The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ২৮ জুলাই ২০১৪, ১৩ শ্রাবণ ১৪২১, ২৯ রমজান ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ তোবায় আটকা শ্রমিক, বেতন দিচ্ছে বিজিএমইএ

বড় গল্প

বাসনালয়

মাকিদ হায়দার

কাঁসারি পট্টির সবচেয়ে ভালো দোকানটির নাম “রজত বাসনালয়”। রজত বাসনালয়ের আশে-পাশে আরও চার-পাঁচটি দোকান থাকলেও কাঁসারি পট্টির রজত বাসনালয়ের চাকচিক্য দেখে ক্রেতারা প্রথমেই যায় ঐ দোকানেই, হাঁড়ি, কলসি, পানির জগ, থালা ময়ূর ভঞ্জের ড়পা,ডপা, পানির গ্লাস, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ফুলতোলা কাঁসার থালা এবং পেতলের বদনাসহ পূজার প্রদীপ, অন্নপ্রাশনের থালা কি নাই রজত বাসনালয়ে— সবই আছে। এমনকি জামালপুরের, ইসলামপুরের সুরেশ আর নরেশ কর্মকারের কাঁসা পেতলের এক পা শূন্যে তোলা সেই নটরাজের পেতলের পট। বিয়ে, জন্মদিন, অন্নপ্রাশনের থালা-বাসন ক্রেতারা যখন কিনতে যান ঐ রজত বাসনালয়ে, তখন অনেক হিন্দু ক্রেতাই জানতে চান, প্রশ্ন করেন, মহাপ্রভু শিব, নটরাজ হঠাত্ কেন পা তুলেছিলেন? এই সহজ প্রশ্নের সহজ উত্তর রজত কাঁসারি হেসে হেসেই জানিয়ে দেন।
প্রভুদের ইচ্ছা বোঝা সাধারণ মানুষের কর্ম তালিকার বাইরে, তবে নটরাজ মহাপ্রভু চেয়েছিলেন, ত্রিভুবনকে ধ্বংস করে দিতে। শিক্ষা দিতে চেয়েছিলেন, প্রলয় ঝঞ্ঝা, অসুখ-বিসুখ আর অশান্তি দিয়ে সতী, পার্বতী, দুর্গা এ সকল দেবী যদিও প্রভুর স্ত্রী, সকল স্ত্রী যেদিন প্রভুর কথার বাইরে গেলেন সেইদিনই, সেই ক্ষণেই প্রভু ক্ষিপ্ত হয়ে ডিসিশন নিলেন, মায়াময় পৃথিবী ধ্বংস করে দেবেন, পা সবেমাত্র তুলেছেন— সেই পা তোলাটাই হচ্ছে মহারাজ নটরাজের। আমার ঠাকুরদা বলতেন, নটরাজ যদি ঐদিন পা না তুলতেন, তাহলে বাড়িঘর সবকিছু আগুনে পুড়িয়ে দিতো বাসুকীর দল। বাসুকীরা ভেবেছিলো, নটরাজ তাদেরকে লাথি দিয়ে পৃথিবী থেকে বিলীন করে দেবে, সেই ভয়ে আর— ঠাকুরদা কাউকে বলেননি, বাসুকীরা কোন দেশ থেকে এসেছিলো, আমি জানতে চেয়ে ঠাকুরদার ধমক খেয়েছিলাম, তিনি শুধু বলেছিলেন,
বলা নিষেধ আছে মহাভারতে।
রজত যেভাবে গুছিয়ে যে এই সময়ের বাসনকোসন কেনার ক্রেতাদেরই বললেন তাই নয়, বহুজনকে বহুবার ঐ একই গলায় একই কথা শোনাতে হয়েছে তাকে। বিশেষত যারা চকচকে ঝকঝকে নটরাজ দেখার পর থেকে স্থির করেন শিব ঠাকুরকে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে পূজো, অর্চনা দেবার আগে বাজার থেকে ফেরার পথে কিছু জবা, বেলী ফুল কিনে নিয়ে যেতে হবে এবং এই রজত বাসনালয় থেকে নিতে হবে পায়ের নূপুর, নিতে হবে নতুন বাছুরের জন্য গলার ঘন্টি।
অন্য সকল দোকানে যে নাচের নূপুর, গরুর গলার ঘন্টি, এমনকি হাঁটি হাঁটি পা পা ন্যাংটো ছেলে-মেয়েদের ও ছোট ছোট ঝুনঝুনি বাচ্চাদের মাজায়, কালো সূতো দিয়ে বেঁধে দিলে মা-কাকীরা বুঝতে পারেন ঝুনঝুনির শব্দে বাচ্চাটি কোনদিকে গিয়েছে। পাল পাড়ার খোকন পালের ছেলেকে যদি ঐ ঝুনঝুনি মাজায় কেউ পরিয়ে দিতেন তাহলে খোকনের ছেলেকে পুকুরের জলের ভেতর থেকে কেউ তুলতো না লাশ হিসেবে অমাবস্যার সন্ধ্যায়।
সেই ঝুনঝুনি, পায়ের নূপুর দেখেই নরেন বাবু ঠিক করলেন, ঝুনঝুনি কিনতে হবে নতুন বাছুরটার জন্যে। আর নূপুর তার ছোট মেয়ে সাবিত্রীর জন্যে। মাত্র বছর খানেকের মধ্যে রাজশাহী শহরের বিভিন্ন মহল্লায় নাচের স্কুল খোলার পরে নূপুরের চাহিদা নিশ্চয়ই আগের চেয়ে বেড়েছে, নয়তো রজত বাসনালয়ে এতো নূপুর রাখবে কেন রজত কাঁসারি। সিপাইপাড়া, লক্ষ্মীপুর, এমনকি সাগরপাড়াতেও নৃত্যকলা একাডেমী নাম দিয়ে স্কুল খুলেছে একই মালিক নৃত্যগুরু রতন সাহা। তিনি তাঁর স্কুলের সামনে বড়ো বড়ো সাইনবোর্ডে লিখে দিয়েছেন- “এই একাডেমীতে অতি যত্নের সহিত রবীন্দ্র, নজরুল, পল্লীগীতি, বাঁশি এবং নৃত্য (বা নাচ) শেখানো হয়। পরীক্ষা প্রার্থনীয়। নৃত্যগুরু রতন সাহা”।
দরগাপাড়ার দিকে নৃত্যকলা একাডেমির কোন শাখা খোলেননি রতন বাবু, কেননা তারই শ্যালক রজত তাকে নিষেধ করেছিলেন, এবং কেন নিষেধ করেছিলেন সেটিও জানিয়ে দিয়েছিলেন জামাই বাবুকে, দরগাপাড়া নামটির ভেতরে একটি ধর্মীয় ব্যাপার-স্যাপার আছে তাই যদি ভবিষ্যতে খুলতেই হয় নৃত্যকলা একাডেমির কোন শাখা তাহলে মতিহারে খোলা যেতে পারে। আজকাল নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলে-মেয়েরাও নাচ,গান শিখছে।
নরেন বাবু এসেছিলেন পাশের বাড়ির ছেলেটির অন্নপ্রাশনের থালা-বাটি কিনতে। বাটি আর কেনা হলো না, বাটির ১০ টাকা দিয়ে তিনি কিনলেন অনেকগুলো নূপুর। মেয়ের এবং সদ্যজাত বাছুরটির জন্যে। বাছুরটি এঁড়ে হবার সুবাদে যেভাবে দৌড়াদৌড়ি শুরু করেছে, এখনই গলায় ঝুনঝুনি না পরালে কোথায় কোনদিকে চলে যাবে তখন হয়তো খুঁজেই পাওয়াটাই হবে মুশকিল। নরেন বাবুর দেখাদেখি খান ইউসুফও কিনলেন অনেকগুলো নয়, মাত্র ৪টি, তার গরুটিও বাছুর দেবে দিন সাতেকের মধ্যেই। ইউসুফ সাহেব ইচ্ছে করেই কিনবেন না পায়ের নূপুর। যদিও তার মেয়ে জেসমিনের খুব ইচ্ছে নাচ, গান শেখার, ইউসুফের স্ত্রী রাজি হলেও হননি ইউসুফ, উপরন্তু তাদের বাড়ি ঐ দরগাপাড়া মহল্লায়। যদিও জেসমিনের গলায় যারা দুই একবার গান শুনেছেন স্কুলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, তারাই ইউসুফ সাহেবকে বলেছিলেন মেয়েটিকে গান শেখালে বিশেষত রবীন্দ্র সংগীত, রাজশাহী বেতারে ভবিষ্যতে গান গাইলে আমরা শুনতে পাবো, আপনিও পাবেন, এমনকি রেডিওতে গান গাইলে নাকি টাকা পাওয়া যায়। দেশে বিদেশে সুনামও ছড়িয়ে পড়ে। খান ইউসুফ বলেছিলেন—
ভবিষ্যতে দেখা যাবে।
নরেন বাবুকে অতোগুলো নূপুর আর ঝুনঝুনি কিনতে দেখে ইউসুফের মনে হয়েছিলো, লোকটির বাড়িতে অনেকগুলো মেয়ে আর অনেকগুলো গরু ছাগলের বাচ্চা না থাকলে পরেরটুকু আর ভাবতে পারেননি তিনি, হঠাত্ মনে পড়েছিলো জেসমিনকে চোখের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে, মেয়েটি আজকাল নাকি চোখে কম দেখছে।
রজত বাসনালয়ে সবসময় ভিড় লেগেই থাকে। দু’জন তিনজন সেলসবয়ও অনেক সময় হাঁপিয়ে ওঠে। বিশেষত আশ্বিন-কার্তিক মাসে, বিশেষত বিয়ের মৌসুম শুরু হবার আগে জামাই বাবু নৃত্যগুরু রতন সাহার পরামর্শেই রজতকে এক সেলসবয়ের জায়গাতে আরো দু’জনকে রাখতে হয়। সেলসবয়দের দায়িত্বটা এক একজনের এক একরকম। বড়ো কাঁসার কলসের গায়ে চক মাটি, কালো রং দেবে হরিপদ, ঝাড়ু দেবে দোকান, সুশীল, থালা-বাসন বাটি গ্লাস সবগুলো মুছবে দোকান খোলার সাথে কেন রোকনালী রজত সাহা নিজ হাতে দোকানে জল ছিটোবে, সিদ্ধিদাতা গণেশের গলায় কাগজের ফুল দিবে, পরিষ্কার করবে ফুঁ দিয়ে, এবং গণেশের সামনে বসে মন্ত্রোচ্চারণের শেষে জ্বালবে আগরবাতি। আগরবাতি জ্বালিয়ে নিজের হাতে ধূলাবালি ঝাড়পোছ করবেন, নটরাজকে সামনে নিয়ে মাথা নোয়াবেন তিনবার এবং প্রতিদিনের মতো আজকেও বলবেন,
মহাপ্রভু, তুমি রক্ষা করো, বার দু’য়েক তাকাবেন সিদ্ধিদাতা গণেশের দিকে, আজকেও তাকালেন, তবে সিদ্ধিদাতাকে আজকে খুবই উত্ফুল্ল মনে হলো, যেদিন সিদ্ধিদাতাকে উত্ফুল্ল মনে হয়, সেদিনটিতে অন্যান্য দিনের চেয়ে থালা-বাসন, পানির জগ, এমনকি ঠাকুরঘরের ঘন্টিও বেশি বিক্রি হয়। যেমন আজকে তার ব্যতিক্রম হয়নি, অথচ গত ভাদ্র মাসটায় যেমন ছিলো গরম, তেমন ছিলো না হিন্দু-মুসলমানদের বিয়ে। হিন্দু-মুসলমান, উভয়ের ভাদ্র মাসে ছেলে-মেয়েকে বিয়ে দিতে চান না উপরন্তু হঠাত্ মেয়ের যদি বিয়ে হয়েও থাকে মেয়ের বাবা মা-মেয়েকে শ্বশুরবাড়ি পাঠাবার জন্য ভাদ্র মাসে নতুন বউয়ের পা দেখা, মঙ্গল নয় বলেই শ্বশুরবাড়ি মরা ভাদ্রে মেয়েকে পাঠায় না। হিন্দু, মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষরা।
মরা ভাদ্রে কৃষকের হাতে টাকা না থাকায় থালা বাসন, এমনকি বিয়ের শাড়ি, গয়নাপাতি কেনা বেচাও অনেকটা কম হয় আশ্বিন কার্তিকের তুলনায়। কারো কারো ধারণা কার্তিক মাসটিও নাকি মরা। রজত কাঁসারি অন্তত এ কথায় বিশ্বাসী নয়। বিশ্বাসী হলে অন্যান্য আশেপাশের আরো ৪-৫টি থালা বাসনের দোকান থাকলেও রজত বাসনালয়ে এতো ক্রেতার সমাগম হবে কেন? রজত দোকান খোলার আগে যাবতীয় ভাবনা-চিন্তা থেকে অন্তত মিনিট সাত, আটেক দোকান ঘরের ঠাকুরদের পূজো অর্চনার কথা মনে রেখেই বাড়ির দোতলায় ছোট্ট পূজা ঘরের চারিদিকে ধূপ, ধুনা, মা গঙ্গার পবিত্র জল ছিটিয়ে নিজেকে ইহজগত্ থেকে নিয়ে যান পরজগতে, সাত আট মিনিট নিঃশব্দে বেদমন্ত্র থেকে শুরু করে গীতার শ্লোক, মাথা নত করে - মা-মা জগধাত্রী, তুমিই একমাত্র মঙ্গলময়। তুমিই উদ্ধারকারী, মন্ত্র পাঠ, পূজা শেষে রজত কাঁসারি বুঝতে পারেন তার দুই চোখ ভেজা। চোখে জলধারা। আজকেও তার ব্যতিক্রম হলো না। হঠাত্ তার মনে হলো ইহজগতের চেয়ে অনেক বেশি সুখস্বাচ্ছন্দ্যের জগত্ পরলোকে। কথাগুলো কেন যে, এই সাত সকালে তাকে পেয়ে বসেছিলো, তিনি নিজেও জানেন না।
সকালের মৃদুমন্দ বাতাসে প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়ে যে লোকটির আজ সঙ্গে দেখা, সেই লোকটিকে কেউই পছন্দ করেন না, উপরন্তু যদি জগত্ মোদকের সাথে সাত সকালে কারো দেখা হয়, সেই দিনটি নাকি অশুভ দিন হিসেবেই গণ্য করেন পাড়া প্রতিবেশীদের সকলেই, এমনকি এর আগে যাদের সঙ্গে প্রাতঃভ্রমণে জগত্ মোদকের দেখা হয়েছে, সেইদিন সকাল থেকে ব্যবসা বাণিজ্য ভালোতো যায়ইনি, এমনও শোনা গিয়েছে জানিয়েছে রজতের জামাই বাবু নৃত্যগুরু রতন সাহা, তার নিজেরই স্ত্রীর সঙ্গে সারাটা দিন অকারণেই ঝগড়া, মন কষাকষি হয়েছে। যদিও আমি, তোমার দিদিকে জানায়নি, প্রাতঃভ্রমণে জগতের সাথে দেখা হয়েছিলো আজ।
এ পাড়ার সকলেই জানেন জগত্ মোদক নিঃসন্তান, স্ত্রীও নাকি বাঁজা। অনেকবার ডাক্তার, কবিরাজ হাতুড়ে দেখিয়েও কোন ব্যবস্থা হয়নি জগতের স্ত্রীর। সকলেই জগেক বুঝিয়েছিলেন পালক ছেলে অথবা মেয়ে দত্তক নিতে, জগতের একান্ত ইচ্ছা থাকলেও বাদ সেধেছে রাধারানী। এছাড়াও সকলেই জানেন জগত্ সুদের ব্যবসায় সবচে’ বেশি সুদ নিলেও একান্তই যারা সুদ না দিয়ে আসল ফিরিয়ে দিলেও আজ পর্যন্ত তারাও কেউ জগেক ভালো বলেননি বরং বলেছেন, সুদখোর জগত্ মোদক। শ্মশানে গেলে তোর অতো টাকা সাতভূতে খাবে। যদি ছেলে-মেয়ে থাকতো, তবে না হয় নৃত্যগুরু রতন— রজতকে আরো বলেছিলো লোকটি অপয়া হলেও মনটা নাকি তার বেশ প্রশস্ত। দুর্গা পূজোয় সাহেববাজারের অন্য ব্যবসায়ীরা যে ক’টাকা দিয়েছেন তারচে’ অনেক বেশি না দিলে কুমোরপাড়ার কুমোরদের বিদায় করাটাই হয়ে যেতো কষ্টকর। জগত্ আমাকেই বলেছিলেন গণেশের দয়ায় অনেক হয়েছে, দিয়েছেন ভগবান, দিয়েছেন জগত্ মায়ের সেবার জন্য। সেই মা-মাত্র দিন কয়েকের জন্য আসবেন, মাকে তার সন্তানেরা যদি ঠিকমতো সেবা শুশ্রূষা, পূজো, অর্চনা না করেন, তাহলে মা দুর্গা অভিশাপ দেবেন, সেই অভিশাপ লাগবে গণেশ ঠাকুরের গায়ে, মা-লক্ষ্মীর শরীরের যেনো মা দুর্গা অভিশাপ না দিতে পারেন। মায়ের জন্য যা করতে হয় তাই করা হবে। সে বছর জগত্ মোদক তাই-ই করেছিলেন, তারপরও। তাকে নিয়ে বাজে কথা।
নৃত্যগুরু কথা না বাড়িয়ে চলে যাবার দিন দু’য়েক পরে আজ অতি সকালে রজতের সাথে দেখা হলো জগত্ মোদকের সাথে ভুবন মোহন পার্কের মাঝখানে। দু’জনার কথা যেটুকু হলো, তারচে’ না হওয়াটাই ভালো ছিলো জগত্ নিজ থেকেই বলেছিলো, ‘সুপ্রভাত,’ সুপ্রভাতের প্রতি-উত্তর না দিয়ে হাসির গতি বাড়িয়ে সরাসরি বোসপাড়ার নিজের বাড়িতে এসেই ঢুকে পড়েছিলেন স্নানাগারে। স্নান শেষে স্ত্রী পূরবীকে কিছু না বলেই প্রাতঃরাশ না সেরেই চলে এসেছিলেন দ্রুতপায়ে রজত সাহা তার রজত বাসনালয়ে। সাহেব বাজারে।
যে শহরে সাহেব বাজার আছে, নিশ্চয়ই সেই শহরে আছে রানীবাজার। আরো আছে সোনাপট্টি, আলুপট্টি, বোসপট্টি। সেই সাহেব বাজারের বাসন পট্টিতে এসে রজত নিজেই একটা বোকা বনে গেলেন, বাসন পট্টির কোন দোকানতো খোলাই হয়নি, এমনকি সোনা পট্টির সোনার দোকানগুলোর একটিও কেউ খোলেনি, যেন নিজের কাছে নিজেই লজ্জা পেলেন। সাত সকালে মোদকের সঙ্গে যদি দেখা না হতো, তাহলে ধীরে সুস্থে সকালের খাবারটা পূরবীর সঙ্গে খেয়ে, গল্পগুজব করে আসা যেতো। আবার এখন যদি সেই বোসপাড়ায় নিজের বাড়ির দিকে ফিরে যায়।
স্বভাবতই পুরবী জানতে চাইবে কোথায় গিয়েছিলে? সেই মুহূর্তে যেন পূরবীর প্রশ্নটি বার দুয়েক কানে দোলা লাগার পরেই রজত নিশ্চিত করলো নিজেকে। সে এখন বোসপাড়ায় ফিরে না গিয়ে রাজশাহী মিষ্টান্ন ভান্ডারে গিয়ে সকালের লুচি, ভাজিটা দিয়ে সেরে নেবে সকারের খাবার। রাজশাহী মিষ্টান্ন ভান্ডারের মালিক হরগোবিন্দ সাহা পুরবীদের সম্পর্কের আত্মীয় হলেও রজতের সঙ্গে সম্পর্কটা মধুর না হবার কারণ, গত বছরের দুর্গোত্সবে হরগোবিন্দ বাবু যে টাকা দেবেন বলে পূজা কমিটিকে জানিয়েছিলেন, সে টাকাতো দেনইনি, বরং মিথ্যে বলেছিলো দুর্গোত্সবে তারা সপরিবারে মুর্শিদাবাদ যাবে, শ্বশুর বাড়ি।
হরগোবিন্দ মুর্শিদাবাদ যেতে পারেননি, পাসপোর্ট থাকলেও পাসপোর্টের মেয়াদ কবে যে শেষ হয়ে গিয়েছিলো সে খেয়াল না থাকলেও তার ঠিকই খেয়াল থাকে ভান্ডারের মিষ্টিগুলো যেন সুন্দরভাবে তৈরি করা হয়। লুচি ভাজি তিনি নিজ হাতে ভাজতে ভাজতেই লক্ষ্য রাখেন ক্যাশ বাক্সের দিকে এবং কতোজন খরিদ্দার সাত সকালে তার দোকানে এসেছেন লুচি ভাজি খেতে। হঠাত্ রজতকে দেখে তার মনে পড়ে যায়, গত বছর দুর্গোত্সবে টাকা না দেয়ায় রজত আমাকে যে ভাবে অপমান করে ছিলো সেই কথা আমৃত্যু মনে রাখবো, সময় সুযোগ পেলে আমিও শুনিয়ে দেবো হাজার কথা। হাজার কথা না শুনিয়ে শোনালেন, লুচি আর ভাজির দাম ১ টাকা, সঙ্গে আরো জানালেন, এখানে চা পাওয়া যাবে না, যাবে রহমানিয়া রেস্টুরেন্টে।
চা খেয়ে সিগারেট খেয়েও যেন সময় কাটতে চায় না- আর এই সকাল আটটা-সাড়ে আটটায় যদি দোকান খুলেও ফেলি পয়ঃপরিষ্কার, ঠাকুর দেবতার জন্য ধূপ,ধুনা, ঘরে জল ছিটানো, থেকে শুরু করে ঘরঝাড় দেয়াসহ যাবতীয় কাজ আমার একার পক্ষে করা সম্ভব নয়, সম্ভব হবে তখুনি সেলস বয়গুলো আসুক। বাসন-পট্টির আরো কয়েকটি দোকানের মালিক, সেলস বয়রা যখন আসবে, তখন নিশ্চয়ই আমার দোকানের ছেলেগুলোও নিশ্চয়ই আসবে, এই দোলাচলের ভেতরে কিছুটা সময় যেতে না যেতেই দেখা হলো নরেন বাবুর সাথে, হাতে বাজারের ঝোলা নিয়ে বাজারে যাবার পথে নরেন বাবু নিজেই রজতকে নমস্কার জানিয়ে জানতে চাইলেন,
‘রজত বাবু আজ সাত সকালে যে?
রজত, নরেনের কথাকে সামনের দিকে এগোবার আগেই হেসে জানিয়ে দিলেন,
“কিছু হিসেব কিতাব আছে, কয়েকদিন পরেই চৈত্র মাস শুরু হবে,
রজত হয়তো আরো কিছু বলতেন, নরেন বাবু মৃদু হেসে জানালেন, এবারের চৈত্র সংক্রান্তিতে হাজরা খেলাটি হবে ভুবন মোহন পার্কে, আর বৈশাখি মেলাটি হবে রাজশাহী কলেজের মাঠে। আপনিতো প্রতিবছর হালখাতা করেন, এবারও নিশ্চয়ই করবেন, নরেন বাবু কথা না বাড়িয়ে বাজারের ব্যাগটা দেখিয়ে দু’এক পা এগিয়ে গিয়ে আবার ফিরে এসে জানালেন, আপনি তাড়াতাড়ি দোকান খুলুন বাজার থেকে ফেরার পথে অন্নপ্রাশনের একটি কাঁসার থালা, দুটি বাটি আর দুটি জল খাবার গ্লাস নিয়ে যাবো, সাত সকালে বাকি নেব না, আগের যা কিছু বাকি আছে পাবেন হালখাতায়।
নরেন বাবু চলে যাবার পরেই নিজেকে খুব হালকা মনে হলো রজত সাহার। যেন পৃথিবীর সমস্ত প্রসন্নতা তাকে এই মুহূর্তে ঘিরে ধরেছে যেন বকুল, গোলাপ, কৃষ্ণচূড়া তাকে কাছে ডাকছে, যেন ডেকে বলছে, জগত্ মোদক নিঃসন্তান হলেও অপয়া নন, ভগবান তাকে বঞ্চিত করেছেন সন্তানাদি না দিয়ে, সেটিতো তার অপরাধ নয়। তিনিই তোমাকে আজ প্রাতঃভ্রমণের সময়, তোমার জন্যে ঈশ্বরের নিকট প্রার্থনা করেছিলেন, তোমার যেন আরো আয় উন্নতি হয়, যেন তুমি সামনের দুর্গোত্সবে আলুপট্টিতে রানীবাজারের, অথবা অলকার মোড়ে দুর্গোত্সবে তোমার দেয়া দান-দক্ষিণা যেন সবার উপরে থাকে। জগত্ মোদককে দেখলেই যে দিনটি খারাপ যাবে কথাটি যে ঠিক নয়, সেটির প্রমাণতো একটু আগেই দিয়ে গেলেন নরেন বাবু অন্নপ্রাশনের থালা, বাটি, জলের গ্লাস, বাজার থেকে ফিরেই নগদ টাকায় নিয়ে যাবেন।
পৃথিবীর সমস্ত প্রসন্নতায় রজত নিজেকে সেই মুহূর্তে সুখী মানুষের, ভালো মানুষের সারিতে দেখতে পেলেন, এমনকি সেই সারিতেই দেখতে পেলেন আরো একটি ভালো মানুষের মুখ জগত্ মোদকের। মোদক যেন তাকে বলছেন, তাড়াতাড়ি রজত- তোমার বাসনালয়টি খুলে ফেলো, আজ অন্যান্য বাসনালয়ে যা বিক্রি হবে, তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি বিক্রি হবে তোমার রজত বাসনালয়ে। এমনকি এই কাসারিপট্টিতে যে কয়েকজনের বাসনালয়, কাঁসা পিতলের ভান্ডার আছে তাদের ভেতরে যে দুই একজন দোকানের মালিক আছেন তারা তোমাকে হিংসা করে, তোমার বেচা-বিক্রি দেখে, বিশেষত লক্ষ্মীপুরের কালা হরেন, আর মুর্শিদাবাদের রিফিউজি সেপাইপাড়ার কট্টর মুসলিম লীগ নেতা মীর গোলাম রসুল।
রজতকে যেন তার স্বপ্নজগত্ থেকে ফিরিয়ে আনলেন নরেন বাবু। রজতই জানতে চাইলেন মাছ মাংসের দাম, তরিতরকারীর বাজার দর, দুজনের কথোপকথনের শেষ সীমায় এসে রজত দেখতে পেলেন তার দোকানের সেলস বয়রা এসে উপস্থিত হয়েছে। রজত বাসনালয়ের সামনে। নরেন বাবুর নিকট থেকে কিছুটা সময় চেয়ে নিয়ে জানালেন, দোকানটি পরিষ্কার ধূপ ধুনা, গনেশ ঠাকুরকে ফুল, পূজা দিতে যে সময়টুকু লাগবে, সেই সময়টুকু তাকে দিতেই হবে, কেননা প্রথম কাস্টমারকে ফেরত দিলে সারাটা দিন বেচা-বিক্রি মোটেই ভালো হবে না। উপরন্তু রজত চা-সিগ্রেটের অফার দিতেই নরেন বাবু আরো জানালেন, ছোট মেয়ে সাবিত্রির জন্যে অনেকগুলো নাচের নূপুরও নিতে হবে। নৃত্য গুরু গতকাল নিজেই বলেছেন আমাকে।
প্রসন্ন সকালের বিক্রিটা এমনভাবে যে শুরু হবে রজত সাহা নিজেও ভাবতে পারেনি, এমনকি নরেন বাবু নগদ ৬২ টাকার থালা, জলের গ্লাস, পায়ের নূপুর এবং মহাপ্রভু নটরাজের পট কিনবেন সেটি তার মাথায় না এলেও, এলো লাভ বেশি হয়নি, হয়েছে মাত্র ১১টাকা, অন্যদিন হলে, ১১ টাকা না হয়ে হতো ২০ টাকার কম নয়, তবু সকালের প্রথম কাস্টমার, লাভ কম হলেও হয়েছে তো ১১ টাকা।
নরেন বাবু কেনাকাটা শেষ করে দোকান থেকে বের হবার সময় রজতকে জানালেন, আগামী ইলেকশানে নাকি মুসলিম লীগ নেতা মীর গোলাম রসুল, ‘ফুল মার্কা নিয়ে ভোটে দাঁড়াবেন, রজত হেসেই জানালেন, যার যেখানে ইচ্ছে দাঁড়াতেই পারে ইলেকশানে, রজতকে থামিয়ে দিয়ে নরেন বাবু আরো যোগ করলেন শেখ মুজিবও দাঁড়াবেন নাকি সামনের ইলেকশানে তাঁর নৌকা মার্কা প্রতীক নিয়ে। ইলেকশান নিয়ে আলাপ আলোচনার মধ্যেই একই সাথে আরো দুই-তিনজন, ক্রেতা এসে উপস্থিত। তাদের উপস্থিতি দেখে মোদকের চেহারা তার সকালের সুপ্রভাতের প্রতিউত্তর না দেয়াটা মোটেই যে শোভন হয়নি, মনে মনে রজত আহত হলেও, সকালের ক্রেতা-লক্ষ্মীদের সাথে হেসে, হেসেই অভ্যর্থনা জানিয়ে তাদের নিকট থেকে সামান্য সময় নিয়ে গনেশ ঠাকুরের কপালে সিঁদূর পরিয়ে গলায় কাগজের ফুল দিয়ে পূজা সম্পন্ন করে জেনে নিলেন, সকালের ক্রেতা-লক্ষ্মীদের কার কি লাগবে, কাঁসার কলস, জলের জগ, গ্লাস, থালা, এমনকি পায়ের নূপুর, বা বাচ্চাদের গলায়, মাজায় পরাবার ঝুনঝুনি এবং সবশেষে সেই শূন্যে পা তোলা শিব ঠাকুর। আবারও প্রসন্ন হলো রজত সাহার সেই শুভ্র সকালের শুভ্র আনন্দের দিনের প্রথম প্রহর। কাসারিপট্টির-বাসনপট্টির, সোনাপট্টির, কাপড়ের পট্টির, এমনকি সেই আলুপট্টির দোকানপাট খুলে গিয়েছে, খুলে গেলেও সাহেব বাজারে ক্রেতাদের সমাগম শুরু হয়নি। এমন সময় রজত বাসনালয়ের সামনে দিয়েই দ্রুত পায়ে হেঁটে গেলেন, মুসলিম লীগ নেতা মীর গোলাম রসুল। তার মীর বাসনালয়ের দিকে রজত বাসনালয় থেকে চারটি দোকান পরে পূর্বদিকের চা দোকানের পাশে। মীর বাসনালয়ে বেচা-বিক্রি কম হবার নাকি কারণও আছে, মালদহের কোন রিফিউজি, মুর্শিদাবাদের রিফিউজিদের যে কোন দোকান থেকে যেন কোন মালামাল কখনোই কেনে না নয়। কারণ, পশ্চিমবঙ্গের ঐ দুই জেলার রিফিউজিদের ভেতরে দীর্ঘদিনের রেষারেষি। কেউ কাউকে দেখাতো দূরে থাক, নাম শুনলেই তাদের নাকি যাত্রা অশুভ হয়ে যায় সারাদিনের জন্য।
মালদহের লোকেরা প্রকাশ্যেই বলে বেড়ান, মুর্শিদাবাদের মানুষেরা সকলেই মীর জাফরের আত্মীয়-স্বজন, নিমক হারাম, বিশ্বাসঘাতক। ওদের সাথে আত্মীয়তা করা যাবে না, এমনকি তাদের কোন দোকান থেকে মালামাল দূরে থাকুক,এক ইঞ্চি সূতা কেউ যদি কেনেন, তাকে সামাজিকভাবে বয়কট করা হবে। যেভাবে করা হয়ে আসছে দেশ বিভাগের পর থেকে। পূর্ব পাকিস্তানে আসবার পর থেকে।
মুর্শিদাবাদের রিফিউজিদের ঐ রকম কথা না থাকলেও তারাতো আর অস্বীকার করতে পারছেন না মীর জাফর-জাফরের বংশধর, তাদের অনাত্মীয়। তারা শুধু প্রকাশ্যেই বলেন, মালদহের মানুষগুলো সুবিধেবাদী, গুণ্ডা বদমাইশ। গুণ্ডা না হলে, সাগরপাড়ার জমিদার বিজয় চৌধুরীর বাড়িঘর একরাতে দখল করে পরের দিন বিজয় বাবুর পরিবারকে একবস্ত্রে রাজশাহী থেকে জোর করে আলুপট্টির নদীর ঘাটে আগে থেকে রাখা নৌকো ও পদ্মা পার করে দিয়েছিলো ঐ মালদহের হাজী বদরউদ্দিনের লোকজন। বদরউদ্দিনের লোকজন গুজব ছড়িয়ে ছিলো, মালদহের আদালতপাড়ায় তাদের যে বাড়িঘর ছিলো ১৫ আগস্টের পর সেই তিনতলা বাড়িটি দখল করিয়ে ছিলেন ঐ শালা মালাউনের বাচ্চা, মালাউন, বিজয় হারামজাদা। কথাটি যে মিথ্যে সে প্রমাণও দিয়েছিলো। মীর বাসনালয়ের মালিক মীর গোলাম রসুল। সেই বাদানুবাদের মাঝে কে বা কারা হেতেম খাঁ, দরগাপাড়া, সিপাইপাড়া, বোসপাড়া অলকা সিনেমা হলের পশ্চিমের খোলামাঠের দক্ষিণের একতলার বাড়িটির দেয়ালে রাতের অন্ধকারে বিশাল বিশাল অক্ষরে লিখে দিয়েছিলো, মুর্শিদাবাদের মীর গোলাম রসুল মীর জাফরের আপন মামার ছেলের ছেলে, সেই ছেলের মেয়ের ঘরের নিমক হারাম মীর গোলাম রসুল। বহরমপুরের গোরাবাজারের বটগাছের নিচে যে মন্দিরটি আছে, সেই মন্দিরের জমানো সোনা গহনা, টাকা পয়সা নিয়ে রাতের অন্ধকারে মাত্র ১২ মাইল পদ্মা নদী পাড়ি দিয়ে এসে উঠেছিলো প্রথমে সাগরপাড়ায়, সেখান থেকে পালিয়ে গিয়ে জেলখানার সামনে গোপাল ঘোষের একতলা বাড়িটি শুধু দখলই করেনি, গোপালের গরু এবং গোয়ালঘর সবই নিয়েছে দখলে এবং গোপালের এক আত্মীয়ের ‘সীমা বাসনালয়’ রাতের অন্ধকারে দখল করে বহরমপুরের গোরাবাজারের মন্দির থেকে যা কিছু লুটপাট করে এনেছিলো সেই সব টাকা থেকে কিছু টাকা আর কিছু সোনা দিয়ে সীমা বাসনালয়ের নাম একরাতে পাল্টে দিয়ে বিশাল সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিলো ‘মীর বাসনালয়’ ।এখানে অতি সুলভ মূল্যে কাঁসার, পেতলের যাবতীয় থালা, বাসন, কলস পাওয়া যায়। পরীক্ষা প্রার্থনীয়।
পরের দিন সাগরপাড়ায় যে সকল প্রাতঃরাশ ভ্রমণকারীরা ঐ দেয়াল লিখন পড়েছিলেন, তারা সকলেই অলকা সিনেমা হলের অলকার মোড়ে দাঁড়িয়ে আলাপ-আলোচনায় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, বিয়েথা, অন্নপ্রাশন, মুসলমানি, যে কোন অনুষ্ঠানেরই হোক না কেন মীর বাসনালয় থেকে জলের কলস কেন, মাটির প্রদীপও কেনা যাবে না। এমনকি নিজেদের ভেতরে নাকি সিদ্ধান্ত হয়েছিলো এখন থেকে সব কিছু কেনা হবে রজত সাহার রজত বাসনালয় থেকে এবং রজতকে বিষয়টি জানাবেন তারই ভগ্নিপতি নৃত্যগুরু রতন সাহাকে। নৃত্যগুরু যদিও এই দলের প্রাতঃভ্রমণকারীদের একজন, তিনি এখনো এসে না পৌঁছানোতেই কথাটি পৌঁছানোর দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো লোকনাথ হাইস্কুলের সংস্কৃতির পণ্ডিত ক্ষিতিশ বাচস্পতিকে। পণ্ডিত মশায় নৃত্যগুরুকে বলার আগেই স্বচক্ষে গিয়ে দেখে এসেছিলেন, সাগরপাড়ার সেই বাড়িটির দেয়ালগুলোর লিখন। অজস্র বানান ভুল হলেও কারো বুঝতে অসুবিধে হয়নি মীর গোলাম রসুল বিশ্বাসঘাতক মীর জাফরের নিকট আত্মীয়।
মীর গোলাম রসুল আমার পিতা, তিনি বহরমপুরের গোরাবাজারের স্থায়ী মুসলমানদের পঞ্চম, অধস্তন পুরুষ। আমাদের পূর্ব পুরুষেরা এসেছিলেন ইরান থেকে, সম্রাট শাজাহানের রাজত্বকালে ভারতবর্ষে। রাজমিস্ত্রির জোগান্দার হিসেবে, যখন সম্রাট তাজমহল তৈরি করছিলেন আগ্রায়, তখন থেকেই আমাদের দুই পুরুষ ঐ আগ্রাতেই ছিলেন। সম্রাট আওরঙ্গজেবের সময় পূর্বপুরুষেরা আগ্রা থেকে পালিয়ে দিল্লী হয়ে কলকাতায় এসে উঠেছিলেন, খিদিরপুরে। সেই খিদিরপুরেও থাকতে পারলেন না আমাদের প্র, প্র, পিতামহ একদিন জানতে পারলেন ভারতবর্ষ ইংরেজরা দখল করে নিয়েছে, সিরাজদৌলার নিকট থেকে। এখন ইংরেজদের স্থানীয় সেপাই, বরকন্দাজ এবং কিছু বাড়ি পাহারা দেবার দারোয়ানের চাকরি দেবে, হিন্দু, মুসলমান, সকলেই পাবেন সেই চাকরি, তবে যোগ্যতা অনুসারে।
প্র. পিতামহের চাকরি হয়েছিলো বহরমপুর শহরের পশ্চিম প্রান্তে, ভাগিরথি নদী সংলগ্ন ইংরেজ সাহেবের টম জিলানের বাড়ির দারোয়ান হিসেবে। বাড়িটি এখনো দাঁড়িয়ে আছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রথম দিকেই জোয়ান তাগড়া আমাদেরই পিতামহকে ইংরেজরা ধরে নিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন বার্মা ফ্রন্টে। যুদ্ধ শেষে পিতামহ ফিরে এলে তাকে প্রচুর জায়গা জমি, পুলিশী চাকরিও দিয়ে ছিলেন টম জিলান। সেই থেকে মাত্র বছর দুয়েক, বাবা, চাচারা সুখেই ছিলেন বহরমপুরের বড় বাজারের ‘মীর বাসনালয়’ নামের সবচেয়ে বড়ো দোকানটির মালিক হিসেবেই। দেশ ভাগের মাত্র দুই সপ্তাহ পরেই দোকান, বাড়িঘর সবকিছু জবর দখল করলেন এই রাজশাহী শহরের জমিদার বিজয় চৌধুরী। প্রায় নিঃস্ব অবস্থায় আমাদের পরিবার রাতের অন্ধকারে পদ্মানদী পাড়ি দিয়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন এই রাজশাহী শহরের বস্তিমার্কা পাড়ায়। আর সেই বছরের শেষের দিকে আমার জন্ম হয়েছিলো, রাজশাহীর ক্রিশ্চিয়ান মিশনারীদের হাসপাতালে।
আমাদের পিতা বছর পাঁচেক আগেই নাম লিখিয়েছিলেন মুসলিম লীগের খাতায়। তখন নাকি মুসলিম লীগের জোয়ার সারা পূর্ব পাকিস্তানে, সেকি নাকি পঞ্চদশ দশকের গোড়ার দিকে, আর সেই বছরই সাহেববাজারে মীর বাসনালয় দোকানটি ভাড়া নিয়েছিলেন এক হিন্দু মহাজনের নিকট থেকে। যেহেতু দোকানটিতে মহজন চালাতে না পারায় এবং তিনি ভারতে চলে যাবেন বলে পিতাকে খুব কমমূল্যেই দিয়েছিলেন, আজকের মীর বাসনালয়ের দোকান ঘরটি।
পিতা এবং আমি দুজনই থালা, বাসন, পানির কলস, জগ, বেচা-বিক্রি করি, সেই বিক্রিটা রজত বাসনালয়ের তুলনায় অতি নগণ্য। রজত কাকা সেদিন বলছিলেন, গতকালই নাকি, এই বছরের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে প্রায় দুই হাজারের উপরে, পাড়ার, হিন্দু-মুসলমানের বিয়ে, অন্নপ্রাশন, মুসলমানি, এমনকি নাক এবং কান ফোঁড়ানোর জন্যে অনেকেই থালা, বাসন নিয়ে গিয়েছে। আজ দুপুরে।
রজত কাকার কথাগুলো আমাদের পিতা মনোযোগ দিয়ে শুনেছিলেনই শুধু কোন কথাই বলেননি, হয়তো পিতার প্রতিপক্ষ, মালদহের দুষ্টু লোকদের দেয়াল লিখন নিশ্চয়ই অনেকেই পড়েছেন, এমনকি কল্পনায় ও অলকা সিনেমা হলের দেয়ালে দেয়ালে বিভিন্ন রঙের পোস্টারও সেঁটে দিয়েছিলো মালদহীরা, সেই একই কথা আমরা নাকি মীর জাফরের নিকট আত্মীয়। অন্যান্য দিন একশো-দেড়শো টাকার তৈজসপত্র বেচা-বিক্রি হলেও, দুপুর গড়িয়ে বিকেল পর্যন্ত মাত্র ৫২ টাকার মালামাল বিক্রি হয়েছে। অথচ সেই সকাল থেকেই রজত কাকার দোকানে ক্রেতা আর ক্রেতা। কিছুতেই ভেবে পাই না রজত কাকার দোকানে আমাদের মুসলমানেরা কেন থালা বাসন কিনতে যায়। শালা মালাউনেরা পূর্ব পাকিস্তান থেকে আয় উপার্জন করে মুর্শিদাবাদ, মালদহে, বাড়িঘর বানাচ্ছে। আর এখানে থাকে শুধু বুড়া, বুড়ি, কোন রকমে বৃষ্টির পানি পড়া ঘরে, ক্যানেসতারা কালো টিনের আর ছেঁড়া ধুতি আর একটা ময়লা পাঞ্জাবী—-
আমাকে আর এগোতে দিলেন না আমাদের পিতা মীর গোলাম রসুল। দোকানে ঢুকেই জানতে চাইলেন, এই বেলা পর্যন্ত কতো টাকার বিক্রি সিক্রি হয়েছে। আমি জানানোর পরেই তিনি পাঞ্জাবীর পকেট থেকে ছোট একটি পোস্টারের নমুনা দেখিয়ে আমাকে পাঠিয়ে দিলেন ঘোড়ামারার সারদা প্রেসের মালিকের কাছে। সারদা প্রেসের মালিক কিছু টাকার বিনিময়ে ’৬৫ সালের যুদ্ধের পরপরই পালিয়ে যাবার সময় আমার ছোটমামার নিকট প্রেস বিক্রি করলেও সারদা প্রেসের মালিক বসন্ত মজুমদার মামাকে নাকি অনুরোধ করেছিলেন, সারদা নামটি যেন পরিবর্তন না করেন। কেননা, সারদা ছিলো আমার একমাত্র মেয়ে। দুইদিনের কলেরায় ঈশ্বর তাকে নিয়ে গিয়েছেন স্বর্গে। মামা বসন্ত বাবুর কথা রেখেছেন, সেই সারদা প্রেসে আমাদের বাবার নির্বাচনী পোস্টার ছাপাবে মামা, তারই ছোট খসড়াটি নিয়ে পথে নামতেই শুনলাম শেখ মুজিব নাকি আগামী কাল ৭ মার্চ ভাষণ দেবেন ঢাকায় রেসকোর্স ময়দানে। সারদা প্রেসের দিকে না গিয়ে আমি ফিরে এসে পিতাকে কথাটি জানাতেই তিনি বললেন যাসনি ভালোই হয়েছে। আজ রাতে নওদা পাড়ায় আমাদের মুসলিম লীগের মিটিং আছে, মিটিং-এর সিদ্ধান্ত শেষে, যা হয় করা যাবে, তুই দোকানেই থাক, আমি নওদা পাড়া যাবো, আর আসবো।
সারাদিনের বেচা-বিক্রিতে যে কয়েকটি টাকা হাতে এলো, তার থেকে সামান্যই হলো লাভ। গভীর রাতে পিতা ফিরে এলেন নওদাপাড়ার মুসলিম লীগ নেতা হাজী আতাউর রহমানের বাড়ি থেকে। সেই রাতেই তিনি জানালেন শেখ মুজিব বোধ হয় সোনার পাকিস্তান আর একত্রে থাকতে দেবে না, আমাদের প্রিয় নেতা জিন্নাহ সাহেব চেয়েছিলেন, যেনো মুসলমান, মুসলমান এক হয়ে থাকি, সেটা বোধ হয় আর এক হয়ে থাকা যাবে না। পিতা জানালেন, হাজী আতাউর রহমান বললেন, আগামীকাল ৭ই মার্চই সোনার পাকিস্তানের ভাগ্য নির্ধারণ হয়ে যাবে, দুঃখ করে বললেন, কেন যে লড়কে লেঙ্গের জন্য পুলিশের লাঠি পেটা, টিয়ার গ্যাস খেয়েছিলাম। তবু সান্ব্তনা পেলাম, আমাদের জাতিরজনক কায়দে আজম, মোহাম্মদ আলী জিন্না হাত তুলেছিলেন আমাকে দেখে, সেই হাত তোলার ছবি কলকাতার স্টেটম্যান, আনন্দবাজার, লোকসেবক, প্রভৃতি পত্রিকায় আমার এবং জিন্না সাহেবের সেই হাত তোলা- টা-টা- দেয়া ছবিটা এখনো আছে আমার কাছে। আর আজ সেই সোনার পাকিস্তানকে দুই টুকরা করবে শেখ মুজিব ইন্দিরার বুদ্ধিতে, আর পূর্ব পাকিস্তানের যতো মালাউন আছে তাদেরই কুপরামর্শে। মুসলিম লীগ, শেখ মুজিবের দলকে কোনো অবস্থাতেই ছাড় দেবে না। খাজা খয়েরউদ্দিন, নূরুল আমিন সাহেবরা আমাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন। পিতা-তাঁর দলীয় নেতার কথাগুলো এক নাগাড়ে বলে গেলেন, সেই গভীর রাতে আমরা ভাই-বোন, মা, সকলেই জেনে গেলাম, সোনার পাকিস্তান ভাঙ্গছেন শেখ মুজিব নামের এক গুণ্ডার সর্দার। পিতা ডাকতেন গুণ্ডার সর্দার নামেই, আমিও প্রকাশ্যে কাউকে বলি নাই, কেননা, আমাদের মহল্লার চারিদিকেই গুণ্ডা সর্দারের লোকজন। পিতা সারারাত না ঘুমিয়ে পায়চারি করে কাটিয়ে দিলেন রাত। এমনকি সাত সকালে আমাদেরকে জাগিয়ে দিয়ে মাকে বললেন, তোমার বড়ো ভাই বারঘড়িয়ার বাদশা ডাক্তারের বাড়িতে গিয়ে আমি সপ্তাহখানেক থাকবো।চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাস একটু পরেই ছাড়বে।
পিতা আমাদেরকে সপ্তাহ খানেকের কথা বলে গেলেও, তিনি বড়ো মামার বাড়ি থেকে ফিরলেন প্রায় এক মাসের অধিক সময় কাটিয়ে, এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহে। ইতিমধ্যে রাজশাহী শহরে এসেছেন সোনার পাকিস্তানের মিলিটারিরা, বাড়িঘর না জ্বালিয়ে, কাউকে হত্যা না করেই তাদের উপস্থিতিটাই ছিলো মানুষের ভয়ে কারণ।
সোনার পাকিস্তানের মিলিটারিরা নাকি ঢাকার রাজারবাগে অনেক পুলিশ মেরেছে, বাড়িঘর জ্বালিয়েছে, এসবই যে মিথ্যে কথা, সেটি জানাতেই আজ সকালে আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন মুসলিম লীগের বড়ো নেতা, হাজী আতাউর চাচা, সঙ্গে ছিলেন পিতার মুসলিম লীগের আরো ২০-৩০ জন। আতাউর চাচারা যখন এলেন আমাদের বাড়িতে তখন দেখি সকলের মাথায় জিন্নাটুপি, হাতে পাকিস্তানের পতাকা। আমাদের বাড়ির সামনে এসেই সমবেত ভাবে সকলেই বললেন, নারায়ে তকবীর, আল্লাহু আকবর, পাকিস্তান জিন্দাবাদ। তখুনি শুনলাম, পাকিস্তানকে রক্ষা করতে হবে। যে সকল মালুরা দোকানপাট ফেলে রেখে পালিয়ে গিয়েছে বাড়িঘর আমাদেরকে দখল করতে হবে। মন্দির গুঁড়িয়ে দিয়ে রাতারাতি...
আতাউর চাচাকে থামিয়ে দিলেন হাশেম চাচা, তিনিই বললেন, পাক-মিলিটারি ভাইদের সাথে নিয়ে সাহেববাজারের যতো মালুর সোনার দোকান, কাপড়ের দোকান, এমনকি যতোগুলো কাঁসারির দোকান আছে আজকের মধ্যেই দখল করে দোকানের নতুন নাম দিয়ে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেবো, সোনার পাকিস্তানের মিলিটারি মেজর কামাল খানের সাথে আমার আলাপ হয়েছে, এটি তারই নির্দেশ।
আতাউর চাচা পিতাকে বললেন, মীর তোমার জন্য বরাদ্দ করেছি রজত বাসনালয়। হাশেমের জন্য দিপালি জুয়েলার্স, আমার জন্য মাত্র গোটা দুয়েক, আর বাদবাকী, আমার দলের সকলেই পাবেন, এটিও মেজর সাহেবের নির্দেশ। মেজর সাহেব আরো নির্দেশ দিয়েছেন কোন মালাউন যেন রাজশাহী, নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ না থাকেন, থাকলেই শালাদের মুসলমান বানানো হবে, আর যদি না হতে চায় তবে পদ্মায় ভাসতে ভাসতে যাবে, মালুদের মা গঙ্গায়। আতাউর চাচার কথায় সকলেই বললেন আলহামদুলিল্লাহ, পাকিস্তান জিন্দাবাদ, কায়দে আজম জিন্দাবাদ, মুসলিম লীগ জিন্দাবাদ। সব জিন্দাবাদ শেষে আতাউর চাচার নির্দেশে মাছের বাজারে গিয়ে রজত বাসনালয়ের তালা ভেঙ্গে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে গনেশ ঠাকুরকে আছাড় দিয়ে ভেঙ্গে পিতাকে হাশেম চাচা বুঝিয়ে দিলেন, আজ থেকে মীর গোলাম রসুল এই ভাণ্ডারের মালিক তুমি।
পিতার সঙ্গে আমিও ছিলাম, পিতা আমাকে দিয়েই বিশাল একটি সাইন বোর্ড বানিয়ে আনালেন সারাদিন ধরে। আমাদের নতুন বাসনালয়ের নামটি দিলেন ‘রায়হান বাসনালয়’।
আবু রায়হান আমার ভালো নাম, রজত সাহা রজত বাসনালয়ে যা কিছু রেখে গিয়েছিলেন তার ভেতরে শুধু সিদ্ধিদাতা গনেশ ঠাকুর বাদে নটরাজ শূন্যে এক পা তুলে ঠিকই দাঁড়িয়ে আছেন রায়হান বাসনালয়ের মাঝখানে, যেখানে নূপুর, ঘুঙ্গুর, থালা, কলস, জগ, বাসনের স্তূপ, ঠিক তার মাঝখানে।
আমার একবার ইচ্ছে হয়েছিলো, কাজী হাটিয়া গিয়ে আমার কলেজ জীবনের সহপাঠিনী মমতাজ বেগম মীরাকে গিয়ে বলে আসি, সাহেব বাজার এলে ‘রায়হান বাসনালয়ে’ এসো। বলতে যেতে সাহস পাইনি। যদি পিতা জেনে যান, মীরাদের বাড়ি মালদহে।

এই পাতার আরো খবর -
font
আজকের নামাজের সময়সূচী
অক্টোবর - ১৯
ফজর৪:৪২
যোহর১১:৪৪
আসর৩:৫২
মাগরিব৫:৩৩
এশা৬:৪৪
সূর্যোদয় - ৫:৫৭সূর্যাস্ত - ০৫:২৮
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :