The Daily Ittefaq
ঢাকা, রবিবার ১৬ ডিসেম্বর ২০১২, ২ পৌষ ১৪১৯, ২ সফর ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মৃতিসৌধে লাখো মানুষ

মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা ও সংবিধানের জন্মকথা

ফিরোজ আহমেদ

'আবার তোরা মানুষ হ' চলচ্চিত্রটির কথা মনে আছে? ছবিটির অনেক নিন্দা হয়েছিল মুক্তিযোদ্ধা-দের 'অমানুষরূপী' উপস্থাপনার জন্য। প্রয়াত তারেক মাসুদ অবশ্য তাঁর এক লেখায় এই চলচ্চিত্রটি সম্পর্কে বলেছিলেন, '১৯৭২-৭৩ সালে আসলেই কিছুসংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা আদর্শচ্যুত হয়েছিল। তারা যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধা বটে, তবে যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ৯ মাসের অস্ত্রের স্বাদ পাওয়ায় তারা শুধু অস্ত্রের ভাষায়ই কথা বলতে শিখেছিল। এর মানে কিন্তু এই নয়, তারা সবাই "পশু" হয়ে গিয়েছিল। তাদের ভালোবাসার পাত্রীকেও অস্ত্রের ভাষায় প্রেম নিবেদেন করেছিল। যুদ্ধ একটি ভাষা তৈরি করে দেয়। আর সেই ভাষাটি হলো অস্ত্রের ভাষা। এই জিনিসটি আমরা দেখেছি ১৯৭২-৭৩ সালে। এই ছবিটি সৃজনশীল ছবি হিসেবে না হোক, ওই সময়ের হিস্ট্রিক্যাল ডকুমেন্ক্ষেশন অব মাইন্ড, নট অনলি সেপস। সময়ের এবং মেন্ক্ষাল সেপস বা মেন্ক্ষাল যে টাইমটা ছিল, তা ওই জিনিসটাকে প্রতিনিধিত্ব করে। ব্যাপারটা আসলে তখনই জটিল হয়ে পড়ে, যখন যিনি নির্মাণ করলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর অবস্থানটা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিল কি না। যখন দেখা যায়, তাঁর অবস্থানটাই মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে বিভিন্নভাবে, তখন কিন্তু মানুষ সেটাকে প্রশ্ন করে এবং সেই হিসেবে কিন্তু "আবার তোরা মানুষ হ" ছবিটি বিতর্কিত হয়েছিল এবং এর সদিচ্ছা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল।'

স্বাধীন বাংলাদেশেই মুক্তিযোদ্ধাদের একাংশের বেপরোয়া লুণ্ঠনে প্রবৃত্ত হওয়ার বর্ণনা পাওয়া যাবে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের 'খোঁয়ারি' নামের ছোটগল্পটিতেও, গল্পের 'মানিক ভাই' তো আদতে সদ্যস্বাধীন দেশে ক্ষমতাসীন যুবসংগঠনের অবিসংবাদিত নেতার নামটিরই অর্থ ঠিক রেখে শব্দটা একটুখানি পালেক্ষ নেওয়া; গত বছরের (২০১১) ইত্তেফাক ঈদসংখ্যায় প্রকাশিত শামসুদ্দীন আবু জাফরের রোজনামচার ৮ জুন, ১৯৭৫ তারিখে এই যুবনেতার কথাই উল্লেখ করা হয়েছে দেশের শীর্ষতম ধনীতে পরিণত হওয়া ব্যক্তি হিসেবে। নতুন স্বাধীন দেশের যে চিত্র খোঁয়ারিতে পাওয়া যাবে, যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ নিয়ে সকল ভাবালু কল্পনাতে তা যেন সুঁইয়ের খোঁচা। যোদ্ধারা নেমে পড়েছেন টাকা বানাতে, যেখানেই দুর্বল কাউকে পাওয়া যাচ্ছে, লোপাট হয়ে যাচ্ছে তার ঘড়বাড়ি, সংখ্যালঘুর চেয়ে দুর্বল আর কে আছে, তাদের বিপন্নতার বোধই খোঁয়ারির উপজীব্য।

কিন্তু 'অমানুষে' পরিণত হওয়া মুক্তিযোদ্ধাই তো একমাত্র বাস্তবতা নয়—তার বিপরীতে ইলিয়াসের নিজেরই যেমন গল্পের চরিত্রেরা আছে, তাহেরদের মতো চরিত্র আমরা বাস্তবেও লড়াকু যোদ্ধা হিসেবেই পেয়েছি—মুক্তিযুদ্ধের উচ্চতর একটি আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের সংগ্রাম যারা বিভিন্নভাবে অব্যাহত রেখেছেন।

সেক্টর কমান্ডার কর্নেল কাজী নুরুজ্জামান এক টেলিভিশন সাক্ষাত্কারে বলেছিলেন তাঁর বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে জন্ম নেওয়া সেই উচ্চতর আদর্শের কথা, যুদ্ধের সমাপ্তির পর অনেকেই তাঁরা আর বাড়ি ফিরে যেতে চাইছিলেন না, জীবন দিতেই তাঁরা যুদ্ধে এসেছেন, এই যুদ্ধ বছরের পর বছর চলতে পারে, তা মেনে নিয়েই তাঁরা লড়াইয়ে এসেছেন। তাঁদের মিনতি ছিল, কারখানা কি পাঠশালায় কয়েক বছর পর ফেরত যাওয়া যাবে কিন্তু এখন তাঁরা চান দেশ পুনর্গঠনের কাজে নামতে। ভেঙে যাওয়া অবকাঠামো ঠিক করা, কি নিরক্ষরতা দূরীকরণ অথবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষ—সব কাজেই তাঁরা লেগে পড়তে চান। এই উত্সর্গীপ্রাণ তরুণদের নিয়ে একটি জাতীয় পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হলো না, বরং মুক্তিফৌজকে ভেঙে দেওয়া হলো।

ভেঙে পড়া এই মুক্তিফৌজের খুব ছোট একটা অংশই 'আবার তোরা মানুষ হ' ছবির অমানুষ। কিন্তু হাসান আজিজুল হকের 'নামহীন গোত্রহীন' কি আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের 'খোঁয়ারি'সহ আরও অনেকের গল্পগ্রন্থগুলোতে যে হার না-মানা মুক্তিযোদ্ধারদের কথা পাই, তাঁরাই সংখ্যায় ছিলেন বহুগুন বেশি। আরও বড় সত্য হলো, শেষপর্যন্ত রাজনীতিতে তাঁরা দুর্বল আর কোনঠাসা হলেন, রক্ষীবাহিনী আর কোর্টমার্শালের শিকার হলেন, নিজেরাও শতধা বিভক্ত হলেন, আর বাংলাদেশ নিজেও ক্রমাগত দূরে সরে গেল মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষার রাষ্ট্র আর সংবিধান থেকে। ইলিয়াসের 'মিলির হাতের স্টেনগান'-এর সেই আব্বাস পাগলা তো কুিসত্ বর্তমানকে মেনে নিতে না পেরে স্টেনগান খোঁজা মুক্তিযোদ্ধাই, যে অস্ত্রটি কিছুদিন আগে ব্যবহূত হয়েছে দেশ স্বাধীন করার কাজে, সেটাই এখন ব্যবহূত হচ্ছে ব্যক্তিগত সম্পদ আহরণের জন্য, সেই অস্ত্রটিই তো মিলি তার ভাইয়ের কাছ থেকে চুরি করেছিল আব্বাস পাগলাকে দেবে বলে। আর সেই আব্বাস পাগলাই এখন 'ভালো' হয়ে গেছে, অর্থাত্, অসুস্থ চারপাশকে সুস্থ বলে মেনে নিতে শিখে গেছে। আব্বাস সুস্থ হয়ে উঠলেও (বা মেনে নিতে শিখলেও) লড়াইয়ের বাসনাটা সঞ্চালিত করে যায় মিলির মাঝে। মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষাও তেমনি অন্তর্হিত হয় না, কেননা যে প্রবল আর উচ্চতর চেতনার জন্ম সে দিয়েছিল, তার বিনাশ অসম্ভব।

মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের সংবিধান বা শাসনতন্ত্র, রাষ্ট্রের আইনি প্রকাশ ঘটে যেখানে, যেন হুবহু 'খোঁয়ারি' আর 'মিলির হাতের স্টেনগান' গল্পেরই প্রতিচ্ছবি। 'আবার তোরা মানুষ হ' সিনেমার যেটা দুর্বলতা—তারেক মাসুদের মূল্যায়নেও—লুটতরাজ দেখানো হয়েছে অস্ত্রবাজ কিছু মুক্তিযোদ্ধাদের বিপথগামী ব্যক্তি বা বাহিনী হিসেবে; এর পেছনে যে রাজনৈতিক ক্ষমতার একটা ভিত্তিভূমি আছে, সেটা সেখানে অনুপস্থিত। কিন্তু ইলিয়াসের গল্পে অর্থনীতি আর রাজনৈতিক ক্ষেত্রে যা ঘটে চলেছিল রাষ্ট্রের জন্মপ্রক্রিয়ার শুরু থেকেই, তার নির্ভুল ইশারা পাওয়া যাবে।

২.

১৯৭০ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের সংবিধান প্রণয়নের জন্য নির্বাচিত ব্যক্তিদের নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের বিষয়ে অনেকেই গুরুতর আপত্তি তুলেছিলেন। ২১ ডিসেম্বর ১৯৭২ তারিখে ন্যাপ নেতা মোজাফফর আহমেদ বলেন, আরেকটি সাধারণ নির্বাচন না করে দেশের জন্য কোনো স্থায়ী সংবিধান গ্রহণ করা যেতে পারে না। তাত্পর্যপূর্ণ এবং অসাধারণ একটা উপলদ্ধি থেকেই তিনি প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন: স্বাধীনতাযুদ্ধকালে দেশে একটা গুণগত পরিবর্তন সাধন হয়েছে এবং এই পরিস্থিতিতে ভোটাভুটির মাধ্যমে জনগণের মতামত যাচাই ও বিবেচনা করার উদ্দেশ্যে অপর একটি নির্বাচন অনুষ্ঠান করা অপরিহার্য।

অথচ 'মাত্র এক বত্সর' পূর্বে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার যুক্তি দেখিয়ে কার্যত মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসের মধ্য দিয়ে গোটা জাতির রাজনৈতিক চেতনার যে বিকাশটি ঘটেছিল, তাকে পাশ কাটানো হয়। নতুন নির্বাচনের দাবির মুখ্য বিষয় তো কত দিন আগে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেটা নয়, বরং নয় মাসের এই সময়ের মাঝে জনগণের আকাঙ্ক্ষা আর রাজনৈতিক চেতনার প্রতিফলন যেন গণপরিষদে ঘটে, তা-ই ছিল তাদের লক্ষ্য। এক বছর আগে দেশটা ছিল পাকিস্তান, এখন তা বাংলাদেশ। নতুন সংবিধানে সেই উচ্চতর আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলনের জন্যই প্রয়োজন নতুন নির্বাচন, এটিই ছিল বিরোধীদের দাবি।

১৯৭২ এর ৬ অক্টোবর দুই প্রাক্তন প্রভাবশালী ছাত্রলীগ নেতা আ স ম আবদুর রব ও শাহজাহান সিরাজ বলেন, 'পরিষদ-সদস্যের শতকরা নব্বই জনই যেখানে স্বাধীনতা-সংগ্রামের সাথে যুক্ত না থেকে আরাম-আয়েশে গা ভাসিয়ে দিয়ে এবং নানা ধরনের অসামাজিক কাজে লিপ্ত থেকে স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালীন সম্পূর্ণ সময়টুকু ভারতে নির্লিপ্ত জীবনযাপন করেছে, সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের শাসনতন্ত্র প্রণয়নের অধিকার সেই সব গণপরিষদ-সদস্যের আদৌ আছে বলে দেশবাসী মনে করেন না।'

মাওলানা ভাসানীর সাপ্তাহিক 'হক কথা'য় 'সংবিধান প্রণয়ন করিবে কারা' এবং 'গণপরিষদের আইনী ভিত্তি কোথায়' শীর্ষক নিবন্ধে বলা হয়: 'জেনারেল ইয়াহিয়া খানের পাঁচ দফা শর্ত মেনে এই সদস্যরা নির্বাচনে গিয়েছিল। সেই নির্বাচনে পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র প্রণয়নের জন্য জাতীয় পরিষদ তথা গণপরিষদ নির্বাচিত হয়েছিল, তত্সহ নির্বাচিত হয়েছিল প্রাদেশিক পরিষদ। ...পাকিস্তান কায়েম থাকাকালে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হবার পর এই দুই সময়ের ব্যবধান মাত্র ৯ মাস হলেও রাজনৈতিক সচেতনতা, আশা-আকাঙ্ক্ষা ও মূল্যদানের দিক দিয়ে জনগণ অনেক এগিয়ে গেছে।'

এভাবে গণপরিষদের বৈধতার এই গুরুতর প্রশ্নটা উল্লেখযোগ্য বেশ কটি মহল থেকেই উঠেছিল। ভারত ও পাকিস্তানের বেলায় সংবিধান সভার সদস্য হিসেবে বৃটিশ আমলে অনুষ্ঠিত হওয়া শেষ নির্বাচনে বিজয়ীরাই দায়িত্ব পেয়েছিলেন বটে, কিন্তু পাকিস্তান ও ভারতের স্বাধীনতা-পরবর্তী সংবিধান প্রণয়নের জন্যই জনগণ সেই নির্বাচনে তাদের ভোট দিয়েছিল। এ দেশ দুটিতে শাসকের পরিবর্তন কোনো যুদ্ধের মধ্য দিয়ে হয়নি; বরং ক্ষমতা হস্তান্তরের একটা আইনি ধারাবাহিকতাই রক্ষিত হয়েছিল। ফলে শাসনতন্ত্র প্রণয়নে 'আইনি অর্থে' বৈধতার অভাব তখন ছিল না—সে প্রশ্ন ওঠেওনি। কিন্তু রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করা বাংলাদেশে যুদ্ধকালীন চেতনাগত উত্তরণের সুবাদে সেই ঔপনিবেশিক ধারাবাহিকতা সঙ্গত কারণেই ছিন্ন হবার কথা ছিল।

মোটকথা, আওয়ামী লীগ ছাড়া সব বিরোধী দলের দাবিরই মূল বক্তব্য ছিল, পাকিস্তানের সংবিধান রচনার জন্য নির্বাচিত ব্যক্তিদের দিয়ে নয়, নতুন নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়েই সংবিধানপরিষদ নির্বাচন করতে হবে। কিন্তু তা প্রত্যাখ্যান করা হয়।

৩.

সংবিধান প্রণয়নপর্বে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কটি ছিল বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংবিধান প্রণয়নের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত গণপরিষদের ক্ষমতা ও কার্যবিধির সীমাবদ্ধতার প্রশ্নটি। বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নে গণপরিষদের বৈধতা নিয়ে যারা প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন, তাঁরা ছিলেন আওয়ামী লীগের বাইরের প্রতিদ্বন্দ্বী। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের মাঝে তরুণতর একটা অংশে জন্ম নেওয়া 'বিপ্লবাত্মক' চিন্তাও আওয়ামী রাজনীতির বাইরে বেরিয়ে নবগঠিত জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) কাঠামোতেই প্রশ্নটি উত্থাপন করে। কিংবা মোজাফফর ন্যাপের মতো দল, যারা আওয়ামী লীগের প্রতি মিত্রভাবাপন্ন হলেও আওয়ামী লীগের দিক থেকে তেমন পাত্তা তাঁদের দেওয়া হয়নি।

কিন্তু গণপরিষদকে সংবিধান প্রণয়নী সভা হিসেবে যাঁরা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যাঁদের রাজনৈতিক স্বার্থ গণপরিষদের সাথেই সংশ্লিষ্ট ছিল, তাঁদের অনেকের জন্যও অস্বস্তিকর বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল গণপরিষদের এখতিয়ারের সীমাবদ্ধতার প্রশ্নটি। অকার্যকর একটি গণপরিষদ যাঁদের ভেতর অস্বস্তি, অসন্তুষ্টি কিংবা ভিন্ন চিন্তার জন্ম দিয়েছিল, তাঁরা ছিলেন আওয়ামী লীগের রাজনীতিরই অভ্যন্তরে। সংবিধান প্রণয়ণকারী সভা হিসেবে মনোনীত গণপরিষদকে দুভাবে ক্ষমতাহীন করা হয়; প্রথমত, আর সব গণতান্ত্রিক দেশে সংবিধান প্রণয়নী সভার হাতে রাষ্ট্রের প্রায় সকল ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকলেও (অর্থাত্ সংবিধান প্রণয়নের পাশাপাশি একইসাথে তা সংসদ হিসেবে ভূমিকা পালন করলেও) গণপরিষদকে এ থেকে বঞ্চিত করা হয়; দ্বিতীয়ত, গণপরিষদের সদস্যদের স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের অধিকার আইন করে রুদ্ধ করা হয়।

স্বাধীনতা পাবার পর ভারত ও পাকিস্তান—উভয় রাষ্ট্রেই ১৯৩৫ সালের ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স অ্যাক্টের অধীনে ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে বিজয়ীরা দুটি পৃথক সংবিধান পরিষদ গঠন করেন। তাঁদের বৈধতার উত্স ছিল এই যে, ওই নির্বাচনে নির্বাচিতগণ অবিভক্ত ব্রিটিশ-ভারতের জনগণের কাছ থেকে ভারত ও পাকিস্তান—এই দুটি রাষ্ট্রের সংবিধান প্রণয়নের জনরায় গ্রহণ করেছিলেন। নতুন সংবিধান গৃহীত না হওয়া পর্যন্ত নতুন রাষ্ট্রদ্বয়ে কেন্দ্রীয় আইনসভা বা সংসদ হিসেবেও এই দুই সংস্থাই কার্যকর ছিল। এভাবে ভারত ও পাকিস্তান উভয় রাষ্ট্রে সংবিধান পরিষদ সংবিধানসভা ও আইনসভার দ্বিবিধ ভূমিকাই পালন করে। মন্ত্রীসভার ওপর এর কর্তৃত্ব ছিল, মন্ত্রীসভা সংবিধান পরিষদের নিকট দায়বদ্ধ ছিল। পরিষদের অনুমতি ছাড়া সরকার কোনো অর্থ ব্যয় করতে পারত না, কোনো নতুন করও আরোপ করতে পারত না।

বাংলাদেশের সংবিধান রচনার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত এই গণপরিষদের কোনো আইনপ্রণয়নী ক্ষমতা ছিল না, মন্ত্রীসভার ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না, ছিল না সরকারের ব্যয়ের ওপরও কোনো তদারক-ক্ষমতা। ফলে নতুন রাষ্ট্রে বিপুল বিস্তারি রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির লুণ্ঠন, অপব্যয় এবং তা ব্যক্তিগত সম্পত্তি বৃদ্ধির কাজে বেপরোয়া ব্যবহার রুদ্ধ করার কোনো আইনি ব্যবস্থা কিংবা জবাবদিহি আদায়ের উপায় প্রথম থেকেই ছিল না। এ ছাড়া আইন প্রণয়নের সকল ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছিল এককভাবে রাষ্ট্রপতির ওপর, যিনি আবার প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়া কোনো কিছু করতে পারতেন না। কার্যত মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে এমনকি আওয়ামী লীগের একাংশের মাঝেও যে উচ্চতর রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ হয়েছিল, যার প্রতিনিধিত্ব করতেন তাজউদ্দীন আহমেদরা, সেটাই গণপরিষদকে এখতিয়ারচ্যুত করার পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছিল।

গণপরিষদের ভেতরে থাকা সদস্যরা কেউ কেউ গণপরিষদের হাতে এই ক্ষমতা প্রদানের দাবি উত্থাপন করেছিলেন বটে, তাঁরা গণপরিষদের সভাতেই নিগ্রহের শিকার হয়েছেন। ২২ মার্চ ১৯৭২ রাষ্ট্রপতি কর্তৃক জারি করা হয় বাংলাদেশ গণপরিষদ সদস্য (সদস্যপদ বাতিল) আদেশ, [কনস্টিটুয়েন্ট অ্যাসেম্বলি (সিসেশন অব মেম্বারশিপ) অর্ডার (পিও ন: ২৩ অব ১৯৭২)]। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক চেতনাবিরোধী আইন। রাষ্ট্রপতির একক কর্তৃত্বে জারি করা এই আদেশ অনুযায়ী গণপরিষদের কোনো সদস্য দলের অনুমতি ব্যতীত কোনো প্রস্তাব উত্থাপন, বিরোধিতা কিংবা আলোচনা করতে সক্ষম ছিলেন না, সে ক্ষেত্রে তাঁর গণপরিষদের সদস্যপদ বাতিল হয়ে যাবে। এর মধ্য দিয়ে দলের ভেতর থেকেও যেকোনো প্রকার বিরোধী সমালোচনার পথ বন্ধ করা হয়।

এভাবে সদস্যদের মুখে কুলুপ আঁটা গণপরিষদে খসড়া উত্থাপনের মাত্র ২৪ কার্যদিবসের মাঝে সংবিধান চূড়ান্তরূপে গ্রহণের উদাহরণ বিরল। প্রতিবেশী দেশ ভারতে খসড়া সংবিধান প্রকাশ করা হয়েছিল ১৯৪৮ সালের জানুয়ারিতে এবং গ্রহণ করা হয়েছিল ১৯৪৯-এর ২৬ নভেম্বর। সংবিধান প্রণয়নে সময় লেগেছিল ১১৪ কর্মদিবস। ভারত বা পাকিস্তানের সাথে তুলনায় বিষয়টা আরও মর্মান্তিক এ কারণে যে, ওই দুটি রাষ্ট্রের থেকে ব্যতিক্রমীভাবে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। খসড়া সংবিধান প্রস্তাবের ওপর সাধারণ আলোচনার পর ১৬৩টি সংশোধনী প্রস্তাব করা হয়, এর মাঝে ৮৪টি গৃহীত হয়, যার ৮৩টি আওয়ামী সদস্যদের এবং একটি সুরঞ্জিত সেনগুপ্তর। কিন্তু অধিকাংশ সংশোধনীই শাসনতান্ত্রিক বিষয়গুলোর সাথে সম্পর্কিত ছিল না, এগুলো ছিল ভাষাগত সংশোধনী।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, যেসব ধারার নিন্দা আওয়ামী লীগ ১৯৫৬ সালে করেছিল, হুবহু সেগুলোই তারা স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানে প্রবিষ্ট করিয়েছে। তিনি আরও বলেন, '১৯৬২ সালের শাসনতন্ত্র করা হয়েছিল আইয়ুব খানকে সামনে রেখে। বর্তমান শাসনতন্ত্রে বিলে প্রধানমন্ত্রীকেও বেশি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।' লারমা সংবিধানের জাতিবিদ্বেষী চরিত্র নিয়ে আপত্তি তোলেন।

১৯৭২-এর সংবিধানের অগণতান্ত্রিক ভিত্তি বিষয়ে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বেশ দীর্ঘ একটি আলোচনা গণপরিষদে করেছিলেন, সংবিধানে এক হাতে অধিকার দিয়ে আরেক হাতে তা কেড়ে নেওয়ার খুটিনাটি বিল্লেষণ করেছিলেন। শেষপর্যন্ত তিনি অন্য সব দাবি ছেড়ে দেওয়ার পরও অন্তত অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত বিনা মূল্যে শিক্ষার দাবিও প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল বলে ওই সংবিধানে স্বাক্ষরও করেননি। কিন্তু সংবিধানে ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতাকে পাকাপোক্ত করা পঞ্চদশ সংবিধানের উত্সাহী পুরোহিতদের একজন হিসেবেই ২০১১ সালে তাঁকে আমরা দেখলাম। ইলিয়াসের আব্বাস চরিত্রের মতোই হয়তো সম্বিত ফিরে পেয়ে একটু দেরিতে হলেও অন্যদের কাতারেই যোগ দিয়েছেন তিনি। নতুন যুগের মিলিরাই এখন ভরসা। মুক্তিযুদ্ধের অমলিন আকাঙ্ক্ষার স্টেনগানটা তাঁরা নিশ্চয়ই হাতছাড়া করবে না।

লেখক :প্রাবন্ধিক, রাজনীতিবিদ

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
সিপিবি-বাসদের হরতাল কর্মসূচির প্রতিবাদে ১২টি ইসলামি দলের হরতাল আহ্বান যথার্থ হয়েছে বলে মনে করেন?
5 + 5 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
নভেম্বর - ১৮
ফজর৫:১৩
যোহর১১:৫৫
আসর৩:৩৯
মাগরিব৫:১৮
এশা৬:৩৬
সূর্যোদয় - ৬:৩৪সূর্যাস্ত - ০৫:১৩
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :