The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ২৮ জুলাই ২০১৪, ১৩ শ্রাবণ ১৪২১, ২৯ রমজান ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ তোবায় আটকা শ্রমিক, বেতন দিচ্ছে বিজিএমইএ

অনুবাদ

সাদাত হাসান মান্টোর গল্প শরীফন অনুবাদ : জাফর আলম

উর্দু কথাসাহিত্যের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর সাদাত হাসান মান্টো। জন্ম—১৯১২ সালের ১১ই মে পাঞ্জাবের লুধিয়ানার সোমরালা গ্রামে। মৃত্যু—১৯৫৫ সালের ১৮ই জানুয়ারি লাহোরে। মাত্র ৪৩ বছর মান্টো বেঁচে ছিলেন। দেশ বিভাগের দাঙ্গা ও পতিতাদের নিয়ে লিখেছেন কিছু অসাধারণ গল্প। বুর্জোয়া সমাজের সকল ভণ্ডামি এবং অপকর্মের বিরুদ্ধে মান্টো সারা জীবন লড়াই করেছেন, অশ্লীলতার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছেন, কিন্তু নতি স্বীকার করেননি। সালমান রুশদি তাঁকে আধুনিক ভারতীয় ছোটগল্পের অবিতর্কিত শ্রেষ্ঠ রূপকার (undisputed master of modern Indian Short Story) বলে শ্রদ্ধা জনিয়েছেন। মান্টোর ইংরেজি লেখক খালিদ হাসান বলেছেন, ‘মান্টো শুধু আমাদের দক্ষিণ এশিয়া মহাদেশের নয়, সারা দুনিয়ার সবচেয়ে বড় লেখকদের একজন।’ একথা ষোল আনা সত্য।
ভারত বিভাগের দাঙ্গার ওপর ‘শরীফন’ মান্টোর একটি বিখ্যাত গল্প।
কাশেম যখন ঘরে ফিরে আসে তখনও তার পা বেদনায় টন টন করছিল। কারণ, পায়ের গোড়ালিতে একটি গুলি বিদ্ধ হয়ে গভীরে চলে গিয়েছিল। ঘরে ঢুকেই স্ত্রীর লাশ দেখতে পেয়ে তার মাথায় খুন চাপে। পাশে পড়েছিল একটি কুড়াল। কুড়ালটি হাতে নিয়ে সে হত্যা ও লুটপাটের জন্য পাগলের মতো আবার ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে। হঠাত্ তার শরীফনের কথা মনে পড়ে। সে চিত্কার করে শরীফন শরীফন নাম ধরে ডাকতে থাকে।
সামনের দালানটির দরজা বন্ধ। কাশেম ভাবে, হয়তো ভয়ে মেয়েটি সেখানেই লুকিয়ে আছে। সে দালানের দরজার কাছে গিয়ে হাঁক দেয়। শরীফন শরীফন আমি তোমার আব্বা। কিন্তু ভেতর থেকে কোনো উত্তর আসে না। কাশেম দুহাতে দরজা ধাক্কা দিতেই খুলে যায়। সে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে উঠে দাঁড়াতেই কাশেম চিত্কার করে ওঠে। মাত্র কয়েক গজ দূরে এক যুবতীর লাশ পড়ে আছে। সম্পূর্ণ নগ্ন, ফরসা, সবল দেহের গড়ন। বুকের ছোট ছোট দুটি উদ্যত স্তন ছাদের দিকে উঁচু হয়ে আছে। কাশেমের সারা দেহ শিউরে ওঠে। কিন্তু জমাট কান্না ঠোঁট পর্যন্ত আসে না। তার চোখ দুটি আপনা আপনি বুজে আসে।
সে কম্পিত দুহাতে মুখ ঢেকে ফেলে। কণ্ঠ থেকে শুধু শব্দ বেরুচ্ছে, ‘শরীফন’। সে গৃহের এদিক সেদিক থেকে কাপড় কুড়িয়ে আনে এবং তা শরীফনের লাশের ওপর ঢেকে দিয়েই ত্বরিত ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে।
বাইরে এসে স্ত্রীর লাশ আর দেখতে পায় না। কারণ, শরীফনের নগ্ন লাশের ছবি তার চোখে তখনও ভাসছে। কাশেমের ডান পায়ের গোড়ালিতে বিদ্ধ গুলি একই অবস্থায় আছে। গৃহে প্রবেশ করার পরই তার কল্পনায় একটি মাত্র চিন্তা ছিল। তার প্রিয়তমা স্ত্রী নিহত হয়েছে, দুষ্কৃতকারীদের হাতে।
এখন স্ত্রীর মৃত্যুর বেদনাও তার মন থেকে উবে গেছে। চোখের সামনে শুধু একটি মানচিত্র ভাসছে—শরীফনের নগ্ন লাশ। বর্শার ফলার মতো এই দৃশ্য। এই দৃশ্য তার চোখ থেকে হূদয়ের গভীরে প্রবেশ করে।
কুড়ালটা হাতে নিয়ে কাশেম একটি জনশূন্য বাজারের মাঝ দিয়ে হেঁটে চলে। চকের কাছে একজন স্বাস্থ্যবান শিক যুবকের সাথে তার সংঘর্ষ বাঁধে। কাশেম ক্ষিপ্তবেগে এমন প্রচণ্ড হামলা চালায় যে, এই শিক যুবক ঝড়ে উপড়ানো গাছের মতো মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। কাশেমের দেহের শিরায় রক্ত উত্তপ্ততর হয়ে ওঠে, যেন আগুনে ফুটন্ত তেলের অবস্থা। এক ফোঁটা পানি পড়লে ছ্যাঁত্ করে উঠবে।
দূরে সড়কের ওপারে কয়েকজন লোক দেখা যাচ্ছে। সে দ্রুতগতিতে তাদের দিকে ছুটে যায়। তাকে দেখে সমবেত লোকজন ‘হর হর মহাদেব’ শ্লোগান দিতে শুরু করে।
কাশেম অশ্লীল ভাষায় তাদের গালিগালাজ করে তার কুড়ালখানি খাড়া করে শূন্যে তুলে তাদের মাঝে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কয়েক মিনিট পর তিনটি লাশ সড়কের ওপর পড়ে ছটফট করতে দেখা যায় এবং বাকিরা পালিয়ে যায়। কিন্তু কাশেম অনেকক্ষণ ধরে কুড়ালখানি শূন্যে ঘুরাতেই থাকে। আসলে সে চোখ বন্ধ করে কুড়াল চালাচ্ছে। এই ভাবে কুড়াল চালাতে চালাতে সে একটি লাশের সাথে হোঁচট খেয়ে মাটিতে পড়ে যায়। তার ধারণা, হয়তো তাকে ঘেরাও করা হয়েছে। তাই সে অশ্লীল ভাষায় চিত্কার করে গালাগাল করতে থাকে এবং বলতে থাকে, ‘আমাকে মেরে ফেলো, আমাকে মেরে ফেলো।’ কিন্তু যখন অনেকক্ষণ যাবত্ কেউ তার গায়ে হাত দেয়নি, দেহে কোনো আঘাত হানেনি, তখন ধীরে ধীরে চোখ খুলে সে দেখতে পায়, তিনটি লাশের পাশে সে পড়ে আছে। আশপাশে একটি লোকও নেই।
কাশেম কিছুটা হতাশ হয়। কারণ সে মরতে চেয়েছিল। কিন্তু শরীফনের নগ্ন লাশ আবার তার চোখের সামনে ভেসে উঠতেই সে অস্থির হয়ে ওঠে, যেন কেউ তার দুচোখে গরম গলিত ধাতু ঢেলে দিয়েছে।
সারা দেহে বিদ্যুতের তরঙ্গ খেলে যায়, যেন দেহখানি আগুনের স্ফূলিঙ্গে রূপান্তরিত হয়েছে। কিন্তু তবুও সে গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ায় আর ছোট্ট কুড়ালখানি হাতে নিয়ে উন্মত্ত সাগর তরঙ্গের মতো ছুটে চলে।
সে কয়েকটি বাজার অতিক্রম করে কিন্তু সেখানে জনশূন্য। সে একটি গলিতে প্রবেশ করে আর সেখানে সকলে মুসলমান।
হতাশ হয়ে সে আবার অন্যদিকে যাত্রা করে। সে একটি বাজারে গিয়ে পৌঁছে, কুড়ালখানি শূন্যে ঘুরাতে ঘুরাতে অশ্লীল ভাষায় লোকজনকে মা-বোনের ইজ্জত নিয়ে গালাগালি করে। এতেও তার সাধ মেটেনি। তাই সে আবার তাদের মেয়ে নিয়ে অশ্লীল ভাষায় গালাগালি করতে থাকে। কিন্তু কেউ এগিয়ে আসে না। অবশেষে সে একটি বাড়ির দিকে এগিয়ে যায়। বাড়ির দরজায় হিন্দিতে কিছু কথা লিখা ছিল। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। কাশেম কুড়াল দিয়ে দরজায় অবিরাম আঘাত হানতে থাকে।
হাত থেকে কুড়ালখানি ছুঁড়ে ফেলে সে মেয়েটির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, মেয়েটি দরজার ওপাশে দাঁড়িয়েছিল। তাকে ধাক্কা দিয়ে ঘরের ভেতর নিয়ে যায়। প্রথমে পাগলের মতো মেয়েটির জামা-কাপড় দুহাতে টেনে ছিঁড়তে থাকে যেন লেপ-তোষকের ধূমকর তুলা ধূনে বাতাসে উড়িয়ে দিচ্ছে। প্রায় আধঘণ্টা যাবত্ কাশেম প্রতিশোধ নেয়ার আক্রোশে এই ধরনের কাজে ব্যস্ত থাকে। মেয়েটি কোনো বাধা দেয়নি, কারণ, মেয়েটি মেঝেতে পড়ে সাথে সাথে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল। কাশেম চোখ খুলে দেখে, সে মেয়েটির গলা দুহাতে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে। এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে সে উঠে দাঁড়ায়। তার সারা দেহ ঘেমে ওঠে, আর একবার আত্মতৃপ্তির জন্য মেয়েটির দিকে তাকায়।
একগজ দূরে এক যুবতীর লাশ পড়ে আছে সম্পূর্ণ নগ্ন। সুন্দর চেহারা আর নিটোল দেহের গড়ন। ছোট ছোট স্তন দুটি ছাদের দিকে ঊর্ধ্বমুখী। কাশেম সহসা চোখ বন্ধ করে নেয়। দেহের উষ্ণ ঘামের বিন্দু শীতল হয়ে পড়েছে। আর প্রতিটি রক্তস্রোত পাথরের মতো জমাট হওয়ার উপক্রম হয়। কিছুক্ষণ পর খোলা তরবারি হাতে নিয়ে একজন লোক ঘরে প্রবেশ করে। লোকটি দেখল, একজন লোক চোখ বন্ধ করে মেঝেতে পড়ে থাকা একটি জিনিসের ওপর কম্পিত হাতে কম্বল ঢেকে দিচ্ছে।
কাশেমের টনক নড়ে। সে চোখ মেলে তাকায়, কিন্তু তার কিছু নজরে পড়ে না। তরবারিধারী লোকটি চিত্কার করে ওঠে, ‘কাশেম’।
কাশেম সম্বিত ফিরে পায় এবং দূরে দাঁড়ানো লোকটিকে চিনতে চেষ্টা করে, কিন্তু চিনতে পারে না।
লোকটি ভীত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করে, ‘তুমি এখানে কী করছ?’
কাশেম মেঝেতে পড়ে থাকা কম্বলটির দিকে কম্পিত হাতে ইশারা করে এবং ধীর কণ্ঠে উত্তর দেয়, ‘শরীফন’।
তরবারিধারী লোকটি দ্রুতপায়ে সম্মুখে এগিয়ে আসে এবং দ্রুত কম্বল সরিয়ে দেখে, নগ্ন এক তরুণীর লাশ।
লোকটি প্রথমে কেঁপে ওঠে, পরক্ষণেই চোখ বন্ধ করে নেয়। তার হাত থেকে তরবারি ছিটকে মাটিতে পড়ে যায়। দুহাতে মুখ ঢেকে ‘বিমলা, বিমলা’ বলে ডাকতে ডাকতে কম্পিত পায়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে।

এই পাতার আরো খবর -
font
আজকের নামাজের সময়সূচী
জুন - ২৪
ফজর৩:৪৪
যোহর১২:০১
আসর৪:৪১
মাগরিব৬:৫২
এশা৮:১৭
সূর্যোদয় - ৫:১২সূর্যাস্ত - ০৬:৪৭
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :