The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৩, ০২ পৌষ ১৪২০, ১২ সফর ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ সাতক্ষীরায় যৌথ বাহিনীর অভিযানে নিহত ৫ | পেট্রোল বোমায় আহত অটোরিকশা চালকের মৃত্যু | আলোচনার মাধ্যমে সংবিধানের মধ্যে থেকে নির্বাচন : হানিফ | গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলনে জনগণের বিজয় হবে : ফখরুল | পরাজিত শক্তি জাতিকে বিভক্ত করতে তত্পর : তোফায়েল | আবার ৭২ ঘণ্টার অবরোধ | সিরিরায় বিমান হামলায় নিহত ২২ | চীনের জিনজিংয়াংয়ে সংঘর্ষে ২ পুলিশসহ নিহত ১৬

[মু ক্তি যু দ্ধ ]

মুক্তিযুদ্ধকে চিরঞ্জীব করুন

বিজয় দিবসের ভাবনা

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

বাঙালি বীরের জাতি। বাইরের কোনো শক্তি তাকে কখনো বেশিদিন দাবিয়ে রাখতে পারেনি। বিদেশি ও বিজাতীয় আধিপত্যকে সে বারংবার রুখে দাঁড়িয়েছে। বুকের রক্ত ঢেলে সে বিজয় ছিনিয়ে এনেছে। কিন্তু বাঙালির দুর্ভাগ্য— যে বিজয়কে সে রক্ত দিয়ে ছিনিয়ে আনতে জানে, সেই বিজয়কে সে ধরে রাখতে পারে না। বিজয় লাভ করেও বারবার সে পরাজিত হয়। পরাজিত হয়ে পুনর্বার তাকে নতুন করে বিজয় অর্জন করতে হয়। পাকিস্তানের যুগে বারবার এমনই ঘটেছে। একাত্তরে আমরা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও শ্রেষ্ঠ বিজয় অর্জন করতে পেরেছিলাম। কিন্তু সে বিজয়ও আমরা ধরে রাখতে পারিনি।

১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মধ্যদিয়ে আমরা দুই যুগের ধারাবাহিক সংগ্রাম ও নয় মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের অমর বিজয় গাঁথা রচনা করতে সক্ষম হয়েছিলাম। কিন্তু বিজয়ের সেই অমূল্য কীর্তিকে আমরা পূর্ণভাবে রক্ষা করতে পারিনি। যাত্রার শুরুতেই সঙ্গ নিয়েছিল পিছুটান। বিজয় সংহত করার কর্তব্যকে অবহেলা করে শুরু হয়েছিল আত্মস্বার্থের ও দলীয় স্বার্থের টানে পদস্খলনের পালা। সাড়ে তিন বছরের মাথায় ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মাধ্যমে সূচিত প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে উল্টোমুখি যাত্রা শুরু হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের অর্জনগুলো একে একে হাতছাড়া হতে শুরু করেছিল। দেশ নিপতিত হয়েছিল সামরিক স্বৈরশাসনের কবলে। পর পর দু'দুজন সামরিক জেনারেলের নেতৃত্বে দেড় দশক ধরে চলেছিল সেনা-শাসন অথবা বেসামরিক লেবাসে সামরিক স্বৈরশাসন।

মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে সাধিত প্রগতিশীল অর্জনগুলোর সিংহভাগ পঁচাত্তরে হরণ করা হয়েছিল। গণতন্ত্র-ধর্মনিরপেক্ষতা-জাতীয়তাবাদ-সমাজতন্ত্র—মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে প্রতিষ্ঠিত এই চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতি থেকে রাষ্ট্রকে সরিয়ে নিয়ে দেশে স্বৈরাচার, ধর্মীয় ও জাতিগত সাম্প্রদায়িকতা, সাম্রাজ্যবাদ নির্ভরতা ও 'মুক্তবাজার অর্থনীতির' অবাধ শোষণের ধারা ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। ফিরিয়ে আনা হয়েছিল 'পাকিস্তানি ধারার' প্রেতাত্মা। সেই প্রেতাত্মার পুনঃআবির্ভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারা আজ বহুলাংশেই নির্বাসিত।

জেনারেল জিয়ার শাসনের পর ১৯৮২ সালে আবির্ভাব ঘটে জেনারেল এরশাদের শাসনামলের। সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে জনরোষ পুঞ্জিভূত হতে হতে তা ১৯৯০ সালে গণবিস্ফোরণের রূপ নেয়। পতন ঘটে এরশাদের সামরিক স্বৈরশাসনের। শুরু হয় নির্বাচিত বেসামরিক সরকারের অধ্যায়। তারপর পার হয়েছে ২৩টি বছর। এই সময়কালের মধ্যে বিএনপির নেতৃত্বে ২ বার ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ২ বার সরকার প্রতিষ্ঠা হয়েছে। তাছাড়া সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২ বছর দেশ শাসন করেছে।

স্বৈরাচার বিরোধী সংগ্রামের অগণিত শহীদদের মধ্যে একজন ছিলেন শহীদ নূর হোসেন। বুকে ও পিঠে শ্লোগান লিখে সে রাজপথে স্বৈরাচার বিরোধী মিছিলে নেমেছিল। বুকে লেখা ছিল 'স্বৈরাচার নিপাত যাক', পিঠে লেখা ছিল 'গণতন্ত্র মুক্তি পাক'। কিন্তু আজও স্বৈরাচারী ব্যবস্থা কিংবা স্বৈরাচারী এরশাদ— কোনটারই নিপাত ঘটেনি। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার গণতন্ত্রায়ন ঘটেনি। সামরিক স্বৈরাচারী ব্যবস্থার স্থান নিয়েছে নির্বাচিত স্বৈরাচার। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা সর্বময় হওয়ায় একনায়ক সুলভ প্রবণতা অব্যাহত থেকেছে।

তৃণমূলে নির্বাচিত স্বশাসিত সংস্থার কর্তৃত্বের বদলে কায়েম হয়েছে 'এমপিতন্ত্র'। আমলাতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ আরো দৃৃঢ়মূল হয়েছে। ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার, নাগরিক অধিকার, মৌলিক অধিকার ইত্যাদি পদদলিত হয়ে চলেছে। নির্বাচন ব্যবস্থায় টাকার খেলা, পেশীশক্তির দাপট, প্রশাসনিক কারসাজি, সাম্প্রদায়িক প্রচারণা ইত্যাদি শুধু আগের মতো অব্যাহতই নেই— এসব বিকৃতি আরো বেড়েছে। দেশকে আজ আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কেন্দ্রিক দ্বি-দলীয় শক্তি বলয়ের আধিপত্যে আটকে ফেলা হয়েছে। দেশে লুটপাটের অর্থনীতি চলছে। লুটপাটের ভাগবাটোয়ারা নিয়ে দু'পক্ষের মধ্যে চলছে দ্বন্দ্ব-সংঘাত-হানাহানি। রাষ্ট্রক্ষমতা হয়ে উঠেছে লুটপাটের উত্স ভূমি। তাই, লুটপাটের উত্স রাষ্ট্র ক্ষমতার জন্য দু'পক্ষই উন্মাদ। নির্বাচনকালের বেপরোয়া সংঘাত-নৈরাজ্য হয়ে উঠেছে একটি 'মৌসুমী' রাজনৈতিক আপদ।

কোথায় হারিয়ে গেল নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী গণবিস্ফোরণের বিজয় সম্ভার? কোথায় গেল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-ধারা, প্রতিনিধিত্বশীল গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা, সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সব কালাকানুনের অবসান ইত্যাদি সম্পর্কে তিন জোটের রূপরেখায় প্রদত্ত প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন। কোথায় গেল 'এরশাদ, তার মন্ত্রী ও তার দলের নেতা-কর্মীদেরকে তিন জোটের কোনো জোটে বা দলে আশ্রয় দেয়া হবে না'— মর্মে জনসম্মুখে প্রদত্ত তিন জোটের সব দলের সম্মিলিত অঙ্গীকার? এরশাদকে দলে ভিড়ানোর প্রতিযোগিতায় দু'দলই এখন ব্যস্ত। 'নির্বাচনে অংশ নিবো না', 'মহাজোট ত্যাগ করলাম'— ইত্যাদি স্পষ্ট ঘোষণা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টির জন্য ৬০ সিট ছেড়ে দিয়ে বসে আছে। এরশাদ কর্তৃক মহাজোট ত্যাগ করার ও নির্বাচনে অংশ না নেয়ার ঘোষণাকে স্বাগত ও অভিনন্দন জানিয়ে বিএনপি বিবৃতি দিয়েছে এবং অনেক স্থানে গরু জবাই করে ভোজের ব্যবস্থা ও মিঠাই বিতরণ করেছে। কোথায় রইলো শহীদ নূর হোসেনের বুকে পিঠে লেখা 'স্বৈরাচার নিপাত যাক- গণতন্ত্র মুক্তি পাক' শ্লোগানের মর্যাদা? নব্বইয়ের সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামের অমূল্য বিজয়ের প্রায় সবটাই আজ হাতছাড়া।

মুক্তিযুদ্ধ ছিল ইতিহাসে বাঙালির শ্রেষ্ঠতম অর্জন। সে অর্জনের শ্রেষ্ঠত্ব কেবল ভৌগোলিকভাবে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সে অর্জনের তাত্পর্য আরো অনেক গভীর। পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে একাত্তরের সশস্ত্র সংগ্রাম 'পাকিস্তানকে দু'টুকরো করার' জন্য লড়াই ছিল না। তা কোন 'বিচ্ছিন্নতাবাদী' আন্দোলন ছিল না। তা ছিল 'জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম'-এর ধারায় পরিচালিত একটি লড়াই। পাকিস্তান ও আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদ পরিচালিত জাতিগত শোষণের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার লড়াই। পাশাপাশি এই লড়াই ছিল শ্রেণিগত শোষণ ও শ্রেণি বৈষম্যের হাত থেকে পরিত্রাণের জন্য গণমানুষের লড়াই। এটি ছিল একটি জনযুদ্ধ।

পাকিস্তানের একটি খণ্ডিত নবসংস্করণ প্রতিষ্ঠা করাটা মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ছিল না। 'ধর্মের ভিত্তিতে জাতি গঠিত হওয়ার মতবাদ'কে ভিত্তি করে হাজার মাইল দূরত্বে অবস্থিত পৃথক দু'টি অঞ্চল নিয়ে ভারত ভাগ করে পাকিস্তান রাষ্ট্রটি গঠিত হয়েছিল। পাকিস্তান সৃষ্টির লক্ষ্যে গৃহীত 'লাহোর প্রস্তাবে' পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলে 'একাধিক' রাষ্ট্রের সমন্বয়ে পাকিস্তান গঠনের পরিকল্পনা হাজির করা হয়েছিল। বলা হয়ে থাকে যে, জিন্নাহ সাহেব পরে বহুবচনবোধক 'একাধিক' শব্দটি পরিবর্তন করে অখণ্ড একক পাকিস্তান রাষ্ট্রের ধারণা চাপিয়ে দেন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে অনেকে 'লাহোর প্রস্তাবের বাস্তবায়ন' হিসেবে রূপায়িত করার চেষ্টা চালিয়েছেন। তাদের কথা অনুসারে, ধর্মের ভিত্তিতে জাতি গঠিত হয় এবং মুসলমানরা পৃথক জাতি— এই তত্ত্ব মেনে নিয়ে সেই ভিত্তিতে 'বাঙালি মুসলমানদের' জন্য একটি পৃথক রাষ্ট্র প্রয়োজন। এই মতবাদ দ্বারা আমাদের লড়াইয়ের চরিত্রকে চিত্রায়িত করার চেষ্টা হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধকে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলে বাঙালি মুসলমানদের জন্য 'পাকিস্তানের' অনুরূপে একটি স্বাধীন 'বাংলাস্থান' বা 'মুসলিম বাংলা' প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম বলে দেখানোর চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু এসবই ছিল মুক্তিযুদ্ধের মর্মবাণীকে আড়াল করে তার উপর পাকিস্তানি ভূত চাপিয়ে দেয়ার প্রয়াস মাত্র।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল পাকিস্তানের 'মানচিত্র' ও 'মতবাদ' উভয় বিষয়কে নেতিকরণের (negation) জন্য একটি আন্দোলন-লড়াই। পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙ্গে বেরিয়ে এসে নতুন একটি রাষ্ট্রীয় বাস্তবতাকে রূপ দেয়ার পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধ পাকিস্তানের কৃত্রিম ও প্রতিক্রিয়াশীল ভাবাদর্শ ও ব্যবস্থা নাকচ করে ভিন্ন ধরনের চরিত্র সম্পন্ন একটি রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছিল। পাকিস্তানি ভাবাদর্শগত ও ব্যবস্থাগত বৈশিষ্ট্যের সাথে 'ছেদ' ঘটিয়ে জন্ম নিয়েছিল বাংলাদেশ এবং সূচিত হয়েছিল তার নতুন যাত্রাপথ।

এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় সব সময়ই একই সাথে একটি 'ছেদ' (discontinuity) ও সাথে সাথে একটি 'অ-ছেদ' (continuity) পাশাপাশি বিরাজ করে। গুণগত রূপান্তরের সময় মৌলিক উপাদানগুলোতে 'ছেদ'-এর থাকে প্রাধান্য। কিন্তু বিবর্তনের প্রক্রিয়ার সময় 'অ-ছেদ' -এর ধারাই হয় প্রধান। বাংলাদেশের জন্ম চরিত্রগতভাবে ছিল পাকিস্তান থেকে 'ছেদ'-এর একটি প্রক্রিয়া। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র নির্মাণের সময় সেই 'ছেদ'-এর বিষয়টি সবক্ষেত্রে প্রাধান্য না পেয়ে 'অ-ছেদ'-এর ধারা প্রাধান্য লাভ করে। আইন-কানুন, প্রশাসন-আমলাতন্ত্র, বিধি-ব্যবস্থা ইত্যাদি ক্ষেত্রে চলতে থাকে পরিত্যক্ত পাকিস্তানি ব্যবস্থা (যার একটি প্রধান অংশ আবার বৃটিশ শাসনকালের ধারাবাহিকতা হিসেবে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত)। অথচ '৭২ সালে দেশের সংবিধান রচিত হয় মুক্তিযুদ্ধের প্রগতিমুখীন চেতনা ও ধারার ভিত্তিতে। মুক্তিযুদ্ধোত্তর কালের দ্বন্দ্বের প্রধান উত্স হলো এই 'ছেদ' ও 'অ-ছেদ'-এর মধ্যে উপযুক্ত ভারসাম্য স্থাপনে ত্রুটি। 'ছেদ'-এর চেয়ে 'অ-ছেদ' কে গুরুত্ব দেয়া হয় বেশি। ফলে পুরনো ব্যবস্থা ও ভাবাদর্শ ক্রমেই প্রাধান্য বিস্তার করতে শুরু করে। পুরনো ব্যবস্থা ও ভাবধারার সুবিধা হলো এখানেই যে সে 'চলতি হাওয়ার' সুবিধা পায়। সেই সুবিধাকে নাকচ করে নতুনের আবাহন নিশ্চিত করতে তাই প্রয়োজন হয় 'ছেদ'-এর শক্তিশালী ধারাবাহিক ও সুদৃঢ় সচেতন প্রয়াস। কিন্তু স্বাধীন দেশে সে সব প্রাতিষ্ঠানিক, আইনগত, ব্যবস্থাগত, সাংস্কৃতিক-সামাজিক-চেতনাগত কাজকে বাস্তবায়ন করা হয়নি।

এভাবে সুদূরপ্রসারী ও গভীরতাসম্পন্ন চিন্তা ও কর্মসম্পাদনের জন্য মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ছিল অক্ষম। শ্রেণিগত দুর্বলতার কারণেই এটি তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। অর্থনৈতিক-সামাজিক মুক্তির পথে দেশকে এগিয়ে নিতে মধ্যস্তরের নেতৃত্বে পরিচালিত সে দল আওয়ামী লীগ সক্ষম হয়নি। তার নানা সীমাবদ্ধতা, ত্রুটি-বিচ্যুতির সুযোগ নিয়ে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি ষড়যন্ত্র চালাতে ও আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে। দেশকে তারা উল্টোমুখী পথে নিয়ে যেতে পেরেছে। বিএনপি ও জাতীয় পার্টি ক্ষমতায় বসে সেই পথকে স্থায়িত্ব দেয়ার চেষ্টা করেছে। জামায়াতে ইসলামী প্রমুখ স্বাধীনতাবিরোধী উগ্র সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিস্ট দল ও শক্তি দেশকে পুরোপুরি 'নয়া পাকিস্তানে' পরিণত করার জন্য সক্রিয় হয়েছে। আওয়ামী লীগ এই জামায়াতী বিপদকে মোকাবেলার কর্তব্যকে গুরুত্ব দেয়নি। ক্ষমতার অঙ্ক মেলানোর জন্য কখনো কখনো তার সাথে সে 'কৌশলগত ঐক্য' করেছে। এভাবে নানা মহলের মদদ পেয়ে তারা আজ বিপজ্জনক শক্তি হয়ে উঠেছে। বিজয়ের শেষ চিহ্নগুলোকেও ছিনিয়ে নিতে তারা মরিয়া তত্পরতা চালাচ্ছে।

আওয়ামী লীগ দু'দুবার ক্ষমতায় আসতে পারলেও আজও দেশকে মুক্তিযুদ্ধের ধারায় পরিপূর্ণভাবে ফিরিয়ে আনতে পারেনি। সংবিধানে 'ধর্মনিরপেক্ষতা' ফিরিয়ে আনলেও এরশাদের 'রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম'-এর বিধান ও জিয়াউর রহমানের 'বিসমিল্লাহ... ' বহাল রেখেছে (যা কিনা আবার কখনো কোনভাবে পরিবর্তন করা যাবে না বলে সংবিধানের অন্য এক ধারা দ্বারা চিরস্থায়ী করে দিয়েছেন। সংবিধানে 'সমাজতন্ত্র' লিখে রাখলেও সে পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়ন, খোলাবাজার, পুঁজিবাদের নয়া উদারবাদী নীতি, বিনিয়ন্ত্রণ, উদারিকরণ ইত্যাদির পথ অনুসরণ করছে। ফলে শোষণ-বৈষম্য বাড়ছে। গরিব মানুষের জীবনে অসহায়ত্ব ও দুর্গতি বাড়ছে। 'জাতীয়তাবাদ' লিখে রাখা সত্ত্বেও নানা চুক্তি স্বাক্ষর করে দেশকে স্থায়ীভাবে সাম্রাজ্যবাদের শিকলে বেঁধে ফেলে জাতীয় স্বাধীনতা-স্বার্বভৌমত্বকে ভূলুণ্ঠিত করেছে। 'গণতন্ত্র'-এর কথা বললেও জনগণের ক্ষমতায়নের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সুদৃঢ় করার বদলে ব্যক্তিগত কর্তৃত্ব, পরিবারতন্ত্র, দলতন্ত্র, গোষ্ঠীতন্ত্র ও আমলাতন্ত্রের থাবার নিচে গণতন্ত্রকে পিষ্ট করা হচ্ছে। কোথায় রইল একাত্তরের বিজয়?

বিজয় আনতে পারলেও, সে বিজয় যে রক্ষা করা যাবে তা নিশ্চিত হয়ে যায় না। বিজয় আনতে যে দল ও শ্রেণি নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হয়েছিল, তাদের পক্ষে তা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় রক্ষা করা যে সম্ভব হয়নি— বাংলাদেশের ঘটনাবলী সেই অভিজ্ঞতাই তুলে ধরে। বিজয় অর্জন ও একই সাথে তার সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হলে ভিন্ন ধরনের দল ও শ্রেণির নেতৃত্ব প্রয়োজন। দেশবাসী বিজয় অর্জন করে এবার তা আর হারাতে চায় না। বিজয়কে চিরস্থায়ী করতে চায়। তাই, এবার দেখতে হবে যেন বিজয় অর্জনের পাশাপাশি সে বিজয় ধরে রাখার ব্যবস্থাও নিশ্চিত থাকে। সেজন্য দেশের বামপন্থী শক্তি ও শ্রমজীবী মানুষকে দায়িত্ব নিতে হবে।

লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি- সিপিবি

E-mail : [email protected]

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মো. নাসিম বলেছেন, 'বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হওয়া সুখবর না হলেও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে নির্বাচন করতে হচ্ছে'। আপনিও কি তাই মনে করেন?
2 + 1 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
অক্টোবর - ১৮
ফজর৪:৪১
যোহর১১:৪৪
আসর৩:৫২
মাগরিব৫:৩৪
এশা৬:৪৫
সূর্যোদয় - ৫:৫৭সূর্যাস্ত - ০৫:২৯
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :