The Daily Ittefaq
শুক্রবার ১৫ আগস্ট ২০১৪, ৩১ শ্রাবণ ১৪২১, ১৮ শাওয়াল ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ শাহ আমানতে যাত্রীর ফ্লাস্ক থেকে ৪০ লাখ টাকার সোনা উদ্ধার | ধর্ষণের ঘটনা ভারতের জন্য লজ্জার: মোদি | শোক দিবসে সারাদেশে জাতির জনকের প্রতি শ্রদ্ধা | লঞ্চ পিনাক-৬ এর মালিকের ছেলে ওমর ফারুকও গ্রেফতার

আমার প্রথম স্মৃতির নাম শেখ মুজিব

মাসুদ সেজান

নাট্যকার ও নির্মাতা

জন্মের পর ঠিক কোন বয়সটাতে এসে পৌঁছালে, একটি ঘটনা মানুষের চিন্তার মধ্যে রেখাপাত করে, যা পরবর্তীকালে তার স্মৃতি হিসেবে সংরক্ষিত হয়—এই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আমার জানা নেই। শুধু এইটুকু বুঝতে পারি, স্মৃতিকে স্মরণ করবার শক্তিতে আমি খুবই দুর্বল প্রকৃতির মানুষ। ছোটবেলার কোনো কিছুই ওইভাবে আমার মনে পড়ে না, এমনকি প্রথম কবে স্কুলে গিয়েছিলাম সেই মহেন্দ্রক্ষণটিও। তবে দিন তারিখের হিসেবে, চোখ বন্ধ করলে এখনো স্পষ্ট দেখতে পাই বিশেষ একটি সকাল। হায়! আমার প্রথম স্মৃতির সেই সকাল। যেই স্মৃতির সঙ্গে মিশে আছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নাম।

আমি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কথা বলছি। তখন আমার বয়স ৫ বছর। জয়পুরহাটের বামনপুর গ্রামের মাদারগঞ্জে আমাদের বাস। হঠাত্ করেই সেই সকালে আমার বাবা আবুল কাশেম তার ঘর থেকে ময়েজ উদ্দিন ময়েজ উদ্দিন (ছোট চাচা) বলে চিত্কার করতে করতে বের হয়ে এলেন। বাবার সঙ্গে সঙ্গে আমার মা আলেয়া বেগম। তাদের সেই উদ্বেগ, উত্কণ্ঠা আর বিচলিত ছোটাছুটি দেখে ওই বালক বয়সেই আমার মনে হয়েছিল, বাড়িতে বোধ হয় ডাকাত পড়েছে, তারা আমাদের সবকিছু লুটে নিয়ে গেছে। মুহূর্তের মধ্যেই আশপাশের লোকজন এসে আমাদের উঠোনে জড়ো হতে লাগল। ছোট চাচা তার ঘর থেকে একটি পড়ার টেবিল বের করে উঠোনে রাখলেন। টেবিলের ওপর সেট করা হলো চেয়ার, চেয়ারের ওপরে বাবার থ্রি ব্যান্ড রেডিও। যেন এমন কিছু ঘটে গেছে, যা শুধু কানে শুনবার নয়, বিশ্বাস করতে চাইলে মানুষকে চোখ দিয়ে দেখতে হবে। ওই গ্রামের একমাত্র রেডিওটি তখন মুহূর্তেই এই সময়ের টেলিভিশনের রূপ ধারণ করল। এক গ্রাম মানুষের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আমিও রেডিও দেখছি, আমিও শুনতে পাচ্ছি মেজর ডালিমের সেই সদম্ভ ঘোষণা—'খন্দকার মোশতাক আহমেদের নেতৃত্বে আজ ভোরে সামরিক বাহিনী দেশের সর্বময় ক্ষমতা গ্রহণ করেছেন... শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়েছে।'...

ক্রমেই চারিদিকে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল। সমূহ বিপদের আশঙ্কায় পুরো গ্রাম থমথম করছে। ভীত, আতংকিত সেইসব মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে আমি উপলব্ধি করলাম, ডাকাত সত্যিই পড়েছে, তবে আমাদের বাড়িতে নয়, দেশে। শেখ মুজিব আমাদের রাজা। ওরা আমাদের রাজাকে মেরে ফেলেছে।

দুই.

কলেজে প্রবেশ করার আগেই আমি ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দিই। কারণ আর কিছুই নয়, সমাজে যা কিছু বৈষম্য আছে, একমাত্র সমাজতন্ত্রই তা দূর করে দিতে পারে—এই ভরসায়। আর, ভালো ছাত্ররা ছাত্র ইউনিয়ন করবে—এটাই তখন ট্রেন্ড ছিল। ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দিয়েছিলাম বলেই হয়তো পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধুকে চিনতে আমার সুবিধা হয়েছে। সমকালীন রাজনীতির একরৈখিক চিন্তা থেকে নয়, বহুমাত্রিক ও নিরপেক্ষ একটি অবস্থানে দাঁড়িয়ে এই মহান নেতাকে আমি জানার চেষ্টা করেছি। সোভিয়েত ইউনিয়নের লাল বইয়ের পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু সম্পর্কিত বইগুলোই তখন সেই ছাত্রজীবনে আমার প্রিয় পাঠ্য ছিল।

ঢাকায় আসার পর রাজনীতি ছেড়ে দিয়ে আবৃত্তি, নাটক আর সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছি। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল কিংবা জীবনানন্দের মধ্যে ডুব দিয়ে বোধের অতলান্তে পৌঁছাতে গিয়ে দেখি, সেখানেও আমার সামনে একমাত্র অবলম্বন হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন শেখ মুজিব। কেননা, 'আমার সোনার বাংলা' যখন নতুন নতুন ষড়যন্ত্রের শিকার, মৌলবাদীদের বেপরোয়া উত্থান, কিংবা যারা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি হাসিল করবার উদ্দেশ্যে এখনও আমার প্রিয় স্বদেশকে 'দুর্গম গিরি, কান্তার মরু, দুস্তর পারাবার' বানিয়ে রাখবার পায়তারা করছেন, তখন এই 'রূপসী বাংলা'কে রক্ষা করবার জন্য আবারও একজন কাণ্ডারী শেখ মুজিবকে আমাদের বড় বেশি প্রয়োজন ছিল।

তিন.

সম্প্রতি বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়লাম। বঙ্গবন্ধুকে পড়া, তাঁকে জানা, তাঁকে উপলব্ধির পর আমার কেবলই মনে হয়, তিনি শুধু লিডার ছিলেন না, ছিলেন একজন গ্রেট লিডার, একজন গার্ডিয়ান। পৃথিবীতে খুব কম জাতির সৌভাগ্য হয়েছে তার মতো বড় মাপের একজন নেতাকে কাছে পাবার। বাঙালি জাতিকে তিনি কতটা আপন করে নিয়েছিলেন, ৭ই মার্চের ভাষণ থেকেই তা স্পষ্ট হয়ে যায়। ওই ভাষণের এক পর্যায়ে তিনি যখন পুরো জাতিকে 'তুমি' বলে সম্বোধন করে বললেন, 'আর যদি একটা গুলি চলে... তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে, তা-ই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে।'... তখন বাংলাভাষার 'তুই', 'তুমি' এবং 'আপনি'র সম্পর্ক নির্ণায়ক পারস্পেকটিভে এই 'তুমি'র আপনত্ব অনুভব করেই যেন একাত্তরের নয় মাস, মুক্তির সংগ্রামে আমরা জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে অধিকতর ঘন হয়ে উঠেছিলাম।

বঙ্গবন্ধুর উদারনৈতিক মনোভাব এবং মানুষ হিসেবে তিনি কত বড় ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন তার সাক্ষ্য পাই, ক্ষমতায় অবস্থানকালীন তুঙ্গ সময়ে তিনি যখন বলতে পারেন, 'দেশে সাত কোটি কম্বল আসল, আমার ভাগের কম্বলটি কোথায় গেল?' কিংবা 'দেশ স্বাধীন করে অন্যেরা পায় তেলের খনি, সোনার খনি, আমি পেয়েছি চোরের খনি'। তখন তার সততা, স্পষ্টবাদিতা কিংবা চোর ধরবার পজিটিভ ইনটেনশন নিয়ে আর কোনো সন্দেহ থাকে না। বঙ্গবন্ধু-পরবর্তী এতগুলো সরকার আমরা পেয়েছি, কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকেই এইভাবে নিজেদের সমালোচনা করতে দেখিনি। বিশেষ করে, নিজেদের দুর্বলতা আর অপকর্ম ঢাকবার জন্য যখন আমাদের রাজনীতিবিদরা মরিয়া হয়ে ওঠেন, তখন বঙ্গবন্ধুর এই সাহসী উচ্চারণ প্রমাণ করে দেয় তিনি সাধারণ কেউ নন, অসাধারণ, অবিসংবাদিত এক মহান নেতা। যদিও কাউকে কাউকে বলতে শুনি, শেখ মুজিব বড় নেতা ছিলেন বটে কিন্তু প্রশাসক হিসেবে তিনি ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন, আমি তাদের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করি। যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবার পর, পৃথিবীর কোনো দেশ থেকে তার মিত্রবাহিনী তিন মাসের মধ্যে সবকিছু গুটিয়ে চলে গেছে—এরকম নজির নেই। বঙ্গবন্ধু তিন মাস অতিক্রম করার আগেই তাদের চলে যাওয়া নিশ্চিত করে একজন যোগ্য প্রশাসকের সূচনাটিই করেছিলেন। যুদ্ধ বিধ্বস্ত একটি ভূখণ্ডকে, একটি দেশের কাঠামোতে দাঁড় করবার জন্য সু-শাসকের অন্যান্য কাজগুলোও তিনি গুছিয়ে এনেছিলেন, কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীরা তাঁকে পরবর্তী পর্যায়ের সুযোগটি আর দেয়নি। ১৫ আগস্টের কালরাত্রির মধ্যে দিয়ে ওরা বঙ্গবন্ধুকে নয়, বাঙালির স্বপ্ন-সম্ভাবনাকেই হত্যা করেছে।

পরিশেষে শুধু এইটুকু বলব, যখন দেখি আওয়ামী লীগের কিছু নেতা-কর্মী জাতির পিতাকে নিজেদের নেতা বানিয়ে জাহির করবার চেষ্টা করছেন, কিংবা এন্ট্রি-আওয়ামী লীগ গোষ্ঠী আরেকজনের সঙ্গে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে তাঁকে তার যোগ্য মর্যাদা থেকে নিচে নামিয়ে আনবার অপচেষ্টায় মুখর, তখন বাঙালি জাতির একজন প্রতিনিধি হিসেবে আমি কুণ্ঠিত হই, লজ্জা পাই...

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, 'জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা নিয়ে টিআইবি'র বক্তব্য রাজনৈতিক উদ্দেশ্যমূলক।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
5 + 9 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
নভেম্বর - ১৭
ফজর৫:১৩
যোহর১১:৫৫
আসর৩:৩৯
মাগরিব৫:১৮
এশা৬:৩৬
সূর্যোদয় - ৬:৩৪সূর্যাস্ত - ০৫:১৩
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :