The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ২৮ জুলাই ২০১৪, ১৩ শ্রাবণ ১৪২১, ২৯ রমজান ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ তোবায় আটকা শ্রমিক, বেতন দিচ্ছে বিজিএমইএ

গোয়েন্দা উপন্যাস

মেডেল রহস্য

রকিব হাসান

শার্টের পকেট থেকে একটা চিঠি বের করে রবিন ও কিশোরকে দেখাল তিন গোয়েন্দার বন্ধু বিড ওয়াকার।
চিঠির নিচে প্রেরকের নামের জায়গায় শুধু ‘ওটিনো’ লেখা। লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে পাঠানো হয়েছে চিঠিটা।
‘এই লোক না দেখেই কিউরিওর সমস্ত কালেকশন পাঁচশো ডলারে কিনে নেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে,’ বিড বলল। ‘গতকাল চিঠিটা পেয়েছি আমি। তারপর সকালবেলা ফোন করেছে। লোকটা বলেছে বিকেলে আবার করবে। আমি রাজি থাকলে নগদ টাকা দিয়ে জিনিসগুলো সব নিয়ে যাবে।’
ব্যাপারটা সন্দেহজনক। রবিন আর কিশোর দুজনই বুঝতে পারছে, লোকটা বিডকে ভাবার সময় দিতে চাইছে না। ভাবলে যদি মত বদলে ফেলে, যদি বিক্রি না করে।
কিশোর বলল, ‘আমার ধারণা তোমার কিউরিও কালেকশনের দাম পাঁচশো ডলারের অনেক বেশি। নইলে না দেখে এভাবে কিনে ফেলার প্রস্তাব দিত না ওটিনো।’
‘ঠিক,’ মাথা ঝাঁকাল রবিন। বিডের দিকে তাকাল। ‘তোমার জায়গায় আমি হলে সহজে রাজি হতাম না। অন্তত জিনিসগুলো না দেখে তো নয়ই।’
বিড বলল, ‘আমিও আগে জিনিসগুলো দেখে নিতে চাই। বলা যায় না কী বেরিয়ে পড়বে ওগুলো থেকে।’
‘এমন কিছু নিশ্চয় আছে ওগুলোর মধ্যে, ওটিনো জানে,’ কিশোর বলল। ‘আর জানে বলেই না দেখে সব কিনে নেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে।’
‘নাহ্, বেচব না,’ জোরে জোরে মাথা নাড়ল বিড। ‘না দেখে কোনোমতেই না।’
‘জিনিসগুলোর লিস্ট আছে তোমার কাছে?’ বিডকে জিজ্ঞেস করল রবিন।
‘না, পুরো লিস্ট নেই। তবে লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে একটা ব্যাংকের ম্যানেজার চিঠি পাঠিয়েছেন আমাকে। তাতে কয়েকটা আইটেমের নাম লেখা আছে।’ পকেট থেকে লম্বা, ভাঁজ করা একটা খাম বের করল বিড।
খাম খুলে চিঠিটা বের করে পড়তে পড়তে কুঁচকে গেল রবিনের ভুরু। ‘আরে! মুরিশ সিমিটার!’
‘সে আবার কী জিনিস?’ প্রশ্ন করল বিড।
‘সিমিটার হলো বাঁকা ধারালো তলোয়ার। মধ্যযুগে মুরিশ ঘোড়সওয়াররা ব্যবহার করত। নেপোলিয়নও যুদ্ধের সময় ব্যবহার করতেন। খাঁটি দামেস্ক ইস্পাতে তৈরি। সোনায় মোড়া হাতলে মূল্যবান পাথর বসানো থাকে। পুরনো এই তলোয়ারগুলো এখন দুষ্প্রাপ্য বলে দামও অনেক।’ গড়গড় করে বলে গেল বইয়ের পোকা রবিন। একটু থেমে যোগ করল, ‘ছোট করে ফেলা সংকুচিত কাটা মাথার কথাও চিঠিতে লিখেছে। মানুষের কাটা মুণ্ডু—সানস্তাস না তো? সরকারের কড়া নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও পেরু আর ইকুয়েডরের চোরাবাজারে স্যুভেনির শপগুলোতে এখনও যেগুলো বিক্রি হয়?’
‘হতে পারে,’ বলে বিডের দিকে তাকাল কিশোর। ‘আন্দিজ পর্বতমালার বাসিন্দা বুনো ইণ্ডিয়ানরা আগে লড়াই বাধলে পরাজিত শত্রুর মাথা কেটে নিত। কাটা মাথা থেকে প্রথমে মগজ বের করে ফেলে দিত। তারপর সেটা সেদ্ধ করে ছোট করতে করতে মানুষের মুঠোর সমান বানিয়ে ফেলত। তার ভেতরে ভরত গরম বালি আর পাথর। চোখ, ঠোঁট সেলাই করে দিত। মানুষের স্বাভাবিক চেহারা ঠিকই থাকত, মুন্ডুটা হয়ে যেত অনেক বেশি ছোট। চুলগুলো যেমন থাকত, তেমনই রেখে দিত। এমনকি এর ঔজ্জ্বল্যও নষ্ট হতো না।’
বানানোর কায়দা শুনে মন্তব্য করল বিড, ‘বর্বরতার চূড়ান্ত!’
‘এসব মাথা খুব একটা দামি নয়,’ কিশোর বলল। ‘সভ্য লোকে এ জিনিস ড্রইংরুমে সাজাতে পছন্দ করে না। তার মানে নিশ্চয় দামি অন্য কোনো জিনিস আছে তোমার কিউরিওগুলোর মধ্যে। না দেখে বিক্রি করাটা বোকামি হবে।’
বিড সায় দিল কিশোরের কথায়।
‘চলো, স্টেশনে যাই,’ তাগাদা দিল রবিন। ‘ট্রেন আসার সময় হয়ে গেছে।’
ঘটনার শুরু ঘণ্টাখানেক আগে। কিশোরদের বাড়িতে কিশোরকে ফোন করে জানিয়েছে বিড, ‘আমার ডেভিড আঙ্কেলের কিউরিও শপ থেকে বহু জিনিস আসছে আমার নামে। লস অ্যাঞ্জেলেসে তার দোকান ছিল। কয়েক দিন আগে মারা গেছেন। বিয়ে করেননি। উত্তরাধিকার সূত্রে জিনিসগুলো এখন আমার। দোকানের সমস্ত জিনিসপত্র ট্রেনে করে রকি বিচে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। দুপুরের ট্রেনে আসছে ওগুলো। দেড়টার দিকে স্টেশনে যাব আনতে। ওসবের মধ্যে মাথাগুলোও থাকবে। যাবে আমার সঙ্গে?’
‘নিশ্চয়ই যাব,’ জবাব দিতে এক মুহূর্ত দ্বিধা করেনি কিশোর। লাঞ্চের সময় তখন। নাকে-মুখে কিছু খাবার গুঁজে দিয়ে রবিনকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে ও। চলে এসেছে বিডদের বাড়িতে।
ও, হ্যাঁ, এখানে একটা কথা জানিয়ে রাখা ভালো। রবিন এখন কিশোরদের বাড়িতেই থাকে। ওর বাবা-মা জরুরি কাজে ইউরোপে গেছেন। কবে ফিরবেন ঠিক নেই। বাড়িতে একা থাকতে ভালো লাগে না, তাই কিশোরদের বাড়িতে এসে উঠেছে সে।
যাই হোক, দুটো চিঠিই আবার পকেটে চালান করে দিল বিড। তিনজনে মিলে পা বাড়াল গেটের দিকে।
বিডের বাবা মিস্টার ড্রেক ওয়াকার কন্সট্রাকশনের কাজ করেন। কোম্পানির একটা ট্রাক বাড়ির সামনেই রাখা আছে। সেটাতে করে স্টেশনে পৌঁছল ওরা। প্ল্যাটফর্মে ঢুকল। একটা ওয়ালফোনের পাশ দিয়ে যাবার সময় তীক্ষ শব্দে বেজে উঠল ফোন। যেন ওদেরকেই জানান দিল।
‘ওটিনো না তো!’ ভুরু কুঁচকে তাকাল বিড। আশপাশে কাছাকাছি ওরা তিনজন বাদে আর কেউ নেই।
‘কী করে বুঝলে?’ রবিনের প্রশ্ন।
‘মন বলছে।’
‘ধরে দেখো না।’
ফোন ধরল বিড। ‘হ্যালো!’
ওপাশের কথা শুনতে শুনতে চোয়াল কঠিন হয়ে উঠল ওর। কিশোর আর রবিনকে ইশারায় জানাল ওর ধারণাই ঠিক। ওটিনোই ফোন করেছে।
‘না!’ অবশেষে কঠিন কণ্ঠে জবাব দিল বিড। ‘আমার ওই এক কথা। এভাবে জিনিস আমি বেচব না।’
ফোন রেখে দিল সে।
‘কী বলল লোকটা?’ একযোগে জানতে চাইল কিশোর ও রবিন।
‘হুমকি দিচ্ছে,’ বিড বলল। ‘শাসাল। বলল এজন্য নাকি আমাকে ভুগতে হবে। রকি বিচেই আছে এখন লোকটা।’
‘আমার তো মনে হয় স্টেশনেই আছে,’ চিন্তিত ভঙ্গিতে জবাব দিল রবিন। ‘চোখ রাখছে আমাদের ওপর। আমরা ওয়ালফোনের পাশ দিয়ে যাবার সময় ফোন করেছে। নইলে আমরা কখন ফোনের কাছে পৌঁছলাম, জানার কথা নয় তার।’
প্ল্যাটফর্মে ঢুকল ওরা।
ট্রেন আসেনি তখনও। প্ল্যাটফর্ম ভর্তি লোকজন। হকারদের হাঁকডাক। কুলির চেঁচামেচি। সব মিলিয়ে হট্টগোল। কিন্তু তবুও কোথায় যেন একটা ভালো লাগা আছে এই স্টেশনগুলোর মধ্যে।
প্ল্যাটফর্মের চারদিকে তাকিয়ে লোকটাকে খুঁজতে লাগল তিনজন। দেখল, কেউ ওদের ওপর নজর রাখছে কি না।
ট্রেনের বাঁশি বাজল। প্ল্যাটফর্মে ঢুকল ট্রেন। ভারি গুমগুম শব্দ তুলে কিশোরদের পাশ দিয়ে চলে গেল ইঞ্জিনটা। পায়ের নিচে মাটি কাঁপছে। বেশ খানিকটা এগিয়ে থেমে দাঁড়াল।
যাত্রীবাহী কামরাগুলোর মাঝখানে দু-তিনটে মালবাহী কম্পার্টমেন্ট। চাবির গোছা হাতে ওগুলোর দিকে এগিয়ে গেল রেলওয়ের দুজন কর্মচারী। দরজা খুলল। মাল নামানো শুরু হলো। বেশির ভাগই নানা ধরনের বাক্স।
কয়েকটা বাক্সের গায়ে বিডের নাম দেখে শিস দিয়ে উঠল রবিন। ‘ওই যে, তোমার জিনিস।’
এগিয়ে গেল তিনজন। রেলওয়ের একজন কর্মচারীর হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দিল বিড। বাক্সগুলো দেখাল। ‘এগুলো বোধহয় আমার।’
কাগজের নম্বর আর নাম দেখে বাক্স মিলিয়ে নিল লোকটা। মাথা ঝাঁকাল। ‘হ্যাঁ। নিয়ে যাও।’
লোহার ঠেলাগাড়িতে করে মালগুলো প্রথমে গেটের বাইরে নিয়ে এল ওরা। তারপর পিকআপে তুলল। বাক্সে কী আছে দেখার জন্য অস্থির হয়ে আছে ওরা। কিন্তু বাড়ি না ফিরে সেটা সম্ভব না।
রবিন বলল, ‘কিশোর, তুমি সামনে বিডের সাথে বসো। আমি ট্রাকের পিছনে বসছি। মাল পাহারা দিই।’
‘ঠিক আছে,’ পিকআপের কেবিনে প্যাসেঞ্জার সিটে উঠে বসল কিশোর। বিড বসল ড্রাইভিং সিটে। ইঞ্জিন স্টার্ট দিল।
খোলা ট্রাকের পিছনে বাক্সের ওপর বসেছে রবিন। এখান থেকে প্ল্যাটফর্ম দেখা যায়। চারপাশে চোখ বোলাচ্ছে ও। ওটিনো নামটার সাথে মানানসই হয়, এ রকম কোনো লোকের চেহারা চোখে পড়ল না। তার মনে হতে লাগল, মিথ্যেই শাসিয়েছে লোকটা।
স্টেশন থেকে সরে এসে বড় রাস্তায় উঠল পিকআপ। কিছুদূর এগিয়ে মোড় নিয়ে আরেকটা রাস্তায় পড়ল। রাস্তার দু পাশে গাছের সারি। আরও কিছুটা এগিয়ে নিজেদের বাড়ির গলিতে পড়ল পিকআপটা। কয়েকটা বাড়ি পরেই ওদের বাড়ি।
রিয়ার ভিউ মিররের দিক থেকে মুহূর্তের জন্য চোখ সরায়নি কিশোর। একই সঙ্গে নজর রেখেছে সামনের রাস্তার দিকে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল, ‘যাক, নিরাপদেই পৌঁছলাম।’
তার কথা শেষ হতে না হতেই রবিনের চিত্কার শোনা গেল।

দুই
তিরটাকে আসতে দেখেই চট করে মাথা নুইয়ে ফেলেছিল রবিন। আপনাআপনি একটা হাত উঠে চলে এসেছিল মুখের কাছে। খোঁচা লাগার তীক্ষ ব্যথা অনুভব করল ডান হাতে। চোখা ফলার খোঁচা খেয়েছে।
‘এই বিড, গাড়ি থামাও!’ চিত্কার করে উঠল রবিন। ‘ধরো ব্যাটাকে!’
গাছের আড়ালে লুকিয়ে ছিল লোকটা। পিকআপটা দেখে বেরিয়ে এসেছিল। তীরটা ছুড়ে মেরেই দৌড়। চলে যাচ্ছে।
সশব্দে ব্রেক কষল বিড। এক ঝটকায় দরজা খুলল কিশোর। লাফিয়ে নেমে ওপাশের ঝোপঝাড় আর জঙ্গল লক্ষ করে ফুটপাতের ওপর দিয়ে দৌড় দিল।
‘লোকটার কাছে ব্লোগান আছে!’ পেছন থেকে সাবধান করল রবিন।
জঙ্গল ঘেঁষা বাড়িগুলোর পেছনে অদৃশ্য হয়ে গেল কিশোর। লোকটা ওদিকেই গেছে।
বিড ট্রাকটাকে রাস্তার এক পাশে রাখল। দরজা খুলে লাফ দিয়ে নেমে এল। রবিন নেমে পড়েছে ততক্ষণে।
‘লেগেছে?’ জানতে চাইল বিড।
‘হ্যাঁ, হাতে বাড়ি লেগেছে।’ তীরটা ওকে দেখাল রবিন। দণ্ডটা খুবই ছোট, মাত্র কয়েক ইঞ্চি লম্বা। ফলার গায়ে আঠা দিয়ে লাগানো এক টুকরো কাগজ। কাগজ বা তির কোনটাই পরীক্ষা করার সময় নেই। ট্রাউজারের পকেটে ঢুকিয়ে রাখল সে। বিডকে ট্রাক পাহারা দিতে বলে সে-ও ছুটল কিশোরের পেছন পেছনে।
জঙ্গলে ঢুকে ঘন ঝোপের পাশ দিয়ে বেরিয়ে এসে ডাক দিল রবিন, ‘কিশোর, তুমি কোথায়?’
‘এখানে!’ একটা কাঁটাতারের বেড়ার কাছ থেকে জবাব দিল কিশোর। হাঁপাচ্ছে। বেড়ার ওপাশে একটা প্ল্যাস্টিক কারখানার সীমানা। ‘ব্লোগানওয়ালা লোকটা বেড়া টপকে পালিয়েছে। ওই বিল্ডিং দুটোর মধ্যে ঢুকে পড়েছে। ধরা যাবে না আর।’
রবিন হাঁপাচ্ছে। দম নিয়ে হতাশ ভঙ্গিতে বলল, ‘তাহলে আর দাঁড়িয়ে থেকে লাভ কী? চলো। বলা যায় না, ট্রাকের কাছ থেকে আমাদের সরানোর ফন্দিও হতে পারে এটা।’
ঝোপঝাড় ভেঙে কারও আসার শব্দ শোনা গেল। হামলাকারীর সঙ্গী নয় তো?
‘জলদি লুকাও!’ ফিসফিস করে বলল কিশোর।
একটু পরেই আগন্তুকের চেহারা দেখা গেল। বেরিয়ে এসেছে খোলা জায়গায়।
‘বিড!’ নিচু স্বরে ডাকল কিশোর।
ওদের দিকে এগোল বিড। মুখে স্বস্তির হাসি। ‘ভয় লাগছিল তোমাদের জন্য। ভাবলাম কি না কী হচ্ছে। গাড়িতে বসে থাকতে পারলাম না।’
‘চাবি?’
‘এই যে,’ রিং-সহ চাবিটা তুলে দেখাল বিড। ‘অতটা বোকা ভেবো না আমাকে।’
‘তবু গাড়ি ছেড়ে আসা উচিত হয়নি তোমার।’
‘জলদি চলো!’ ছুটতে শুরু করল রবিন।
রাস্তার কাছাকাছি এসে কিশোরকে জিজ্ঞেস করল বিড, ‘লোকটাকে দেখেছ?’
‘দেখেছি, তবে ভালোমতো না,’ জবাব দিল কিশোর। ‘বেঁটে। রোগা। ছোট ছোট গোঁফ আছে। বয়েস এই চল্লিশ-টল্লিশ হবে। তবে খুব শক্তসমর্থ— যেভাবে লাফ দিয়ে বেড়া টপকাল!’
গাড়ির কাছে ফিরে এল ওরা। জিনিসপত্রগুলো ঠিকমতোই আছে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
‘রবিন, আর পেছনে থাকার দরকার নেই। সামনে এসে বসো আমাদের সঙ্গে,’ বিড বলল। ‘একবার তির ছুড়েছে, পরের বার হয়তো ব্লোগান দিয়ে ডার্ট মারবে, এবার হূিপণ্ডে। এসো এসো, চলে এসো। বার বার ভাগ্য সহায় হয় না।’
ট্রাকে বসে তিরটা পরীক্ষা করে দেখল ওরা। ফলাটা সিসা দিয়ে তৈরি। কাগজের টুকরো দিয়ে মোড়ানো থাকায় ফলাটাকে প্রায় দেখাই যায় না। কাগজটা একটা নোট। পেন্সিল দিয়ে লেখা। হাতের লেখা ভালো না। বিডকে হুমকি দেওয়া হয়েছে সে যেন কিউরিওগুলো কাউকে না দেখায়।
‘আশ্চর্য! হচ্ছেটা কী?’ অভিযোগের সুরে বলল বিড। ‘জিনিস বিক্রি করতে রাজি না হওয়ায় প্রথমে ওটিনো আমাকে ভয় দেখাল। আর এখন আরেকজন কাউকে ওগুলো না দেখানোর হুমকি দিচ্ছে।’
‘আমার ধারণা, দুটোই ওটিনোর কাজ,’ রবিন বলল। ‘তোমাকে বিভ্রান্ত করতে চাইছে।’
‘শিওর হব কিভাবে?’ নিজেকেই প্রশ্ন করল যেন কিশোর। ‘বলা যায় না, ওটিনো ছাড়াও আরো কেউ লাগতে পারে কিউরিওগুলোর পেছনে।’
‘ওটিনোর কোনো শত্রু?’ ইঞ্জিন স্টার্ট দিল বিড।
‘হতে পারে,’ জবাব দিল কিশোর। ‘অসম্ভব না। তবে যা-ই বলো, জটিল হয়ে উঠছে রহস্য। মজাই লাগছে আমার।’
বাড়ি পৌঁছল বিড। গেটের ভেতর গাড়ি ঢোকাল। গ্যারেজের কাছে এনে থামাল। চার কামরার গ্যারেজ। সবগুলোতে গাড়ি থাকে না। একটাতে বাক্সগুলো রাখা যাবে।
বিড বলল, ‘এখানেই খুলি। পরে ঘরে নিয়ে যাব।’
বাক্সগুলো ট্রাক থেকে নামাতে শুরু করল ওরা। একটা বাক্সে পাওয়া গেল দামেস্ক ইস্পাতে তৈরি চারটে তলোয়ার।
‘বিড,’ কিশোর বলল। ‘গ্যারেজে এসব জিনিস রাখা ঠিক হবে না। ঘরে নিয়ে যাই চলো। স্টোররুমে রেখে দেব।’
‘তার চেয়ে বরং আরেক কাজ করি,’ বিড বলল। ‘মিউজিয়ামকে দিয়ে দিই। নিরাপদে থাকবে। আমরাও ঝামেলা থেকে বাঁচব। কিউরেটর মিস্টার ব্র্যাডম্যান বাবার বন্ধু।’
‘বুদ্ধিটা মন্দ না,’ কিশোর বলল।
‘দাঁড়াও এখানে,’ বিড বলল। ‘পাহারা দাও। আমি ফোন করে আসি।’
কিশোর ও রবিন বাক্স পাহারা দিতে রয়ে গেল গ্যারেজে। বিড চলে গেল বাড়ির ভেতর।
মিস্টার ব্র্যাডম্যান ওর অনুরোধ শুনে বললেন, ‘মিস্টার ডেভিডের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল, বিড। লস অ্যাঞ্জেলেসে তার দোকানেও গেছি। খুব ভালো আর মজার মানুষ ছিলেন। তবে বড্ড ভুলো মন। তোমার চাচাকে খুব পছন্দ করতাম আমি। তার মৃত্যুর খবর শুনে খারাপই লাগছে। জিনিসপত্রগুলো আমাদের মিউজিয়ামের খুব একটা কাজে লাগবে বলে মনে হয় না।’
‘কিন্তু অন্তত...’ বলতে গেল বিড।
বাধা দিয়ে মিস্টার ব্র্যাডম্যান বললেন, ‘জিনিসগুলোর নিরাপত্তা চাইছ তো? ঠিক আছে। কিছুদিনের জন্য তোমার কিউরিওগুলো মিউজিয়ামে রাখার ব্যবস্থা করা যাবে।’
বিড জিজ্ঞেস করল, ‘কখন আসব?’
‘রাত নটার দিকে এলেই ভালো হয়। তখন মিউজিয়ামে লোকজন থাকে না। আমিও ফ্রি। জিনিসগুলোতে একবার চোখ বোলানোর সুযোগ পাব।’
তাঁকে ধন্যবাদ দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল বিড। দেখল একটা লোক গ্যারেজের পাশ দিয়ে পা টিপে টিপে চলে যাচ্ছে। নিশ্চয় আড়ি পেতে এতক্ষণ কথা শুনছিল। লোকটা বেঁটে। মাথায় একটা ক্যাপ পরেছে। সামনের কানাটা টেনে নামিয়ে দিয়েছে কপালের ওপর, যাতে মুখটা ঠিকমতো চেনা না যায়।
চিত্কার করে উঠল বিড।
স্প্রিংয়ের মতো লাফিয়ে উঠে দৌড় দিল লোকটা।
বিড ধাওয়া করল তাকে।
লোকটা এক দৌড়ে চলে গেল পাশের রাস্তায়। ঢুকে পড়ল দুটো বাড়ির মাঝের ফাঁকে। ওপাশে একটা গাড়ি অপেক্ষা করছিল তার জন্য। লোকটা গাড়িতে গিয়ে উঠতেই ছেড়ে দিল গাড়ি। ধরা যাবে না বুঝে থেমে গেল বিড।
ফিরে এসে কিশোরদের জানাল সব। চিন্তিত হয়ে পড়ল ওরা।
‘লোকটার আচরণে বদমতলব টের পাওয়া যাচ্ছে,’ রবিন বলল। ‘আমাদের আরও সাবধান হতে হবে।’
বাক্স খুলে কিউরিওগুলো দেখার সময় চারপাশে সতর্ক নজর রাখল ওরা। একটা ব্যাপারে নিশ্চিত হলো। এগুলোর দাম পাঁচশো ডলারের অনেক বেশি।
ঘণ্টাখানেক পরে রবিন বলল, ‘সাড়ে ছটা বাজে। এবার ক্ষান্ত দেওয়া দরকার। খিদে পেয়েছে।’
‘বাবা-মা পার্টিতে গেছে,’ বিড বলল। ‘কিশোর, তোমাদের বাড়িতে ফোন করে জানিয়ে দাও না, রাতে এখানেই খাবে।’
‘বেশ,’ কিশোর বলল।
ফোন করে চাচিকে জানিয়ে দিল ও।
ফ্রিজ ভর্তি খাবার আছে। খেতে বসল ওরা।
হঠাত্ কান পাতল কিশোর।
‘কী ব্যাপার?’ জিজ্ঞেস করল বিড।
‘গ্যারেজে কিসের যেন শব্দ শুনলাম।’
তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এল ওরা। গ্যারেজের দরজায় আগের মতোই তালা দেওয়া দেখে পেছন দিকে চলে এল। একমাত্র জানালাটা খোলা।
‘কে খুলল!’ ভুরু কোঁচকাল বিড। ‘বন্ধই তো ছিল যদ্দূর মনে পড়ে।’
গ্যারেজের অনেক ওপরে জানালা। লাফিয়ে উঠে চৌকাঠ ধরে ঝুলে পড়ল রবিন। বানরের মতো বেয়ে উঠে প্রথমে পা দুটো ঢুকিয়ে দিল ভেতরে।
‘সাবধানে ঢুকো!’ বিড বলল। ‘ভেতরে লোক থাকতে পারে।’
সামনের দিক দিয়ে এসে তালা খুলল বিড। কিশোরকে নিয়ে ভেতরে ঢুকল।
ওরা ঢুকতেই চেঁচিয়ে উঠল রবিন, ‘একটা তলোয়ার কম!’
তন্নতন্ন করে খুঁজেও তলোয়ারটার সন্ধান পাওয়া গেল না। তিনজন মিলে সিদ্ধান্ত নিল আরও বিপত্তি ঘটার আগেই ট্রাকে মাল ভরে পৌঁছে দেবে মিউজিয়ামে। তবে তার আগে এঁটো থালা-বাসনগুলো ধুয়ে রাখা দরকার।
থালা-বাসন ধুচ্ছে ওরা, দরজায় কলবেল বাজল। কে এল? সতর্ক হলো ওরা।
দরজা খুলে দিল বিড। মুসাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হাসি ফুটল মুখে।
‘খাবার মিস করলাম নাকি?’ কিশোরকে তোয়ালেতে হাত মুছতে দেখে জিজ্ঞেস করল মুসা।
‘হ্যাঁ, করেছ,’ হাসল কিশোর। ‘খাওয়া মিস করেছ, তবে আরেকটা ব্যাপারে সময়মতোই এসেছ— বিশটা বাক্স বিডের গাড়িতে তুলে দিতে সাহায্য করতে পারবে আমাদের?’
হতাশ ভঙ্গিতে গুঙিয়ে উঠে একটা চেয়ারে বসে পড়ল মুসা। ‘তার মানে সেধে এসে তোমাদের ফাঁদে ঢুকলাম, তাই না? তবে সবচেয়ে ছোট বাক্সগুলো তুলব আমি। এখন বলো, ঘটনাটা কী?’
সংক্ষেপে জানানো হলো মুসাকে। কাজ শুরু করল ওরা। রাতের অন্ধকার যখন গাঢ় হতে শুরু করল রকি বিচের ওপর, ওর দুশ্চিন্তার কথাটা কিশোরকে জানাল বিড, পুলিশের পাহারা ছাড়া বাক্সগুলো নিয়ে বেরোনো উচিত হবে না।
‘ঠিকই বলেছ,’ এক মত হলো কিশোর। ‘এ সময় তো থানাতেই থাকেন পুলিশ চিফ ক্যাপ্টেন ইয়ান ফ্লেচার। ফোন করো।’
ফোন করে সব জানাল বিড।
‘এত কিছু ঘটে গেছে,’ টেলিফোনে গমগম করে উঠল ক্যাপ্টেন ফ্লেচারের কণ্ঠ। ‘আরও আগে জানাওনি কেন আমাকে? এক্ষুনি আসছি। সাথে আরও লোক নিয়ে আসব। চিন্তা কোরো না।’
ফ্লাড লাইটের আলোয় কাজ চালিয়ে গেল ওরা।
শেষ বাক্সটা গাড়িতে তোলা শেষ করেছে টনি, এ সময় বলে উঠল রবিন, ‘ওই যে, এসে গেছে।’
মোড়ের কাছে দেখা গেল পুলিশের গাড়িটা। গেটের বাইরে থামল।
ফ্লাডলাইট নিভিয়ে দিল বিড। তিন গোয়েন্দাকে নিয়ে গাড়িতে উঠল। নিজে বসল ড্রাইভিং সিটে।
পিছিয়ে গেটের বাইরে বের করে আনল গাড়িটা।

তিন
মিউজিয়ামের দিকে ছুটে চলল দুটো গাড়ি।
শহরের সবচেয়ে নির্জন রাস্তাগুলোর একটা হলো মিউজিয়ামে যাওয়ার রাস্তাটা। রাতে খুব কম গাড়ি চলে এটা দিয়ে। পথের দু পাশে বড় বড় গাছ। গাছের সারি ভুতুড়ে ছায়া ফেলেছে রাস্তার ওপর।
‘আমার গা ছমছম করছে,’ রবিনকে বলল মুসা। ‘মনে হচ্ছে প্রতিটি গাছের আড়ালে, প্রতিটি ঝোপের মধ্যে ব্লোগান নিয়ে ঘাপটি মেরে রয়েছে আততায়ী।’
তবে পথে কোনো অঘটন ঘটল না। পুলিশ দেখেই বোধহয় কিছু করতে সাহস করল না কেউ।
মিউজিয়ামের ড্রাইভওয়েতে ঢুকল গাড়ি দুটো।
ড্রাইভওয়েতেও আলো খুব কম। প্রায় পুরো দালানটাকেই ঘিরে রেখেছে আইভি লতা। দালানটার আশপাশের ঝোপঝাড়ে তীক্ষ দৃষ্টি বোলাচ্ছে কিশোর ও রবিন।
সন্দেহজনক কিছু চোখে পড়ল না।
বাড়িটা পুরনো। ক্যাচকোচ শব্দে খুলে গেল মিউজিয়ামের প্রকাণ্ড দরজা।
দোরগোড়ায় এসে দাঁড়ালেন কিউরেটর মিস্টার ব্র্যাডম্যান। দ্রুতপায়ে নেমে এলেন সিঁড়ি বেয়ে। স্বাগত জানালেন সবাইকে।
‘জলদি, আঙ্কেল!’ কাতর গলায় বলল বিড। ‘এই জিনিসগুলোর একটা হিল্লে করুন। আর টেনশন সহ্য হচ্ছে না। ইস্, কী জিনিসের মালিকই যে হলাম!’
‘মাটির নিচের ঘরটায় নিয়ে যাও,’ মিস্টার ব্র্যাডম্যান বললেন।
ট্রাক থেকে বাক্স নামাতে শুরু করল ছেলেরা। ক্যাপ্টেন ফ্লেচার আর তার সহকারীরা পাহারায় থাকলেন। পনেরো মিনিটের মধ্যে কাজ শেষ হয়ে গেল। সর্বশেষ বাক্সটা নামানোর পর ক্যাপ্টেন ফ্লেচারকে বলল বিড, ‘কাজ শেষ, খালু। অনেক ধন্যবাদ আপনাদের।’
হাসলেন ক্যাপ্টেন ফ্লেচার। ‘আমরা তো শুধু ডিউটি করলাম, পুলিশের কর্তব্য। আবারও কোনো সমস্যায় পড়লে নির্দ্বিধায় খবর দিয়ো আমাকে।’
দলবল নিয়ে চলে গেলেন তিনি।
পুলিশ চলে যাবার সঙ্গে সঙ্গে ভেতর থেকে মস্ত দরজাটার হুড়কো লাগিয়ে দিলেন মিস্টার ব্র্যাডম্যান। গোয়েন্দাদের নিয়ে চলে এলেন মাটির নিচের ঘরে।
তালিকাটা পড়লেন মিস্টার ব্র্যাডম্যান। উত্তেজনায় জ্বলজ্বল করছে চোখ। ‘কল্পনাই করিনি এমন সব জিনিস আছে। তুমি যখন ফোনে বললে, তখন মনে করেছিলাম... আসলে না দেখে বলাটা ভুল হয়েছে। খোলো খোলো, দেখি।’
বাক্সগুলো খুলতে শুরু করল ছেলেরা।
উত্সুক ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইলেন মিস্টার ব্র্যাডম্যান। মন্তব্য করলেন, ‘তবে কিছু কিছু জিনিস আছে এখানে যেগুলোর কোনো মূল্যই নেই। যেমন এই বাক্সটা।’ সাধারণ সিগারেটের বাক্সের মতো একটা বাক্স তুলে নিলেন তিনি। চার ইঞ্চি লম্বা, কালো কাঠের তৈরি বাক্সটা ময়লা ফেলার ঝুড়িতে ফেলে দিলেন।
বাক্সটার দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবল কিশোর। ঝুড়ি থেকে তুলে নিয়ে পকেটে ভরে রাখল।
ব্যাপারটা লক্ষ করল রবিন। ওই মুহূর্তে কিছু জিজ্ঞেস করল না।
‘চলো, স্টোররুমটা দেখাই। ওখানেই রাখবে জিনিসগুলো।’ মিস্টার ব্র্যাডম্যান বললেন।
সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল সবাই।
আগে আগে হাঁটছে কিশোর। তার জুতোর শব্দ প্রতিধ্বনি তুলল মেইন হলের মেঝেতে। নীরবতার মাঝে প্রকট হয়ে কানে বাজতে লাগল সামান্য শব্দও।
‘কিশোর!’ পেছন থেকে জামার আস্তিন টেনে ধরল রবিন। হাত তুলে দেখাল, ‘একটা শব্দ শুনলাম মনে হলো ওদিকে!’
হলঘরের অন্যপ্রান্তে একটা ঘর। শব্দটা ওদিক থেকেই এসেছে মনে হলো তার। মিস্টার ব্র্যাডম্যানের দিকে তাকিয়ে নিচুস্বরে জিজ্ঞেস করল, ‘আঙ্কেল, বিল্ডিংয়ের কাজ চলছে নাকি?’
মাথা নাড়লেন মিস্টার ব্র্যাডম্যান। ‘নাহ্! তাছাড়া এতরাতে কিসের কাজ? এ বাড়িতে এখন আমরা ছাড়া আর কেউ নেই।’
আবার হলো শব্দ। এবার শুনতে পেল সবাই।
হলের সমস্ত বাতি আগেই জ্বেলে দিয়েছেন মিস্টার ব্র্যাডম্যান। ও প্রান্তের ঘরটার দিকে দৌড় দিলেন।
সবার আগে দরজার কাছে পৌঁছে দাঁড়িয়ে গেল কিশোর। সুইচ টিপে আলো জ্বালল। সারি সারি কফিন দেখতে পেল। কিছু আছে পাথরের, বাকিগুলো কাঠের তৈরি। মমি রাখার বাক্স। সবগুলোই শূন্য, একটা বাদে। সিডার কাঠে তৈরি ডালাতোলা এই বাক্সটায় শুয়ে আছে একটা মমি। মমিঘরের একমাত্র মমি। মিশরীয় নয়। তার পরেও ওই একটা মমি আনতেই বিপুল অঙ্কের টাকা খসেছে মিউজিয়ামের কোষাগার থেকে।
‘নিশ্চয় মমি চুরি করতে এসেছিল!’ শঙ্কিত শোনাল মিস্টার ব্র্যাডম্যানের কণ্ঠ। ‘একজন দোতলার ব্যালকনিতে চলে যাও। বাকি সবাই আমরা এ তলাটা খুঁজে দেখি।’
মেইন হল থেকে পেঁচানো সিঁড়ি চলে গেছে ব্যালকনিতে। লোহার রেলিং ধরে সেই সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করল মুসা। রবিন ও কিশোর মমিঘরে রইল। আর বিডকে নিয়ে মিস্টার ব্র্যাডম্যান এগোলেন হলঘরের দিকে।
‘কেমন গা ছমছমে জায়গা, কিশোর, দেখেছ!’ মমিঘরের চারপাশে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল রবিন।
‘মমি দেখে গা ছমছম করার কিছু নেই,’ কিশোর বলল। ‘আমি ভয় পাচ্ছি ওই থামের আড়াল থেকে কেউ ব্লোগান দিয়ে ডার্ট ছুঁড়ে মারে কি না ভেবে।’
মমিঘরে কাউকে পেল না ওরা। পা টিপে টিপে বাইরের প্যাসেজে চলে এল। শেষ মাথায় পৌঁছে গেছে। কাউকে চোখে পড়ল না।
হঠাত্ থমকে দাঁড়াল কিশোর। নাক তুলে বাতাস শুঁকতে লাগল। ‘ধোঁয়ার গন্ধ পাচ্ছ?’
‘পাচ্ছি,’ মাথা ঝাঁকাল রবিন।
পোড়া গন্ধ নাকে ঢুকছে।
গন্ধের উত্স খুঁজতে খুঁজতে আবার মমিঘরে এসে ঢুকল দুজন।
‘আগুন! আগুন!’ চিত্কার করে উঠল রবিন।
তার চিত্কার শুনে হুড়মুড় করে এসে ঘরে ঢুকলেন মিস্টার ব্র্যাডম্যান। পেছনে বিড।
একটা কারুকাজ করা কফিনের দিকে আঙুল তুলে দেখাল রবিন। খুলে চিত হয়ে আছে কফিনের ডালা। ভেতর থেকে উঠে আসছে সাদা ধোঁয়ার একটা পাতলা রেখা।
কাছে এসে নিচে তাকাল সবাই। কফিনের তলায় মোচার আকারে সাজানো ছাইয়ের স্তূপ। ছাইয়ের নিচে জ্বলছে কাঠের টুকরো। ধোঁয়া উঠছে ওই অদ্ভুত স্ত ূপ থেকেই।
দুই টানে গায়ের শার্ট খুলে ফেলল রবিন। বাড়ি মেরে মেরে আগুন নেভাতে শুরু করল।
‘চোরটা এখনও এ বিল্ডিংয়েই আছে!’ উত্তেজিত গলায় বললেন মিস্টার ব্র্যাডম্যান। ‘তবে বেরোতে পারবে না। দরজায় তালা। চাবি আমার কাছে। তার মানে আগে থেকেই ঢুকে বসে ছিল।’ কফিনটার দিকে তাকালেন। ‘ছাই সরাতে হবে। আমি আসছি এক্ষুনি।’
কিশোরদের দাঁড়াতে বলে চলে গেলেন তিনি।
পকেট থেকে একটা খাম বের করল কিশোর। বালতি থেকে আধপোড়া কয়েকটা কাঠের টুকরো তুলে নিয়ে ভালোমতো নিভিয়ে সেই খামে ভরল।
‘কী করবে?’ জিজ্ঞেস করল রবিন।
‘আমাদের ল্যাবে নিয়ে গিয়ে পরীক্ষা করব।’
অফিসের সঙ্গেই স্টোররুম। সেখান থেকে ছোট একটা বেলচা আর একটা টিনের বালতি নিয়ে এলেন মিস্টার ব্র্যাডম্যান। কফিন থেকে ছাই আর পোড়া কাঠের টুকরোগুলো তুলে বালতিতে রাখলেন। তাকে সাহায্য করল ছেলেরা।
কাজ শেষ হলে বালতি আর বেলচাটা তুলে নিলেন তিনি। ‘চলো, বেরোই। চোরটাকে খোঁজা বাকি রয়ে গেছে এখনও।’
মমিঘর থেকে সবে বেরিয়েছে তিনজন, ঠিক এই সময় ব্যালকনির কাছে ধুড়ুম করে কী যেন পড়ার শব্দ হলো। সেই সঙ্গে ভেসে এল রক্ত হিম করা চিত্কার।
এতক্ষণে খেয়াল করল সবাই, মুসা নেই ওদের সঙ্গে।

চার
তীক্ষ চিত্কারে বৈদ্যুতিক শক খাওয়ার মতো চমকে গেল সবাই। লাফিয়ে উঠে ঘোরানো সিঁড়ির দিকে দৌড় দিল কিশোর। ওর পেছনে রবিন ও বিড। সবার পেছনে মিস্টার ব্র্যাডম্যান।
মুসার কাছে সবার আগে পৌঁছল কিশোর।
ব্যালকনির রেলিঙের গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়েছে মুসা। ব্যালকনিটার উল্টো দিকে একটা গ্যালারির প্রবেশ মুখ। বিশিষ্ট মানুষদের মূর্তি রাখার জন্য তৈরি করা হয়েছে।
‘এখানে এসে দেখি ওই মূর্তিটা নড়ছে।’ গলা কাঁপছে মুসার। দরজার কাছে মাটিতে পড়ে থাকা চেরোকি ইন্ডিয়ান সর্দারের একটা মূর্তি দেখাল।
‘ওখানে এল কী করে ওটা?’ কিশোরের প্রশ্ন।
‘হেঁটে এসেছে। নিজের চোখে দেখেছি। বার দুই টলে উঠে মাটিতে পড়ে গেল,’ মুসার কণ্ঠে ভয়।
পাশে এসে দাঁড়ালেন মিস্টার ব্র্যাডম্যান। ‘শান্ত হও, মুসা। ওই মূর্তিটা নিয়ে এর আগেও আমাদের ভুগতে হয়েছে। বসানোটাই বোধহয় ঠিকমতো হয়নি। সেজন্য পড়ে যায়। ভালোমতো বসাতে হবে এবার।’
‘কি—কিন্তু হেঁটে এল কিভাবে?’ গায়ে কাঁটা দিল মুসার।
কথাটা মাথায় ঢুকতে চোখ বড় বড় হয়ে গেল কিউরেটরের। তাই তো! বসানো ঠিক না হওয়ার কারণে পড়লে তো গ্যালারির নিচে পড়বে। এখানে আসে কিভাবে? বিড়বিড় করে বললেন, ‘তার মানে, ওটা নিজে নিজে নড়েনি, নড়ানো হয়েছে। চুরি করে যে লোকটা মিউজিয়ামে ঢুকেছে, আড়ালে থেকে সে-ই নড়িয়েছে ওটাকে।’
‘এহেহ, হাতে পেয়েও ছেড়ে দিলে!’ আফসোস করে মুসাকে বলল রবিন।
এত বড় সুযোগটা হাতছাড়া হওয়ার হতাশায় মুখ ভার করে রইল মুসা। মস্ত ফাঁকি দিয়েছে ওকে চোরটা। চালাকি করে তার চোখ এড়িয়ে হয়তো বেরিয়েও গেছে এতক্ষণে। কথাটা মনে হতেই রেগে উঠে বলল, ‘ধরতেই হবে ব্যাটাকে! চলো চলো, খুঁজে বের করি।’
আধঘণ্টা ধরে খোঁজাখুঁজি চলল। মিউজিয়ামের ওপরতলা-নিচতলা কিছুই বাদ দিল না ওরা। তন্নতন্ন করে খুঁজল। কোনো চিহ্নই নেই লোকটার। নিচতলায় কোনো জানালা নেই যে পালিয়ে যাবে। আর দোতলার জানালা বন্ধ। তালা মারা।
‘স্কাইলাইট দিয়ে পালায়নি তো?’ সন্দেহ প্রকাশ করল কিশোর।
‘টপ ফ্লোরের প্রিন্ট গ্যালারিতে শুধু একটা স্কাইলাইট আছে,’ জানালেন মিস্টার ব্র্যাডম্যান। চাঁদিতে হাত রাখলেন। ‘ইস্স্, কেন যে ভাবিনি ওটার কথা। একমাত্র ওটাতেই স্পেশাল লক লাগানো নেই।’
দোতলায় উঠে এল কিশোর। স্কাইলাইটের দিকে তাকাল। কাচ লাগানো ফ্রেমটা নিচের দিকে ঝুলে আছে। ওটার সাধারণ তালাটা খুলে ফেলা হয়েছে।
‘লোকটা স্কাইলাইট গলে ছাদে উঠেছে। ওখান থেকে আইভি লতা বেয়ে নেমে গেছে নিচে,’ ভাবল কিশোর। ‘পালাবার চমত্কার উপায়।’
একতলায় নেমে এল সে। যা যা দেখে এসেছে জানাল মিস্টার ব্র্যাডম্যানকে।
কিউরেটর বললেন, মিউজিয়াম বন্ধ করার আগে প্রতিদিন সন্ধ্যায় পরীক্ষা করে দেখা হয় স্কাইলাইট। আজও হয়েছিল। এখন যেহেতু খোলা, বোঝা যাচ্ছে মিউজিয়াম বন্ধ হবার আগেই ভেতরে ঢুকেছে লোকটা।
‘অনেক হয়েছে। এবার বাড়ি যাওয়া যাক,’ মিস্টার ব্র্যাডম্যান বললেন।
আবার উঠে গিয়ে স্কাইলাইটটা লাগিয়ে দিয়ে এল কিশোর। সবাই মিলে রওনা হলো নিচতলায়।
পিকআপের কেবিনে বসলেন মিস্টার ব্র্যাডম্যান। পাশে রবিন। পেছনের খোলা জায়গায় উঠল মুসা ও কিশোর।
গাড়ি চালাল বিড। মেইন রোডে উঠে মোড় নিল।
পকেটে হাত ঢোকাল রবিন। হাতে ঠেকল একটা শক্ত জিনিস। তিরটার কথা মনে পড়ল ওর। এখনও পকেটেই আছে। বের করল।
‘আঙ্কেল, দেখুন তো,’ ড্যাশবোর্ডের আলোয় ফলাটা দেখাল সে, ‘এটা কোন দেশের জিনিস?’
রবিনের হাত থেকে নিয়ে জিনিসটা উল্টেপাল্টে দেখলেন কিউরেটর। মাথা নাড়লেন, ‘এ রকম জিনিস দেখিনি কখনও। আমাদের দেশের আদিবাসী উপজাতীয়রা তির-ধনুক দিয়ে শিকার করে, তির বানায়। কিন্তু ওগুলোর ফলা এমন না।’
‘কোন দেশের, অনুমান করতে পারেন?’
‘বলা কঠিন।’ মুচকি হাসলেন কিউরেটর। ‘গোয়েন্দার কাছে ভুলভাল বলে লজ্জা পেতে রাজি নই আমি।’
রবিন হাসল। ফলাটা রেখে দিল পকেটে।
প্রথমে মিস্টার ব্র্যাডম্যানকে তার বাড়িতে নামিয়ে দিল বিড। তারপর মুসাকে। সবশেষে স্যালভিজ ইয়ার্ডের গেটে নামাল কিশোর ও রবিনকে।
‘শিগগির দেখা হবে আবার,’ বিডকে বলল কিশোর। ‘ওটিনো কিছু বললে জানিয়ো।’
চলে গেল বিড।
বাড়িতে ঢুকল কিশোর ও রবিন। দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে উঠে এসে ঢুকল দোতলায়, কিশোরের বেডরুমে। গভীর চিন্তায় ডুবে আছে কিশোর।
দীর্ঘ একটা মুহূর্ত কিশোরের দিকে তাকিয়ে থেকে রবিন বলল, ‘সকাল নটা থেকে ছোটাছুটি করেও কিন্তু ক্লান্ত দেখাচ্ছে না তোমাকে!’
‘পোড়া কাঠের টুকরোগুলো কোন গাছের, না জানা পর্যন্ত শান্তি নেই আমার,’ কিশোর বলল।
‘শব্দ করা যাবে না,’ সাবধান করল রবিন। ‘আন্টির ঘুম ভাঙলে উঠে এসে এত রাত পর্যন্ত কোথায় ছিলাম সেটা নিয়ে হইচই শুরু করবেন।’
পরনের শক্ত সোলের জুতো খুলে কাপড়ের নরম জুতো পরে নিল দুজনে, যাতে হাঁটার সময় শব্দ না হয়। পা টিপে টিপে আবার নিচে নেমে এল ওরা। বাইরে বেরিয়ে গ্যারেজের দিকে চলল। ওখানে রয়েছে ওদের ব্যক্তিগত খুদে ল্যাবরেটরি।
গ্যারেজে ঢুকে কিশোর বলল, ‘মাইক্রোটোমটা সেট করো। আমি ফটোমাইক্রোগ্রাফটা রেডি করে ফেলি।’
খাম থেকে ছাই আর কয়লাগুলো একটা পাত্রে ঢালল রবিন। খুদে কয়লার টুকরোগুলো থেকে সবচেয়ে শক্ত একটা টুকরো বেছে নিল। মাইক্রোটোমের ক্লিপে আটকাল ওটা। ক্ষুরের মতো ধারাল ছুরি দিয়ে সেটা থেকে খুব ছোট একটা অংশ কেটে নিল।
জিনিসটা কিশোরকে দিয়ে বলল, ‘মেপে দেখো, কতখানি পুরু।’
মাপল কিশোর। জানাল, ‘এক ইঞ্চির দুই হাজার ভাগের এক ভাগ।
খুব সাবধানে, টুকরোটাকে পাতলা পাতলা করে কাটল রবিন। একটা কাঁচের স্লাইডে রাখল সেগুলো। কিশোর ওগুলোর ফটোমাইক্রোগ্রাফ তৈরি করল। কাঠের আঁশ বোঝা যাচ্ছে এখন ছবিতে।
বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে ছবিগুলো পরীক্ষা করার পর কিশোর বলল, ‘মেহগনি কাঠের সাথে মিল।’ উদ্ভিদের ওপর লেখা মোটা একটা রেফারেন্স বই টেনে নামাল তাক থেকে। পাতা উল্টে মিলিয়ে দেখে বলল, ‘সম্ভবত মধ্য আমেরিকান মেহগনি।’
‘কিন্তু...’
রবিনকে কথা বলতে দিল না কিশোর। ‘ওটিনো নামটা শুনলে কোন দেশি মনে হয়?’
‘স্প্যানিশ।’
‘আর তিরটাও উত্তর আমেরিকান নয়,’ রহস্যময় কণ্ঠে কিশোর বলল। ‘কাল সকালে উঠে আমাদের প্রথম কাজ হবে এটা পরীক্ষার জন্য শিকাগোতে পাঠানো, চাচার বন্ধু মিস্টার হ্যামলিনের কাছে। এ মুহূর্তে প্রাচীন অস্ত্রে বিশেষজ্ঞ আর কারও কথা মনে পড়ছে না।’
‘হ্যাঁ। নিশ্চয় তিনি বলতে পারবেন এটা কোন দেশি অস্ত্র।’
আপাতত আর কিছু করার নেই।
ছাইয়ের প্যাকেট আর ছবিগুলো ছোট একটা আলমারিতে তালা দিয়ে রাখল কিশোর। তারপর ঘরে ফিরে চলল দুজন। পা টিপে টিপে ঢুকল বেডরুমে।
‘রহস্যটা নিয়ে কাল সকাল থেকেই ভালোমতো কাজে লাগতে হবে,’ হাই তুলল কিশোর।
ভুল করে ঘড়িতে ছটার অ্যালার্ম দিয়ে রাখল রবিন। নিভিয়ে দিল ঘরের বাতি। ঘুমিয়ে পড়ল দুজন।
পরদিন সকালে অ্যালার্মের কর্কশ শব্দে ঘুম ভেঙে গেল ওদের।
‘ধ্যাত্তোরি!’ মহা বিরক্ত হলো রবিন। থাবড়া মেরে অ্যালার্ম বন্ধ করল। ‘মাত্র তো শুলাম!’
বিছানায় উঠে বসল কিশোর। ‘ঘড়ির কী দোষ? দিয়ে রেখেছ ছটায়। ঠিক সময়ই তো বেজেছে।’
‘জাহান্নামে যাক ছটা! আমি এখন উঠতে পারব না।’ কোলবালিশটা টেনে নিল আবার রবিন।
দ্বিতীয়বার ঘুম ভাঙল সকাল আটটায়।
‘ডিম ভাজার গন্ধ!’ লাফ দিয়ে বিছানা থেকে নামল রবিন। তাড়াতাড়ি ছুটল বাথরুমের দিকে।
‘এবার কী কেস?’ রান্নাঘরে জিজ্ঞেস করলেন মেরি চাচি। ডিম ভাজা, মাংস ভুনা আর রুটির প্লেট ঠেলে দিলেন দুই গোয়েন্দার দিকে।
মিথ্যে বলে পার পাবে না, তাই সত্যি কথাই বলতে হলো। গতকাল থেকে যা যা ঘটেছে, চাচিকে সব খুলে বলল কিশোর।
খাওয়া প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, এমন সময় বাজল ফোন।
‘এখন আবার কে?’ ভুরু কোঁচকালেন মেরি চাচি।
‘নিশ্চয় রাশেদ আঙ্কেল,’ রবিন বলল।
‘ব্র্যাড আঙ্কেলও হতে পারেন,’ কিশোর বলল।
‘আমি দেখছি,’ পেছনে চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াল রবিন। ফোনটা রয়েছে বারান্দায়, সেখানে চলে এল। রিসিভার তুলে বলল, ‘হ্যালো?’

পাঁচ
‘হ্যালো, রবিন,’ ভেসে এল বিডের উত্তেজিত কণ্ঠ। ‘এইমাত্র ফোন করেছিল ওটিনো।’
‘কী বলল?’ রবিন জিজ্ঞেস করল।
‘তোমাদের দুজনকেও হুমকি দিয়েছে এবার!’
‘আমাদেরও!’ চেঁচিয়ে উঠল রবিন। ‘কিন্তু কেন?’
‘ওটিনো বলছে, তোমরা নাকি ওর কাছে জিনিস বিক্রি করতে আমাকে বাধা দিচ্ছ। বললাম, তোমরা কিছু করনি, আমিই ওর কাছে জিনিসগুলো বিক্রি করতে চাই না। কিন্তু ওটিনো আমার কথা বিশ্বাস করেনি। প্রচণ্ড খেপেছে। হুমকি দিচ্ছে, যা দাবি করছে তা যেন ওর হাতে তুলে দিই। বলে দিয়েছে, তোমরা এর মধ্যে নাক গলালে তোমাদের কপালে খারাবি আছে।’
‘ওটিনো আমাদের কথা জানল কিভাবে?’ জিজ্ঞেস করল রবিন।
‘জানি না,’ জবাব দিল বিড। ‘ওর কথা থেকেই বুঝলাম তোমরা গোয়েন্দা এটাও জানে ও।’
কিশোরকে ওটিনোর হুমকির কথা জানাল রবিন। ওটিনোর ব্যাপারে কী করে আরও তথ্য জানা যায় ভাবছে কিশোর, মেরি চাচি বললেন, ‘দেখ, ভাল চাস তো লোকটার ত্রিসীমানা মাড়াবি না। ওর এভাবে হুমকি দেয়াটা আমার ভাল্লাগছে না। বিপজ্জনক লোক...’
সদর দরজার বেল বাজতে বাধা পেয়ে থেমে গেল চাচির লেকচার। মুচকি হেসে দরজা খুলতে গেল কিশোর। পেছন পেছন গেল রবিন।
দরজা খুলে দিল কিশোর। দরজায় দাঁড়ানো অপরিচিত এক লোক। ছয় ফুটের ওপর লম্বা। চওড়া কাঁধ। লাল চুল। চেহারাই বলে দিচ্ছে সাগরের সঙ্গে দীর্ঘদিনের যোগাযোগ ওর। তার মানে নাবিক। পেশিবহুল ইয়া মোটা বাহুতে অনেকগুলো টাট্টু আঁকা। দুই গোয়েন্দাকে দেখে এক পা এগোল। সন্দেহ হলো কিশোরের— ওটিনোর দলের না তো? রবিন সতর্ক। দরজার দু পাশে দাঁড়িয়ে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে লোকটার দিকে।
‘গুড মর্নিং,’ ইংরেজিতে বিনীত ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল কিশোর, ‘কে আপনি?’
লোকটা জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কি কিশোর?’
‘হ্যাঁ।’
বিমল হাসিতে ঝলমল করে উঠল লোকটার চেহারা। খাটো করে ছাঁটা চুলে আঙুল চালাল। আচমকা ঝটকা দিয়ে একটা রোদেপোড়া থাবা বাড়িয়ে দিল দুই গোয়েন্দার দিকে। ‘আমার নাম অ্যাংলার। গ্রোভ অ্যাংলার,’ লোকটা আন্তরিকতার ভান করলেও কথা বা হাত ঝাঁকানো কোনোটাতেই আন্তরিকতার ছোঁয়া অনুভব করল না দুই গোয়েন্দা। ‘সেই কখন থেকে তোমাদের খুঁজছি।’
লোকটাকে ভেতরে আসতে বলল রবিন।
দরজার ভেতরে পা রাখল অ্যাংলার। ‘হ্যাঁ, বসা দরকার। সেই স্টেশন থেকে হেঁটে এলাম।’
স্টেশনের কথা শুনে অবাক হলো দুই গোয়েন্দা। লোকটার চেহারা দেখে ওরা ভেবেছিল রকি বিচ বন্দরের কোনো জাহাজ থেকে নেমে এসেছে। ট্রেনে এসেছে কল্পনাই করেনি।
‘কখন এলেন? আজ সকালে?’ বসার ঘরে ঢুকতে ঢুকতে জিজ্ঞেস করল রবিন। সোফা দেখিয়ে বসতে বলল।
‘হ্যাঁ, আজ সকালেই এলাম। লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে।’
‘লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে এসেছেন শুধু আমাদের সঙ্গে দেখা করার জন্য?’ রবিন অবাক।
‘হ্যাঁ, অনেকটা তাই,’ জবাব দিল অ্যাংলার। জানাল মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার মাঝে যাতায়াতকারী একটা মালবাহী জাহাজে চাকরি করে ও। শুনে চট করে পরস্পরের দিকে তাকাল দুই গোয়েন্দা। ব্যাপারটা লক্ষ করে হাসল অ্যাংলার। ‘দক্ষিণ আমেরিকাগামী জাহাজে চাকরি করাটা কি অস্বাভাবিক?’
‘না না,’ মাথা নাড়ল রবিন, ‘তা নয়।’
‘হুঁ,’ অ্যাংলার বলল। ‘হ্যাঁ, যা বলছিলাম। লস অ্যাঞ্জেলেসে আমাদের জাহাজ ভেড়ার পর চাকরিটা ছেড়ে দিলাম। বেতনটেতন যা পাওনা ছিল, সব নিয়ে চলে গেলাম আমার এক পুরনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে— তার নাম ডেভিড জনসন।’
‘জনসন!’ প্রতিধ্বনি করল যেন কিশোর। নামটা ভীষণ চমকে দিয়েছে ওকে। তবে মুখের ভাবে সেটা প্রকাশ পেতে দিল না।
‘হ্যাঁ,’ মাথা ঝাঁকাল অ্যাংলার। ‘কিন্তু দুঃখের বিষয়, মারা গেছে ও। দোকানে তালা দেয়া। এত খারাপ লাগল, কী বলব! হতাশও হলাম। কারণ, শুধু দেখা করাটাই যে প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, তা নয়।’ এক মুহূর্ত বিরতি দিয়ে আবার বলল, ‘আমার দুটো মেডেল ছিল ওর কাছে। একটা আধ ডলারের কয়েনের সমান, অন্যটা তার চেয়ে সামান্য বড়।
‘যাই হোক, অন্য এক দোকানদারের কাছে জানলাম, ডেভিডের দোকানের মালপত্র সব রকি বিচে মিস্টার জনসনের ভাতিজা বিড ওয়াকারের নামে ওদের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। মনে হলো, মেডেল দুটোও তাহলে মালপত্রের সঙ্গে ওই বাড়িতেই চলে গেছে। স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমেই আগে বিডদের বাড়িতে গিয়েছিলাম। ওকে পেয়েছি। শুনে বলল, মালপত্রের মধ্যে ও রকম কোনো মেডেল চোখে পড়েনি ওর। জরুরি কাজ আছে, তাই সময় দিতে পারল না ও। ট্রাক নিয়ে বাবার সঙ্গে কোথাও যাবে। মেডেলগুলোর ব্যাপারে তোমাদের সঙ্গে কথা বলতে বলল ও।’
‘মেডেলগুলো কোথায় পেয়েছিলেন, বলতে আপত্তি আছে?’ কিশোর জানতে চাইল।
‘না, আপত্তি থাকবে কেন?’ জবাব দিল অ্যাংলার। ‘এক বন্ধু আমাকে ও দুটো দিয়েছিল। দেয়ার পরপরই খুন হয়েছে ও। কিছুদিন আগে টাকার অভাবে পড়ে মেডেল দুটো ডেভিডের কাছে বন্ধক রেখেছিলাম।’
‘তার মানে ও দুটো আবার ফেরত নিতে চান?’
‘উঁ...হ্যাঁ।’ লোকটার ইতস্তত ভঙ্গি অবাক করল দুই গোয়েন্দাকে। অ্যাংলার বলল, ‘নিশ্চয় অবাক হচ্ছ, সাধারণ দুটো মেডেলের জন্য এত দৌড়াদৌড়ি করছি কেন? অন্য কারও কাছে ওগুলোর কোনো মূল্য না থাকলেও আমার কাছে এর মূল্য অপরিসীম। কারণ ওগুলো ছিল বন্ধুর উপহার, আবেগ কাজ করে এতে।’
‘দেখতে কেমন ছিল মেডেলগুলো?’ জানতে চাইল কিশোর।
অ্যাংলার জানাল, সস্তা ধাতু দিয়ে তৈরি জিনিস। গায়ে আঁকাবাঁকা নকশা কাটা। বড় মেডেলটাতে একটা নকল উপল পাথর বসানো। আরেকটাতে একটা অদ্ভুত শব্দ লেখা, ‘চিকসাপিকো’। ইংরেজি বানান : সি-এইচ-আই-কে-এস-আ-পি-আই-সি-ও।
‘মানে কী এর?’ রবিন জানতে চাইল।
‘জানি না,’ জবাব দিল অ্যাংলার ।
‘হুঁ!’ চিন্তিত ভঙ্গিতে কিশোর বলল, ‘কিন্তু মিস্টার অ্যাংলার ...’
‘আমাকে মিস্টার-টিস্টার বলার দরকার নেই, শুধু গ্রোভ ডাকলেই চলবে।’
‘ও-কে, গ্রোভ, মেডেল দুটো যদি খুঁজে পাইও আমরা, সরাসরি আপনাকে দেয়ার অধিকার আমাদের নেই। প্রথমে দিতে হবে বিডের হাতে, যেহেতু ওর আঙ্কেলের জিনিস ওগুলো। ওর কাছ থেকে আপনি নেবেন।’
‘ঠিক আছে,’ অ্যাংলারের কোনো অমত দেখা গেল না এতে।
উঠে দাঁড়াল ও। দুই গোয়েন্দার সঙ্গে হাত মেলাল। রওনা হলো দরজার দিকে। দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। ফিরে তাকিয়ে বলল, ‘ও, একটা কথা বলতে ভুলে গেছি।’
উত্সুক হয়ে তাকিয়ে আছে দুই গোয়েন্দা।
‘একজন আমাকে বলেছে, মেডেল দুটো নাকি অভিশপ্ত।’
‘অভিশপ্ত!’ প্রায় চিত্কার করে উঠল রবিন।
‘হ্যাঁ। যে-ই ওই জিনিস বিক্রি করবে, অভিশাপ নেমে আসবে তার ওপর। সেজন্যই চাইছি আমার জিনিস আমার কাছেই থাক, শুধু শুধু কেন আমার কারণে নিরীহ কেউ অভিশপ্ত মেডেল বিক্রি করতে গিয়ে প্রাণ হারাবে!’
অ্যাংলারের সঙ্গে বাইরে বেরিয়ে এল দুই গোয়েন্দা। নিজেদের গাড়িতে করে স্টেশনে নিয়ে এসে লস অ্যাঞ্জেলেসের ট্রেনে তুলে দিল ওকে। তারপর বাড়ি ফিরে ব্যাপারটা নিয়ে মেরি চাচির সঙ্গে আলোচনা করল।
‘কিশোর, লোকটার গাঁজাখুরি গপ্প বিশ্বাস করেছ?’ রবিন জিজ্ঞেস করল।
‘অভিশাপের ব্যাপারটা করিনি,’ জবাব দিল কিশোর। ‘তবে বাকিটা বোধহয় সত্যি।’
‘এর সঙ্গে মিউজিয়ামের ঘটনাগুলোর কোনো সম্পর্ক নেই তো? রহস্যময় ওই লোকটা— চুরি করে যে মিউজিয়ামে ঢুকেছিল— ও, আর কফিনের ভেতরে পাওয়া ছাইয়ের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ আছে?’
‘থাকতে পারে,’ ঠোঁট কামড়ে ধরে মাথা দোলাল কিশোর। ‘অভিশাপের গল্পটা নিশ্চয় বিশ্বাস করেছিল ওই লোকটা, হয়তো সেটার রহস্যই ভেদ করতে গিয়েছিল।’
রহস্যগুলোর কথা ভাবতে ভাবতে জগ থেকে গ্লাসে দুধ ঢালছে রবিন, এই সময় শুরু হলো মেরি চাচির লেকচার, অ্যাংলার হঠাত্ ঢুকে পড়ায় যেটাতে বাধা পড়েছিল।
‘ঠিক আছে, ঠিক আছে, বাবা,’ লেকচার থেকে বাঁচার জন্য কিশোর বলল, ‘আর এসবের মধ্যে যাব না আমরা।’
‘খাওয়াটাও তো ঠিকমতো খাস না,’ থামলেন না চাচি। ‘শান্তিতে নাস্তাটা করতে পারলি না, খাওয়ার মাঝখানে উঠে যেতে হলো পুরোপুরি অচেনা একটা লোককে স্টেশনে দিয়ে আসার জন্য।’
‘এ রকম ছোটাছুটিতে খিদে বাড়ে,’ একটা বনরুটি তুলে নিতে হাত বাড়াল রবিন।
‘খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে উঠে খানিকটা হাঁটাহাঁটি করে আসা স্বাস্থ্যের জন্য ভালো...’ হঠাত্ কী মনে পড়তে প্রসঙ্গ বদল করে বলে উঠল কিশোর, ‘মিস্টার জনসনের উকিল ও উইলের সাক্ষী মিস্টার হেনরি উইনারের সঙ্গে একবার কথা বলা দরকার। তিনি হয়তো মেডেলের কথা জানেন।’
‘ঠিক বলেছ,’ একমত হলো রবিন। ‘তবে কাজটা করা উচিত বিডের।’
নাস্তা সেরে বিডকে ফোন করল কিশোর। ওকে লস অ্যাঞ্জেলেসে মিস্টার উইনারের সঙ্গে ফোনে কথা বলতে বলল।
কিছুক্ষণ পর ফোন করে বিড জানাল ওদের, মিস্টার উইনার মেডেল দুটোর কথা জানেন না। যে ব্যাংকের ভল্টে মিস্টার জনসন দামি জিনিস রাখতেন, সেই ব্যাংক ম্যানেজারের সঙ্গেও কথা বলেছেন মিস্টার উইনার। ম্যানেজারও ও রকম কোনো মেডেলের কথা জানাতে পারলেন না। ব্যাংকের রেজিস্টারে রেকর্ড নেই।
গেল কোথায় তাহলে মেডেল দুটো? ভাবতে লাগল দুই গোয়েন্দা। কী করেছেন মিস্টার জনসন? বিক্রি করে দিয়েছিলেন?
এসব নিয়ে আলোচনা করছে দুই গোয়েন্দা, এ সময় ফোন বাজল। মেরি চাচি ধরলেন। তারপর কিশোরকে ডাকলেন, ‘কিশোর, তোর চাচা।’
লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল কিশোর। ‘আমাদের কেসটার কথা চাচা শুনলে চমকে যাবে!’
ফোন ধরল ও। রাশেদ পাশা বললেন, ‘একটা কেস পেয়েছি, বেশ জটিলই মনে হলো, কিন্তু আমার হাতে অন্য জরুরি কাজ থাকায় আপাতত নিতে পারছি না। এখানকার একটা ডিটেকটিভ এজেন্সির সুপারিশে পুয়ের্তো গিনেস নামে এক লোক দেখা করতে এসেছিল আমার হোটেলে। পরিচয় দিয়েছে, গুয়াতেমালান প্যাট্রিয়টিক সোসাইটির প্রধান ও। বলল, সোসাইটির লোকেরা নাকি এমন একটা জায়গার গুপ্তধন খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে, যে জায়গার খবর বাইরের দু-একজনও জানে, যারা লোক ভালো না। ওরা সেই গুপ্তধন চুরির মতলব করেছে। সাধারণত এ ধরনের গুপ্তধনের আসল মালিক হয় যে দেশে সেটা পাওয়া যায় সে দেশের সরকার।’
‘ঠিক আছে, তোমার জরুরি কাজটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি আর রবিনই তদন্ত চালাই,’ উত্সাহী হয়ে বলল কিশোর। ‘গিনেস কোনো সূত্র দিয়েছে তোমাকে?’
‘সে তো বলল ওর কাছে সূত্র বলতে ছিল একজোড়া মেডেল।’
‘মেডেল!’ চেঁচিয়ে উঠল কিশোর। রকি বিচে যা যা ঘটেছে সব কথা চাচাকে জানাল ও। মনোযোগ দিয়ে সব শুনলেন রাশেদ পাশা। বললেন, ‘এক্ষুনি ফোন করছি আবার গিনেসকে। ওর সঙ্গে কথা বলে তোমাদের জানাচ্ছি।’
পুরনো মালের ব্যবসা করতে করতে মাঝে মাঝে হাঁপিয়ে যান রাশেদ পাশা। তাঁর চিরকালের রহস্য ও অ্যাডভেঞ্চারের নেশা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। স্যালভিজ ইয়ার্ডের ভার তখন স্ত্রীর ওপর চাপিয়ে দিয়ে অভিযানে বেরোন। অনেক সময় রকি বিচ থেকে দূরে চলে যান। এবারও সে রকমই একটা অভিযানে বেরিয়েছেন।
ফোনের কাছে তীর্থের কাকের মতো বসে রইল কিশোর ও রবিন। কয়েক মিনিট পরে আবার সরব হলো ফোন। সঙ্গে সঙ্গে থাবা দিয়ে রিসিভার তুলে নিল কিশোর।
‘ব্যাড লাক,’ রাশেদ পাশা বললেন। ‘গিনেস বিল চুকিয়ে চলে গেছে হোটেল ছেড়ে। যোগাযোগের কোনো ঠিকানাও রেখে যায়নি।’
‘লোকটাকে কী করে খুঁজে পাওয়া যায় বলো তো, চাচা?’ কিশোরের প্রশ্ন। ‘হয়তো গ্রোভ অ্যাংলারের সঙ্গে দেখা করতে লস অ্যাঞ্জেলেস চলে গেছে।’
সম্ভাবনাটা একেবারে উড়িয়ে দিতে পারলেন না রাশেদ পাশা। বললেন জরুরি তদন্তের কাজে লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে ওয়াশিংটন যেতে হবে তাকে। কিশোর আর রবিনকে লস অ্যাঞ্জেলেসে গিয়ে কিউরিওগুলোর ব্যাপারে তদন্ত করার পরামর্শ দিলেন। ব্যাংক রেকর্ডগুলো আবার পরীক্ষা করে দেখতে বললেন। মেডেলে আগ্রহী দুজন লোক গিনেস আর অ্যাংলারের মাঝে সম্পর্ক থাকাটাও অসম্ভব নয়। রেকর্ড ঘাঁটতে গিয়ে জরুরি তথ্য বেরিয়ে যেতে পারে, এমনকি ওই দুজনের খোঁজ পাওয়াটাও বিচিত্র নয়।
‘গিনেস দেখতে কেমন?’ জিজ্ঞেস করল কিশোর।
‘বেঁটেখাটো, হাল্কা-পাতলা। গায়ের রঙ বাদামি। উঁচু চিবুক, কালো গোঁফ।’
‘আরে!’ চেঁচিয়ে উঠল কিশোর। ‘সেই ব্লো-গানওয়ালা লোকটার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে, যে আমাদের লক্ষ্য করে ডার্ট ছুড়েছিল!’
কিন্তু রাশেদ পাশা জোর দিয়ে বললেন, গিনেস আর ব্লো-গানধারী একই লোক হওয়া সম্ভব নয়, কারণ রবিনের ওপর যখন হামলা হয়েছে, সে সময় লস অ্যাঞ্জেলেসে বসে গিনেস তার সঙ্গে কথা বলছে।
রাশেদ পাশা ফোন করার পর ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই লস অ্যাঞ্জেলেসে ছুটল কিশোর, রবিন আর বিড। যথাসময়ে লস অ্যাঞ্জেলেস বিমানবন্দরে নামল।
‘কোনখান থেকে তদন্ত শুরু করব?’ রবিনের প্রশ্ন।
‘প্রথমেই মিস্টার উইনারের সঙ্গে দেখা করব,’ জবাব দিল কিশোর। ‘তাঁর অনুমতি নিয়ে ব্যাংকে গিয়ে কিউরিওগুলোর তালিকা নিজেরাই পরীক্ষা করে দেখব। তালিকার দু-একটা জিনিস ব্যাংক ম্যানেজারের চোখ এড়িয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়।’
ফোনে যোগাযোগ করল ওরা। হেনরি উইনার বললেন, তিনি ব্যাংকে ওদের জন্য অপেক্ষা করবেন।
ব্যংকে পৌঁছল ওরা। মিস্টার উইনার উষ্ণ অভ্যর্থনা জানালেন ওদের। তার সঙ্গে একজন লোক রয়েছে। বিডের আঙ্কেলের সম্পত্তি সম্পর্কিত কাজে মিস্টার উইনারকে সাহায্য করছে লোকটা। মিস্টার জনসনের ব্যক্তিগত রেকর্ড দেখার অনুমতি পেয়ে গেল গোয়েন্দারা। ওদেরকে ব্যাংকের ভল্টে নিয়ে এলেন মিস্টার উইনার। দুটো হারানো মেডেলের খোঁজে মিস্টার জনসনের রেখে যাওয়া রেকর্ড বুকের পাতার পর পাতা উল্টে চলল কিশোর ও রবিন। কিছুই পাওয়া গেল না।
কিছুটা হতাশ হয়ে একটা ডায়েরির দিকে নজর দিল রবিন। কয়েকটা পাতা উল্টেই স্থির হয়ে গেল। উত্তেজিত কণ্ঠে চেঁচিয়ে বলল, ‘এই তো পাওয়া গেছে! গ্রোভ অ্যাংলারের কাছ থেকে মেডেল নেয়ার কথা লেখা আছে এতে!’
‘অ্যাংলার তাহলে মিথ্যে বলেনি,’ মাথা দোলাল কিশোর।
‘ডায়েরি পড়ে বোঝা যাচ্ছে,’ রবিন বলল, ‘মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মেডেল দুটো বিডের আঙ্কেলের কাছেই ছিল। জিনিসগুলো বহু পুরনো আর মূল্যবান। মেডেলে খোদাই করা অদ্ভুত নকশা কোনো কিছুর সূত্র হতে পারে।’
মিস্টার উইনারের দিকে তাকাল কিশোর। ‘আঙ্কেল, মিস্টার জনসনের দোকানটা একবার দেখা যায়?’
‘নিশ্চয়ই। আমি সেফ ডিপোজিট থেকে চাবি এনে দিচ্ছি। দোকানটা দেখে এসে চাবিটা ফেরত দিয়ো আমাকে।’
হেনরি উইনার চলে গেলে উত্তেজিত ভঙ্গিতে রবিন বলল, ‘গিনেসের কথা পরে ভাবা যাবে। আগে মেডেলগুলো খুঁজে বের করি। যদি না পাই, কেন ওগুলো গায়েব হলো সে রহস্যটা ভেদ করার চেষ্টা করব।’
আধঘণ্টা পর মিস্টার জনসনের তালা দেয়া দোকানের সামনে হাজির হলো ওরা। বিড দোকানটা চেনে। সে-ই নিয়ে এল দুই গোয়েন্দাকে।
তালা খুলে ভেতরে ঢুকল ওরা। দোকানের পেছন দিক থেকে খোঁজা শুরু করল। বিডকে ছোট অফিস ঘরটার দিকে যেতে দেখে ওর পিছু নিল রবিন।
কিশোর সেদিকে গেল না। একটা শোকেস নজর কেড়েছে ওর। শোকেসের খাড়া হয়ে থাকার ভঙ্গিটা স্বাভাবিক নয়। কিছুটা কাত হয়ে আছে। সতর্ক হয়ে উঠল কিশোরের খুঁতখুঁতে গোয়েন্দা মন। শোকেসটাকে ঘোরাল ও, হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল।
নিচে কাঠের মেঝে। শোকেসটা কাত হয়ে থাকার কারণ বুঝতে পারল। একটা ট্র্যাপ ডোর দেখা যাচ্ছে। গুপ্ত দরজা। ওটার ওপর শোকেসের দুটো পায়া রাখা ছিল বলে কাত হয়ে ছিল ওটা।
‘শিওর, মাটির নিচে গুপ্ত কুঠুরি আছে,’ আনমনে বিড়বিড় করল ও।
দরজাটা খোলার চেষ্টা করতে লাগল। জোরে চাপ লাগতে নিচের দিকে ডেবে গেল তক্তা। দরজাটা ঝুলে পড়ায় মস্ত এক ফোকর তৈরি হলো।
অতিরিক্ত সামনে ঝুঁকে গেল কিশোরের শরীর। টাল সামলাতে না পেরে ডিগবাজি খেয়ে পড়ল নিচের ঘন অন্ধকারে!

ছয়
একটা প্যাকিং বাক্সে মাথা ঠুকে যাওয়ায় বেহুঁশ হয়ে গেল কিশোর। পড়ে রইল কংক্রিটের মেঝেতে।
ওপরের দোকানে তখন লম্বা ঘরটার পেছনে ছোট একটা অফিস ঘরে ঢুকেছে রবিন আর বিড। উঁচু কাঠের দেয়াল দিয়ে মূল ঘর থেকে আলাদা করা এই ঘরটা।
সুইচ টিপে আলো জ্বেলে দিল বিড। ফিরে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কিশোর কোথায়?’
‘ছিল তো আমার পেছনেই...’ অফিস ঘরের দরজা দিয়ে বাইরে তাকাল রবিন। ‘গেল কোথায়?’
‘কিশোর!’ ডাক দিল বিড। ‘কিশোর, কোথায় তুমি?’
শূন্য দোকানে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এল ওর ডাক। সাড়া মিলল না।
ফিরে এসে আবার দোকানে ঢুকল দুজন। কিশোর সেখানেও নেই। দরজার বাইরে এসে রাস্তার দিকে তাকাল। কোথাও দেখল না ওকে।
‘ঘটনাটা কী! মনে হচ্ছে যেন বাতাসে মিলিয়ে গেছে...’ হঠাত্ কী মনে পড়তে থেমে গেল রবিন। তাড়াতাড়ি ফিরে এসে আবার দোকানে ঢুকল। মেঝেতে গর্ত খুঁজতে শুরু করল। ডানযন অর্থাত্ মাটির নিচের ঘরে ঢোকার ট্র্যাপ ডোরের ফোকর।
চৌকোনা কালো ফোকরটা খুঁজে বের করতে সময় লাগল না। ঢাকনাটা ঝুলে আছে নিচের দিকে।
‘বিড, দেখে যাও!’ চিত্কার করে ডাকল ও। ‘একটা ট্র্যাপ ডোর। কিশোর নিশ্চয় নিচে পড়ে গেছে।’ ফোকরের কাছে মুখ নামিয়ে কয়েকবার ডাকল কিশোরকে। সাড়া পেল না।
পকেট থেকে ছোট একটা টর্চলাইট বের করল ও। কাজে লাগতে পারে ভেবে নিয়ে এসেছিল সঙ্গে করে। আলো ফেলল নিচে।
‘ওই তো পড়ে আছে!’ শঙ্কিত কণ্ঠে বলে উঠল ও। ‘বিড, আমি নামছি। কিন্তু নামব কী দিয়ে?’ চারপাশে তাকাল ও। একটা মই চোখে পড়ল। হালকা, কাঠের তৈরি। দেয়ালে ঠেস দিয়ে রাখা হয়েছে। সেটা এনে ট্র্যাপ ডোরের ফোকর দিয়ে খাড়া নামিয়ে দিল ও। মেঝেতে ঠেকল মইয়ের নিচের মাথা।
মই বেয়ে নেমে এল দুজন।
কয়েক ফুট ওপর থেকে পড়েছে কিশোর। হাড়টাড় ভাঙার সম্ভাবনা আছে। সাবধানে পরীক্ষা করে দেখল রবিন। বিডকে বলল, ‘মাথায় বাড়ি খেয়েছে। এ ছাড়া আর কোনো জখম দেখছি না।’
এ সময় নড়ে উঠল কিশোর। গোঙানি দিয়ে, মাথা ঝেড়ে উঠে বসার চেষ্টা করল।
‘আস্তে, আস্তে,’ কিশোরকে ধরে রেখে রবিন বলল। ‘তাড়াহুড়া কোরো না।’
বিড আর রবিনের কাঁধে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াল কিশোর। জড়িত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, ‘কী হয়েছে আমার?’
টর্চের আলো ফেলে ট্র্যাপ ডোরের ফোকরটা দেখাল বিড। কী হয়েছিল জানাল।
টলমল পায়ে মইটার দিকে এগোল কিশোর। ‘মনে হচ্ছে কোনো গোপন স্প্রিঙে চাপ দিয়ে ফেলেছিলাম।’
‘এক সেকেণ্ড,’ বিড বলল। ‘নামলামই যখন, এই বাক্সগুলোতে কী আছে দেখে নিই। বলা যায় না, কিছু পেয়েও যেতে পারি।’
কাছেই একটা ক্ল হ্যামার পড়ে থাকতে দেখল ও। বিশেষ ধরনের এই হাতুড়ির একদিকের মাথা চ্যাপ্টা আর ভেতরের দিকে বাঁকানো, মাঝখানটা চেরা, অনেকটা নখের মতো লাগে দেখতে। পেরেক খোলার জন্য তৈরি হয়েছে এভাবে। এর সাহায্যে একটা কাঠের বাক্সের পেরেক মারা ডালা সহজেই ফাঁক করে ফেলল ও। ভেতরে কী আছে দেখল। কয়েকটা বাক্স খোলার পর থেমে গেল বিড। ‘এই যে, এ জিনিসটা তো লিস্টে নেই।’ চীনা ঘোড়সওয়ারের একটা ছোট মূর্তি আলতো করে তুলে নিল ও। এটাও কিউরিও।
‘মনে হচ্ছে এ বাক্সগুলোর কথা জানেন না হেনরি উইনার,’ রবিন অনুমান করল।
উত্তেজিত হয়ে পড়েছে বিড। ‘হারানো মেডেলের খোঁজ মনে হয় পেয়েই যাব এখানে। বাকিগুলোতেও দেখা দরকার।’
কিন্তু কিশোরের অবস্থা ভালো না দেখে আপাতত কাজ বন্ধ রাখতে বলল রবিন। এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ কোনো হোটেলে একটা রুম বুক করা। কিশোরের বিশ্রাম দরকার। আঘাতের ধাক্কাটা কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে।
‘হুঁ!’ হতাশ মনে হলো বিডকে। ‘কাল আবার আসা যাবে। বাক্সগুলোতে কী আছে না দেখে শান্তি নেই আমার।’
ওপরে উঠে ট্র্যাপ ডোরটা পরীক্ষা করল রবিন। গোপন স্প্রিংটা কিভাবে কাজ করে বোঝার চেষ্টা করল। তারপর দোকান থেকে বেরিয়ে এল ওরা। দরজায় তালা লাগাল বিড।
হোটেল খুঁজে বের করে, রুম বুক করে, রুম থেকে হেনরি উইনারকে ফোন করল ও। ঠিক হলো, পরদিন তিনিও একজন সহকারীকে নিয়ে ওদের সঙ্গে দোকানে যাবেন। তিনি জানালেন, ওই গুপ্ত কুঠুরিটার কথা ব্যাংক জানে না। সেজন্যই ওখানে রাখা জিনিসগুলোর কথা ব্যাংকের লিস্টে নেই।
ইতিমধ্যে কাপড়চোপড় বদলে শুয়ে পড়েছে কিশোর।
রবিন বলল, ‘কিশোর, তুমি ঘুমাও। আমি আর বিড একটু ঘুরে আসি।’
‘কোথায় যাবে?’
‘গিনেসকে খুঁজতে।’
কাজটা খড়ের গাদায় সুচ খোঁজার চেয়েও কঠিন। নিচে নেমে হোটেলের ইনফরমেশন ডেস্কে এসে লস অ্যাঞ্জেলেস শহরের এমন কিছু হোটেলের খোঁজখবর নিল রবিন, যেগুলোতে গিনেসের মতো একজন লোক রুম ভাড়া নিতে পারে। হোটেলগুলোর নাম লিখে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল বিডসহ। কয়েক ঘণ্টা চেষ্টার পর গলদঘর্ম হয়ে হোটেলে ফিরে এল দুজন।
কিশোর জানাল, ও অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠেছে। ভালো বোধ করছে। বলল, ‘তোমাদের খবর বলো। কী করে এলে?’
‘প্রচুর ঘোরাঘুরি,’ জবাব দিল রবিন। ‘গিনেস সম্ভবত শহরে নেই। কিংবা থাকলেও এমন কোথাও লুকিয়ে আছে, খুঁজে বের করা মুশকিল।’
পরদিন সকালে পেট ভরে নাস্তা খেয়ে আবার বেরোল তিনজন। সোজা চলে এল মিস্টার জনসনের দোকানে। একটু পরে একজন সহকারী নিয়ে হাজির হলেন হেনরি উইনার। তার সহকারীর নাম হ্যারিস। দলবেঁধে গুপ্ত কুঠুরিতে ঢুকল সবাই। বাক্সের পর বাক্স খুলতে লাগল। বেরোতে থাকল নানান আকৃতির খুলি, জন্তু-জানোয়ারের দাঁত, মিশরীয় খেলনা নৌযান এবং আরও নানা ধরনের বিচিত্র পোশাক-আশাক।
‘দুনিয়ার যত অদ্ভুত আর বিচিত্র জিনিসের গুদাম বানিয়েছিলেন এখানে মিস্টার জনসন,’ হেনরি উইনার বললেন।
‘সেজন্যই ভাবছি, মেডেলগুলো এখানেই কোথাও নেই তো?’ চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল বিড। ‘আঙ্কেলের নোট পড়েই বোঝা গেছে সাধারণ জিনিসের তালিকায় ও দুটোকে ফেলেনি আঙ্কেল।’
দুপুর নাগাদ সমস্ত জিনিসপত্রের তালিকা করার কাজ শেষ হয়ে গেল। কিন্তু রহস্যময় সেই আজব মেডেলের চিহ্নও দেখা গেল না কোথাও।
‘মনে হচ্ছে নিরাশই হতে হলো তোমাদের,’ মিস্টার উইনার বললেন। ‘এখানে আর পাওয়া যাবে না ওগুলো।’ লম্বা তালিকার নিচের দিকে শেষ নামগুলোও লিখে নিয়ে বিডের দিকে তাকালেন। ‘বিড, খোঁজাখুঁজিতে অনেক লাভ হলো। এমন আরও কোনো লুকানো জায়গা আছে কি না তোমার আঙ্কেলের কে জানে। মেডেলগুলো তো পাওয়া গেল না, সেজন্যই বলছি।’
কাগজপত্র গুছিয়ে নিয়ে মইয়ের দিকে পা বাড়ালেন তিনি। তাকে অনুসরণ করল বাকি সবাই। এক এক করে ওপরে উঠতে লাগল। সবার শেষে পা বাড়াল কিশোর। পা রাখল মইয়ের শেষ ধাপে। উঠতে ইচ্ছে করছে না ওর। যেতে মন চাইছে না। ওর কেবলই মনে হচ্ছে, আরো কোনো গোপন জায়গা থাকতে পারে এখানে। টর্চের আলো ফেলে শেষবারের মতো দেখতে শুরু করল ঘরটা। কঠিন দেয়ালে ধীরে ধীরে সরাতে থাকল আলোকরশ্মি।
হঠাত্ চোখে পড়ল ওটা। মেঝে থেকে আট ফুট ওপরে হালকা আয়তাকার একটা সরু দাগ। মাটিতে রাখা বাক্স ডিঙিয়ে প্রায় লাফাতে লাফাতে এগিয়ে গেল সেদিকে। দেয়ালের কাছে পৌঁছে আঙুলের গাঁট দিয়ে টোকা দিতেই ফাঁপা শব্দ হলো।
‘মনে হচ্ছে কোনো দরজার আড়কাঠ,’ চিন্তিত ভঙ্গিতে আনমনে বিড়বিড় করল কিশোর। ‘দরজাটা সিল করে দেয়া হয়েছে। কেন?’
আঙুলের নখ ঢুকিয়ে দিয়ে পাতলা দরজাটা টেনে খোলার চেষ্টা করল ও। ‘নাহ্, নখ ভাঙবে। একটা ছেনি হলে ভালো হতো।
উত্তেজনায় দুরুদুরু করছে বুকের ভেতর। ছেনি কোথায় পাবে? মই বেয়ে ওপরে উঠে এল ও। সবাইকে জানাল ওর সাংঘাতিক আবিষ্কারের খবরটা। ‘মনে হয় কোনো গুপ্ত প্রবেশপথের মুখ ওটা!’
ছেনি খুঁজতে শুরু করল। অফিসের ডেস্কের সবচেয়ে নিচের ড্রয়ারে মরচে পড়া কতগুলো যন্ত্রপাতির মধ্যে পাওয়া গেল একটা ছেনি। সবাইকে নিয়ে আবার মাটির নিচের ঘরে চলে এল ও।
‘আশ্চর্য!’ কিশোরের আবিষ্কার করা দেয়ালের আয়তাকার দাগটার দিকে তাকিয়ে আছেন মিস্টার উইনার। ‘কিভাবে মিস করলাম তখন? দেখলাম না কেন?’ কিশোরের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। ‘এখন বুঝলাম, গোয়েন্দা হওয়ার জন্য আলাদা ট্যালেন্ট দরকার।’
একটা প্যাকিং বাক্সের ওপর উঠে দাঁড়াল কিশোর। ছেনির ধারালো মাথাটা দাগের ওপর চেপে ধরে আঁচড় কাটতে শুরু করল। নিচ থেকে টর্চ ধরে রাখল রবিন। প্রথমবারের চেষ্টা বিফল হলো ওর। তারপর ডান পাশের খাড়া রেখাটার ওপর ছেনির চাপ দিতেই পুরো আয়তাকার অংশটাই নড়ে উঠল।
‘সরছে!’ চিত্কার করে জানাল ও। আবার একই জায়গায় ছেনি দিয়ে চাপ দিল। আরও জোরে। ঢুকে গেল ছেনির মাথাটা। চাড় দিতেই বেরিয়ে আসতে লাগল দেয়ালের একটা অংশ। আঙুল ঢোকানোর মতো ফাঁক হয়ে যেতেই কাঠের তৈরি টুকরোটা টেনে বের করে নিয়ে এল কিশোর।
টাল সামলাতে না পেরে পড়ে যাচ্ছিল প্যাকিং বাক্স থেকে। ধরে ফেলল বিড। চৌকোনা ফোকরটার দিক থেকে চোখ সরাল না কিশোর।
‘কী ওটা?’ জানতে চাইল রবিন। ‘কী আছে ভেতরে?’
মস্ত ফোকরটায় হাত ঢুকিয়ে দিল কিশোর। ধীরে ধীরে টেনে বের করে নিয়ে এল এমন একটা জিনিস, যা থাকবে কল্পনাও করেনি ওরা কেউ! জিনিসটা বেশ ভারি।
ফোকর থেকে একটা মানুষের কঙ্কাল টেনে বের করেছে কিশোর। ধবধবে সাদা। এত সাদা কঙ্কাল সাধারণত দেখা যায় না। স্তব্ধ করে দিল ওদের। নীরবে তাকিয়ে রইল সবাই কঙ্কালটার দিকে।
সবার আগে সামলে নিল রবিন, রসিকতা করে বিডকে বলল, ‘তোমার আঙ্কেলের জিনিস, তুমিই এটার মালিক। নিয়ে যাও। বেডরুমে রেখে দিয়ো। রাতের বেলা সঙ্গ দেবে তোমাকে।’
পুরো কঙ্কালটা বের করে এনে আস্তে করে বিডের হাতে দিল কিশোর। বিড ওটাকে নামিয়ে রাখল একটা প্যাকিং বাক্সের ওপর। বলল, ‘কঙ্কালের ব্যাপারে খুব কুসংস্কার ছিল আঙ্কেলের।’ তারপর নিজেকেই যেন প্রশ্ন করল, ‘সেজন্যই কি লুকিয়ে রেখেছিল? নাকি আমাদের হাতে পড়ুক সেটা চায়নি? যাকগে, এটা এমন কোনো জরুরি বিষয় নয়। কঙ্কাল-ফঙ্কাল নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। দরকারও নেই। যে খুঁজে বের করেছে, এটা তাকেই দিয়ে দেয়া উচিত।’
‘ব্যাংকে নেয়ারও প্রয়োজন নেই,’ মিস্টার উইনার বললেন। ‘কেউই যখন নিতে রাজি হচ্ছে না, এক কাজ করা যেতে পারে, কোনো মেডিকেল কলেজকে দান করে দেয়া যাক।’
বিড বা অন্য কারও তাতে আপত্তি নেই। কঙ্কালটা নিয়ে ওপরতলায় উঠে এল ওরা। অফিসে টেলিফোন আছে। লাইন কাটা হয়নি এখনও। ডিরেক্টরি থেকে একটা মেডিকেল কলেজের নম্বর বের করে নিয়ে হেনরি উইনারই যোগাযোগ করলেন ওদের সঙ্গে। খুশি হয়েই নিতে রাজি হয়ে গেলেন কলেজ কর্তৃপক্ষ।
বিডকে বললেন মিস্টার উইনার, ‘বিড, আমরা যাই। মেডেলগুলো খুঁজতে চাইলে থাকো এখানে। পরে দোকানের চাবিটা আমাকে দিয়ে দিলেই হবে। আমার জরুরি কাজ আছে। আমি হ্যারিসকে নিয়ে চলে যাচ্ছি।’
মিস্টার উইনার ও হ্যারিস চলে গেলে কিশোর ও রবিনের দিকে তাকিয়ে ভুরু নাচাল বিড। বলল, ‘কঙ্কাল সাহেবকে তার পরবর্তী বাসস্থানে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্বটা কার? এই অতি আনন্দের কাজটা আমি নির্দ্বিধায় অন্য যে কারও ওপর ছেড়ে দিতে রাজি আছি। সাহেবের সঙ্গে আমার বনাবনি হবে বলে মনে হয় না।’
‘অত ঘোরপ্যাঁচের দরকার কী।’ হেসে বলল রবিন। ‘নিতে যে ভয় পাচ্ছ, সে কথাটা খোলাখুলি বললেই হয়।’ কিশোরের দিকে তাকাল ও। ‘আমরাই কোলে করে নিয়ে যেতে পারব, কি বলো, কিশোর? গাড়িতে আমাদের কোলের ওপর শুয়ে থাকবে।’
কিশোরের কোনো আপত্তি নেই তাতে। হাসল। ‘কঙ্কাল সাহেবকে বের করে এনেও তো ভুল করলাম দেখি। যাকগে, যা করেছি করেছি। বের যখন করেই ফেলেছি, বয়ে নেয়ার দায়িত্বও আমাদেরই হওয়া উচিত। বিড, তোমার ভয় নেই। আমরাই নেব।’
বহু কসরত করে মই বেয়ে গুপ্ত কুঠুরি থেকে বের করে আনা হলো কঙ্কালটাকে। দোকান থেকে বেরিয়ে এল তিনজন। দরজায় তালা লাগাল বিড। ট্যাক্সি ডাকতে গেল রবিন।
ড্রাইভার অবাক চোখে কঙ্কালটার দিকে তাকাল। কঙ্কাল দেখে ভয় পাচ্ছে, বোঝা গেল। তবে কিছু বলল না। সামনের সিটে ওর পাশে বসল বিড। পেছনের সিটে কঙ্কাল কোলে নিয়ে কিশোর ও রবিন।
গাড়ির দরজা বন্ধ করল ড্রাইভার। স্টার্ট দিতে যাবে, এই সময় পাশে এসে থামল একজন পুলিশ অফিসারের মোটর সাইকেল। বাঁশি বাজিয়ে ওদের থামার নির্দেশ দিলেন তিনি।

সাত
‘কী অপরাধ করলাম?’ কিশোরের দিকে তাকাল রবিন। ‘পুলিশ কী চায়?’
জবাবটা পাওয়া গেল। মুখ নিচুু করে ওদের পাশের জানালা দিয়ে উঁকি দিলেন অফিসার। কঠোর দৃষ্টিতে কঙ্কালটা দেখলেন। মুখচোখ থমথমে করে তাকালেন কিশোর-রবিনের দিকে। ভুরু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এটা কোথায় পেলে?’
‘একটা দোকানের গুপ্ত কুঠরিতে পেয়েছি,’ সামনের সিট থেকে জবাব দিল বিড। কেমন বোকা বোকা লাগছে ওকে। কাগজপত্র ছাড়া কঙ্কাল বহন করা বেআইনি কিনা জানা নেই ওর।
‘তার মানে কোন দোকান থেকে চুরি করেছ?’ আরও কঠোর হয়ে গেল অফিসারের চেহারা। ড্রাইভারের দিকে তাকালেন, ‘অ্যাই, কোনখান থেকে তুলেছ ওদের?’
‘এই তো, এখান থেকেই,’ মিস্টার জনসনের তালা দেয়া দোকানটা দেখাল ও।
‘ওটা তো মিস্টার জনসনের দোকান। কয়েক দিন আগে মারা গেছেন।’ এক এক করে তিন কিশোরের মুখের দিকে তাকালেন অফিসার। ‘ঘটনাটা কী। ওখানে ঢুকলে কিভাবে?’
হঠাত্ মনে পড়ল বিডের, মিস্টার উইনারের পাঠানো একটা চিঠি আছে পকেটে। মানিব্যাগ থেকে চিঠিটা বের করে অফিসারের দিকে বাড়িয়ে ধরল, ‘এই যে, এটা পড়ে দেখুন। তাহলেই সব বুঝতে পারবেন।’
চিঠিটা পড়লেন অফিসার। কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকালেন বিডের দিকে। ‘তার মানে তুমিই বিড? মিস্টার জনসনের ভাতিজা? এ জন্যই তো বলি, চেহারায় মিল কেন। আর চোখ দুটোই বা ও রকম চঞ্চল, অস্থির কেন। চাচার সঙ্গে প্রচুর মিল।’
এতক্ষণে চেহারার মেঘ কাটল অফিসারের। হাসি ফুটল মুখে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল ছেলেরা।
‘কঙ্কালটাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ?’ জিজ্ঞেস করলেন অফিসার।
‘রিভার ড্রাইভ মেডিকেল কলেজে,’ কিশোর বলল।
‘রিভার ড্রাইভ? সে তো অনেক দূর। পথে আবার কে ঠেকাবে, কী ঝামেলায় ফেলবে তোমাদের কে জানে। চলো, এগিয়ে দিয়ে আসি।’
ইস্ট রিভার ড্রাইভে পৌঁছে কলেজের সামনে এসে গাড়ি থামাতে বলল বিড। সাহায্য করার জন্য বারবার ধন্যবাদ দিল অফিসারকে। অফিসার ওদেরকে সাবধানে থাকতে বলে চলে গেলেন।
গেটের ভেতরে গাড়ি ঢোকাল ড্রাইভার। তিনতলা একটা বড় বাড়ির সামনের চত্বরে এনে রাখল। কঙ্কালটা নিয়ে নেমে পড়ল দুই গোয়েন্দা। ট্যাক্সিভাড়া মিটিয়ে দিল বিড। চলে গেল ট্যাক্সিটা।
কঙ্কালটাকে নিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকল ওরা। হলঘরের রিসিপশনে ওদের থামালেন ডেস্ক ক্লার্কের টেবিলের পাশে বসা একজন নার্স। হাসিখুশি, আন্তরিক মহিলা। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। ওদের দেখে উঠে এলেন চেয়ার থেকে। বললেন, ‘এসেছ। তোমাদের অপেক্ষাতেই ছিলাম। কঙ্কাল নিয়ে আসবে বলা হয়েছে আমাকে। তোমরা এলে জায়গামতো পৌঁছে দেয়ার নির্দেশ আছে। এসো আমার সঙ্গে।’
নার্সের সঙ্গে বড় আরেকটা ঘরে এসে ঢুকল ওরা। এটা গবেষণাগার। সাদা লম্বা কোট পরা একজন তরুণ ডাক্তার হাসিমুখে স্বাগত জানালেন ওদের। কঙ্কালটা রেখে রশিদ লিখে দিলেন। ভারমুক্ত হয়ে খুশিমনে বেরিয়ে এল তিন কিশোর।
হাসপাতালের বারান্দা থেকে সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে বিড জিজ্ঞেস করল, ‘এবার কী? রকি বিচে ফিরে যাব? আর দেরি করলে প্লেন মিস করব কিন্তু। টিকেট নষ্ট হবে।’
‘তা ঠিক,’ একমত হলো কিশোর। ‘গিনেসকেও আর খুঁজে পাবার আশা নেই লস অ্যাঞ্জেলেসে। অকারণে সময় নষ্ট করে লাভ নেই।’
‘যাওয়ার আগে চাবিটা অবশ্যই দিয়ে যেতে হবে মিস্টার উইনারের কাছে,’ বিড বলল।
চাবি ফিরিয়ে দিতে গেলে মিস্টার উইনার বললেন, দোকানে পাওয়া জিনিসগুলো থেকে বিড এখন ইচ্ছে করলে যেটা খুশি নিয়ে যেতে পারে। হোটেলে ফিরে লাঞ্চ সেরে ওদের ব্যাগগুলো নিয়ে ফিরে এল ওরা। ছোটখাটো কিছু অ্যানটিক ব্যাগে ভরে নিল।
‘জলদি করা দরকার!’ বিড বলল। ‘প্লেন ছাড়তে আর মাত্র এক ঘণ্টা বাকি।’
একটা ট্যাক্সি ডেকে এয়ারপোর্টে রওনা হলো ওরা। ইস্ট রিভারের ব্যস্ত চৌরাস্তা পেরোনোর সময় লাল ট্রাফিক বাতি জ্বলে উঠল। থেমে গেল ট্যাক্সি। হঠাত্ রবিনের হাত খামচে ধরল কিশোর। ‘ওই দেখো, রবিন, কে যায়! ডান দিকের ফুটপাতে!’
রবিন দেখল। গ্রোভ অ্যাংলার। সঙ্গে আরেকজন লোক। লোকটার মুখকে আড়াল করে রেখেছে অ্যাংলারের চওড়া কাঁধ। কিন্তু ওরা সামান্য সরতেই পলকের জন্য ওই লোকটার চেহারাও দেখতে পেল রবিন। কালো চুল, কালো গোঁফ।
‘আরে সেই ব্লোগানওয়ালা না! গিনেস?’ কিশোরও দেখে ফেলেছে লোকটাকে। ‘এখানেই নামা দরকার। জলদি!’
‘প্লেন মিস করব তো!’ বিড বলল।
‘প্লেন মিস করলে পরেরটা ধরতে পারব,’ জবাব দিল রবিন। ‘কিন্তু ওদের মিস করা চলবে না।’
ঠিক ওই মুহূর্তে সবুজ বাতি জ্বলে উঠল। পাগলের মত হর্ন দিতে শুরু করল পেছনের গাড়িগুলো। একটা মুহূর্ত সময় দিতে রাজি নয় কেউ সামনের ড্রাইভারকে। চলতে শুরু করল কিশোরদের ট্যাক্সি।
‘এই যে ভাই, রাখুন তো একটু!’ জরুরি কণ্ঠে ড্রাইভারকে বলল কিশোর।
গাড়ি সাইড করে রাখতে বেশ কয়েক সেকেণ্ড সময় নষ্ট হলো। ধাক্কা দিয়ে ততক্ষণে দরজা খুলে ফেলেছে কিশোর। চলন্ত গাড়ি থেকেই লাফিয়ে পড়ল। রবিন নামল। বিডকে বলল কিশোর, ‘তুমি গাড়িতে বসো। আমরা আসছি। এসো, রবিন।’
রাস্তার বাঁ পাশে গাড়ি থেমেছে। লোকগুলো হাঁটছে ডান দিক ধরে। ওদের কাছে যেতে হলে আইল্যাণ্ড, তারপর ডান পাশের রাস্তা পেরিয়ে গিয়ে ফুটপাতে উঠতে হবে। স্রোতের মতো গাড়ি ছুটছে দুই পাশে। ওগুলোকে কাটিয়ে যাওয়া মোটেও সহজ নয়। বারবার গাড়ির নিচে পড়ার ঝুঁকি নিয়ে, ড্রাইভারদের গালাগাল শুনে অবশেষে ফুটপাতে যখন উঠল ওরা, মোড়ের ওপাশে অদৃশ্য হয়ে গেছে লোক দুজন।
হাল ছাড়ল না দুই গোয়েন্দা। ফুটপাতের ভিড় ঠেলে পথ করে ছুটল ওরা। অবাক হয়ে পথ ছেড়ে দিল পথচারীদের কেউ, কেউ বা চোখ গরম করে তাকাল।
মোড়ের অন্যপাশে আসতে চোখে পড়ল আবার লোক দুজনকে। লাল চুলো নাবিক স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাঁটছে। কিন্তু অন্য লোকটা চঞ্চল। বারবার এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে, যেন কারও চোখে পড়ার ভয়।
কিশোর ভাবছে, কিসের ভয় পাচ্ছে ওরা? কারও পিছু নেয়ার নাকি?
হঠাত্ পেছনে ফিরে তাকাল গ্রোভ অ্যাংলার। দুই গোয়েন্দাকে দেখে চিনে ফেলল। ‘আরে! কিশোর-রবিন, তোমরা!’
তার কথা কানে গেল কালো গোঁফওয়ালা লোকটার। সে-ও ফিরে তাকাল। একটা মুহূর্ত দেরি না করে লাফিয়ে উঠে দিল দৌড়। কিশোর রয়ে গেল নাবিকের সঙ্গে কথা বলার জন্য, রবিন ছুটল অন্য লোকটার পেছনে।
কিন্তু বেশ খানিকটা এগিয়ে রয়েছে কালো গোঁফওয়ালা লোকটা। তাছাড়া লোকের ভিড়। এর মধ্যে দৌড়ানো কঠিন। এগোতে পারছে না রবিন। চট করে পাশের একটা গলিতে ঢুকে পড়ল লোকটা। একটু পরেই রবিন ঢুকল। কিন্তু লোকটাকে দেখতে পেল না আর। খানিকক্ষণ খোঁজাখুঁজি করে হতাশ হয়ে ফিরে এল কিশোর যেখানে অ্যাংলারের সঙ্গে কথা বলছে।
‘লস অ্যাঞ্জেলেসে কী করছ তোমরা?’ কিশোরকে তখন জিজ্ঞেস করছে অ্যাংলার। রবিন কোথায়, এ নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই যেন ওর।
‘একটা কাজে এসেছিলাম,’ জবাব দিল কিশোর। ‘এখন এয়ারপোর্টে যাচ্ছি। আপনাকে দেখে থামলাম। মেডেল দুটোর কোনো খবর আছে? আমরা তো অনেক খোঁজাখুঁজি করেও পেলাম না।’
মাথা নাড়াল অ্যাংলার। ‘না। পাইনি।’
অন্য লোকটার কথা জিজ্ঞেস করল না ওকে কিশোর। সে আদৌ অ্যাংলারের সঙ্গী ছিল, নাকি ওকে অনুসরণ করছিল, নিশ্চিত নয় ওরা।
সেটা জিজ্ঞেস করার সুুযোগও ওদের দিল না অ্যাংলার। বলল, ‘আবার সাগরে ভেসে পড়তে পারলে বাঁচি। লস অ্যাঞ্জেলেসে থাকতে ভালো লাগছে না। একা একা থাকি, এমন কেউ নেই যার সঙ্গে কথা বলতে পারি।’ কিশোরের দিকে তাকাল ও। ‘মেডেলগুলোর অভিশাপের কথা ভুলো না কিন্তু। ভয়ানক দুশ্চিন্তা আমার ঘুম-নিদ্রা হারাম করে দিয়েছে। আমি কী ভাবছি জানো? মিস্টার জনসনের অকাল মৃত্যুর জন্যও ওই মেডেল দুটোই দায়ী।’
‘অবাক কথাই শোনালেন,’ কিশোর বলল। ‘বাদ দিন ওই অভিশাপের কথা। দুশ্চিন্তা ছাড়ুন।’
‘চেষ্টা তো করছি।’
মেডেলগুলো যেভাবেই হোক খুঁজে বের করবে, কথা দিল কিশোর। রবিন আর না বলে থাকতে পারল না, ‘দেরি করিয়ে দিলাম। আপনার বন্ধু নিশ্চয় অপেক্ষা করছে।’
‘বন্ধু?’ অবাক মনে হলো অ্যাংলারকে।
চট করে কিশোরের দিকে তাকাল রবিন। গোঁফওয়ালা লোকটা ওর সঙ্গী, এ কথা অস্বীকার করতে চাইছে নাকি অ্যাংলার? নাকি সত্যিই অ্যাংলারের অজান্তে ওর কাছাকাছি থেকে ওকে অনুসরণ করে চলেছিল অন্য লোকটা? অ্যাংলারের অবাক হওয়া দেখে দ্বিতীয় ধারণাটাই ঠিক বলে মনে হতে লাগল ওদের। নাবিকের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গাড়িতে ফিরে এল ওরা।
গাড়িতে উঠে বিডকে বলল কিশোর, ‘নাহ্, কোনো লাভ হলো না। কিছুই জানতে পারলাম না।’
অ্যাংলারের সঙ্গে যা যা কথা হয়েছে, বিডকে জানানো হলো।
এয়ারপোর্টে পৌঁছতে আর দু-তিন মিনিট দেরি করলেই রকি বিচের প্লেনটা মিস করত ওরা।

আট
পরদিন সকাল সাড়ে সাতটা। দরজায় ঘন ঘন থাবা পড়ার শব্দে অবাক হলো দুই গোয়েন্দা। জানালার কাছে গিয়ে হাঁক দিল রবিন, ‘কে?’
জানালার কাছে দৌড়ে এল মুসা। ‘জলদি বেরোও!’
মুসার মুখ দেখেই বুঝে গেল রবিন, কিছু একটা ঘটেছে। তাড়াতাড়ি দরজা খুলে বাইরে বেরোল সে ও কিশোর।
‘ওই দেখ!’ হাত তুলে রবিনকে দেখাল উত্তেজিত মুসা।
কী দেখে এত উত্তেজিত হয়েছে ও, দেখার জন্য ফিরে তাকাল দুই গোয়েন্দা। থমকে গেল ওরাও। সদর দরজার পাশে বারান্দার রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে ছয় ইঞ্চি উঁচু ছাইয়ের স্ত ূপ।
রহস্যময় শত্রুর এই সর্বশেষ হুমকিতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে মুসা। চিত্কার করে বলল, ‘সেই লোকটার কাজ! আমি ঠিক জানি, সেই লোকটা। মিউজিয়ামে যে লোকটা আগুন লাগিয়েছিল! এখন...এখন বাড়িতে এসে এই স্ত ূপ বানিয়ে রেখে তোমাদের দুজনকে হুমকি দিয়ে গেল!’
‘এর আগেও হুমকি দেওয়া হয়েছে আমাদের,’ কিশোর বলল। ফোনে বিডকে যা যা বলেছিল ওটিনো, সব মুসাকে জানাল কিশোর। ‘এখন আমি শিওর হতে আরম্ভ করেছি, ওটিনোই আমাদের মিউজিয়ামের সেই রহস্যময় লোক।’
‘কিন্তু এভাবে ছাই রেখে গিয়ে কী বোঝাতে চাইছে ও?’ মুসার প্রশ্ন। ‘নাকি জাদুটোনা কিছু করছে? মেডেলের অভিশাপ ছড়াচ্ছে তোমাদের ওপর?’
‘হতে পারে,’ হেসে জবাব দিল কিশোর। ‘তবে লাভ হবে না। দেখা যাবে ওর জাদুটোনা ওর কাছেই ফিরে গেছে, বুমেরাং হয়ে...কিন্তু আমি ভাবছি বাড়িতে ঢুকল কিভাবে লোকটা?’
রবিন বলল, ‘পেছনের দেয়ালের ওপর যে গাছের ডালটা এসে পড়েছে, নিশ্চয় ওটা বেয়ে ঢুকেছে।’
‘হুঁ!’ চিন্তিত ভঙ্গিতে কিশোর বলল। ‘ডালটা কেটে ফেলতে হবে।’
রবিন আর মুসাকে দাঁড়াতে বলে ঘরে চলে গেল কিশোর। ফিরে এল ছোট একটা বাক্স হাতে। এক টুকরো কাগজ দিয়ে ছাইগুলো তুলে নিয়ে বাক্সে ভরতে লাগল। ‘আমাদের ল্যাবরেটরিতে নিয়ে গিয়ে পরীক্ষা করে দেখব, কী পাওয়া যায়।’
মুসার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল রবিন। ‘আমরা কিন্তু এখনও নাস্তা করিনি। আন্টিকে দেখে এলাম কেক বানাচ্ছেন।’
হাসি ছড়িয়ে পড়ল মুসার মুখে। পলকে দূর হয়ে গেল চেহারা থেকে আতঙ্ক। নাক উঁচু করে বাতাসে গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে বলল, ‘তাই তো বলি, সুগন্ধ আসে কোত্থেকে! চলো চলো, পেটের মধ্যে সব খালি হয়ে গেছে আমার।’
নাস্তার টেবিলে মুসা আর রবিনকে বসিয়ে দিয়ে কিশোর বলল, ‘ছাইগুলো কিসের না দেখে খেতেও পারব না আমি। তোমরা খেতে থাকো, আমি চট করে পরীক্ষাটা সেরে আসি।’
বিশাল সাইজের ছয় নম্বর কেকের টুকরোটা যখন সাবাড় করে সাত নম্বরটার দিকে হাত বাড়িয়েছে মুসা, এই সময় উত্তেজিত চেহারা নিয়ে ফিরে এল কিশোর।
বাড়ানো হাতটা মাঝপথে থেমে গেল মুসার। কিশোরকে জিজ্ঞেস করল, ‘কিসের ছাই?’
‘হাড়ের। হাড় পোড়ানো ছাই।’
ঝট করে কেকের ওপর থেকে হাতটা সরে চলে এল মুসার। চোখেমুখে আতঙ্ক দেখা দিল আবার। ‘বলো কী!’
‘ঠিকই বলছি,’ দৃঢ়কণ্ঠে জানাল কিশোর।
‘নিশ্চয় কোনো উন্মাদ খুনি কাউকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মেরেছে!’ গলা কাঁপছে মুসার।
‘আরে দূর! অকারণ ভয় পাচ্ছ,’ হাসল কিশোর। ‘মানুষের হাড় না, মুরগির হাড় পুড়িয়েছে।’
হঠাত্ করেই ঢিল হয়ে গেল মুসার মুখের পেশি। মুচকি হাসল। ‘তাই বলো।’ আরেক টুকরো কেক তুলে নিল ও।
মুচকি হেসে রবিন বলল, ‘খাও, বেশি করে খাও। খাবার খুব দ্রুত মানুষের ভয়ডর ভুলিয়ে দেয়।’
‘ঠিক,’ উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে সমর্থন করল মুসা। ‘এতক্ষণে একটা কথার মতো কথা বললে। তা বললেই যখন আরেকটা টুকরো খাই।’ দুটো টুকরো তুলে নিল ও।
খাওয়া শেষ করে মুসা চলে গেল ট্র্যাক্টরের যন্ত্রাংশ কিনতে। রবিন গেল বিডকে ফোন করতে। ছাই রেখে গিয়ে ওদেরকে হুমকি দেওয়ার কথাটা জানাবে। ওটিনোর আর কোনো খবর আছে কিনা তা-ও জিজ্ঞেস করবে।
‘নাহ্, আর কোনো খবর নেই,’ বিড জানাল। ‘তোমার কি ধারণা ওটিনোই ছাই রেখে গিয়ে তোমাদের ভয় দেখানোর চেষ্টা করছে?’
‘মনে হচ্ছে।’
পাশ থেকে কিশোর বলে উঠল, ‘ওই ব্যাটাই যদি রেখে গিয়ে থাকে, তাহলে ধরে নিতে হবে ও এখনও রকি বিচেই আছে।’
কথাটা শুনে ফেলল বিড। জবাব দিল, ‘ঠিক। খুঁজতে যাবে নাকি, রবিন? আমাকে সঙ্গে নিয়ো।’
সারাটা দিন ওটিনোকে খুঁজে বেড়াল ওরা। থানায় গিয়ে প্রথমে পরিচিত ডিউটি অফিসারের সহায়তায় রেকর্ডপত্র খুঁজল। ওটিনোর বিরুদ্ধে কিছু পাওয়া গেল না। তারপর খুঁজে বেড়াল হোটেল, মোটেল, বোর্ডিং হাউসগুলোতে। কিন্তু কোথাও ওর খোঁজ পাওয়া গেল না।
‘একটা জায়গাতেই কেবল খোঁজা বাদ রেখেছি আমরা,’ কিশোর বলল। ‘শহরের কিনারে যে নতুন বাড়িঘরগুলো উঠেছে ওখানে। প্রায়ই নতুন নতুন লোক ওখানে গিয়ে উঠছে, পরস্পরের মধ্যে পরিচয় থাকার সম্ভাবনা কম। ওটিনোর পক্ষে ওখানে লুকিয়ে থাকা সহজ।’
‘ঠিক বলেছ!’ রবিন বলল। ‘চলো, দেখে আসি।’
গাড়ি নিয়ে বেরিয়েছে ওরা। চলে এল শহরের প্রান্তে। মেইন রোড থেকে নামল পাশের আরেকটা রাস্তায়। খানিক দূর এগোতেই নতুন নতুন বাড়িঘর চোখে পড়ল। আরও বাড়ি উঠছে। কাজ চলছে সমানে। প্লটগুলোর ভেতরে ভেতরে অনেক রাস্তায়ই সবে খোয়া বিছানো হয়েছে। পাকা হয়নি এখনও। ও রকমই একটা রাস্তা ধরে এগোতে লাগল ওরা। একটা বাড়ির কাছে এসে গাড়ির গতি কমিয়ে দিয়ে ওটিনোর মতো কাউকে চোখে পড়ে কি না দেখল। বাড়ির বারান্দায় দেখা গেল অনেককে। বাগানে খেলছে বাচ্চারা।
‘দেখছি তো অনেককেই,’ রবিন বলল। ‘কিন্তু কাউকেই তো ওটিনোর মতো লাগছে না। তাছাড়া কোনটা ওটিনো কী করে বুঝব? যাদের দেখছি, তাদের কাউকেই ল্যাটিন বলে মনে হচ্ছে না।’
পুরো এলাকাটায় চক্কর মেরে হতাশ হয়ে ফিরে যাওয়ার জন্য ঘুরল কিশোর। যেদিক দিয়ে ঢুকেছিল, সেখান দিয়ে না গিয়ে আরেকটা রাস্তা ধরল। এলাকাটা থেকে বেরোতে যাবে ঠিক এই সময় চিত্কার করে উঠল বিড, ‘এই গাড়ি রাখো!’
ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষল কিশোর। ফিরে তাকাল।
হাত তুলে একটা বাড়ি দেখাল বিড। ‘ওই দেখো! ওটিনো! ওটিনো’জ বারবার শপ!’
‘ওটিনোর নাপিতের দোকান!’ বিড়বিড় করে ইংরেজিটার বাংলা করল রবিন। ‘তার মানে ওটিনো পেশায় একজন নাপিত। স্যালুন খুলেছে।’
রাস্তার পাশে গাড়ি রেখে দরজা খুলে টপাটপ নেমে পড়ল তিনজন। দ্রুত এগোল বাড়িটার দিকে। এ এলাকার অনেক বাড়ির মতোই এই বাড়িটাও অসমাপ্ত। কাজ শেষ হতে দেরি আছে এখনও। নিচতলার একটা বড় ঘরে স্যালুন খুলেছে ওটিনো। দরজার পাশে পিতলের নেমপ্লেটে লেখা : এস ওটিনো। সামনের স্ক্রিন ডোরটায় তালা দেওয়া।
তার ভেতর দিয়ে উঁকি দিল কিশোর। ঘরের পেছনে একটা টেবিলের সামনে কুঁজো হয়ে বসে আছে একজন লোক। মাথাভর্তি কালো চুল। মনোযোগ দিয়ে কী যেন লিখছে। দরজায় থাবা দিল কিশোর।
ঝট করে মুখ তুলে তাকাল লোকটা। চমকে গেছে। অস্বস্তি ভরা কণ্ঠে চেঁচিয়ে জবাব দিল, ‘দোকান বন্ধ। কাল এসো।’
‘আপনি কি মিস্টার ওটিনো?’
‘হ্যাঁ, আমি ওটিনো। আমাদের দেশে মিস্টারকে সেনিওর বলে। কী চাও?’
‘চুল কাটাতে আসিনি আমরা, সেনিওর ওটিনো,’ জবাব দিল কিশোর। ‘কয়েকটা কথা ছিল আপনার সঙ্গে।’
এ কথায় অস্বস্তি যেন আরও বেড়ে গেল লোকটার। ‘কী কথা?’ বিড়বিড় করে স্প্যানিশ ভাষায় কী যেন বলল। তারপর বলল, ‘দেখো, আমি খারাপ লোক না। স্পেন থেকে ব্যবসা করতে এসেছি। পুলিশের ভয় দেখিয়ে আমার কাছ থেকে চাঁদা আদায় করতে এসেছ তো? আমি স্মাগলার নই, অবৈধ কাজ করি না। পুলিশকে জানিয়ে লাভ হবে না।’ বিড়বিড় করে বলল, ‘কি বিপদে যে পড়লাম! খালি এসে চাঁদা চায়। টাকা দিতে দিতে ফতুর, ব্যবসা করব কী!’
ওরা যে চাঁদাবাজ নয়, কিংবা ডাকাতি করতে আসেনি, ওটিনোকে বোঝাতে বেগ পেতে হলো কিশোরের। অকারণেই সময় নষ্ট করছে কি না বুঝতে পারছে না ও। কারণ ওরা একজন ল্যাটিন লোককে খুঁজছে। আর এ লোকটা বলছে সে স্পেন থেকে এসেছে, তার মানে স্প্যানিশ।
কিশোরের সরাসরি কথাবার্তা আর নির্বিকার আচরণ সন্দেহ পুরোপুরি দূর করে দিল লোকটার। অবশেষে হাসি ফুটল ওর মুখে। দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। কিন্তু তালা খুলল না। জিজ্ঞেস করল, ‘কী কথা?’
‘আমরা একজন ওটিনোকে খুঁজছি।’
‘আমার নামও ওটিনো। তবে আমি বোধহয় তোমাদের লোক নই।’ লোকটা জানাল, এ দেশে সে অল্প কিছুদিন হলো এসেছে। ওর নামের সঙ্গে মিল আছে এমন কাউকে চেনে না এখানে। সবশেষে বলল, ‘তোমাদের কথা শেষ হয়েছে? আমি বাড়িতে একটা জরুরি চিঠি লিখছিলাম, সেটা শেষ করব এখন। রাতের ডাকেই ছাড়তে হবে।’
লোকটাকে ধন্যবাদ দিয়ে দোকানের বারান্দা থেকে নেমে এল ওরা। তিক্ত কণ্ঠে বিড বলল, ‘সারা শহরে একজন মাত্র ওটিনোকেই পেলাম, সে-ও আমাদের লোক নয়।’
বাড়ি ফেরার পথে বিডকে ওদের বাড়িতে নামিয়ে দিল কিশোর। নিজেদের বাড়িতে ফিরে ড্রাইভওয়েতে গাড়ি ঢোকাল। গাড়ি রেখে ঘরে ঢুকল। রবিন ঢুকল ওর পেছনে। রান্নাঘরে ঢুকে রেফ্রিজারেটরের গায়ে টেপ দিয়ে আটকানো একটা ভাঁজ করা কাগজ দেখে খুলে নিল কিশোর। মেরি চাচি লিখে রেখে গেছেন :
কিশোর,
বান্ধবীর পার্টিতে গেলাম।
ফিরতে দেরি হবে।
তোর চাচা ফোন করেছিল।
এখন ওয়াশিংটনে আছে।
আজই ফিরবে বলল।
—তোর চাচি।
‘কিশোর, ফ্রিজে ঠাণ্ডা খাবার আছে। গরম করব?’ জিজ্ঞেস করল রবিন। ‘খিদে পেয়েছে?’
‘পাচ্ছে। খাওয়ার আগে টেলিভিশনের খবরটা দেখে নিলে কেমন হয়?’
‘মন্দ হয় না। চলো।’
বসার ঘরের দিকে রওনা হলো ওরা। ডাইনিং রুমের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় থমকে দাঁড়াল রবিন। ‘আরে কী কাণ্ড! দেখো অবস্থা!’
দেয়াল-আলমারির চারটা ড্রয়ারই খুলে ফেলে রাখা হয়েছে। জিনিসপত্র সব মেঝেতে ছড়ানো।
‘চোর এসেছিল!’ রবিন বলল।
দৌড়ে এসে বসার ঘরে ঢুকল দুজন। সেখানেও একই অবস্থা। জিনিসপত্র সব তছনছ করা।

নয়
সারা বাড়ির সমস্ত ঘরে ছুটে বেড়াতে লাগল দুজন। ওপরতলা নিচতলার যত জায়গায় যত ড্রয়ার আছে সব খোলা। সবগুলোতে খোঁজা হয়েছে। রাশেদ পাশার স্টাডির তালা দেওয়া ড্রয়ারগুলোই কেবল খুলতে পারেনি। তালা ভাঙারও চেষ্টা করা হয়েছে। পারেনি। কম্বিনেশন লক বলেই বোধহয়।
‘রবিন,’ অবশেষে কথা বলল কিশোর। ‘কিছুই যে চুরি যায়নি বুঝতে পারছ? গহনাপাতি, মূল্যবান জিনিসত্র কোনো কিছুই খোয়া গেছে বলে মনে হচ্ছে না। কী নিতে এসেছিল চোরটা?’
‘যেটা নিতেই আসুক, পায়নি তাতে কোনো সন্দেহ নেই।’
রাশেদ পাশার কেসের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো জিনিসের সন্ধানে এসেছিল চোরটা, এ ব্যাপারে প্রায় নিশ্চিত হয়ে যাচ্ছিল কিশোর, হঠাত্ একটা কথা মনে পড়ে গেল ওর। দৌড় দিল নিজেদের বেডরুমের দিকে।
‘কী জন্য এসেছিল ও, জানি আমি,’ আলমারির দরজা খুলতে খুলতে বলল কিশোর।
ঘরে ঢুকল দরজায় দাঁড়ানো রবিন। কী জিনিস খোয়া গেছে এতক্ষণে জানা গেল। বিডের আঙ্কেলের সংগ্রহ থেকে নেওয়া সিগারেটের বাক্সের মতো যে জিনিসটা ফেলে দিচ্ছিলেন কিউরেটর মিস্টার ব্র্যাডম্যান, সেটা আলমারির তাকে রেখেছিল কিশোর। জিনিসটা নেই এখন।
‘কিন্তু এত সাধারণ একটা জিনিসের জন্য এত কষ্ট করল কেন চোরটা?’ রবিনের প্রশ্ন।
‘তার মানে সাধারণ নয় জিনিসটা,’ চিন্তিত ভঙ্গিতে জবাব দিল কিশোর। আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, বাধা পড়ল গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দে। নিশ্চয় চাচি এসেছে। দরজা খুলে দিতে দৌড়ে নিচে নামল দুই গোয়েন্দা।
রবিন বলল, ‘এত তাড়াতাড়ি ফিরবে তোমরা ভাবিনি। আমি ভেবেছিলাম খেয়েদেয়ে ফিরতে বুঝি অনেক রাত হবে।’
কী ঘটনা ঘটেছে শুনে চমকে গেলেন মেরি চাচি। মূল্যবান জিনিস খোয়া গেছে কি না দেখতে চললেন। কিন্তু দেখা গেল, কিছুই হারায়নি, সব ঠিক আছে।
‘শুধু আমাদের কিউরিও বক্সটা বাদে,’ রবিন বলল।
ভুরু কোঁচকালেন চাচি। ‘ওই বাক্সটাও নিয়ে গেছে?’
‘মানে?’ রবিনের প্রশ্ন।
ওর প্রশ্নের জবাব না দিয়ে চাচি বললেন, ‘জানল কিভাবে, ওখানে আছে?’
‘অমন রহস্য করে কথা বলছ কেন, চাচি?’ কিশোর কিছু বুঝতে পারছে না।
‘আসলে হয়েছে কি, বিকেলে তোদের ঘরে কাপড় গোছাতে গিয়ে বাক্সটা দেখলাম। পছন্দ হয়ে গেল। বোতাম-টোতাম রাখা যাবে ভেবে জিনিসটা এনে আমার সেলাই মেশিনের বাক্সে রেখেছিলাম। তোদের বলার সুযোগ পাইনি।’
‘একটা কাজের কাজই করেছ তুমি, চাচি! একটা পুরস্কার পাওনা হয়ে গেল তোমার! তুমি সরিয়ে ফেলাতেই চোরে খুঁজে পায়নি।’ রবিনের দিকে তাকাল কিশোর। ‘হাতে পেয়েও জিনিসটার কদর করিনি আমরা। জিনিসটা যে মূল্যবান, সেটা বুঝিয়ে দিয়ে গেল চোর।’ এক মুহূর্ত থেমে বলল, ‘এখনও তোমার মেশিনের বাক্সে আছে নাকি, দেখা দরকার। যদি ওখান থেকেই নিয়ে গিয়ে থাকে?’
তাড়াতাড়ি গিয়ে সেলাই মেশিনের ঢাকনা তুললেন মেরি চাচি।
আছে।
হাঁপ ছাড়ল দুই গোয়েন্দা। হাসি ফুটল মুখে।
‘আবার যখন পাওয়া গেছে, ভেতরে কী আছে না দেখে আর রাখছি না,’ কিশোর বলল। ‘আমি শিওর, এই বাক্স নিতেই চোর এসেছিল।’
‘কী করে বুঝলি?’ মেরি চাচি জিজ্ঞেস করলেন।
‘বাক্সটা ছিল বিডের আঙ্কেলের। মিউজিয়ামে ব্র্যাড আঙ্কেল ফেলে দিচ্ছিলেন,’ কিশোর বলল। ‘আমি তুলে নিয়ে এসেছি। তখন নিশ্চয় আড়ালে লুকিয়ে থেকে দেখেছিল চোরটা। ও জানে ওটার মধ্যে কী আছে। সে জন্যই বাড়িতে কেউ নেই দেখে সুযোগ বুঝে চুরি করতে ঢুকেছিল।’
বাক্সটা হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখতে লাগল কিশোর। রবিনের দিকে তাকাল। ‘কিসের তৈরি এটা অনুমান করতে পারো? মধ্য আমেরিকান মেহগনি। পোড়া কাঠের যে টুকরোটা আমরা পরীক্ষা করেছিলাম, সেটার কাঠ আর এটার কাঠ একই।’
‘মানে? কিসের কথা বলছিস তোরা?’ বুঝতে না পেরে ভুরু কুঁচকে ফেললেন মেরি চাচি।
জবাব দিল না কিশোর। বাক্সের দিকে মনোযোগ দেওয়ার ভান করে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। গোপন কুঠুরি আছে কি না খুঁজতে শুরু করল। হঠাত্ উজ্জ্বল হয়ে উঠল মুখ। ‘এই যে, যা ভেবেছিলাম! নকল একটা তলা আছে বাক্সটার।’
বুড়ো আঙুলের নখ দিয়ে খুঁচিয়ে তুলে আনল তলাটা। পাতলা এক ফালি কাঠ। নিচে রাখা খোদাই করা চমত্কার একটা সোনার মুদ্রা। ওটা তুলে আনার সময় উত্তেজনায় হাত কাঁপতে লাগল ওর। দুই হাতে টিপে ধরে আলোর দিকে উঁচু করল মুদ্রাটা।
‘মেডেল!’ চিত্কার করে উঠল রবিন। ‘খাঁটি সোনাই তো মনে হচ্ছে। ভাগ্যিস চোরটা খুঁজে পায়নি।’
‘দেখো,’ রবিনের দিকে বাড়িয়ে ধরল কিশোর। ‘উপল পাথর বসানো। গ্রোভ অ্যাংলার কী বলেছিল মনে আছে? পাথরটা কোনখানে বসানো দেখো।’ মেডেলটাকে মাঝামাঝি কেটে দিয়ে চলে গেছে একটা রেখা। পাথরটা সেই রেখার ওপর বসানো। ‘সুন্দর না পাথরটা? অ্যাংলার বলেছিল নকল। কিন্তু এখন তো দেখা যাচ্ছে আসল।’
‘বিডের আঙ্কেল মনে করতেন এর কোনো বিশেষত্ব আছে,’ কিশোর বলল। ‘আমার মনে হচ্ছে এই রেখাগুলো দিয়ে কোনো ধরনের ম্যাপ আঁকা হয়েছে। কিংবা নকশা।’
‘অন্য মেডেলটায় কী যেন লেখা আছে বলেছিল অ্যাংলার?’ জিজ্ঞেস করল রবিন।
‘একটা শব্দ। উচ্চারণটা হবে “চিকসাপিকো” বা ও রকম কিছু।’
মেরি চাচিও সোনার মুদ্রাটা হাতে নিয়ে দেখলেন।
রবিন বলল কিশোরের দিকে তাকিয়ে, ‘এই নকশা থেকে নিশ্চয় চিকসাপিকোতে গুপ্তধন কোথায় লুকানো আছে সেটা বোঝা যাবে। পুয়ের্তো গিনেস রাশেদ আঙ্কেলকে কী বলেছিল মনে আছে?’
‘আছে। চলো, চিকসাপিকো কোন দেশে দেখে নেওয়া যাক।’
ম্যাপ নিয়ে বসল কিশোর ও রবিন। গভীর মনোযোগে মেক্সিকো আর দক্ষিণ আমেরিকার সমস্ত জায়গা তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখল। চিকসাপিকো নামে কোনো জায়গা নেই ম্যাপে।
‘তার মানে,’ অবশেষে মুখ তুলল কিশোর, ‘চিকসাপিকোর মানে কোনো জায়গা নয়, অন্য কিছু। কোনো সাংকেতিক শব্দ না তো?’
‘হতে পারে,’ বলে উঠলেন মেরি চাচি। ‘কিংবা চিকসাপিকো হয়তো কোনো মানুষের নাম, প্রাচীন রাজা, যার সঙ্গে কবরে রাশি রাশি মূল্যবান ধনরত্ন দিয়ে আসা হয়েছিল।’
কিশোর বলল, ‘আমার ধারণা, ধাঁধার জবাব লুকিয়ে আছে দুটো মেডেলের মধ্যে। তবে দুটো যেহেতু হাতে নেই, যে একটা আছে, সেটারই নকশাগুলো মুখস্থ করে ফেলা যাক। কোনো কারণে এটা হাতছাড়া হয়ে গেলেও নকশা নিয়ে তখন আর ভাবতে হবে না আমাদের।’
‘ঠিক,’ একমত হলো রবিন।
‘তোরা তোদের কাজ কর,’ মেরি চাচি বললেন। ‘আমি তোদের খাবার গরম করতে যাই।’
মেডেলের উপল পাথরটা কোন রেখার ওপর কিভাবে বসানো, মনে গেঁথে নিল দুই গোয়েন্দা। তারপর দুজন দুটো কাগজে মেডেল না দেখে নকশা আঁকল। বারবার আঁকতে আঁকতে যখন হুবহু মেডেলটার মতো হয়ে গেল, তখন ক্ষান্ত দিল। খাওয়ার কথা মনে পড়ল ওদের।
কিশোর আর রবিন খেতে বসলে, চোর ঢোকার কথাটা থানায় ফোন করে জানিয়ে দিতে বললেন মেরি চাচি। আর ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠল। মেরি চাচি ধরলেন। ওপাশের কথা শোনার পর রিসিভার রেখে কিশোরকে বললেন, ‘তোর চাচা, বাড়ি আসছে। গাড়ি নিয়ে নয়টার সময় এয়ারপোর্টে যেতে বলেছে।’
রবিনকে বলল কিশোর, ‘চলো, একসাথেই বেরোই দুজন। আমাকে থানায় নামিয়ে দিয়ে তুমি চলে যেয়ো রাশেদ আঙ্কেলকে আনতে। ফোন করার দরকার নেই। ক্যাপ্টেন ইয়ান ফ্লেচারকে আমি সব খুলে বলব।’
‘মেডেলটার কী হবে?’ রবিন জিজ্ঞেস করল। ‘বিডকে দিয়ে দেওয়া উচিত। বাক্সটা ফেলে দেওয়া জিনিস ভেবে আমরা নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু এখন তো দেখছি মহামূল্যবান। তাছাড়া মেডেলটারও অনেক দাম।’
‘তুমিই সাথে নিয়ে যাও। চাচাকে দেখিয়ো আগে। আসার পথে বিডকে দিয়ে এসো।’
খাওয়ার পর বেরোনোর জন্য তৈরি হলো দুই গোয়েন্দা। মেডেলটা পকেটে ভরে নিল রবিন। ঘর থেকে বেরিয়ে গ্যারেজের দিকে পা বাড়াল দুজন।
গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসল রবিন। গাড়ি চালিয়ে থানার সামনে এসে থামল। নেমে যাওয়ার আগে রবিন সাবধান করে দিল কিশোরকে, ‘সাবধান থেকো। আমাদের শত্রুরা লোক ভালো না মনে রেখো।’
থানার গেটের দিকে এগোল কিশোর।
গাড়ি নিয়ে এয়ারপোর্টে চলল রবিন। মাঝামাঝি আসার পর মনে পড়ল এ পথে যাওয়া যাবে না। সামনে রাস্তা কেটে মেরামত চলছে। যেতে হবে ঘুরপথে অন্য রাস্তা দিয়ে। মিউজিয়ামের সামনে দিয়ে গেছে রাস্তাটা।
বেশ গরম পড়েছে। বাতাস নিথর।
এয়ারপোর্টে যাবার এই রাস্তাটা এমনিতেই নির্জন। এ সময়টায় আরও বেশি নির্জন হয়ে যায়। দু ধারে খেত। দূরে দূরে বাড়িঘর। দুই পাশে বড় বড় গাছ রাস্তাটাকে অন্ধকার করে রেখেছে। দ্রুত গাড়ি চালাচ্ছে রবিন। আর মাইলখানেক গেলেই এয়ারপোর্ট। ওদের কেসের বিবরণ নিজের মুখে রাশেদ আঙ্কেলকে জানানোর কথা ভেবে রোমাঞ্চিত হচ্ছে ও।
সামনে একটা তীক্ষ বাঁক। ওপাশের রাস্তা দেখা যায় না। মোড় নিয়ে ওপাশে আসতে এক ভয়ানক মর্মান্তিক দৃশ্য চোখে পড়ল রবিনের। কয়েক গজ দূরে রাস্তার কিনারে পড়ে আছে একজন মানুষ। রক্তাক্ত লাশ। নিশ্চয় কোনো গাড়ি লোকটাকে চাপা দিয়ে পালিয়েছে।
ব্রেক কষল ও। গাড়ির গতি কমাল। লাশের সামান্য দূরে ছায়া থেকে বেরিয়ে এল আরেকজন মানুষ। এক হাত কপালে রেখে হেডলাইটের আলো থেকে চোখ বাঁচাচ্ছে, অন্য হাত নেড়ে গাড়ি থামাতে ইশারা করছে।
গাড়ি থেকে নেমে এল রবিন। ‘কী হয়েছে?’
‘জানি না,’ হাত নাড়ানো বন্ধ করল লোকটা। আবছাভাবে এখন ওর চেহারা দেখতে পাচ্ছে রবিন। গোঁফজোড়া চোখে পড়ছে।
হঠাত্ লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল মাটিতে পড়ে থাকা লাশ। দুই হাতে মুখ ঢাকা। ওর চোখ দুটো ছাড়া মুখের আর কিছুই দেখতে পাচ্ছে না রবিন।
পুরো ব্যাপারটাই একটা ফাঁদ, সাজানো নাটক, যখন বুঝল রবিন, অনেক দেরি হয়ে গেছে তখন। লাফ দিয়ে গিয়ে গাড়িতে ওঠার চেষ্টা করল। কিন্তু কাছাকাছি দাঁড়ানো লোকটা এমন জোরে এক ঘুসি মারল, পাক খেয়ে গিয়ে গাড়ির বনেটে পড়ল রবিন।
কোনোমতে সোজা হয়ে লোকটাকে লাথি মারার চেষ্টা করল। লাগাতে পারল না। আরেকটা আঘাত এসে লাগল মাথার একপাশে। অন্য লোকটা মেরেছে।
এখন একটা গাড়ি এলে হয়তো বেঁচে যেত রবিন। কিন্তু এল না। কোনো গাড়ির আলো দেখল না। ইঞ্জিনের শব্দ শুনল না। ওকে সাহায্য করতে এল না কেউ।
একটাই চিন্তা এখন ওর, কোনোমতে নিজের গাড়িটাতে উঠে বসা। তাহলে পালানো যায়। গাড়িতে ঢোকার জন্য মরিয়া হয়ে উঠল ও। ড্রাইভিং সিটের পাশের খোলা দরজা দিয়ে এক পা ঢুকিয়ে দিল ভেতরে। হামলাকারীরা ছাড়ল না। দুজন দুদিক থেকে ওর হাত চেপে ধরল।
‘ছাড়ো! ছাড়ো আমাকে!’ চিত্কার করে উঠল রবিন। ঝাড়া দিয়ে একটা হাত ছুটিয়ে নিল। অন্য লোকটা ওর কানের ওপর ধাঁ করে এক ঘুসি বসিয়ে দিল। সহ্য করতে পারল না আর রবিন। চোখের সামনে আঁধার হয়ে এল দুনিয়া।
কয়েক সেকেণ্ড পরেই হুঁশ ফিরল রবিনের। কিন্তু ততক্ষণে হাত-পা বেঁধে ফেলা হয়েছে ওর। মুখে রুমাল গুঁজে দিল একজন। আরেকজন আরেকটা রুমাল দিয়ে ওর চোখ বাঁধল। তারপর ওকে টেনে নিয়ে এল ঝোপের আড়ালে।
ওর পকেট হাতড়াতে শুরু করল একজন। পকেট থেকে বের করে নিল মেডেলটা।

দশ
হাত-পা বাঁধা অবস্থায় অসহায় হয়ে রাস্তার পাশের ঝোপের মধ্যে পড়ে রইল রবিন। মুখে রুমাল গোঁজা থাকায় চিত্কারও দিতে পারছে না। এতক্ষণে একটিবারের জন্যও কথা বলেনি দুই হামলাকারীর কেউ। এখন কাছেই অন্ধকারের মধ্যে কথা শোনা গেল ওদের। কী বলে শোনার জন্য কান খাড়া করে রেখেছে রবিন। ভাষাটা ইংরেজি নয়। স্প্যানিশ। খুব সামান্যই বোঝে ও। একজন বলছে : এবার জায়গাটা খুঁজে বের করতে পারব আমরা। অন্যজন রাগত স্বরে বলল, আমার ভাগ আমাকে না দিলে ভালো হবে না বলে দিলাম।
গর্জে উঠল গাড়ির ইঞ্জিন। পুঁক-পুঁক পুঁক-পুঁক করছে। ইঞ্জিনে সমস্যা থাকলে নিউট্রাল অবস্থায় সাধারণত এ রকম শব্দ হয়। কিন্তু ছিল কোথায় গাড়িটা এতক্ষণ? দেখেনি কেন ও? নিশ্চয় রাস্তার পাশের ঝোপটোপ কিংবা গাছের আড়ালে গাড়িটা লুকিয়ে রেখেছিল। তারপর ফাঁদ পেতে ওর জন্য অপেক্ষা করছিল লোকগুলো।
কিন্তু সে যে এই রাস্তা দিয়ে এ সময়ে যাবে, জানল কিভাবে ওরা? বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় ওর নিজেরও মনে ছিল না এদিক দিয়ে যেতে হবে। তার মানে সে আর কিশোর যখন খাচ্ছিল, জানালার নিচে লুকিয়ে থেকে ওদের কথাবার্তা শুনেছে লোকগুলো। ওদের জানা আছে এয়ারপোর্টে যাওয়ার একমাত্র পথ এখন এটাই। নাহ্, বাড়ি ফিরে গিয়েই দেয়ালের ওপরের ডালটা কাটতে হবে আগে। এভাবে চুরি করে লোক ঢোকা বন্ধ করতে হবে।
ওর নিজের গাড়িটাও চালু হতে শুনল রবিন। নিয়ে যাচ্ছে নাকি? না, নিল না। গাড়িটাকে চালু করে রাস্তার ঢালের কাছে গিয়ে লাফিয়ে নেমে পড়ল ড্রাইভার। ঢাল বেয়ে গড়িয়ে নেমে গেল চালকবিহীন গাড়িটা। এসবের কিছুই দেখতে পেল না রবিন। তবে অনুমানে সবই বুঝল।
চলে গেল অন্য গাড়িটা। আর কোনো সাড়াশব্দ নেই।
মাটিতে পড়ে পড়ে নিজেকে মুক্ত করার কথা ভাবছে ও। কোনো উপায় দেখছে না। কেউ এসে না বাঁচালে নিজে থেকে উদ্ধার পাবে না।

লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে আসা প্লেনটা রকি বিচে ল্যাণ্ড করল। প্লেন থেকে নেমে এলেন রাশেদ পাশা। ওয়েটিং রুমের কাছে এসে দাঁড়ালেন। চারপাশে তাকিয়ে ছেলেদের খুঁজছে ওর চোখ। দুজনের কাউকে দেখলেন না। ভাবলেন, ওয়েটিং রুমে অপেক্ষা করছে ওরা। উঁকি দিলেন সেখানে। ওখানেও নেই। কী হলো? খবর যখন পেয়েছে, না এসে থাকার কথা তো নয়। নিশ্চয় জ্যামে আটকা পড়েছে। কয়েক মিনিট অপেক্ষা করার পর সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি।
কিন্তু দশ মিনিট পরেও যখন এল না ওরা, আর নিশ্চিন্ত থাকতে পারলেন না তিনি। খোঁজ নিতে বাড়িতে ফোন করলেন।
‘কেন, ওরা যায়নি এখনও? অনেকক্ষণ আগেই তো বেরিয়ে গেছে,’ উদ্বিগ্ন হলেন মেরি চাচি। তারপর শব্দ শুনে ফিরে তাকিয়ে কিশোরকে ঢুকতে দেখলেন। ‘ওই যে, কিশোর এল। এই কিশোর, ধর তো, তোর চাচা। রবিন নাকি এখনও এয়ারপোর্টে যায়নি।’
‘যায়নি! কখন তো চলে যাবার কথা!’ রিসিভার কানে ঠেকাল কিশোর। ‘হ্যালো, চাচা!’ রবিন ওকে থানায় নামিয়ে দিয়ে এয়ারপোর্টের দিকে গিয়েছিল, চাচাকে জানাল ও। সব শুনে রাশেদ পাশা জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোন রাস্তা দিয়ে গেছে জানিস নাকি?’
‘নিশ্চয় ঘুরপথে গেছে, মিউজিয়ামের সামনের রাস্তাটা দিয়ে,’ কিশোর বলল। ‘বড় রাস্তাটা তো কাটা।’ এক মুহূর্ত চুপ থেকে বলল, ‘চাচা, দুটো মেডেলের একটা পেয়ে গেছি আমরা। রবিন ওটা সাথে করে নিয়ে গেছে তোমাকে দেখাতে। ফেরার পথে বিডকে দিতে বলেছিলাম। হয়তো আগেই দিতে চলে গেছে, যদিও সেটা করার কথা নয়!’
‘কিশোর, ব্যাপারটা আমার ভালো ঠেকছে না। আমি বিপদের গন্ধ পাচ্ছি। অন্য গাড়িটা নিয়ে ওকে খুঁজতে বেরোও। আমি ট্যাক্সি নিয়ে আসছি।’
‘এখনি বেরোচ্ছি, চাচা। তুমি চিন্তা কোরো না।’
ব্যাগ হাতে তাড়াহুড়া করে এয়ারপোর্ট বিল্ডিং থেকে বেরোলেন রাশেদ পাশা। ট্যাক্সি ডেকে উঠে বসলেন। ড্রাইভার ওকে চেনে। কী ঘটেছে সংক্ষেপে তাকে জানালেন রাশেদ পাশা।
সব শুনে ড্রাইভার বলল, ‘খুব ভাবনার কথা!’
কিশোরের সঙ্গে কোথায় দেখা করার কথা, ড্রাইভারকে জানালেন রাশেদ পাশা।
হাইওয়ে ধরে গাড়ি এগোল। ঘন কুয়াশা। বেশি দূর দৃষ্টি চলে না। হেডলাইটের আলোয় রাস্তার পাশের প্রতিটি ইঞ্চি দেখতে দেখতে চললেন রাশেদ পাশা। গাড়ি চালাতে চালাতে ড্রাইভারও কড়া নজর রেখেছে। কিন্তু রবিন কিংবা ওর গাড়িটার কোনো চিহ্নই চোখে পড়ল না। উল্টো দিক থেকে আসা একটা গাড়ির হেডলাইট দেখা গেল। রাশেদ পাশা ভাবলেন, কিশোর। কিন্তু গাড়িটা পাশ কাটিয়ে চলে গেল। কিশোর নয়। হতাশ হলেন তিনি। অবশেষে সেই জায়গাটাতে পৌঁছাল গাড়ি, যেখানে রবিনের ওপর হামলা চালানো হয়েছে।
‘যেকোনো মুহূর্তে কিশোরের সঙ্গে দেখা হয়ে যেতে পারে,’ রাশেদ পাশা বললেন।
ঠিক এই সময় আবার একটা গাড়ির হেডলাইট চোখে পড়ল।
‘হ্যাঁ, এটা কিশোরের গাড়ি হতে পারে,’ ড্রাইভারকে বললেন রাশেদ পাশা। ‘হেডলাইট দিয়ে সংকেত দাও তো। কিশোর হলে জবাব দেবে।’
কয়েকবার হেডলাইটের আলো ওপরে-নিচে করে সংকেত দিল ড্রাইভার। গাড়িটাও একইভাবে সংকেতের জবাব দিল।
পাশে এসে গাড়ির জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দিল কিশোর। ‘চাচা, তুমি নাকি?’
‘হ্যাঁ। কিছু পেলি?’
‘না। আসার পথে রাস্তার দুই পাশ দেখতে দেখতে এসেছি। ওর গাড়িটার চিহ্নও নেই।’
‘আমরাও দেখতে দেখতে এলাম। এ রাস্তা দিয়েই যদি গিয়ে থাকে ও, এখানেই আশপাশে কোথাও আছে।’
ড্রাইভারকে গাড়িতে বসিয়ে রেখে নেমে পড়লেন রাশেদ পাশা। কিশোরও নামল। রাশেদ পাশা বললেন, ‘তুমি ওদিকটাতে খোঁজো, আমি এদিকে খুঁজছি।’
কয়েক পা গিয়েই হঠাত্ ঝোপের ভেতর দিয়ে চকচকে কী যেন একটা চোখে পড়ল রাশেদ পাশার। ড্রাইভারকে ডেকে বললেন, ‘এই, ওদিকটাতে আলো ফেলো তো।’
গাড়ি ঘুরিয়ে হেডলাইটের আলো ফেলল ড্রাইভার। রাস্তার পাশে খেতের কিনারে পড়ে থাকা রবিনের গাড়িটা চিনতে পারলেন রাশেদ পাশা।
কিশোরও ছুটে এল। চাচার পাশে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইল গাড়িটার দিকে।
‘টর্চ আছে তোমার গাড়িতে?’ জিজ্ঞেস করলেন রাশেদ পাশা।
‘আছে।’
‘নিয়ে এসো।’
টর্চ হাতে গাড়িটার কাছে নেমে এল দুজন। রবিনকে পাওয়া গেল না গাড়িতে। আবার ওপরে উঠে এসে রাস্তার ধারে ঝোপের কিনারগুলোতে আলো ফেলে দেখতে লাগল। কুয়াশায় ভেজা নরম মাটিতে এক জায়গায় বেশ কয়েক জোড়া জুতোর ছাপ চোখে পড়ল ওদের।
‘এখানেই ছিল ওরা,’ দেখতে দেখতে বললেন রাশেদ পাশা। ‘রবিনের অপেক্ষায় ঘাপটি মেরে বসে ছিল। হয় ধরে নিয়ে গেছে, নয়তো এখানেই কোথাও ফেলে গেছে। ওই ঝোপগুলোতে দেখা দরকার।’
কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যেই মাটিতে পড়ে থাকা রবিনকে খুঁজে বের করে ফেলল কিশোর। হাত-পা বাঁধা। মুখে রুমাল গোজা। কুয়াশার মধ্যে বেকায়দা ভঙ্গিতে পড়ে থেকে থেকে কাহিল হয়ে গেছে।
চিত্কার করে ডাকল কিশোর, ‘চাচা! চাচা! পেয়েছি!’
মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে পকেট থেকে ছুরি বের করে রবিনের বাঁধন কাটতে বসে গেল ও। রাশেদ পাশাও এসে বসল ওর পাশে।
মুখের ভেতরটা শুকিয়ে গেছে রবিনের। রুমাল বের করে নেওয়ার পরেও কথা বলতে কষ্ট হলো।
ট্যাক্সির কাছে ফিরে এল তিনজন। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে রবিনকে জিজ্ঞেস করল কিশোর, ‘কী হয়েছিল?’ যখন বুঝল কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে রবিনের, সিটের পাশে ফেলে রাখা একটা পানির বোতল বের করে বাড়িয়ে দিল।
পানি দিয়ে জিভ আর গলা ভেজানোর পর কথা বলতে পারল রবিন। কী ঘটেছিল অল্প কথায় জানাল। ড্রাইভারের সামনে চুরি হয়ে যাওয়া মেডেলটার কথা কিছু বলল না। ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে ড্রাইভারকে বিদায় করে দিলেন রাশেদ পাশা। রবিনকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হ্যাঁ, এইবার বলো দেখি, কোন্ কথাটা গোপন করেছ?’
মেডেল নিয়ে যাওয়ার ঘটনাটা সবিস্তার জানাল রবিন। আফসোস করে বলল, ‘মেডেলটা তো কেড়ে নিল। বিডকে কী জবাব দেব এখন তাই ভাবছি। যেভাবেই হোক, লোকগুলোর কাছ থেকে মেডেলটা এখন ফেরত আনতেই হবে।’
‘লোকগুলোকে চিনেছ?’ কিশোর জানতে চাইল।
‘না। একজনের গোঁফ ছিল। নিশ্চয় সেই ব্লোগানওয়ালা। আরেকটা সূত্র অবশ্য আছে, ওদের গাড়ির ইঞ্জিনটা বিচিত্র পুঁক-পুঁক শব্দ করে।’
‘পুলিশকে জানানো দরকার,’ রাশেদ পাশা বললেন। ‘গাড়িটা খুঁজে বের করার চেষ্টা করুক। তাড়াতাড়ি করলে এখনও হয়তো লোকগুলোকে ধরা যায়।’
‘কিন্তু এই সামান্য সূত্র দিয়ে ওদের খুঁজে বের করা যাবে কি না কে জানে।’
‘চেষ্টা তো করতে হবে। চলো, আগে থানায় যাই।’
কিশোরের আনা গাড়িটাতে বেঁধে টেনে তোলা হলো রবিনের গাড়িটা। ওটাতে চড়ল দুই গোয়েন্দা। আর কিশোর যেটা নিয়ে এসেছে, সেটাতে বসলেন রাশেদ পাশা।
থানায় পৌঁছে পুরো ঘটনাটা জানানো হলো পুলিশ চিফকে। সঙ্গে সঙ্গে ওয়্যারলেসে খবরটা টহলরত পুলিশ কারগুলোকে জানিয়ে দিলেন ক্যাপ্টেন ইয়ান ফ্লেচার। কিশোর, রবিন আর রাশেদ পাশাও গাড়িটা খুঁজতে বেরোলেন। ওদের সঙ্গে একজন পুলিশ অফিসারকে দিয়ে দিলেন ক্যাপ্টেন ইয়ান ফ্লেচার। যাতে কোনো প্রয়োজন পড়লে সঙ্গে সঙ্গে থানা কিংবা টহলরত পুলিশ কারগুলোকে খবর দিতে পারেন অফিসার।
রবিনের গাড়িটা থানার সামনে রেখে দেওয়া হলো। রাশেদ পাশা যেটা চালাচ্ছিলেন, সেটাতে চড়ে বসল সবাই। পুরো একটি ঘণ্টা মেডেল ছিনতাইকারীদের গাড়িটার খোঁজে সারা শহর চষে ফিরল ওরা। ব্যর্থ হলো।
নৌ-বন্দরের কাছে আসতে একটা গাড়ি পাশ কাটাল ওদের। সরু রাস্তায় পাশ কাটাতে গিয়ে দুটো গাড়ির গতি ধীর করতে হলো। অন্য গাড়িটা পাশ কাটানোর সময় ইঞ্জিনের সেই অদ্ভুত শব্দ কানে এল রবিনের। চিত্কার করে উঠল ও, ‘আঙ্কেল, ওটাই!’
সরু রাস্তায় গাড়ি ঘোরাতে সময় লাগল। গাড়ি ঘুরিয়ে চোরের গাড়ির পিছু নিতে নিতে বেশ অনেকখানি এগিয়ে গেল ওটা।
পিছু নিলেন রাশেদ পাশা।
পশ্চিমে চলেছে গাড়িটা।
তীব্র গতিতে গাড়ি ছুটিয়েছেন রাশেদ পাশা। কমে আসছে দুটো গাড়ির দূরত্ব। হঠাত্ গতি বেড়ে গেল সামনের গাড়িটার।
‘বুঝে ফেলেছে মনে হয়,’ বলে উঠলেন পেছনের সিটে বসা পুলিশ অফিসার। ‘পালাতে চাইছে!’
কিন্তু রাশেদ পাশার সঙ্গে পারল না। কারণ তার গাড়িটা নতুন, ইঞ্জিনও বেশি শক্তিশালী।
সামনের গাড়িটার একেবারে পেছনে চলে এলেন রাশেদ পাশা। পাশ কাটাতে শুরু করলেন। ধাক্কা লাগে লাগে। কেয়ার করলেন না তিনি। গাড়িটার সামনে চলে এলেন।
‘থামান! আটকে ফেলুন!’ চিত্কার করে উঠলেন পুলিশ অফিসার।
পালানোর পথ বন্ধ। গাড়ি থামাতে বাধ্য হলো অন্য গাড়ির ড্রাইভার। জেরার মুখে স্বীকার করল গাড়িটা চুরি করে এনেছে ও। রবিন দেখল, যে দুজন লোক ওকে আটক করেছিল, এই লোকটার বয়স তাদের চেয়ে কম। আর স্প্যানিশভাষীও নয় ও।
পুলিশ অফিসার জিজ্ঞেস করলেন রবিনকে, ‘তোমাকে যারা আটক করেছিল, এ ব্যাটা ছিল নাকি তাদের মধ্যে?’
মাথা নাড়ল রবিন, ‘না। তবে ওই দুজনের সহকারী হতে পারে ও। এ গাড়িটাতে করেই লোকগুলো পালিয়েছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই আমার। ইঞ্জিনের শব্দ অবিকল এক।’
চোরাই গাড়িসহ গাড়িচোরকে নিয়ে থানায় রওনা হলেন পুলিশ অফিসার। চোরের হাতে হাতকড়া পরিয়ে ওকে নিয়ে পেছনের সিটে বসলেন। গাড়ি চালাল রবিন। পাশে কিশোর। অন্য গাড়িটা নিয়ে রাশেদ পাশা একা একা চললেন।
থানায় এনে ভালোমতো জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো চোরটাকে। গাড়িটা ওর কাছে কিভাবে এল, জানা গেল অবশেষে। দুজন লোককে একটা নির্জন জায়গায় গাড়িটা ফেলে যেতে দেখে ও। ভঙ্গি দেখেই বুঝে গিয়েছিল, গাড়িটা চুরি করে এনেছে লোকগুলো। ফেলে যাওয়া গাড়িটা মেরে দিতে চেয়েছিল লোকটা। কপাল খারাপ, রবিনের চোখে পড়ে যায়।

এগারো
হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়তে নাড়তে রবিন বলল, ‘তার মানে এবারও ধরা গেল না লোকগুলোকে। ওদের খুঁজে পাওয়ার আশা নেই আর।’
ওকে আশ্বস্ত করার জন্য চিফ জানালেন, কড়া নজর রাখার ব্যবস্থা করেছেন তিনি। ধরা পড়তেই হবে লোকগুলোকে। খোঁজ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রবিনকে জানাবেন।
তাকে ধন্যবাদ দিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো সেদিন থানা থেকে বেরিয়ে এল কিশোরেরা। বাড়ি ফিরে এল। রবিনের গাড়িটাও নিয়ে আসা হলো এবার।
বাড়ি ফেরার পরেও আলোচনার প্রধান বিষয়বস্তু হয়ে উঠল এই রহস্য।
‘এ পর্যন্ত মেডেলটার ব্যাপারে দুজন লোককে আগ্রহী দেখা যাচ্ছে— একজন গ্রোভ অ্যাংলার, আরেকজন পুয়ের্তো গিনেস,’ রাশেদ পাশা বললেন। ‘আমার মনে হচ্ছে দুজনের মধ্যে গিনেসকে খুঁজে বের করাটাই সহজ হবে।’
‘ওর প্যাট্রিয়টিক সোসাইটির ব্যাপারে কী মনে হয় তোমার, চাচা?’ কিশোর জিজ্ঞেস করল। ‘পুরো একটা ভুয়া ব্যাপার না?’
‘কী জানি, বুঝতে পারছি না। গিনেসের সঙ্গে আমি কথা বলতে পারলে এ রহস্যের সমাধান হয়তো সম্ভব হতো। তবে ওকে যে আমি সন্দেহ করি, এটা বুঝতে দেওয়া যাবে না।’
‘কিন্তু, আঙ্কেল,’ রবিন বলল, ‘ইতিমধ্যেই যদি ওরা জেনে গিয়ে থাকে আপনার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক আছে, তাহলে আপনার সহযোগিতা নিতে রাজি হবে না ওরা।’
‘ভুলে যাচ্ছ,’ রাশেদ পাশা বললেন, ‘আমরা এখনও জানিই না কে আমাদের আসল শত্রু, কে তোমাদের ওপর ডার্ট ছুড়েছিল। ওটিনো? অ্যাংলার? গিনেস? নাকি অন্য কেউ?’
‘সব কজন ওরা একই দলের সদস্য হতে পারে,’ রবিন বলল।
‘তা পারে,’ মাথা দোলাল কিশোর। ‘কিংবা এমনও হতে পারে, কোনোভাবে জাহাজঘাটায় অ্যাংলারের সঙ্গে পরিচয় হয়ে গিয়েছিল গিনেসের। কথায় কথায় জেনে ফেলেছিল মেডেলটার কথা।’
‘এ সম্ভাবনাটাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না,’ রাশেদ পাশা বললেন। ‘এমনও হতে পারে গিনেসই কুসংস্কারের গল্পটা বানিয়ে বলে অ্যাংলারকে ভয় দেখিয়েছে, যাতে মেডেলটা ওকে দিয়ে দেওয়া হয়।’
লস অ্যাঞ্জেলেসে গিয়ে ব্যর্থ তদন্ত করে আসার কথা চাচাকে জানাল কিশোর। তারপর রবিন জিজ্ঞেস করল, ‘আঙ্কেল, গিনেস কোথায় আছে, কিছু অনুমান করতে পারেন?’
‘হয়তো পারি। শিওর হওয়ার জন্য লস অ্যাঞ্জেলেসে একজনকে ফোন করতে হবে। সে লস অ্যাঞ্জেলেসে খুঁজুক। তবে আমার কী মনে হয় জানো?’
‘কী?’
‘এখানে, এই রকি বিচেই রয়েছে গিনেস।’
‘কী করে বুঝলে?’
‘আমার দৃঢ়বিশ্বাস, অ্যাংলার আর গিনেস একসঙ্গে কাজ করছে। গিনেসই বস। এখানে ওর সহকারীর কাজ কতখানি এগোল দেখতে এসেছে।’
পরদিন সকালে লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে একটা রেজিস্ট্রি করা চিঠি এসে হাজির হলো কিশোরের নামে। নাশতার টেবিলে বসে আছে কিশোর, রবিন, আর রাশেদ পাশা। কম্পিউটারে টাইপ করা চিঠিটা পড়ল কিশোর। রাশেদ পাশার দিকে মুখ তুলল। ‘তোমার বন্ধু মিস্টার হ্যামলিন, চাচা। তিরটা পরীক্ষা করতে পাঠিয়েছিলাম। তার জবাব এসেছে।’
‘কী লিখেছেন?’ রবিন জানতে চাইল।
‘লিখেছেন, এ রকম করে তির বানায় দক্ষিণ আমেরিকান ইণ্ডিয়ানরা। খাটো দণ্ড আর ছোট ফলার কারণে নিশানা খুব ভালো হয় এগুলোর। উত্তর আমেরিকার আদিবাসীদের মধ্যে এ জিনিস কখনই দেখা যায় না।’
‘এ কারণেই ব্র্যাড আঙ্কেল চিনতে পারেননি জিনিসটা,’ রবিন বলল।
‘কোন ধরনের ব্লোগান থেকে এটা ছোড়া হয়েছে, তা-ও জানিয়েছেন মিস্টার হ্যামলিন,’ কিশোর বলল। ‘আমাযন জঙ্গলের ইণ্ডিয়ানরা সাত ফুট লম্বা যেসব ব্লোগান ব্যবহার করে তার চেয়ে এই গানগুলো অনেক খাটো।’
‘হুঁ, এতক্ষণে বুঝলাম,’ মাথা দুলিয়ে রবিন বলল, ‘কেন মাত্র এক ঝলক দেখেছিলাম ব্লোগানটা। বড় হলে লুকাতে পারত না। ছোট বলেই ছোড়ার পরপর শার্টের নিচে লুকিয়ে ফেলেছে। আর কী লিখেছেন মিস্টার হ্যামলিন?’
‘মিস্টার হ্যামলিন লিখেছেন,’ কিশোর বলল, ‘নলখাগড়া কিংবা লোহাকাঠ দিয়ে এসব ব্লোগান বানায় দক্ষিণ আমেরিকার ইণ্ডিয়ানরা। লোহার শিক পুড়িয়ে লাল করে ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়ে ছিদ্র করে। এর সাহায্যে পঞ্চাশ-ষাট গজ দূর থেকেও নিখুঁত লক্ষ্যে ডার্ট ছুড়ে মারতে পারে।’
অবাক হয়ে ভাবতে লাগল রবিন, ওদের শত্রুরা কি আসলেই গুয়াতেমালার লোক, নাকি দক্ষিণ আমেরিকান ইণ্ডিয়ান কিংবা স্প্যানিশ আর ইণ্ডিয়ান রক্তের মিশ্রণ?
নীরবে সব কথা শুনছিলেন এতক্ষণ মেরি চাচি। এসব মারাত্মক অস্ত্রের কথা শুনে ঘাবড়ে গেলেন। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এ কেস থেকে সরে দাঁড়ানোর হুকুম দিলেন রবিন ও কিশোরকে।
কোন সময় আবার মেরি চাচির কথায় তদন্ত ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় এই ভয়ে তাড়াতাড়ি পালানোর জন্য রবিন বলল, ‘বিডদের বাড়ি যেতে হবে এখন। এই কিশোর, চলো চলো, ওঠো।’
বিডদের বাড়িতে পৌঁছে দেখে ডাকবাক্স থেকে চিঠিপত্র বের করছে বিড।
‘কোনো খবর আছে?’ রবিন জিজ্ঞেস করল। ‘নতুন করে হুমকি-টুমকি দিয়েছে আর?’
হাসল বিড। মাথা নাড়ল। ‘নাহ, নেই। তোমাদের কথাই ভাবছিলাম। এসে ভালো করেছ। বড় টেনশনে ছিলাম, কী না কী ঘটে যায়।’
‘আমাদের কাছে যা খবর আছে, শুনলে টেনশন নয়, ঘাবড়ে যাবে,’ ঘরের দিকে যেতে যেতে রবিন বলল।
বসার ঘরে ঢুকে সোফায় বসল তিনজন। রাতের বেলা ওকে আটকে ফেলে কিভাবে মেডেলটা কেড়ে নিয়েছে সবিস্তারে জানাল রবিন। তারপর বলল, ‘বিড, মাপ করে দাও ভাই, তোমার মেডেলটা বাঁচাতে পারলাম না।’
‘গেছে গেছে, কী আর করা,’ বিড বলল। ‘যা যা লেখা ছিল সেটা তো মুখস্থ করে নিতে পেরেছ। এতক্ষণে বোঝা গেল, ওটিনো কেন...’
কথা শেষ হলো না ওর। ঝনঝন করে ভেঙে গেল জানালার কাঁচ।
‘এই, কে কে!’ চিত্কার করে উঠল রবিন। তাকিয়ে আছে দেয়ালে আঘাত হেনে কার্পেটের ওপর পড়ে যাওয়া তিরটার দিকে। ‘ঠিক এ রকম জিনিসই আমাকে লক্ষ্য করেও ছোড়া হয়েছিল।’
‘নোটও বাঁধা দেখা যাচ্ছে!’ বলতে বলতে গিয়ে জিনিসটা তুলে নিল কিশোর।
‘নোটটা কাকে দিয়েছে?’ কিশোরের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল বিড। ‘তোমাদেরকে না আমাকে?’
‘মনে তো হচ্ছে আমাদেরকেই,’ নোটটার দিকে তাকিয়ে থেকে জবাব দিল কিশোর। ‘প্রিন্ট করে লিখেছে, বাঁচতে চাইলে তোমাদের গোয়েন্দাগিরি বন্ধ করো।’
তিরটা দেখার সঙ্গে সঙ্গে সামনের দরজা দিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে গিয়েছিল রবিন। বারান্দায় দাঁড়িয়ে ব্লোগানধারীর খোঁজে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে, ওর পাশে এসে দাঁড়াল অন্য দুজন।
‘দেরি করে ফেলেছি,’ রবিন বলল। ‘চলে গেছে।’
‘জানালাটা ওই দিকে,’ বোঝার চেষ্টা করছে কিশোর। ‘তার মানে তিরটা এসেছে রাস্তার ওপাশের ওই জংলা জায়গাটার দিক থেকে। লোকটা ওখানে লুকিয়েই তিরটা ছুড়েছে।’
জংলা জায়গাটার কাছে টেলিফোনের একজন লাইনম্যান পিকআপ ট্রাকের ওপর দাঁড়িয়ে কাজ করছে। ওর কাছে ছুটে এল গোয়েন্দারা। ব্লোগানধারী কাউকে দেখেছে কি না জিজ্ঞেস করল।
‘ব্লোগান!’ লোকটা অবাক। ‘সেটা আবার কী জিনিস?’
বোঝানো সহজ হবে না, তাই কিশোর জিজ্ঞেস করল, ‘কয়েক মিনিটের মধ্যে কাউকে সন্দেহজনকভাবে এদিকে ঘোরাফেরা করতে দেখেছেন?’
ভেবে জবাব দিল লোকটা, ‘হ্যাঁ, তা দেখছি। ওই দিকের জঙ্গলের মধ্য দিয়ে দৌড়ে চলে গেল।’
‘দেখতে কেমন?’
‘ছোটখাটো। রোগাটে। কালো গোঁফ।’
যা বোঝার বুঝে নিল তিন গোয়েন্দা। এ লোকটা সেই লোক, যে প্রথম তিরটা ছুড়ে মেরেছিল ওদের দিকে। বিমানবন্দরে যাওয়ার পথে রবিনের ওপর যারা হামলা চালিয়েছিল, এ লোকটা তাদের একজন হওয়াও বিচিত্র নয়। তবে ও ওটিনো না গিনেস, প্রশ্নটা থেকেই যাচ্ছে।
লাইনম্যানকে ধন্যবাদ দিল কিশোর। ঘরে ফিরে চলল আবার তিনজন।
ভাঙা জানালাটার কাচের মাপ নিল বিড।
‘আঙ্কেলের ধারণাই কি তাহলে ঠিক?’ কিশোরের দিকে তাকাল রবিন। ‘গিনেস লোকটা রকি বিচেই আছে, আর সে-ও ব্লোগান ছুড়তে পারে?’
‘আমার তো সে রকমই মনে হচ্ছে।’ জবাবটা দিল বিড। কিশোর ও রবিনকে ঘর পাহারা দিতে বসিয়ে রেখে হার্ডওয়্যারের দোকান থেকে কাচ কিনে আনতে চলে গেল।
শিগগির কাচ নিয়ে ফিরে এল ও। সেটা জানালায় বসাতে সাহায্য করল কিশোর ও রবিন। লাগানো হয়ে গেলে, কিভাবে ব্লোগানধারীকে ধরা যায় সেটা নিয়ে আলোচনা করতে লাগল তিনজন।
‘সারা গায়ে বর্ম না পরে আর বেরোচ্ছি না,’ রসিকতা করল কিশোর। ‘রকি বিচের রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে ব্লোগানধারী শিকারি।’
অনেক আলোচনা করেও লোকটাকে খুঁজে পাওয়ার কোনো উপায় বের করতে পারল না ওরা। শেষে রাস্তায় রাস্তায় খুঁজে বেড়ানোর পরামর্শ দিল বিড। ‘খড়ের গাদায় সুচ খোঁজা হবে’— মন্তব্য করল কিশোর। তবে আর কিছু করারও নেই। বেরিয়ে পড়ল ওরা। কথা হলো, তিনজন তিন দিকে যাবে। ঘোরাঘুরি শেষ করে একটা নির্দিষ্ট সময়ে ওদের বাড়ির কাছের রিগান মার্কেটের গেটে এসে অপেক্ষা করবে। সেখানেই আবার দেখা হবে তিনজনের।
ঘুরতে ঘুরতে একটা বাজারের পাশ দিয়ে যাচ্ছে কিশোর, এই সময় দেখে ছোটখাটো কালো গোঁফওয়ালা একটা লোক এগিয়ে আসছে।
কিশোরকে দেখেই চিনে ফেলল লোকটা। মুহূর্তে ঘুরে দাঁড়িয়ে দৌড়ে চলে গেল বিল্ডিংয়ের আড়ালে।
কিশোরও দৌড় দিল। অন্য পাশে এসে লোকটাকে দেখতে পেল না আর। রাস্তার ওপারে একটা বাড়ি। তার মনে হলো ও বাড়িতেই ঢুকেছে লোকটা। এছাড়া এত তাড়াতাড়ি আর লুকানোর কোনো জায়গা দেখা যাচ্ছে না আশপাশে।
সর্তক হয়ে উঠল ওর গোয়েন্দা মন। এ মুহূর্তে কী করছে লোকটা? আড়াল থেকে ওর ওপর নজর রাখছে? খেপে গিয়ে মারাত্মক বিষ মাখানো ডার্ট কিংবা তির ছুড়ে মারবে না তো?

বারো
ব্লোগানধারীর ডার্ট থেকে বাঁচার জন্য মাথা নিচুু করে একছুটে একটা গাড়ির আড়ালে চলে এল কিশোর। একটু অপেক্ষা করে আবার দৌড়, চলে এল আরেকটা বড় গাড়ির আড়ালে। এখানে মোটামুটি নিরাপদ। লোকটা যেখানে থাকতে পারে সন্দেহ করছে ও, ওখান থেকে ডার্ট ছুড়ে লাগাতে পারবে না।
‘কিশোর, কী করছ?’ কিশোরকে চমকে দিয়ে কানের কাছে বেজে উঠল একটা পরিচিত কণ্ঠ। ‘লুকোচুরি খেলছ নাকি?’
ফিরে তাকাল কিশোর। ‘ও, মুসা! জলদি মাথা নামাও। এসো এদিকে।’
কিশোরের কাছে চলে এল মুসা। কী ঘটেছে, জানাল কিশোর। থানায় গিয়ে খবর দিতে বলল মুসাকে। ‘জলদি যাও। আমি এখানেই আছি।’
পরিস্থিতি বুঝে তর্ক করল না মুসা। এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে ছুটল।
বাড়িটার দরজার দিকে তাকিয়ে ঘাপটি মেরে বসে রইল কিশোর। মুহূর্তের জন্য চোখ সরাল না দরজার ওপর থেকে। মিনিটের পর মিনিট কেটে যাচ্ছে। বেরোচ্ছে না লোকটা। পুলিশ নিয়ে মুসাও আসছে না। কী হলো ওর?
হাল ছেড়ে দিতে বসেছে যখন কিশোর, ঠিক তখন শোনা গেল পুলিশের গাড়ির সাইরেন। মার্কেটের মোড় ঘুরে বেরোতে দেখা গেল একটা গাড়িকে। লাফ দিয়ে উঠে গাড়ির আড়াল থেকে দৌড়ে বেরিয়ে গেল কিশোর। পুলিশের গাড়ির দিকে ছুটল।
গাড়িতে বসা অফিসারকে চেনে ও। অফিসার পল নিউম্যান। উত্তেজিত কণ্ঠে তাকে সব জানাল কিশোর। কোন বাড়িটায় লুকিয়েছে লোকটা, হাত তুলে দেখাল। তারপর বলল, ‘খুব সাবধান, আঙ্কেল। লোকটার কাছে বিষ মাখানো ডার্ট রয়েছে।’
অস্ত্র হাতে টপাটপ গাড়ি থেকে লাফিয়ে নামল চারজন পুলিশম্যান। অফিসারও নামলেন ওদের সঙ্গে। বাড়ির পপছন দিকে চলে যেতে বললেন দুজন সহকারীকে, যাতে পেছনের দরজা দিয়ে পালাতে না পারে লোকটা। দুজন পুলিশম্যান দৌড়ে চলে গেল পেছন দিকে। বাকি দুজনকে নিয়ে সামনের দরজা দিয়ে বাড়িতে ঢুকলেন অফিসার নিউম্যান। মুসার সঙ্গে কিশোর বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগল।
পুলিশ দেখে ভিড় জমাতে শুরু করল লোকজন। একটু পরে বাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন অফিসার। কিশোরকে জানালেন, ‘পেলাম না তো। তুমি যে রকম গোঁফওয়ালা লোকের কথা বললে, ও রকম কোনো লোকই নেই বাড়িতে। ওটা বোর্ডিং হাউস। ম্যানেজারকে জিজ্ঞেস করেছি। ও রকম গোঁফওয়ালা কেউ নাকি ওর বোর্ডিংয়ে নেই।’
বাড়ির পেছনে যারা গেছে, তাদেরকে ডেকে নিয়ে আসতে বললেন অফিসার। একজন পুলিশম্যান চলে গেল ডাকতে।
কিশোর ভীষণ হতাশ। ওর মাথায়ই ঢুকছে না, লোকটা কোন দিক দিয়ে পালাল।
পুলিশ চলে গেলে মুসাকে বলল কিশোর, ‘লোকটা যে ও বাড়িতে নেই, এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না আমার।’ হঠাত্ বুদ্ধি ঝিলিক দিয়ে উঠল ওর মগজে। ‘এক কাজ করা যাক।’
‘কী?’
‘চলে যাওয়ার ভান করি। বাড়ির পেছন দিয়ে ঘুরে অন্য পাশ দিয়ে বেরিয়ে এসে লুকিয়ে থাকি।’
‘তাতে লাভটা কী?’
‘লোকটা নজর রেখেছে এদিকে। আমরা অন্যদিক দিয়ে বেরোলে সেদিকে তাকানোর কথা ভাববে না ও। আমরা চলে গেছি ভেবে বেরিয়ে আসতেও পারে তখন।’
বুদ্ধিটা মুসারও পছন্দ হলো। হাঁটতে শুরু করল দুজন। দ্রুত বাড়ির পেছন ঘুরে অন্যপাশ দিয়ে বেরিয়ে একটা ছোট কফি হাউসের আড়ালে এসে দাঁড়াল। চোখ রাখল বাড়িটার ওপর।
সময় কাটছে। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে অস্থির হয়ে উঠল মুসা।
‘কিশোর, তোমার কি এখনও ধারণা লোকটা বাড়ির ভেতরেই আছে?’ পকেট থেকে চিউয়িং গাম বের করে মোড়ক ছাড়াতে শুরু করল ও। এতক্ষণ যে চিবানো বন্ধ রেখেছে সেটাই বেশি। ‘আধা ঘণ্টা তো হয়ে গেল।’
দরজার ওপর থেকে চোখ সরাল না কিশোর। জবাব দিল, ‘গোয়েন্দার অস্থির হতে নেই। থাকি না এখানে। কতক্ষণ না বেরিয়ে থাকতে পারবে ও।’
আরও দশ মিনিট পেরিয়ে গেল। রবিন আর বিডের কথা ভাবল কিশোর। ওরা নিশ্চয় খোঁজা শেষ করে এতক্ষণে মার্কেটের গেটে চলে এসেছে। ওর দেরি দেখলে দুশ্চিন্তা করবে।
‘মুসা!’ আচমকা বলে উঠল কিশোর। ‘ওই যে...বেরোচ্ছে!’
ছোটখাটো একজন মানুষকে সামনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসতে দেখা গেল।
‘কিন্তু গোঁফ কই?’ মুসার প্রশ্ন। ‘তোমার বর্ণনার সাথে লোকটার সবই মিলছে, কেবল গোঁফটা বাদে।’
‘গোঁফ কামাতে কতক্ষণ? পোশাক বদলানোও কঠিন নয়। এই লোকই যে সেই লোক, যার পিছু নিয়েছিলাম, কোনো সন্দেহ নেই আমার। এসো।’
‘কী করব?’
‘ওর পিছু নেব,’ কিশোর বলল। ‘ও ভেবেছে মস্ত ফাঁকি দিয়েছে আমাদের। আমরা চলে গেছি। দেখছ না, কোনো রকম সতর্কতা নেই। কোনো দিকে তাকাচ্ছে না।’
বেশ খানিকটা দূরত্ব রেখে লোকটাকে অনুসরণ করে চলল দুজন।
একটা হার্ডওয়্যারের দোকানে ঢুকল লোকটা।
‘শোনো,’ ফিসফিস করে মুসাকে বলল কিশোর, ‘ও তোমাকে চেনে না। কী কিনতে ঢুকেছে দেখে এসো তো।’
একটা থামের আড়ালে সরে গেল কিশোর। মুসা দোকানের দিকে এগোল।
খানিক পরেই হন্তদন্ত হয়ে ফিরে এল ও। উত্তেজিত হয়ে বলল, ‘কী কিনছে বুঝলাম না। তবে দোকানদার ওকে ওটিনো বলে ডাকছিল। এই নামে ডাকতে শুনেই চলে এলাম তোমাকে জানাতে।’
‘বললাম না!’ উত্তেজিত হয়ে উঠল কিশোরও, ‘আমার সন্দেহই ঠিক।’
একটা দুধের গাড়ি এসে দাঁড়াল ওদের সামনে। তাতে আড়াল পাওয়া গেল। দোকানের দিকে তাকিয়ে রইল ওরা। খানিক বাদেই দোকান থেকে বেরোতে দেখা গেল ওটিনোকে। এদিক-ওদিক তাকাল একবার। দুধের গাড়িটার জন্য কিশোর আর মুসাকে দেখতে পেল না ও। ধীরেসুস্থে সিঁড়ি বেয়ে নেমে হেঁটে চলল।
‘তুমি আবার দোকানে যাও,’ মুসাকে বলল কিশোর। ‘কায়দা করে দোকানদারের কাছ থেকে ওটিনো সম্পর্কে কিছু জানতে পারো নাকি দেখো।’
‘তুমি?’
‘আমি ওর পিছু নিচ্ছি।’
‘তোমার সঙ্গে কোথায় দেখা করব?’
‘রিগান মার্কেটের বারান্দায়।’
মুসা চলে গেল। আবার ওটিনোর পিছু নিল কিশোর।
আগের বাড়িটাতেই ফিরে গেল ওটিনো। বাড়িতে ঢুকে সিঁড়ির গোড়ার ডাকবাক্স থেকে কয়েকটা চিঠি বের করে নিয়ে শান্ত ভঙ্গিতে উঠে গেল সিঁড়ি বেয়ে। কোনো তাড়াহুড়া নেই। কেউ যে ওর পিছু নিতে পারে, মাথায়ই আসছে না যেন। ব্যাপারটা অবাক করল কিশোরকে। কোথায় যেন কী একটা খটকা আছে। ভুল লোককে অনুসরণ করছে না তো? কিন্তু মুসা তো নিজের কানে শুনে এসেছে, লোকটাকে ‘ওটিনো’ বলে ডাকছিল দোকানদার।
এটাই লোকটার বাসা, সন্দেহ নেই কিশোরের। অফিসার নিউম্যান যখন বাড়িতে ঢুকেছিলেন, লোকটা তখন কোথায় ছিল?
প্রশ্নটার কোনো জবাব বের করতে পারল না কিশোর। ফিরে চলল রিগান মার্কেটে।
রবিন আর বিড এসে দাঁড়িয়ে আছে মার্কেটের গেটে।
‘কী ব্যাপার? কিছু হয়েছে নাকি?’ জিজ্ঞেস করল রবিন।
সব কথা খুলে বলল কিশোর। মুসাও এসে হাজির হলো। জানাল, ‘ওটিনোই। পুরো নাম রিটো ওটিনো। লোকটাকে চেনে দোকানদার। অনেক দিন ধরে নাকি আছে ওই বোর্ডিং হাউসে। ওর দোকান থেকে জিনিস কেনে। পোর্টে কাজ করে। গোঁফের কথা জিজ্ঞেস করলাম। শুনে দোকানদার অবাক। বলল, কোনো দিন ওটিনোকে গোঁফ রাখতে দেখেনি ও।’
‘তবে কি ভুল করলাম?’ আনমনে বিড়বিড় করল কিশোর। তারপর মাথা নাড়ল, ‘উঁহু, ভুল হতেই পারে না। অবিকল এক চেহারা। ওটিনোর সঙ্গে ব্লোগানধারীর কিছু একটা সম্পর্ক অবশ্যই আছে!’
চিন্তিত ভঙ্গিতে রবিন বলল, ‘আমার মনে হয় গোঁফটা ওর আসল গোঁফ নয়। ছদ্মবেশ নেওয়ার জন্য পরে...’ হঠাত্ কথাটা মনে পড়তেই থেমে গেল ও। জ্বলজ্বল করে উঠল চোখ। ‘আচ্ছা, লোকটার কোনো যমজ ভাই নেই তো?’
‘ঠিক!’ বিড বলল। ‘পুলিশ যখন খুঁজছিল ওকে, ও বাড়িতেই লুকিয়ে ছিল ভাইটা। কোনোভাবে ফাঁকি দিয়েছে পুলিশকে।’
‘সেটাই তো বুঝতে পারছি না, কিভাবে ফাঁকিটা দিল,’ কিশোর বলল।
রবিনের দিকে তাকাল কিশোর। ‘চলো, বাড়ি যাই। চাচার সঙ্গে কথা বলে দেখি। প্রয়োজন হলে জেসনকেও বাড়ির ওপর সারাক্ষণ নজর রাখার জন্য পাঠানো যাবে।’
‘আমি আর তোমাদের সঙ্গে যেতে পারছি না,’ মুসা বলল। ‘বাড়ি যেতে হবে। কাজ আছে।’
বিড জানাল, সে-ও যেতে পারবে না। তারও কাজ আছে। মুসার সঙ্গে চলে গেল সে-ও। কিশোরদের সঙ্গে থাকতে না পারায় দুজনই হতাশ।
বাড়ি ফিরে এল দুই গোয়েন্দা। রাশেদ পাশাকে সব জানাল। জেসনকে ডেকে বুঝিয়ে দেওয়া হলো কী করতে হবে। রাশেদ পাশার সহকারী জেসন উইলকিনস। বেতন দিয়ে রাখা হয়েছে। দেরি না করে নির্দেশ পালন করতে বেরিয়ে গেল ও।
রাশেদ পাশা বললেন, ‘ইমিগ্রেশনেও খবর নিতে হবে। কিছুদিনের মধ্যে ওটিনো নামে বিদেশি কোনো লোক রকি বিচে ঢুকেছে কি না জানা দরকার। তোমরাও বসে না থেকে বোর্ডিং হাউসে গিয়ে ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলো। রিটো ওটিনো সম্পর্কে যতটা পারো জানার চেষ্টা করো।’
রিটোর সঙ্গে সহজেই দেখা করা গেল। ম্যানেজারই দেখা করিয়ে দিল। দুই গোয়েন্দাকে নিজের ঘরে নিয়ে গেল ওটিনো। চমত্কার কাজ করা মেহগনি কাঠের আসবাবপত্র দেখে মুগ্ধ হলো কিশোর ও রবিন। কাঠের তৈরি সুন্দর কয়েকটা মূর্তিও সাজানো আছে।
কথা বের করার ছুতোয় জিজ্ঞেস করল রবিন, ‘খুব সুন্দর। দেশ থেকে এনেছেন নাকি?’
প্রশংসা শুনে খুশি হলো ওটিনো। এক মুহূর্ত দ্বিধা না করে জবাব দিল, ‘হ্যাঁ।’ গর্ব করে বলল, ‘সবচেয়ে দামি মেহগনি কাঠ দিয়ে তৈরি।’ ওর কথায় কোনো রকম জড়তা নেই।
‘কোথায় আপনার দেশ?’ জানতে চাইল কিশোর।
‘গুয়াতেমালা।’
চট করে পরস্পরের দিকে তাকাল দুই গোয়েন্দা। ছাইয়ের কথা ভাবছে দুজন। মেহগনি গাছের কাঠপোড়া ছাই। যে গাছের জন্ম মধ্য আমেরিকার কোনো দেশে।
‘এ শহরে কোনো আত্মীয় আছে আপনার?’ কিশোর জিজ্ঞেস করল। ‘ভাইটাই?’
চোয়াল কঠিন হয়ে গেল লোকটার। মুহূর্তের জন্য হাসিটা মিলিয়ে গিয়ে ফিরে এল আবার। ‘নাহ্, এ দেশে আমার আত্মীয় বলতে কেউ নেই। আমি একা।’
ওটিনোকে ধন্যবাদ দিয়ে বেরিয়ে এল দুই গোয়েন্দা।
‘এত খাটাখাটনি করে কোনো লাভ হলো না। যে অন্ধকারে ছিলাম সেখানেই রয়ে গেলাম,’ হতাশ কণ্ঠে বলল কিশোর। ‘রবিন, ওটিনোকে আমার কিন্তু ভালো লোক বলেই মনে হলো। ও আমাদের ব্লোগানধারী নয়।’
একমত হয়ে মাথা ঝাঁকাল রবিন। ‘রাশেদ আঙ্কেলই এখন একমাত্র ভরসা। দেখি বাড়ি গিয়ে, তিনি নতুন কিছু জানতে পারলেন কি না।’
ছেলেরা বাড়িতে ঢুকতেই ওদেরকে বসার ঘরে ডেকে নিয়ে গেলেন রাশেদ পাশা। জানালেন, ‘গত এক বছরের ইমিগ্রেশনের তালিকায় ওটিনো নামে কেউ নেই। যারা ঢুকেছে রকি বিচে, তাদের কাউকে সন্দেহজনকও মনে হয়নি।’
‘তার মানে লোকটা অবৈধ পথে ঢুকেছে,’ রবিন বলল।
‘তাছাড়া আর কী। কিভাবে ঢুকেছে, ওক ধরতে না পারলে জানা যাবে না।’
টেবিলে খাবার দেওয়া হয়েছে, মেরি চাচি জানিয়ে গেলেন।
রাতের খাওয়ার পর আবার আলোচনায় বসল গোয়েন্দারা। ওটিনো প্রসঙ্গ নিয়ে খানিক আলোচনার পর রাশেদ পাশা বললেন, ‘জেসনই এখন ভরসা। ও কী খবর নিয়ে আসে দেখা যাক। অকারণে বসে থেকে রাত করে লাভ নেই। ঘুমাও গিয়ে।’
সকাল সকালই শুয়ে পড়ল কিশোর ও রবিন। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠলও তাই তাড়াতাড়ি। ঘর থেকে বেরোতে না বেরোতেই নিজের বেডরুমের দরজা থেকে উঁকি দিলেন মেরি চাচি, ‘কিশোর, তোমাকে চায়। মুসার গলা মনে হলো।’
তাড়াহুড়া করে গিয়ে ফোন ধরল কিশোর। এক্সটেনশন রিসিভার। ‘হ্যালো! কিশোর বলছি।’
‘কিশোর!’ আতঙ্কিত শোনাল মুসার কণ্ঠ। ‘এই মাত্র হুমকি দেওয়া একটা চিঠি পেলাম। ছাইও ফেলে গেছে। চিঠিতে লিখেছে, অভিশপ্তদের তালিকায় এখন তোমার নামও উঠে গেল! অতএব সাবধান!’ কঁকিয়ে উঠল ও, ‘কিশোর, আমি এখন কী করি!’

তেরো
মুসাকে শান্ত থাকতে বলল কিশোর। আপাতত বাড়ি থেকে একা বেরোতে নিষেধ করে দিল।
‘আর বেরোই বাড়ি থেকে?’ মুসা বলল। ‘আস্ত মুরগির লোভ দেখালেও না।’
লাইন কেটে দিয়ে সবে ঘর থেকে বেরিয়েছে কিশোর, জানালা দিয়ে রবিন দেখল, একটা ছেলে ওদের ডাকবাক্সে একটা চিঠি ফেলে দিয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেল। ঘর থেকে ছুটে বেরোল রবিন। ছেলেটাকে ধরতে পারবে না বুঝে আর সে চেষ্টা করল না। চিঠিটা বের করল বাক্স থেকে। ওপরে কিশোর ও রবিনের নাম লেখা।
চিঠিটা খুলে ভুরু কুঁচকে ওটার দিকে এক মুহূর্ত তাকাল ও। তারপর দৌড়ে ঢুকল ঘরে। চিত্কার করে ডাকতে লাগল, ‘আঙ্কেল, দেখে যান। কিশোর, তুমিও এসো।’
বারান্দায় বেরিয়ে এল কিশোর ও রাশেদ পাশা।
খামের মধ্যে ছাই। সেই সাথে একটা প্রিন্ট করা চিঠি। তাতে লেখা, কিশোর-রবিন, তোমাদের বন্ধু বিড ও মুসাকে সাবধান করে দিয়েছি। তোমাদেরও করছি। এবারই শেষ। এর পরও যদি পেছনে লাগো, আর কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না বলে দিলাম।
ছাইগুলো দেখতে দেখতে কিশোর বলল, ‘এগুলো মাইক্রোটোমে পরীক্ষা করার দরকার হবে না। জানি কী জিনিস। মধ্য আমেরিকান মেহগনি কাঠের ছাই।’
কী যেন ভাবছেন রাশেদ পাশা।
‘কী ভাবছ, চাচা?’ কিশোর জিজ্ঞেস করল। ‘তুমি কিছু বলছ না যে?’
‘আমার মনে হয় আবার একবার ওটিনোর বোর্ডিং হাউসে যাওয়া দরকার,’ রাশেদ পাশা বললেন। ‘আমি নিজে একবার দেখা করতে চাই ওর সঙ্গে।’
আবার ওটিনোর বোর্ডিংয়ে চলল দুই গোয়েন্দা। সঙ্গে এবার রাশেদ পাশা।
যে কফি হাউসের আড়ালে দাঁড়িয়ে বাড়ির ওপর নজর রেখেছিল কিশোর ও মুসা, ওটাতে টুলে বসা দেখা গেল জেসনকে। রাশেদ পাশার গাড়িটা চিনতে পেরে উঠে এল। জানাল, মুহূর্তের জন্য নড়েনি ও। কিন্তু কালো গোঁফওয়ালা লোকটাকে ঢুকতেও দেখেনি, বেরোতেও না।
গাড়ি রেখে বোর্ডিং হাউসে ঢুকল কিশোর, রবিন ও রাশেদ পাশা। ম্যানেজারকে চাচার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল কিশোর। রাশেদ পাশা বললেন, ‘ওটিনোর সঙ্গে দেখা করব।’
‘আসুন।’
ঘরেই আছে ওটিনো। রাশেদ পাশা নিজের পরিচয় দিয়ে কঠিন কণ্ঠে বললেন, ‘ফালতু কথা বলার সময় নেই আমার। যা জিজ্ঞেস করব সঠিক জবাব দেবেন।’
ভয় পেয়ে গেল ওটিনো। ‘কিন্তু কিশোরকে তো সবই বলেছি আমি।’
গত কয়েক দিনের কথা বিস্তারিত বললেন রাশেদ পাশা। ফ্যাকাশে হয়ে গেল ওটিনোর মুখ। রাশেদ পাশার কথা শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় চুপ করে থাকল ও। তারপর বলল, ‘আপনারা যাকে খুঁজছেন আমি সেই লোক নই। তবে কিছু তথ্য গোপন করেছি কিশোরদের কাছে। এখন বুঝতে পারছি, কাজটা ঠিক করিনি।’
‘বলুন।’
‘কালো গোঁফওয়ালা যাকে খুঁজছেন আপনারা,’ ওটিনোর মুখে বেদনার ছাপ, ‘সে আমার ভাই। আমাদের বংশের কলঙ্ক। আমাদের ছয় ভাইবোনের মধ্যে কেউই ওর মতো খারাপ হয়নি।’
‘কী নাম ওর?’ জানতে চাইলেন রাশেদ পাশা।
‘গ্যাটো ওটিনো।’
‘এখন কোথায়?’
‘জানি না। তবে দিন কয়েক আমার এখানেই ছিল।’
কিশোরের দিকে তাকাল রবিন। ‘কালো গোঁফ রহস্যের সমাধান হলো অবশেষে।’
‘চোরাপথে অবৈধভাবে এ দেশে ঢুকেছে গ্যাটো,’ ওটিনো জানাল। ‘অনেক বকাবকি করেছি আমি। গতকাল আমাকে কথা দিয়েছে গুয়াতেমালায় ফিরে যাবে। সে কারণেই কাল পুলিশের হাতে ধরিয়ে দিইনি। আমি হার্ডওয়্যারের দোকান থেকে ফিরে এসে দেখি ও নেই। চলে গেছে। বিশ্বাস করুন, ও যে এত কিছু ঘটিয়ে বেড়াচ্ছে, কল্পনাই করিনি। তাহলে জায়গা দিতাম না।’
‘আর কি কিছু বলার আছে আপনার?’ রাশেদ পাশা জিজ্ঞেস করলেন। ‘আজ আর কিছু গোপন করছেন না তো?’
চিন্তিত ভঙ্গিতে জবাব দিল ওটিনো, ‘না, আর তো কিছু মনে পড়ছে না। তবে মেহগনি কাঠের তৈরি গোটা দুয়েক পুতুল চুরি হয়েছে আমার ঘর থেকে। গ্যাটোই নিয়েছে নিশ্চয়। আর কে নিতে আসবে ওগুলো?’
মেহগনি কাঠের সঙ্গে গুয়াতেমালার কোনো কুসংস্কার কিংবা উপকথা জড়িত আছে কি না জানতে চাইল গোয়েন্দারা। মধ্য আমেরিকায় আছে একটা কুসংস্কার, জানাল ওটিনো। ‘মেহগনি কাঠের ছাই যদি কেউ শত্রুর কাছে পাঠায়,’ বলল ও, ‘শত্রু শক্তিহীন হয়ে পড়ে, প্রেরকের আর কোনো ক্ষতি করতে পারে না।’
ভুরুকুটি করল কিশোর। ‘কী অদ্ভুত বিশ্বাস!’
আর কিছু জানানোর নেই ওটিনোর। ওকে ধন্যবাদ দিয়ে বেরিয়ে এল গোয়েন্দারা। ফুটপাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে ছাই পাঠানোর ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করতে লাগল দুই গোয়েন্দা।
‘ভাইয়ের পুতুল চুরি করে ওগুলো পুড়িয়েই ছাই পাঠিয়েছে আমাদের কাছে গ্যাটো ওটিনো,’ কিশোর বলল।
‘কিন্তু তাহলে মুরগির হাড় পোড়ানো ছাই পাঠাল কেন? মুরগির হাড়ের সঙ্গেও কোনো কুসংস্কার জড়িত কি না এ কথাটা জিজ্ঞেস করতে মনে ছিল না ওর ভাইকে,’ রবিন বলল। ‘এমন হতে পারে, ওই সময় গ্যাটোর কাছে মেহগনি ছিল না, তাই হাড় পুড়িয়েই ছাই পাঠিয়েছে। ভেবেছে, পরিবর্তনটা ধরতে পারব না আমরা।’
গাড়ির গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল জেসন, ওদের দেখে সোজা হয়ে দাঁড়াল। রাশেদ পাশা ওকে বাড়িটার ওপর আগের মতোই নজর রাখতে বললেন।
বাড়ি ফিরল গোয়েন্দারা।
দেখেই বলে উঠলেন মেরি চাচি, ‘কিশোর, বিড ফোন করেছিল।’
‘কেন? কিছু বলেছে?’ কিশোর জানতে চাইল।
‘না, কিছু তো বলেনি। বলেছে, তোমরা আসামাত্র যেন ওর ওখানে চলে যাও।’
‘নিশ্চয় আবার কিছু ঘটেছে!’ কিশোরের দিকে তাকাল রবিন। ‘একটা ফোন করব নাকি?’
মাথা কাত করল কিশোর, ‘করো।’
বিডের জরুরি তলবের কারণ জানা গেল। ওর জমা দেওয়া কিউরিওগুলোর মধ্যে যেগুলো মিউজিয়ামের দরকার নেই ওগুলো ফেরত নিয়ে আসতে অনুরোধ করেছেন মিউজিয়ামের কিউরেটর মিস্টার ব্র্যাডম্যান। সাহায্য করার জন্য কিশোর আর রবিনকে যেতে বলল বিড।
দুপুরের খাওয়ার দেরি হয়ে গেছে এমনিতেই। না খেয়ে আর বেরোনো যাবে না। খেয়েই বেরোল দুই গোয়েন্দা। বিডদের বাড়িতে চলল।
ছোট পিকআপ ট্রাকটা নিয়ে ওদের অপেক্ষাতেই বসে ছিল বিড। ওরা উঠতেই গাড়ি ছেড়ে দিল।
রবিন বলল, ‘মুসাকে সঙ্গে নিলে কেমন হয়?’
‘মন্দ হয় না,’ বিড বলল। ‘নিশ্চয় বাড়িতে একা বসে থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে গেছে বেচারা। অভিশাপের ভয়ে ঘর থেকেই বেরোয়নি হয়তো।’
বারান্দায় মন খারাপ করে বসে ছিল মুসা। ওদের দেখে খুব খুশি। গাড়িতে ওঠার কথা দ্বিতীয়বার বলতে হলো না ওকে। এমনকি রসিকতা করে রবিন যখন বলল, বোঝা বওয়ানোর জন্য ওর হাতির মতো শরীরটাকে ব্যবহার করা হবে, তখনও কিছু মনে করল না ও। পারিশ্রমিক হিসেবে শুধু কয়েক প্যাকেট চিপস দাবি করল। বিডের তাতে আপত্তি নেই। বলল, ‘কুলিকে দিলে চিপসের দামের চেয়ে বেশি পয়সা দিতে হতো।’ এ ধরনের অপমানজনক কথাতেও কিছু মনে করল না মুসা। হাসাহাসি চলল।
মিউজিয়ামে পৌঁছে দেখে বিডের দেওয়া কাটামুণ্ডুগুলো তাকের ওপর সাজাচ্ছেন মিস্টার ব্র্যাডম্যান। কোন কোন জিনিস রাখতে চান, তার একটা তালিকা দিলেন বিডকে। তারপর স্টোররুমের একটা চাবি বের করে দিয়ে বললেন বিডের জিনিসগুলো বের করে নিয়ে যেতে।
‘তোমাদের বাড়িতে রাখতে অসুবিধে হবে না তো আর?’ বিডকে জিজ্ঞেস করলেন তিনি।
‘না, তা হবে না,’ চাবিটা নিতে নিতে বলল বিড। ‘আমাদের চিলেকোঠায় রেখে দেব। আপনি যখন রাখছেন না, তার মানে ধরে নিচ্ছি কিউরিও হিসেবে খুব একটা মূল্য নেই এগুলোর। চোরের চোখ পড়বে না।’
চাবি নিয়ে স্টোররুমের দিকে চলল চার গোয়েন্দা। আবছা অন্ধকার বারান্দা ধরে এগোতে এগোতে তীক্ষ চিত্কার শুনে থমকে দাঁড়াল।
‘ব্র্যাড আঙ্কেল না?’ বলেই ঘুরে দৌড় দিল রবিন।
আবার শোনা গেল চিত্কার। অন্য তিনজনও রবিনের পেছনে ছুটল।
কিন্তু ঘরে ঢুকে মিস্টার ব্র্যাডম্যানকে দেখতে পেল না। ডাকাডাকি করেও তার কোনো সাড়া মিলল না। অফিসে উঁকি দিল গোয়েন্দারা। সেখানেও নেই তিনি।
খুঁজতে খুঁজতে তাঁকে পাওয়া গেল মমিঘরে। মেঝেতে বেহুঁশ হয়ে পড়ে আছেন। দৌড়ে গিয়ে তাঁকে ঘিরে বসল ছেলেরা।
‘রক্ত!’ চিত্কার করে উঠল বিড। ‘মাথায় বাড়ি মেরেছে!’
কিশোর লক্ষ করল, মিস্টার ব্র্যাডম্যানের পোশাকের সমস্ত পকেট হাতড়ানো হয়েছে। উল্টে বেরিয়ে আছে ভেতরের কাপড়। সহকারীদের দিকে তাকিয়ে জরুরি কণ্ঠে বলল কিশোর, ‘লোকটা নিশ্চয় এখনও মিউজিয়ামের ভেতরেই আছে। রবিন, তুমি আর বিড চলে যাও। ধরতে হবে ওকে। আমি আর মুসা ব্র্যাড আঙ্কেলের কাছে থাকছি। দরকার মনে করলে হাসপাতালে নিয়ে যাব।’
দৌড়ে চলে গেল রবিন আর বিড।
গাড়ি থেকে মুসাকে ফার্স্ট এইড কিট নিয়ে আসতে বলল কিশোর। দৌড়ে গিয়ে নিয়ে এল মুসা। দুজন মিলে মিস্টার ব্র্যাডম্যানের জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করতে লাগল।
ভাগ্য ভালো, আঘাতটা গুরুতর হয়নি। একটু পরেই গুঙিয়ে উঠলেন তিনি। ঠোঁট কাঁপল। হুঁশ ফেরার লক্ষণ।
বার কয়েক মিটমিট করে চোখের পাতা খুললেন তিনি। গুঙিয়ে উঠলেন আবার। ‘কী হয়েছে?’
‘চুপ করে শুয়ে থাকুন,’ কিশোর বলল। ‘নড়াচড়া করবেন না। ঠিক হয়ে যাবে।’
‘বেহুঁশ হয়ে গিয়েছিলাম, তাই না?’
‘হ্যাঁ। আমরা এসে দেখি মেঝেতে পড়ে আছেন।’
চোখ বুজলেন মিস্টার ব্র্যাডম্যান। অপেক্ষা করতে লাগল কিশোর ও মুসা।
কিছুক্ষণ পর আবার চোখ মেললেন মিস্টার ব্র্যাডম্যান।
‘কিছুটা ভালো মনে হচ্ছে এখন?’ জিজ্ঞেস করল কিশোর।
‘হ্যাঁ। মাথার ভেতরটা সাফ হয়ে আসছে।’ উঠে বসতে গেলেন মিস্টার ব্র্যাডম্যান। তাকে সাহায্য করল কিশোর আর মুসা। মাথার পাশের কাটা জায়গাটার রক্ত বন্ধ হয়ে গেছে।
উঠে দাঁড়ালেন মিস্টার ব্র্যাডম্যান। পুরোপুরি সুস্থ হতে পারেননি এখনও। পা কাঁপছে। ধরে ধরে তাকে অফিসে নিয়ে এল কিশোর ও মুসা। চেয়ারে বসিয়ে দিল।
‘হ্যাঁ, এবার বলুন, কী হয়েছিল?’ জিজ্ঞেস করল কিশোর। ‘কথা বলতে পারবেন? কষ্ট হবে না তো?’
‘পারব,’ মিস্টার ব্র্যাডম্যান বললেন। ‘তোমরা চাবি নিয়ে চলে যাওয়ার পর একটা শব্দ কানে এল। মনে হলো মমিঘরে হেঁটে বেড়াচ্ছে কেউ। তোমরা গেছ উল্টো দিকে। তার মানে অন্য কেউ। দেখতে গেলাম।’
‘দেখেছেন লোকটাকে?’ মুসা জিজ্ঞেস করল।
‘হ্যাঁ। মুখোশ পরা একটা লোককে দেখলাম। আমাকে দেখেই ধমক দিয়ে বলল, চিকসাপিকো মেডেলটা দিয়ে দিতে।’
‘তারপর?’ জানার জন্য তর সইছে না কিশোরের।
‘আমি বললাম, ও রকম কোনো মেডেলের কথা আমি জানি না। আমার মিউজিয়ামে নেই। বিশ্বাস করল না লোকটা। একটা পাথরের পুতুল তুলে নিয়ে বাড়ি মারতে এল আমাকে। মেডেলটা কোথায় আছে না বললে মাথা ফাটিয়ে দেবে বলল। আর কোনো উপায় না দেখে চিত্কার শুরু করলাম। বাড়ি মারল লোকটা। তারপর আর কিছু মনে নেই।’
‘লোকটা দেখতে কেমন?’ জানতে চাইল কিশোর।
‘ছোটখাটো, রোগাটে শরীর। মাথায় কালো চুল।’
শিস দিয়ে উঠল কিশোর। ‘আমাদের সেই ব্লোগানওয়ালা।’
‘তার মানে ভাইকে মিথ্যে কথা বলেছে,’ মুসা বলল। ‘গুয়াতেমালায় ফিরে যায়নি গ্যাটো ওটিনো।’
মাথা ঝাঁকাল কিশোর। মিস্টার ব্র্যাডম্যানের টেবিলে রাখা টেলিফোনের দিকে হাত বাড়াল। ফোন করল থানায়। অফিসে পাওয়া গেল চিফ ক্যাপ্টেন ইয়ান ফ্লেচারকে।
‘তোমরা থাকো ওখানে। এক্ষুনি আসছি,’ পুলিশ চিফ বললেন।
ইতিমধ্যে মিউজিয়ামের বেশির ভাগ জায়গাই চষে ফেলেছে রবিন ও বিড। কিন্তু রহস্যময় হামলাকারীর কোনো চিহ্নই চোখে পড়েনি। আরও কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজি করে আবার মমিঘরে ফিরে এল ওরা।
মিস্টার ব্র্যাডম্যান, কিশোর কিংবা মুসাকে দেখল না। ওরা তখন মিস্টার ব্র্যাডম্যানের অফিসে। সেদিকে পা বাড়াতে যাবে, হঠাত্ মেঝেতে চোখ পড়ল রবিনের। একটা জিনিস পড়ে আছে। উবু হয়ে তুলে নিল ওটা। হাতের তালুতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখতে দেখতে উত্তেজিত কণ্ঠে বলে উঠল, ‘বিড, গুয়াতেমালান মুদ্রা!’

চোদ্দ
ছুটতে ছুটতে অফিসে এসে ঢুকল দুজন।
মুদ্রাটা সবাইকে দেখাল রবিন।
মিস্টার ব্র্যাডম্যান জানালেন, তার মিউজিয়ামের জিনিস নয় এটা। নিশ্চয় হামলাকারীর পকেট থেকে পড়েছে।
‘বিডের কিউরিওগুলো দেখা দরকার,’ রবিন বলল। ‘লোকটা ওটিনো হয়ে থাকলে ওই জিনিসগুলোর পেছনেই লেগেছে।’
তাড়াহুড়া করে অফিস থেকে বেরিয়ে এল ওরা। গ্যালারিতে ঢুকল যেখানে সাজানো আছে পুরনো বাদ্যযন্ত্র আর নানা রকম গয়না। ছাদের আলোটা জ্বালা হলো। স্তব্ধ হয়ে গেল সবাই। নিখুঁতভাবে একটা বাক্সের কাঁচ খুলে ফেলা হয়েছে। ভেতরে রাখা আংটি, চুড়ি, হার, কিছুই নেই, সব নিয়ে গেছে।
‘সর্বনাশ!’ চিত্কার করে উঠলেন মিস্টার ব্র্যাডম্যান। কাঁপতে শুরু করেছেন। ধরে ধরে নিয়ে তাকে একটা টুলে বসিয়ে দিল কিশোর।
এ সময় শোনা গেল সাইরেনের শব্দ। খানিক পরেই সামনের দরজার বেল বেজে উঠল।
‘পুলিশ!’ মুসা বলল।
‘চাবিটা নিয়ে যাও,’ কম্পিত কণ্ঠে মিস্টার ব্র্যাডম্যান বললেন। ‘খুলে দাও।’
সঙ্গে দুজন পুলিশম্যান নিয়ে ঘরে ঢুকলেন চিফ ক্যাপ্টেন ইয়ান ফ্লেচার। চুরির খবর জানানো হলো তাকে। পুরো বাড়িটা তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখল পুলিশ। চোরকে পাওয়া গেল না। বেরিয়ে গেছে। ক্যাপ্টেন ইয়ান ফ্লেচার বললেন, ‘লোক রেখে যাচ্ছি। চব্বিশ ঘণ্টা পাহারার ব্যবস্থা থাকবে। চুরি যাওয়া জিনিসগুলোও উদ্ধারের সাধ্যমতো চেষ্টা করা হবে।’ একজন কনস্টেবলকে বললেন, ‘ফ্রেডি, তুমি থাকো।’
ফ্রেডিকে একটা বাড়তি চাবি বের করে দিলেন মিস্টার ব্র্যাডম্যান, যাতে যখন-তখন মিউজিয়ামে ঢুকে টহল দিতে পারে ও। বিডকে বললেন, ‘অন্য সময় এসে তোমার জিনিসগুলো নিয়ে যেয়ো।’
একমাত্র ফ্রেডি বাদে মিউজিয়াম থেকে বেরিয়ে এল সবাই।
পরদিন সকালে আবার রিটো ওটিনোর সঙ্গে কথা বলতে যাবে ঠিক করল কিশোর ও রবিন। ভাইয়ের কোনো খবর পেয়েছে কি না জিজ্ঞেস করবে লোকটাকে।
‘আমার ভাই?’ মাথা নাড়ল রিটো। ‘উঁহু। সেদিন তোমরা এসে আমার সঙ্গে কথা বলে যাবার পর আর যোগাযোগ করেনি।’
‘এখানে আর কোনো ঝামেলায় জড়িয়েছে কি না, কিছু বলেছিল আপনার ভাই?’ কিশোর জানতে চাইল।
একটা মুহূর্ত চিন্তা করল রিটো। ‘নাহ্, তেমন কোনো ঝামেলার কথা বলেনি, তবে গুপ্তধনের কথা কী যেন বলছিল। কোথাও লুকানো আছে সে গুপ্তধন। কান দিইনি। আমার কোনো আগ্রহ নেই ওসবে।’
‘লুকানো গুপ্তধন!’ কান খাড়া হয়ে গেছে কিশোরের। ‘কোনো মেডেল-টেডেলের কথা বলেছিল?’
‘মেডেল?’ ভুরু কোঁচকাল রিটো। ‘না। দেখো, আমার এসব ভালো লাগছে না। পুরো ব্যাপারটা নিয়েই আমি খুব বিব্রত বোধ করছি।’
রিটোকে আর বিরক্ত না করে বেরিয়ে এল দুই গোয়েন্দা। বাকি দিনটা কী করে কাটাবে ভাবছে।
‘এক কাজ করা যাক,’ রবিন বলল। ‘বিডের কিউরিওগুলোর মধ্যে চিকসাপিকো মেডেলটা খুঁজি, চলো। আমার বিশ্বাস, ওটা খুঁজতেই মিউজিয়ামে গিয়েছিল গ্যাটো ওটিনো।’
‘হ্যাঁ, চলো,’ কিশোর বলল। ‘মুসা আর বিডকেও সঙ্গে নেওয়া যাক। ব্র্যাড আঙ্কেল যেসব কিউরিও রাখতে আগ্রহী নন, সেগুলোও নিয়ে আসা দরকার।’
বেলা দুটোর দিকে মিউজিয়ামে পৌঁছল চার গোয়েন্দা। মিস্টার ব্র্যাডম্যানের কপালে এখনও ব্যাণ্ডেজ। ছেলেদের দেখে হাসলেন। বিডের বাক্সগুলোর কাছে নিয়ে চললেন ওদের। ‘আজ আর কোনো অঘটন ঘটবে না আশা করি।’
মাটির নিচের ঘরে নামল ওরা। মেডেল খোঁজার কাজে লেগে গেল। প্রতিটি জিনিস খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। যেটা দেখা হয়ে যাচ্ছে, রেখে দিচ্ছে আলাদা বাক্সে। ঘণ্টাখানেক পর ভরে উঠল বাক্সটা, কিন্তু মেডেলের খোঁজ নেই।
মেহগনি কাঠের তৈরি একটা বল তুলে নিল মুসা। জিনিসটা চকচকে পালিশ করা, মসৃণ। হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে লাগল ও। বলের মাঝামাঝি অতি সূক্ষ্ম একটা দাগ চোখে পড়ল। পুরো বলটাকে মাঝামাঝি ঘিরে রেখেছে। জোড়া লাগানো। টান দিয়ে খোলার চেষ্টা করতে যেতেই হাত থেকে পড়ে গেল বলটা। মেঝেতে গড়াতে গড়াতে গিয়ে কয়েকটা বাক্সের ফাঁকে ঢুকল।
‘আর কাজ পেলে না,’ খোঁচা দিয়ে বলল রবিন। ‘এ সময় বল খেলা শুরু করলে।’
‘বল খেলে কে?’ গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দিল মুসা। ‘খুলতে যাচ্ছিলাম...’ বলটা বের করে আনল ও। হাত থেকে পড়ে যাওয়ায় বাড়ি লেগে অনেকখানি ফাঁক হয়ে গেছে ওপরের দিকটা। বোঝা গেল, ওটা ঢাকনা। টান দিতেই খুলে এল। ভেতরে নীল মখমলের ওপর রাখা চকচকে একটা জিনিস।
বলের দুটো অংশ দুই হাতে নিয়ে বিকট চিত্কার করে উঠল ও, ‘এই দেখো! দেখে যাও তোমরা! জলদি এসো!’
কী দেখে এত উত্তেজিত হয়েছে মুসা দেখার জন্য ছুটে এল সবাই।
‘পেয়েছি! পেয়েছি!’ প্রায় নাচতে আরম্ভ করে দিল মুসা। ‘অন্য মেডেলটা পেয়ে গেছি!’
মেহগনি কাঠের তৈরি বলের নিচের অর্ধেকটাতে নীল মখমলের বিছানায় শুয়ে আছে চমত্কার একটা মেডেল। দুই আঙুলে টিপে ধরে সাবধানে তুলে নিল ওটা কিশোর। সবাইকে দেখিয়ে বলল, ‘এই সূত্রটাই দিয়েছিল আমাদেরকে গ্রোভ অ্যাংলার। এই যে, চিকসাপিকো লেখা রয়েছে।’
তীক্ষ দৃষ্টিতে দেখতে দেখতে রবিন বলল, ‘এটাতেও সেই অদ্ভুত বিচিত্র রেখা খোদাই করা, চুরি হয়ে যাওয়া মেডেলটাতে যে রকম ছিল।’
আস্তে করে বলের মধ্যে আবার আগের জায়গায় মেডেলটা রেখে দিল কিশোর। বিডকে বলল, ‘বাড়ি নিয়ে গিয়ে ভালোমতো পরীক্ষা করে দেখব। চাচাকেও দেখাব।’
‘নাও,’ বিড বলল। ‘তবে খুব সাবধান। প্রথম মেডেলটার কারণে রবিনের কী দশা হয়েছিল ভুলে যেয়ো না।’
মিস্টার ব্র্যাডম্যানের কাছে মূল্যহীন কিউরিওগুলো বাড়ি নিয়ে গেল বিড। সঙ্গে কিশোর ও রবিন। বিডকে পৌঁছে দিয়ে নিজেদের বাড়িতে ফিরে এল ওরা। চাচাকে বল আর মেডেলটা দেখাল কিশোর। তারপর সেগুলো নিয়ে নিজেদের ব্যক্তিগত ল্যাবরেটরিতে ঢুকে পরীক্ষা করতে বসল।
বলটা এক ধরনের বাক্স। মেডেলটা রাখার জন্যই তৈরি করা হয়েছে।
প্রথম মেডেলটাতে যেসব রেখা আঁকা ছিল, মনে রেখেছিল কিশোর, কম্পিউটারে এঁকে নিল সেগুলো। তারপর দ্বিতীয়টাতে আঁকা রেখাগুলোও আঁকল প্রথমগুলোর পাশে। নাড়াচাড়া করে এদিক-ওদিক সরিয়ে মিলাতেই তৈরি হয়ে গেল একটা নকশা।
‘গুপ্তধনের নকশা,’ কিশোর বলল। ‘এটাই খুঁজে বেড়াচ্ছে গ্যাটো ওটিনো, এখন আমি নিশ্চিত।’
‘আর নকশার যেখানে উপল পাথরটা বসানো, ঠিক সেখানেই রয়েছে গুপ্তধন,’ রবিন বলল। ‘আমার ধারণা, শুধু অলংকরণ করার জন্য পাথরটা বসানো হয়নি মেডেলে। ইস্, জায়গাটা যদি খুঁজে বের করতে পারতাম।’
‘কী করে করবে?’ ভুরু নাচাল কিশোর। ‘চিকসাপিকোতে রয়েছে সেই গুপ্তধন, যে জায়গার কোনো চিহ্নই নেই ম্যাপে।’
‘অনেক জায়গারই আঞ্চলিক নাম থাকে, যেগুলো ম্যাপে লেখা থাকে না,’ রাশেদ পাশা বললেন। ‘জায়গাটা কোথায়, অন্য কোনোভাবে জানার চেষ্টা করতে হবে। আপাতত নকশাটা মুখস্থ করে নিয়ে কম্পিউটার থেকে ডিলিট করে দাও। মেডেলটা দাও, আমার আলমারিতে রেখে দেব।’
নকশাটা বারবার এঁকে ভালো করে মুখস্থ করে নিল দুই গোয়েন্দা। তারপর কম্পিউটার থেকে মুছে ফেলল যাতে শত্রুপক্ষের চোখে না পড়ে।
‘আমি ভাবছি,’ রাশেদ পাশা বললেন, ‘মেডেলে আঁকা নকশার কথা গ্রোভ অ্যাংলার জানে কি না। খাঁটি সোনার তৈরি জিনিস। এগুলোর মূল্য ও ভালো করেই জানে। বিড জেনে গেলে যদি বিক্রি করতে রাজি না হয়, সেজন্য এগুলোর কোনো দাম নেই বলে মিথ্যে কথা বলেছে বিডের কাছে।’
‘অ্যাংলারকে পেলে এখন ভালো হতো,’ কিশোর বলল। ‘ওকে জিজ্ঞেস করতে পারতাম জানে কি না।’
‘জানলেই কি স্বীকার করবে?’
মেডেলটা আবার বলের মধ্যে ভরে নিজের স্টাডিতে ফাইল-সেফে রেখে দিলেন রাশেদ পাশা। এরপর মেডেল রহস্য নিয়ে আলোচনা করতে লাগলেন কিশোর ও রবিনের সঙ্গে।
‘আমি জানি ম্যাপে চিকসাপিকো খোঁজা বাকি রাখোনি তোমরা,’ রাশেদ পাশা বললেন। ‘তার পরও, আমি আরেকবার চেষ্টা করে দেখতে চাই।’ টেলিফোনের দিকে হাত বাড়ালেন তিনি।
গোয়েন্দাগিরির সুবাদে প্রচুর লোকজনের সঙ্গে তার জানাশোনা। বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে ফোনে কথা বলতে লাগলেন। কিন্তু কেউ কিছু জানাতে পারল না। চিকসাপিকো নামটা একেবারেই অপরিচিত সবার কাছে।

পনেরো
সেদিন রাতে খাবার টেবিলে চিকসাপিকো নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, মেরি চাচি স্বামীকে বললেন, ‘এক কাজ করো না, আমার বান্ধবী জুডিথ ক্রেইগকে ফোন করো। দু-তিন দিন হলো ওর স্বামী একটা অভিযান থেকে ফিরেছে।’
মধ্য আমেরিকার এক দুর্গম অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক অভিযানে গিয়েছিলেন মিস্টার ক্রেইগ, রাশেদ পাশা জানেন। উত্তেজিত হয়ে বললেন, ‘তাই তো, ঠিকই তো বলেছ! এখনি ফোন করছি।’ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দমে গেলেন তিনি, ‘কিন্তু এত রাতে কারও বাড়িতে ফোন করাটা কি ঠিক?’
‘রাত তেমন হয়নি,’ মেরি চাচি বললেন। ‘তাছাড়া ক্রেইগের কাছে এখন তো মোটে সন্ধ্যা। সারারাত জেগে থাকে, বই পড়ে আর লেখালেখি করে কাটায়। ঠিক আছে, আমিই জুডিথকে ফোন করছি।’
বান্ধবীকে ফোন করলেন মেরি চাচি। তারপর রিসিভারটা স্বামীর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘নাও, কথা বলো।’
সব শুনে এতটাই উত্তেজিত হয়ে উঠলেন মিস্টার ক্রেইগ, বললেন, ‘এখনি আসছি! আপনারা শুতে যাবেন না কিন্তু।’
ফোন নামিয়ে রেখে মুচকি হাসলেন রাশেদ পাশা। ‘আমাদের চেয়ে তার আগ্রহই তো বেশি মনে হচ্ছে।’
মেরি চাচিও হাসলেন, ‘বললাম না!’
বসার ঘরে এসে ক্রেইগের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল সবাই। মেরি চাচি আর জেসনও আছে। বাইরে আবহাওয়া ভালো না। আকাশে মেঘ। থেকে থেকে বিদ্যুত্ চমকাচ্ছে। মেঘের গুড়ুগুড়ু। ঝড় শুরু হওয়ার আগেই উঠে গিয়ে সমস্ত জানালা বন্ধ করে দিয়ে এলেন চাচি, শুধু ঘরের যে পাশটায় নিজেরা বসেছেন, সেদিকের জানালাটা ছাড়া। সব বন্ধ করে দিলে ঘরে দম আটকানো অবস্থা হয়ে যাবে। ফিরে এসে তিনি বসতে না বসতেই আচমকা বাতাস ছাড়ল। তীব্র বাতাসের ঝাপটায় দড়াম করে বাড়ি খেল জানালার পাল্লা।
ঝড়-তুফানের মধ্যেই এসে হাজির হলেন ক্রেইগ। বয়স পঞ্চাশ। সুগঠিত কষ্টসহিষ্ণু দেহ। রেইনকোট খুলে রেখে হাত মেলালেন সবার সঙ্গে। সোফায় বসলেন।
মেরি চাচির দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, ‘আপনাদের সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছে বহুদিনের। আপনার বান্ধবীর মুখে এত প্রশংসা শুনেছি আপনাদের!’
‘দেখা আর করবেন কী করে?’ হেসেই জবাব দিলেন মেরি চাচি। ‘বাড়িতেই তো থাকেন না।’
‘তা ঠিক। এই তো, দু দিন আগে এলাম গুয়াতেমালা থেকে। আবার চলে যাব আগামী মাসে।’
‘গুয়াতেমালা থেকে!’ চোখ বড় বড় হয়ে গেছে কিশোরের। ‘একেই বলে কপাল! তার মানে এ মুহূর্তে ঠিক আপনার মতো একজনকেই আমাদের প্রয়োজন ছিল।’
জানার জন্য আর তর সইছে না রবিনের। ভূমিকায় গিয়ে সময় নষ্ট না করে সরাসরি জিজ্ঞেস করল, ‘চিকসাপিকোর নাম শুনেছেন?’
বিকট শব্দে বাজ পড়ল। চমকে দিল সবাইকে। আওয়াজ কমলে মিস্টার ক্রেইগ বললেন, ‘চিকসাপিকো! আশ্চর্য! এ নাম তোমরা জানলে কিভাবে?’
‘তার মানে আপনি জানেন?’ আগ্রহে গলা বাড়িয়ে দিল কিশোর। ‘কোথায় ওটা?’
এক এক করে সবার মুখের দিকে তাকালেন মিস্টার ক্রেইগ। নজরটা ফিরে এসে থামল আবার কিশোরের ওপর। ‘গুয়াতেমালায় গেছ কখনও?’
একযোগে মাথা নাড়ল ঘরের সবাই। কেউই যায়নি।
মিস্টার ক্রেইগ বললেন, ‘মেক্সিকোর ঠিক নিচে, প্রশান্ত মহাসাগর থেকে শুরু করে আটলাণ্টিক মহাসাগরের উপকূল ঘেঁষে ছড়িয়ে আছে একটা দেশ। রুক্ষ উঁচুনিচুু টিলাটক্কর, গিরিখাত, পাহাড়-পর্বত আর আগ্নেয়গিরিতে ভরা। বাসিন্দাদের বেশির ভাগ ইণ্ডিয়ান। বেশ কিছু পুরাকীর্তি রয়েছে ওখানে, প্রাচীন সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ। পাথরে তৈরি এমন কিছু মন্দির রয়েছে, যেগুলোর গায়ের অলংকরণ দেখলে চোখ সরাতে পারবে না, মুগ্ধ বিস্ময়ে তাকিয়েই থাকবে শুধু। গভীর জঙ্গলের মধ্যে, যেখানে বাড়িঘর থাকার কথা কল্পনাই করবে না কেউ, সেখানেও মন্দির আর গুপ্তপ্রাসাদের গুজব শোনা যায়। বহুকাল আগে নাকি হারিয়ে গেছে ওগুলো। মাটির নিচে তলিয়ে গেছে।’
আবার বাজ পড়ল বিকট শব্দে। মুষলধারে বৃষ্টি। ঝোড়ো বাতাসে ক্রমাগত জানালার শার্সিতে আঘাত হেনে চলেছে বৃষ্টির ফোঁটা।
‘একটা দারুণ শহর এই গুয়াতেমালা,’ আগের কথার খেই ধরে বললেন মিস্টার ক্রেইগ। ‘যেদিকেই তাকানো যাক, শুধু রং আর রং, রঙের ছড়াছড়ি। যেন ওপর থেকে রঙের ড্রাম উপুড় করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। শহরের পুরনো এলাকাগুলোতে গেলে দেখা যাবে বহু পুরনো ইটের রাস্তা। হালকা নীল কিংবা সাদা রং করা বাড়িঘর, লাল রঙের চালা। প্রতিটি বাড়ির সামনেই বাগান। ফুলের রং চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। আর পার্কগুলো তো মনে হয় ছবি।’
‘চিকসাপিকোটা কোনখানে?’ মোলায়েম স্বরে জিজ্ঞেস করলেন রাশেদ পাশা।
‘ও, হ্যাঁ, তাই তো। আসল কথা বাদ দিয়ে বক্তৃতা শুরু করেছি,’ মিস্টার ক্রেইগ হাসলেন, কেমন বোকা বোকা দেখাল হাসিটা।
গভীর আগ্রহ নিয়ে অভিযাত্রীর দিকে তাকিয়ে রয়েছে শ্রোতারা।
‘গুয়াতেমালা শহর থেকে বেশ কয়েক মাইল দূরে একটা জায়গা আছে, দেখলে রহস্যময় এক রূপকথার দেশ মনে হয়। সেখানে বাস করে কুলকুল ইণ্ডিয়ান নামে ইণ্ডিয়ানদের ছোট্ট একটা গোত্র। চিকসাপিকো নামটা তাদেরই দেওয়া।’
‘তার মানে চিকসাপিকো নামে সত্যি একটা জায়গা আছে?’ জানার জন্য তর সইছে না রবিনের।
‘হ্যাঁ, কুলকুলরা বলে আছে,’ মাথা ঝাঁকালেন মিস্টার ক্রেইগ। ‘জায়গাটার কথা ওখানে অনেক শুনেছি আমি, বহু গুজব শুনেছি। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় গুজব যেটা, তা হলো ওখানে নাকি বিশাল এক গুপ্তধনের ভাণ্ডার লুকানো রয়েছে।’ কিশোর-রবিনের মুখ হাঁ হয়ে যেতে দেখে মুচকি হাসলেন তিনি। ‘চিকসাপিকো সম্পর্কে তথ্য জানার বহু চেষ্টা করেছি আমি। কিন্তু জিজ্ঞেস করলেই চুপ হয়ে যায় ইণ্ডিয়ানরা, মুখে খিল এঁটে দেয়। ওদের এই রহস্যময় আচরণই প্রমাণ করে, গুজবটা মিথ্যে নয়। গুপ্তধন সত্যিই লুকানো আছে।’
দম নেওয়ার জন্য থামলেন মিস্টার ক্রেইগ।
অধীর হয়ে অপেক্ষা করছে সবাই।
‘গুপ্তধন লুকানো আছে, আপনি কি শিওর?’ জিজ্ঞেস না করে আর পারলেন না রাশেদ পাশা।
‘আছে,’ জোর দিয়ে বললেন মিস্টার ক্রেইগ। ‘আমাদের মতো অভিযাত্রীদের অনুমান বলতে পারেন একে।’
‘আর অভিজ্ঞ অভিযাত্রীর অনুমান বেশির ভাগ সময়েই মিথ্যে হয় না,’ কথার পিঠে বলল কিশোর। ‘শুধু এই অনুমানের ওপর নির্ভর করেই পৃথিবীর অনেক বড় বড় প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার সম্ভব হয়েছে।’
‘ঠিক!’ একমত হয়ে মাথা ঝাঁকালেন মিস্টার ক্রেইগ।
‘গুপ্তধন লুট হয়ে যাওয়ার ভয়েই নিশ্চয় মুখ খোলে না কুলকুলরা, তাই না?’ জিজ্ঞেস করল কিশোর।
‘হ্যাঁ,’ আবারও মাথা ঝাঁকালেন মিস্টার ক্রেইগ।
চোখ চকচক করে উঠল রবিনের। ‘ইস্, যদি দেখতে পারতাম ওগুলো।’
মেরি চাচি বললেন, ‘থাক, আর অত লোভের দরকার নেই। দেখতে গেলেই খুন করবে কুলকুল ইণ্ডিয়ানরা।’
হাসিমুখে মিস্টার ক্রেইগ জানালেন, ‘না, করবে না। গুয়াতেমালার ইণ্ডিয়ানরা মোটেও ভয়ঙ্কর নয়, বরং নিরীহ স্বভাবের। কিন্তু ওদের মুখ থেকে গুপ্তধনের কথা আদায় করা যায় না কোনোমতেই। ওই গুপ্তধনের কথা জিজ্ঞেস করলেই চুপ করে যায়, মুখে একেবারে খিল এঁটে ফেলে। যাই হোক, ওখানকার বেশির ভাগ ইণ্ডিয়ান ভালো হলেও যেসব ছুটকা-ছাটকা ল্যাডিনোরা পর্বতে বাস করে, তাদের এড়িয়ে চলাই ভালো।’
‘ল্যাডিনো?’ ভুরু কোঁচকাল কিশোর।
‘ওরা স্প্যানিশভাষী মিশ্র প্রজাতির লোক,’ মিস্টার ক্রেইগ জানালেন। ‘সাধারণ ইণ্ডিয়ানদের মতো খেতখামারে কাজ করতে রাজি না, শ্রমিকের কাজ করতেও অনীহা, যেন জমিদারের বাচ্চা। দোকানদারি করে, রেস্টুরেন্ট চালায়, আর রাজনীতি করে বেড়ায়।’
কী যেন ভাবছিলেন রাশেদ পাশা। চিন্তিত ভঙ্গিতে মাথা দোলালেন। বললেন, ‘আচ্ছা, মিস্টার ক্রেইগ, গুয়াতেমালায় কি এমন কোনো গোপন দল বা সংগঠন আছে, যারা ইণ্ডিয়ানদের ওই গুপ্তধনের ব্যাপারে আগ্রহী?’
‘আছে,’ মিস্টার ক্রেইগ বললেন। ‘কিন্তু কোন ধরনের সংগঠনের কথা জানতে চান আপনি বুঝলাম না। রাজনৈতিক দল ব্যাঙের ছাতার মতো গজায় ওখানে। কিছুদিন বেশ শোরগোল তোলে, তারপর যেভাবে হঠাত্ আসে তেমনি হঠাত্ করেই হারিয়ে যায়। আচ্ছা, দাঁড়ান, জেনেই বলি। ইদানীং কোন দলটা বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে জানাটা কোনো ব্যাপার নয়। গুয়াতেমালা সিটিতে কালরুয়া নামে আমার একজন বন্ধু আছে, যার কাজ সরকারের পক্ষে থেকে এসব তদন্ত করে বেড়ানো। ওকে জিজ্ঞেস করলেই বলে দেবে। ফোনটা কোথায়?’
‘এত রাতে তাকে পাবেন?’ মেরি চাচি জিজ্ঞেস করলেন।
হাসলেন মিস্টার ক্রেইগ। ‘ওখানে এত রাত নয়। এখানকার চেয়ে তিন ঘণ্টা কম।’
মিস্টার ক্রেইগকে হলরুমে ফোনটা দেখিয়ে দিয়ে এল রবিন। সবার সঙ্গে অপেক্ষা করতে লাগল বসার ঘরে।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই ফিরে এলেন মিস্টার ক্রেইগ। আগের জায়গায় বসে হাসিমুখে জানালেন, ‘কালরুয়াকে পাওয়া গেছে। ও বলল, আরেকটা স্বদেশি দল গজানোর গুজব সরকারের কানে এসেছে, কিন্তু এখনও পুরোপুরি শিওর নয় সরকারের গুপ্তচর বিভাগ। তবে গুজব যখন শোনা গেছে, যেকোনো দিন রাস্তায় নেমে পড়তে পারে দলটা।’
কথা বলতে বলতেই বড় বড় হাই তুলতে লাগলেন মিস্টার ক্রেইগ। আচমকা সোফায় নেতিয়ে পড়লেন। অবাক লাগল সবার। কিন্তু মুহূর্ত পরেই কিশোর আর রবিন অনুভব করল, অকস্মাত্ ক্লান্তি লাগতে শুরু করেছে ওদের। ঘুম আসছে। টেনেও চোখের পাতা খুলে রাখতে পারছে না। ব্যাপারটা মোটেও স্বাভাবিক লাগল না ওদের কাছে।
বাকিরাও বাদ রইল না। রাশেদ পাশা, মেরি চাচি, জেসন— সবার চোখেই যেন একযোগে ঘুম নেমে আসতে লাগল। প্রথমে লুটিয়ে পড়লেন মিস্টার ক্রেইগ। তারপর কিশোর ও রবিন। রাশেদ পাশা বুঝতে পারলেন, বেহুঁশ হয়ে যাচ্ছে সবাই। বেহুঁশ হয়ে গেলেন মেরি চাচি, জেসন। আঁধার ঘনিয়ে এল রাশেদ পাশার চোখেও।
বাইরে ঝড়ের তাণ্ডব। ঘরের মধ্যে সবাই বেহুঁশ। মিনিট বিশেক নিথর হয়ে পড়ে থাকল ওরা। দিক পরিবর্তন করল বাতাস। একমাত্র খোলা জানালাটা দিয়ে ভেতরে এসে ঢুকতে লাগল বৃষ্টির ছাট।
জানালাটার সবচেয়ে কাছে বসেছে কিশোর। বৃষ্টিভেজা ঠাণ্ডা বাতাস এসে গায়ে ঝাপটা দিচ্ছে। ধীরে ধীরে হুঁশ ফিরতে লাগল ওর। চোখ মেলল। তন্দ্রালু ভাবটা যাচ্ছে না কোনোমতে। বহু কষ্টে টেনে তুলল নিজেকে। ঘোরের মধ্যে যেন তাকিয়ে দেখল আশপাশটা।
‘সবাই ঘুমিয়ে পড়ল!’ ভাবল ও। ‘ঘুম না অন্য কিছু?’
হঠাত্ই মাথায় ঢুকল ভয়ানক ভাবনাটা। বিষাক্ত কোনো খাবারের কারণে মারা পড়েনি তো সবাই। আতঙ্কিত হয়ে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াতে গেল ও। জোর পেল না পায়ে। টলতে টলতে একে একে সবার কাছে এসে নাড়ি দেখার পর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। সবাই বেঁচে আছে।
কিন্তু এই অদ্ভুত ঘটনার কারণটা কী? খাবারের জন্য হলে মিস্টার ক্রেইগের তো বেহুঁশ হবার কথা নয়। কারণ এ বাড়িতে কোনো কিছুই খাননি তিনি।
বিদ্যুত্ চমকের মতো জবাবটা ঢুকে গেল মাথায়। বিড়বিড় করল, ‘স্লিপিং গ্যাস! কিন্তু এল কোথা থেকে?’

ষোলো
কিছুটা সামলে নিয়ে খোলা জানালাটা বন্ধ করতে এগোল কিশোর। কাছে যাওয়ার পর লক্ষ করল, জানালার ফ্রেমে লাগানো তারের জালটা কেটে ফেলা হয়েছে। মেঝেতে পড়ে আছে কাটা তারের টুকরো। ওটার কাছে পড়ে আছে কয়েকটা নীল রঙের বল। টেনিস বলের চেয়ে ছোট। বলগুলো ভেতরে ফেলার জন্যই জাল কাটা হয়েছে।
একটা বল তুলে নিয়ে পরীক্ষা করে দেখল ও। বুঝতে পারল, এগুলো গ্যাস-বল। ছোট ছোট ফুটো করে দিয়েছে গ্যাস বেরিয়ে যাওয়ার জন্য।
কিন্তু এত কাছে থেকে লোকটার জাল কাটার শব্দ শুনল না কেন কেউ? নিশ্চয় ঝড়ের শব্দের জন্য। আর জাল কাটার সময় লোকটা কারও চোখে পড়েনি তার কারণ, মিস্টার ক্রেইগের গল্পে এতই মগ্ন ছিল সবাই, অন্য কোনো দিকে খেয়াল ছিল না।
পায়ের টলমল ভাব অনেকটা কেটেছে কিশোরের। চাচির পাশে গিয়ে বসল। হাতের তালু ডলে দিতে লাগল। মাঝে মাঝে আলতো চাপড় দিতে লাগল গালে। চোখের পাতা কেঁপে উঠল। কয়েকবার মিটমিট করে চোখ মেললেন মেরি চাচি। মিস্টার ক্রেইগকে বিড়বিড় করতে শুনল কিশোর। কিন্তু চোখ মেললেন না তিনি। বেহুঁশ অবস্থাতেই বিড়বিড় করছেন।
অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল কিশোর। এ সবই গ্যাসের প্রভাব— নিজেকে বোঝাল ও।
বাকি সবাইও নড়তে আরম্ভ করেছে। বিপদ কেটে গেছে, বুঝতে পারল কিশোর। আবার সজাগ হয়ে উঠল ওর গোয়েন্দা-মন। কে ছুড়েছে বলগুলো? মাটিতে পড়ে থাকা তারের জালটার কথা ভাবতেই বিদ্যুত্ চমকের মতো মনে এল প্রশ্নটা— গ্যাস-বল ছুড়েছে যে লোকটা সে এখন কোথায়? ওরা যখন বেহুঁশ, ওই সময় জানালা দিয়ে ঘরে ঢুকে পড়েনি তো?
পেয়ে গেল জবাব। সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসতে দেখল লোকটাকে। মুখোশ পরা। কিশোরকে দেখে চমকে গেল। এত তাড়াতাড়ি জ্ঞান ফিরবে ওদের, আশা করেনি বোধহয়। লাফাতে লাফাতে সিঁড়ির বাকি ধাপগুলো নেমে এসে দৌড় দিল সামনের দরজার দিকে।
কিশোরও ছুটল পেছনে। দরজার নবে হাত দিল লোকটা। মোচড় দেওয়ার আগেই ওর গায়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল কিশোর। লোকটাকে নিয়ে পড়ল মেঝেতে।
খানিক ধস্তাধস্তি করে আবার উঠে দাঁড়াল দুজন। দুই হাতে এলোপাতাড়ি ঘুসি মারতে লাগল লোকটা। একটা ঘুসি লাগল কিশোরের চোয়ালে। চামড়া কেটে রক্ত বেরিয়ে এল। কিশোরও ছাড়ল না। লোকটাকে কাবু করার চেষ্টা করতে লাগল।
এতক্ষণে হুঁশ ফিরল রবিনের। টলমল পায়ে উঠে দাঁড়িয়ে চারপাশে তাকাল। লোকটার সঙ্গে ধস্তাধস্তি করতে দেখল কিশোরকে। কেন, কী ঘটছে, কিছুই বুঝতে পারল না ও। মাথার ভেতরের ঘোলাটে ভাবটা যায়নি এখনও। ঝাড়া দিয়ে সেটা পরিষ্কার করার চেষ্টা করতে করতে ছুটল কিশোরকে সাহায্য করার জন্য।
দুজনের সঙ্গে পারল না লোকটা। কাবু হয়ে গেল। ওর মুখোশ টেনে খুলে ফেলল রবিন। সেই ব্লে¬াগানধারী!
‘আপনি গ্যাটো ওটিনো?’ চিত্কার করে উঠল কিশোর।
‘না!’ সরাসরি অস্বীকার করল লোকটা। ‘ওই নামে কাউকে চিনি না আমি।’
‘ওটিনো না হলে আপনি কে?’
‘বললাম তো আমি ওটিনো নই। ভুল করছ তোমরা। ছাড়ো আমাকে।’
‘ওটিনো হন বা না হন, আপনাকে ছাড়া হবে না। গ্যাস দিয়ে সবাইকে বেহুঁশ করে ঘরে ঢুকেছেন, নিশ্চয় কোনো কুমতলব ছিল আপনার। কেন ঢুকেছেন?’
‘কুমতলব থাকবে কেন? আসলে ভুল করে অন্য বাড়িতে ঢুকে পড়েছি।’
‘তা তো বটেই!’
লোকটার হাত পিঠের ওপর মুচড়ে ধরে রাখল কিশোর। আর পকেটগুলোতে খুঁজে দেখল রবিন। জানালার নিচে পড়ে থাকা বলগুলোর মতো একটা বল বেরোল এক পকেট থেকে। আরেক পকেট থেকে বেরোল ‘চিকসাপিকো’ লেখা মেডেলটা।
কঠিন কণ্ঠে কিশোর বলল, ‘এখনও বলবেন ভুল বাড়িতে ঢুকে পড়েছিলেন? সেফটা খুললেন কিভাবে?’
মিথ্যে বলে আর লাভ নেই বুঝে লোকটা জানাল, কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে তালা ভেঙেছে। কুড়ালটা ওই ঘরেই ফেলে এসেছে। তবে আর কোনো প্রশ্নের জবাব দিতে রাজি হলো না সে। নজর মেডেলটার দিকে।
কিভাবে লোকটার কাছ থেকে কথা আদায় করা যায় ভাবছে কিশোর। রবিনের হাতের বলটার ওপর চোখ পড়ল। লোকটাকে বলল, ‘আপনার নাকের কাছে ফাটাব এটা। কথা কী করে না বলেন, দেখব।’
এই হুমকিতে কাজ হলো। এতক্ষণে ভয় পেল লোকটা। ‘না না, বল ফাটিয়ো না! সব বলছি আমি! কী জানতে চাও?’
বসার ঘরে নিয়ে আসা হলো লোকটাকে। সবাই নড়াচড়া করছে। জ্ঞান ফিরে আসছে সবারই। কিশোর-রবিনের সঙ্গে লোকটাকে দেখে, ও কিভাবে ঘরে ঢুকেছে, শুনে অবাক।
লোকটার দিকে তাকিয়ে কিশোর বলল, ‘হ্যাঁ, এবার শুরু করুন আপনার কাহিনি।’
‘কোনখান থেকে শুরু করব?’ তিক্তকণ্ঠে জিজ্ঞেস করল লোকটা।
‘প্রথমে আপনার নাম।’
‘আমার নাম গ্যাটো ওটিনো,’ লোকটা বলল, ‘ঠিকই অনুমান করেছ তোমরা। গুয়াতেমালা থেকে এসেছি আমি। একটা অনুরোধ করছি, আমার ভাই রিটোকে কিছু বোলো না। সে এসবের কিছুই জানে না।’
‘কেন করছেন এসব?’ জানতে চাইলেন রাশেদ পাশা।
‘সেটা বলা যাবে না। আমাকে শুধু যেতে দিন। সোজা গিয়ে দেশের জাহাজে চাপব এখন আমি।’
‘কিন্তু এটা ছাড়া গিয়ে কী করবেন?’ মেডেলটা তুলে দেখাল রবিন। ‘খালি হাতে ফিরে গেলে বিপদে পড়বেন না?’
চুপ হয়ে গেল গ্যাটো। বুকের ওপর ঝুলে পড়ল মাথাটা। দীর্ঘ একটা মুহূর্ত ওভাবে থেকে অবশেষে মুখ তুলে তাকাল।
কে ওকে মেডেল চুরি করতে পাঠিয়েছে, জানতে চাইল কিশোর। লোকটা জানাল, ‘পুয়ের্তো গিনেস।’
‘গিনেসের সঙ্গে আপনার কী সম্পর্ক?’
‘আমরা দুজনই একটা স্বদেশি দলের সদস্য। গিনেস আমাদের নেতা।’
‘মেডেলটা দিয়ে কী করবেন?’
‘চিকসাপিকোর গুপ্তধন খুঁজে বেড়াচ্ছি আমরা। মেডেলটাতে রয়েছে তার নকশা। সে জন্যই এটা দরকার।’
‘আগে যে মেডেলটা কেড়ে নিয়েছিলেন, সেটা দিয়ে কী করবেন?’ জিজ্ঞেস করল রবিন।
অস্বীকার করল গ্যাটো। বলল, নেয়নি।
‘ঠিক আছে, পুলিশের কাছে যান, ওদের কাছেই এসব বলবেন,’ হুমকি দিলেন রাশেদ পাশা।

সতেরো
পুলিশকে ফোন করতে গেল কিশোর। ওপাশ থেকে ডিউটি অফিসার কথা বললে তাকে জানাল ও, ‘এবার আর ব্লোগানধারীর পিছু নিতে হয়নি আমাদের। সে নিজেই এসে বাড়িতে হাজির হয়েছে। আমাদের ধারণা, এই লোকই রবিনকে লক্ষ করে তীর ছুড়েছিল।’
বসার ঘর থেকে কিশোরের কথা শুনতে পেল গ্যাটো। প্রবল প্রতিবাদ জানাল ও। জোরে জোরে মাথা নাড়তে লাগল। ওর বক্তব্য, আজকের আগে সে রবিনকে দেখেইনি কখনও। বিডের কিউরিওগুলো কিনতে চাওয়ার কথা স্বীকার করল। কিন্তু ওদের বাড়ি থেকে তলোয়ার চুরি, ছাই ফেলে রেখে গিয়ে হুমকি দেওয়া, মিউজিয়ামে চুরি— এসব কোনোটাই করেনি বলে দাবি করল।
মাথা টিপে ধরে বসে আছেন মিস্টার ক্রেইগ। প্রচণ্ড মাথা ধরেছে। লোকটার কথা শোনার জন্য বসে ছিলেন এতক্ষণ। উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আমি এখন যাই।’ ছেলেদের বললেন, ‘গুয়াতেমালার যেকোনো তথ্য জানার দরকার হলে ডেকো আমাকে।’ রসিকতা করে বললেন, ‘তবে ডাকার আগে শিওর হয়ে নিয়ো, জানালার কাছে কেউ সি¬পিং গ্যাস নিয়ে ঘাপটি মেরে রয়েছে কি না।’
তাকে ধন্যবাদ দিলেন রাশেদ পাশা। দরজার বাইরে এগিয়ে দিলেন। মিস্টার ক্রেইগের গাড়িটা না ছাড়া পর্যন্ত দাঁড়িয়ে রইলেন ওখানে।
ঘরে ফিরে এসে ছেলেদের জানালেন, ‘গ্রোভ অ্যাংলার এখন এখানে থাকলে ভালো হতো। গ্যাটো ওটিনোর ব্যাপারে আরও অনেক কথা জানাতে পারত।’
গ্রোভ অ্যাংলারের নাম শুনেই লাফিয়ে উঠে দাঁড়াতে গেল গ্যাটো। কিন্তু দুই পাশে বসে ওর হাত চেপে ধরে রেখেছে কিশোর আর রবিন। টেনে বসিয়ে দিল ওকে।
‘গ্রোভ অ্যাংলার!’ রাশেদ পাশার দিকে তাকিয়ে প্রায় চিত্কার করে উঠল ও। ‘ওকে চেনেন নাকি?’
‘চিনি,’ জবাবটা দিল রবিন।
‘কিভাবে চিনলে?’
‘আমাদের বাড়িতে এসেছিল,’ কিশোর বলল। ‘মেডেলগুলোর কথা সেই আমাদের জানিয়ে গেছে।’
চুপ হয়ে গেল আবার গ্যাটো।
‘আপনিও ওকে চেনেন বোঝা যাচ্ছে,’ রাশেদ পাশা বললেন। ‘আপনার সঙ্গে পরিচয় হলো কিভাবে?’
গ্যাস-বলটার দিকে ইঙ্গিত করল কিশোর।
‘জাহাজঘাটায় ওর সঙ্গে দেখা,’ চুপ করে থেকে লাভ হবে না বুঝে মুখ খুলল গ্যাটো। ‘বেঈমান! বিশ্বাসঘাতক! ও যে এসে বলে দেবে সব, ভাবতেই পারিনি। হাতে পেয়ে নিই একবার...!’ দাঁতে দাঁত ঘষল ও।
‘তার মানে আমাদের কাছেও মিথ্যে কথা বলেছে অ্যাংলার,’ কিশোর বলল। ‘মেডেলগুলোতে কী আছে ভালো করেই জানে ও। নিশ্চয় সে-ও গুপ্তধনের খোঁজে রয়েছে।’ গ্যাটোকে জিজ্ঞেস করল, ‘ও এখন কোথায়?’
‘জানি না,’ জবাব দিল গ্যাটো। ‘বহুকাল দেখা হয় না।’
‘আপনি মিথ্যে কথা বলছেন,’ রাশেদ পাশা বললেন।
জোরে জোরে মাথা নাড়ল গ্যাটো। ‘না। ও কোথায় কিছুই জানি না আমি। কিছু জানতে চাইও না। আমি এখন বাড়ি যেতে চাই।’
গ্যাটোকে আর কিছু জিজ্ঞেস করে লাভ হবে না বুঝে চুপ হয়ে গেলেন রাশেদ পাশা। পুলিশ এসে নিয়ে যাক। পুলিশের জেরার মুখে না বলে পারবে না।
সাইরেন শোনা গেল। রবিন বলল, ‘ওই যে, এসে গেছে!’
দলবল নিয়ে ঘরে ঢুকলেন চিফ ক্যাপ্টেন ইয়ান ফ্লেচার। সব কথা শুনলেন কিশোর-রবিনের মুখে। তারপর তিনি জানালেন, মিউজিয়াম থেকে চুরি যাওয়া জিনিসপত্র, আর বিডদের বাড়ি থেকে চুরি যাওয়া তলোয়ারটার খোঁজ পাওয়া গেছে চোরাই মার্কেটে। সেগুলো আনতে লোক পাঠিয়েছিলেন। তারা জেনে এসেছে, জিনিসগুলো ওদের কাছে বিক্রি করেছে কালো গোঁফওয়ালা এক বিদেশি। চেহারার বর্ণনার সঙ্গে গ্যাটো ওটিনোর চেহারা হুবহু মিলে যায়।
কঠোর দৃষ্টিতে লোকটার দিকে তাকালেন তিনি।
কিন্তু প্রতিবাদ করেই চলল গ্যাটো, নিজেকে নিরপরাধ বলতে থাকল। ছেড়ে দিতে বলল।
ক্যাপ্টেন বললেন, ‘তুমি নিরপরাধ কিনা আদালতেই সেটা প্রমাণ হবে। নিরপরাধ হলে নিশ্চয়ই ছেড়ে দেওয়া হবে তোমাকে। তবে স্লিপিং গ্যাস দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে অন্যের বাড়িতে চুরি করে ঢুকে, সেফ ভাঙার অপরাধ থেকে রেহাই পাবে না। এর কী জবাব দেবে?’
চুপ করে রইল গ্যাটো।
হাতকড়া পরানো হলো ওকে। বের করে নিয়ে গেল পুলিশ। গাড়িতে তোলা হলো।
বাইরে তখন অঝোর বৃষ্টি।

এই পাতার আরো খবর -
font
আজকের নামাজের সময়সূচী
মার্চ - ২৭
ফজর৪:৪০
যোহর১২:০৫
আসর৪:২৯
মাগরিব৬:১৬
এশা৭:২৮
সূর্যোদয় - ৫:৫৬সূর্যাস্ত - ০৬:১১
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :