The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ২৮ জুলাই ২০১৪, ১৩ শ্রাবণ ১৪২১, ২৯ রমজান ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ তোবায় আটকা শ্রমিক, বেতন দিচ্ছে বিজিএমইএ

কিশোর গল্প

আধুনিক দানবের দ্বীপে

রুশিদান ইসলাম

মণি দ্বীপের খনি আর দানব

কয়েকদিন ধরেই রেনি একটা নতুন বই পড়ছে। এটা ভ্রমণকাহিনি। লেখক গিয়েছিল থাইল্যান্ডের কাছাকাছি কতকগুলো দ্বীপে আর সমুদ্র সৈকতে। নানা রকম মজার অভিজ্ঞতার বর্ণনা রয়েছে। কিন্তু যে বিষয়টি রেনির মনোযোগ কেড়ে নিল তা হচ্ছে অন্য এক আজব দ্বীপ। যে দ্বীপে লেখক যেতে পারেনি। তার কারণ হচ্ছে যে, সেখানে যেতে সবাই ভয় পায়। সে গল্প শুনেছে এই ‘দানবের দ্বীপের’। এই দ্বীপের আসল নাম ছিল ‘মণি দ্বীপ’। সেখানে নাকি খুব মূল্যবান ধাতুর খনি আছে। কিন্তু সেই দ্বীপে মাঝে মাঝে হানা দেয় এক আজব দানব। দু-চারটে মানুষ খেয়ে সাবাড় করে। তারপর উধাও হয়ে যায়। মানুষ খেয়ে কিছু হাড়গোড় ফেলে যায়।
বইটিতে আরও একটি অদ্ভুত দ্বীপের কথা আছে। সেখানেও যাবার নানা বাধা-নিষেধ, ভয়। সেখানেও লেখক যায়নি। সেটা নাকি ‘কালো দ্বীপ’। এই দুটো দ্বীপই নাকি বাংলাদেশের, মানে কক্সবাজারের কাছে। তবে রেনি এখন ‘দানব দ্বীপ’ নিয়েই বেশি ভাবছে। যে দ্বীপে কিছুদিন পরপর দানব এসে মানুষ খেয়ে সাবাড় করে, সেখানে রাজা-মন্ত্রীরা কী করে! সেখানে কি পুলিশ নেই, যারা দানবকে ধরে জেলে পাঠাবে? কৌতূহল কুটকুট করতে লাগল রেনির পেটের মধ্যে। ইস, আরও কিছু যদি জানা যেত এই দানবের সম্পর্কে। সে কতদিন পরপর আসে, কেমন দেখতে, মানুষ ছাড়া আর কী খায়—এসব জানতে পারলে ভালো হতো।
আচ্ছা, একবার সেই দ্বীপে যাওয়া যায় কি? এরপর যখন জাদুকরের সাথে ভ্রমণের সুযোগ পাবে তখন সেই দ্বীপে গিয়ে দ্বীপের লোকজনের সাথে কথা বললেই তো সব জানা যাবে। কিন্তু সেখানে যেতে হলে আগে তার ভাই রাসেলের মত নিতে হবে। রাসেল যদি ভয় পেয়ে পিছিয়ে যায়, তাহলে তো আর যাওয়া হচ্ছে না। তবে ভয় পাওয়ার তো কিছু নেই। একেবারে দানবের সামনে গিয়ে না পড়লেই হলো। শুধু দ্বীপের লোকজনের সাথে কথা বলে চলে এলে তো কোনো বিপদ হবার ভয় নেই।
কিভাবে রাসেলকে রাজি করানো যায়, ভাবতে লাগল রেনি। কিছু বলার আগে তাকে সেই ভ্রমণকাহিনিটি পড়তে দিলো। দু-দিন পর রাসেল ঘোষণা করল, ‘পড়া শেষ’।
রেনি তখনই বলল, ‘তাহলে চল আমরা ওই দ্বীপে যাই।’
রাসেল তো অবাক। বলল, ‘কোন দ্বীপে? এই লেখক তো অনেকগুলো দ্বীপেই গিয়েছে। তার কোনটাতে যাবি?’
রেনি বুঝল যে একটু বিস্তারিতভাবে বলতে হবে। তাই একটু খুলে বলল, ‘আরে না, আমরা যাব সেই দ্বীপে, যেখানে লেখক যেতে পারেনি। ও যেতে পারেনি কারণ নৌকা বা স্টিমারের মাঝিরা ওকে নিতে চায়নি। ওরা ভয়ে সেখানে যায় না। তবে আমরা যেতে পারি, কারণ আমরা তো যাব জাদুকরের সাথে অদৃশ্য হয়ে।’
রাসেল জিজ্ঞেস করল, ‘একটু বল তো সেই দ্বীপটা কেমন। কেন ওরা ভয় পায়। আমি তাড়াতাড়ি পড়া শেষ করতে গিয়ে সেই পৃষ্ঠাটা ভালোভাবে পড়িনি।’
রেনি একটু হালকাভাবে বলল, ‘আরে এমন কিছু নয়। কী এক দৈত্য-দানব আসে। আর সেটা হয়তো ওদের ধারণা। তেমন কিছু হয়তো নেই।’
রাসেল তো হতভম্ব! ‘বলিস কীরে! সেই দ্বীপে দৈত্য আসে আর তুই সেখানে যেতে চাস! দৈত্য এসে কি লোকজনকে আক্রমণ করে?’
রেনি বুঝল যে রাসেলকে পুরোটা বলা যাবে না। তাহলে ভয়ে সে যেতে চাইবে না। তাই রেনি একটু ঘুরিয়ে বলল,
‘দৈত্য যদি আসে, তাহলে সে কিছু ক্ষতি করার চেষ্টা তো করবেই। কিন্তু আদৌ দৈত্য আসে কিনা, নাকি সেটা লোকের মনগড়া, সেই বিষয়টা বোঝার জন্যই তো যেতে চাই। ওখানকার লোকজনের সাথে কথা বললেই তো সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে। আর দৈত্যটাকে ঘায়েল করার কোনো উপায় যদি ওদের বাতলে দিতে পারি, তাহলে তো বিরাট উপকার হয় ওদের।’
রাসেল এবারে খোঁচা মারল, ‘হুঁ, দৈত্যের হুংকার শুনলেই তুই কাত হয়ে পড়ে যাবি। দৈত্য তাড়ানোর কায়দা বের করার আর সুযোগ পাবি না। কাত হয়ে পড়ে গেলে, দৈত্য এসে তোকে কপ করে গিলে ফেলবে।’
রেনি রাগ করল না। ধীরভাবে বলল, ‘আমার ধারণা দৈত্য সবার সামনে আসে না। কাজেই দৈত্যকে ধরা সহজ হবে না। ওখানকার লোকজন যদি সাহায্য করে, তাহলে উপায় পাওয়া যাবে। আমার মনে হয় কি—এর মধ্যে একটা ষড়যন্ত্র আছে। চল না যাই, গিয়ে দেখি, রহস্য ভেদ করা যায় কি না।’
রাসেল একটু নরম হয়ে বলল, ‘ঠিক আছে। তুই যখন বলছিস এটা করা যায়। মনে হচ্ছে, তোর একটু ডিটেক্টিভগিরি করার সখ হয়েছে। তবে আমি কিন্তু দৈত্যের সামনে যাব না।’
রাসেল যদিও রেনির এক ক্লাস ওপরে, ক্লাস সিক্সে পড়ে, সে ততটা বড় ভাইগিরি ফলাতে পারে না, কারণ সে একটু ভীতু ধরনের ছেলে। কিন্তু যেখানে সবাই যেতে ভয় পায়, সেখানে ওরা দুজন যাবে কিভাবে? ওদের একটা বিশেষ উপায় আছে। ওদের আছে বিশেষ এক বন্ধু—জাদুকর আলাদীন।
রাসেল আর তার ছোটবোন রেনি একদিন স্কুল থেকে ফিরছিল। পথে হঠাত্ দেখল একজন লোক বসে আছে এক পা উঁচু করে। পায়ে ফুটেছে কাঁটা, সে বের করতে পারছে না। রাসেল তাকে সাহায্য করল সেই কাঁটা বের করতে। তখন সে জানাল যে সে একজন জাদুকর। আর সে ওদের জন্য দিতে পারে এক আশ্চর্য সুযোগ। জাদুকর আলাদীন ওদের দুজনকে নিয়ে অদৃশ্য হয়ে চলে যেতে পারে দূরে কোনো দুর্গম জায়গাতে, মুহূর্তের মধ্যে। কাজেই যেসব জায়গাতে যাওয়া এমনিতে সম্ভব নয়, সেখানে ওরা যেতে পারবে আর দু’ঘণ্টা পর আলাদীন আবার ওদের ফিরিয়ে আনবে।

দুই
দানবের ছবি আর মুনিয়াদের দুঃখ
কাজেই এরপর জাদুকর যখন এলো ওদের নিয়ে যাবার জন্য, ওরা চোখেমুখে উত্তেজনা নিয়ে ‘দানব দ্বীপের’ কথা জানাল। ওদের উত্সাহ দেখে আলাদীন মানা করতে পারল না। বলল, ‘ওখানে কিন্তু বিদেশিদের যাওয়া নিষেধ, কাজেই তোমাদের সাবধানে চলতে হবে।’
রেনি বলল, ‘হ্যাঁ অবশ্যই’।
জাদুকর ওই দ্বীপ সম্পর্কে আরও কিছু বিষয় জানে মনে হলো। সে বুঝিয়ে বলল সবকিছু। যা বলল, তার মূলকথা হচ্ছে
এরকম :
ওখানে দামি পদার্থের খনি আছে। সেই খনির মালিক সেই দেশের রাজা। আগে তারা দুই ভাই ছিল। রাজা ছোট ভাইকে মেরে নিজে সব দখল করে নিয়েছে। দ্বীপের একপাশে বিশাল প্রাসাদ বানিয়েছে। সেটা বেশ উঁচুতে। তার চারপাশে সৈন্যরা পাহারা দেয়। অন্যদিকে খনি আছে। তার কাছাকাছি থাকে সাধারণ মানুষেরা। তারা খনিতে কাজ করে আর তার বিনিময়ে পায় শুধু খাবার। সেসব খাবার আসে অন্য দেশ থেকে। নদীর একপাশে নৌকা আর জাহাজের ঘাট। সপ্তাহে একদিন জাহাজ আসে। ‘আজ যদি ঘাটে জাহাজ না থাকে তাহলে ঘাটের কাছে তোমাদের নামাব। তোমরা ঘাটের মাঝি আর অন্য ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে সব জেনে নিও। তারপর আমরা ফিরব’। বলল আলাদীন।
নির্ধারিত স্থানে এসেই ওরা নামল। মাঝিকে জিজ্ঞেস করে জানা গেল যে আজ জাহাজ আসবে না। কাজেই ঘাটের পাশে একটু উঁচু জায়গা দেখে ওরা বসল।
মাঝি একটু অবাক। এই দ্বীপে বাইরের কেউ তো কখনো আসে না। এমন কি বড়রাও না। আর এই দুটো ছোট ছেলেমেয়ে কেন এসেছে। সে প্রথমে সেটা বলেই ফেলল। গলা নামিয়ে প্রায় ফিসফিস করে মাঝি বলল, ‘তোমরা কিন্তু রাজপ্রাসাদের দিকে যেও না। রাজার সৈন্যরা যদি দেখতে পায়, তাহলে আর উপায় নেই।’ রেনিও সেরকম ফিসফিস করে উত্তর দিলো,
‘না না, রাজপ্রাসাদের দিকে যাব কেন। আমরা অন্যদিকে থাকব, একটু হেঁটে দেখব আর ছোটদের সাথে কথা বলব।’
রাসেল জিজ্ঞেস করল, ‘রাজপ্রাসাদটা কোথায়, কোনদিকে? দূর থেকে একটু দেখা যায় না?’
মাঝি বলল, ‘এস আমার সাথে। কিন্তু শুধু দূর থেকে এক ঝলক দেখবে।’
সরু রাস্তা ধরে দ্বীপের ভেতর দিকে একটু এগোতেই সামনে পড়লো একটা বড় মাঠ। মাঠ থেকে সামনে তাকাতেই দূরে কিছুটা উঁচুতে দেখা গেল ঝলমল করছে এক প্রাসাদ। রাসেল আর রেনি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। আর ঘাটের কাছে পথের পাশে আছে ছোট ছোট ঝুপড়ি ঘর। সেগুলোতে নাকি সাধারণ লোকেরা থাকে।
এবারে রেনি জিজ্ঞেস করল, ‘আপনার ঘর কোথায়? আর এই দ্বীপের ছোট ছেলেমেয়েরা এখন কোথায়? ওরা নিশ্চয় স্কুলে গিয়েছে!’
মাঝি দুঃখিতভাবে বলল, ‘না, এখানে আবার স্কুল কোথায়! ওরা ওদিকে ঘরের আড়ালে মাঠে খেলছে। একটু পর ওরা যাবে দুপুরের খাবার নিয়ে ওই খনিতে, ওদের বাবা-চাচা-বড়ভাইদের কাছে। চলো, ওই মাঠে ওদের সাথে বসে গল্প করবে। অনেকদিন পর নতুন কাউকে পেয়ে আর কথা বলতে পেরে ওরা খুশি হবে।’
একটু এগিয়ে গিয়েই ওরা দেখল—বড় মাঠ। চারপাশে ঝোপঝাড়, গাছপালায় ঘেরা। সেখানে জনাবিশেক ছেলেমেয়ে হৈ-হল্লা করছে। ছেলেরা একপাশে ডালপালা জড়ো করে একটা খাঁচার মতো বানিয়েছে। তার ভেতরে একটা আজব ধরনের প্রাণী। ঝোপের ভেতর থেকে এনে বেঁধে রেখেছে। ওরা নাকি এটাকে মেরে মাংস খাবে। রেনি তো অবাক। জিজ্ঞেস করল, ‘কেন, তোমাদের দ্বীপে গরু-ছাগল নেই?’
ওদের মধ্যে একটু বড় একটা ছেলে এগিয়ে এসে বলল, ‘এসব কথা কেন জিজ্ঞেস করছ? জানো না যে রাজা আমাদের শুধু চাল, নুন, আলু ছাড়া কিছু দেয় না।’
রাসেল একটু ঘাবড়ে গেল ছেলেটির ভাবভঙ্গি দেখে। সে রেনির হাত চেপে ধরে বলল, ‘এই চল, যাই।’
তখন রেনির মতোই একটি মেয়ে এসে রেনির হাত ধরে ওই ছেলেটিকে ধমক লাগাল, ‘এ্যই গিট্টু, তুই এমনভাবে কথা বলছিস ক্যান? ওরা বেড়াতে এসেছে। ওদের সাথে ভালোভাবে কথা বল।’
বোঝা গেল ছেলেটির নাম গিট্টু। বাহ, মজার নাম তো, ভাবল রেনি। মেয়েটি গল্প জুড়লো রেনির সাথে। কী নাম, কোত্থেকে এসেছে। নিজের নাম বলল ‘মুনিয়া’। মুনিয়া রাসেলকেও কাছে ডাকল। তারপর বলল যে গিট্টুর কথায় যেন কিছু মনে না করে। ওর মেজাজ কিছুদিন ধরে খারাপ, কারণ ওদের পরিবারে বেশ বিপদ। আর সেটা সাধারণ ঘটনা নয়। (বড় বড় অঘটন। মুনিয়া বলা শুরু করল—‘গিট্টুর বাবা খুব অসুস্থ। কাজ করতে পারে না, বেশি কথাও বলতে পারে না।’
রেনি জানতে চাইল, কবে থেকে কিভাবে সেটা হয়েছে। মুনিয়া পুরোটা খুলে বলল, বলতে গিয়ে কখনো ও উত্তেজিত হয়ে জোরে বলল, কখনো দুঃখে ওর চোখে পানি এসে গেল।
পুরো বিষয়টা গল্পের মতো মনে হচ্ছিল রেনির। মূল কথা হচ্ছে, গিট্টুর বাবা অন্য সবার মতোই খনিতে কাজ করত আর তার বিনিময়ে রেশনে চাল পেত। কিন্তু সে চাল তার পরিবারের সবার জন্য যথেষ্ট হতো না। আবার রেশন দোকানের মালিক সবার কাছ থেকে বেআইনিভাবে কিছুটা চাল সরিয়ে নিত চাঁদা হিসেবে। গিট্টুর বাবা ওই দোকানদারের সাথে ঝগড়া করেছিল। সেটা রাজার পাহারাদাররা জেনে ফেলে রাজার কাছে রিপোর্ট করেছে। তার কিছুদিন পরই এক আজব দৈত্য এসে গিট্টুর বাবার ঘাড় চেপে ধরে মেরে ফেলার চেষ্টা করে। সেখান থেকে কোনোমতে পালিয়ে এসেছে সে। কিন্তু ভয়ে তার কথাবার্তা বন্ধ। কাজও করতে পারছে না।
দৈত্যের ঘটনা শোনামাত্রই রেনি তো প্রায় লাফিয়ে উঠেছিল। আরে, একেবারে ঠিক ছেলেকে পাওয়া গেছে। তাহলে সে তো সব ভালোভাবে বলতে পারবে। নিজের ভাগ্য এত ভাল হবে ভাবতেও পারেনি রেনি। সে প্রথমেই বুঝতে চায় যে দৈত্য কেন আক্রমণ করল। এর উত্তর খুব সহজ। কেউ যদি রাজার কোনো নিয়ম না মানে, তখনই নাকি দৈত্য নেমে আসে আর সেই নিয়ম ভঙ্গকারীকে চেপে ধরে। এর আগে কয়েকজনকে মেরেই ফেলেছে। তবু গিট্টুর বাবার ভাগ্য ভালো যে তাকে মারতে পারেনি। গিট্টুর রাগের কারণ আছে। তার কথা হলো যে তার বাবা তো বিনা কারণে রাগ করেনি। রেশন দোকানের মালিক অন্যায়ভাবে তাদের চাল থেকে কিছু সরিয়ে নিয়েছে।
এসব শুনে রেনির মাথায় একটি প্রশ্নের উদয় হলো।

তিন
গিটটুর পরিবারের গোপন প্ল্যান
রেনি মুনিয়াকে জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা রেশন তো সব পরিবারই পায়। সেই পরিমাণে অন্যদের যদি খাওয়া চলে, তাহলে গিটটুদের কেন চলে না?’
মুনিয়া একটু ইতস্তত করল উত্তর দিতে, তারপর বলল, ‘এর মধ্যে একটু সমস্যা আছে। আর সেটা একটা গোপন বিষয়। তোমাদের কাছে বলাটা বোধহয় ঠিক হবে না। এসব কথা রাজার কানে যদি যায়, তাহলে ওদের সর্বনাশ হবে।’
রেনি সমস্যাটা খুব ভালোভাবেই বুঝল। নিজেই বলল, ‘হ্যাঁ, সেটা আমিও বুঝতে পারছি। একবার যাকে সন্দেহ করা হয়, তার ওপর নজর রাখা হবে। তবে আমরা কথা দিতে পারি যে আমরা আর কাউকে বলবো না।’
রেনির দিকে তাকাল মুনিয়া। সেই তাকানো থেকেই রেনি বুঝল যে মুনিয়া ভরসা পাচ্ছে না। আর ওরা তো নতুন এসেছে এই দ্বীপে—কাজেই ওদের বিশ্বাস করা যায় কিনা, সেটা কিভাবে বুঝবে। রেনি নিজেই তো রাসেলের ওপর ভরসা রাখতে পারে না। কাজেই রেনি চেষ্টা করল মুনিয়াকে অন্যভাবে বোঝাতে, বলল, ‘আর দ্যাখ, আমরা তো এদেশ ছেড়ে কিছুক্ষণ পরই চলে যাব। রাজা বা তার লোকদের সাথে কথা বলার কোনো সুযোগই আমাদের নেই। আর আমাদের দেশে গিয়ে যদি এই দ্বীপের কথা কাউকে বলি, সে এটা বিশ্বাস করবে না, ভাববে উদ্ভট কল্পনা। ভাববে সব আমাদের বানানো গল্প। আর গল্পেও এত আজব জিনিস ঘটে না। কাজেই আমরা কাউকে বলব না।’
এবারে রেনির যুক্তিতে সায় দিলো মুনিয়া। আর মুনিয়া আসলে বিষয়টা নিয়ে মন খুলে কারও সাথে কথা বলতে চাচ্ছিল। সেই সুযোগ এবারে এসেছে।
মুনিয়া তখন বলতে শুরু করল—এই দ্বীপের লোকজনের দুর্ভাগ্যের কাহিনি। এই দ্বীপে কোনো স্কুল নেই। ছেলেমেয়েদের তাই পড়াশোনা হয় না। আর পরিবারে কয়জন লোক, সেটা গুনে সেই অনুযায়ী খাবারের রেশন দেওয়া হয়। গিটটুর বাবা তার দুই ছেলেমেয়ের নাম লিখিয়েছে আর দুই ছেলেমেয়ের নাম লেখায়নি। কাজেই চার জনের খাবার পায় মোট, তা দিয়ে ছয় জনের চলতে হয়।
এটুকু বলে মুনিয়া রেনির দিকে তাকিয়েই বুঝতে পারল যে ওর মনে আর একটি প্রশ্ন ঘুরছে। তা হচ্ছে যে দুটি ছেলেমেয়ের বিষয় কেন গোপন করা হলো। তাই মুনিয়া সেটাও ব্যাখ্যা করল। জানাল যে এই দ্বীপ থেকে কেউ বাইরে যেতে পারে না। কিন্তু গিটটুর বাবা চায়, দুটি ছেলেমেয়েকে বাইরের কোনো দেশে পাঠিয়ে দেবে, যাতে সেখানে গিয়ে পড়ালেখা শিখতে পারে।
রেনি তো এসব শুনে অবাক। জিজ্ঞেস করল যে ওই ছেলেমেয়েরা কোথায় যাবে। তার উত্তরে মুনিয়া যা বলল, সেটা তো আরেক অদ্ভুত কাহিনি। এই দ্বীপের রাজা এখানে বেশি বয়সী লোকদের থাকতে দেয় না। তাদেরকে নাকি কোথায় অন্য এক দ্বীপে পাঠিয়ে দেয়। গিটটুর বাবা ছেলেমেয়েদের সেই দ্বীপে পাঠিয়ে দিতে চায়। পরে ওরা সুযোগমতো অন্য দেশে যাবে। এর আগেও দুটি পরিবার তাদের ছেলেমেয়েদের এভাবে পাঠিয়ে দিয়েছে।
রেনির মাথায় এখন দুটো চিন্তা ঢুকল। প্রথমেই মনে হলো, তাহলে তো সেই ‘বৃদ্ধ নিবাস’ দ্বীপটিতে একবার যাওয়া যায়। কিভাবে বেঁচে আছে তারা সেটা দেখা দরকার। আর দ্বিতীয় ভাবনা হলো, এবার গিটটুকে জিজ্ঞেস করা দরকার যে দৈত্যটা দেখতে কেমন ছিল। ও কি কামড় বসিয়েছে নাকি গলা টিপে মারতে চেয়েছিল, ওর দাঁত কি বিরাট বড় রাক্ষসের মতো—ইত্যাদি ইত্যাদি।

চার
দৈত্যের ছবি
রেনি তখন মুনিয়াকে জিজ্ঞেস করল যে গিটটু দৈত্যকে দেখেছে কি না, তাহলে গিটটুর সাথে কথা বলে ওরা দৈত্যটা কেমন জানতে চায়। রেনি গিটটুকে ডাকার বদলে উঠে দাঁড়িয়ে রেনির হাত ধরে টানতে লাগল। আর বলল, ‘চলো, একটা জিনিস দেখাই।’
ওরা সবাই পাকা রাস্তাটা ধরে হাঁটতে লাগল। একটু পরে পথের দু’পাশে যা দেখা গেল, সেটা রেনি ভাবতেই পারেনি। দু’পাশে কয়েকটা বিশাল ব্যানারে ছবি টাঙানো। দৈত্যের ছবি, আর রাজার ছবিও আছে একটা। রাজার ছবির নিচে লেখা আছে :
‘রাজা আমি, আমার কত শক্তি
অবশ্যই সবাই কর ভক্তি।’
আর দৈত্যের ছবির নিচে লেখা :
‘একটা পাজি শ্রমিক ধরি।
আজকে পেলে ডিনার করি।’
রেনি এসব ছবি দেখে বুঝল যে এটা এক আধুনিক দানব। এমন দানবের দেখা পাওয়া তো একটা নতুন ঘটনা হবে—অবশ্য যদি দেখা পাওয়া যায়।
দৈত্যের ছবি দেখে তাকে গল্পের দৈত্যের মতো তো লাগছে না। এটার গায়ে একটা চকচকে খোলস। মনে হচ্ছে, ধাতুর তৈরি একটা কোট পরেছে। তবে চোখগুলো খুব ভয়াবহ। চোখ থেকে লাল আলো ফুটে বেরোচ্ছে। আর হাতের ও পায়ের নখগুলো বিরাট লম্বা ও তীক্ষ্ম। রেনি রাসেল দুজনেই ঢোক গিলল। এরকম নখ ও হাত দিয়ে চেপে ধরলে কি আর বের হওয়া যাবে? সর্বনাশ! রাসেল তো বলেই ফেলল—‘এই চল পালাই। এই দৈত্যকে সামনে দেখলে ও ধরার আগেই আমি অজ্ঞান হয়ে যাব।’
রেনি এবার বিশেষ আপত্তি করতে পারল না। দুজনে আবার ঘাটের মাঝির কাছে ফিরে যেতে পথ ধরল। এবারে মাঝিকে রেনি অনেক প্রশ্ন করতে শুরু করল—‘আচ্ছা, শেষ কবে এই দৈত্য এসেছিল? ও কয়জন লোককে মেরেছিল?’
মাঝি বলল—‘সে এসেছিল তিন সপ্তাহ আগে। এবারে এসে সে কাউকে মারতে পারেনি। একজনকে ধরেছিল সে কোনোমতে পালিয়ে এসেছে। আর সেজন্যই মনে হচ্ছে, দৈত্যটা শিগগিরই আবার আসবে।’
মাঝি একটু থেমেছিল। হঠাত্ই তার আবার কিছু মনে পড়ে গেল আর তাই সে বলে উঠল—‘ওহো, বলতে ভুলে গিয়েছি, সে আসে অমাবস্যার রাতের আগের দিন বিকেলবেলায়। সেটা আর ছয় দিন পরে।’
এই কথা শোনামাত্রই রেনির মাথাতে একটা দারুণ আইডিয়া এসে গেল। আরে, এই তো মনে হচ্ছে সুযোগ। শুধু সুযোগ নয়, বইয়ের ভাষায় সুবর্ণ সুযোগ। আইডিয়াটা এখনই রাসেলকে বলা যাবে না। প্ল্যানটা মনে মনে আগে তৈরি করতে হবে।

পাঁচ
মুনিয়ার দাদু গেছে বৃদ্ধনিবাস দ্বীপে

এদিকে সময় তো দ্রুত ফুরিয়ে গেল। এবার যেতে হবে। মুনিয়া আর গিটটুর কাছ থেকে বিদায় নিতে ওরা ছেলেমেয়েদের দিকে এগিয়ে গেল। মুনিয়ার চেহারাটা খুব শুকনো মনে হলো। রেনির হঠাত্ মনে হলো যে ওদেরও হয়তো খাবার যথেষ্ট হয় না।
রেনি জিজ্ঞেসই করে ফেলল—‘তোমাদের যা খাবার দেয়, তা যথেষ্ট হয় না! কেন হয় না?’
মুনিয়া ফিসফিস করে বলল—‘আমাদের অবস্থাও ওই গিটটুদের মতো। আমার বাবাও আমাদের দু’বোনের নাম লেখায়নি।’
রেনি বুঝল ওরাও এই দ্বীপ ছেড়ে চলে যাবে। তবুও জানতে চাইল—‘তোমরা কয় ভাইবোন? যাদের নাম লেখা হয়নি তারা কি অন্য কোথাও যাবে?’
মুনিয়া আবারও ফিসফিস করে ওদের ভবিষ্যত্ পরিকল্পনাটা জানাল। মুনিয়া আর ওর ছোট বোনও যাবে সেই ‘বৃদ্ধ নিবাস’ দ্বীপে। ওর দাদুমণি, অর্থাত্ ওর বাবার মাকে যেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কাজেই মুনিয়া দাদুর কাছে গিয়ে থাকবে। সে একটু রাগতভাবেই বলল—‘আমার দাদু মোটেও বৃদ্ধ নয়, সে সব কাজ করতে পারে। তবু তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। জানো, উনি এখানে আমাদের পড়াতেন। উনি খুব জ্ঞানী মানুষ ছিলেন। নিজে তাঁর মার কাছে লেখাপড়া শিখেছিলেন আর এখানে সব বাচ্চাদের ডেকে পড়াতেন, অঙ্ক শেখাতেন। সেই অপরাধেই তাকে সরিয়ে দিয়েছে। আমি ওঁর কাছে গিয়ে আবার পড়ালেখা শুরু করব।’
রেনি উত্সাহ দিয়ে বলল—‘অবশ্যই পড়াশোনা করবে। কিছুটা শিখে অন্য কোথাও গিয়ে আবার স্কুলে ভর্তি হবে। স্কুলের পড়া শেষ করে আবার এই দ্বীপে এসে স্কুল খুলবে। সবাই পড়াশোনা করলে রাজাও তোমাদের ভয় পাবে। বিদেশের লোকেরাও তোমাদের কথা জানবে। তখন রাজা আর এত অত্যাচার-অবিচার করবে না।’
রেনি নিজেও আশ্চর্য হলো যে এসব কথা সে ভাবতে পারছে আর এত উত্তেজিত হয়ে উঠেছে। আসলে বোধহয় সে এরকরম ভাবছে, কারণ এর আগে সে কখনো চিন্তাই করতে পারেনি যে তার মতো মেয়েরা খাবার কম পাচ্ছে, পেট পুরে খাচ্ছে না, আর স্কুলেও যাচ্ছে না।

ছয়
আবার যাবে দানবের দ্বীপে
পরদিন ছিল স্কুল ছুটি। বাসাতে সারাদিন রেনি সুস্থির হয়ে বসতে পারছিল না। দৈত্যের দ্বীপ থেকে ফিরে সারাক্ষণই মনে হচ্ছিল যে ওখানে রাজা খুব অন্যায় করছে। ওখানে দৈত্যটা ভয়ঙ্কর, আর অন্যায়ভাবে লোককে মারছে। মুনিয়াদের এত কষ্ট, ওদের জন্য কী করা যায়? আচ্ছা, দৈত্যটাকে সবাই মিলে মেরে ফেলতে পারে না! দৈত্য তো একটা, আর ওরা তো অনেক মানুষ। সবাই মিলে ওকে চেপে ধরতে তো পারে।
আর একটা বিষয়ও মনের মধ্যে খেলা করছে। মুনিয়ার দাদুমণি যে দ্বীপে আছে, সেটা কোথায়! সেখানে একবার যেতে হয়। এমনিতে রেনি কিন্তু রাসেলের ওপর তেমন ভরসা রাখে না। তবে এখন এতগুলো বিষয় মাথাতে কুটকুট করছে যে কারো সাথে আলাপ না করে পারছিল না। কাজেই রাসেলকে ডেকে বলল—‘আয়, জরুরি মিটিং হবে। অনেক সমস্যা আছে, তোর মাথা খাটিয়ে বুদ্ধি বের কর। তোকে ছাড়া তো আমি কোথাও যেতে পারি না। চল, দুজনে মিলে বুদ্ধি করি।’
রাসেল একটু আশ্চর্য হলো। রেনি তাকে এত গুরুত্ব দিচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন সে একেবারে বড়ভাইয়ের সম্মানিত আসনে বসে গিয়েছে। কাজেই সে দায়িত্বশীল চেহারা করে বলল—‘হ্যাঁ, ঠিক আছে, শুনব। কী সমস্যা বল। মা কোনো বকা-টকা দিয়েছে? স্কুলের হোমওয়ার্ক পারছিস না? দে, তাহলে আমি বুঝিয়ে দেবো।’
রেনি তো আশ্চর্য। রাসেল সেই দৈত্যের দ্বীপের কথা ভুলে গিয়ে শুধু হোমওয়ার্কের মতো ছোটখাটো জিনিস নিয়ে ভাবছে। রেনি বুঝল যে পুরো বিষয়টা রাসেলকে আগে বুঝিয়ে বলা দরকার। কাজেই দৈত্য আর রাজার অন্যায়গুলো সে আবার ব্যাখ্যা করল। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মুনিয়াদের কী করা উচিত। আর রেনি বা রাসেল কি কিছু করতে পারে? কী করবে, কিভাবে করবে?
রাসেল বলল—‘থাম, থাম। তিন-চারটা প্রশ্ন করেছিস। একটু উত্তরগুলো গুছিয়ে নিই।’
রাসেল আসল সমস্যা নিয়েই প্রথমে মাথা খেলাল আর রেনিকে সেটাই জিজ্ঞেস করল, ‘তুই যে ওদের জন্য কিছু করতে চাস, বা ওরা কী করবে সেই বুদ্ধি দিতে চাস, ওদেরকে পাচ্ছিস কোথায়? ওদের তো কোনো মোবাইল ফোনও নেই যে ফোন করবি!’
রেনি তো সেটা জানে, আর সেজন্যেই তো রাসেলকে ডেকে এনেছে। এবারে সে ভবিষ্যত্ পরিকল্পনাটা বুঝিয়ে বলল এভাবে—‘শোন আগামী শনিবার বিকেলে আমরা আবার ওই দ্বীপে যাব। আলাদীনের সাথে আগামী সপ্তাহের অভিযানটা এভাবেই করা যায়—শুধু তোর রাজি হতে হবে’। ‘ইস, বলিস কী রে! আমাদের যে আরও অনেকগুলো বেড়ানোর ছক কাটা আছে, সেগুলোর কী হবে? তুই একটা সপ্তাহ এই কাজে অপব্যয় করবি?’ বলল রাসেল। রেনি দেখল, পরিকল্পনাটা বুঝি ভেস্তে যায়। রাসেলকে একটু নাকি সুরে বলল—‘তুই ওদের দিকটা একটু চিন্তা কর। দ্বীপের লোকগুলো কত কষ্টে আছে। তুই বড়ভাই, তুই তো বরং আমাকে উত্সাহ দিবি। সেদিনই তো দৈত্য আসবার সম্ভাবনা। সেটা ভেবে ভয়ে তোর পা কাঁপছে নাকি? শোন, তোর কোনো ভয় নেই। আমি কি তোর কোনো ক্ষতি হতে দিতে পারি?’
রাসেল একটু মুশকিলে পড়লো। রেনির খোঁচার জওয়াব দিতে হলে তাকে তো রাজি হয়ে যেতে হয়। আর রেনি যেভাবে তোয়াজ করছে সেটাতেও তার মনটা খুশি হয়ে উঠেছে। সে রাজি হয়ে গেল। শুধু বলল—‘শোন, আমি কিন্তু কোনো অবস্থাতেই দৈত্যের ধারে-কাছে যাব না। দৈত্যের সাথে যুদ্ধ-টুদ্ধ করার মধ্যে আমি নেই।’

সাত
রেনি-রাসেল কি দানবের খপ্পরে পড়বে?
পরের সপ্তাহে যখন আলাদীন এসেছে, রেনি বুঝিয়ে বলল যে ওরা আবার ওই দ্বীপেই যেতে চায়। সেটার কারণটাও ব্যাখ্যা করল। ওরা মুনিয়াদের দ্বীপের লোকজনদের বুদ্ধি দেবে যেন তারা দৈত্যকে মারতে পারে, বা একেবারে না মারতে পারলেও যেন মেরে তাড়িয়ে দিতে পারে।
আলাদীন খুশি হয়ে বলল, ‘বাহ! এটা তো ভালো কথা। তবে তুমি শুধু ওদেরকে বুদ্ধি দেবে কেন, ওদের সাথে মিলে দৈত্যকে তো তুমি নিজেই মেরে ফেলতে পারো।’
রেনি সন্দেহের সুরে বলল, ‘আমি কি পারব! দৈত্যটা তো বিরাট—আমি ওটার ছবি দেখেছি। আবার নাকি মানুষ ধরে ধরে ডিনার সারে।’
আলাদীন বলল, ‘অবশ্যই পারবে। তবে তার জন্য বুদ্ধি লাগবে। আর লাগবে সাহস। বুদ্ধি তো তোমার আছে। তবে সাহস আছে তো?’
রেনি ঠিক নিশ্চিত নয় যে তার সাহস আছে কি না। এখন যদি বলে যে সাহস আছে আর দৈত্যকে দেখামাত্র পালানোর জন্য দৌড় দেয় তাহলে তো লজ্জার কথা। সে সেটাই আলাদীনকে বুঝিয়ে বলল যে, দৈত্য দেখার পরই বোঝা যাবে যে তার সাহস আছে কি না, বা কতটা আছে।
রাসেল কিন্তু এটা মানতে রাজি নয়। সে বরং জোর দিয়ে বলল যে ওরা দুজনই সাহসী, আর দৈত্যকে মারার বুদ্ধি করবে, দরকার হলে মুনিয়াদের কাছ থেকে একটা ছুরি নিয়ে যাবে। দৈত্যকে সামনে পেলে সোজা ওর পেটে ঢুকিয়ে দেবে।
রেনি আস্তে বলল, ‘তাহলে তো ওটার একেবারে কাছে যেতে হবে।’
রাসেল একটু ঢোক গিলল। তারপর যোগ করল যে দরকার হলে একটা বন্দুক জোগাড় করবে আর দৈত্যকে দেখামাত্র গুলি করে মাথার খুলি উড়িয়ে দেওয়া যাবে। এসব শুনে রেনি রাসেলের দিকে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকাল। কারণ সে আর রাসেল কেউ কোনোদিন সত্যিকারের বন্দুক দেখেনি, শুধু সিনেমার দৃশ্যে দেখেছে। তবে আলাদীন রাসেলের কথার দিকে মনোযোগ না দিয়ে ওদের দুজনকে নিয়ে হাজির করল সেই দৈত্যের দ্বীপে, সেই স্টিমারঘাটে, যেখানে মাঝি তখন দিবানিদ্রা দিচ্ছিল।
ওদের পৌঁছে দিয়ে আলাদীন উধাও হবার পর রাসেল আবার একটু ভীতু চেহারা করে রেনির দিকে তাকাল। তারপর অভিযোগের সুর ধরল, ‘আরে, এই আলদীনের ব্যাপারটা তো বুঝলাম না। সে তোকে উত্সাহ দিলো বিপদের ঝুঁকি নিয়ে দৈত্যকে মারতে। এখন তো আমি আর তোকে থামাতে পারব না। আর আমিও যেমন! তখন যে বলে ফেলেছি আমিই দৈত্যকে মারব, তুই যেন সেটা একেবারে আসল কথা বলে ধরে নিস না।’
রেনি একটুও অবাক না হয়ে বলল, ‘সেটা তুই না বললেও আমি ভালো করেই জানি। শুধু তোকে একটা অনুরোধ—ওহো না, দুইটা অনুরোধ। এক নম্বর হচ্ছে, তুই ওরকম সাহসী ভাবভঙ্গিটা আর মিছামিছি করিস না। আর দ্বিতীয়টা, যেটা এখন বেশি জরুরি তা হচ্ছে আমি এরপর দৈত্যকে মারার জন্য যা কিছু করতে যাই, তুই বাধা দিস না।’
রাসেল একটু আহত হলো মনে মনে। প্রথমটা সে নিজেই ভেবে রেখেছিল; কিন্তু রেনি এরকম কথা বলবে কেন? সে তো ছোট বোন, বড়ভাইকে সম্মান করতে শেখা উচিত তার। সে সেই উপদেশই দিলো, ‘এই তুই বড়ভাইয়ের সম্মান রেখে কথা বলতে শিখবি, বলে দিলাম কিন্তু। আর বড়ভাই হয়ে তুই বিপদে পড়তে গেলে আমার একটা দায়িত্ব আছে না! আমি তো আমার জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়ে তোকে পরামর্শ দেবোই।’
রেনি একটু মুখ ঘুরিয়ে হাসল। তারপরে অন্য সুর ধরল, ‘আরে তুই বড় ভাই—পরামর্শ তো দিতেই পারিস। আমি কিছু করতে গেলে শুধু আটকাস না, সেটাই আমার কথা।’
এদিকে মাঝি ওদের দেখেই মুনিয়া আর অন্য ছেলেমেয়েদের ডেকে নিয়ে এসেছে। রেনি দেখল, ওদের সবার চোখে-মুখে বেশ একটা ভয়ের ভাব। রেনি আর অন্য সবাই কিছুটা এগিয়ে গিয়ে মাঠের কোণায় গাছের ছায়ায় বসল।
রেনি ওদের দেখেই বুঝল যে কিছু একটা ঘটেছে। জিজ্ঞেস করল যে ওরা এত ভয় পাচ্ছে কেন, কী ঘটেছে। মুনিয়ার ঠোঁট এত শুকনো যে ও কথাই বলতে পারছিল না। অনেক কষ্টে বলল, ‘এখনি আবার দৈত্য আসবে বলে মনে হচ্ছে।’ রেনি তো অবাক, কেমন করে ওরা বুঝল এটা। জিজ্ঞেস করতেই মুনিয়া আঙুল তুলে দেখাল প্রাসাদের দিকটাতে। সেদিকে দেখা গেল কালো ধোঁয়া উঠছে। মুনিয়া এবারে বলল, ‘যেদিন দৈত্য আসে, সেদিনই অমন কালো ধোঁয়া হয়। আর বিকালে যখন লোকজন খনি থেকে কাজ করে বের হয়, তখন আক্রমণ করে।’
রেনি বুদ্ধি জোগাল, ‘এক কাজ করলে হয়—আমরা বাচ্চারা রাস্তার ধারে বসে থাকি। আমরা তৈরি থাকব, দৈত্যকে দেখলেই সবাই মিলে তাকে চেপে ধরব।’
মুনিয়া সন্দেহের সুরে বলল, ‘দৈত্য কি আর সেই সুযোগ দেবে, তার আগেই; একজনকে ধরে উড়ে যাবে।’
রেনি তবু রাসেল আর মুনিয়ার হাত ধরে টানতে টানতে রাস্তা ধরে এগোতে থাকল। একটু পরে মুনিয়া ওদের দেখাল যে খনি থেকে বের হওয়ার দরজা থেকে বেশ কিছুটা দূরে একটা মোটা লাইন টানা। বলল যে এই লাইনের পরে আমাদের যাওয়া নিষেধ।
তখন রেনি রাস্তার পাশে একটা বড় গাছের তলায় ঝোপঝাড় দেখিয়ে বলল, ‘চলো আমরা এগুলোর আড়ালে বসে অপেক্ষা করি। দৈত্যকে দেখতে পেলে তখন ঠিক করব, কী করা যায়।’
ওরা বসল। মুনিয়া মাঝে মাঝে চোখ মুছতে লাগল।
রেনি ওর হাত ধরে বোঝানোর চেষ্টা করল যে, অত ভয় পাওয়ার কিছু নেই। মুনিয়া তখন খুলে বলল, কেন সে এত ভয় পাচ্ছে। ভয়টা ওর বাবার জন্য। ওর বাবা পায়ে ব্যথা পেয়েছে, হাঁটতে কষ্ট হয়। কাজেই ওর বাবা সবার পেছনে থাকবে। আর দৈত্যটাও সহজেই ওর বাবাকে ধরে ফেলতে পারবে।
একটু পর দেখা গেল লোকজন বেরোচ্ছে। সবাই বেশ দ্রুত হাঁটছে। কেউ কেউ প্রাসাদের দিক থেকে উঠতে থাকা ধোঁয়ার দিকে তাকাচ্ছে। সেটা দেখে সবাই নিশ্চিত যে, দৈত্য এসে পড়বে।
একটু পর দেখা গেল মুনিয়ার বাবা খোঁড়াতে খোঁড়াতে বেরোচ্ছে। তখন হঠাত্ ঘড়ঘড় করে এক ভয়াবহ শব্দ শুরু হলো। রাসেল আর রেনি দেখল—খনির সামনের রাস্তাতেও ধোঁয়া আর বিশাল আকারের দৈত্য এগিয়ে যাচ্ছে মুনিয়ার বাবার দিকে। যখন প্রায় হাতখানেক দূরে, দৈত্যের হাত এগিয়ে গেল মুনিয়ার বাবার গলা চেপে ধরার জন্য, আর তার চোখ দিয়ে বেরোচ্ছে লাল আলো।
রাসেল কানে আঙুল চেপে ধরেছে। মুনিয়ার ঠোঁট শুকনো, চোখে পানি; কিন্তু ভয়ে কাঁদতেও পারছে না ওরা, দুজনেই হঠাত্ দেখল, রেনি সাঁই করে দৈত্যের দিকে ছুটে যাচ্ছে। রাসেল তাকে টেনে ধরবারও সুযোগ পেলো না। শুধু চীত্কার করল,
‘রেনি, যাস না।’
ততক্ষণে রেনি দৈত্যকে ধাক্কা দিচ্ছে। আর কোথায় শব্দ, কোথায় চোখের লাল আলো! সব চুপ। দৈত্যের হাত দুটো দুপাশে ঝুলে রইল। আর হঠাত্ ঝুপ করে দৈত্যটা চিত্পাত হয়ে পড়ে গেল।
দৈত্যের হাত থেকে ছাড়া পেয়েই মুনিয়ার বাবা প্রায় দৌড় লাগালেন। পায়ের ব্যথার জন্য একটু বাঁকা হয়েই লাফাতে হচ্ছিল অবশ্য। মুনিয়া দৌড়ে গিয়ে বাবার হাত ধরল। তা দেখে রাসেলও গিয়ে রেনির হাত ধরে টানতে টানতে ছুটতে লাগল। রেনি অবশ্য ছুটবার আগে মাটি থেকে কিছু একটা কুড়িয়ে নিল।
ওরা যখন বাড়ির পাশের মাঠটার কাছে পৌঁছাল, দেখল মাঠে লোকের ভিড়। মুনিয়ার বাবাকে স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে দেখে ওরা তো অবাক। তখন সবাই ধরল মুনিয়াকে। সমস্বরে প্রশ্ন যে, দৈত্যটাকে কিভাবে মারল। ওটা কি এক্কেবারে মরেছে নাকি পালিয়ে বেঁচেছে সেটাও জানতে চাইল।
মুনিয়া আঙুল দিয়ে রেনিকে দেখাল। আর সবাইকে যার যার বাসাতে যেতে বলল।
এবারে মুনিয়া ধরল রেনিকে। জানতে চাইল, সে দৈত্যকে মারল কেমন করে। এমন বিশাল বড়, হিংস্র, লম্বা নখ—ওটাকে কাবু করা কি সহজ কথা। রেনি একটু রহস্য করে বলল যে সহজ নয়, তবে আবার সহজ হয়ে যায় যদি ওদের কারসাজিটা বুঝে ফেলা যায়।
রাসেল অধৈর্য হয়ে উঠল। বলল, ‘শিগগির বল, তুই এমন রহস্য এত তাড়াতাড়ি কেমন করে ভেদ করলি? আমি তো কোনো কূলকিনারা পাচ্ছি না। খুলে বল।’
রেনি দেখল যে আর বেশি সময় নেই। সংক্ষেপে বলল যে, ও লক্ষ করেছে যে দৈত্যটাকে একটা সৈন্য ঠেলেঠেলে নিয়ে এসেছে। আর তারপর একটা সুইচ টিপে অন করল, তারপরই ওর চোখের বাতিগুলো জ্বলল আর হাত দুটা ওপরে উঠে আবার সামনের লোকটাকে চেপে ধরল। সৈন্যটা সুইচ অন করে দৌড়ে চলে গিয়েছে। কাজেই রেনি যা করেছে তা হলো সুইচটা অফ করা। অর্থাত্ ওটা আসলে দৈত্য নয়, একটা বড় আকারের রোবট। রাজা ওটা নিয়ে এসেছে সবাইকে ভয় দেখাতে।
মুনিয়া রেনির হাত ধরে হেসে উঠল। ইস, একটা রোবটকে দৈত্য ভেবে এতদিন সবাই এত ভয় পেয়েছে। এটা তো বেশ আধুনিক দৈত্য, মানুষের তৈরি দৈত্য।
রাসেল জ্ঞানী লোকের ভঙ্গিতে বলল, ‘এই পৃথিবীতে সব দৈত্যই মানুষের তৈরি। তবে রেনি, তোর এমনটা করা ঠিক হয়নি। ওটা যদি সত্যিকারের দৈত্য হতো, তাহলে তো হাতের এক ধাক্কায় তোকে শেষ করে দিত।’
রেনি এবারে বক্তৃতার সুর ধরল, ‘আরে, আসল দৈত্য তো কিছু নেই। আর যদি দু-চারটা থাকেও, আমি ওগুলোকে এক ধাক্কায় কাত করব।’
তারপর, ধরল কবিতা—
‘দৈত্যরা সব কোথায় গেলে?
ডিনার করি একটা পেলে।’
তারপর ঘরে ফেরার পালা।

এই পাতার আরো খবর -
font
আজকের নামাজের সময়সূচী
জুন - ২৪
ফজর৩:৪৪
যোহর১২:০১
আসর৪:৪১
মাগরিব৬:৫২
এশা৮:১৭
সূর্যোদয় - ৫:১২সূর্যাস্ত - ০৬:৪৭
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :