The Daily Ittefaq
ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩১ ডিসেম্বর ২০১৩, ১৭ পৌষ ১৪২০, ২৭ সফর ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান এম মোরশেদ খানের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা | ৩ জানুয়ারি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

শচীনের বিদায়

 এ কে এম মুজিব

চব্বিশ বছরের অভ্যাস ভুলে যাওয়া তো আর চাট্টিখানি কথা নয়। ২০১৩ সালে সেই অভাবনীয় কাজটিই করে ফেললেন একজন। মহানায়কের মতোই বিদায় বললেন ক্রিকেটকে, দু যুগ ধরে যাকে মন্দিরের মতো পূজা করে এসেছেন। কাঁদল ভারত, শ্রদ্ধায় মাথা নত করল গোটা বিশ্ব। বিদায় বেলায়ও আরেকবার চিনিয়ে দিয়ে গেলেন নিজের জাত। ৭৪ রান করে আউট হয়ে গেলেন; হাঁটতে লাগলেন প্যাভিলিয়নের দিকে, পথটাকে হয়তো আগে কখনোই এত লম্বা মনে হয়নি শচীন রমেশ টেন্ডুলকারের।

১৯৮৯ সালে করাচিতে শচীনের অবসরের পর থেকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে অবসরের সময় পর্যন্ত ভারত টেস্ট খেলেছে মোট ২১৭টি। এর ২০০টিতেই খেলেছেন 'লিটল মাস্টার'। ৫৩.৭৮ গড়ে করেছেন ১৫৯২১ রান। পার্টটাইম স্পিন বোলিংয়ে নিয়েছেন ৪৬টি উইকেট। সমান দাপটের সাথে খেলে গেছেন ওয়ানডে ক্রিকেট। ওয়ানডে'র ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ডও তার। ৪৬২টি ম্যাচে ৪৪.৮৩ গড়ে করেছেন ১৮৪২৩ রান। সাথে ১৫৪টি উইকেট। ২৫ হাজারেরও বেশি প্রথম শ্রেণী রান; ১০০টি আন্তর্জাতিক সেঞ্চুরি, প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে ওয়ানডেতে ডাবল সেঞ্চুরি, সবচেয়ে বেশি টেস্ট খেলার রেকর্ড; অবিস্মরণীয় বললেও কম বলা হবে। কৈশোর পেরোনোর পরপরই আলোচনায় চলে আসেন শচীন। স্কুল ক্রিকেটে বিনোদ কাম্বলির সাথে ৬৬৪ রানের সেই রেকর্ড ঢুকে গেছে ইতিহাসের পাতায়। সেটা ১৯৮৮ সালের কথা। একবছর বাদে ইরানি ট্রফি'র এক ম্যাচে দিল্লির বিপক্ষে ১০৩ রানের ইনিংসের কল্যাণে জাতীয় দলে সুযোগ পেয়ে যান। পাকিস্তানের বিপক্ষে কৃষ্ণামাচারি শ্রীকান্তের অধিনায়কত্বে করাচিতে ১৫ মে জাতীয় দলের জার্সি গায়ে খেলতে নামেন ১৬ বছর বয়সী শচীন। এর নয়দিন বাদে ফয়সালাবাদে পেয়ে যান ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট হাফ সেঞ্চুরি। প্রথম ছয়টি টেস্ট ইনিংসে করেন দুটি হাফসেঞ্চুরি। এক প্রদর্শনী ম্যাচে সে বছরই পেশোয়ারে পাকিস্তানি লেগ স্পিনার আব্দুল কাদিরের এক ওভারে তুলেছিলেন মোট ২৮ রান। মাস্টার ব্লাস্টারের আসল রূপ আস্তে আস্তে প্রকাশ হতে থাকে।

১৯৯০ সালে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে ১৭টি চারের সাহায্যে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলেন ১১৭ রানের অপরাজিত এক ইনিংস। ম্যাচ বাঁচিয়ে ফেরার পরই শচীন-রবে মুখরিত হয়ে ওঠে ক্রিকেট বিশ্ব।

সেখান থেকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি টেন্ডুলকারকে। ১৯ বছর বয়সে অস্ট্রেলিয়ার পার্থে তার রূদ্রমূর্তির সামনে গলির বোলারের পর্যায়ে নেমে আসেন ক্রেইগ ম্যাকডরমট, মার্ভ হিউজেস, পল রাইফেল ও মাইক হুইটনির মতো পেসাররা। ১১৪ রানের সেই ইনিংসটি এখনও ক্রিকেটের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ইনিংস বলে বিবেচিত হয়ে আসছে। অতিমানবীয় সেই ইনিংসটির কিছুদিন পরই তার মধ্যে নিজের ছায়া খুঁজে পান স্যার ডন ব্র্যাডম্যান। ১৯৯২ সালে প্রথম বিশ্বকাপের আসরে এই কিংবদন্তিকে দেখা যায়। পাকিস্তানের বিপক্ষে ৫৪ রান করে দলকে ৪৩ রানের জয় এনে দেন তিনি। সে বছরই কনিষ্ঠ ব্যাটসম্যান হিসেবে টেস্টেও এক হাজারী ক্লাবে প্রবেশ করেন শচীন।

দেশের মাটিতে প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি করেন ১৯৯৩ সালে চেন্নাইয়ে (১৬৫); সেই ইংল্যান্ডের বিপক্ষেই। ম্যাচটিতে ভারত ইনিংস ও ২২ রানের বিশাল ব্যবধানে জয়লাভ করে। এর পরের বছরই ওয়ানডে ক্রিকেটে প্রথমবারের মতো ওপেনিং পজিশনে দেখা যায় তাকে। অকল্যান্ডের ইডেন গার্ডেনে নিউজিল্যান্ড বোলারদের নিয়ে রীতিমতো ছেলে খেলা করে করেন ৪৯ বলে ৮২ রান। ক্যারিয়ারের ৭৯তম ওয়ানডেতে এসে পান প্রথম সেঞ্চুরি।

১৯৯৫ সালে বিশ্বের তাবত্ ক্রিকেটারদের জন্য অনন্য এক মাইল ফলক স্থাপন করেন শচীন। ৩০ কোটি রুপির বিনিময়ে ওয়ার্ল্ডটেলের সাথে পাঁচ বছর মেয়াদি এক বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষর করেন তিনি। সবচেয়ে ধনী ক্রিকেটারের তকমা যুক্ত হয় তার নামের পাশে।

এর পরের বছর বিশ্বকাপের সব মিলিয়ে শচীন করেন ৫২৩ রান। সেবার ভারতও বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পৌঁছে যায়। একই বছর দশম টেস্ট সেঞ্চুরির দেখা পান শচীন। এর ক'দিন পরই অধিনায়ক হিসেবে আবির্ভাব ঘটে শচীনের। ১৯৯৮ ওয়ানডে ক্রিকেটের সাত হাজারী রানের ক্লাবে অন্তর্ভুক্ত হন শচীন। পান খেলাধুলায় ভারতের সর্বোচ্চ পদক-রাজিব গান্ধী খেলরত্ন পুরস্কার। ১৯৯৯ সালে পান পদ্মশ্রী পদক। ২০০০ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সেঞ্চুরি হাফ সেঞ্চুরি করেন তিনি। পরের বছর ইতিহাসের প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে শচীনের নামের পাশে লেখান দশ হাজার রান। সৃষ্টি করেন আরেক ইতিহাস।

২০০২ সালে স্পর্শ করেন ডন ব্র্যাডম্যানের ২৯টি সেঞ্চুরির রেকর্ড। ২০০৩ সালের বিশ্বকাপে ৬৭৩ রান করে ভারতকে ফাইনালে পৌঁছে দেন শচীন। ২০০৪ সালে এসে ছুঁয়ে ফেলেন আরেক ভারতী ব্যাটিং কিংবদন্তি সুনীল গাভাস্কারকে। সামনের বছর দ্বিতীয়বারের মতো পান রাজিব গান্ধী পুরস্কার। সেবারই ইতিহাসের পঞ্চম ব্যাটসম্যান হিসেবে টেস্টেও ১০ হাজারী রানের ক্লাবে প্রবেশ করেন শচীন।

২০০৬ সালে এসে ক্যারিয়ারের একমাত্র আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেন শচীন। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সেই ম্যাচে ১০ রান ও একটি উইকেট পান তিনি। পরের বছর চতুর্থ বিশ্বকাপ খেলেন তিনি; ওয়ানডেতে ছাড়িয়ে যান ১৫ হাজার রান। ২০০৮ সালে পান ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক পদ্মভূষণ। পাশাপাশি ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান কিংবদন্তি বায়ার্ন লারাকে ছাড়িয়ে হয়ে যান টেস্টেও সর্বোচ্চ রান সংগ্রহকারী ব্যাটসম্যান।

২০০৯ লন্ডনের মাদাম তুস্যো জাদুঘরে শচীন টেন্ডুলকারের মূর্তি স্থাপন করা হয়। ২০১০ সালে এসে প্রথমবারের মতো আইসিসি'র বর্ষসেরা ক্রিকেটারের পুরস্কার পান তিনি। এর পরের বছর এসে স্বপ্ন পূরণ হয় শচীন টেন্ডুলকারের। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দে ভাসার সুযোগ পান তিনি। এ বছরই পেরিয়ে যান টেস্টের ১৫ হাজার রানের মাইলফলক।

২০১২ সালে এশিয়া কাপে বাংলাদেশের বিপক্ষে ক্যারিয়ারে ১০০তম আন্তর্জাতিক সেঞ্চুরির দেখা পান শচীন। সেই টুর্নামেন্ট শেষেই ওয়ানডে ক্রিকেট না খেলার সিদ্ধান্তের কথা জানান তিনি। ২০১৩ সালে মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ টি-টোয়েন্টি খেলার মাঝপথে সব ধরনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ মিলিয়ে পঞ্চাশ হাজার রান করেন। এই বছরই সব ধরনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় বলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এর পরই প্রথম ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব হিসেবে ভারত রত্ন পাওয়ার গৌরব অর্জন করেন শচীন। আরেকটি বিস্ময় দিয়ে শেষ হয় মহানায়কের মহাকাব্যিক ক্যারিয়ার।

এই ক'দিন আগেই দিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবনে এনডিটিভি'র এক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে শচীন টেন্ডুলকার বলেছিলেন, 'ক্রিকেট আমাকে পরাজয়ে ভেঙে না পড়ে উঠে দাঁড়িয়ে আরেকটি চ্যালেঞ্জ গ্রহণের শিক্ষা দিয়েছে।'

ক্রিকেট নয়, ভক্তদের কাছে সেই শিক্ষক শচীন নিজেই!

কার্টুন এমএ কুদ্দুস

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, 'বিরোধীদল সরকারের বিরুদ্ধে নয়, জনগণের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
7 + 7 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
সেপ্টেম্বর - ২৩
ফজর৪:৩৩
যোহর১১:৫২
আসর৪:১৩
মাগরিব৫:৫৭
এশা৭:১০
সূর্যোদয় - ৫:৪৭সূর্যাস্ত - ০৫:৫২
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: ittefaq.adsection@yahoo.com, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: ittefaqpressrelease@gmail.com
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :