The Daily Ittefaq
ঢাকা, রবিবার ১৬ ডিসেম্বর ২০১২, ২ পৌষ ১৪১৯, ২ সফর ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মৃতিসৌধে লাখো মানুষ

সামাজিক মাধ্যমের শক্তি ও সৌন্দর্য

ফাহমিদুল হক

ওয়েবসাইট ইন্টারনেটওয়ার্ল্ডসের দেওয়া তথ্য অনুসারে, ৩০ জুন ২০১২ তারিখে বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ছিল ৮০,৫৪,১৯০ জন এবং ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১২ তারিখে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২৯,৮৭,৮২০, যা মোট জনসংখ্যার যথাক্রমে ৫ ও ১.৯ শতাংশ। শতাংশ হিসাবে এই সংখ্যা অনেক কম হলেও ব্যবহারকারীদের মোট সংখ্যা অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় বেশ বড়ই বলতে হবে। এক ফেসবুক ঘিরেই বিরাট একটা বাংলাভাষী সাইবার কমিউনিটির সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া বিগত সাত বছরে বাংলাভাষীদের একটা বড় ব্লগ কমিউনিটি গড়ে উঠেছে। এসব মিলিয়ে আমরা বাংলাভাষীদের অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা এক সামাজিক মাধ্যমের দেখা পেয়েছি, যার উপস্থিতি একেবারে সামপ্রতিক হলেও স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ে একটি উল্লেখযোগ্য অর্জনই বলতে হবে। আরও সঠিকভাবে বললে ইন্টারনেটভিত্তিক যে মিথোস্ক্রিয়ামূলক পরিসর তৈরি হবার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল, বাংলাভাষী ব্যবহারকারীরা সেই পরিসরকে চিহ্নিত করতে, তাতে অংশ নিতে সফল হয়েছেন।

সামাজিক মাধ্যম হলো ইন্টারনেটনির্ভর একধরনের মাধ্যম, যা ওয়েব টুর আদর্শ ও প্রাযুক্তিক ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে ব্যবহারকারীদের আধেয় তৈরিতে এবং তা বিনিময় করতে সহায়তা করে। ওয়েব টু হলো, প্রযুক্তির এমন একটি প্রজন্ম, যেখানে ব্যবহারকারীরা আরেক জনের সঙ্গে মিথোস্ক্রিয়া করবে, আলোচনা করবে, জিনিসটাকে চলমান রাখবে। এই মাধ্যম এত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে যে, আমেরিকায় কম্পিউটার ব্যবহারের মোট সময়ের শতকরা ২২ অংশজুড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার হয়ে থাকে। ভারতীয়রা অনলাইনে অন্য কাজের তুলনায় সবচেয়ে বেশি সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দিয়ে থাকে। আর আমরা অনুমান করতে পারি যে, ওয়েবে পর্নোগ্রাফি দেখার ব্যবহারটা বেশি হয়ে থাকে। কিন্তু সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের বিষয়টা পর্নোগ্রাফিকে ছাড়িয়ে গেছে। সামাজিক মাধ্যমে আমরা যে ধরনের মিথোস্ক্রিয়া দেখি, তা হলো সামাজিক সম্পর্ক নির্মাণ, পুরোনো সম্পর্ক খুঁজে বের করে তার সাথে পুনরায় সর্ম্পক তৈরি করা, অথবা নতুন সম্পর্ক তৈরি করা। এ ছাড়া সামাজিক মাধ্যমগুলোতে তথ্য উত্পাদন ও সরবারাহ করা হয়। উত্পাদন অর্থে নাগরিক-সাংবাদিকতার কথা বলা যায়, সামাজিক মাধ্যমের ব্যবহারকারীরা চটজলদি যে ধরনের তথ্য বা সংবাদ পরিবেশন করে থাকেন। আরেকটা হলো বিনোদন। কেউ হয়তো তাঁর প্রিয় গানটি ইউটিউব থেকে নিয়ে ফেসবুকে শেয়ার করছেন। সেটা তাঁর জন্যেও যেমন বিনোদন, তেমনি যাঁরা দেখছেন, তাঁদের জন্যও। আরেকটি ধরন আমরা দেখি, তা হলো প্রতিরোধ। সমাজে যা ঘটে চলেছে, তার বিরুদ্ধে বা সাড়াতে বলি, যদি কোনো অন্যায়-অনিয়ম হয়ে থাকে, তাহলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা প্রয়োজনমতো প্রতিরোধ করেন, কোনো অনিয়ম ঘটলে তাতে সাড়া দেন।

এই অর্থে সামাজিক মাধ্যমকে জনপরিসর বলা যায়। জার্মান দার্শনিক জুর্গেন হ্যাবারমাস জনপরিসরের ধারণাটি দেন। জনপরিসর হলো সামাজিক জীবনের এমন একটি এলাকা, যেখানে মানুষ মুক্তভাবে সামাজিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা করবে এবং আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য প্রভাবিত করার চেষ্টা করবে। অর্থাত্, একত্রিত মানুষেরা সমাজের কোনো সমস্যা নিয়ে আলোচনা করবে এবং তা সমাধানে রাজনৈতিক পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করবে। হ্যাবারমাস আশা করেছিলেন, একটি আধুনিক বুর্জোয়া সমাজে মিডিয়ার মাধ্যমে জনপরিসর গঠিত হবে এবং সেখানে এর মাধ্যমে রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা সম্ভব হবে। কিন্তু মূলধারার মিডিয়া নানা সীমাবদ্ধতার কারণে সেই জনপরিসরটি তৈরি করতে পারেনি। কিন্তু অনলাইনে মানুষ এক জায়গায় মিথোস্ক্রিয়া করছে, আলোচনা করছে এবং সমাধানের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছে। এবং এর মাধ্যমে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারে চাপ তৈরি করা হচ্ছে।

আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে বলা যায়, বিডিআর বিদ্রোহের সময় দেখা গেছে, কোনো একটি ব্লগে একজন ব্লগার বলছেন, বিডিআরের ভেতরে কিছু একটা হচ্ছে, বাইরে থেকে শব্দ পাচ্ছি। তারপর হয়তো বাকিরা বলছেন, যে আপনি একটু আপডেট দিতে থাকেন, কোনো অগ্রগতি আছে কি না। পরে এ রকম আপডেট দেওয়া হয়েছে। সম্ভবত এটাই প্রথম কোনো নিদর্শন, যা বিডিআর বিদ্রোহ নিয়ে তথ্য বিলি করেছে। জরুরি ক্ষেত্রে এ রকম নাগরিক সাংবাদিকতা খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, অন্তত তথ্যটা পৌঁছে দিতে। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক মাধ্যমগুলো বিকল্প মাধ্যম হিসেবেও কাজ করছে। বিকল্প মাধ্যম হলো মূলধারার সাংবাদিকতার বিপরীতে এমন একধরনের সাংবাদিকতা, যেটা সামাজিক পরিবর্তনের জন্য একধরনের অ্যাডভোকেসি করে। সামাজিক মাধ্যমে এ রকম অ্যাডভোকেসি প্রায়ই দেখা যায়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে বেশ কয়েক বছর ধরেই ব্লগাররা তত্পর রয়েছেন। আবার ফুলবাড়িতে এশিয়া এনার্জির উন্মুক্ত খননপদ্ধতির বিরুদ্ধে যাঁরা কাজ করে চলেছেন, তাঁরা তাঁদের অ্যাডভোকেসির জন্য সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করছেন।

কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ বলেন, ভার্চুয়ালিটি সমাজ হলো প্রথাগত সমাজেরই প্রাযুক্তিক সংস্করণ। যেমন হাওয়ার্ড রেইনগোল্ড বলেছেন, শিল্পায়নের পর পশ্চিমা সমাজে বা আধুনা সমাজে, শহুরে সভ্যতায়, আগের কৌম বা প্রথাগত সমাজে যখন মানুষের সাথে মানুষের মিথোস্ক্রিয়া অনেক গভীর ছিল তার বিলুপ্তি ঘটেছে। এখানে আধুনিক মানুষ পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন। আগেকার কমিউনিটি-অনুভূতি তাদের মধ্যে নেই এবং ব্যক্তিস্বতন্ত্রতা বিচ্ছিন্ন মানুষে পরিণত করেছে। কিন্তু মানুষের সাইকিতে, আগের কমিউনিটিতে বাস করার যে অভ্যাস, তা যখন জারি রাখা যাচ্ছে না, তখন তার মাঝে কমিউনিটি গড়ার একটি ক্ষুধা চলে আসছে। একাকিত্ব খুব সুখের বিষয় নয়, ফলে কমিউনিটি গড়ার ক্ষুধা থেকে যাচ্ছে। সেই ক্ষুধা থেকেই যখন মানুষ দেখেছে যে ভার্চুয়াল হলেও অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব, তখন তারা ভার্চুয়াল কমিউনিটিতে দ্রুত যুক্ত হয়েছে।

সাইবার কমিউনিটিতে যাঁরা বসবাস করেন, তাঁদের অনেকেই প্রকৃত পরিচয় নিয়ে সামনে আসেন না। তাঁরা মেকি পরিচয় নিয়ে থাকেন এবং তাঁদের আলোচনার যে বিষয়বস্তু সেটাও খুব বেশি সিরিয়াস কিছু হয় না। আর সমাজিক মাধ্যমগুলো নিয়ে নানা ধরনের সমালোচনা ও আপত্তির মধ্যে একটি হলো, অপেশাদার। এর ওপর নির্ভর করা মুশকিল। যেমন একজন কোনো একটা কিছু দেখে লিখে ফেললেন, সবকিছু যাচাই-বাছাই না করে লিখেছেন, যেটা অনেক সময় গুজব তৈরিতে সহায়তা করে এবং যা একসময় ক্ষতিকর হতে পারে। অন্যদিকে ফেসবুকের মতো বড় সাইটগুলোর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগও আছে যে, ভেতরে ভেতরে ব্যবহারকারীদের অনেক তথ্য ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর সাথে শেয়ার করে। সামাজিক মাধ্যমের আরেকটি সমালোচনা হলো এর এলিটত্ব। আমাদের মতো দেশের শতকরা কত ভাগ লোকই বা সামাজিক মাধ্যমে যুক্ত আছে? শহুরে-আধুনিক-শিক্ষিত কিছু মানুষ এর সাথে যুক্ত।

তবে আরব বসন্তে কিংবা পশ্চিমা অকুপাই আন্দোলনে সামাজিক মাধ্যমগুলোর সফল ব্যবহার দেখে সরকারগুলোর দিক থেকে সামাজিক মাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করার নানা উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। আমাদের দেশেও বিডিআর ট্র্যাজেডি, সীমান্তে হত্যা, সাংবাদিক দম্পতি হত্যা, রামুতে সামপ্রদায়িক আক্রমণ ইত্যাদি নানা বিষয়ে সামাজিক মাধ্যমের ব্যবহারকারীরা সরব থেকেছেন। আমাদের যে শাসকশ্রেণী, তারাও এ সম্পর্কে সচেতন হয়েছে। একবার কিছু দিনের জন্য ফেসবুক বন্ধ ছিল, এখন বন্ধ আছে ইউটিউব, একজন ব্লগারকে গ্রেফতার করা হয়েছিল, প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে লিখে আইনের ফ্যাসাদে পড়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক।

সামাজিক মাধ্যমে যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রেরক ও গ্রহীতার সম্পর্ক পাল্টে গেছে। এখন গ্রহীতা ও প্রেরকের মতো গুরুত্বপূর্ণ হতে পারেন। একজন প্রেরক যখন কোনো কথা বলছেন, তখন গ্রাহক তাঁর সম্পর্কে কোনো উত্তর দিচ্ছেন বা মন্তব্য করছেন, তখন তাঁর অবস্থান পরিবর্তিত হয়ে গ্রহীতার অবস্থানে চলে যাচ্ছেন। আদি প্রেরক আবার গ্রহীতার জায়গায় চলে যাচ্ছেন। অর্থাত্, একধরনের মিথোস্ক্রিয়া চলছে এবং তা চলছে বলেই সর্ম্পক তৈরি হচ্ছে। আর সম্ভবত এই প্রথম মতপ্রকাশের সর্বোচ্চ স্বাধীনতা পাওয়া গেছে। আবার অনেক ব্যবহারকারীই এই স্বাধীনতার জন্য স্বেচ্ছাচারী আচরণ করেন ও দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ করেন। অনেক আক্রমণ প্রতি-আক্রমণ, প্রতিহতকরণ চলতে থাকে। ব্যক্তি আক্রমণ হয় এবং নানা অপব্যবহারের শিকার হন অনেকে। এসব কারণে আইনি প্রয়োজনের কথা এসেছে। শাসকশ্রেণীর পক্ষ থেকে কিছু কিছু আওয়াজ চলে আসছে এই সামাজিক মাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য। কিন্তু এর ব্যবহারকারীরা সামাজিক মাধ্যম নিয়ন্ত্রণের যেকোনো উদ্যোগের ঘোর বিরোধী। বিশেষত, এ ক্ষেত্রে জোর যুক্তি এই যে, যদি কেউ দেশবিরোধী, প্রচলিত আইনবিরোধী বা যেকোনো ধরনের সাইবার অপরাধ করেই থাকেন, তবে তাঁকে শাস্তি দেবার জন্য প্রচলিত আইনই যথেষ্ট। ইতোমধ্যে যেকয়েকটি বিষয়ে সরকার পদক্ষেপ নিয়েছে, তা বিদ্যমান আইনের আওতায়ই করেছে।

সামাজিক মাধ্যম যে অনন্য অবয়ব-বৈশিষ্ট্য নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হয়েছে, তার শক্তি ও সৌন্দর্যের দিকটি উপলব্ধি করার প্রয়োজন রয়েছে। এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার একটি পাটাতন, মানুষে মানুষে মিথোস্ক্রিয়ার একটি পরিসর, সামাজিক পরিবর্তন আনয়নের একটি যোগাযোগস্থল। এটিকে ব্যক্তি-আক্রমণ, কুত্সা কিংবা অপরাধের ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করার অর্থ হলো, এর শক্তি ও সৌন্দর্যের দিকটিকে অবজ্ঞা করা। সামাজিক মাধ্যম যেমন ব্যক্তির শ্বাস ফেলার জানালা হতে পারে, তেমনি সমষ্টির অগ্রবর্তিতা ও কল্যাণসাধনের জন্য যাবতীয় উদ্যোগের কার্যকর হাতিয়ারও হতে পারে।

লেখক :শিক্ষক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
সিপিবি-বাসদের হরতাল কর্মসূচির প্রতিবাদে ১২টি ইসলামি দলের হরতাল আহ্বান যথার্থ হয়েছে বলে মনে করেন?
9 + 4 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
মার্চ - ২৩
ফজর৪:৪৪
যোহর১২:০৬
আসর৪:২৯
মাগরিব৬:১৪
এশা৭:২৬
সূর্যোদয় - ৬:০০সূর্যাস্ত - ০৬:০৯
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :