The Daily Ittefaq
শুক্রবার ১৫ আগস্ট ২০১৪, ৩১ শ্রাবণ ১৪২১, ১৮ শাওয়াল ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ শাহ আমানতে যাত্রীর ফ্লাস্ক থেকে ৪০ লাখ টাকার সোনা উদ্ধার | ধর্ষণের ঘটনা ভারতের জন্য লজ্জার: মোদি | শোক দিবসে সারাদেশে জাতির জনকের প্রতি শ্রদ্ধা | লঞ্চ পিনাক-৬ এর মালিকের ছেলে ওমর ফারুকও গ্রেফতার

প্রেরণার ও সৃষ্টিশীলতার এক অশেষ ঝরনাধারা

মিনার মনসুর

বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামী লীগ এখন ক্ষমতায়। ফলে জনগণের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত আবেগের সঙ্গে স্বার্থগন্ধী কিছু কিছু আতিশয্যও হয়তো যুক্ত হচ্ছে। ভারী হচ্ছে অতিভক্ত ও স্তাবকের কাফেলা। বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায়ও তাই হয়েছে। কিন্তু সপরিবারে তিনি নিহত হওয়ার পরের দৃশ্যপট ছিল একেবারেই অন্যরকম। ঘটনার আকস্মিকতায় সাধারণ মানুষ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিল এটা সত্য। তবে সর্বক্ষণ যারা তাঁকে ঘিরে থাকতেন, স্তাবকতার মধু বর্ষণ করতেন তাঁর কানে— তাদের অনেকের বেলায় এ কথা খাটে না। চরম দুঃসময়ে তারা শুধু মুখ ফিরিয়ে নিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং সপরিবারে মর্মান্তিকভাবে নিহত এই মহান নেতার বিরুদ্ধে বিরামহীন বিষোদ্গারের পাশাপাশি জঘন্য অপপ্রচারেও অবতীর্ণ হয়েছিলেন প্রকাশ্যে। এটাই নিয়ম। সুসময় যেমন ভক্ত-সমর্থকের বাঁধভাঙা ঢল নিয়ে আসে, তেমনি দুঃসময়ও একা আসে না। শঠতা ও বিশ্বাসঘাতকতার বিশাল ডালা ভরে নিয়ে আসে খাঁ খাঁ শূন্যতা।

বঙ্গবন্ধু হত্যা-পরবর্তীকালের অভিজ্ঞতা আরও বিভীষিকাময়। একদিকে সামরিক জান্তার রক্তচক্ষু, অন্যদিকে ঘাতকের সদম্ভ উল্লাস। মনুষ্যরক্তের স্বাদ পাওয়া বাঘের মতো তারা তখন ঘুরে বেড়াচ্ছে জনপদে। নারী ও শিশুসহ অসংখ্য নিরপরাধ মানুষের রক্তে স্নাত তাদের হাত। বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে হত্যা করেও নিরস্ত হয়নি হিংস্র এ ঘাতকের দল, বাংলার মাটি থেকে তাঁর অস্তিত্ব মুছে ফেলার ভয়ঙ্কর খেলায়ও মেতে উঠেছিল তারা। বঙ্গবন্ধু যেন নিষিদ্ধ এক নাম। তাঁর নাম উচ্চারিত হওয়া মাত্রই ছুটে আসে রক্তলোলুপ হায়েনার পাল। তার ভয়াল ছায়া বিস্তৃত হয়েছিল আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও। ভীতি আর আতঙ্ক ছিল আমাদের নিত্যসঙ্গী।

মানবেতিহাসের ঘৃণ্যতম এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে কিছু একটা করার জন্যে আমরা তখন টগবগ করে ফুটছিলাম। অথচ চারপাশে কবরের স্তব্ধতা। কী করবো কীভাবে করবো তার কোনো কূলকিনারা পাচ্ছিলাম না। এ সময়ে অভিনব এক আইডিয়া নিয়ে এগিয়ে আসেন আমাদের এক বড়োভাই। তাঁর প্রস্তাব অনুযায়ী বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রথম বার্ষিকীতে (১৯৭৬ সালের ১৫ আগস্ট) আমরা ভূপেন হাজারিকার বিখ্যাত একটি গানের পঙিক্ত-সংবলিত একপৃষ্ঠার একটি প্রচারপত্র প্রকাশ করি চট্টগ্রাম থেকে। সেই পঙিক্তগুলো হলো— 'বলো কী তোমার ক্ষতি/জীবনের অথৈ নদী/পার হয় তোমাকে ধরে/দুর্বল মানুষ যদি।' প্রচারপত্রের অর্ধেকটা জুড়ে ছিল কাঠের ব্লকে মুদ্রিত বঙ্গবন্ধুর আবক্ষ একটি ছবি। তার নিচে ৩৬ পয়েন্ট টাইপে পঙিক্তগুলো ছাপা হয়েছিল। গোপনে বিলিকৃত প্রচারপত্রটি বেশ সাড়া জাগিয়েছিল। কয়েক মাসের ব্যবধানে আমাদের হাতে আসে কবি নির্মলেন্দু গুণের সেই অসামান্য কবিতাটি— 'আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি'। এটা ছিল একটা বিস্ফোরণ। তার আঘাতে কবরের স্তব্ধতা ভেঙে যায়। তাত্ক্ষণিকভাবে কবিতাটির শত শত কপি গোপনে মুদ্রিত করে আমরা জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে দেই। এ দু'টি ঘটনা শুধু যে আমাকে প্রবলভাবে নাড়া দিয়েছিল তা-ই নয়, হঠাত্ আলোর ঝলকানির মতো আমরা প্রতিবাদের সর্বোত্তম পথটিও পেয়ে যাই। সেই শুরু।

'বঙ্গবন্ধুর তৃতীয় শাহাদাত্ বার্ষিকী স্মরণিকা' হিসেবে ১৯৭৮ সালের ১৫ আগস্ট আমরা প্রথম প্রকাশ করি 'এপিটাফ'। এ নামকরণের মূলেও ছিল বঙ্গবন্ধু হত্যার বিষাদময় পটভূমি। ডিমাই ১/৮ সাইজের ৪০ পৃষ্ঠার এ সংকলনে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ৪টি প্রবন্ধ, একটি সম্পাদকীয় (পুনর্মুদ্রিত) এবং ১২টি কবিতা ছাপা হয়। প্রচ্ছদে তুলে ধরা হয় বঙ্গবন্ধুর স্মরণীয় কিছু বাণী। পরের বছরই আমরা প্রকাশ করি 'শেখ মুজিব একটি লাল গোলাপ'। ইতোমধ্যে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রতিবাদী কবিতা ও ছড়া সংকলন 'এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়' (২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৮) প্রকাশিত হয়ে গেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। স্বল্প পরিসরের এ-প্রকাশনাটি তখন বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।

প্রতিবাদী তরুণ লেখক ও সংস্কৃতিকর্মীদের উদ্যোগে প্রায় একই সময়ে আরও কিছু স্মরণিকা-সংকলনও প্রকাশিত হয়েছে সারা দেশে। তবে আমার জানা মতে, পঁচাত্তর-পরবর্তীকালে 'শেখ মুজিব একটি লাল গোলাপ'ই হলো বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত প্রথম সংকলন। সর্বমোট ১৩২ পৃষ্ঠার এ-সংকলনটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৭৯ সালের সেপ্টেম্বরে। বঙ্গবন্ধুর চতুর্থ শাহাদাত্ বার্ষিকীকে সামনে রেখে এটি প্রকাশিত হয়েছিল। তখন কোনো গ্রন্থ বা সংকলনই ৫শ' কপির বেশি ছাপা হতো না। আমরা সাহস করে 'শেখ মুজিব একটি লাল গোলাপ'-এর ১২শ' ৫০ কপি ছেপেছিলাম। প্রকাশের মাত্র একমাসের মধ্যেই বিক্রি হয়ে গিয়েছিল সবক'টি কপি। তার পরও চাহিদা ছিল বিপুল। পরে ১৯৯৮ ও ২০১০ সালে গ্রন্থটির আরও দু'টি ঢাউস সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে।

আমাদের মধ্যে তীব্র ক্রোধ ছিল এ-কথা সত্য। ছিল ঘাতকদের প্রতি পর্বতপ্রমাণ ঘৃণা। কিন্তু 'শেখ মুজিব একটি লাল গোলাপ' কোনো তাত্ক্ষণিক আবেগের ফসল ছিল না। বহু বিনিদ্র রাত আমরা উত্সর্গ করেছি এর পেছনে। আমাদের সাধ ছিল আকাশচুম্বী। প্রথমে আমরা ভেবেছি, বিশ্বের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের কাছ থেকে এ ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়া সংগ্রহ করে তা গ্রন্থাকারে প্রকাশ করবো বাংলা ও ইংরেজিতে। আমাদের বন্ধু কবি কামাল চৌধুরীও (বর্তমান জনপ্রশাসন সচিব) ছিলেন এ-পরিকল্পনার অন্যতম ভাবসঙ্গী। কিন্তু সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সাধ্য আমাদের ছিল না। ফলে আমরা আমাদের ভাবনার বৃত্তকে সংকুচিত করে 'শেখ মুজিব একটি লাল গোলাপ' প্রকাশে উদ্যোগী হই। আমাদের প্রাথমিক চিন্তা ছিল, বাংলা ভাষাভাষী সকল বিবেকবান মানুষের প্রতিবাদ ও ঘৃণাকে একত্রে সংকলিত করে গ্রন্থাকারে তা দেশবাসীর সামনে তুলে ধরা। আমাদের পথ যে কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না তা বলা বাহুল্য মাত্র।

সবচেয়ে বেশি ভুগতে হয়েছে লেখা সংগ্রহ করতে গিয়ে। লেখার জন্যে লেখক, কবি ও বুদ্ধিজীবীদের দুয়ারে দুয়ারে ধরনা দিয়েছি। চট্টগ্রাম থেকে এসে দিনের পর দিন ঢাকায় পড়ে থেকেছি। ঢাকার পথঘাট ভালো চিনতাম না। অগ্রজ কবীর আনোয়ার (চলচ্চিত্র নির্মাতা), কবিবন্ধু জাফর ওয়াজেদ, রেজা সেলিম ও মুজাহিদ শরীফকে নিয়ে খ্যাত-অখ্যাত প্রায় সব বুদ্ধিজীবী ও লেখকের দরোজার কড়া নেড়েছি। অভিজ্ঞতা তিক্ত-মধুর। বোস প্রফেসর আবদুল মতিন চৌধুরীসহ কেউ কেউ সস্নেহে বুকে জড়িয়ে ধরেছেন। আবার অনেকে মুখের ওপর দরোজা বন্ধও করে দিয়েছেন। তাদের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর বিশেষ অনুগ্রহভাজন ব্যক্তির সংখ্যাও কম ছিল না। তবে আমরা হাল ছেড়ে দেইনি। আমাদের সৌভাগ্য যে অন্নদাশঙ্কর রায় ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখাও আমরা পেয়েছিলাম। কবি বেলাল চৌধুরীর মাধ্যমে সেই লেখা আমাদের হস্তগত হয়েছিল।

সংকলনটির নাম নিয়ে আমাদের মধ্যে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দ্বিধা ছিল। আমার পছন্দের একটি শিরোনাম ছিল 'আবার যুদ্ধে যাবো'। আমার তখন মনে হয়েছিল, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়নি। দেশকে রাহুমুক্ত করতে হলে আমাদের আরও একটি মুক্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হবে। পরে ১৯৮০ সালের ১৫ আগস্টে আমরা 'আবার যুদ্ধে যাবো' নামেও একটি বিশেষ বুলেটিন প্রকাশ করি। এতে আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ, সুফিয়া কামাল, সৈয়দ আলতাফ হোসেন, আবু জাফর শামসুদ্দীন, আবদুল মতিন চৌধুরী, কলিম শরাফী, কবীর চৌধুরী, সন্তোষ গুপ্ত, আনিসুজ্জামান, দেবদাস চক্রবর্তী, খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস, আলী আকসাদ, রাহাত খান, বেলাল চৌধুরী, নির্মলেন্দু গুণ, আলী যাকের, আবদুল জব্বার, কবীর আনোয়ার ও কামাল চৌধুরীসহ বহু বিশিষ্ট জনের স্বাক্ষরসংবলিত প্রতিক্রিয়া ছাপা হয়। আমার বিশ্বাস, এই বুলেটিনটি বঙ্গবন্ধু হত্যা-পরবর্তীকালে প্রকাশিত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রথম একক কাব্যগ্রন্থটিও প্রকাশিত হয় এপিটাফ প্রকাশনী থেকে। মহাদেব সাহার সাড়া জাগানো এ-গ্রন্থটি আমরা প্রকাশ করি ১৯৮২ সালে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত হয় আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'এই অবরুদ্ধ মানচিত্রে'। বঙ্গবন্ধুকে উত্সর্গ করা এ-গ্রন্থটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বাজেয়াপ্ত হয়ে যায়। বেশকিছুদিন পালিয়ে বেড়াতে হয় আমাকে। দেশে তখন লে. জে. এরশাদের স্বৈরশাসন। সামরিক শাসনের কোপানলে পড়ে মাঝপথে থেমে যায় আমাদের এ ক্ষুদ্র প্রতিবাদী প্রকাশনা উদ্যোগটি। তবে বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র পরিসরে 'ভয় হতে অভয় মাঝে' আমাদের যে-যাত্রা শুরু হয়েছিল তা ততদিনে ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। সেদিনের সামান্য চারাগাছটি পরিণত হয়েছে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের অসামান্য এক মহীরুহে। সর্বোপরি, পহেলা বৈশাখ ও অমর একুশের মতো বঙ্গবন্ধুও পরিণত হয়েছেন বাঙালি কবি-লেখক ও শিল্পীদের প্রেরণার ও সৃষ্টিশীলতার এক অশেষ ঝরনাধারায়।

minarmonsur@gmail.com

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, 'জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা নিয়ে টিআইবি'র বক্তব্য রাজনৈতিক উদ্দেশ্যমূলক।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
6 + 5 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
নভেম্বর - ১১
ফজর৫:১০
যোহর১১:৫২
আসর৩:৩৭
মাগরিব৫:১৬
এশা৬:৩৩
সূর্যোদয় - ৬:৩০সূর্যাস্ত - ০৫:১১
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :