The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ২৮ জুলাই ২০১৪, ১৩ শ্রাবণ ১৪২১, ২৯ রমজান ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ তোবায় আটকা শ্রমিক, বেতন দিচ্ছে বিজিএমইএ

গল্প

ঘুণপোকা

নূর কামরুন নাহার

তৃপ্তির শরীর দেখতে দেখতে মনে পড়ে অয়ন্তীর কথা—অয়ন্তী বলেছিল, ‘ইস! শুধু মন বুঝি চেনা যায় না। শরীর বুঝি খুব চেনা যায়!’ কথাটা অদ্ভুত মনে হয়েছিল, শরীর চেনা যাবে না কেন। চেনা শরীরের ঘ্রাণ নিলেই তো হয়। প্রতিটি শরীরের গন্ধই তো আলাদা। কিন্তু এখন এই কয়েক সেকেন্ড তৃপ্তির শরীরের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারছি অয়ন্তীর কথাটা কত কঠিন সত্য।
তৃপ্তির এই চেনা শরীর আমার কাছে নামতার মতো মুখস্থ। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, এই একটা শরীর ছাড়াও আরো দু-তিনটা শরীর আমি ভালোভাবে চিনেছি। ঘ্রাণ নিয়েছি। শিল্পিত সৌন্দর্য দেখেছি। তবে অন্তরঙ্গ অনেক নারীর শরীর আমি দেখতে চাইনি। প্রয়োজনও মনে করিনি। ওসব নারীদের সঙ্গ আমার ভালো লেগেছে। ওদের সাথে আমার খুব ভালো ঘনিষ্ঠ সময় কেটেছে। ওদের সুন্দর মনে হয়েছে। মনে হয়েছে ওদের শরীরও হয়তো বেশ সুন্দর। তবে সে সুন্দরের উন্মোচনে আমি উতলা হইনি। শরীর কখনই আমার কাছে এক নম্বর হিসেবে গুরুত্ব পায়নি।
কোনো কোনো নারীর সাথে আমার ঘনিষ্ঠতার মাত্রাটা এমন হয়েছে যে আমি হয়তো চাইলে তার শরীরে যেতে পারি। কোনো কোনো নারীকে আমি আমার ক্ষমতা এবং অর্থবলে বিভিন্নভাবে সাহায্য করেছি। চাইলে আমি এদের সাথেও শরীরী সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারতাম। তাদের কারো কারো শরীরের প্রতি আমার আগ্রহও ছিল। কিন্তু তারপরও তাদের শরীরের সাথে আমার জানাশোনা হয়নি। প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই কিছু অদ্ভুত বিষয় থাকে। আমার মধ্যেও আছে। ঘনিষ্ঠতা ও সুযোগ থাকার পরও শরীরে না গিয়ে ওদের আমার প্রতি একটা ভালো মানুষী মোহ জাগিয়ে রেখেছি। ওরা আমাকে দেবতার মতো মানে আর আমি সেটাই উপভোগ করি।
আরার ঘনিষ্ঠ নারীর অনেকের শরীরের সাথেই আমার নিবিড়তম সম্পর্ক গড়ে না ওঠলেও আমি ওদের শরীর সম্পর্কে নির্মোহ ছিলাম না। একবারে অজ্ঞও ছিলাম না। আমি ওদের কাউকে কাউকে চুম্বন করেছি, ওদের শরীর পছন্দ করেছি, বিভিন্নভাবে স্পর্শ করেছি, স্পর্শ নিয়েছি। এভাবে ওদের শরীরকে বোঝার চেষ্টা করেছি। ওদের শরীর স্পর্শের জন্য তীব্র আকুলতা বোধ করেছি। তারপরও কেন যেন ওদের শরীর আমি দেখিনি। আমার মনে হয়েছে, না থাক, প্রয়োজন নেই।
তৃপ্তির শরীরে আরো কয়েক সেকেন্ড দৃষ্টি রাখি। এই শরীর আমি সাতাশ বছর ধরে চিনি। সাতাশ বছর আগে ওর ছিল পঁচিশ। ও তখন আমার কাছে পঁচিশের শরীর নিয়ে এসেছিল। আমরা দুজন ক্লাসমেট। সে হিসেবে সমবয়সী বলা যায়। মাঝে মাঝে আমার মনে হয় ও হয়তো আমার চাইতে বড়। তা যদি বড়ও হয় তা কত আর! বছর দুই—সেটাকে সমবয়সীই বলা যায়। ওর সেই পঁচিশ, তারপর এই সাতাশ বছর—এই পুরো সময় ধরে ও আমার চেনা, ওর শরীর আমার চেনা। আমার বিশ্বাস অন্ধকারে আরো দু-তিনটা শরীর থেকে অনায়াসে আমি বের করে নিতে পারব এটা তৃপ্তির শরীর।
তৃপ্তির দিকে আমি তাকিয়ে থাকি। সরাসরি ওর শরীরের দিকে। আর মাত্র কয়েক সেকেন্ড তারপর দৃষ্টি সরিয়ে নিই। না, আমি তাকাতে পারি না। কোনো নারীর বায়ান্নর শরীর দেখা এত ভয়াবহ এটা আমি ভাবতেই পারি না। আজ হঠাত্ তৃপ্তির অচেনা শরীর আবিষ্কার করি। ওর শরীর আমাকে চাবুকের বাড়ি মারে। এই কি তৃপ্তির শরীর। এই তবে তৃপ্তির শরীর। কী এটা ? এটা কি কোনো শরীর! জায়গায় জায়গায় থুবলানো মাংসপিণ্ড ছাড়া ওটা আর কি! এই কি তৃপ্তি? পঁচিশের শরীর নিয়ে যে এসেছে, যার সাথে আমার সাতাশ বছর! এই তার শরীর! কিন্তু কেন? আজ কেন আমি এমন চাবুক খাওয়া মানুষের মতো আহত হচ্ছি। বায়ান্নর এ থুবলানো নির্জীব মাংসপিণ্ডের এ শরীরটা কি রাতারাতি আমার চোখের সামনে উঠে এসেছে। আমি কি মাঝে মাঝেই ওই শরীরে যাই না। ওর বায়ান্নর এ শরীর তো একবারে নিস্তরঙ্গ না, মাঝে মাঝে সেখানে ঢেউ উঠে। ও তখন আমাকে ডেকে নেয়। আমি যাই। কই কখন তো মনে হয়নি বায়ান্নর নারী এত অরুচিকর। এত ভয়াবহ বীভত্স!
তৃপ্তি এখন সম্পূর্ণ উলঙ্গ। ওর শরীর থেকে খুলে নেয়া কাপড়গুলো আমি হাত থেকে মেঝের ওপর রাখি। ও আমার সামনে দিয়ে হেঁটে বাথরুমে প্রবেশ করে। ওহ ওর এই নগ্ন হেঁটে যাওয়া কি ভয়ংকর! যেন ও একটা কুজো কচ্ছপ। ওর কাপড় খুলে নেবার সাথে সাথে আমার মনে হয়েছিল—হঠাত্ কেউ আমার চোখে অ্যাসিড ছুড়ে দিয়েছে। আমার চোখ যন্ত্রণায় পুড়ে গেছে। সেই যন্ত্রণা বিদ্ধ আহত দৃষ্টি তৃপ্তির শরীর থেকে সরিয়ে নেয়ার পর আমি নিজেকে ধাতস্থ করি, তারপর একটু নরম হয়ে বলি, ‘আমি কি বাথরুমের ভেতরে আসব?’ তৃপ্তি বোধহয় একটু লজ্জা পাচ্ছে। ও মাথা নেড়ে দ্রুত বলে, ‘না, না, তুমি আসবে না। তুমি যাও।’
বাথরুমে তৃপ্তির পানি ঢালার শব্দ পাই। বিছানার ওপর সোজা হয়ে শুয়ে থেকে আমি আবারো ভাবি ওর ওই লজ্জা অবান্তর। এই শরীর এখন আর লজ্জা আনার কোনো অধিকার রাখে না। নাকি ওর ভেতরেও ভয়। ওই থুবলানো মাংসপিণ্ড প্রদর্শনের ভয়। তৃপ্তির শরীরটা একটা শুকনো টাওয়েল দিয়ে মুছিয়ে দিতে হবে। ওই বেঢপ বীভত্স মাংসপিণ্ডকে যত্ন করে মুছিয়ে আবার কাপড়ে আবৃত করে দিতে হবে। তাও ভালো, কাপড়ে ঢেকে দেব। কিন্তু আবার আমার মনে হয় আজ কেন? আজ কেন এভাবে আমি আঁতকে উঠলাম। তৃপ্তির বায়ান্নর শরীর কি রাতারাতি আবির্ভূত হলো ! ঐ শরীরটা কি একটু একটু করে আমার সামনেই বদলে যায়নি, রিসেপ নেয়নি। তবে আজই কেন আমি আবিষ্কার করলাম এই জমানো থুবড়ানো মাংসের ঢেলা। কোনো কোনো রাতে তো আমি ভালোভাবেই ওর শরীর দেখেছি। রাতের তাড়নার সেই শরীর আর আজ দিনের আলোয় কোনো তাড়না ছাড়া ঐ শরীর দেখার প্রাথক্য এতো ভয়ংকর! আজ এই তৃপ্তির এই শরীর আবিষ্কার এটা কি সম্ভব হতো যদি না তৃপ্তি হঠাত্ ডান হাতটি ভেঙে না ফেলত, দিনের আলোয় তৃপ্তির কাপড় খুলে ওকে গোছলের জন্য তৈরি না করতাম—আমি কি জানতে পারতাম নারীর বায়ান্নর শরীরের দিকে তাকিয়ে থাকা কি ভয়াবহ অভিজ্ঞতা!
তৃপ্তির গোছল শেষ করে আমাকে ডাকে। আমি একটা টাওয়েল হাতে বাথরুমের দরজায় দাঁড়াই। বা হাতে টাওয়ালটার একপ্রান্ত টেনে নিয়ে তৃপ্তি শরীর মোছে। অন্য প্রান্ত ধরে আমি দাঁড়িয়ে থাকি। বাঁ হাতে আনাড়ি ভঙ্গিতে তৃপ্তি শরীর মোছে।
আমি বলি, ‘দাও আমি ভালো করে মুছে দিই।’
আমি আলতো ছোঁয়ায় ওর শরীরের ঝুলে পড়া মাংসের পিণ্ড আর থুবড়ানো কুঁচকানো চামড়ার মাংসের দলাগুলো মুছে দিই। এখন এই মাংসের দলাকে আমার কাছে আর কোনো শরীর মনে হয় না। মনে কুঁকড়ানো দলাপাকানো একটা ঘুণপোকা।
তৃপ্তির বায়ান্ন। অয়ন্তীর ঊনচল্লিশ। ঊনচল্লিশের শরীর নিশ্চয় বায়ান্ন মতো এত ফাপড়া হয়ে যায়নি। কিন্তু অয়ন্তী ও কথা কেন বলেছিল, ‘ইস শরীর বুঝি খুব চেনা যায়!’ তবে কি অয়ন্তীর শরীরের বাঁকে বাঁকেও ঘুণপোকা! অয়ন্তীর শরীরও কি বাইরের চোখকে ফাঁকি দেয়। বাইরে আঁটসাঁট ওই শরীর কি এমনই হয়ে উঠছে মাংসের দলা? নাকি মেয়েটা মাথা নেড়ে নেড়ে অন্য কিছু বলছিল। শরীর চেনা যায় না। কেন চেনা যায় না? নিজের শরীর নিজের কাছেই কি অচেনা! নাকি চেনা যায় না শরীরের ক্ষুধাকে। কখন শরীর কী চায় কখন উতলা হয়ে ওঠে। মেয়েটার স্বামী ঢাকার বাইরে চাকরি করে সপ্তাহে একদিন আসে। ওতে কি ওর হয়! মেয়েটা আমাকে কী বলেছিল? ও কি সেটাই বলেছিল?
ও কি আমাকে কিছু বলতে চেয়েছিল। আমি যখন বলেছিলাম, ‘তাহলে সব শরীরই কি এমন, অচেনা?’ রহস্যের হাসি দিয়ে মেয়েটি বলেছিল, ‘খুব অচেনা। শরীর প্রতিদিন বদলায়।’ তৃপ্তির সেই পঁচিশের শরীর প্রতিদিন বদলে গেছে। আমার অলক্ষ্যে শরীর কেটে গেছে ঘুণপোকা। অয়ন্তীকেও কি প্রতিদিন কেটে যাচ্ছে ঘুণপোকা। নাকি এটাও অন্য কথা? প্রতিদিন শরীর বদলায়। শরীর প্রতিদিন নতুনভাবে কথা কয়। অয়ন্তী কি একথা বলে আমাকে অন্য কিছু বুঝিয়েছিল।
আমারও এখন বায়ান্ন। আমার শরীর কি বদলে গেছে। বাইরে এখনও আমাকেও বেশ ভালো দেখায়। লুকানো থাকে বয়স। এই মেয়েটা অয়ন্তী প্রায়ই রহস্যময় কথা বলে। ওর স্বামীটা ছয়দিন বাইরে থাকে। এমন বোঝা যায় ইচ্ছে করলেই মেয়েটার বাসায় যাওয়া যায়। কই যাই না তো। রক্তে সাড়া নেই কেন? আমিও কি ভেতরে এখন নির্জীব মাংসের দলা? ভেতরে কি আমার ঘুণপোকা। নাকি আমিও তৃপ্তির মতোই এখন একটা ঘুণপোকা?
আজ উলঙ্গ হয়ে দাঁড়াব আয়নার সামনে দেখব আমার ঘুণপোকাটাকে।

এই পাতার আরো খবর -
font
আজকের নামাজের সময়সূচী
অক্টোবর - ২০
ফজর৪:৪২
যোহর১১:৪৪
আসর৩:৫১
মাগরিব৫:৩২
এশা৬:৪৪
সূর্যোদয় - ৫:৫৮সূর্যাস্ত - ০৫:২৭
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :