The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৩, ০২ পৌষ ১৪২০, ১২ সফর ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ সাতক্ষীরায় যৌথ বাহিনীর অভিযানে নিহত ৫ | পেট্রোল বোমায় আহত অটোরিকশা চালকের মৃত্যু | আলোচনার মাধ্যমে সংবিধানের মধ্যে থেকে নির্বাচন : হানিফ | গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলনে জনগণের বিজয় হবে : ফখরুল | পরাজিত শক্তি জাতিকে বিভক্ত করতে তত্পর : তোফায়েল | আবার ৭২ ঘণ্টার অবরোধ | সিরিরায় বিমান হামলায় নিহত ২২ | চীনের জিনজিংয়াংয়ে সংঘর্ষে ২ পুলিশসহ নিহত ১৬

ক্ষমা অথবা অক্ষমতার গল্প

নূর সিদ্দিকী

মানুষটার কেবল চোখ দুটো হাসছে। খুশিতে চকচক করছে। ডান চোখ বাম চোখের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উল্লাস প্রকাশ করতে গিয়ে সামান্য ট্যারা হয়ে গেছে। বাম চোখ ডান চোখের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় হেরে গিয়ে বোকার মতো হাসছে। এমনটাও সম্ভব? হয়তো সম্ভব। আমি যখন নাজিমুদ্দিনের চোখের কারিশমা দেখেছি তখন আমার কাছে এমনই মনে হয়েছিল। চোখের মধ্যে রাজ্যের হাসি নিয়ে বসে থাকা নাজিমুদ্দিনকে যদি আপনাদের দেখাতে পারতাম তাহলে আপনারাও চমকে উঠতেন। কারণ এমন শীর্ণ রুগ্ন মানুষটির গর্তে যাওয়া চোখ দুটো আজ খুশিতে নেচে নেচে উঠছে। শরীরে জড়ানো ময়লা আর ছেঁড়া জামা কাপড়কে ব্যাঙ্গ করছে ওই চোখ দুটি। খুশির খবর যেন কেবল তার চোখ দুটোই পেয়েছে। ভালোভাবে খেয়াল করে দেখেছি নাজিমুদ্দিনের চোখের আলো খুব বেশি দূর আর যায় না বোধ হয়।

চোখের মণি দুটো পুরোনো চুষে খাওয়া বরফের মতো ফ্যাকাশে লাগছে দেখতে। অথচ আজ সেই মণিতে যেন সাতরাজার মণিরত্ন যোগ হয়েছে, আবারও বলছি, যেন চকচক করছে। ঠোঁটের কোণে সামান্য হাসির একটা রেখা আছে বটে, তবে তা বোধ হয় আপনার চোখ এড়িয়ে যেত না। না হাসার অভ্যাসের ফলে ঠোঁট বা চোয়াল হাসতে গিয়ে বারবার আটকে যাচ্ছে, মরিচা পড়া শেকলে। আরেকটা জিনিস আপনি খেয়াল করতে পারতেন—লোকটার মাথা কাঁপানোর রোগ আছে। কিন্তু সেই মাথা কাঁপানোটাকেই আজ আপনার কাছে নৃত্যভঙ্গিমা বলে মনে হতো। কারণ লোকটা বেজায় খুশি। গা-গতরে জোর থাকলে এতক্ষণে নেচে নেচে বাড়ির উঠানের বারোটাও হয়তো তার পক্ষে বাজানো অসম্ভব ছিল না।

যা হোক। এমন খুশি কাকে দেখাবে তা নিয়েই প্রথমে ধন্ধে পড়ে যায় নাজিমুদ্দিন। বুড়ি বউটা বিছানায় শুয়ে শুয়ে কাতরাতেই বেশি ভালোবাসে। চিঠির খামের গায়ে যেমন করে স্ট্যাম্প লেগে থাকতে ভালোবাসে ঠিক সেরকম বুড়ি বউটা বিছানাকে ভালোবাসে। কাত হলে কাত; আর চিত্ হওয়ার কথা তার মনেই থাকে না। চিত্ হলে কাত হওয়ার নিয়মকানুন ভুলে যায় সে। এমন বউয়ের কাছে গিয়ে খুশির খবর বলার কোনো মানে নেই। তাই ঘরের বারান্দাতেই বসে আছে নাজিমুদ্দিন। চেয়ারে বসে থাকলে হয়তো পা দুটো দোলাতে পারত কিন্তু চেয়ারে কীভাবে বসে আর কীভাবে পা দোলাতে হয়, তা নাজিমুদ্দিনকে শিখতে হলে নতুন করে জন্ম নিতে হবে। অত কষ্ট কি আর করা সাজে, না তার কপালে আছে?

এসময় ঘরের ভেতর থেকে সেই বুড়ি বউটা বোধ হয় কিছু একটা বলে ওঠে। বোধ হয় স্বামীর খুশির খবরটা তার মনের দরজায় কড়া নেড়েছে। কিন্তু কথাগুলো ঘরের ভেতর থেকে চৌকাঠ পেরিয়ে বারান্দার এই কোনায় আসতে আসতে আর কথা থাকে না। ধোঁয়ার মতো বাতাসে মিলিয়ে যায়। তবে নাজিমুদ্দিন হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়া কথাগুলো কুড়িয়ে এনে একটা অর্থ তৈরি করে। গত বছর দশেক ধরে এভাবেই বুড়িটার কথাগুলো বুঝে নিচ্ছেন নাজিমুদ্দিন। প্রথম দিকে সঠিক কথাগুলো হাওয়া থেকে নামিয়ে নিতে না পারলে বুড়ি বউটার গলা থেকে আরও কিছু কথা বের হতো। আর এই কথাগুলোর তাপও অনুভব করতেন নাজিমুদ্দিন। এখন আর তেমন হয় না। দুইজনের বোঝাপড়া হয়ে গেছে। নাজিমুদ্দিন উত্তর দেন—'আর কইয়ো না, খুনকার বাড়ির বড় পোলায় আইছিলো জোহরের পর নাহি জানাজা, আমারে নাহি যাইতেই হইবো। কী রহম কাণ্ড হইলো কওতো। খুনকার বাড়ির বড়পোলায় আমারে হাত ধইরা কইয়া গেলো—কাকা, আপনার কিন্তু যাওন লাইগবোই'। এই কথাগুলোর সঙ্গে নাজিমুদ্দিনের খুশি হওয়ার কোনো যোগসূত্র হয়তো আপনারা এখনো খুঁজে পাননি, তাই তো? না পাওয়ারই কথা। কেউ মারা গেছে শুনলে শত্রুও শোক প্রকাশ করে। নাজিমুদ্দিন খুশি হয়েছে আসলে জানাজায় অংশহগ্রণের আমন্ত্রণে। কিছুক্ষণ আগেই খন্দকার বাড়ি মানে এলাকার মানুষের কাছে পরিচিত খন্দকার ইদ্রিস আলী সাহেবের বড় ছেলে জামিল খন্দকার এসেছিল নাজিমুদ্দিনের বাড়িতে, নিজের পিতার জানাজায় অংশগ্রহণের দাওয়াত দিতে। এতটা অবশ্য আশাই করেননি নাজিমুদ্দিন। যা আশা করেননি তা পেলে খুশি না হয়ে উপায় আছে?

এমন একটা খুশির খবরের জন্যই তো অপেক্ষা ৪৩ বছরের। ইদ্রিস খুনকারের চার চাকার গাড়িটা যখন বছরে দুই-একবার এই গ্রামে আসে তখন গ্রামের কাঁচা রাস্তায় কেবলই ধুলো উড়াউড়ি করে। গাড়ির পেছনের সবকিছুকে ঝাপসা করে দেয়, ঠিক নাজিমুদ্দিনের চোখের মতো। আজ সেই চোখের ঝাপসা ভাব যেন কিছুটা হলেও কেটে যাচ্ছে। সবকিছু পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে নাজিমুদ্দিন। তেরশ্রী অঞ্চলে পাকবাহিনীকে পরাজিত করে নাজিমুদ্দিনদের মুক্তিবাহিনী যখন গান গাইতে গাইতে গ্রামের দিকে ফিরছিল ঠিক তখনকার ঘটনাও এখন তার চোখে ভেসে উঠছে। দলনেতা আব্দুল ওহাব, যাকে সবাই কান্দু ভাই বলে ডাকতেন তিনি ছিলেন সবার আগে। তার হাতেই ছিল পতাকা। হঠাত্ একটা গুলি এসে লাগল পতাকাটার ঠিক মাঝখানে। তখন পতাকার মাঝে কিন্তু লালসূর্য ছিল না, ছিল বাংলাদেশের ম্যাপ। গুলিতে ম্যাপটা ছিঁড়ে গেলো। কান্দু ভাই ছিঁড়ে যাওয়া পতাকার মানচিত্রের দিকে তাকিয়ে যোদ্ধার হুঙ্কার দেবার আগেই আরেকটা গুলি এসে লাগে তার বুকে। নাজিমুদ্দিনসহ অন্যদের চোখের সামনে ঘটেছিল পুরো ঘটনা। তৃতীয় গুলিটাও বোধ হয় কান্দু ভাইয়ের বুকেই লাগত যদি নাজিমুদ্দিন তাকে বুকে টেনে না নিতেন। গুলিটা নাজিমুদ্দিনের ডান পায়ের হাঁটুর বাটিতে আঘাত করে। আরও অনেক কিছুই আজ পরিষ্কার মনে পড়ছে নাজিমুদ্দিনের। সেদিনের সেই গুলির উত্স সন্ধানে বের হওয়া সহযোদ্ধারা ফিরে এসে জানিয়েছিল, ইদ্রিস খুনকার এই কাজ করেছে।

রাজাকার ইদ্রিস খুনকার সেই রাতেই গ্রাম ছেড়েছিল। ফিরেছিল ৮৪ সালের দিকে। ততদিনে খুনকার বাড়ি হয়ে গেছে খন্দকার বাড়ি। আর ইদ্রিস খুনকার নয়, লোকে তখন তাকে বলতে শুরু করেছে খন্দকার ইদ্রিস আলী সাহেব। ইদ্রিস খুনকারের খন্দকার এবং সাহেব হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নাজিমুদ্দিনেরও নাম বদলে গিয়েছিল। কেউ বলত খোঁড়া নাজিমুদ্দিন কেউ আবার তিন ঠ্যাঙওয়ালা নাজিমুদ্দিনও বলত। কিন্তু নাজিমুদ্দিনের মনের মধ্যে ইদ্রিস খুনকার নামটা আজও গেঁথে আছে, যেভাবে ৪২ বছর আগের একটা গুলি কান্দু ভাইয়ের বুকে আর একটা গুলি নাজিমুদ্দিনের হাঁটুতে গেঁথেছিল।

খন্দকার ইদ্রিস আলী সাহেবের ছেলেটা বলে গেছে জোহরের নামাজের পরই জানাজা হবে। হাতে খুব বেশি সময়ও নেই মনে হচ্ছে নাজিমুদ্দিনের। কারণ এরই মধ্যে চারদিক থেকে মাইকে বারবার ঘোষণা করা হচ্ছে—অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, এলাকার সম্মানিত মুরুব্বি, বিশিষ্ট দানবীর আলহাজ্ব ইদ্রিস আলী খন্দকার সাহেব আর নেই, ইন্নালিল্লাহ... রাজিউন। মাইকের ঘোষক নাজিমুদ্দিনের চিরচেনা সেই ঘাতক, ইদ্রিস খুনকার (স্বাধীনতার পরবর্তী) জীবনে কী কী করেছে কোন কোন সামাজিক প্রতিষ্ঠানে দান খয়রাত করেছে তারও বিশদ বিবরণ তুলে ধরছে কান্নাভেজা কণ্ঠে। এলাকার অনেকের বাড়িতেই হয়তো কান্নার রোলও পড়ে গেছে মাইকিং শুনে। ইদ্রিস খুনকার অথবা জনাব খন্দকার ইদ্রিস আলী সাহেবের কাছ থেকে নেমক খায়নি এমন মানুষ তো এখন এলাকায় দুর্লভ। অবশ্য শুরুতে লোকটা উপযাজক হয়েই সবার উপকার করত ঢাকায় বসে বসেই। দায়গ্রস্থ কন্যার বিয়ের জন্য টাকা, মসজিদের জন্য টিন, সিমেন্ট, মাইক, স্কুলের জন্য টেবিল চেয়ার যখন যা দরকার হয়েছে সব দিয়েছে। বছরান্তে কলেজ মাঠের বার্ষিক পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির আসনটা তাই তার নামেই বরাদ্দ থাকত বরাবরই। ফলে আজ তার মৃত্যুতে এলাকার পরিবেশ কিছুটা হলেও ভারী হবে—এটাই স্বাভাবিক।

আগেই বলেছি নাজিমুদ্দিনের মনের অবস্থার খবর। আজ মনের পরদায় ৪২ বছরের পুরোনো সাদাকালো যত ছবি ভেসে উঠছে ততই যেন নাজিমুদ্দিনের ঝাঁপসা চোখ রঙিন এবং উজ্জ্বল হতে শুরু করেছে। মরহুম ইদ্রিস আলী খন্দকার সাহেবের জানাজায় যেতে হবে তাকে। কী আনন্দ। কিন্তু বুড়ি বউটা আজও বোধ হয় কোনো উপকারেই আসবে না তার। চৌকির নিচে রাখা টিনের ট্রাঙ্কের মধ্যে একটা সাদা পাঞ্জাবি আছে, গোসল করে সেটা গায়ে জড়াতে হবে। হাজার হোক এলাকার মানুষের কাছে সম্মানিত লোকের জানাজা। বছর তিনেক আগে পাঞ্জাবিটা কেউ একজন দিয়েছিল তাকে। সবশেষ কবে সেই পাঞ্জাবিটা পরা হয়েছে তা আর তিনি মনে করতে পারছেন না। ট্রাঙ্কের মরিচায় যদি পাঞ্জাবিতে দাগ পড়ে যায় তাহলে বুড়ি বউটার ওপরই তার রাগ হবে সবচেয়ে বেশি। এসব ভাবনার গতি আর বাড়াতে পারলেন না তিনি। মনে তার খুশির ডমক।

৪২ বছরে একবারের জন্যও নাজিমুদ্দিন ইদ্রিস খুনকারের মুখোমুখি হননি। সুযোগ চেয়েছিলেন এমনটাও কেউ বলতে পারবে না। কী হবে তার মুখোমুখি হয়ে। কী বলবেন ইদ্রিস খুনকারকে। এই তো বছর কয়েক আগে মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল ওহাব কলেজের বর্ধিত ভবনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিল ইদ্রিস খুনকার। নাজিমুদ্দিন তখন একবার ভেবেছিলেন যাবেন সেখানে। ইদ্রিস খুনকারকে বলবার জন্য কিছু কথাও হয়তো তিনি মনের মধ্যে গুছিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু যাননি শেষ পর্যন্ত এই ভেবে যে, আব্দুল ওহাব মানে তার কান্দু ভাইয়ের নামে কলেজ করে দিয়ে ইদ্রিস খুনকার তো নিজের সঙ্গেই নিজে প্রতারণা করে চলেছে। একজন প্রতারকের সঙ্গে, একজন খুনির সঙ্গে তো কথা থাকতে পারে না। নাজিমুদ্দিনের যে খ্যাপাটে স্বভাব তাতে এমন সিদ্ধান্ত তিনি নিতেই পারেন।

তবে আজ তিনি মুখোমুখি হতে চান ইদ্রিস খুনকারের। যদিও লোকটা আজ মৃত। নাজিমুদ্দিনও কি মৃত নন? কেবল দেহের মধ্যে প্রাণটা থাকলেই কি মানুষ বেঁচে থাকে? হাঁটুতে গুলি লাগার পর থেকে যে লোক সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি, অন্যের দয়ায় বেঁচে থাকতে হচ্ছে তিনি কি নিজেবে জীবিত ভাবতে পারেন? পারেন না বোধ হয়। ফলে দুইরকমের মৃত মানুষ আজ মুখোমুখি হবে। নাজিমুদ্দিনের প্রস্তুতি শেষ। প্রথমে দ্রুতপদে তিনি যাত্রা শুরু করেন। কিন্তু মনের খুশিতে তো আর পায়ে জোর আনা যায় না, তাই খোঁড়ানোর গতিতে যতটা ছন্দ রেখে চলা যায় সেভাবেই চলছেন তিনি। তবে তার চলনের মধ্যে একটা বীরত্বের ছাপ চলে এসেছে। সেই সেদিনের মতো কান্দু ভাইয়ের নেতৃত্বে মিছিলে যেমন বীরত্ব ছিল বুকের মধ্যে।

বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আব্দুল ওহাব কলেজ মাঠে যখন নাজিমুদ্দিন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাজির হন তখন তার মনে হচ্ছিল সবাই যেন তারই অপেক্ষায় আছে। নাজিমুদ্দিন দূর থেকে দেখতে পান ইদ্রিস খুনকারের কফিন জরিদার ঝালর দেওয়া খাটিয়ার ওপরে রাখা। ইদ্রিস খুনকারের সেই ছেলেটা কফিনের সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। তবে ছেলেটার মনোযোগ কফিনের দিকে নেই। ডানে বামে ঘুরে হয়তো কাউকে খুঁজছে ছেলেটা। এসময় মুরুব্বিমতো কেউ একজন তাকে বললেন—যাও তোমার বাবার পক্ষ থেকে সবার কাছে মাফ চেয়ে নাও, সবাইকে মাফ করার জন্য অনুরোধ করো। কথাগুলো ছেলেটার কানে গেলো কি না বুঝতে পারল না কেউ। কারণ তখনো সে মাইক্রোফোন থেকে বেশ দূরে। সেই লোকটার পর আরও একজন একই অনুরোধ করল তাকে। অনেকটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও যেন ছেলেটা এবার মাইক্রোফোনের কাছে গেলো। কান্নার দমক থামিয়ে খুব সংক্ষেপেই বলল ছেলেটা—আমি আজ আপনাদের সবার কাছে আমার মরহুম বাবা খন্দকার ইদ্রিস আলীর পক্ষ থেকে ক্ষমা চাইছি। বিশেষ করে নাজিমুদ্দিন চাচার কাছে মাফ চাচ্ছি। ছেলেটার এই কথায় জানাজাস্থলে মৃদু হৈচৈ শুরু হলো। কী বলল ছেলেটা, কোন নাজিমুদ্দিন, যদি বাপে কারও কাছে অন্যায় কইরাই থাহে তাইলে সরাসরি তার কাছে মাফ চাইলেই পারে, হাজার লোকের সামনে মুর্দারে অসম্মান করা কেন? কার কতা কইলো পুলায়? ল্যাঙড়া নাজিমুদ্দিনের কতা নাহি? এমন অনেক কথার গুঞ্জন ছড়াচ্ছিল তখন। কারও কথায় বিস্ময়, কেউ আবার ক্ষুব্ধও বটে ছেলেটার ওপর।

ছেলেটার কথাগুলো নাজিমুদ্দিনও শুনেছেন। প্রথমে তার বিশ্বাস হয়নি। ইদ্রিস খুনকারের ছেলে তার কাছে মাফ চাচ্ছে তার বাবার পক্ষ থেকে বিশ্বাস না হওয়ারই কথা। ঠিক এইসময় আবারও মাইকে শোনা যায় ছেলেটার বলিষ্ঠ কণ্ঠ—মুক্তিযোদ্ধা নাজিমুদ্দিন চাচা আপনি আমার বাবার কফিনের পাশে আসুন, জানি না আপনি এখানে এসেছেন কি না। নাজিমুদ্দিনের সেই খুশি আরেকবার বলক দিয়ে উঠল মনের মধ্যে। আর তাই কফিনের দিকে যাওয়ার জন্য খুঁড়ানোর গতি বাড়িয়ে দিলেন। এসময় বেশ কয়েকজন তরুণকে নাজিমুদ্দিনের কাছে ছুটে আসতে দেখা গেলো। ছেলেগুলো তাকে সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করল, যেভাবে ইদ্রিস খুনকার কোনো অনুষ্ঠানে গেলে করত লোকজন। সবার চোখ তখন নাজিমুদ্দিনের দিকে। নাজিমুদ্দিন, আরে আমাগো ল্যাংড়া নাজিমুদ্দিনরে মাইকে ডাকলো? তিন ঠ্যাঙ্গা নাজিমুদ্দিন? খন্দকার ইদ্রিস সাহেবের ছেলেটা কি পাগল হয়ে গেছে? এই প্রশ্নগুলো কেউ কেউ প্রকাশ্যে কেউ আবার মনে মনে করেছেন। নাজিমুদ্দিন ততক্ষণে মাইক্রোফোনের কাছাকাছি। ইদ্রিস খুনকারের ছেলে নিজে এগিয়ে এসে তাকে সামনে নিয়ে যায়। ছেলেটা আবার বলতে শুরু করে—আপনারা আজ স্বীকার করুন আর না করুন আমার বাবা একজন অপরাধী, এটা আমি জেনেছি। বাবার অপরাধ পাহাড় সমান। বাবার অপরাধের ফল আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন নাজিমুদ্দিন চাচা। মৃত্যুর আগে অনেকবার তাকে বলেছি ক্ষমা চাইতে, তিনি সাহস পাননি। আর তাই মৃত বাবার পক্ষ থেকে আমি আপনাদের সামনে নাজিমুদ্দিন চাচার কাছে ক্ষমা চাইছি। ছেলেটা এই পর্যন্ত বলে থামে, নাজিমুদ্দিনের দিকে তাকায়। ছেলেটা দেখতে পায় নাজিমুদ্দিন চাচা লাঠিতে ভর দিয়ে তার ভাঙা হাঁটুতে তাল ঠুকছে আর বিড়বিড় করছে। সমবেত জনতা তখন একেবারে চুপ।

ছেলেটি আবার মাইকে সরব হয়ে ওঠে, তার এবারকার কথাগুলো অনেকটা ভাষণের মতো শোনায়। ছেলেটা এই কথাগুলো বলতে বলতে চোখ বন্ধ করে ফেলে যেন লজ্জা পেয়েছে সে। সে বলতে শুরু করে—শাহবাগের মিছিলে যাবার আগে আমি জানতাম না আমার বাবার অপরাধ কতটা জঘন্য। শাহবাগে আমি দেখেছি যুদ্ধাপরাধীদের তালিকায় আমার বাবার নাম। এরপর ভেবেছি তাকে বাবা বলব কি না, ভেবেছি তার অপরাধের জন্য ঠিক কতটা ঘৃণা তার প্রাপ্য। জন্মদাতা বাবাকে ঘৃণা করা যায় না, তাই আজ আমি আপনাদের সামনে। আমি জানি বাবার অপরাধের কথা এলাকার বেশিরভাগ মানুষই ভুলে গেছেন, কেবল নাজিমুদ্দিন চাচা ছাড়া। বাবার অপরাধ গোপন রাখার জন্য আমি চাইলে ঢাকার যেকোনো কবরস্থানে বাবাকে দাফন করতে পারতাম, কিন্তু তা করিনি এই ভেবে যে, নাজিমুদ্দিন চাচা যেন দেখে যেতে পারেন, খন্দকার ইদ্রিস আলীর সন্তান তার বাবার অপরাধ বয়ে বেড়াতে চায় না। আমি ক্ষমা চাইছি সকল শহীদদের পরিবারের কাছে, ক্ষমা চাইছি তাদের প্রতিনিধি নাজিমুদ্দিন চাচার কাছে। যে দেশের আলো হাওয়ায় আমি বেঁচে আছি সেই দেশের জন্য যারা রক্ত দিয়েছে তাদের কাছে আমি ক্ষমা চাই। ক্ষমা চাওয়া আমার দায়িত্ব, অধিকার নয়। দেশের প্রতি, মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রতি ও বীর শহীদদের প্রতি সর্বোচ্চ দায়বোধও বলতে পারেন। এই মাটিতে অপরাধ বয়ে বেড়ানোও অপরাধ, জঘন্য অপরাধ।

ছেলেটির এমন অগোছালো ভাষণে জানাজা ময়দান যে শূন্য বিরানমাঠে পরিণত হবে তা বোধ হয় স্বয়ং নাজিমুদ্দিনও ভাবতে পারেননি। দৃশ্যটা প্রথম নাজিমুদ্দিনেরই চোখে পড়ে। নাজিমুদ্দিন আবিষ্কার করে সেখানে মৃত ইদ্রিস খুনকার আর তার ছেলের পাশে কেবল তিনিই আছেন। ইদ্রিস খুনকারের গুণমুগ্ধরা লজ্জায় আর সেখানে থাকতে পারেনি। এখন কী করবে নাজিমুদ্দিন। ছেলেটি তখনো চোখ বন্ধ করে বলে যাচ্ছে, শাহবাগে আমিও শ্লোগান দিয়েছি—আমার মাটি আমার মা রাজাকারের হবে না, এই দেশ সত্যিই আমার বাবার জন্য নয়। তার রক্ত আমার ধমনীতে তাই আমাকে যেন আপনারা ঘৃণা না করেন সেজন্যই আজ ক্ষমা চাইছি।

ছেলেটির কথার সূত্র ধরে নাজিমুদ্দিন ভাবতে শুরু করেছেন সত্যিই কি কোনো রাজাকারকে ক্ষমা করা যায়? ক্ষমা পাওয়ার তো কিছু যোগ্যতা লাগে, তা কি ছিল এই রাজাকার ইদ্রিস খুনকারের? ক্ষমা পাবে জেনেই বোধ হয় ইদ্রিস খুনকার ক্ষমা চাওয়ার ধৃষ্টতা দেখাতে পারেনি। আর মুখে ক্ষমার কথা বললেও মন কি ক্ষমা করবে? ভাবনাগুলো নাজিমুদ্দিনের মাথার মধ্যে ছটফট করছিল। কিন্তু কার কাছে জানতে চাইবে সে। নিজের মনের সঙ্গেই তাই চলতে থাকে তুমুল লড়াই। মনটা একবার ক্ষমার পক্ষে মুখ খুলতে চাইলে হাজার কোটিবার চিত্কার করে ওঠে—না রাজাকারের ক্ষমা নেই বলে। নিজের চোখে শাহবাগের গণজাগরণ দেখেননি নাজিমুদ্দিন। লোকমুখে শুনে এখন তার মনে হচ্ছে তার মতো মুক্তিযোদ্ধাদের মনের মধ্যে শত শত শাহবাগ জেগে থাকে সব সময়।

ভাবতে ভাবতে কখন যে নাজিমুদ্দিনও সমবেতদের সঙ্গে কফিন থেকে খানিকটা দূরে চলে এসেছে নিজেও অনুমান করছে পারেনি। মাইকে ভেসে আসা ছেলেটির কখনো ক্ষুব্ধ কখনো বিষণ্ন কণ্ঠ তখনো শোনা যাচ্ছিল, ছেলেটির কথাগুলো হাহাকার হয়ে ছড়িয়ে পড়ছিল যেন আকাশে বাতাসে, আর তা ফিরে আসছিল ইদ্রিস খুনকারের কণ্ঠ হয়ে—আমি ক্ষমা চাই নাজিমুদ্দিন, তোমরা আমাকে ক্ষমা করো; এবার থমকে দাঁড়ায় নাজিমুদ্দিন। হাজার রাজাকারের সন্তানেরা যখন নতুন করে রাজাকার হবার বাসনায় মত্ত তখন এই ছেলেটি যে অপরাধ স্বীকার করে ক্ষমা চাইছে, তাকে খাটো করে দেখলে চলবে না—নাজিমুদ্দিন এভাবেও ভাবতে চান। এই ছেলেটিই একদিন নব্য রাজাকারদের রুখে দেবে, আর কেউ প্রাণ হারাবে না, কেউ পঙ্গু হবে না। নাজিমুদ্দিনের যুক্তি দীর্ঘতর হতে থাকে। নাজিমুদ্দিন ফিরে আসতে থাকেন কফিনের দিকে, তবে তার তিন পায়ে খোঁড়ানোর গতিটা যেন বাড়তেই চায় না।

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মো. নাসিম বলেছেন, 'বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হওয়া সুখবর না হলেও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে নির্বাচন করতে হচ্ছে'। আপনিও কি তাই মনে করেন?
4 + 9 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
মার্চ - ২৪
ফজর৪:৪৩
যোহর১২:০৬
আসর৪:২৯
মাগরিব৬:১৪
এশা৭:২৭
সূর্যোদয় - ৫:৫৯সূর্যাস্ত - ০৬:০৯
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :