The Daily Ittefaq
মঙ্গলবার ২৬ আগস্ট ২০১৪, ১১ ভাদ্র ১৪২১, ২৯ শাওয়াল ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ ওরিয়েন্টাল ব্যাংকের ছয় কর্মকর্তাসহ ৭ জনের কারাদণ্ড | চট্টগ্রাম নৌঘাঁটিতে যুদ্ধজাহাজে আগুন | বিজিবিকে প্রশিক্ষণ দেয়ার প্রস্তাব বিএসএফের | শাস্তি কমল সাকিবের | আওয়ামী লীগ নেতা জাহাঙ্গীর হত্যায় আটক ৩

আলোকপাত

বাংলাদেশে জাহাজ ভাঙা শিল্পের জন্য যা করণীয়

 ড. এন. এম. গোলাম জাকারিয়া ও ড. মো. মশিউর রাহমান

জাহাজ ভাঙা শিল্প বাংলাদেশের চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড উপজেলার অন্তর্গত ভাটিয়ারী থেকে বারওয়ালী পর্যন্ত উপকূল অঞ্চলে গড়ে উঠেছে। এই এলাকায় ১০০টির বেশি ছোট-বড় জাহাজ ভাঙা কারখানা অবস্থিত। এই শিল্প বাংলাদেশের ইস্পাত তৈরির অন্যতম উত্স হিসাবে বিবেচিত এবং সরকার প্রতি বছর এ খাত থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় করে থাকে। এই শিল্পের সাথে প্রত্যক্ষভাবে ৫০,০০০ লোক এবং পরোক্ষভাবে এক লক্ষের অধিক লোক জড়িত। বাংলাদেশের ইস্পাত শিল্পের প্রায় ৬০% কাঁচামাল জাহাজ ভাঙা শিল্প যোগান দেয়। বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ জাহাজের প্রয়োজনীয় ষ্টিল, কাঠামোর উপকরণ, যন্ত্রাংশ ইত্যাদি এই শিল্পের উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। অন্যান্য শিল্প যেমনঃ নির্মাণ, রি-রোলিং মিল, স্টিল মিল, কেবল, আসবাবপত্র এবং অক্সিজেন কারখানা এ শিল্প থেকে লাভবান হয়।

বাংলাদেশে জাহাজ ভাঙা শিল্পে বিচিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এ পদ্ধতিতে ব্যয়বহুল ও ভারি অবকাঠামোর প্রয়োজন হয় না। বিচিং পদ্ধতিতে জোয়ারের সর্বোচ্চ উচ্চতা ব্যবহার করে জাহাজকে তার নিজস্ব শক্তিতে কর্দমাক্ত সমুদ্র তীরে টেনে তোলা হয়। তারপর ভাটার সময় অর্ধদক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিকের সাহায্যে জাহাজটিকে কেটে ফেলা হয়। কাটা অংশগুলো শক্তিশালী উইন্স এবং শ্রমশক্তি দিয়ে শুকনা জায়গায় নিয়ে আসা হয়। গ্যাস কাটিং এর সাহায্যে জাহাজকে সাধারণত কাটা হয়। সাধারণত কাটার সময় ন্যূনতম সাবধানতা, অপর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ইত্যাদি কারণে অনেক সময় বিস্ফোরণ, মারাত্মক জখম, স্থায়ী বিকলাঙ্গ এমন কি মৃত্যুর মত দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। সেইজন্য অর্থনৈতিক উপকারিতার পাশাপাশি জাহাজ ভাঙা শিল্পের সাথে জড়িত অন্যান্য সামাজিক ও পরিবেশগত বিষয়সমূহ বিবেচনায় আনা উচিত ।

বাংলাদেশে যদিও জাহাজ ভাঙা শিল্পের শুরু ৬০ দশকের দিকে, বাণিজ্যিকভাবে শুরু হয় ৭০ দশকের দিকে। গত কয়েক বত্সরের তথ্য উপাত্ত, বিশেষ করে ২০০০-২০১০ সাল পর্যন্ত তথ্যের ভিত্তিতে দেখা যায় বাংলাদেশ উক্ত সময়ে জাহাজ ভাঙা শিল্পে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। এই সময়ে সমগ্র বিশ্বের সার্বিক ক্ষমতার ৩০% জাহাজ ভাঙার কাজ বাংলাদেশে হয়েছে। শুধুমাত্র ২০০৯ সালে বাংলাদেশ প্রায় দুই মিলিয়ন টন জাহাজ ভাঙার কাজ করেছে, যা তাকে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় জাহাজ ভাঙা শিল্পের অধিকারী হিসাবে বিবেচনা করে।

জাহাজ ভাঙার সময় জাহাজে বিপুল পরিমাণ বিষাক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ পদার্থ থাকতে পারে যা মানুষের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা এবং পরিবেশের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। জাহাজ ভাঙা শিল্পে সাধারণত এজবেসটস, পিসিবি, বিলজ ও ব্যালাস্ট জাতীয় পানি, তৈল ও জ্বালানির অবশিষ্টাংশ ইত্যাদি জাতীয় বর্জ্য থাকতে পারে। মেটাল কাটিং-এর সময় বিষাক্ত ধোঁয়া বাতাস দূষণ করতে পারে। অনেক সময় তেল ও সলাজ এর উপস্থিতির কারণে জাহাজ কাটার সময় আগুন ধরে যেতে পারে। সঠিকভাবে সংরক্ষণ অথবা পরিবেশ সম্মতভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে স্ক্র্যাপ মেটাল ও অন্যান্য বর্জ্য মাটি ও পানিকে দূষণ করতে পারে। জাহাজের ভিতরে ও বাইরে যেসব রং ব্যবহার করা হয় সেগুলোতেও বিভিন্ন ধরনের বিষাক্ত পদার্থ যেমন পিসিবি, ভারি ধাতু এবং কীটনাশক জাতীয় পদার্থ থাকে। ফলে রং সরানোর সময় উদ্বায়ী ও বিষাক্ত পদার্থ মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। জাহাজে বিভিন্ন রেফ্রিজারেশনে ব্যবহূত গ্যাস ও বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে অবদান রাখছে। জাহাজ ভাঙার সময় গ্রাইন্ডিং, হেমারিং, মেটাল কাটিংসহ অন্য কার্যক্রমে উত্পন্ন অতিরিক্ত শব্দ শ্রবণ শক্তিজনিত ব্যাঘাত, উদ্বিগ্নতা, হূদরোগসহ ঘুমের ব্যাঘাতজনিত সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।

বাংলাদেশে অনেক জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডে শ্রমিকরা দুর্ঘটনারোধী উপকরণ ব্যবহার করে না। এমন কি যেখানে অক্সিজেনের স্বল্পতাজনিত কারণে মারাত্মক সমস্যা দেখা দিতে পারে, সেখানেও সঠিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে না। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া শ্রমিকরা তাদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি সম্পর্কে অবগত নয় কিম্বা এ সমস্ত ঝুঁকি কিভাবে কমানো যায় সেগুলো সম্পর্কে তাদের কোন প্রশিক্ষণ দেয়া হয় না। সঠিকভাকে সংরক্ষণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে মাটি এমন কি ভুগর্ভস্ত পানির ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী দূষণ হতে পারে। বেশিরভাগ ইয়ার্ডের নিজস্ব কোন বর্জ্য পদার্থ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার অবকাঠামো সুবিধা নাই।

সন্দেহ নেই জাহাজ ভাঙা শিল্পের প্রয়োজন আছে। এর জন্য আমাদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশগত যে সমস্ত বিষয়গুলো আছে সেগুলোর অন্তত ন্যূনতম মানদণ্ড নিশ্চিত করতে হবে এবং সেই সাথে Green ship recycling এর দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য আমাদের প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর উন্নতি সাধন করতে হবে। Green recycling মানে এই নয় যে, আমরা বিচিং পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারবো না, বরং বিচিং পদ্ধতি রেখেও আমাদের যে সমস্ত অবকাঠামোর ঘাটতি আছে যেমন বর্জ্য আধার ও ব্যবস্থাপনা, বিলজ ও ব্যালাষ্ট পানি সংরক্ষণ ও শোধনাগার, শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ ইত্যাদি ব্যবস্থা করে আমরা আমাদের জাহাজ ভাঙা শিল্পের অবস্থার যথেষ্ট উন্নতি সাধন করতে পারি। আমাদের এই শিল্প নিয়ে যথেষ্ট গবেষণা কার্যক্রম দরকার যা আমাদের এ শিল্পে বিদ্যমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে আমাদের উপযোগী সমাধান দিতে সহায়তা করবে। কিন্তু এর সাফল্যের জন্য দরকার গবেষণার অনুদান, সাথে জাহাজ ভাঙা শিল্প মালিকদের সহযোগিতা। ভারত তাদের জাহাজ ভাঙা শিল্প নিয়ে গবেষণা অনেক আগে থেকেই শুরু করেছে। ফলে আন্তর্জাতিক সেমিনার/কনফারেন্সে তারা তাদের জাহাজ ভাঙা শিল্প নিয়ে গবেষণালব্ধ ফলাফল উপস্থাপন করতে পারে ও গবেষণালব্ধ কোন কিছুর গ্রহণযোগ্যতা খুব সহজে পাওয়া যায় এবং তারা তা পাচ্ছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আমাদের জাহাজ ভাঙা শিল্প নিয়ে খুবই নেতিবাচক ধারণা বিদ্যমান। এই অবস্থা কাটিয়ে আমাদের এই শিল্পকে সামনে এগিয়ে নিতে দরকার গবেষণালব্ধ ফলের প্রয়োগ ঘটানো।

লেখকদ্বয় : সহকারী অধ্যাপক, নৌযান ও নৌযন্ত্র কৌশল বিভাগ, বুয়েট, ঢাকা-১০০০

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, 'হতাশায় নিমজ্জিত বিএনপি আন্দোলনে ব্যর্থ হয়ে মিথ্যাচার করছে।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
2 + 8 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
এপ্রিল - ২৩
ফজর৪:১০
যোহর১১:৫৭
আসর৪:৩১
মাগরিব৬:২৬
এশা৭:৪৩
সূর্যোদয় - ৫:৩০সূর্যাস্ত - ০৬:২১
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :