The Daily Ittefaq
শুক্রবার ১৫ আগস্ট ২০১৪, ৩১ শ্রাবণ ১৪২১, ১৮ শাওয়াল ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ শাহ আমানতে যাত্রীর ফ্লাস্ক থেকে ৪০ লাখ টাকার সোনা উদ্ধার | ধর্ষণের ঘটনা ভারতের জন্য লজ্জার: মোদি | শোক দিবসে সারাদেশে জাতির জনকের প্রতি শ্রদ্ধা | লঞ্চ পিনাক-৬ এর মালিকের ছেলে ওমর ফারুকও গ্রেফতার

সাহিত্য ও শিল্পে বঙ্গবন্ধু

'বাঙালীর সর্বগর্ব তোমাতেই আজি দ্যুতিমান'

আখতার হুসেন

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং তার অবিসংবাদিত নায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর জীবদ্দশায় যেমন, তেমনি তাঁকে ঘাতকেরা নৃশংসভাবে হত্যা করার পরও বন্দিত হন কবিতা, গান ও ছড়ার পাশাপাশি সৃজনশীল অন্যান্য মাধ্যমের কারুকারদের রচিত নানা মাত্রার কাজের মাধ্যমে। এখনো সে ধারা অব্যাহত।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পরপরই তত্কালীন পাকিস্তানি প্রতিনিধি দলের কনিষ্ঠতম সদস্য হিসেব বঙ্গবন্ধু চীন সফরে যান সেখানে অনুষ্ঠিত এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় আঞ্চলিক সম্মেলনে যোগ দিতে। তাঁর অন্যান্য সফরসঙ্গীর ভেতরে ছিলেন আতাউর রহমান খান, তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ও খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াসসহ আরো কয়েকজন। ওই একই সম্মেলনে ভারতীয় প্রতিনিধি দলের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন কথাসাহিত্যিক মনোজ বসু। উভয় দেশের প্রতিনিধি দলের থাকবার জায়গা করা হয়েছিল একই হোটেলে। সম্মেলনের কাজের ফাঁকে ফাঁকে বয়সের বেশ ব্যবধান সত্ত্বেও তাঁরা দুজন পরস্পর মিলিত হতেন। প্রায়শ নানা বিষয়ে ভাব বিনিময় করতেন। আর এভাবেই দুজনের মধ্যে গড়ে ওঠে গভীর সখ্য।

মনোজ বসুর 'চীন দেখে এলাম' প্রকাশিত হয় পঞ্চাশ দশকের শেষাশেষি কি তার কিছুটা আগে। বইটিতে তিনি উঠে আসেন দুই পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টিকারী পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকবর্গের অপপ্রয়াসের মুখোশ উন্মোচক এবং প্রাণান্ত অসাম্প্রদায়িক এক মহত্ হূদয়ের ব্যক্তিপুরুষ হিসেবে।

১৯৫৭ সালে বঙ্গবন্ধুর নাম স্বাক্ষরিত হয় আরেকবার। গ্রন্থের নাম 'ভাসানী যখন ইউরোপে'। প্রাঞ্জল ও রম্যকথন ভঙ্গির ভিয়েনে খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস লিখিত এই বইটি প্রকাশ পাওয়া মাত্র যেমন দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, তেমনি তত্কালীন স্বৈরাচারী পাকিস্তান সরকারের নানা বিড়ম্বনা শেষে অচিরেই তাকে বরণ করতে হয় নিষিদ্ধ হওয়ার ভাগ্যও।

তত্ত্বতালাশ করতে গিয়ে দেখি, বঙ্গবন্ধুর নাম কবিতায় প্রথম খোদাই করেন কবি নির্মলেন্দু গুণ '৬৮ সালের মধ্যভাগে তাঁর 'হুলিয়া' শীর্ষক সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক কবিতার ভেতর দিয়ে। এর ৮০ ও ৮১তম পঙিক্ততে যেখানে তিনি বলেন : 'আইউব খান এখন কোথায়? শেখ মুজিব কি ভুল করছেন?'। ছেপেছিলেন দৈনিক 'আজাদ'-এর তখনকার সাহিত্য সম্পাদক আ. ন. ম. গোলাম মোস্তফা, দেশ স্বাধীন হওয়ার আগ মুহূর্তে যিনি শহীদ বুদ্ধিজীবীর তালিকায় নাম লিখিয়েছিলেন। নির্মলেন্দু গুণ অবশ্য অন্য এক সূত্রে জানিয়েছেন, তিনি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে '৬৪ সালেই কবিতা লিখেছিলেন।

প্রবল জনরোষের মুখে '৬৯ সালের ২৪ মার্চ পাকিস্তানের স্বৈরশাসক আইউব খান পদত্যাগ করলে দেশব্যাপী বয়ে যায় স্বতস্ফূর্ত আনন্দের বন্যা। জনতার মুখে মুখে তখন এই ছড়া, কোথাও কোথাও পোস্টার ও লিফলেটেও। কেউ জানে না কে তার রচয়িতা। সেই ছড়াতেও বঙ্গবন্ধুর নাম। ছড়াটি এ-রকমের : 'আইউব ব্যাটা মুরগি চোর,/ ব্যাড়া ভাইঙ্গা দিলো দৌড়।/ ধরলো ক্যাডা, ধরলো ক্যাডা?/ শেখ মজিবর, শেখ মজিবর '।

এরপর ঘটনা পরম্পরায় এসে যায় ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন। বাঙালি জাতির জীবনে এই নির্বাচন ছিল এক অগ্নিপরীক্ষাস্বরূপ ঘটনা। ফলে বাঙালি জাতি প্রাণপণে ঝাঁপিয়ে পড়ে এই নির্বাচনী যুদ্ধে। এই সময় গ্রামোফোন রেকর্ডে ধারণ করা হয় সেই ঐতিহাসিক গান, যার দৌলতে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রায় প্রতিটি ঘরে সুরে ও ছন্দে পৌঁছে যায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম। গানটির রচয়িতা, সুরকার ও গায়কের নাম নিয়ে নানা পরস্পরবিরোধী বক্তব্য প্রচারিত। এর বিভ্রান্তি মোচনে কেউ এগিয়ে এলে জাতি একটি বিভ্রান্তি থেকে মুক্তি পাবেন। গানটি ছিল : 'মুজিব বাইয়া যাওরে/ নির্যাতিত দেশের মাঝে/ জনগণের নাওরে মুজিব/ বাইয়া যাওরে / ও মুজিবরে, ছলেবলে চব্বিশ বছর রক্ত খাইল চুষি/ জাতিরে বাঁচাইতে যাইয়া/ মুজিব হইল দূষীরে... '

সরাসরি 'বঙ্গবন্ধু' নাম স্বাক্ষরিত করে দ্বিতীয় কবিতাটি রচনা করেন কবি হাবীবুর রহমান। শিরোনাম ছিলো 'বঙ্গবন্ধু তুমি আছ বলে'। এটি তিনি রচনা করেছিলেন ১৯৭১ সালের ১৫ এপ্রিল তারিখে অর্থাত্ দেশ স্বাধীন হওয়ার প্রায় আট মাস আগে। এর রচনাকালের তারিখসহ কবিতাটি প্রকাশিত হয়েছিল দৈনিক 'আজাদ'-এর ১৯৭২ সালের ৬ জানুয়ারি সংখ্যায়, যাতে তিনি বলেন : 'বঙ্গবন্ধু, তুমি আছ বলে—বিভীষিকাময় অন্ধকারের শব ঠেলে ঠেলে/ প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তের মৃত্যুকে উপেক্ষা করে/ আমরা এগিয়ে যাই উদয়াচলের পথে...।'

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়ে যায় আমাদের মহান সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। অচিরেই গঠিত হয় বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তাঁকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ও সর্বাধিনায়ক করে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার। এই সময় বঙ্গবন্ধুকে মহিমান্বিত করে অন্নদাশঙ্কর রায় রচনা করেন তাঁর সেই কালজয়ী কবিতা 'যতো দিন রবে পদ্মা-মেঘনা/ গৌরী যমুনা বহমান,/ ততো দিন রবে কীর্তি তোমার/ শেখ মুজিবুর রহমান।'...

মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কবিতারই অন্য অঙ্গীভূত শাখা গানের পর গান হয়ে ওঠে আমাদের ন্যায়যুদ্ধ জয়ের, মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্বুদ্ধ ও প্রেরণাদৃপ্ত করার অপরিমেয় উত্স। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ছিল আমাদের সেই উন্মাতাল সময়ের সেইসব গানের সম্প্রচারগত শক্তিশালী হাতিয়ার। এর বেতার তরঙ্গে যেমন মুক্তিযুদ্ধ, তেমনি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত গানও আকাশ-বাতাসে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার রচিত এবং অংশুমান রায় গীত 'শোনো একটি মুজিবরের থেকে/ লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি, প্রতিধ্বনি/ আকাশে-বাতাসে ওঠে রণি/ বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ ' অথবা শ্যামল গুপ্তের কথায় এবং বাপ্পী লাহিড়ীর সুরে মোহাম্মদ আব্দুল জব্বারের গাওয়া 'সাড়ে সাত কোটি মানুষের আর একটি নাম/ মুজিবর, মুজিবর, মুজিবর/ সাড়ে সাত কোটি প্রশ্নের জবাব পেয়ে গেলাম...', এই গান দুটি এখনো যখন শুনি, ঘুরেফিরে আমাদের মন চলে যায় একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সেই উদ্দীপ্ত দিনগুলোতে এবং মনে হয়, বঙ্গবন্ধু এখনো জীবিত, তাঁরই নির্দেশে চলছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে এই সময় হাফিজুর রহমানের কথা ও সুরে এবং ইন্দ্রমোহন রাজবংশী, রথীন্দ্রনাথ রায়, লিলি হক ও শাহীন আকতারসহ লেখক ও সুরকারের নিজের গাওয়া 'আমার নেতা শেখ মুজিব/ তোমার নেতা শেখ মুজিব' গানটিও উদ্দীপ্ত করে মুক্তিপাগল দেশবাসীকে। ১৯৭২ সালের ১৭ মার্চ মোস্তফা জামান আব্বাসীর সম্পাদনায় 'স্বাধীনতা দিনের গান' শিরোনামী মুক্তিযুদ্ধের সময়ে রচিত ও গীত লোকসঙ্গীতের গানের যে সঙ্কলনটি প্রকাশিত হয়, নিঃসন্দেহে তা প্রশংসার দাবিদার।

মুক্তিযুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়ে যাওয়ার পর থেকেই প্রবন্ধ-ভাষ্য, রিপোর্ট বা রিপোর্টাজের পাশাপাশি কবিতা ও গান রচনার যেন রীতিমতো জোয়ার এলো। কোলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গের শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী ও কবি-কারুকারদের প্রায় সবাই এগিয়ে এলেন মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে অন্যবিধ সাহায্য-সহযোগিতার পাশাপাশি তাঁদের লেখনী হাতিয়ার সহযোগে। তাঁদের কাছে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ একাকার হয়ে যায়।

বর্ষীয়ান কবি-কথাসাহিত্যিক বনফুল (বলাই চাঁদ মুখোপাধ্যায়) এই সময় তাঁর 'সহস্র সেলাম' শীর্ষক এক কবিতায় বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাঁর শ্রদ্ধাস্তোত্র রচনা করেন এই বলে : 'বাঙালীর সর্বগর্ব তোমাতেই আজি দ্যুতিমান।/ আমি বাংলার কবি তাই বন্ধু ছুটিয়া এলাম/ মুজিবর রহমান লহ মোর সহস্র সেলাম।' মনীশ ঘটকের উচ্চারণ : 'কর্ণফুলী আড়িয়াল খাঁর/ তীর্থসলিল টকটকে লাল/ নবোদিত সূর্য কিরণে/ চারটি হরফে রূপায়িত হয়ে গেছে/ মুজিবর।' বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত কবি-সাহিত্যিক প্রেমেন্দ্র মিত্রের শ্রদ্ধার্ঘ্যও স্মরণীয়। তিনি তাঁর 'বন্ধু' কবিতায় বলেন : '...কত যুগ কত দেশ ভিন্ন নামে তবু/ শোনে তার একই কণ্ঠস্বর,/ আজ শুধু আমাদেরই মাঝে মুগ্ধ মন জানে/ নাম তার বন্ধু মুজিবর।' বিমলচন্দ্র ঘোষের 'ইস্পাতসূর্য মুজিবর', মণীন্দ্র রায়ের 'মানুষ', বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'বাংলার এই রূপ', শান্তিকুমার ঘোষের 'মহানায়ক' ও বিনোদবেরার 'বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে' শীর্ষক কবিতার পর কবিতায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম-বন্দনাই শুধু বিধৃত নয়, তাঁর সাহসিক ভূমিকাও অম্লান ও ভাস্বর। এই সময় মনকাড়া, চিত্তজয়ী ছড়াও রচিত হয়। পরমানন্দ সরস্বতী তাঁর ছোট্ট দু-লাইনের ছড়ায় পাকিস্তানের কুখ্যাত সমরনায়ক টিক্কা খানকে ব্যঙ্গবাণে বিদ্ধ করে বলেন : 'এক ফুঁয়েতে টিক্কা ফতে,/ কল্কে হলো খালি,/ ইয়াহিয়ার আশার ভাতে/ মুজিব দিলেন বালি।' অমিতাভ চৌধুরী তাঁর রচিত ছড়ায় মুজিব-বন্দনা করেন এইভাবে : 'মুজিব মুজিব কোথায় মুজিব/ মুজিব গেছে রণে,/ ঢাল ধরেছেন, হাল ধরেছেন/ আছেন মনে মনে।' এবং সত্যেস্বর মুখোপাধ্যায় বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার অনুসরণে আনন্দ-ধ্বনি করে ওঠেন এই বলে : 'তোরা সব জয় বাংলা কর,/ স্বাধীন বঙ্গের কেতন ওড়ে/ নেতা মুজিবর / তোরা সব জয় বাংলা কর '

বাংলাদেশের কবিদের পুনরায় বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা রচনার দ্বিতীয় পর্যায়ের সূচনা হয় স্বাধীন, সার্বভৌম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অস্তিত্ব লাভের পর থেকে। ১৯৭২ সালে পাকিস্তানের কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের অধীর অপেক্ষায় অপেক্ষমাণ কবি সিকান্দার আবু জাফর এবং কবি আবুবকর সিদ্দিক বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বেশ কটি কবিতা রচনা করেন। আমাদের অন্য আর কবিদেরও কলম থেমে থাকেনি তখন; কিন্তু তাঁর আকস্মিক ছেদ ঘটে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর অপ্রত্যাশিত-অনাকাঙ্ক্ষিত ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড-পরবর্তী রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে।

বঙ্গবন্ধুর নৃশংস মৃত্যুর ঘটনায় অন্নদাশঙ্কর রায় তাঁর 'কাঁদো প্রিয় দেশ' বলে শুধু হাহাকারই করে ওঠেননি, প্রতিবাদও করেছিলেন 'বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মরণে' শিরোনামে অবিস্মরণীয় কবিতায়। এতো গেলো পিতৃহত্যার প্রতিবাদে ধিক্কার-বাণীর উচ্চারণ দেশের বাইরে থেকে। দেশের ভেতরেও প্রস্তুত হচ্ছিলেন সমাজের সংবেদনশীল মানুষেরা। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের মধ্যেই দেশ চলে যায় মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে অর্জিত বাঙালি জাতীয়তাবাদের আমূল কনসেপ্ট-বিরোধী শাসকদের হাতে। কিন্তু বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি। '৭৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই গোপনে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বেরুতে থাকে বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ-জ্ঞাপক নানা ধরনের হ্যান্ডবিল, প্রচারপুস্তিকা এবং ছড়া-কবিতা ও প্রবন্ধের সঙ্কলনগ্রন্থ। এ রকমেরই কয়েকটি সঙ্কলনের একটি 'এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়?'। এর সঙ্গে মূলত জড়িত ছিলেন অবিভক্ত খেলাঘরের কিছু নেতা-কর্মী—মুক্তিযোদ্ধা আবদুল আজিজ, অধ্যাপক ভীষ্মদেব চৌধুরী, সিরাজুল ফরিদ, জিয়াউদ্দিন আহমদ, ছড়াকার আলতাফ আলী হাসুসহ আরো অনেকে। এইভাবে এসে যায় ১৯৭৭ সাল। বাংলা সাহিত্যে কবিতায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম প্রথম যিনি উচ্চারণ করেছিলেন, সেই কবি নির্মলেন্দু গুণই প্রকাশ্যে দ্বিতীয়বার তাঁর নাম উচ্চারণ করেন তাঁর 'আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি' শীর্ষক কবিতা পাঠ করে। ওই বছরের একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে বাংলা একাডেমি আয়োজিত কবিতা পাঠের আসরে গুণ পাঠ করেছিলেন কবিতাটি।

উল্লেখ্য, ওই একই সময় বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত 'মৃতের আত্মহত্যা' শীর্ষক একটি প্রতীকী গল্পও আলোড়ন সৃষ্টি করে। এটির রচয়িতা ছিলেন আবুল ফজল। প্রকাশিত হয়েছিল মাসিক 'সমকাল'-এ। আবুল ফজল তখন ক্ষমতাসীন সামরিক সরকারের অন্যতম উপদেষ্টা। আমরা এও দেখি, জনকের অপ্রত্যাশিত-অনাকাঙ্ক্ষিত ট্র্যাজিক মৃত্যুর পর রচিত কবিতার পর কবিতায়, গল্পের পর গল্পে বঙ্গবন্ধুর মহিমা যেন আরো ভাস্বর, আরো দ্যুতিময়।

বঙ্গবন্ধুর নিষ্ঠুরতম হত্যা-পরবর্তী বাঙালি জাতির বিবেকের জাগরণের সবেমাত্র শুরু। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই জাগরণই স্মরণ করাবে তাঁকে, তাঁর মহিমা ও বীরত্বব্যঞ্জক কীর্তিপরম্পরাকে। ভারতীয় উপমহাদেশ তো বটেই, বিশ্বের আর কোনো দেশের আর কোনো নেতাকে নিয়ে তাঁর জীবদ্দশায় কি মৃত্যুর পরও সময় পরিসরগত বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই, বলা চলে, এত কবিতা, গান কিংবা গল্প রচিত হয়েছে বলে মনে হয় না। এও ধারণা করি, একদিন নিশ্চিতই বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত হবে মহাকাব্য।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর 'পূর্ব-পশ্চিম' উপন্যাসে ইতিমধ্যেই বঙ্গবন্ধুকে উপস্থাপিত করেছেন, না হোক তা ওই মহাপুরুষের পূর্ণ জীবন কাহিনির সাহিত্য-ভাষ্য। হোক না তা খণ্ডিত উপস্থাপনা।

স্মর্তব্য, কথাসাহিত্যের অন্যতম প্রধান শাখা ছোটগল্পেও বঙ্গবন্ধুকে চিত্রিত করা হয়েছে। কোনো কোনোটিতে তাঁকে সরাসরি নায়ক করে, কখনো রূপকাশ্রয়ে।

বেশ কিছু গীতি-আলেখ্যেও বঙ্গবন্ধু স্বমহিমায় অধিষ্ঠিত। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য উদীচী প্রযোজিত ও মাহমুদ সেলিম রচিত 'ইতিহাস কথা কও।' নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের একটি নাটকে তিনি উপস্থাপিত হয়েছেন রূপকাশ্রয়ে—শেক্সপিয়ারের বিখ্যাত 'হ্যামলেট' নাটকের হ্যামলেট চরিত্রের ভিন্নতর উপস্থাপন রীতির কল্যাণে। তাঁকে নিয়ে এখনো নতুন নতুন গান রচিত ও সিডিবদ্ধ হচ্ছে। পাশাপাশি আবৃত্তির সিডিও।

ছবিও আঁকা হচ্ছে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে। শুধু পোর্ট্রেট নয়, সৃজনশীল অঙ্কন-শিল্পেরও আধার হচ্ছেন তিনি। শিল্পী শাহাবুদ্দিনের রঙ-তুলির আঁচড়ে বঙ্গবন্ধু পেয়েছেন নতুনতর মাত্রা ও মহিমা। পোস্টার শিল্পীদের হাতেও তিনি উপস্থাপিত হচ্ছেন নানা আঙ্গিক ও রীতিতে। এমন কি তাঁর বিষয়ে রচিত কোনো কোনো গ্রন্থের প্রচ্ছদেও তিনি গভীর সৃজনশীলতার স্পর্শে হচ্ছেন ভাস্বর। কাইয়ুম চৌধুরী, হাশেম খান, রফিকুন নবী, সমর মজুমদার, শেখ আফজাল ও ধ্রুব এষসহ আরো অনেক চিত্রী বঙ্গবন্ধুকে প্রতিনিয়ত তাঁদের স্ব-স্ব সৃজন ক্ষেত্রে উপস্থাপিত করছেন নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভেতর দিয়ে।

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থও প্রকাশিত হচ্ছে। এসবের ভেতর দিয়ে উন্মোচিত হচ্ছে এই মহান ব্যক্তি-পুরুষের জীবনের অনেক অজানা কথা ও কাহিনি। পাশাপাশি প্রচুর তথ্যমূলক গ্রন্থাদিও। এসবই ভবিষ্যত্-প্রজন্মের নির্মোহ ঐতিহাসিকদের সাহায্য করবে বঙ্গবন্ধুর তথ্যবহুল ও অনুপুঙ্খ জীবনী রচনার কাজে।

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রবন্ধ ও স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ যাঁরা লিখেছেন, কিংবা গ্রন্থ সম্পাদনা করেছেন, তাঁদের মধ্যে যাঁদের নাম উল্লেখযোগ্য, তাঁরা হলেন : অন্নদাশঙ্কর রায়, এ. এল. খতিব, এ. আর. মল্লিক, কবির চৌধুরী, মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, এম. আর. আখতার মুকুল, এম. এ. সাঈদ, মহীউদ্দিন আহমদ, এম. ওয়াজেদ মিয়াসহ আরও অনেকে।

এছাড়া বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে ও পরে প্রকাশিত বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের প্রবীণ ও সমসাময়িক সহযোগী-সতীর্থবৃন্দেরও বেশকিছু প্রবন্ধ ও স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থও বাজারে রয়েছে। এসবের রচয়িতাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন আবুল হাশিম, আবুল মনসুর আহমদ, তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, মণি সিংহ, খোকা রায়, আতাউর রহমান খান, কামরুদ্দীন আহমদ, অলি আহাদ, অধ্যক্ষ সাইদুর রহমান, আবুল ফজল, আবদুল মতিন, আবদুল গাফফার চৌধুরী ও মোহাম্মদ ওয়ালীউল্লাহ প্রমুখ। এঁদের রচিত গ্রন্থাদি বঙ্গবন্ধুর জীবনের বহুদিকের উন্মোচনে জরুরি উত্সস্বরূপ।

ছড়া-সাহিত্যেও বঙ্গবন্ধু মহিমান্বিত। কবিতার সঙ্গে পাল্লা দিয়েই ছড়া যেন তার এই কাজটি করে চলেছে। ছড়া ও কিশোর কবিতায় অনেকেই তাঁকে মহিমান্বিত করেছেন।

ইতিহাস হচ্ছে সেই জাত কৃষক, যে তার প্রিয় ফসলের মাঠে গজিয়ে ওঠা আগাছার জঞ্জাল নিষ্ঠুর হাতে নিড়ানি দিয়ে সাফ করতে সদা-তত্পর। তার হাত থেকে আগাছা বা জঞ্জালের রেহাই নেই। তাই এ-কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রকৃত মর্যাদা ও তাঁর আদর্শের প্রতিষ্ঠায়, তাঁর একাগ্র সাধনা ও স্বপ্নের ফসল বাংলাদেশের ঔজ্জ্বল্য রক্ষায় অতীতেও যেমন, তেমনি ভবিষ্যতেও জাত কৃষকের মতোই বরাবর অগ্রচারীর ভূমিকা পালন করবেন আমাদের সাহিত্য-শিল্প ও সংস্কৃতির নিষ্ঠ দেশপ্রেমিক কারুকারবৃন্দ।

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, 'জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা নিয়ে টিআইবি'র বক্তব্য রাজনৈতিক উদ্দেশ্যমূলক।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
1 + 5 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
মার্চ - ১৯
ফজর৪:৪৮
যোহর১২:০৭
আসর৪:২৮
মাগরিব৬:১৩
এশা৭:২৫
সূর্যোদয় - ৬:০৩সূর্যাস্ত - ০৬:০৮
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :