The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৩, ০২ পৌষ ১৪২০, ১২ সফর ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ সাতক্ষীরায় যৌথ বাহিনীর অভিযানে নিহত ৫ | পেট্রোল বোমায় আহত অটোরিকশা চালকের মৃত্যু | আলোচনার মাধ্যমে সংবিধানের মধ্যে থেকে নির্বাচন : হানিফ | গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলনে জনগণের বিজয় হবে : ফখরুল | পরাজিত শক্তি জাতিকে বিভক্ত করতে তত্পর : তোফায়েল | আবার ৭২ ঘণ্টার অবরোধ | সিরিরায় বিমান হামলায় নিহত ২২ | চীনের জিনজিংয়াংয়ে সংঘর্ষে ২ পুলিশসহ নিহত ১৬

মুক্তিযুদ্ধে শরণার্থী রাজনীতি

দিব্যদ্যুতি সরকার

১৯৭১ সালে স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সময়ে এমন কিছু ঘটনা সংঘটিত হয়, ঐতিহাসিক বিবেচনায় যা অভূতপূর্ব। যেমন এক. ১৯৭০ সালের নির্বাচন শেষ হওয়ার মাত্র দুই মাসের মধ্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা। দুই. ২৫শে মার্চের রাত থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক অভিযান। বস্তুত নিজ দেশের বেসামরিক জনগণের ওপর এ জাতীয় সামরিক অভিযানের নজির উপমহাদেশের ইতিহাসে নেই। ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল নির্বাচন পরবর্তী ক্ষমতা হস্তান্তর। কিন্তু মার্চ মাসে এসে পরিস্থিতি দ্রুত এমনভাবে পরিবর্তিত হয়, যার ফলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের কাছে এই যুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধ হলেও পাকিস্তান রাষ্ট্রের কাছে তা ছিল বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন। এজন্য সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে তারা এই আন্দোলন স্তব্ধ করার চেষ্টা করে। কিন্তু এই সামরিক অভিযান ছিল বহুলাংশে অদূরদর্শী এবং পরিকল্পনার দিক দিয়ে এলোমেলো। এই অভিযানের একটি প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল পূর্ববাংলার সকল স্বাধীনতাকামী রাজনীতিবিদদের বন্দী করা। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (১৯২০—১৯৭৫) ছাড়া সব নেতৃস্থানীয় রাজনীতিবিদ তাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যায়। কার্যত এই অভিযান পরিণত হয় বেসামরিক জনগণের ওপর গণহত্যা ও নির্যাতনের অভিযানে। এরপর নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রায় নয় মাস এই গণহত্যা ও নির্যাতন চলে।

রাষ্ট্রীয় এই গণহত্যা ও নির্যাতনের ফলে এমন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, পাকিস্তান কিংবা বাংলাদেশ যে ব্যাপারে কোনো পূর্বানুমান করতে পারেনি। এই পরিস্থিতি হলো শরণার্থী সমস্যা। মাত্র আট মাসের মতো সময়ের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় এক কোটি মানুষ শরণার্থী হয়ে ভারতে চলে যায়। ফলে ভারতের এই পরিস্থিতির সাথে জড়িয়ে পড়া অনিবার্য হয়ে ওঠে। অথচ সেনা অভিযানের আগে পাকিস্তানের নীতিনির্ধারকরা নানাদিক ভেবে নিশ্চিত হয়েছিল যে, এই অভিযানের ফলে এমন কিছু ঘটবে না, যাতে ভারত সংশ্লিষ্ট হওয়ার কোনো সুযোগ পায়। কিন্তু বাস্তবে ঘটে এর উল্টো। বাংলাদেশ ইস্যুতে জড়িয়ে পড়ার জন্য ভারতকে আর বিশেষ কোনো চেষ্টা করা লাগেনি। শরণার্থী পরিস্থিতিই দেশটিকে এই সংকটে জড়াতে একপ্রকার বাধ্য করে।

শরণার্থী সমস্যা উদ্ভবের আগে পর্যন্ত বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম ছিল মূলত একটি জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম। এর এক পক্ষে ছিল পাকিস্তানি সামরিক-অসামরিক রাষ্ট্রযন্ত্র এবং অন্যপক্ষে পূর্ববঙ্গের স্বাধীনতাকামী জনতা। শুরুর সময়ে তাই এ যুদ্ধ পাকিস্তান রাষ্ট্রের সাথে পূর্ববাংলার জনগণের দ্বিপাক্ষিক স্বার্থ ও সংঘাতের প্রশ্নের সাথে জড়িত ছিল। এই দুই শক্তির বাইরে অন্য কোনো রাষ্ট্র বা শক্তির পক্ষে এতে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হওয়ার বাস্তব পরিপ্রেক্ষিত তখন তৈরি হয়নি। ফলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ আন্তর্জাতিক মহলে নিতান্তই পাকিস্তান রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসেবে মূল্যায়িত হওয়ার সম্ভাবনার মধ্যে ছিল। সেটি সম্ভব হলে মুক্তিযুদ্ধ একটি দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধে রূপ নিতে পারত এবং শুধু জাতীয়তাবাদী আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের প্রশ্ন তুলে সেই যুদ্ধের প্রয়োজনীয় রসদ সংগ্রহ বাংলাদেশি স্বাধীনতাকামীদের জন্য দুরূহ হয়ে পড়তো। জাতিসংঘ বা অন্য কোনো আন্তর্জাতিক শক্তির হস্তক্ষেপে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধও সুদূরপ্রসারী কোনো অনিশ্চয়তায় নিমজ্জিত হতে পারত।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক এই সমীকরণ পুরোপুরি পাল্টে যায় পাকিস্তানের সামরিক অভিযানের দুটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে। যথা : এক. 'দুষ্কৃতি' ও 'বিচ্ছিন্নতাবাদী'-দের দমন করার নামে অসামরিক ও নিরস্ত্র জনসাধারণের ওপর গণহত্যা ও নির্যাতন; এবং দুই. হিন্দু জনগোষ্ঠীর ওপর সামপ্রদায়িক নিপীড়ন ও সন্ত্রাস। প্রধানত এ দুইটি কারণে শরণার্থী সমস্যার উদ্ভব হয়। ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাস থেকে শরণার্থী প্রবাহ ধীরে ধীরে ব্যাপক আকার ধারণ করতে থাকে। শরণার্থীদের এই দেশত্যাগের কারণে পাকিস্তান অচিরেই নিজের ফাঁদে নিজেই আটকা পড়ে যায়। এতে দেশটির বরং দুশ্চিন্তা করার কথা, কিন্তু তারা উল্টো খুশিই হচ্ছিল। সেনা অভিযানে অবশ্য পাকিস্তানের অন্তত একটি আশু লক্ষ্য অর্জিত হয়েছিল। সেটি হলো, পূর্ব বাংলার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। এপ্রিল মাসের মধ্যেই পূর্ব বাংলার অধিকাংশ 'বিদ্রোহী' ভারতে চলে যাওয়ায় দেশের অভ্যন্তরে পাকিস্তানকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো যথেষ্ট পরিমাণ শক্তি তাদের ছিল না। ফলে আপাতদৃষ্টিতে এ সময় পূর্ব বাংলার ওপর সেনা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু যে প্রক্রিয়ায় এই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়, সেই প্রক্রিয়ার মধ্যেই এমন কিছু দুর্বলতা ছিল যার কারণে পাকিস্তানিরা তা বেশি দিন ধরে রাখতে পারেনি। এই অভিযানের ফলে প্রথমত, পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় সকল 'বিদ্রোহী' মাত্র মাসখানেকের মধ্যে ভারতে চলে যাওয়ায় ভারত প্রায় বিনা চেষ্টায় পাকিস্তানকে ভৌগোলিকভাবে খণ্ডিত করার একটি শক্তিশালী উপাদান হাতে পেয়ে যায়। ফলে পরিস্থিতি দ্রুত একটি ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের দিকে মোড় নেয়। দ্বিতীয়ত, পূর্ব পাকিস্তান থেকে ব্যাপক হারে ভারতে শরণার্থী অনুপ্রবেশ করতে থাকায় ভারতের অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর তা প্রবল চাপ সৃষ্টি করে। ফলে ভারতের পক্ষে তখন নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকা সম্ভব ছিল না।

শরণার্থীরা ব্যাপকভাবে ভারতে প্রবেশ করায় পাকিস্তানের জন্য এর প্রতিক্রিয়া হয় বিপজ্জনক। এপ্রিল-মে মাসে পূর্ব পাকিস্তানে যে 'স্থিতিশীল' পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছিল, সেই কথিত স্থিতিশীলতার পরিপ্রেক্ষিতের মধ্যেই এমন উপাদান ছিল, যা সমগ্র ঘটনাকে আন্তর্জাতিক রূপ দেওয়ার জন্য ছিল যথেষ্ট। বস্তুত তখনকার অবস্থা দৃশ্যত স্বাভাবিক মনে হলেও তা মোটেই স্থায়ী হয়নি। অচিরেই এই পরিস্থিতির একটি সুদূরপ্রসারী প্রভাববলয় তৈরি হয়, যে বলয়ে পাকিস্তান বনাম বাংলাদেশ প্রশ্নের মাঝে ভারত একটি তৃতীয় পক্ষ হিসেবে প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন ও পাকিস্তানি রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা রক্ষা—এই দ্বিমুখী দ্বন্দ্বের সাথে এ সময় যুক্ত হয় প্রায় এক কোটি শরণার্থীর ভরণ-পোষণ ও প্রত্যাবর্তনের প্রশ্ন, যা ভারতের সম্পৃক্ততা ক্রমাগত বৃদ্ধি করতে থাকে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ দ্রুত পরিণত হয় ত্রিপাক্ষিক ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতে; যেখানে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ নামক তিনটি শক্তিকেন্দ্র সৃষ্টি হয়।

১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসের মধ্যেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ আর শুধু জাতীয়তাবাদী যুদ্ধ থাকেনি, বরং তা সুস্পষ্ট ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের রূপ পরিগ্রহ করে। পাকিস্তানের দিক থেকে এই লড়াইয়ের স্পষ্ট দুটি ফ্রন্ট তৈরি হয়। যথা : এক. বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের জন্য সৃষ্ট জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট এবং দুই. বৈশ্বিক ও ভূ-রাজনৈতিক ফ্রন্ট। বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে স্তব্ধ করতে গেলে এই দুটি ফ্রন্টেই পাকিস্তানকে জিততে হতো। প্রথমটিকে মোকাবিলা করবার জন্য প্রয়োজন ছিল নবগঠিত বাংলাদেশ সরকার তথা জাতীয়তাবাদী শক্তির মধ্যে ভাঙন ধরিয়ে এর শক্তিমত্তা ও সম্ভাবনাকে দুর্বল করা। (আওয়ামী লীগের দক্ষিণপন্থী মোশতাক আহমদ (১৯১৯—১৯৯৬) অক্ষটি ব্যবহার করে এই লক্ষ্য পূরণে পাকিস্তান একাধিকবার তত্পর হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের যথাযথ পদক্ষেপের কারণে তা অবশ্য সফল হয়নি।) দ্বিতীয় ফ্রন্টে জয়লাভের জন্য প্রয়োজন ছিল আন্তর্জাতিক শক্তিকেন্দ্রসমূহ পাকিস্তানের পক্ষে সক্রিয় করে তোলা। দ্বিতীয়োক্ত এই ফ্রন্ট অর্থাত্ দ্বি-মেরুকৃত বিশ্বের মিত্রসমূহ তথা জাতিসংঘকে ব্যবহার করে উদ্ভূত পরিস্থিতি পাকিস্তানের অনুকূলে আনার ব্যাপারে প্রাথমিক পর্যায়ে পাকিস্তান ভারতের তুলনায় এগিয়ে ছিল। চীন ও যুক্তরাষ্ট্র তখন পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং এই দুটি দেশই ছিল জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য। এছাড়া সমগ্র মুসলিম-বিশ্ব প্যান-ইসলামিক ভ্রাতৃত্বের কারণে সর্বদা পাকিস্তানের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছিল। অন্যদিকে জাতিসংঘ ও বহির্দেশীয় পরিমণ্ডলে ভারত বহুলাংশে মিত্রহীন ছিল; স্নায়ুযুদ্ধের কারণে দুই মেরুতে বিভক্ত বৈশ্বিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় সোভিয়েত ইউনিয়নের পাশাপাশি কয়েকটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রই মাত্র তার পাশে দাঁড়িয়েছিল। এ সময়ে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মিত্রের প্রশ্নটি ছিল অনেকটা অবান্তর, রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো দেশের সমর্থন পাওয়ার মতো কূটনৈতিক অবস্থানে পৌঁছানো বাংলাদেশের পক্ষে তখন সম্ভব ছিল না। ফলে ভারতের একপ্রকার পার্শ্বচরিত্র হিসেবেই তাকে বহির্বিশ্বে অগ্রসর হতে হয়।

বিদ্যমান এই আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের, এমনকি এখানে ঘটে যাওয়া মানবিক বিপর্যয়ের কার্যকর আবেদনও বহির্বিশ্বে ক্রমাগত ম্লান হয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সাথে তখন মোশতাক আহমদ-কেন্দ্রিক খণ্ডীকরণ প্রক্রিয়া সফল হলে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তার মাঝেও এই যুদ্ধ নিমজ্জিত হতে পারত। ভারতও তখন সম্ভাব্য নানাবিধ ঝুঁকির কথা বিবেচনায় নিয়ে আন্তর্জাতিক কোনো মীমাংসা মেনে নিতে পারত। কিন্তু বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পথে এসব আশঙ্কা ও অনিশ্চয়তার কোনোটাই যে বাস্তবে পরিণত হয়নি, তার প্রধান কারণ ছিল শরণার্থী সমস্যা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই শরণার্থীরাই ছিল পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বৃহত্ শরণার্থী। এমনকি জাতিসংঘকেও এ জন্য ইতিহাসের সবচেয়ে বৃহত্ মানবিক সহায়তা কার্যক্রম গ্রহণ করতে হয়। শরণার্থী সমস্যার এই বিশালত্ব বাংলাদেশ আন্দোলনকে বিশ্ব সমপ্রদায়ের কাছে বাঁচিয়ে রাখে। সমস্যাটির ব্যাপকতা ও গভীরতা এত বেশি ছিল যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই সংকট সৃষ্টি হওয়ার প্রায় শুরুতে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব সম্পর্কে পাকিস্তানকে সতর্ক করে দিয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তানি নীতিনির্ধারকরা তাতে তেমন কর্ণপাত করেনি।

শরণার্থী পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান এই তিনটি পক্ষ বেশকিছু সুবিধা ও অসুবিধার সম্মুখীন হয়। যেমন, বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠিত হয়েছিল রাজনৈতিক শরণার্থীদের দ্বারা। এই সরকার কৌশলগত কারণে ভারতে তাদের সচিবালয় স্থাপন করলেও তারা আসলে তার নিজের জনগণের সাথেই অবস্থান করত। কারণ, পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় ১৫ শতাংশ অধিবাসী তখন ভারতে এই সরকারের সাথে অবস্থান করছে। এর ফলে অতি দ্রুত বাংলাদেশের পক্ষে মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রহ এবং ধারাবাহিকভাবে তাঁদের যুদ্ধে পাঠানো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। সামগ্রিকভাবে দেখলে, বাংলাদেশ সরকার তখন নিজস্ব জনগণ, ক্যাবিনেট, সেনাবাহিনী, বেসামরিক প্রশাসন, বিদেশি দূতাবাস প্রভৃতি, একটি রাষ্ট্রের অধিকাংশ অপরিহার্য উপাদানসহ ভারত ভূ-খণ্ডে অবস্থান করছিল। শরণার্থী পরিস্থিতির কারণে অপেক্ষাকৃত সহজে বাংলাদেশের পক্ষে এই অবস্থান সৃষ্টি সম্ভব হয়। বিপরীতক্রমে শরণার্থী সমস্যা ছিল ভারতের ওপর এমন একটি চাপ, যার কারণে বাংলাদেশকে সহায়তা করা ভিন্ন বিকল্প কোনো উপায় তখন ভারতের কাছে ছিল না। শরণার্থী পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশ সবসময়ই ভারতের ওপর একপ্রকার নিরবচ্ছিন্ন চাপ ধরে রাখতে সক্ষম হয়।

ভারতের দিক থেকে শরণার্থী সমস্যার অন্যরকম তাত্পর্য ছিল। প্রথমত, এই সমস্যার কারণে ভারত বিশাল আর্থিক, সামাজিক ও নিরাপত্তাজনিত সংকটে পড়ে। শরণার্থীদের ভাষা, ধর্ম ও নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ছিল ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশসমূহের অধিবাসীদের সাথে প্রায় অভিন্ন। দ্রুত তাদের দেশে ফেরত পাঠাতে না পারলে এরা ভারতীয় জনসাধারণের সাথে মিশে স্থায়ীভাবে ভারতে থেকে যেতে পারত। শরণার্থীদের ফেরত পাঠানো তাই ভারতের কাছে আবশ্যক কর্তব্য হয়ে পড়েছিল। শরণার্থী ফেরত পাঠানোর জন্য ভারতের এই তাড়না ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এমন এক সমীকরণের জন্ম দেয়, যেখানে শরণার্থী ফেরত পাঠানো প্রশ্নটির সাথে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নটি শর্তাধীন হয়ে পড়ে। ফলে ভারত খোলাখুলিভাবে বাংলাদেশকে সহায়তা করার ভিত্তি পায়। ভিত্তি পায় পাকিস্তানের 'অভ্যন্তরীণ' ব্যাপারে সরাসরি হস্তক্ষেপের; যে হস্তক্ষেপ এতদূর পর্যন্ত প্রসারিত করা সম্ভব যা পাকিস্তানকে ভেঙে ফেলতে পারে। পাকিস্তানের ব্যাপারে এই সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং বাংলাদেশ সরকারকে সাহায্য করার ব্যাপারে ভারত শেষপর্যন্ত একটি মাত্র যুক্তিকেই আঁকড়ে ছিল, সেটি হলো নিরাপদে ও স্বেচ্ছায় শরণার্থী প্রত্যাবর্তন। ১৯৭১ সালে জাতিসংঘসহ পৃথিবীর বিভিন্ন সংস্থা ও দেশে ভারতীয় প্রচারণার মূল বক্তব্য ছিল মূলত তিনটি। যথা : এক. বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্ন কিংবা পাকিস্তানের অখণ্ডতার প্রশ্নটি বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের নিজস্ব বিষয়, ভারত সেখানে কোনো পক্ষ নয়। দুই. ভারতের মূল লক্ষ্য এক কোটি শরণার্থীকে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো। এর জন্য প্রয়োজন শরণার্থীদের ফিরে যাওয়ার উপযোগী নিরাপদ পরিবেশ। তিন. পাকিস্তান কিংবা আন্তর্জাতিক সমপ্রদায় যদি এই উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি তথা শরণার্থী ফেরত পাঠানোর দায়িত্ব না নেয়, তাহলে ভারত চূড়ান্ত ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে। বস্তুত পাকিস্তানের পক্ষে তার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি কখনোই এমন করা সম্ভব হয়নি, যাতে সেখানে শরণার্থী ফিরে যাওয়ার মতো নিরাপদ অবস্থা তৈরি হয়।

শরণার্থী সমস্যার কারণে পাকিস্তান আসলে নিজের তৈরি করা অলঙ্ঘনীয় একপ্রকার ফাঁদে আটকা পড়ে গিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকে পাকিস্তানের লক্ষ্য ছিল সামরিক অভিযানের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। সেটি করতে গিয়ে তারা পূর্ব পাকিস্তানের অন্তত ১৫ শতাংশ অধিবাসীকে মাত্র আট মাসের মধ্যে দেশ থেকে বিতাড়িত করে। এর ফলে পাকিস্তান এমন কিছু পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়, যা মোকাবিলা করার প্রস্তুতি ও সামর্থ্য তার ছিল না। প্রথমত, এর আগে দেশটির এক নাগাড়ে সর্বোচ্চ এক পক্ষকাল যুদ্ধে লিপ্ত থাকার অভিজ্ঞতা ছিল। কিন্তু এই সামরিক অভিযান চালাতে গিয়ে পাকিস্তান আসলে সাড়ে আট মাসের একটি ধারাবাহিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ফলে আর্থিক দিক দিয়ে দেশটি বহুলাাংশে দুর্বল হয়ে পড়ে। বেশকিছু আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ওই বছর পাকিস্তানকে আর্থিক সাহায্য প্রদান স্থগিত করায় এই সংকট আরও প্রকট হয়েছিল। দ্বিতীয়ত, শরণার্থী সমস্যার যুক্তি দেখিয়ে ভারত সহজে পাকিস্তান সংকটে হস্তক্ষেপ করে এবং এর ফলে ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে দেশটি সাংঘাতিক বিপদের মুখে পড়ে। তৃতীয়ত, বাংলাদেশ পক্ষকে ভারতের সাথে সংযোগ সৃষ্টি করা থেকে বিরত রাখাও পাকিস্তানের পক্ষে সম্ভব হয়নি। এসব কারণে অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক এই উভয় ক্ষেত্রেই পাকিস্তান চরম সংকটে নিপতিত হয়।

বাংলাদেশ আন্দোলন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রধানত দুইটি কারণে পরিচিতি পায়। এর একটি হলো পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নির্যাতন ও গণহত্যা এবং দ্বিতীয়টি হলো শরণার্থী সমস্যা। মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকে বাংলাদেশের গণহত্যা বহির্বিশ্বে কিছুটা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল বটে, তবে তা ছিল সাময়িক। বাঙালিরা বিহারিদের ওপর হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে—এই জাতীয় অনেক রিপোর্ট বহির্বিশ্বে প্রচারিত হওয়ায় এ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বও তৈরি করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু যে বিষয়টি নিয়ে পাকিস্তান বহু চেষ্টা করেও কোনো দ্বিধা সৃষ্টি করতে পারেনি, তা হলো শরণার্থী সমস্যা। বস্তত এই সমস্যাকে আড়াল করতে হলে পুরো এক কোটি লোককে স্থায়ীভাবে গায়েব করে দেওয়ার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেটি আসলে অসম্ভব ব্যাপার। ফলে প্রধানত শরণার্থী সমস্যার কারণে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বহির্বিশ্বে ব্যাপক মানবিক সমর্থন পায়। এই মানবিক সমর্থনের সূত্র ধরে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক সমর্থনের পথ সুগম হয়। জাতিসংঘ, ইউএনএইচসিআর-সহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংগঠন ও বিভিন্ন দেশ শরণার্থী সমস্যার ব্যাপারে যেভাবে সংশ্লিষ্ট হয়, বাংলাদেশ আন্দোলনকে আন্তর্জাতিকীকরণে তা সহায়ক হয়।

সামগ্রিকভাবে শরণার্থী ইস্যুটির কূটনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব পাকিস্তানও এক পর্যায়ে বুঝতে পেরেছিল। কিন্তু তাদের পক্ষে ততদিনে অনেক বিলম্ব হয়ে গেছে; মুক্তিযুদ্ধজনিত বহুমুখী লড়াইয়ে তাই শেষ পর্যন্ত তারা পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য হয়। ৪ঠা ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে দেওয়া এক বিবৃতিতে পাকিস্তানি প্রতিনিধি আগা হিলালী শাহী শরণার্থী সংক্রান্ত একটি বিশ্লেষণ পেশ করেন, শরণার্থী সংক্রান্ত ভূ-রাজনীতি অনুধাবনের জন্য তা আজও প্রাসঙ্গিক। তিন ভাবে ভারত শরণার্থী ইস্যুটিকে ব্যবহার করছে বলে তাঁর বিশ্লেষণে ধরা পড়ে। যথা : 'সামরিকভাবে, তা বাস্তুচ্যুত মানুষের মধ্য থেকে একটি অনিয়মিত সেনাবাহিনী সৃষ্টি করছে। রাজনৈতিকভাবে, ভারত বাস্তুচ্যুত লোকজনের মধ্যে এই ধারণা গেঁথে দিয়েছে যে, পাকিস্তানে নয়, বরং পূর্ব পাকিস্তানে একটি নতুন সার্বভৌম রাষ্ট্রে তারা ফিরে যাবে। (কূটনৈতিকভাবে, ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সকল অর্থনৈতিক সহায়তা বন্ধের পন্থা হিসেবে শরণার্থী পরিস্থিতিকে ব্যবহার করছে।'

বস্তুত একাত্তরে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের জন্য তিনটি পূর্বশর্ত প্রধান হয়ে উঠেছিল। এক. মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক সংগঠন ও মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রহ; দুই. ভারতের অব্যাহত ও সক্রিয় সমর্থন এবং তিন. আন্তর্জাতিক সমর্থন। এই তিনটি শর্তকেই পরিপূরণ করার জন্য 'শরণার্থী সমস্যা' উপাদানটি খুবই কার্যকর ভূমিকা রেখেছিল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আর এমন কোনো একক উপাদান নেই, যা এই তিনটি পূর্বশর্তকেই সমান্তরালভাবে পরিপূরণ করে। 'শরণার্থী সমস্যা' প্রপঞ্চটি দ্বারাই কেবল এই তিনটি পূর্বশর্তকে তাত্ত্বিকভাবে সংযুক্ত করা সম্ভব। শরণার্থী ইস্যুটি তাই বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের একটি মৌল নিয়ামক।

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মো. নাসিম বলেছেন, 'বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হওয়া সুখবর না হলেও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে নির্বাচন করতে হচ্ছে'। আপনিও কি তাই মনে করেন?
5 + 2 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
মার্চ - ২৪
ফজর৪:৪৩
যোহর১২:০৬
আসর৪:২৯
মাগরিব৬:১৪
এশা৭:২৭
সূর্যোদয় - ৫:৫৯সূর্যাস্ত - ০৬:০৯
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :