The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ২৮ জুলাই ২০১৪, ১৩ শ্রাবণ ১৪২১, ২৯ রমজান ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ তোবায় আটকা শ্রমিক, বেতন দিচ্ছে বিজিএমইএ

গল্প

ব্যবচ্ছেদ

রুমা মোদক

সেই মুহূর্তে যাকে মনে পড়ছিল তাকে সেই মুহূর্তে মনে পড়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই, তবু মনে পড়ছিল। সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ যুবক, সদ্য শহরে আসা চকচকে ভবিষ্যতের সন্ধানে, মাথার ওপর ছাউনিহীন, আধা শহর আধা গ্রাম থেকে উঠে আসা, ঠোঁটের ওপর নব্য গোঁফ গজানো, গাইয়া, নাম না-জানা একটি ছেলে...ঘটনাক্রমে যে হয়ে পড়েছিল উদ্বাস্তু। গর্ভবতী বিড়ালটির মতো, ঠিক বিড়ালটির মতো বলা ঠিক নয়, বিড়ালটি তবু শেষ পর্যন্ত উদ্বাস্তু হয়নি, লুকিয়ে-চুরিয়ে তাকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ছেলেটির কোনো হদিস আজো সে জানে না, আসলে জানার কোনো চেষ্টাও তো তার ছিল না, চেষ্টার কোনো যৌক্তিক কারণও ছিল না, সম্ভবও ছিল না। তবু ‘বিবেক’ নামে যে বোধটি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে মধ্যবিত্ত মনের ভেতর, সেই বোধে অচেনা, নাম না-জানা, সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ ছেলেটি বিঁধে আছে খচ করে কাঁটার মতো, দীর্ঘ দশ বছর পরও। অনিন্দ্যর মতো মধ্যবিত্তের ম্যাড়ম্যাড়ে মনটাকে চাপা দেওয়া যায়নি বলে। চাপা দিতে সে চায়ওনি কোনো দিন, চেষ্টাও করেনি, প্রয়োজনও বোধ করেনি, কেননা শুরুতেই সে বুঝে গিয়েছিল, শ্রেণীচ্যুত হয়ে ওপরে ওঠা যদিও বা সম্ভব, নিচে নামাটা ভীষণই কঠিন, অথচ যে রাজনৈতিক দর্শনে দীক্ষা নিয়েছিল সে অকালে, তা ছিল শ্রেণীচ্যুত হয়ে নিচে নামার, প্রলেতারিয়েত কিংবা শ্রমিক-মজদুরের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাবার। ঠিক তখন, যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন টুকরো টুকরো, ভেঙে পড়ছে পূর্ব-ইউরোপের শ্রেণীহীন সমাজের স্বপ্নময় জগত্। দেশি কমরেডরা পথভ্রষ্ট, রাতারাতি বিশ্বাস আর ভোল পাল্টে রাস্তায় ছুড়ে দিয়েছে প্রগতি প্রকাশনের ঝকঝকে ছাপা সিরিজ বইগুলো স্মৃতি ট্রাস্টের কল্যাণে। ঘর পরিষ্কারের মহানব্রত নিয়ে। আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদের কূটকৌশলে সারাবিশ্বের কমিউনিস্ট আন্দোলন বিভ্রান্ত, প্রাক্তন কমিউনিস্ট কর্মীরা সখেদে নয়, বরং তৃপ্তিতে ঢেঁকুর তুলে গালি দিচ্ছেন— শা..লা..রা...। তখন বিপ্লব আর সমাজ বদলের শ্লোগানে বিশ্বাস রেখে নয়, বরং অস্ত্রের প্রতিযোগিতা, নেতৃত্বের কাড়াকাড়ি, কোন্দল আর ক্যাম্পাস দাপিয়ে বেড়ানো দলগুলোর সাথে পাল্লা দেওয়ার অক্ষমতায় তাদের থেকে নিরাপদ দূরত্বে থেকে ‘নেতা’ নাম বাগানোর জন্য তখন যারা সমাজতন্ত্রের পতাকা তলে একত্রিত হয়েছিল, তাদের দলে থেকেও রেবেকা তাদের দলের হয়ে উঠতে পারেনি। দেয়ালে কিংবা পোস্টারে সাটা শ্লোগানগুলোতে অগাধ বিশ্বাস ছিল তার, সে সত্যি তখন স্বপ্ন দেখত শ্রেণীবৈষম্যহীন এক সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের। বোকা কিংবা সরল বালিকার মতো বিশ্বাস করত মার্কস এঙ্গেলসের থিয়োরিতে, মিছিলের অগ্রভাগে শ্লোগান দিত বিশ্বাস থেকে। পেছনে পড়ে থাকত কমিটির মূলপদগুলো দখলের ইঁদুর দৌড়ে, বরং স্টাডি সার্কেল নামের যে কার্যক্রমটি ক্ষীণ হলেও টিকে ছিল তা তারই কল্যাণে, যেখানে বসে সে দেখতে চাইত সদ্য তরুণদের স্বপ্নে উজ্জীবিত চকচকে চোখ, স্বপ্ন দেখত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের তরুণরা আড্ডা, দলবাজি, প্রেম-প্রেম খেলা আর বড় দলগুলোর টেন্ডারবাজি, অস্ত্র ও আধিপত্য বিস্তারের লড়াইকে ঘৃণা করে এই ঘুণে ধরা সমাজটাকে বদলে দেওয়ার মিছিলে যোগ দিচ্ছে ঝাঁকে ঝাঁকে।
মূলত কৈশোরে রেবেকার ভেতরে এ স্বপ্ন যিনি বপন করেছিলেন, নিবেদিতপ্রাণ একজন শিক্ষক। স্ত্রী-পুত্রকে দুর্ঘটনায় হারিয়ে একা জীবন ছিল তার। নিজেরও সমাজ বদলের লড়াইয়ে বিশ্বাস ছিল অকপট, যা তিনি সংক্রমিত করতে পেরেছিলেন রেবেকার মতো কিছু শিক্ষার্থীর অন্তরে। ছাত্রদের কমিউনিজমে দীক্ষা দিচ্ছেন, নাস্তিকতা ছড়াচ্ছেন এ অপবাদে তার জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত কিছু শিক্ষক তাকে চাকরিচ্যুত করলেও তিনি মোটেই নিরাশ না হয়ে পূর্বের চেয়ে বেশি না হোক, পূর্বের মতোই উত্সাহে ছাত্র-ছাত্রী দীক্ষার কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন, উপরন্তু তার দুর্ভাগ্যজনক অবস্থার কথা বলে সহানুভূতি প্রকাশ করতে গেলে, হো হো হেসে উঠে বলেন, এই তো দুনিয়ার নিয়ম, ভালো-মন্দ মিলিয়ে— ভালো-মন্দ যা-ই আসুক, সত্যরে লও সহজে। মেনে নেওয়াটাই বাস্তব। তার যোগ্য শিষ্যই হয়ে উঠেছিল রেবেকা, যে কারণে বিশ্বাস আর আচরণে কোনো তফাত্ ছিল না তার, ফলে সহকর্মীরা যখন বিপ্লবের শ্লোগান দিয়েও আমলার বউ হওয়ার স্বপ্ন দেখত আর নিয়মিত জায়নামাজে বসত, তখন সে খুঁজে নিয়েছিল মিছিলেরই একজন সহযোদ্ধাকে জীবনসঙ্গী হিসেবে, ভবিষ্যত্ যার একেবারেই অনিশ্চিত।
অনিন্দ্যর বাবা হাইস্কুলের বাংলার শিক্ষক, নিজের নাম আব্দুর রহমান হলেও ছেলেমেয়েদের নামের বেলা অরুণা, বরুণা আর অনিন্দ্য রেখে নিজের যে উদার মানসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন, কালের স্রোতে মেয়েরা সেই নামের মাশুল তোলে জনৈক পীরের মুরিদ হয়ে নাকমুখ কালো নেকাবে ঢেকে আর ছেলে কালক্রমে হেগেলের তত্ত্ব থেকে মুখ ঘুরিয়ে সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহ বর্ণিত কোট-প্যান্ট-টাই পরা নব্য মুসলমান হয়ে। কোনো কালে কি হেগেলের দর্শনে তার গূঢ় বিশ্বাস ছিল কিংবা সে তত্ত্বের ভেতরে সে প্রবেশ করেছিল, সে প্রশ্ন আজ যখন রেবেকার মনে উদয় হয়, তখন রেবেকার আসলে কিছুই করার নেই। স্বপ্নভঙ্গের কোনো যন্ত্রণা তার হয় না, কেননা স্বপ্ন ভাঙতে ভাঙতে এখন স্বপ্ন ভাঙাটাই তার জন্য বাস্তব আর সত্য হওয়াটা অলীক। স্বপ্ন ভাঙাটাকে সে দিব্যি মেনে নিতে পারে কোনো রকম মনোবিকার ছাড়া।
ক্যাম্পাসে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের কিংবা বিপ্লবের অঙ্গীকারের সহযোদ্ধারা তখন হলে হলে ঠাট্টা-মশকরা করে অনিন্দ্যর মতো তুখোড় সমাজতান্ত্রিক কর্মীদের সঙ্গে— শালা, তোদের সংগঠনে নাকি বিপ্লবের সঙ্গে ফ্রি প্রেম মেলে? অনিন্দ্যও হয়তো সে মশকরায় যোগ দেয়— সত্যি মেলে, চলে আয় আমাদের সঙ্গে। মূলত এ বক্তব্যের কিংবা এ ধারণার একটি ভিত্তি রয়েছে, সমাজতান্ত্রিক শ্লোগান তোলা সংগঠনের সিনিয়র নেতা-কর্মীরা প্রায় বিপ্লব করেছে প্রেম ও বিয়ের ক্ষেত্রে। ফলে সিনিয়র নেতা-কর্মীদের জোড়াবদ্ধ হওয়ার একটি ট্র্যাডিশন তৈরি হয়েই গিয়েছিল। তবে অনিন্দ্যর জানা ছিল না, রেবেকা সেই দলের ছিল না। অনিন্দ্য নামের ছেলেটার গ্রাম্য সরলতা তাকে আকৃষ্ট করেছিল, আকৃষ্ট করেছিল গোঁয়ারের মতো প্রতিবাদী স্বভাবটাও। রেবেকা বন্ধু কিংবা প্রেমিক নয়, সরাসরি স্বামী হিসেবে তাকে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। না, নিশ্চিত সুখে যাপনের কোনো জীবনের জন্য নয়, বরং অন্তত আধা সামন্ততান্ত্রিক সমাজে একটি লড়াইয়ের জীবন গড়ে নেওয়ার প্রত্যয়ে। সে লড়াইটা বিপ্লবের জন্য না হোক, (কেননা চূড়ান্ত লক্ষ্যে কমিউনিজমে বিশ্বাসী হলেও বাস্তবে তার জীবদ্দশায় তা কায়েম সম্ভব হবে কিনা সে সম্পর্কে সন্দিহান ছিল রেবেকা, যদিও তা রেবেকার দ্বৈত মানসিকতারই সুস্পষ্ট ইঙ্গিত, কিন্তু রেবেকা সে সম্পর্কেও সচেতন। লড়াইয়ের কর্মী রেবেকা বিশ্বাস করত, তার জীবদ্দশায় কম্যুনিজম কায়েম সম্ভব নয়), লড়াইটা তবু হোক একটি সত্ আর সরল জীবনের জন্য। আশপাশে সামান্য, যতটা তাদের হাত যায় ততটা যদি কিছু পরিবর্তন করা যায়, গড়ে নেওয়া যায় অন্তত নিজের জন্য একটি সত্ ও সরল পরিবেশ যেখানে সে আর অনিন্দ্য প্রতিদিন লড়াই করবে সততার সঙ্গে। জেনেশুনে একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যত্ সে বেছে নিয়েছিল অবশ্য অনিন্দ্যকে ভালো লেগেছিল বলেই। শুধুই ভালো লেগেছিল। তার মোহও জন্মেছিল কিছুটা, ভরাট গলার বক্তৃতা দেওয়া অনিন্দ্যর প্রতি।
মোহ তো থাকে ভালোবাসার উল্টো পিঠে, মোহ না থাকলে ভালোবাসা থাকে না। কিন্তু সে মোহ রেবেকার ভেঙে গিয়েছিল বছর দুয়েকের মধ্যেই। এখানে সে আধুনিকমনস্ক নয়, বরং রক্ষণশীলতায় আক্রান্ত হয়ে ভেবেছিল, আর উপায় নেই মুক্তির, কেননা ততদিনে অনিন্দ্যর সঙ্গে তার সম্পর্ক মনের সীমানা অতিক্রম করে শরীরের গভীরে পৌঁছে গিয়েছিল আর শরীর নিয়ে রেবেকা ভুগত ছুত্মার্গে, এই একবিংশতি কালের অনুপযোগী তথাকথিত নৈতিকতা গ্রাস করেছিল তাকে আর তাই মোহভঙ্গের যন্ত্রণা, স্বপ্নভঙ্গের হতাশা সত্ত্বেও টিকে থেকেছে অনিন্দ্যর সঙ্গেই। যেদিন ক্যাম্পাসে বড় দলের ছাত্রনেতাদের মধ্যে ঠিকাদারি আর ইট-সিমেন্ট-রড-বালুর ভাগবাটোয়ারা নিয়ে বন্দুক ও কাটা রাইফেলের যুদ্ধে দ্রুম দ্রুম শব্দে চারপাশ সুনসান, সবাই নিরাপদ দূরত্বে, হলের ভেতরে, সেদিনও কলা ভবনের ক্লাসরুমের দরজা বন্ধ করে অনিন্দ্য বুক কাঁপা ভয়ের মধ্যে ছুঁতে চেয়েছে এবং জোর করে ছুঁয়েছে রেবেকার ঠোঁট। বিস্ময় ও অনাঙ্ক্ষায় রি রি করেছে রেবেকা, থু থু করে ঝেড়ে ফেলেছে ভালোবাসার ঘৃণা। আর সেদিনই সন্ত্রাসবিরোধী মিছিলে সহযোদ্ধা রানা নিহত হলে দুই-এক দিনের মধ্যেই ক্যাম্পাসে প্রকাশিত হয়েছিল রানাকে নিয়ে বিশেষ স্যুভেনির যার শিরোনাম ছিল ‘রানা এই ক্যাম্পাসের প্রমিথিউস’। এই স্যুভেনির শিক্ষকদের চেম্বারে চেম্বারে বিক্রি করতে গেলে, যখন জনৈক শিক্ষক জানতে চেয়েছিলেন, বলো তো প্রমিথিউস কে? তখন অনিন্দ্যর নির্বাক অসহায়ত্ব নিমেষে ছাই করে দিয়েছিল রেবেকার মোহ। অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে দাঁড়িয়ে যার বক্তৃতা কাঁপুনি ছড়িয়ে দেয় কলাভবন-রেজিস্টার বিল্ডিং পার হয়ে উত্তরপাড়া-দক্ষিণপাড়া পর্যন্ত, সে কিনা জানে না প্রমিথিউস কে? ভুল করে ফেলল কি রেবেকা মানুষ চিনতে? সিদ্ধান্ত নিতে?
মানুষ চেনা আর ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভুলটা চূড়ান্তভাবে ঠিক মনে হয়েছিল যেদিন, তারপর থেকে সেই ভুলটা কাঁধে করে নিয়েই জীবন কাটানো, কাটাতে বাধ্য হওয়া। সেদিনটাও স্পষ্ট মনে রেখেছে রেবেকা ইচ্ছে করে, একটি অনুশোচনা নিয়ে, বিবেকের তাড়না নিয়ে প্রচণ্ড নোংরা একটি স্মৃতির সঙ্গে। যদিও অনিন্দ্য সব ভুলে গেছে, ভুলেও কিছু মনে রাখেনি, কিংবা রেবেকা যে মনে রেখেছে তা জানেও না। অনিন্দ্য মনে করে, তার এই প্রতিষ্ঠা, সিঁড়ি ভেঙে ক্রমশ ওপরে ওঠা, এতেই জীবনের সার্থকতা। ওপরে ওঠা মানে অর্থনৈতিক প্রতিপত্তি অর্জন করা। গরিব স্কুলশিক্ষকের ছেলে, অভাব-দৈন্যের সঙ্গে নিয়মিত বসবাস, পিতার দর্শন-দৃষ্টি-আদর্শ কিছুই অর্জন করা নয়, শুধু ওপরে ওঠাতেই জীবনের সার্থকতা বলে ভেবেছে সে, যেমনটি তার মা ভাবত। অনিন্দ্যর মুখে শুনেছে রেবেকা, তার মায়ের আক্ষেপ বাণী, ছেলেমেয়েদের তিনি বলতেন— আর যা-ই হোক, তোরা কেউ মাস্টার হবি না। বিত্তহীন জীবনের আপসোস জারিত তীব্র ঘৃণা থাকত তার কণ্ঠে, আর সেই ঘৃণা চিরস্থায়ী আবাস গড়েছে ছেলেমেয়ে প্রত্যেকের মনে, কেউ ভুলেও মাড়ায়নি সে পথ এবং জীবনে সার্থকতা অর্জন করেছে, বাপের ইচ্ছায় গ্র্যাজুয়েট হওয়া অরুণা, বরুণা সম্পন্ন আমলার বউ আর অনিন্দ্য ওসব ছাপোষা চাকরির ধার না ধেরে ব্যবসা ফেঁদে, পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী হয়ে, সব সম্পর্ককে ব্যবসা দিয়ে যাচাই-বাছাই-বিবেচনা করে, এখন কোটিপতি। তাদের কাছে জীবনের সার্থকতার কোনো বিকল্প মানে নেই। যে রেবেকার সঙ্গে একছাদের নিচে বসবাস অনিন্দ্যর, সেই রেবেকার জীবনের সার্থকতা সম্পর্কিত দর্শনটার কোনো গুরুত্বই নেই তার কাছে, নেহাতই অকেজো। আর এই আকাশ-পাতাল দূরত্বের ভাবনায় তারা স্বামী-স্ত্রী হলেও অনিন্দ্যর এ নিয়ে কোনো দুঃখবোধ নেই, রেবেকারও নিস্পৃহ মনে কোনো প্রত্যাশা নেই।
সেদিন থেকেই, হ্যাঁ, স্পষ্ট মনে আছে সেদিনটার কথা, তখন হল ছেড়ে মেসে উঠেছে অনিন্দ্য, রেবেকার প্রচ্ল আপত্তি সত্ত্বেও ব্যবসা শুরু করেছে (কেননা একমাত্র ব্যবসাতেই রাতারাতি বড়লোক হওয়া সম্ভব)। রেবেকা তখন সদ্য ক্যাম্পাস ছাড়া এনজিওকর্মী, প্রচলিত বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার প্রস্তুতি চলছে দুজনের। ছুটিছাঁটার ফাঁকফোকরে আসতে হয় অনিন্দ্যর মেসে, বিছানায় মেলে দিতে হয় নিজেকে। অবশ্য তখন, যখন মেসের আর সবাই কর্মস্থলে থাকে। রেবেকার প্রচণ্ড অনীহা, অনিচ্ছা, ভয়, শংকা, অপরাধবোধ, তবু তৃষ্ণা প্রচণ্ড স্পর্শের, অনিন্দ্যর আহ্বানে সাড়া না দিয়ে পারে না। অতঃপর মেসের কালো ময়লা হাঁড়ির ভাত, পাতলা মশুরির ডাল, আর পাতলা ধনেপাতার ঝোল খেতে খেতে অনুশোচনা— ছিঃ ছিঃ কেন যে এলাম, যা কিনা মোটেই প্রেমসঞ্জাত নয়, আর ভেতরে প্রচ্ল আত্মদহন, প্রতিনিয়ত যুদ্ধ নিজের সঙ্গেই, যখন-তখন শরীরের ডাকে সাড়া দিতে সায় দিত না মন, কিন্তু অনিন্দ্যর ভাবখানা ছিল এমন যে রেবেকা একটা খাদ্য এবং গোগ্রাসে গিলে না ফেললে পচে যাবে। নিত্য এ নিয়ে খিটিমিটি ভালো লাগত না। সেদিনও এমনি কাজের ফাঁকে অনিন্দ্য তাকে ডেকেছিল মেসের নির্জনতায়। মেসে গ্রাম থেকে সদ্য উঠে আসা ছেলেটির উপস্থিতি জানা ছিল না রেবেকার, অনিন্দ্য আগে বলেনি তাকে, হয়তো সে আসতে রাজি হতো না বলে। অনিন্দ্যর উন্মত্ত সোহাগের নিচে ভাসতে ভাসতে হঠাত্ আবিষ্কার করেছিল সে, দুটো কৌতূহলী চোখ দরজার ফাঁকে, নিমেষে ছিটকে গিয়েছিল রেবেকা, ভেতরে-বাইরে গ্রাস করেছিল লজ্জা আর ঘৃণা, আর অনিন্দ্য তখন লক্ষ্যভ্রষ্ট উন্মাদ, অমানুষিক বর্বর পিটিয়েছিল মেসের জনৈক সদস্যের আত্মীয়, সদ্য গোঁফ গজানো কৈশোরোত্তীর্ণ ছেলেটিকে, যে কিনা রাজধানীতে এসেছিল ভাগ্যের খোঁজে, ভবিষ্যতের সন্ধানে, গ্রামে তার অসহায় মা অপেক্ষা করে বসে আছে একগাদা ভাইবোন নিয়ে, দোকানদার বাপের মুদি দোকানে মালামাল আর অবশিষ্ট নেই বেঁচে খাওয়ার মতো, বোধ করি ছেলে এবার পাঠাবে কিছু নুনভাত খাবার জন্য, সেদিন যে ছেলেটা মেসের ঠিকানা হারিয়ে উদ্বাস্তু হয়ে পড়েছিল, কথা ছিল দু-তিন জায়গায় নিয়ে যাবে কাজের সন্ধানে নব্য ব্যবসায়ী অনিন্দ্য। পরিচয়ের পরিধি ভালোই বেড়েছিল তার। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি। রেবেকা জানে না, অমানুষিক পিটুনি খাওয়া ছেলেটি সারা শরীরে রক্তাক্ত ক্ষত নিয়ে কোথাও আশ্রয় পেয়েছিল কিনা, তার কোনো কাজের যোগাড় হয়েছিল কিনা! ব্যস্ত শহরে রেবেকা প্রায় প্রতিদিন একটি অস্পষ্ট চেহারার ছেলেকে খোঁজে, শুধু জানবার জন্য, এই শহর তাকে আশ্রয় দিয়েছিল কি, যেমন দিয়েছে অনিন্দ্যকে? প্রায় একই রকম আলো-হাওয়া-শেকড় থেকে উঠে আসা অনিন্দ্য ছেলে-বুড়ো-বন্ধু-আত্মীয় সবার সঙ্গে চোখ উল্টে বা চোখ বন্ধ করে, প্রফেশনাল আচরণ রপ্ত নয় শুধু, আত্মস্থ করে পরিচয়হীন রূঢ় শহরে প্রতিষ্ঠিত ধনাঢ্য ব্যবসায়ী।
মুক্তি ম্যাটার্নিটির দরজায় প্রেগনেন্সি পজেটিভ রিপোর্টটি হাতে নিয়েও রেবেকার অবচেতন মন তাকেই খুঁজছিল, তাকেই মনে পড়ে গিয়েছিল কোনো সংগত কারণ ছাড়া। সেই ছেলেটি, রেবেকার কারণে যে উদ্বাস্তু হয়ে রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়েছিল। খবরটি জেনে অনিন্দ্য উচ্ছ্বাসহীন নির্বিকার থাকবে এ তো জানা রেবেকার, তবু ভেতরে ভেতরে দুর্বল হচ্ছিল তার মন। প্রথম পিতা হবার আনন্দ অনিন্দ্যর নেই, শিহরণও নেই রেবেকার, দশ বছরে সব ফিকে হয়ে গেছে, তবু নতজানু মনে হচ্ছিল আপন শরীরের কাছে, ধীরে ধীরে চূড়ান্ত একটি দিনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার শংকার কাছে। আর ঠিক তখনই পোয়াতি বিড়ালটাও কী করে আশ্রয় খুঁজে নিয়েছিল তাদের ফ্ল্যাটে, লুকিয়ে-চুরিয়ে তাকে কাঁটা-হাড়, উচ্ছিষ্ট দিতে গেলেই খ্যাঁকখ্যাঁক করে উঠত অনিন্দ্য, মাটির দেয়ালের ঘর থেকে উঠে আসা অনিন্দ্য, রক্ত জল করা টাকায় কেনা ফ্ল্যাটটি নোংরা হবে একটি বিড়ালের কারণে? অমানুষিক পিটুনি দেয় অনিন্দ্য দেখলেই, হাতের কাছে যা পায় তাই দিয়ে, তবু উদ্বাস্তু হয় না পোয়াতি বেড়ালটা, লুকিয়ে-চুরিয়ে সময় করে চলে আসে উচ্ছিষ্ট খেতে, ছেলেটি তো শহরে এসেছিল উচ্ছিষ্ট কুড়াতেই।
তোমার দয়া দেখানোর ইচ্ছে, অনাথ আশ্রম খুলে বসো গিয়ে— অনিন্দ্যর ব্যঙ্গ কোনো হুল ফোটায় না রেবেকার গায়ে। এটা বলাই অনিন্দ্যর জন্য স্বাভাবিক। সমাজতন্ত্র, লড়াই, বিপ্লব, মুক্তি ইত্যাদি শব্দগুলোকে অনেক পেছনে ফেলে অনিন্দ্য এখন যুগোপযোগী সার্থক মানুষ। একটি উদ্বাস্তু ছেলে কিংবা একটি উচ্ছিষ্টভোগী বেড়াল নিয়ে ভাববার ফুসরত কিংবা বোধ অনিন্দ্যর তখনো ছিল না আর এখন তো প্রশ্নই নেই...
রেবেকা হতাশ হয় না, করুণা করে। অনিন্দ্যর জানা হয় না সে করুণার বিচিত্র বহুমাত্রিক গতিবিধি। অনিন্দ্য শরীরে সুখের চর্বি মেখে সাদা পাঞ্জাবিতে জুম্মাবারে মসজিদে যায়, মসজিদে টাকা দান করে, সদ্য বড়লোক হবার কারণে মসজিদ কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদ প্রাপ্তির আনন্দ উপভোগ করে, পবিত্র সংযমের মাসে টুপি মাথায় অফিস করে, সেহরি-ইফতারে নিষ্ঠতার পরিচয় দেয়। এগুলো সে করে সামাজিক কোনো গ্রহণযোগ্যতার খাতিরে নয়, বরং বিশ্বাস থেকে। জন্মদাতা পিতাকে গালি দেয় হিন্দুয়ানি নামটার জন্য। মুখ ঝামটে ধমক দেয় রেবেকাকে— বেশি জ্ঞানের বুলি কচলিও না। পার্টিতে নিচের সারির নেত্রী ছিলে তুমি।
তাই বটে, অস্বীকার করার জো নেই, অস্বীকার করেও না রেবেকা। যেমন অস্বীকার করে না অনিন্দ্য, ঠিকাদারিতে কাজ পেয়ে সাপ্লাইয়ের বেলায় কৌশলে সর্বোচ্চ লাভটা আদায় করে নেয় সে। এটাই নাকি ব্যবসার কৌশল, মোটেই অন্যায় নয়। তথ্যটা কেবল স্ত্রী বলে রেবেকাকেই জানিয়েছে অনিন্দ্য, এর চেয়ে বেশি মর্যাদা কোন কালে কোন স্বামী দিয়েছে স্ত্রীকে?
রেবেকা সেই মর্যাদা উপলব্ধি করে না বলেই আধুনিক ফ্ল্যাট, আধুনিক মডেলের গাড়ি কিংবা আকাশছোঁয়া টাকার পাহাড়ে সুখী হতে পরে না। লেবার পেইন উঠলে গাড়ির কিংবা স্বামীর টেলিফোনের অপেক্ষা না করে স্কুটারে পৌঁছে যায় ক্লিনিকে, ডাক্তার ধমকে ওঠে। প্লাসেন্টা ফেটে বন্যার মতো ছুটছে জল, কে জানে জলে ভাসা কুসুমটি অক্ষত আছে কিনা! ওদিকে ও.টি. রেডি হয়, ডাক্তার-নার্স দৌড়াদৌড়ি, ডাক্তার সেলফোন টিপে সিনিয়র ডাক্তারের কাছে— ম্যাডাম, বাচ্চাটিকে বাঁচানো যাবে কিনা বোঝা যাচ্ছে না। জ্বি জ্ব, পেশেন্টের বয়স বেশি— বিয়ের দশ বছর পর কনসেপ্ট। ফোন যায় অনিন্দ্যর কাছে, অনিন্দ্য তড়িঘড়ি ড্রাইভার ডাকে, ব্যবসা স্থগিত রেখে বেরিয়ে আসে, গাড়ি দৌড়ায়। না, ক্লিনিকের দিকে নয়, প্রথমে কাকরাইল মসজিদের দিকে, মুয়াজ্জিন দরকার, বাচ্চা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আজান দেবে, আলট্রাসাউন্ডে স্পষ্ট দেখা গেছে, অনাগত বাচ্চাটির সেক্স পুরুষ।

এই পাতার আরো খবর -
font
আজকের নামাজের সময়সূচী
জুলাই - ২৭
ফজর৪:০২
যোহর১২:০৫
আসর৪:৪৪
মাগরিব৬:৪৭
এশা৮:০৮
সূর্যোদয় - ৫:২৫সূর্যাস্ত - ০৬:৪২
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :