The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার ২৮ জুলাই ২০১৪, ১৩ শ্রাবণ ১৪২১, ২৯ রমজান ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ তোবায় আটকা শ্রমিক, বেতন দিচ্ছে বিজিএমইএ

ঢালিউডটলিউডউভয় সংকট!

তানভীর তারেক

কে বেশী শক্তিশালী টালিউড বা ঢালিউড?
কার কাছে কার মর্যাদা কতটুকু? কে কাকে ছাড় দেবে বাংলা চলচ্চিত্রের এই ক্রান্তিকালে? এই উভয় সংকটে ...?
কলকাতায় কাজে অকাজে প্রায়ই যাওয়া হয়। পড়শী দেশে সেই যাতায়াতের ভেতরেই কিছু মানুষের সাথে সখ্য গড়ে ওঠে স্বাভাবিক ভাবেই। যেহেতু বিনোদন সাংবাদিকতা আর গানের সাথেই জীবনের যাতায়াত দীর্ঘদিনের তাই আমার সখ্য ডালপালাগুলো তেমনই কিছু প্রকৃতি খোঁজে নিজের অবলীলায়।
গত দুই বছর ধরে দুই বাংলার চলচ্চিত্র নিয়ে বেশ আলোচনা চলছে। মাত্র বছর দশেক আগে আমাদের ফেরদৌসকে টলিউডে কাস্ট করার জন্য মিষ্টির হঁড়ি নিয়ে আসতো। নায়ক রাজ রাজ্জাক ছিলেন সেখানকারও টপকাস্ট। কিন্তু এখন উল্টো আমাদের নিপুন, জয়া, রুহী , মীম থেকে শুরু করে একাধিক শিল্পীরা দেশের বাইওে অর্থাত্ কলকাতায় কাজ করার জন্য যেন উন্মুখ হয়ে বসে থাকেন। এখানে তারকাদের মূলত কোনো দোষ নেই। দোষটা সময়ের।
কিন্তু টলিউড ভাল অবস্থানে না ঢালিউড ? এই কঠিন বিতর্কে যখন দুই দেশের সংস্কৃতিজন। তখন দেখে আসি এই কঠিন দ্বন্দ্বে আসলে দুই পক্ষই আছেন লোকসানের ভাগিদার হয়ে।

টালিগঞ্জ যখন চেন্নাই!
কলকাতার চলচ্চিত্র কর্মীরা হঠাত্ কেন আগ্রহী হয়েছেন তাদের চলচ্চিত্রের বিপনন করানোর জন্য। এ প্রসঙ্গেও জবাব খুঁজতেই এক দুপুরে যাই নায়ক জিত্ এর অফিসে। ওখানকার উঠতি মিউজিক কম্পোজার আকাশ আমাকে নিয়ে যায়। তবে জিত্ এর অফিসে যাবার আগেই টালিগঞ্জের এক ব্যস্ত ফিল্ম এডিটিং হাউজে নিয়ে যায় আমাকে। সেখানে না গেলে হয়তো বুঝতেই পারতাম না আমাদেও ফিল্ম প্রডাকশনের আসল গোমরটা কি?
দুপুর শেষে ক্লান্ত রোদ তখন গায়ে নিচ্ছে কলকাতার মানুষ। ঘরোয়া পরিবেশে ৪ তলার এই পুরো স্টুডিওটার প্রতিটি ঘরে বসানো এডিটিং প্যানেল। আমি যখন ঢুকেছি, তখন দেব অভিনীত একটি চলচ্চিত্রের এডিটিং এর কাজ চলছে। একটি আইটেম গান। তার পাশেই একটি বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের কাজ। প্রডাকশন ম্যানেজার আমাকে চিনে ফেললেন। কিন্তু খানিক খটকা লাগলো। কারণ অনেক নির্মাতাই আজকাল তাদের ইন্টারভিউ নিতে গেলে বেশ গর্বভরে বলে ওঠেন, ‘আমার ছবি তো এখন চেন্নাইতে গিয়েছে।’ আমি খানিক কৌতুহল আর আগ্রহভরা চোখ নিয়ে বারকয়েক জিজ্ঞেস করেছি। ভাই আপনার ছবি কি চেন্নাইতে প্রদর্শিত হবে? তখন আমাকে খুবই অবাক করে বলেন। আরে নারে ভাই। বাংলাদেশে কি এফেক্টেও কাজ হয় ? এখানে এনিমেশনের কাজ ভাল হয় না।’
আমি বোকার মতো তখন চুপ থাকি। আসলে ওই প্রযোজক বা নির্মাতাকে যদি বলা হয় এনিমেশন আর সাউন্ড এফেক্ট কী জিনিস। আমি নির্ঘাত তিনি বলতে পারবেন না।
সে যাই হোক । আমি অবশেষে আবিষ্কার করলাম যে, তাদের অনেকেরই চেন্নাই এখন কলকাতায় অবস্থিত। আমাকে তখন বাংলাদেশের সেই প্রডিউসার বেশ খাতির যত্ন করলেন। আমি কিন্তু মুখ ফুটে কিছুই বলিনি। কিন্তু সেই প্রডাকশন ম্যানেজার বুঝে গেছেন, যে আমি জেনে গেছি যে, চেন্নাইয়ের নাম আর টালিগঞ্জের কাম।
আমরা যেমন বিদেশি ব্র্যান্ড শুনলেই আহা ! কি দারুণ বলে একটু দাম দিয়েই কিনতে যাই। তেমনি চেন্নাইয়ের ঘটনাটাও একই রকম। তবে সেই বাংলাদেশি চিত্র কলাকুশলীর কাছ থেকেই শুনলাম বিস্তারিত।
তিনি অকপটেই বললেন, ‘দেখুন তানভীর ভাই, কলকাতার নাম দিলে তেমন কেউ খাবে না। কারণ এটাকে বাংলাদেশিরা এখনও বিদেশ বলে ভাবতে পারে না। এই খাওয়ানোর জন্যই চেন্নাইটা এখানে নিয়ে আসতে হয়। তবে বলে রাখা ভাল, কেউ কেউ প্রকৃত অর্থেই চেন্নাইতে তাদের ছবির পোস্ট প্রডকশনের কাজ করতে যান।

জিত্ এর কণ্ঠে আক্ষেপ !
একেবারে নির্ভেজালভাবে চলচ্চিত্রের সাথে সম্পৃক্ত থাকবেন বলে ক্যারিয়ারে খানিক ভাটা নামবার সাথে সাথেই নিজেকে প্রজোযক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করেছেন। এরই ভেতরে কয়েকটি চলচ্চিত্র প্রযোজনা করেছেন। পরিপাটি অফিস। পরিচয় দিয়ে যখন জানতে চাইলাম চলচ্চিত্রের অবস্থা। এখনকার প্রেক্ষিতের কথা। ও কথা আর বলবেন না। এখন আমাদের গান করতে যেতে হয় মিশর বা ইতালি। বাঙালির ছবিতে তো কোনোদিন আমরা কলকাতার বাইরে যেতেও শুনিনি। কিন্তু এখানে নায়ক-নায়িকার গল্প গড়িয়াহাটে হচ্ছে অথচ গান হচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকায়। এই উদ্ভট ক্যারিশমা না করলে নাকি আবার ছবি চলে না। এর ভেতরে কতদিন আমরা সাসটেইন করতে পারবো বলা মুশকিল।’
জিতের কথা শুনে খানিকটা বিভ্রান্তিতে পড়া গেল। যেখানে আমরা সকলেই জানি পশ্চিমবাংলার চলচ্চিত্র এখন সাফল্যে অনেককেই ছাড়িয়ে যাচ্ছে। কিন্তু দূরের ঘাস যে সত্যিই সত্যিই শুধু দৃষ্টিসুখই দেয়। কাছে এলে ভিন্ন হয়ে যায়। তা বোঝা গেলো এপার বাংলার তারকাদের সাথে আলাপচারিতায়।
প্রশ্ন রাখলাম, প্রযোজক হিসেবে এদেশে লাভজনক নাকি অভিনেতার অবস্থান টা-
দুটোই নড়বড়ে। কারণ প্রযোজক শক্তিশালী হতে না পারলে তো অভিনেতা শক্ত হতে পারবেন না। আর এখানে রিলায়েন্সসহ একাধিক প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসছে ঠিকই। কিন্তু ওরা এসেই কনফার্ম হিট চাইছে। আর সেই ফর্মূলা হলো তামিল ছবির কপিরাইট নিয়ে বাংলায় অনুবাদ করে ফেলো।
আমি আর শুভশ্রী দুজন মিলে কাজ করলাম বস ছবিতে। ছবিটি বক্স অফিস হিট করলো। এখন এই ছবি যে ধারাবাহিকভাবে ব্যবসা দেবে এ কথা তো বলে লাভ নেই।’


শুভশ্রীর সাথে দুই বাংলায়
চিত্রনায়িকা শুভশ্রীর সাথে কথা, দেখা হয়েছে দুই বাংলাতেই। প্রথমে কলকাতার পাঁচতারা হোটেলে অপর্ণা সেনের ‘গয়নার বাক্স’ ছবির প্রিমিয়ারে। কলকাতার এক বন্ধু সাংবাদিক আমাকে নিয়ে যায়। তারকাখচিত রাত। অপর্ণা সেন এর নিমন্ত্রণ কেউ মিস করবেন না। তাই ভেবেই নিলাম অনেকেই বিনা দাওয়াতেই চলে এসেছেন। পার্টিতে বরাবরের মতো লোক দেখানো ভদ্রতার হাসি হেসেই চলেছে। আমি কাচুমাচু হয়ে এক কোনায় দৃশ্যগুলো দেখছি। কারণ অতিথি প্রায় সকলকেই চিনি। কিন্তু কেউই তো আমাকে চেনে না।
বসে বসে কিছুদিন আগের ঘটনার কথা মনে পড়লো। কলকাতা নিউমার্কেটে একদিন এক চিত্রনায়কের সাথে দেখা। এদেশের সকলেই তাকে চেনেন। তার ভক্তসংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। তাকে দেখলাম অনেক কষ্টে সৃষ্টে বউসমেত একগাছি ব্যাগ হাতে নিয়ে ঘামছেন। এখানেও আমাকে দেখে বেচারী হিরো বড্ড লজ্জায় পড়ে গেলেন মনে হলো। এরপর একসাথে লাঞ্চ সারলাম আমরা। সেই মধ্যাহ্ন ভোজের ভেতরেই আক্ষেপ করে দারুণ এক কথা বললেন তিনি।
বললেন, দেখুন তানভীর ভাই আজ আমি বাংলাদেশের এত বড় তারকা। ঢাকায় আমি কোথাও দাঁড়িয়ে থাকলে লোকজনের কম ভীড় হয় না। অথচ এত কাছের দেশ হয়েও মানুষজন আমাকে চেনে না! অথচ এখানকার একজন চতুর্থ পর্যায়ের শিল্পীও যদি ঢাকা নিউমার্কেটে হেঁটে যায়। তার কাছে কি পরিমাণ ভীড় হবে। পার্থক্যটা এখানেই।
আমি অপর্ণাদিও এই আসরে বসে সেই গল্পটাই ভাবছিলাম। যে এদেশে অন্তত বাংলাদেশের ৪ টি চ্যানেল চললেও অতিথিদের বলতে পারতাম আমি অমুক চ্যানেলের অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করি।
তো সেখানেই দেখা শুভশ্রীর। হাই হ্যালো অব্দি।
অবশেষে অনন্য মামুনের বিতর্কিত চলচ্চিত্র ‘আমি শুধু চেয়েছি তোমায়’ এর শুটিং এ যখন ঢাকায় আসলো। তখন আরটিভির একটি অনুষ্ঠান করলাম তাকে নিয়ে। আড্ডা আলাপ হলো বেশ খানিকটা। কিন্তু এখানেও প্রশ্ন করে ধাক্কা খেলাম। ধাক্কা খাওয়ার বিষয়টি হলো, শুভশ্রীও আমাদের দেশের অভিনয় শিল্পীদের চেনে না।

দুই বাংলার ফিল্ম রিপোর্টে সাদৃশ্য
মাত্র কিছুদিন আগে ঢাকার চলচ্চিত্র নির্মাতা দিলশাদুল হক শিমুল আমাকে একটি লিংক দেন ফেসবুকে। সেটিতে ক্লিক করতেই দেখা গেলো আনন্দবাজারের এক রিপোর্টে কলকাতার ফিল্ম ইন্ডাষ্ট্রির বেহাল দশা। বছরে শতকরা ৩০ ভাগ ছবির কোনো ব্যবসা সফলতা নেই। খবরটি পড়ে খানিকটা অবাকই হলাম।
মাত্র কিছুদিন আগে সর্বশেষ কলকাতা গিয়েছিলাম একটি গান রেকর্ডিং এ। সেখানে কথা হয় প্রখ্যাত চিত্রপরিচালক ও অভিনেতা কৌশিক গাঙুলীর সাথে। ভেংকেটশ ফিল্মস এর অফিসে গুণী এই পরিচালকের সাথে কথা বলেই মূলত পুরো বিষয়টি আঁঁচ করতে পেরেছিলাম যে টালিউডের ব্যবসাও খুব একটা ভাল যাচ্ছে না।
কৌশিক যিনি, আরেকটি প্রেমের গল্প, শব্দসহ সর্বশেষ তৈরি করলেন অপুর পাঁচালী।
স্বাধীন ঘরানার এইসব নির্মাতার সাধারণত নিজের পকেটের টাকা খরচ করেই ফিল্ম বানান। তাই তাকে উদ্দেশ্য করে বললাম। কৌশিক দা কি কর্পোরেট এর কাছে বিক্রি হয়ে গেলেন।
কৌশিক হাসলেন। দেখুন, এছাড়া উপায় কি। ফিল্মের যা অবস্থা। এরা সব গুছিয়ে দেয়। আমি ছবি করি। প্রচার, প্রচারণা সব এরাই করে।
আপনারা তো এখন হিন্দি ছবির সাথে ফাইট দিচ্ছেন—
এটা আত্মতৃপ্তি নিয়ে ধ্বংস হয়ে যাবার মতো একটি কথা। কারণ এমনটা ভাবার কোন কারণ নেই। ওই ভুতের ভবিষ্যত তখনকার শাহরুখের একটি ছবিকে পাল্লা দিয়ে ব্যবসা করেছে। এটা তো শুধু কলকাতার ঘটনা। কিন্তু এখন ভাল ছবির বাজেট যে হারে বাড়ছে, তাতে দুই বাংলা এক হওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই।
আমাদের দেশের জয়া, রুহী, নিপুণসহ বেশ কজন কলকাতার ছবিতে কাজ করছেন। তারা ভাবছেন তাদের বিশাল সুযোগ দিচ্ছে কলকাতা।
তাই এটুকু অন্তত স্পষ্ট যে টলিউড বা ঢালিউড দুই পক্ষই আজ উভয়সংকটে আছে। তাই এটা ভেবে কোনো আত্মশ্লাঘায় ভোগার কোনো কারণ নেই। কারণ দুই পক্ষই আছে উভয় সংকটে। কলকাতার ছবি আজ ব্যবসায়িক দিক দিয়ে সমৃদ্ধ থাকলে কোনোদিনই তারা বাংলাদেশের জানালায় উঁকি দেবার চেষ্টা করতো না। আজ দুই দেশের বাংলা চলচ্চিত্রের অবস্থায়ই নাজুক। তাই সমাধান সমমর্যাদাতেই হতে হবে। সমান আলোচনায় বের করতে হবে আমাদের মুক্তির পথ।

এই পাতার আরো খবর -
font
আজকের নামাজের সময়সূচী
মে - ৩০
ফজর৩:৪৫
যোহর১১:৫৬
আসর৪:৩৬
মাগরিব৬:৪৪
এশা৮:০৭
সূর্যোদয় - ৫:১১সূর্যাস্ত - ০৬:৩৯
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :