The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার, ১৪ এপ্রিল ২০১৪, ১ বৈশাখ ১৪২১, ১৩ জমাদিউস সানী ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ মিল্কি হত্যা মামলায় ১২ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট | বারডেমে চিকিৎসকদের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি | কালিয়াকৈরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৪ | তারেকের বক্তব্যে ভুল থাকলে প্রমাণ করুন : ফখরুল

বাঙালির মানব ধর্মের জয়গাথা

মৈমনসিংহ গীতিকার মহুয়া ও বাইদ্যানির গান

আমিনুর রহমান সুলতান

মৈমনসিংহ গীতিকায় যে-কাহিনী 'মহুয়া' হিসেবে সংকলিত তা 'কিস্সা' ও গীতিনাট্য এই দুটি পৃথক লোকজ ধারার আঙ্গিকে পরিবেশিত হয়ে আসছে। এ ছাড়াও ঠিক মহুয়ার পালা নয় মহুয়ার কিছু চরিত্র ও ঘটনার সাথে মিল রয়েছে এরকম কাহিনীর লোকনাট্য পালা 'বাইদ্যানির গান' বা 'বাইদ্যার গানের'ও পরিবেশনা রয়েছে বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে। কিন্তু 'বাইদ্যানির গান' বা 'বাইদ্যার গান'-এর সঙ্গে মহুয়ার পালার যে পাঠ তার মধ্যে বিস্তর অমিল রয়েছে। মহুয়ার কাহিনির মূল বক্তব্য এরকম: মহুয়া হুমরার মেয়ে হিসেবেই বেড়ে ওঠে। নইদ্যার ঠাকুরের বাড়িতে খেলা দেখাতে এসে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ঘটনাচক্রে মহুয়ার প্রেমে পাগল হয়ে মহুয়ার সন্ধানে বেরিয়ে যায় নদের চাঁদ। নতুন অতিথি হয়ে মহুয়ার আশ্রয় লাভ করে। হুমরা বেদে টের পেয়ে যায় নতুন অতিথি আর কেউ নয় নদের চাঁদ। হুমরা নদের চাঁদকে মহুয়ার মাধ্যমে হত্যা করার উদ্যোগী হয়ে একবার ব্যর্থ হলেও দ্বিতীয়বার সফল হয়। নদের চাঁদকে মারার জন্য মহুয়ার হাতে বিষলক্ষের ছুরি তুলে দিলে মহুয়া সে-ছুরি নিজের বুকে আঘাত করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। নদের চাঁদেরও প্রাণবধ করা হয়। হুমরার অনুতাপ প্রকাশের মধ্যদিয়ে কাহিনীর সমাপ্তি ঘটে।

লোকনাট্য পালার কাহিনীর মূল বক্তব্য মহুয়া পালার সাথে খুব একটা মিল নেই আগেই উল্লেখ করেছি। নাট্যপালার কাহিনী এরকম: অধর্ম ও ধর্মের মধ্যে দ্বন্দ্বযুদ্ধে রাজার দরবারে অধর্ম পরাজিত হলে অধর্ম রাজা অভিশপ্ত হন। রাজার জাত যাওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিষাপ অধর্মের কণ্ঠে উচ্চারিত হয়। তারপর বড় একটা উল্লম্ফন। উমরা বেদে ও তার স্ত্রী ভানুমতী স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্যে একটুকরো জমি খোঁজে। মোড়লের কাছে কাঙ্ক্ষিত জমি পেয়েও যায়। মোড়লের পরামর্শে নদের চাঁদের বাড়িতে খেলা দেখাতে গেলে নদের চাঁদ ও ভানুমতী পরকীয়ায় আটকা পড়ে। নদের চাঁদ একসময় ভানুমতীর প্রেমে পাগল হয়ে মোড়লের সহযোগিতায় ভানুমতীর বাড়িতে রাত কাটায়। শেষ রাতে তারা পালিয়ে যায়। উমরা বেদে তাদের খুঁজে বের করে দারোগার কাছে বিচারপ্রার্থী হয়।

বহুদিন আগে থেকেই বৃহত্তর ময়মনসিংহে দু'চার গ্রাম বাদেই বাইদ্যানির বা বাইদ্যার গানের দল গড়ে উঠেছিল। ছেলেরাই মেয়ে সেজে অভিনয় করতো। বর্তমানে বাইদ্যানির গানের দল নেই বললেই চলে। নাট্যপালাগুলো মুখে মুখে রচনা করতেন গ্রাম্য খেটেখাওয়া সাধারণ মানুষেরাই। সে ধারা এখনও কোথাও কোথাও অব্যাহত আছে। আর এ জন্যে যতো না কোনো আদর্শ, দর্শন কাজ করেছে তার চেয়ে অধিক কাজ করেছে বিনোদনটাই। বর্তমান ময়মনসিংহের নাট্যপালাগুলোর কোনোটিতেই ভানুমতী বা নইদ্যার ঠাকুরের মৃত্যু দেখানো হয়নি। নইদ্যার ঠাকুর ভানুমতীকে নিয়ে পালিয়ে যায় আবার ধরাও পড়ে। কিন্তু উমরা বাইদ্যা দারোগার কাছে বিচার প্রার্থী হলে—দারোগা যখন জানতে পারে ভানুমতী স্বেচ্ছায় নইদ্যার ঠাকুরের সঙ্গে পালিয়েছে তখন দারোগা নইদ্যা ঠাকুর বা মোড়লকে নির্দোষ সাব্যস্ত করে ছেড়ে দেয়। আর উমরার হাতে তুলে দেওয়া হয় ভানুমতীকে। মহুয়ার পালায় মহুয়া ও নদের চাঁদের মধ্যে যে প্রেম তা পরকীয়া নয়। অর্থাত্ মহুয়া ও নদের চাঁদ উভয়েই অবিবাহিত। মহুয়া হুমরা বেদের মেয়ে। আর বাইদ্যানি গানের পালায় উমরা ও ভানুমতী স্বামী-স্ত্রী। ভানুমতী বিবাহিতা। ভানুমতী ও নদের চাঁদের মধ্যে যে প্রেম তা পরকীয়া। কারণ ভানুমতী বিবাহিতা হলেও নাট্যপালায় নদের চাঁদ অবিবাহিত।

বৈষ্ণব-দর্শনের প্রভাব অর্থাত্ রাধাকৃষ্ণের পরকীয়া প্রেমকাহিনী লোকনাট্য-পালাকারের মনোজগতে কাজ করে থাকতে পারে বলে আমার ধারণা। কারণ মধ্যযুগে বৃহত্তর ময়মনসিংহে অনেক বৈষ্ণব আখড়া গড়ে উঠেছিল যা থেকে আমরা বলতে পারি এ অঞ্চলে বৈষ্ণবীয় ভাবধারার প্রভাব ছিল। মোড়ল চরিত্রটিকে মানুষের কাছে হাসির ও ভানুমতীর প্রতি প্রবল আকর্ষণ রয়েছে এমনভাবেই নাট্যপালায় তুলে ধরা হয়েছে যার মধ্যদিয়ে তত্কালীন লোলুপ, প্রতিপত্তিসম্পন্ন মোড়লদের চেহারা স্পষ্ট হয়ে ওঠে সমাজের কাছে। বাইদ্যা বা বাইদ্যানি গানের একাধিক পাঠ রয়েছে ময়মনসিংহের বিভিন্ন অঞ্চলে। যাঁরা লোকনাট্যপালা রচয়িতা তাঁরা আরেকটি বিশেষ দিকের প্রতি লক্ষ্য রেখেছিলেন। সেটা হচ্ছে—নিয়তি। অর্থাত্ মানুষ নিয়তির হাত থেকে বাঁচতে পারে না। তাই অধর্মের অভিশাপটাই ভানুমতী ও নদের চাঁদের চরিত্রে বড় হয়ে দেখা দেয়। নাট্যপালায় আরো একটি বিশেষ দিক রয়েছে যা ভূমির সাথে সম্পৃক্ত। বেদেরা ভূমিহীন। কিন্তু উমরা বেদে ভানুমতীর আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবায়িত করার চেষ্টা করে যায়—ভূমিকে আশ্রয় করে। নাট্যপালায় মোড়লের মাধ্যমে বাড়িঘরও হয়ে যায় উমরার ও ভানুমতীর। শুধু তাই নয়—জমি কেনা, জমিতে ঘর করা, আবার চাষের জন্যে গরু কেনা, জমি চাষ করা—এসব ভাবনাও এসেছে কৃষিজীবন থেকে। হয়তো গ্রামীণ জীবনের অর্থনীতির সাথে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করেছেন লোকনাট্যপালাকাররা।

মহুয়ার পালায় মহুয়া ও নদের চাঁদ পালিয়ে গিয়ে যখন সওদাগরের নৌকায় আশ্রয় গ্রহণ করে বা ভানুমতী সন্ন্যাসীর আখড়ায় খুঁজে পায় নদের চাঁদকে তখন সওদাগর ও সন্ন্যাসী উভয়েই মহুয়াকে কামনার দিক থেকে প্রত্যাশা করলে তারা নিজেকে রক্ষা করতে সমর্থ হয়। নারীর সতীত্বের দিকে দৃষ্টি রাখতে ভুল করেননি লোকনাট্য পালাকাররা। আবার প্রেমের মর্যাদা দিতে তারা কুণ্ঠাবোধ করেননি। নদের চাঁদ হিন্দু সমপ্রদায়ের হওয়া সত্ত্বেও তার সঙ্গে মুসলমান বাইদ্যানির ভানুমতির যে পরকীয়া প্রেম তাকে সমর্থন যুগিয়েছে। এক্ষেত্রে সমপ্রদায়গত বিভাজন নয় বাঙালির মানবপ্রেমই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। ভানুমতী চরিত্রটি ময়মনসিংহের বিভিন্ন অঞ্চলে বানান ভেদে বিভিন্ন রকম হলেও মূলত একটি নামকেই ধারণ করেছে। ঈশ্বরগঞ্জ অঞ্চলে 'বারমতী' এবং মুক্তাগাছা অঞ্চলে ভানমতী নামে পরিচিত। অঞ্চল ভেদে আঞ্চলিক উচ্চারণের প্রভাবে ভানুমতী বা বারমতী চরিত্রের নামকরণ যাই হোক না কেন প্রকৃত শব্দটি যে 'ভানুমতী' তাতে সংশয় নেই। 'ভানু' অর্থ কান্তি, আর ভানুমতী অর্থে সুন্দরী বা কান্তিমতী। তবে এখানে সুন্দরী অর্থে ভানুমতী নামটি গ্রহণ করেননি লোকনাট্যপালাকাররা। প্রায় একশো বছর আগে 'ভানুমতী' একটি বিদ্যা হিসেবে পরিচিত ছিল। যাকে ভানুমতীর ভেল্কি বা ভানুমতীর জাদু বলা হতো। শূন্যে রশি ধরে উঠা ভানুমতীর এক প্রসিদ্ধ খেলা ছিল। সুন্দরী ও জাদুকরী এই উভয় অর্থেই ভানুমতী বাইদ্যানির গানের বিনোদনের চরিত্র হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি জয়গাথা হিসেবে চিহ্নিত বাঙালির মানব ধর্মের।

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেছেন, 'দেশ আজ বন্ধুহীন হয়ে পড়েছে। এদেশে বিদেশিরা বিনিয়োগ করছে না'। আপনিও কি তাই মনে করেন?
2 + 1 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
সেপ্টেম্বর - ১৫
ফজর৪:২৮
যোহর১১:৫৪
আসর৪:২০
মাগরিব৬:০৬
এশা৭:১৯
সূর্যোদয় - ৫:৪৪সূর্যাস্ত - ০৬:০১
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :