The Daily Ittefaq
ঢাকা, শুক্রবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৪, ৯ ফাল্গুন ১৪২০, ২০ রবিউস সানী ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ নাটোরে বাস-লেগুনা সংঘর্ষে নিহত ৩ | শাহ আমানতে সাড়ে ১০ কেজি সোনা আটক | একুশের প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন

একুশের চেতনায় সংকট

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ

এতই দুর্ভাগ্য আমাদের যে, বায়ান্নের পর ষাট বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে তবুও সর্বক্ষেত্রে বাংলা ভাষার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে আদালতকে নির্দেশ দিতে হচ্ছে। রক্তমূল্যে ভাষার দাবি আদায় করে বিশ্ববাসীকে চমকে দিয়েছিলেন আমাদের পূর্বসূরিরা। বলা হয় বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বলিষ্ঠ প্রেরণা। আর এর ভেতরগত শক্তি এত প্রবল ছিল যে, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের গৌরব অর্জন করেছে একুশে ফেব্রুয়ারি। কিন্তু ইতিহাস চর্চাবিমুখ আমরা এসব গৌরবের প্রণোদনা ছড়িয়ে দিতে পারছি না প্রজন্মের কাছে। তাদের কাছে স্পষ্ট হচ্ছে না মাতৃভাষার শক্তি আর সৌন্দর্য। ফলে ফিকে হয়ে যাচ্ছে একুশের তাত্পর্য। আর তাই পুনর্বার রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত থেকে নির্দেশনা জারি করে বলতে হয় দূতাবাস ও বিদেশি প্রতিষ্ঠান ছাড়া ইলেকট্রনিক মিডিয়াসহ গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন, গাড়ির নম্বরপ্লেট, সাইনবোর্ড, ব্যক্তিগত নামফলক এক মাসের মধ্যে বাংলায় লিখতে হবে।

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি রিট আবেদনের সূত্রে এই আদেশটি অভিনব নয়। কারণ ২৭ বছর আগে ১৯৮৭ সালে পাস হওয়া আইনে বলা হয়েছিল বাংলাদেশের সর্বত্র তথা সরকারি অফিস, আদালত, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানকে বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগের প্রয়োজন ছাড়া অন্য সকল ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা ব্যবহার করতে হবে। নথি ও চিঠিপত্র, আইন-আদালতের সওয়াল জবাব এবং অন্যান্য আইনানুগ কার্যাবলী অবশ্যই বাংলায় লিখতে হবে। উল্লিখিত কোনো কর্মস্থলে যদি কোনো ব্যক্তি বাংলা ভাষা ব্যতীত অন্য কোনো ভাষায় আবেদন বা আপিল করেন তবে তা বেআইনি ও অকার্যকর বলে গণ্য হবে। যদি কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী এই আইন অমান্য করেন তা হলে এই কাজের জন্য তিনি সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিল বিধির অধীনে অসদাচরণ করেছেন বলে গণ্য হবেন এবং তার বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

কিন্তু বাস্তবে আইন মানার তেমন লক্ষণ কোনো পক্ষের মধ্যেই দেখা যায়নি এবং এর প্রতিবিধানে রাষ্ট্র কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে তেমন শোনা যায়নি। একারণে আবার আদালতের শরণাপন্ন হতে হয়েছে এবং আদালত প্রায় অভিন্ন নির্দেশ জারি করেছে। আইনের প্রয়োগ না হওয়ার রেওয়াজ চালু থাকলে বিষয়টি অনেকটা গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। তাই উচ্চ আদালতের এই নির্দেশ আমার পড়া ১৮ ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত বেশ কয়েকটি জাতীয় দৈনিকের ভেতরের পাতায় ঠাঁই পেয়েছে। প্রথম পাতায় প্রকাশ করার জন্য ইত্তেফাককে ধন্যবাদ। আমাদের মনে হয় প্রকৃতপক্ষে একুশের চেতনাকে যদি আমরা অনুধাবন করতে না পারি এবং মানসিকতার পরিবর্তন না করতে পারি তবে শত আইন করেও বাংলা ভাষাকে যোগ্য মর্যাদার আসন দিতে পারবো না।

সতেরো শতকের কবি আবদুল হাকিম দেশপ্রেম আর আত্মোপলব্ধি থেকে যথার্থই বুঝেছিলেন মাতৃভাষার প্রতি যাদের ভালবাসা-শ্রদ্ধা নেই তাদের জন্ম পরিচয়ও প্রশ্নবিদ্ধ। অমন দূরাত্মাদের কবি দেশ ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বলেছেন। কবির ভাষায়—যে সব বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী/সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি দেশি ভাষা বিদ্যা যার মনে ন জুয়ায়/নিজ দেশ তেয়াগী কেন বিদেশ ন যায়

আজ আবদুল হাকিমের মতো দেশাত্মবোধে উদ্দীপ্ত কোনো কবি থাকলে বাংলা ভাষার মর্যাদাকে হেয় জ্ঞান করা, মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করা, বাংলাদেশে বাস করে দেশের অস্তিত্বকে প্রকারান্তরে অস্বীকার করা মানুষগুলোকে হয়ত এভাবেই ধিক্কার দিতেন।

ভাষাপ্রেমের সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশপ্রেম। সাধারণ সরল উক্তিতে বলা হয়, বায়ান্নতে ভাষা আন্দোলন হয়েছিল বলেই সেই চৈতন্য বাঙালিকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে সাহসী করেছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় পৃথিবীর অন্য কোনো দেশ যা পারেনি বাঙালি কেমন করে তা পারলো? রক্ত দিলো ভাষার জন্য! রক্তমূল্যে মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষার উদ্দীপনা সে পেলো কোথা থেকে? অর্থাত্ অমন মর্যাদার বায়ান্ন তৈরি হলো কেমন করে? ইতিহাসে ফিরে তাকালে এর উত্তর পাওয়া কঠিন নয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় মায়ের ভাষার জন্য মৃত্যুঞ্জয়ী হতে পারে শুধু বাঙালিই। আট শতকের সেই বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য-যাদের মাতৃভাষার পরিচয় অজ্ঞাত কিন্তু তারা বুঝেছিলেন এদেশের প্রাকৃতজনের কাছে বৌদ্ধ ধর্মের বাণী পৌঁছে দিতে হলে তাদের ভাষাতেই বলতে হবে। কিন্তু সে ভাষার লিখিত রূপ তো তৈরি হয়নি। তাই তারা অনেক মমতায় জন্ম দিলেন বাংলা সাহিত্যের ভ্রূণ শিশু চর্যাপদের। একই মনোভঙ্গি ছিল উনিশ শতকে খ্রিস্টান মিশনারিদের। উইলিয়াম কেরি বুঝেছিলেন এদেশে অশিক্ষিত অর্ধশিক্ষিত মানুষের সামনে ইংরেজিতে যিশুর বাণী প্রচারের মানে হয় না। তাদের মুখের ভাষায় ধর্ম প্রচার করতে হবে। এর বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বাংলা গদ্যের যাত্রা শুরু করিয়ে দিলেন এই ডাচ মিশনারি।

পাল যুগে আট থেকে দশ শতকে চর্যাপদ চর্চা এবং উনিশ শতকে বাংলা গদ্য সাহিত্যের বিকাশের মাঝখানে সাময়িক ছন্দপতন ঘটেছিল এগারো-বারো শতকে সেন রাজাদের শাসনকালে। সেনযুগে রাষ্ট্রযন্ত্রের বৈরী দৃষ্টিতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চা শুরুতে থমকে গিয়েছিল। সেনদের আচরণে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিকাশে ক্ষতি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু চৌদ্দ শতকে বহির্ভারতীয় অবাঙালি শাসক সুলতানরা সে সংকট ঘুচিয়ে দিলেন। তারা বাংলা সাহিত্যের বিকাশকে শুধু সমর্থনই দিলেন না, পৃষ্ঠপোষকতায় ভরিয়ে দিলেন। মঙ্গলকাব্য এবং পরবর্তী সময়ে বৈষ্ণব সাহিত্য এবং চৈতন্য চরিত কাব্যের মধ্যদিয়ে হিন্দু কবিরা বাংলা ভাষাকে বিশেষ মর্যাদার জায়গায় পৌঁছে দিয়েছিলেন। পিছিয়ে থাকলেন না মুসলমান কবিরাও। তারাও রোমান্টিক কাব্য, বীরগাঁথা ও জীবনী সাহিত্য রচনা করে বাংলা সাহিত্যকে বিশেষ অবস্থানে এনে দাঁড় করালেন। মোগল যুগে এসে যুক্ত হলো মর্সিয়া সাহিত্য আর বাউল সঙ্গীত।

এভাবে দীর্ঘকাল জুড়ে যে ভাষা শক্ত ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে দিগন্ত বিস্তারী হয়েছে তার উত্তরাধিকারীরা তো সে ভাষা নিয়ে অহংকার করবেই। কোথাকার কোন ভুঁইফোড় এসে মাটিতে শক্ত প্রথিত ভাষামূলে আঘাত করলে এই গর্বিত জাতি তা মানবে কেন! পাকিস্তানি শাসকদের সঙ্গে এদিক থেকে সেন শাসকদের মানসিক অবস্থানে ঘনিষ্ঠ মিল রয়েছে। এদের মনেও ছিল সেনদের মতো একধরনের ঔপনিবেশিকতা। ধর্ম ভিত্তিতে পাকিস্তানের জন্ম হলেও শাসকদের মনে ছিল শোষণ মানসিকতা। তাই সংস্কৃতি বোধে উজ্জ্বল বাঙালির প্রতি ভীতি তাদের ছিল। সেনদের মতো এরাও যথার্থ বুঝেছিল বাংলা ভাষাচর্চা বিচ্ছিন্ন করতে পারলে দেশপ্রেমের শক্তি হারাবে বাঙালি। সংস্কৃতিবোধহীন বাঙালিকে তখন নতজানু করা কঠিন কিছু হবে না। তাই সাতচল্লিশে পাকিস্তানের জন্মলগ্নেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে বিতর্ক তৈরি করে ফেলে। ইতিহাসবোধহীন স্থূল বিবেচনার পাকিস্তানি শাসকরা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চার দীর্ঘ ঐতিহ্যের শক্তিকে বিবেচনায় আনলো না। তারা কেড়ে নিতে চাইলো মুখের ভাষাকে। এ অবস্থায় ঐতিহ্যস্নাত বাঙালি স্বাভাবিকভাবেই রক্তমূল্যে ভাষার মর্যাদা রক্ষায় এগিয়ে আসে। তাই পূর্ব বাংলার বাঙালি বায়ান্নে ঐতিহ্য তৈরি করতে পেরেছিল। ভাষা যে দেশাত্মবোধে জাতিকে উদ্বুদ্ধ করে তার জ্বলন্ত প্রমাণ হলো ভাষা আন্দোলন। ধর্ম নিরপেক্ষ জাতীয়তাবোধ তৈরিতে ভাষা আন্দোলন ছিল একটি প্রেরণাদায়ী শক্তি। একুশে তাই আমাদের ঐতিহ্য—আমাদের সংস্কৃতির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আজ এই বড় সত্যটাকে আমরা আমাদের উপলব্ধি থেকে সরিয়ে দিয়েছি বলেই অপূর্ণ দেশাত্মবোধ আমাদের বিভ্রান্ত করছে। তাই আজ আদালতকেই নির্দেশ দেয়ার জন্য এগিয়ে আসতে হচ্ছে। মানতেই হবে একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির জীবনে—তার সংস্কৃতি ভাবনায় ভিন্ন আবেগ যুক্ত করেছিল। নতুন প্রজন্মকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে এবং বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করতে তাই মৌলিক আবেগ থেকে একুশে তর্পণের বিকল্প নেই। কিন্তু নাগরিক জীবনে একুশের আবেগকে খণ্ডিত করে ফেলা হয়েছে নানা উপায়ে।

লেখক :অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেছেন, 'উপজেলা নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি প্রমাণ করেছে শেখ হাসিনার অধীনে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
3 + 6 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
নভেম্বর - ১
ফজর৫:০৪
যোহর১১:৪৮
আসর৩:৩৫
মাগরিব৫:১৪
এশা৬:৩১
সূর্যোদয় - ৬:২৪সূর্যাস্ত - ০৫:০৯
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :