The Daily Ittefaq
ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩১ ডিসেম্বর ২০১৩, ১৭ পৌষ ১৪২০, ২৭ সফর ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান এম মোরশেদ খানের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা | ৩ জানুয়ারি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

হঠাত্ এক দেবযানী

 প্রতাপ চন্দ্র

২০১৩ সালে যে ঘটনাগুলো বিশ্বকে আলোড়িত করেছে তার মধ্যে দেবযানী খোবরাগাড়ে ইস্যু অন্যতম। যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ভারতীয় কনুস্যলেটের এই ডেপুটি কনসাল জেনারেলকে ভিসা জালিয়াতির অভিযোগে গ্রেফতার করে মার্কিন পুলিশ। হঠাত্ এই গ্রেফতারের ঘটনা দিল্লি-ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক সম্পর্কে চরম অবনতি ঘটায়। দুই দেশের মধ্যে শুরু হয় বাকযুদ্ধ। ঘটনাটি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে ভারত কঠোর অবস্থানে যেতে বাধ্য হয়।

একেবারেই অপ্রত্যাশিতভাবে দুই দেশের কুটনৈতিক সম্পর্কের মাঝে কাঁটা হয়ে দাঁড়ায় এই ঘটনা। আর ঘটনার পেছনের কুশীলব দেবযানীর বাসার কাজের মেয়ে সঙ্গীতা রিচার্ড। সঙ্গীতা দাবি করেন, দেবযানী তাকে যে বেতন দেওয়ার কথা বলে আমেরিকা নিয়ে গিয়েছিলেন, তিনি তার চেয়ে অনেক কম বেতন দিতেন যা মার্কিন আইনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই অভিযোগে গত ১২ ডিসেম্বর নিউইয়র্কে দেবযানীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। কিন্তু কেবল গ্রেফতার করলে কথা ছিল। তার সঙ্গে নিউইয়র্ক পুলিশ যে আচরণ করেছে তা একযোগে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে গোটা ভারতকে।

দেবযানী অভিযোগ করেছেন, গ্রেফতার হওয়ার পর তিনি বারবার পুলিশকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন তিনি একজন কূটনীতিক। গ্রেফতার না হওয়ার আইনি সুরক্ষা তার আছে। কিন্তু পুলিশ তার কথা কানেই তোলেনি। তাকে প্রকাশ্যে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় আদালতে।

ভারতের দাবি, ডেপুটি কনসাল জেনারেল হিসেবে দায়মুক্তি প্রাপ্য ছিল দেবযানীর। কিন্তু এই নারী কূটনীতিক জানান, দায়মুক্তি তো দূরের কথা, পুলিশের বিশেষ শাখায় নেওয়ার পর প্রথমে তাকে বিবস্ত্র করে সমস্ত শরীর তল্লাশি করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রে দাগি অপরাধীদের যেভাবে শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ভেতর-বাহির 'তল্লাশি' চালানো হয়, সেভাবে সমস্ত শরীর স্ক্যান করে তার শরীরের ভেতরে কোনো নিষিদ্ধ দ্রব্য লুকানো আছে কি না তাও পরীক্ষা করা হয়। এরপর ডিএনএ স্যাম্পলের জন্য তার মুখের লালা নেওয়া হয়। এসব প্রক্রিয়ার আগে দেবযানীকে হাজতের যেখানে বসতে দেওয়া হয় সেখানে অপেক্ষা করছিল ছিঁচকে চোর থেকে শুরু করে যৌনকর্মী, খুনি, মাদকাসক্ত ও অন্যান্য অপরাধীরা। পুলিশ তাকে জানায়, নিজের বাসার ভারতীয় গৃহকর্মীকে ভিসায় উল্লিখিত পারিশ্রমিকের চেয়ে কম দেওয়ার অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং তাকে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। কোনো প্রকার বিশেষ সুবিধা তিনি পাবেন না। তাকে নেওয়া হয় ম্যানহাটানের ফেডারেল কোর্টে। পরে সেখান থেকে আড়াই লাখ মার্কিন ডলারের (প্রায় দুই কোটি টাকা) বিনিময়ে জামিন পান তিনি।

কিন্তু তাকে হেনস্থা করার এই ঘটনা দিল্লি-ওয়াশিংটন স্নায়ুযুদ্ধের রূপ দেয়। ভারতের মিডিয়া একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়ে মার্কিন কর্তৃপক্ষের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে। যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পাল্টা পদক্ষেপের অংশ হিসেবে দিল্লিস্থ মার্কিন দূতাবাসের সামনে থেকে নিরাপত্তা ব্যারিকেড বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে দেওয়া হয়। মার্কিন দূতাবাসকে ভারত আর সর্বোচ্চ ক্যাটাগরির নিরাপত্তা দেবে না বলে ঘোষণা দেয়। সেখানে শুধু পুলিশ পিকেট রাখা হয়। নিরাপত্তা দুর্বল করা ছাড়াও প্রত্যাহার করা হয় মার্কিন কূটনীতিবিদদের এয়ারপোর্টের পাস। এখানেই শেষ নয়, ভারতে অবস্থানকারী সকল মার্কিন কূটনীতিবিদদের পরিচয় পত্র জমা দিতে নির্দেশ দেয় দিল্লি। কনস্যুলেটদের পরিবারকেও দেওয়া হয় একই নির্দেশ। ভারতের বিমানবন্দরগুলোতে এখন থেকে মার্কিন কূটনীতিকদের সাধারণ যাত্রীদের মতোই লাইনে দাঁড়াতে হবে। এয়ারপোর্টে গাড়ি ঢুকাতে গেলে লাইন দিয়ে পাস নিতেও হবে। একই ব্যবস্থা নেওয়া হয় কলকাতাতেও। বিরোধ এতটাই তুঙ্গে পৌঁছে যে মার্কিন কংগ্রেসের এক প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকও বাতিল করে দেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুশীল কুমার সিন্ধে ও কংগ্রেস সহ-সভাপতি রাহুল গান্ধী। কিন্তু মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর জানায়, কূটনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে ভিয়েনা চুক্তিতে যা বলা রয়েছে, তার আওতায় দেবযানী পড়েন না। তিনি পূর্ণ কূটনৈতিক সুরক্ষা পেতে পারেন না।

ভারতের পাল্টা চাল :যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছিল, দেবযানী খোবরাগাড়ে কূটনৈতিক রক্ষাকবচ পাওয়ার অধিকারী নন। তাকে অভিযোগ থেকে মুক্তি দেওয়া তাই সম্ভব নয়। একইসঙ্গে ইউএস মার্শাল সার্ভিস কর্তৃপক্ষ বুক ফুলিয়ে স্বীকার করে, দেবযানীকে বিবস্ত্র করেই শরীরের ভেতর-বাহির তল্লাশি চালানো হয়েছে মার্কিন আইন অনুযায়ী। কোনোরকম ইতস্তত বোধ ছিল না তাদের এই স্বীকারোক্তির মধ্যে। একজন ভারতীয় নারীকে বিবস্ত্র করে মার্কিন পুলিশ তল্লাশি করছে এটা মেনে নিতে পারেনি দিল্লি, ভারতীয়দের কাছে এটা গোটা দেশকেই নগ্ন করার সামিল। তাছাড়া বিষয়টি নিয়ে ভারতে এত শোরগোল ওঠা সত্ত্বেও অনুতপ্ত হয়নি মার্কিন সরকার। উল্টো দেবযানী কূটনীতিক সুরক্ষা পাওয়ার অধিকারী নন বলে ভারতের 'কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা' দিল মার্কিন পুলিশ। বারবার ফাঁকা মাঠে গোল দেওয়ার সুযোগ যুক্তরাষ্ট্রকে দিতে চায়নি ভারত। তত্পর হয় নয়াদিল্লি।

দেবযানী খোবরাগাড়েকে যে মিশন নিয়ে নিউ ইয়র্কে পোস্টিং দেওয়া হয়েছিল সেখান থেকে তাকে সরিয়ে জাতিসংঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে নিযুক্ত করা হলো। কার্যত প্রোমোশন দিয়ে দেবযানীকে পাকাপাকিভাবে নিউ ইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দফতরে পোস্টিং দেওয়া হলো। পূর্ণ কূটনৈতিক সুরক্ষা পাওয়ার অধিকারও দেওয়া হলো। দুর্দান্ত এক কূটনৈতিক চাল দিয়ে নয়াদিল্লি বেশ ব্যাকফুটে ঠেলে দেয় ওয়াশিংটনকে। কারণ জাতিসংঘের কূটনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে জেনেভা কনভেনশন মেনে আমেরিকা দেবযানীকে সর্বোচ্চ কূটনৈতিক রীতি ও সম্মান দিতে বাধ্য। শুধু তাই নয়, আমেরিকা চাইলেও এবার দেবযানীকে আমেরিকা থেকে কোনোভাবেই কোনো অভিযোগে গ্রেফতার কিংবা বহিষ্কার করতে পারবে না। তাকে রক্ষা করতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করার ঘোষণা দেয় ভারত।

এবার নমনীয় যুক্তরাষ্ট্র :দেবযানীর গ্রেফতারে গোটা ভারত যে এভাবে তেড়ে আসবে তা যুক্তরাষ্ট্রের কল্পনাতেই ছিল না। তাই তাকে রক্ষার জন্য একেবারে জাতিসংঘের মতো বিশ্বপ্রতিষ্ঠানে পদোন্নতি দেওয়ার বিষয়টিও তাদের ভাবনার বাইরে ছিল। কেবল ভারত নয়, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সহানুভূতিও যেতে থাকে দেবযানীর দিকে। ফলে কিছুটা নড়েচড়ে বসে ওয়াশিংটন। খানিকটা নমনীয় হয়। দেবযানীকে হেনস্তার ঘটনার জন্য দুঃখপ্রকাশ করেন আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি। ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিবশঙ্কর মেননকে ফোন করে দুঃখপ্রকাশ করে আশা প্রকাশ করেন যে এই বিষয়টি নিয়ে ভারতের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। বিষয়টি নিয়ে দেবযানীর প্রতি সমবেদনাও জানান তিনি। তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, দেবযানী হেনস্থা কাণ্ডে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে আমেরিকা কী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে তা জানাতে হবে। শুধু আশ্বাস বা দুঃখপ্রকাশে কাজ হবে না। একই সাথে ভারতের ক্ষোভ প্রশমনে মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল প্রীত ভারারা বলেন, 'প্রকাশ্যে দেবযানীকে হাতকড়া পরিয়ে গাড়িতে তোলা হয়নি। তাকে মহিলা মার্শাল দিয়ে ঘিরে ধরেই গাড়িতে তোলা হয়। আর কোনো পুরুষ পুলিশদের সামনে তাকে বিবস্ত্র করা হয়নি। তাকে যখন বিবস্ত্র করে শরীর তল্লাশি করা হয় তখন কেবল নারী মার্শালরাই উপস্থিত ছিল।' শান্তিপূর্ণ সমাধানের আশায় :ভারত দাবি করে, যুক্তরাষ্ট্রকে তার আচরণের জন্য ক্ষমা চাইতে হবে এবং দেবযানীর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রত্যাহার করতে হবে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি দেবযানী হেনস্থা হওয়ার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করলেও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে পরে জানানো হয় যে মামলা প্রত্যাহার করা সম্ভব নয়। বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রয়োগ ইস্যু।

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, 'বিরোধীদল সরকারের বিরুদ্ধে নয়, জনগণের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
9 + 6 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
মার্চ - ২৪
ফজর৪:৪৩
যোহর১২:০৬
আসর৪:২৯
মাগরিব৬:১৪
এশা৭:২৭
সূর্যোদয় - ৫:৫৯সূর্যাস্ত - ০৬:০৯
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :