The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ২৮ জুলাই ২০১৪, ১৩ শ্রাবণ ১৪২১, ২৯ রমজান ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ তোবায় আটকা শ্রমিক, বেতন দিচ্ছে বিজিএমইএ

গল্প

আমার জীবনে প্রথম মিছিল

তুষার কণা খোন্দকার

১৯৬৫ সনে পাকিস্তানের সাথে ভারতের ধুন্ধুমার যুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার কথা আমার ঝাপসা মনে পড়ে। যুদ্ধের খবর শোনার জন্য সকাল-বিকাল পাড়ার সবাই রেডিও ঘিরে হুমড়ি খেয়ে পড়ত। এক বিকেলে রেডিও পাকিস্তানের খবর শুনে পাড়ার মজনু ভাই বললেন, ‘শোনেন মেজ ভাই, পাকিস্তানের জন্যি দিল্লি দখল করা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। ভাগ্যিস আয়ুব খানের মতো বাপের ব্যাটা ইলেকশনে জিতে প্রেসিডেন্ট হইছিল। মিস ফাতেমা জিন্নার মতো মিয়ামানুষ প্রেসিডেন্ট হলি কি আর আমরা দিল্লি দখল করবার পারতাম?’
মেজভাই কপাল কুঁচকে মজনু ভাইয়ের মুখের দিকে চেয়ে বললেন, ‘দিল্লি দখল করবি? কে, তুই নিজে? তুই নিজে সাহস করে স্বপ্নটা দেখে ফেললি, নাকি? তাই হবি। আয়ুব খানের মনে হয় দিল্লি দখল করার স্বপ্ন দেখার সাহস নাই। তাহলি এক কাজ কর, মজনু। তুই নিজে যুদ্ধে চলে যা। তাহলি, লাল বাহাদুর শাস্ত্রী নিজ হাতে দিল্লি শহর তোর গলা দিয়ে ঢুকিয়ে দিবি।’ আমি কল্পনায় দেখলাম, লাল বাহাদুর শাস্ত্রী নামে খুব জোয়ান তাগড়া মোটা তাজা একটা মানুষ মজনু ভাইকে চিত্ করে ফেলে গলা দিয়ে দিল্লি নামের লাড্ডু জাতীয় কিছু ঢুকিয়ে দিচ্ছে। দিল্লি দখলের স্বপ্ন দেখার ফজিলত কল্পনার চোখে পষ্ট হয়ে যাওয়ায় আয়ুব খানের বীরত্ব নিয়ে ভালো কিছু ভাবার সময় পেলাম না।
সেই ঘটনার পরে কতদিন কেটে গেছে মনে পড়ে না। একদিন কাঁঠালতলায় খেলার আসর গুছিয়ে তোলার ফাঁকে দেখলাম, মেজ ভাই বাড়ির ভেতর বড় চৌচালা ঘরের বারান্দায় বসে খবরের কাগজ পড়ছেন। পড়া শেষ করে হাতের কাগজ ঝটকা মেরে জলচৌকির ওপর ফেলে মেজভাই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আয়ুব হারামজাদা গদি থেকে নড়বি না। ভদ্র ভাষায় ওকে গদি ছাড়তে বলে কোনো লাভ নাই। ছাত্ররা খামোখাই মিছিলে শ্লোগান দিয়ে গলা ছিলে রক্ত তুলছে। আয়ুবকে খুব কষে লাত্থি দিয়ে গদি থেকে ফেলে দেওয়া লাগবি।’ বারান্দা ছেড়ে পৈঠায় পা রেখে কথার পৃষ্ঠে আরও কথা যোগ করলেন, ‘মোনেম খাঁ আয়ুবের পা-চাটা কুত্তা। কুত্তাটার কপালে দুঃখু আছে। এটাকে শুধু লাত্থি দিয়ে কাজ হবি না। এটা বড় বেহায়া। মাঠের মধ্যি ফেলে এটাকে দিয়ে ফুটবল খেলা লাগবি।’
মেজভাইয়ের আদরের কুকুর তার নিজের বাঘা নাম সম্পর্কে সজাগ থাকলেও ‘কুত্তা’ শব্দটা তার অচেনা ছিল না। প্রভুর মুখে ‘পা-চাটা কুত্তা’ শুনে বাঘা উঠানের কোনার শিউলিতলার আরামের ঘুম ছেড়ে ছুটে এসে পৈঠার গোড়ায় দাঁড়িয়ে লেজ দুলিয়ে মেজভাইয়ের পা চাটতে শুরু করল। আয়ুব-মোনেমের খবর পড়ে উনার মেজাজ তখন মাথায় চড়ে গেছে। আদরের কুকুরকেও তার তখন আদর করার মুড নেই। উনি বাঘার মুখে মাঝারি মাপে একটা লাথি ঝেড়ে গজগজ করতে করতে উঠান পার হয়ে বার বাড়ির দিকে চলে গেলেন। এই সুযোগে আমি খবরের কাগজের পাতায় পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খাঁর ছবি খুঁজে বের করলাম। ছবিটা পরখ করে দেখার দরকার ছিল, কারণ মেজভাই বলে গেলেন, লোকটা নাকি একটা ‘কুত্তা’। মেজভাইয়ের কথা ঠিক না বেঠিক সেটা বোঝার জন্য আমি মোনায়েম খাঁর চেহারার সঙ্গে বাঘার চেহারার মিল-বেমিল খুঁজে দেখছিলাম। সেদিনের কাগজের মোনায়েম খাঁর দাঁড়ানো ভঙ্গির একটা ছবি ছাপা হয়েছিল। লোকটার মুখ চিমসে লেগে নিচের দিকে ঝুলে আছে। বেঁটে খাটো শরীর প্যাকাটির মতো চিকনা। তার হেলে সাপের মতো লিকলিকে গায়ে লম্বা শেরওয়ানির ঝুল হাঁটুর নিচে গিয়ে শেষ হয়েছে। মোনায়েম খাঁর মাথার ওপর আলগোছে বসানো জিন্নাহ টুপির মাপ তার মাথার চেয়ে বড়। বাঘার চেহারার সঙ্গে গভর্নর মোনায়েম খাঁর চেহারার মিল ছিল কি ছিল না সে কথা এখন আর মনে নেই। তবে লোকটার ত্যাঁদর কিসিমের নাখান্দা চেহারা আমার মনে স্থায়ী ছাপ ফেলে গিয়েছিল।
সে সময় রেডিও পাকিস্তানে মাস পয়লা বেতার ভাষণ বলে একটা অনুষ্ঠান ছিল। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আয়ুব খান মাসে একবার সন্ধ্যার সময় ‘বেরাদরানে মিল্লাত’ বলে উর্দুতে ভাষণ দেওয়া শুরু করত। ভাষণ শুনে বাড়ির বড়রা কী বুঝত সেটা তারা জানে। আমি নিজে বেরাদরানে মিল্লাত এই কথাটার মানেও জানতাম না। ভাষণের বাকি অংশ বেরাদরানের চেয়ে আরো কঠিন উর্দু শব্দ দিয়ে ঠাসা। কাজেই সে সব কথার হাতামাথা কিছু বোঝার প্রশ্নই আসে না। তবে বড়রা শুনত বলে আমিও কান খাড়া করে রাখতাম। আয়ুব খান তার বেতার ভাষণে ঘন ঘন বলত, ‘মাশরেকি পাকিস্তান’ আর ‘মাগরেবি পাকিস্তান’। আমি নিজে পূর্ব পাকিস্তানের বাসিন্দা এটা জানতাম, কিন্তু কোনটা মাশরেকি আর কোনটা মাগরেবি সেটা ঠাহর করার সাধ্যি আমার ছিল না।
প্রেসিডেন্ট আয়ুব খানের ভাষণ না বুঝলেও পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খাঁর ভাষণ ছিল দারুণ এক মজার ব্যাপার। মনে পড়ে, লোকটা মাসের মধ্যে দুইবার বেতার ভাষণ দিত আর তার ভাষণের মধ্যে একটু পর পর বলত, ‘আমার প্রেসিডেন্ট বলেছেন’। প্রতিবার ভাষণে আর একটা বাক্য সে ঘুরে ফিরে বলত, ‘যেসব লুক পাকিস্তান এবং ইসলামকে দংস করার জন্য ষরুযন্ত্র করছে তাদেরকে কটুর অস্তে দমন করা হবে।’
আয়ুব খানের ‘বেরাদরানে মিল্লাত’ কথার মানে না জানলেও মোনায়েম খাঁর ‘কটুর অস্ত’ মানে যে ‘কঠোর হস্ত’ সেটা জানতাম। বিকেলে বাড়ির দেউড়ির কাঁঠালতলায় মীরা, মীনা, আঙ্গুর ওদের সবাইকে জড় করে মাটিতে ফেলে রাখা গাছের গুড়ির ওপর দাঁড়িয়ে আমি আঙুল তুলে বক্তৃতা দিতাম, ‘আজ তুদেরকে আমি কটুর অস্তে দমন করব।’ তারপর সবাই মিলে হেসে গড়াগড়ি যেতাম।

মেজ ভাই খবরের কাগজ পড়া শেষ করে আয়ুব খান, মোনায়েম খাঁকে যেভাবে গালাগালি করতেন তাতে সেই অচেনা দুই লোকের ওপর আমাদের বিরক্তি চরমে পৌঁছেছিল। মেজভাইর গালাগালির ধরন থেকে বুঝেছিলাম আয়ুব খান মানুষটা ডাকাত দলের সর্দার গোছের কেউ আর মোনায়েম খাঁ তার ছিঁচকে চ্যালা। এর মধ্যে ছোট ভাই ঢাকা থেকে ছুটিতে বাড়িতে এসে আয়ুব-মোনেমের ভাবমূর্তি একবারে ধুলায় মিশিয়ে দিল। ছোট ভাই তখন ঢাকার জগন্নাথ কলেজের ছাত্র। সে সেখানে ছাত্র ইউনিয়নের নেতা। একদিন বিকেলে সে বলল, সে নাকি শিগগিরই কমুনিস্ট পার্টির সদস্য হয়ে লাল কার্ড হাতে পাবে। সে সময় গ্রামে সব পরিবারে অনেকগুলো রেশন কার্ড থাকত। রেশন কার্ড দিয়ে চাল চিনি এগুলো কেনা যেত। আমি ভাবলাম, লাল কার্ড রেশন কার্ডের মতোই একটা কিছু। ছোট ভাই যখন লাল কার্ড পাওয়ার ওপর এত জোর দিচ্ছে তাহলে সেটা দিয়ে নিশ্চয়ই আরও অনেক বেশি বাজার সদাই করা যাবে।
বেশ লম্বা সময় কলেজ ছুটি থাকায় ছোট ভাই এ-বাড়ি ও-বাড়ি ঘুরে ছয় দফা, এগার দফা নিয়ে সবার সঙ্গে সারাক্ষণ তুমুল আলোচনা করতে লাগল। ছোট ভাইয়ের অত শত দফার দিকে আমার নিজের তেমন মনোযোগ ছিল না। তবে সে সময় তার মুখে শোনা একটা গল্প খুব মনে ধরে গিয়েছিল। গল্পটা আয়ুব খান আর মোনায়েম খাঁকে নিয়ে।
সে সময় আয়ুব খান একটা বই লিখে বাজারে ছেড়েছে। বইটির নাম ‘ফ্রেন্ড, নট মাস্টার’। সৈয়দ আলি আহসান নামে একটা বাঙালি চাটুকার বইটিকে ‘প্রভু নয় বন্ধু’ নাম দিয়ে বাংলা করেছে। ছোট ভাই অনেক সময় নিয়ে বাঙালি চাটুকারের পিণ্ডি চটকালো। তারপর বলল, সরকারি খরচে বইটির বেসুমার কপি ছাপিয়ে লোকজনের মধ্যে মাংনা বিলানো হচ্ছে। ঢাকা শহরের ছাত্ররা আয়ুব খানের লেখা ‘প্রভু নয় বন্ধ’ু বইটি মাংনা হাতে পেয়ে ওটি পড়ে তার মর্ম বোঝার ধারে কাছে যাচ্ছে না। উল্টা দোকানপাট ছেঁকে প্রভু নয় বন্ধু বইয়ের কপি রাস্তায় ফেলে তাতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে মজা করছে। বলল, শীতের সকালে আয়ুবের লেখা বই জ্বালিয়ে ছাত্ররা আগুন পোয়াতে খুব আরাম পাচ্ছে।
আয়ুব খানের লেখা প্রভু নয় বন্ধু বই নিয়ে ছোট ভাই হেসে হেসে সবাইকে একটা গল্প বলল। গল্পটা সত্যি না মিথ্যা তা জানি না তবে শুনতে দারুণ মজার ছিল। আয়ুব খান ঢাকা সফরে আসবে বলে মোনায়েম খাঁ কুর্মিটোলা এয়ারপোর্টে গেছে আয়ুব খানকে অভ্যর্থনা জানাতে। যথাসময়ে আয়ুব খান এরোপ্লেন থেকে নেমে এল। প্রভুকে দেখে মোনায়েম খাঁ ভক্তি গদগদ হয়ে দৌড়ে উড়োজাহাজের সিঁড়ির গোড়ায় ছুটে গেল। তার মতলব ছিল, সে সিঁড়ির গোড়ায় পড়ে আয়ুব খানের পায়ে ‘প্রভু হে’ বলে কুর্নিশ করবে। মোনেম খাঁ’র প্রভুভক্তিতে খুশি হয়ে ‘আও মেরা জান’ বলে আয়ুব খান তাকে মাটি থেকে তুলে বুকের সঙ্গে জাপটে ধরল। ব্যাস। ঠিক তখনই এক আচানক শক্ত ঘটনা। মোনায়েম খাঁর ঝিংটে মারা চিকনা শরীর জাপটে ধরতে গিয়ে আয়ুব খানের চওড়া বুক শক্ত কোনো জিনিসের সাথে ধাক্কা খেল। সঙ্গে সঙ্গে আয়ুব খানের মনে ছ্যাঁত্ করে সন্দেহের ছ্যাঁকা। আয়ুব ভাবল, হায় সব্বনাশ! আমাকে মারার জন্য মোনায়েম ব্যাটা বুকে বোমা বেঁধে রাখেনি তো? আয়ুব খান তার মিলিটারি চেহারা আগুন গরম করে গার্ডদের ডেকে মোনায়েম খাঁর বুকের দিকে আঙুল তাক করে বলল, ‘হোক এই ব্যাটা আমার পা-চাটা পোষা গভর্নর। ও যতই আমার জুতার শুকতলা চেটে ক্ষয় করুক তবুও ওকে আমি বিশ্বাস করি না। পাকিস্তানি পাক পোশাক গায়ে চড়ালেও আদতে ও একটা বাঙালি হারামি। ওর বুকের ওপর ভারী শক্ত কিছু বাঁধা আছে। গভর্নর ব্যাটাকে মাটিতে চিত্ করে ফেলে শেরওয়ানি খুলে দেখ ওখানে নির্ঘাত্ একটা বোমা ফিট করা আছে।’ আয়ুব খানের যেই কথা গার্ড ব্যাটাদের সেই কাজ। মোনায়েম খাঁর গায়ে বোমার সন্ধান করতে গিয়ে গার্ডরা প্রবল উত্তেজনায় মোনায়েম খাঁর শেরওয়ানির বোতাম টেনে ছিঁড়ে ফেলল। বাধা দেওয়া দূরে থাক প্রভুর রোষের সামনে মোনায়েম খাঁ সামান্য আঁইগুই করারও সাহস পেল না। ভাবল, প্রভু আমার মিলিটারি মানুষ। তয় আবার ফিল্ড মার্শাল। মাথা গরম করে আমার বুকে যদি গুলি মেরে বসে। থাক বাবা! রিস্ক নিয়ে কাজ নেই। তার চেয়ে মটকা মেরে পড়ে থাকি। গার্ডরা আমার বুকের ভেতর-বার খুঁটিয়ে দেখে ক্লিয়ারেন্স দিলে প্রভু তার পাক কদমে আমাকে ফের জায়গা দেবেন। গার্ডরা মোনেম খাঁ-কে মাটিতে চিত্ করে ফেলে শেরওয়ানির বোতাম ছিঁড়ে বুক খুলে দেখে, মোনায়েমের বুকের সঙ্গে আয়ুব খানের লেখা বই ‘প্রভু নয় বন্ধু’ দড়ি দিয়ে পেঁচিয়ে শক্ত করে বাঁধা।
গল্পটা বারবার বলে বারবার হেসে গড়িয়ে পড়তে আমার খুব ভালো লাগতে লাগল। ভাবলাম, কাঁঠালতলার বিকেলের আসরে এটা নিয়ে একটা নাটক মঞ্চস্থ করা খুব জরুরি। নাটক করতে চাওয়া খুব সোজা, কিন্তু নাটক সাজানো যে কত কঠিন সেইদিন আমি প্রথম টের পেলাম। বিশেষ করে এরোপ্লেন এবং এয়ারপোর্টের আকার আকৃতি ঠিকঠাক কল্পনা করতে পারছিলাম না। আকাশ দিয়ে প্লেন উড়ে যাওয়ার শব্দ পেলে ঘাড় উল্টিয়ে সেটির দিকে চেয়ে থাকতাম। দিগন্ত থেকে উঠে এসে বাঁশঝাড়ের আড়ালে মিলিয়ে যাওয়া পর্যন্ত সেটার দিকে চেয়ে থাকতাম। আকাশে উড়ন্ত উড়োজাহাজ কী কায়দায় মাটিতে নামে কিংবা মাটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকলে সেটাকে কেমন দেখায় সে সম্পর্কে কাঁঠালতলার আসরের কারো কোনো ধারণা ছিল না। তবুও দমে না গিয়ে কাঁঠালতলায় পড়ে থাকা গাছের গুড়িকে এরোপ্লেনের সিঁড়ি বানিয়ে আয়ুব-মোনেমের মিলন দৃশ্যের একটা ছবি দাঁড় করিয়ে ফেললাম। আয়ুব খানের প্রভু নয় বন্ধু বইটি তখনও চোখে দেখিনি। অনুমান করলাম, বইটা বেশ মোটাসোটা এবং শক্ত কভার দিয়ে মোড়ানো হবে। তেমন আকার আকৃতির একটা বইয়ের খোঁজে ঘরে ঢুকে বড়বুর বিছানার ওপর সেটি পেয়ে গেলাম। বিমল মিত্রের লেখা ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম’ বইটা বড়বুর বিছানার ওপর পড়ে আছে। টুক করে বইটি তুলে নিয়ে কাঁঠালতলায় চলে এলাম। নাটকে আমার নিজের আয়ুব খান সাজার খুব ইচ্ছা ছিল, কিন্তু মীনা কিছুতেই মোনেম খাঁ সাজতে রাজি হলো না। নাটকের স্বার্থে ওকে ধুলা মাটিতে চিত্ হয়ে পড়তে হবে। ফ্রকে ধুলা মাটি জড়ালে ওর সত্ মা ওকে আস্ত রাখবে না। কাজেই ওর ফ্রক ধুলামুক্ত রাখা খুব জরুরি। আমার ঘরে আপন মা থাকার কারণে ফ্রকে ধুলা লাগার রিস্ক আমাকেই নিতে হলো। সেদিনের নাটকে আমি মোনেম খাঁ আর মীনা ফিল্ড মার্শাল আয়ুব খান। কড়ি দিয়ে কিনলাম বইটা ফ্রকের তলে ঢুকিয়ে ফ্রকের ঝুল পরনের প্যান্টের মধ্যে গুঁজে নিলাম। এতে বইটা আমার বুকের সঙ্গে আটকে গেল। আয়ুব খানের ভূমিকায় মীনা মাটিতে পড়ে থাকা গাছের গুড়ির ওপর দাঁড়িয়ে আমাকে ‘আও মেরে জান’ বলে জড়িয়ে ধরতে বইয়ের শক্ত কভার ছিঁড়ে ভেতরের লেখার অংশ ঝুপ করে মাটিতে পড়ে গেল। সাথে সাথে আমাদের হাসি আচমকা থেমে গেল। এ যেন হরিষে বিষাদ। আতঙ্কে বুকের মধ্যে গুড়গুড় ডাক ছাড়তে লাগল। কারণ বইটি বড়বুর বিছানা থেকে এনেছি। কাঁঠালতলায় হাজির আমরা সব কটা খেলুড়ে বড়বুকে জমের মতো ডরাতাম। কড়ি দিয়ে কিনলাম বইটি বড়বু দারিয়াপুর ক্রিসেন্ট ক্লাবের লাইব্রেরি থেকে ধার এনেছিল। বইটি আচানক ছিঁড়ে যাওয়ায় আমাদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। লাইব্রেরির বই ছেঁড়ার অপরাধে বড়বু কি কঠিন শাস্তি দেবে সেই আশঙ্কায় সবার আত্মারাম খাঁচা ছাড়া।

দুই
বাড়ি থেকে আয়ুব খান মোনায়েম খাঁ সম্পর্কে চরম অশ্রদ্ধার শিক্ষা নিয়ে ১৯৬৮ সনে আমি দুলাই হাই স্কুলে ক্লাস সিক্সে ভর্তি হলাম। কিছুদিন নিয়মিত ক্লাস করে বিদ্যা শিক্ষার তেমন উল্লেখযোগ্য উন্নতি হওয়ার আগেই স্যারদের মনের গড়ন-পেটন সম্পর্কে আমার ধারণা পষ্ট হয়ে গেল। বিশেষ করে কোন স্যারের পড়া মুখস্থ করতে হয় আর কোন স্যারের পড়া শুধু বুঝলেই পার পাওয়া যায়, সে বিষয়ে আমি মোটামুটি দক্ষ হয়ে গেলাম। স্যারদের মধ্যে গফুর স্যার ছিলেন ভয়ঙ্কর মুখস্থবাদী। স্যার এবং তাঁর চিকন হিলহিলে বেতটাকে আমরা স্কুলসুদ্ধ সবাই যমের চেয়ে বেশি ডরাতাম। বাবর এবং হিমুর যুদ্ধের সন তারিখ রাত জেগে মুখস্থ করে ঘুমাতে গিয়ে স্বপ্ন দেখতাম যেন ওগুলো সব ভুলে গেছি। মুখস্থ বিদ্যায় পিছিয়ে থাকার কারণে আমার মনের জোর কমে গিয়েছিল। গফুর স্যারের ক্লাসের পড়া ভুলে যাওয়ার দুঃস্বপ্ন দেখে প্রায় রাতে আমার ঘুম ভেঙে যেত। সমস্ত স্কুলের মূর্তিমান আতঙ্ক গফুর স্যার একদিন ক্লাসে এসে হাতের চিকন বেতে মৃদু দোল খেলিয়ে গম্ভীর মুখে বললেন, ‘আজ তোদের কোনো ক্লাস হবে না। স্কুলের সবাইকে আয়ুব খানের এক দশক পূর্তির মিছিলে যেতে হবে।’
গফুর স্যারের মুখে মিছিলে যাওয়ার নির্দেশ আমাদের কানে পানিপথের যুদ্ধে যাওয়ার মতো ভয়ঙ্কর শোনাল। স্যারের মুখে মিছিলে যাওয়ার হুকুম শুনে ক্লাসসুদ্ধ সবাই অজানা আশংকায় ঝিমিয়ে পড়লাম। ক্লাসের সবার কানে মিছিল শব্দটা চেনা হলেও মিছিলে যাওয়ার বিষয় ছিল একেবারে অচেনা। আমরা জানতাম, ঢাকা শহরে ছাত্ররা মিছিল করে এবং পুলিশ লাঠিচার্জ করে তাদেরকে ভাগিয়ে দেয়। ঘটনা সেখানেই শেষ নয়। মিছিলের ছাত্ররা মরিয়া হয়ে পুলিশের ওপর চড়াও হলে পুলিশ ছাত্রদের দিকে বন্দুক তাক করে গুলি চালায়। ছাত্ররা যেসব মিছিল করে সেগুলোর অনেক রকম নাম থাকে। যেমন—শান্তিপূর্ণ মিছিল, জঙ্গি মিছিল, মশাল মিছিল। গুলিতে কেউ মারা গেলে তার লাশ কাঁধে নিয়ে যে মিছিল হয় সেটাকে বলে শোক মিছিল। এসবই আমরা খবরের কাগজ পড়ে শিখেছি। তাই বলে আমাদের ক্লাসের কেউ নিজের চোখে কখনো কোনো মিছিল দেখেনি।
ক্লাসে আমি একটু ব্যতিক্রম ছিলাম। আমি একবার নিজের চোখে একটা মিছিল দেখেছি। কিন্তু সেটাকে ঠিক মিছিল বলে চালানো উচিত হবে কি না সেটাও ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। মনে পড়ছিল, আগের বছর ঢাকায় গিয়ে নাজিমুদ্দিন রোডে অনেকক্ষণ বাসের ভেতর বসে ছিলাম। সে সময় পাবনা থেকে ঢাকায় যেতে পথে তিনবার বাস বদলাতে হতো। সেদিন দুপুরবেলা নৌকায় ছোট একটা নদী পার হয়ে নয়ারহাট থেকে ঢাকার বাসে উঠেছিলাম। সেই বাস বিকেল বেলা যখন নাজিমুদ্দিন রোডে জেলখানার ঢালে গিয়ে দাঁড়াল তখন রাস্তা দিয়ে একটা আজব মিছিল যাচ্ছিল। মিছিলের লোকগুলোর হাতে উঁচু ঝাণ্ডা। ঝাণ্ডার কালো কাপড়ের গায়ে সোনালি কালি দিয়ে আরবি লেখা। নিশানের গায়ে আরবি লেখার মানে বুঝতে পারছিলাম না বলে মিছিলের পয়পরিচয় ঠিক করতে পারছিলাম না। মিছিলের মাঝখানে তাগড়া চেহারার চারটে লোকের কাঁধে কালো কাপড়ে ঢাকা খাটিয়া। অমন খাটিয়ার ওপরে কাফন পরানো মরা মানুষ শোয়ানো থাকে। নাজিমুদ্দিন রোডের মিছিলের খাটিয়ায় কালো চাদরের নিচে কোনো লাশ ছিল কি না সেটা দেখতে পাইনি। খাটিয়ার পেছনে গা উদাম কিছু লোকের হাতে দড়িতে বাঁধা ছুরির ঝোপা। ছুরির ঝোপা পিঠের ওপর ঝপাং ঝপাং করে মারছে আর নেচে নেচে বলছে, ‘হায় হোসেন—হায় হোসেন’। দাঁড়িয়ে থাকা বাসের গা ঘেঁষে যখন মিছিল যাচ্ছিল তখন বাসের ড্রাইভার গলা তুলে বলেছিল, ‘মহররমের তাজিয়া দূরে যাক তারপর নামেন।’ মিছিলটা দূরে চলে যাওয়ার পরেও আমার কানে ‘হায় হোসেন, হায় হোসেন’ ধ্বনি অনেকক্ষণ এক নাগাড়ে বেজেছিল। সেই মিছিলের কথা মনে পড়ে, ভাবলাম আমাদের স্কুল থেকে আজ কি তাজিয়া মিছিল বের হবে? আমরা কি রাস্তায় নেমে ‘হায় আয়ুব, হায় আয়ুব’ বলে নাচতে থাকব? স্কুলের মিছিলে আয়ুব খানের নাম ধরে নাচানাচি করে দিনের শেষে বাড়িতে ফিরে হেনস্থার মধ্যে পড়বো না তো? আয়ুব-মোনেমের পক্ষে মিছিল করার দায়ে মেজভাই আমাকেও কুত্তা বললে তখন কী উপায় হবে।
আয়ুব খানের এক দশকের খবর রহিম স্যার কিংবা কৃষ্ণ স্যারের মতো ঠাণ্ডা মাস্টারের মুখে শুনলে প্রশ্ন করে মিছিলের জাতপাত খোলাসা করে জানা যেত। কিন্তু মিছিলের খবর নিয়ে এসেছেন স্বয়ং গফুর স্যার। গফুর স্যারের সঙ্গে ভালোমতো পরিচয় হওয়ার আগে স্যারের হাতে ধরা হিলহিলে চিকন বেতের সঙ্গে আমাদের শক্ত পরিচয় হয়ে গিয়েছিল। চিকনা বেতের বদরাগী মালিক গফুর স্যারকে মিছিল সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস কারো ছিল না। কাজেই মিছিলের কথা শুনে আমরা সবাই ক্লাসে জড়সড় হয়ে চুপচাপ বসে রইলাম। মিছিলের পরে স্কুল ছুটি হয়ে যাবে—এমন সুখবর শুনেও কারো চোখেমুখের দিশেহারা ভাব দূর হচ্ছিল না। ক্লাসসুদ্ধ সবার ভ্যাবাচাকা ভাবের ভেতর স্কুলের দফতরি কোবাদ ভাই ঢং ঢং শব্দে ঘণ্টা বাজিয়ে দেওয়ায় আমরা মুখ কালো করে সার বেঁধে স্কুলের মাঠে নেমে গেলাম।
স্কুলের মাঠের কিনারে অফিস রুমের পাশে জোড়া আমগাছের ঘন ছায়া। স্কুল কমিটির চেয়ারম্যান হাজি সাহেব আমগাছের ছায়ায় ছাতি মাথায় দাঁড়িয়ে কপালে গেরো তুলে আমাদের দিকে কটমট চোখে চেয়ে আছে। তার চাউনির ঝিলিকে আগুন গরম হলকা ছুটতে দেখে আমরা মিছিল নিয়ে কিছু ভাবাভাবির কথা বেমালুম ভুলে গেলাম। এর মধ্যে শরীরচর্চা স্যার অফিস রুমের বারান্দা ছেড়ে ধীর পায়ে নেমে এলেন। মাঠে নেমে উনি চোখ তুলে আকাশের দিকে চেয়ে রোদের তেজ পরখ করে হাতের বাঁশিতে একটা কড়া ফুঁ দিলেন। পিতলের বাঁশি ঠোঁটের সঙ্গে ঝুলিয়ে রেখে স্যার ধীরে সুস্থে আমাদেরকে ঠাটা পড়া রোদের মধ্যে লাইন করে দাঁড় করিয়ে আর একবার তাতে ফুঁ দিলেন। স্যারের বাঁশির ফুঁ শেষ হলে স্কুল কমিটির চেয়ারম্যান হাজি সাহেব ছাতা মাথায় এগিয়ে এসে বললেন, ‘এটি পাকিস্তানের উন্নয়নের এক দশক পূর্তির মিছিল’।
উন্নয়ন শব্দটা খবরের কাগজের পাতায় ছাপার অক্ষরে চোখে পড়েছে। তবে উন্নয়ন শব্দের সাথে আমাদের প্রত্যক্ষ কোনো যোগাযোগ ছিল না। আশপাশের কোনো মানুষের মুখে এই শব্দ আগে আর শুনিনি। হাজি সাহেবের বলা ‘উন্নয়নের এক দশক’ শব্দগুলোর মানে বুঝতে পারছিলাম না বলে ভাবলাম পাঁচশালা পরিকল্পনার সাথে উন্নয়ন দশকের কোনো যোগাযোগ থাকতে পারে। খবরের কাগজের হেডলাইনে পাঁচশালা পরিকল্পনা শব্দগুলো বেশ কয়েকবার দেখেছি। খবরের ভেতরে কী লেখা ছিল সেটা না জানলেও পাঁচশালা বলে যে একটা শব্দ আছে সেটা জানতাম। তাছাড়া পাঁচশালা পরিকল্পনা নিয়ে বড়রা ঠাট্টা করে বলত, ‘পাঁচশালা পরিকল্পনা মানে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য কল্পনার পরি। পরিকল্পনার পরি টাকা-পয়সা সব লুটে নিয়ে উড়ে পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যায়। তারপর পাঁচ বছর ধরে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মনে কল্পনা পড়ে থাকে। আয়ুব খানের পাঁচশালা পরিকল্পনা নিয়ে পত্রিকায় মাঝে মাঝে মজার কার্টুন ছাপা হতো। পত্রিকার কার্টুন নিয়ে বিকেলে কাঁঠালতলায় আমরা কয়েকদিন ধরে মজা করতে পারতাম। একবার একটা কার্টুনে দেখলাম, ঘরের মেঝেতে মাদুরের ওপর পাঁচটা ছেলে সার বেঁধে বসে ভাত খাচ্ছে। সামনে বসে একজন মহিলা তালের পাঙ্খা নেড়ে তাদেরকে বাতাস করছে। একটা লোক ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে চোখ গোল করে দৃশ্যটা দেখছে। মহিলার মুখ থেকে তীর চিহ্ন টেনে খোপের ভেতর লেখা, ‘ওগো অমন করে কী দেখছ? তুমি সারা দিন পাঁচশালা পরিকল্পনার কথা বলে মুখে ফেনা তুলে ফেল বলে আজ আমার পাঁচ ভাইকে দাওয়াত করে নিয়ে এলাম। এই তো চোখের সামনে বসা নিজের পাঁচ শালাকে দেখে চোখ জুড়াও। আয়ুব খানের পাঁচশালার তত্ত্ব তালাশ করে তোমার কী লাভ?’
পাঁচশালার সাথে উন্নয়নের সূতা জোড়া দিতে না পেরে উন্নয়নের মিছিল নিয়ে আমার মনের বেদিশা ঘোর আরো গভীর হলো। অজানা বিষয় নিয়ে বেদিশা ভাব যে আমার একার মনে ছিল তা নয়। মিছিলের মতো একটা অচেনা কাজ করতে হবে বলে স্কুলের সবার চেহারা সেদিন ঘোলা হয়ে উঠেছিল। আমাদের চোখেমুখে দিশেহারা ঘোর দেখে হেডস্যারের বোধ হয় মায়া হলো। উনি এগিয়ে এসে শরীরচর্চা স্যারের পাশে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘তোমরা সবাই পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আয়ুব খানের নাম জানো। ১৯৫৮ সনে উনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে গত দশ বছরে তিনি আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি পাকিস্তানের অনেক উন্নয়ন করেছেন। সেজন্য আজ আমরা উন্নয়নের এক দশক পালন করব। উন্নয়নের এক দশক উপলক্ষে এটি আমাদের আনন্দ মিছিল।’
হেড স্যারের কথা শুনে আমার মাথায় আর একটি চিন্তা চিলিক দিয়ে জেগে উঠল। ভাবলাম, উন্নয়ন মানে সবুজ বিপ্লব নয়তো? সবুজ বিপ্লব মানে তো এক বিদঘুটে পাগলামি। সবুজ বিপ্লব নিয়ে দারিয়াপুর মডেল ফি প্রাইমারি স্কুলের বারান্দার দেয়ালে একটা পোস্টার সাঁটানো ছিল। পোস্টারের মাথার ওপর আয়ুব খানের ছবি। তার নিচে সবুজ কালিতে ছাপা ‘সবুজ বিপ্লব’। মাঝখানে এক কৃষকের মাথায় তালপাতার মাথাল, পরনে চেক লুঙ্গি। সে কোমর বাঁকিয়ে ঝুঁকে কাদা মাটিতে ধানের চাড়া পুঁতে দিচ্ছে। ছবির নিচে লাল কালিতে লেখা ‘সফল করুন’।
সে সময় পাবনায় রোপা ধানের চল ছিল না। পাবনার কৃষকরা বীজ ধানের ধামা কোমরে ঠ্যাকনা দিয়ে ধরে ডান হাতের মুঠা ভরে ধান নিয়ে শুকনা জমিতে ছিটিয়ে দিত। একসময় বৃষ্টির পানিতে মাটি ভিজে চাড়া গজিয়ে সেখানেই ধান ফলতো। ধানের চারা এক ক্ষেত থেকে তুলে আরেক ক্ষেতে লাগানোর দৃশ্য আমরা কখনো দেখিনি। পোস্টারের ছবিতে কৃষক লোকটা এক ক্ষেত থেকে ধানের চারা তুলে আরেক ক্ষেতে কেন পুঁতে দিচ্ছে আর তাতে কেন সবুজ বিপ্লব সফল হয়ে উঠছে সেটা আমার মাথায় খেলত না।
উন্নয়নের হরেক মানে নিয়ে মাথা ঘামানোর মধ্যে স্কুল কমিটির চেয়ারম্যান হাজি সাহেব ছাতা মাথায় পাকা সড়কের দিকে হাঁটতে শুরু করলেন। মিছিলের নাম আনন্দ মিছিল হলেও হাজি সাহেবের মুখে আনন্দের লেশমাত্র না দেখে আমরাও মুখে হাসি ফোটানোর সাহস পেলাম না। জীবনের প্রথম মিছিল আমাদেরকে গোমড়া মুখেই শুরু করতে হলো। পিপড়ার মতো সারি বেঁধে স্যারদের পেছনে পায়ে পায়ে আমরা গিয়ে পাকা সড়কে উঠলাম। পাকা সড়ক বেয়ে পশ্চিম দিকে কিছু দূর এগিয়ে যেতে হাতের বাঁয়ে কাঠ চেরানোর মিল। সেই স মিলের সামনে রাস্তার পাশে অনেকগুলো গাছের গুড়ি। হাজি সাহেব মাথার ছাতা মাটিতে ফেলে একটা গাছের গুড়ির ওপর বসে হ্যাক্কর হ্যাক্কর করে কাশতে শুরু করলেন। অবস্থা বেগতিক দেখে হেড স্যার উন্নয়নের মিছিল ফেলে হাজি সাহেবের পিঠ ডান হাত দিয়ে কষে ডলতে ডলতে বাম হাতের ইশারায় অন্য স্যারদের বললেন আমাদেরকে স্কুলে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে। মিছিল শেষ হয়ে গেছে বলে ফিরতি পথে আমাদের সবার চোখেমুখে স্বস্তি ফিরে এল। স্কুলের মাঠে ফিরে আমরা জটলা করে গোল হয়ে দাঁড়াতে হরিপদ স্যার হাত নেড়ে বললেন, ‘যা যা। উন্নয়নের এক দশক উপলক্ষে আজ তোদের ছুটি। আজ কোনো ক্লাস হবে না।’ উন্নয়নের এক দশক উপলক্ষে স্কুল ছুটি দিয়ে স্যার নিজে খুশি হলেন নাকি বিরক্ত হলেন, স্যারের মুখ দেখে সেটা ঠিক বোঝা গেল না। আমাদেরকে হাতের ঝাপটায় বাতিল করে দিয়ে স্যার তাঁর গায়ের লম্বা ঝুলের শার্টের পকেট হাতড়ে একটা বিড়ি বের করে ঠোঁটে ঝুলালেন। ফস করে ম্যাচ জ্বালিয়ে বিড়িতে টান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে আরো একবার হাতের ঝাপটায় আমাদের ছুটি নিশ্চিত করে বললেন, ‘যা, এবার বাড়ি ফিরে যা। বাড়ি ফিরে গিয়ে উন্নয়ন ধোয়া পানি দিয়ে পেট ভরগে, যা।’
আয়ুব বন্দনার আনন্দ মিছিলের মানে না বুঝলেও হরিপদ স্যারের কথার মানে আমি বুঝতে পারলাম।

এই পাতার আরো খবর -
font
আজকের নামাজের সময়সূচী
এপ্রিল - ২৫
ফজর৪:০৯
যোহর১১:৫৭
আসর৪:৩২
মাগরিব৬:২৭
এশা৭:৪৪
সূর্যোদয় - ৫:২৯সূর্যাস্ত - ০৬:২২
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :