The Daily Ittefaq
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৩, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২০, ০৮ সফর ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান এরশাদ বারিধারার বাসা থেকে আটক | রবিবার দেশব্যাপী জামায়াত এর সকাল-সন্ধ্যা হরতাল | গণভবনে রওশন এরশাদ | কাদের মোল্লার ফাঁসি রাত ১০টা ১ মিনিটে কার্যকর সম্পন্ন | লক্ষ্মীপুরে সংঘর্ষে নিহত ৫, গুলিবিদ্ধ ৫০

[ রা জ নী তি ]

ঝুঁকিপূর্ণ পথে আর কতদূর

হাসান মামুন

নেলসন ম্যান্ডেলার জন্য 'নাগরিক ঐক্য' আয়োজিত স্মরণসভায় যাওয়ার পথে মঙ্গলবার বিকালে দেখি রাজধানীর তোপখানা মোড়ে রীতিমতো যানজট। রিকশাচালক গাইবান্ধার লোক। বললেন, তার দেশের বাড়িতে নাকি 'কড়া অবরোধ' হচ্ছে। শুক্রবার বাদে প্রতিদিনই অবরোধ (আর তার মাঝে হরতাল) থাকাটা রীতি হয়ে গেছে এখন। তবে জাতিসংঘ মহাসচিবের দূত রাজধানীতে অবস্থানকালে খুব সম্প্রতি সহিংসতা কিছুটা কমে এসেছিল। মহাসড়কে যান চলাচলও বেড়েছিল মনে হয়। অবরোধমুক্ত গত শুক্রবার রাজধানীতে দিনভর ছিল যানজট। মানুষ যে যার মতো ছোটাছুটি করে জমে থাকা কাজগুলো সেরেছে। তারাই বেশি করে এদিন বেরোয়, যারা মূলত আতঙ্কে টানা অবরোধ চলাকালে রাস্তায় বেরোয়নি। আতঙ্ক বেশি বেড়েছে রাজধানীতে একটি মিনিবাসে পেট্রল বোমা হামলা হওয়ার পর। এতে অগ্নিদগ্ধ কয়েকজন মারা যায়। আহতরা হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে কাতরাচ্ছে। ভীষণভাবে পুড়ে যাওয়া কারও মৃত্যু সংবাদ শুনলে এখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে দেখা যাচ্ছে অনেককে। অগ্নিদগ্ধদের যন্ত্রণা ভয়াবহ, এটা সবাই জানে। পুলিশের সাঁজোয়া যানেও পেট্রল বোমা হামলার পর আগুন ধরে যাওয়ার দৃশ্য এসেছে মিডিয়ায়। রাজধানীর বাইরেই এমনটি ঘটছে বেশি।

স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলন চলার সময় দেখা গিয়েছিল, রাজধানীসহ বড় বড় শহরেই এর চাপ বেশি। মফস্বল শহর ও গ্রামাঞ্চল বড়জোর উন্মুখ হয়ে থাকতো— 'ঢাকার খবর' জানতে। এখন ঢাকায় রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে আসা মানুষটি জানাচ্ছেন, গাইবান্ধায় কড়া অবরোধ হচ্ছে। গাইবান্ধার চেয়েও বেশি গোলযোগ হচ্ছে সাতক্ষীরা, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, বগুড়ার মতো জেলায়। এদিকে চাঁদপুর, কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার বেল্টেও কম হচ্ছে না। মাঝে মহাসড়কে চলাচল এমনভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল যে, রাজধানী প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। প্রবীণ এক সাংবাদিক তখন সরকারকে অভিহিত করেছিলেন ঢাকা শহরের সরকার বলে। এটাও সত্য, রাজধানীর বাইরে বেশকিছু জেলা বা অঞ্চলে কিন্তু তেমন কোনো গোলযোগ হচ্ছে না। বিরোধী দলের আন্দোলন রচনার চেষ্টায় দেশের কোন কোন এলাকায় গোলযোগ বেশি হচ্ছে আর কোন কোন এলাকায় এর মধ্যেও বিরাজ করছে শান্তি, এর একটা তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা যেতে পারে। রাজনীতি তো বটেই, সমাজবিজ্ঞানের বোদ্ধারাও এ নিয়ে গবেষণা করতে পারেন। এরই মধ্যে দেশের কয়েকটি এলাকায় ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুর ওপর ঘটে গেছে নিষ্ঠুর হামলা। রাজনৈতিক সংঘাত নিয়ে আমরা এত ব্যস্ত আছি যে, মিডিয়ায়ও ওটার তেমন ফলো-আপ হচ্ছে না। আর প্রশাসন তো প্রশাসন! এ সময়ে তারা আছে বলা যায় 'দৌড়ের ওপর'। শুধু বলে রাখি, সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা নিয়ে যারা কাজ করেন, নীরবে হলেও তারা যেন সেটি করে যান। তারা এও খতিয়ে দেখতে পারেন, দেশের বেশকিছু এলাকায় কেন কখনোই সাম্প্রদায়িক সহিংসতা হয়নি বা হচ্ছে না।

বিরোধী দলের সহিংস আন্দোলনের মধ্যেও রাজধানীকে সচল রাখতে সচেষ্ট রয়েছে সরকার। বন্দরনগরীর মূল অংশটি সচল রাখতেও সরকার সচেষ্ট। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের ভেতর কাজ চলছে। অর্থনীতির ওপর চাপ তেমন পড়তো না, যদি ওই বন্দরে খালাস হওয়া পণ্য আর সেখানে পাঠানো মালামাল আনা-নেয়া করা যেত। স্বাভাবিক সময়েও এটি কখনো কখনো করা যাচ্ছিল না সীতাকুন্ড ও মিরসরাইয়ে হাঙ্গামা হওয়ার কারণে। সেখানটায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে আনতে প্রশাসন উদ্যোগী হতেও অনেক সময় নিয়ে ফেলেছে। এর মধ্যে ভালো খবর— রাজধানীর অদূরে পানগাঁও টার্মিনালে সমুদ্রবন্দরে আটকে থাকা কনটেইনার নিয়ে এসে খালাসের ঘটনা। এতে ব্যবসায়ীদের ব্যয়ও পড়বে কম। স্বাভাবিক সময়ে মহাসড়কে যাতে চাপ কম পড়ে, সেজন্যই সরকার উদ্যোগী হয় বুড়িগঙ্গায় এ টার্মিনাল স্থাপনে। এদিকে খারাপ খবর হলো, নৌপথেও অবরোধ কার্যকর করতে সিরিয়াস হচ্ছে আন্দোলনকারীরা। কোনো এক ঘাটে তারা নোঙ্গর করা লঞ্চে আগুন দিয়েছে এর মধ্যে। নৌযানে করে এসে অন্যান্য নৌযানে ঢিল ছোঁড়ার ঘটনাও ঘটিয়েছে। এসবকে লজ্জাজনক বলে অভিহিত করলে বিরোধী দল সমর্থকরা আবার বলেন, অনশনের মাধ্যমে কী দাবি আদায় করা যাবে?

এটা সত্য যে, বিরোধী দল বিশেষত বিএনপি দীর্ঘদিন সহিংস আন্দোলনের পথে না যাওয়ার নীতিতে ছিল। ওই পথে কিছুটা গেলেও তা থেকে আবার ফিরে এসেছে। অধিবেশন বয়কট ও বর্জনের মধ্যে থাকলেও সংসদ থেকে তারা এখনো পদত্যাগ করেননি। এটা নিছক সুবিধাপ্রাপ্তি অব্যাহত রাখার বিষয় নয়— রাজনৈতিক বিবেচনাও তাদের রয়েছে। সর্বশেষ অধিবেশনে গিয়ে তারা জাতীয় নির্বাচনকালে নির্দলীয় সরকার প্রতিষ্ঠার দাবিও জানান আনুষ্ঠানিকভাবে। দেশে এর সমর্থকের সংখ্যা বেশি বলেই মনে হয়। জনমত জরিপেও তেমন ফল পাওয়া গিয়েছিল। এখন এ দাবি আদায়ে বিরোধী দল কোন পথে এগোবে, সেটি তাদের বিবেচনা। তারা তো আর সংবাদপত্রের কলামিস্ট আর টকশোর অতিথিদের কাছ থেকে পরামর্শ নেবেন না। সহযোগী দৈনিকে এক স্নেহভাজন সাংবাদিক দীর্ঘ প্রতিবেদন করে দেখিয়েছেন, দেশের বিভিন্ন দৈনিক অব্যাহতভাবে সংলাপ-সমঝোতার ওপর জোর দিয়ে সম্পাদকীয় লিখলেও দুইপক্ষের কেউ কর্ণপাত করেননি। প্রতিবেশী বৃহত্ দেশ থেকে পররাষ্ট্র সচিব এ নিয়ে আলোচনার জন্য এলে তারা অবশ্য নড়েচড়ে বসেছেন। আমাদের রাজনৈতিক সংকটে নিজেদের অবস্থান অনেকটাই স্পষ্ট করে গেছেন তিনি ওই সফরে। বোঝা যাচ্ছে, ভারত তার নিরাপত্তা ইস্যুকে খুবই গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশের চলতি ঘটনা-প্রবাহে। এখানে সহিংস আন্দোলন হতে থাকলে এবং তার পরিণতিতে এটা জঙ্গিদের হাতে চলে গেলে এ অঞ্চলের নিরাপত্তা বিপন্ন হতে পারে বলে মনে করে যুক্তরাষ্ট্রও। দেশটির সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে পারেনি বর্তমান সরকার, এটা সত্য। তবে এর মধ্যে 'টিকফা' সই হয়ে যাওয়ায় সম্পর্কের কিছুটা উন্নতিও হয়েছে। বাংলাদেশে নিযুক্ত ওই দেশের রাষ্ট্রদূতকে মৌনতা অবলম্বন করতে দেখা যাচ্ছে এখন। অবশ্য জাতিসংঘ সক্রিয় থাকলে এর মধ্যে তাদেরও কিছু সক্রিয়তা থাকে।

এ নিবন্ধ লেখা পর্যন্ত অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর সফরে সমঝোতার লক্ষ্যে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতির খবর নেই। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে দন্ডিত আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসিও স্থগিত রয়েছে উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তে। মঙ্গলবার এটি ঘিরে আতঙ্ক বেড়েছিল নতুন করে এবং নানা স্থানে পরিস্থিতির অবনতিও হয়। জনসম্পৃক্ত আন্দোলন গড়ে তুলতে না পারলেও গোলযোগ সৃষ্টি করে পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর ক্ষমতা যে ছোট দলেরও থাকে, তার প্রমাণ দিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। সরকার বোধহয় বিএনপির ক্ষমতাকেও খাটো করে দেখেছিল। বলেছিল, জোরগলায় দাবি তুললেও এর পক্ষে মাঠে শক্তি দেখাতে পারবে না দলটি। দেশের বেশকিছু স্থানেই 'শক্তি'র প্রমাণ কিন্তু দিয়েছে দলটি। বিএনপি নেতাদের যেভাবে গ্রেফতার করে কারাগারে নিক্ষেপ করেছে সরকার, তাতেও ক্ষিপ্ত হয়েছে দলটির কর্মীরা। সমস্যা হলো, তারা সাধারণ মানুষের ওপরও এর প্রতিশোধ নিচ্ছে। যাদের ওপর ককটেল বা আগুনে বোমা ছোঁড়া হচ্ছে, ভাঙ্গা হচ্ছে গাড়ি— তাদের মধ্যেও ওই দলের সমর্থক রয়েছে নিশ্চয়ই। কিন্তু সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টায় এসব করতে তারা পরোয়া করছে না। মারাত্মক কিছু ঘটে গেলে আবার সরকারের ওপর দোষ চাপাচ্ছে। সরকার যে এমন পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে না, তাও বলা যাবে না। অতীতে বিএনপি সরকারও কি নেয়নি? সমস্যা হলো, আন্দোলন সফল বা ব্যর্থ যাই হোক, তাতে জনগণের কপালে কিছু জুটুক বা না জুটুক— এসব নাশকতার জন্য দায়ীরা হয়তো কখনোই চিহ্নিত হবে না।

রাজনৈতিক বিবেচনায় ফৌজদারি মামলা প্রত্যাহারের সুযোগ নিচ্ছে সব সরকারই। আগামী সরকার এক্ষেত্রে হয়তো নতুন রেকর্ড গড়বে। দেশে অদৃষ্টপূর্ব যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে— তাতে নিকট ভবিষ্যতে কী ধরনের সরকার আসবে, সে প্রশ্নও উঠতে শুরু করেছে বুঝদার মানুষের মধ্যে। থাইল্যান্ডের মতো জনসম্পৃক্ত আন্দোলন গড়ে তুলে সরকারকে দাবি আদায়ে বাধ্য করার পথে দৃশ্যতই নেই বিরোধী দল। দেশের একটি বড় অংশ যা করছে, সেটাই আরও ব্যাপক মাত্রায় করতে তারা সচেষ্ট হবে— ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী সরকার ভোট গ্রহণের পথে গেলে। তেমন পরিস্থিতিতে জরুরি অবস্থা জারিও অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে। এক্ষেত্রেও সরকার 'নেই' হয়ে যাচ্ছে না। তবে বাস্তবে সেটি হবে কানাগলিতে প্রবেশ, যা ময়দানে যুদ্ধরত কোনো পক্ষের জন্যই লাভজনক হবে না। বিরোধী দল জনমত জরিপ ও সহিংস আন্দোলন রচনায় এগিয়ে থাকলেও দেশ-বিদেশে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রগুলোয় এগিয়ে রয়েছে সরকার। এ ভারসাম্য চমকপ্রদ কোনো সমঝোতাও সামনে নিয়ে আসতে পারে। আমরা তো চাইছি না সম্ভাবনাময় এ দেশটি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি কোনো জটিলতায় নতুন করে জড়াতে।

লেখক :সাংবাদিক

hmamun67@gmail.com

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
'সংকট নিরসনে সংলাপ চালিয়ে যেতে দুই দল সম্মত হয়েছে বলে জানিয়েছেন তারানকো।' আপনি কি মনে করেন এর মাধ্যমে সমঝোতা হবে?
7 + 9 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
আগষ্ট - ২০
ফজর৪:১৬
যোহর১২:০২
আসর৪:৩৬
মাগরিব৬:৩১
এশা৭:৪৭
সূর্যোদয় - ৫:৩৬সূর্যাস্ত - ০৬:২৬
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :