The Daily Ittefaq
শনিবার ১৬ আগস্ট ২০১৪, ১ ভাদ্র ১৪২১, ১৯ শাওয়াল ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ সঙ্গীত শিল্পী ন্যান্সির আত্মহত্যার চেষ্টা | পাকিস্তানে ঝড়ে শিশুসহ নিহত ১৬ | শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হলো বিএনপি জোটের কালো পতাকা মিছিল | শান্তি সূচকে ভারত-পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে বাংলাদেশ | ইরাকে ৮০ ইয়াজিদিকে 'হত্যা' আইএসের

সেলুলয়েডে গল্প বলেন...

'দীপু নাম্বার টু'—নামটার সাথে শুধু আমরা পরিচিতই নই, শৈশব কৈশোরের অনেকটা স্মৃতিজুড়ে সেই কাহিনীপট। অনন্য এক উপন্যাসকে অনবদ্য করে চলচ্চিত্রে রূপ দিয়েছিলেন মোরশেদুল ইসলাম। 'চাকা' তার পরিচালিত আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ছবি। 'আমার বন্ধু রাশেদ', 'দূরত্ব', 'দুখাই' অথবা 'প্রিয়তমেষু'-এর মতো দর্শকপ্রিয় চলচ্চিত্রর নির্মাতা তিনি। মোরশেদুল ইসলাম বাংলাদেশের প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে পরিচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন সময়ে তিনি 'আগামী' নামের চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। বিভিন্ন জটিলতার কারণে ছবিটি দুই বছর পরে মুক্তি পায়। চলচ্চিত্র নির্মাণের পাশাপাশি তিনি একজন চলচ্চিত্র সংগঠক। চলচ্চিত্রম, চিলড্রেন ফিল্ম সোসাইটি প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান তার উদ্যোগে গড়ে উঠেছে। তার কথা জানাচ্ছেন সাজেদুল ইসলাম শুভ্র

পঞ্চাশের দশকের পুরোনো ঢাকার ঐতিহ্য আজকের মতো এতটা ফিকে ছিল না। ঐতিহাসিক ভবনগুলো মাটিতে গুড়িয়ে দিয়ে তখনও পযর্ন্ত ঢাকায় এত বাণিজ্যিক ভবন ও মার্কেট গড়ে উঠেনি। ১৯৫৭ সালে সেই পুরোনো ঢাকার লালবাগের উর্দু রোডে জন্ম হয় বাংলাদেশের অন্যতম চলচ্চিত্রকার বিশেষভাবে বলতে গেলে সুস্থধারার প্রথম দিককার চলচ্চিত্র নির্মাতা মোরশেদুল ইসলামের। একটি রক্ষণশীল সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছাশক্তির বলে তিনি আজকে একজন সফল এবং বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন ।

শৈশবের অনেক স্মৃতি থাকলেও সবকিছু ছাপিয়ে তার মনে পড়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার চিনাইল গ্রামের কথা যেখানে তিনি বহুবার গিয়েছেন। যতদূর মনে পড়ে প্রথম তার গ্রাম দর্শন হয় মায়ের সাথে। গাঁয়ের প্রতিটি স্মৃতিই ছিল তার কাছে অত্যন্ত আনন্দের। বছরে অন্তত দুবার তাদের গাঁয়ে যেতে হতো এবং একমাস কিংবা তার কিছু বেশি দিন সেখানে থাকতে হতো। শৈশবের স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে এখনও তিনি আবেগাক্রান্ত হয়ে পড়েন। শৈশবে গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার কারণটা তিনি তখনই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তার গ্রামে যাওয়াটা যে নিছক বেড়ানো বা ছুটি কাটানোর জন্য নয় এই সত্যটি তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। আসলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার এই গ্রামটি ছিল তাদের পুরোনো ঢাকার এতবড় সংসারের অর্থ যোগানের একটি বড় উত্স। এতকিছুর পরেও বছরে দু-একবার করে গ্রামে যাওয়া তার শৈশবজীবনে একটি ভিন্ন মাত্রা এনে দিয়েছিল। কারণ পুরোনো ঢাকার ঘিঞ্জি পরিবেশ থেকে শীতকালের কুয়াশা ঢাকা বিস্তৃত প্রান্তরের দৃশ্য তার মনে অন্য ধরনের প্রশান্তি এনে দিত। শৈশবেই এই পার্থক্য বোঝার সুযোগ সব শিশুর হয় না। তিনি কখনও গ্রামের মাঠে ফুটবল খেলার সুযোগ হাতছাড়া করেননি। মাঝে মাঝে ছোট্ট মোর্শেদ একাই চলে যেতেন গ্রামের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া রেল লাইনের কাছে। সেখান আনমনে স্লিপারের উপর দিয়ে হাঁটতেন। কখনও কখনও সঙ্গী হতো তার মামাতো ভাই। শীতের পিঠা খাওয়ার সময়টা শিশু মোর্শেদের খুবই আনন্দের সময় ছিল। চাচাদের ছিল যৌথ পরিবার আর এই পরিবারেও মোরশেদুল ইসলাম যথেষ্ট আদর পেতেন। পরিণত মোরশেদুল ইসলাম আজও সেই গ্রামের স্মৃতিকে এড়াতে পারেন না। আর তাই এখনও মাঝেমধ্যেই চলে যান সেই প্রত্যন্ত গ্রামে। তার বাবা যখন মারা যান তখন তার বড় ভাই ছাত্র ছিলেন এবং ওই অবস্থাতেই সংসারের হাল ধরেন। তিনি উর্দু রোডে তার বাবার প্রতিষ্ঠিত চেম্বারে বসতেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন আত্মকেন্দ্রিক এবং জেদী প্রকৃতির। ছোট্ট মোর্শেদ খুবই চুপচাপ স্বভাবের ছিলেন। তিনি খুব সহজে নিজেকে প্রকাশ করতেন না। এজন্য শৈশবে তাকে অনেক কষ্ট পেতে হয়েছে।

শৈশব থেকেই মোরশেদুল ইসলামের নির্দেশনা ও অভিনয়ের প্রতি অন্যরকম আগ্রহ কাজ করত। যদিও নির্দেশনা শব্দটির মধ্যে একটি পরিণত বা বয়স্কভাব আছে কিন্তু ছোট্ট মোরশেদুল যখন যেখানে সুযোগ পেয়েছেন সেখানেই তার প্রতিভার প্রকাশ করতে দ্বিধা বোধ করেননি। শৈশব থেকেই তিনি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত ছিলেন। অর্থাত্ একটি স্কুলপড়ুয়া ছেলের জন্য অভিনয়, স্কুলের নাটক মঞ্চস্থ করাসহ আর যা যা সম্ভব তিনি তার সব কিছুই করেছেন।

সন্ধ্যা নেমে এলে মোর্শেদ নিজেই ঘরোয়া পরিবেশে তার বিশেষ দর্শকদের জন্য প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করতেন। তা হলো একটি বাক্সের মধ্যে বিভিন্ন খবরের কাগজ থেকে আঁকা ছবি সংগ্রহ করে বাইস্কোপের ব্যবস্থা করতেন। এখান থেকেই সাত-আট বছরের ছোট্ট মোরশেদুল ইসলামের মধ্যে ছবি তৈরির ইচ্ছাটা চলে আসে। এছাড়া প্রায়ই বাসাতে নাটক মঞ্চস্থ করতেন। বাসার বড় খাটটা হোত স্টেজ আর পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা ছিলেন সেই নাটকের দর্শক। মোর্শেদের সেজভাই অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭২ সালে তিনি মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরে এলে যুদ্ধে ব্যবহূত অস্ত্র দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের নাটকগুলো মঞ্চস্থ করতেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় মোর্শেদের বয়স ছিল ১৪ বছর। স্বাধীনতা যুদ্ধ কিশোর মোর্শেদের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। কিশোর মোর্শেদ একেবারে নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে মুক্তিযুদ্ধকে উপলব্ধি করার সুযোগ পেয়েছিলেন। পাকিস্তান-বিরোধী আন্দোলনকে ঘিরে মোরশেদুল ইসলামের শৈশব ও কৈশোর কেটেছে এবং ছোট্ট মোর্শেদকে এই মহান আন্দোলন থেকে কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন করা যায় না।

শিক্ষাজীবনের শুরুতে মোরশেদুল ইসলাম প্রথম ভর্তি হন পুরোনো ঢাকার চাঁদনীঘাট এলাকার একটি অখ্যাত প্রাইমারি স্কুলে। এরপর তিনি ভর্তি হন এক সময়ের বিখ্যাত নবকুমার ইনস্টিটিউশনে। এখানে তিনি ক্লাস সেভেন পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। ক্লাস এইটে গিয়ে ভর্তি হন ওয়েস্টার্ন হাইস্কুলে। বাবার মৃত্যতে খুব কষ্ট করে এই পরিবারকে পড়াশোনার মতো ব্যয়বহুল কাজ সম্পন্ন করতে হয়েছে। ১৯৭৪ সালে মোরশেদুল ইসলাম ম্যাট্রিক (এসএসসি) পাস করেন। ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন তিনি। এখানে একটা কথা উল্লেখ না করলেই নয় যে ছাত্র হিসেবে মোরশেদুল ইসলাম খুবই মেধাবী ছিলেন। একজন সফল চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে আমরা সবাই তাকে চিনি কিন্তু তার শিক্ষাজীবনের সফলতা-কৃতিত্ব সম্পর্কে কতটুকু জানি। ঢাকা কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে ইন্টারমিডিয়েট পাস করার পর পরিবারের সবাই চাপ দেন মেডিকেলে পড়ার জন্য। কিন্তু তার ইচ্ছা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতায় ভর্তি হওয়ার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন এই বিভাগটি মাত্র চালু হয়েছে। বাসা থেকে বলা হলো মেডিকেলে না হলে অবশ্যই ফার্মেসিতে ভর্তি হতে হবে। সেই সময়ে ফার্মেসি ছিল ছাত্রদের প্রথম পছন্দ। তখন ফার্মেসি বিভাগের দেয়ালে পোস্টার লাগানো থাকত 'Join Pharmacy and Fly to America'. অর্থাত্ ফার্মেসি থেকে পাস করার পর আমেরিকা যাওয়ার নিশ্চিত ভিসা হয়ে যেত। এরকম অবস্থায় মোরশেদুল ইসলাম মোট তিন বিষয়ে পরীক্ষা দিলেন, (১) মেডিকেল (২) সাংবাদিকতা (৩) ফার্মেসি এবং তিনটি বিষয়েই তিনি সফল হলেন। মোরশেদুল ইসলাম সিলেট মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেলেন। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিভাগের ক্লাস আগে থেকে শুরু হয়ে যাওয়ায় প্রথমে তিনি সেখানেই ক্লাস করতে আরম্ভ করেন। তিন মাস সাংবাদিকতা বিভাগে ক্লাস করার পরে মেডিকেলের রেজাল্ট বের হলো এবং তিনি সিলেট মেডিকেল কলেজে চান্স পেলেন। বাসার সবাই জোর করে তাকে সিলেট পাঠিয়ে দিল। সিলেট মেডিকেলে ক্লাস করলেন দুই মাস। কিন্তু ঢাকার ব্যস্ততার আনন্দ তিনি কিছুতেই ভুলতে পারলেন না। এক পর্যায়ে তিনি মানসিক ভাবে খুব ভেঙে পড়লেন এবং সিলেট থেকে পালিয়ে ঢাকা চলে এলেন। তার এ জাতীয় কর্মকাণ্ডে পরিবারের সবাই মারাত্মক হতাশ হলেন। শেষে আর কি করা তাকে ফার্মেসিতেই ভর্তি হতে হলো। কিন্তু তার এই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কোনো কিছুই তার কর্মজীবনে কাজে আসেনি।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়টা মোরশেদুল ইসলামের পুরো মনে আছে। একেবারে ২৫ মার্চ রাত থেকে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস পর্যন্ত। ২৫ মার্চের ভয়াল কালোরাতে ঘুম ভেঙে যায়। পরদিন সকালে এলাকার লোকজন সবাই মিলে মিলিটারি প্রতিরোধের জন্য ব্যারিকেড দিতে শুরু করেন। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ অনুসারে প্রতিটি বাড়ি যেন দূর্গের রূপ নেয়। কিন্তু পরে শোনা যায় যে আর্মিরা যেখানেই ব্যারিকেড দেখছে সেখানেই গুলি করে সব মানুষ মেরে ফেলছে। ফলে তারা ব্যারিকেড সরিয়ে ফেলতে বাধ্য হন। অল্প বয়সের কারণে তিনি ২৫ মার্চের গণহত্যার নৃশংসতা দেখতে পারেননি। তাকে মহল্লার মধ্যেই থাকতে হতো। এখান থেকে তিনি বিচ্ছিন্নভাবে সাধারণ মানুষ হত্যার খবর পেতেন।

মারশেদুল ইসলাম সেই 'আগামী' থেকে শুরু করে 'আমার বন্ধু রাশেদ' পর্যন্ত যতগুলো কাজ করেছেন প্রতিটি কাজই তার সমান প্রিয়। তার জীবনের সেই অন্ধকার সময়ে তিনি দুটো কাজ করেন একটি 'শরত্ ৭১' এবং 'কূপ' নামে একটি নাটক। দুটো কাজই খুবই প্রশংসিত হয়। কিন্তু এই দুটি কাজই করেন খুবই খারাপ অবস্থায় যা কল্পনার বাইরে। সুস্থ হওয়ার পর মুক্তি পায় 'বৃষ্টি', 'দূরত্ব'। মাহমুদুল হকের উপন্যাস নিয়ে তার পরিচালিত চলচ্চিত্র 'খেলাঘর'। 'খেলাঘর'-এর প্রেক্ষাপট মুক্তিযুদ্ধের সময়কার। দর্শকদের কাছে নন্দিত হয়েছে এই ছবি। বর্তমানে ব্যস্ত রয়েছেন হুমায়ূন আহমেদের কাহিনী অবলম্বনে 'অনিল বাগচীর একদিন' নিয়ে।

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্রকারীদেরকে শনাক্ত করতে একটি কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। আপনি তার এই দাবির সাথে একমত?
9 + 4 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
নভেম্বর - ১৬
ফজর৫:১২
যোহর১১:৫৪
আসর৩:৩৯
মাগরিব৫:১৭
এশা৬:৩৫
সূর্যোদয় - ৬:৩৩সূর্যাস্ত - ০৫:১২
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :