The Daily Ittefaq
ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩১ ডিসেম্বর ২০১৩, ১৭ পৌষ ১৪২০, ২৭ সফর ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান এম মোরশেদ খানের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা | ৩ জানুয়ারি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

মৃত্যুফাঁদ মুক্ত বাংলাদেশ চাই

ড. রকিবুল হাসান

দেশের মানুষকে জিম্মি করে, দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে, শিক্ষা ব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলে যে রাজনীতি, সে রাজনীতি কিসের রাজনীতি—কার স্বার্থে রাজনীতি? রাজনীতি যদি হয় ব্যক্তির স্বার্থে বা ব্যক্তির ইচ্ছে পূরণের অস্ত্র, অথবা দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের মূল লক্ষ্য—তখন সেই রাজনীতিকে সুস্থ হিসেবে অভিহিত করা যায় না। আমরা জানি রাজনীতি দেশের উন্নতির জন্য, মানুষের কল্যাণের জন্য। দেশ এবং দেশের মানুষ যখন রাজনীতির কাছে জিম্মি হয়ে যায়, তখন রাজনীতির সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন তো তোলা যেতেই পারে। এমনকি এ ধরনের রাজনীতির বিপক্ষে বুক উঁচিয়ে দাঁড়ানোও বোধহয় নৈতিক দায়িত্বের ভেতর চলে আসে। আমরা সাধারণ মানুষ কিভাবে বেঁচে আছি, কিভাবে কতোটা অর্থনৈতিক সঙ্কটের মুখোমুখি আমরা দাঁড়িয়ে গেছি, প্রতিদিন কী ভয়ঙ্কর মৃত্যু-আতঙ্ক নিয়ে আমাদের ঘর থেকে বেরুতে হয়— সে হিসেব কী কেউ রাখছেন? কখন কে কোথায় পুড়বে, কখন কে কোথায় মরবে—স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা আমরা এখন একদমই পাচ্ছি না। ঘর থেকে বেরুনোর সময় বউ-বাচ্চার মুখটি ভালো করে দেখে যাচ্ছি, যদি আর দেখা না হয়! অফিস থেকে বেরুনোর সময় প্রিয় সহকর্মীদের কাছে এমনভাবে বিদায় নিতে হচ্ছে আগামীকাল অফিসে আসার নিশ্চয়তা কোথায়! বর্তমান এ প্রেক্ষিতে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা কঠিনের থেকে কঠিন হয়ে পড়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে দেশ হরতাল ও অবরোধের কবলে পতিত। নির্বাচন বাতিল করার জন্য এসব কর্মসূচি দেয়া হচ্ছে। নির্বাচন হওয়া না-হওয়া নিয়ে নানা মত আছে—নানারকম বক্তৃতা আছে। পক্ষে-বিপক্ষে বলছেন যে যার মতো, যে যার রাজনৈতিক-আদর্শের জায়গা থেকে। কিন্তু সবকিছুই চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে খেটে-খাওয়া সাধারণ মানুষের উপর। অনাহার-অর্ধাহার পুড়ে অঙ্গার হওয়া- সবই সাধারণ মানুষের জন্যে। এদেশের মানুষ আর কতোবার প্রাণ দিবে? স্বাধীনতা যুদ্ধে যে রক্ত কান্না লাশ সম্ভ্রমের মহাকাব্য রচনা করে এ দেশে বিজয়ের পতাকা আকাশে উড়ানো হলো, তখন কী আমরা ভুল করেও কেউ ভেবেছিলাম, স্বাধীন সার্বভৌম একটি দেশে প্রতিদিন নতুন নতুন মৃত্যুফাঁদে আমাদের আটকে ফেলা হবে— আমরাই আমাদের অর্থনীতির চাকাকে উল্টো পথে ঘুরিয়ে ক্রমশ পশ্চাত্পদ একটি দেশে পরিণত করে ফেলবো আমাদেরই প্রিয় বাংলাদেশ? কে কবে আমরা ভেবেছিলাম, এ দেশে রাজাকারের হাতে পতাকা উঠবে গণতন্ত্র রক্ষার অজুহাতে? স্বাধীনতা-বিরোধীদের হাতে পতাকা তুলে দিয়ে গণতন্ত্র রক্ষার অভিযাত্রা হয় কিভাবে? রক্ত কান্না লাশ সম্ভ্রমে কেনা প্রিয় দেশের সাথে পরিহাস নয়? এ কেমন দুঃসহ সময় জগদ্দল পাথরের মতো জাতির ঘাড়ে চেপে বসেছে?

আমরা পরিষ্কারভাবে দেখতে পাচ্ছি আমাদের সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। বাঁচার অধিকার হারিয়ে ফেলছি আমরা সাধারণ মানুষ। শিল্প-প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ব্যবসা-বাণিজ্যহীন হয়ে পড়ছে এ দেশ। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিকপক্ষ কর্মচারিদের নিয়মিত বেতন পরিশোধ করতে পারছেন না। কল-কারখানার চাকা ঘুরছে না। কর্মচারিরা চাকরিচ্যুত হতে বাধ্য হচ্ছে। উত্পাদিত পণ্য সরবরাহ করা যাচ্ছে না। ব্যবসায়ীদের ক্ষোভ-কষ্ট-কান্না এসবের কোন মূল্য বহন করছে না। আমাদের দেশের প্রধান শিল্পখাত পোশাক শিল্প। সে খাতটি এখন ধ্বংস হতে বসেছে। বিদেশিরা আমাদের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। জ্বালাও-পোড়াও-এর কবলে পড়তে চান না। তারা অন্যান্য দেশের দিকে ঝুঁকছেন। একবার ভেবে দেখুন, দেশের পোশাক শিল্প যদি ধ্বংস হয়ে যায়, আমাদের অর্থনীতির কী হাল হবে। কতো লাখ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়বে। বেকারত্বের অভিশাপে দেশ তখন কোথায় দাঁড়াবে? কী সম্ভাবনাময় একটি শিল্প আবাসন শিল্প। গোটা দেশের অর্থনীতির চেহারা পাল্টে দিতে শুরু করেছিল, সেই আবাসন শিল্পেও করুণ অবস্থা বিরাজ করছে। এভাবে প্রত্যেকটি শিল্পখাত ধরে ধরে বলা যায় দেশের অর্থনীতি একদম ভালো নেই। একটি দেশের যদি অথনৈতিক অবস্থাই ভেঙে যায়, তাহলে আমরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াবো কিভাবে? যারা দিন আনে দিন খায়—এদেশের তাদের বেঁচে থাকা ভয়ঙ্কর কঠিন হয়ে পড়েছে। অনাহার-অর্ধাহারে জীবন চলছে। বাধ্য হয়েই ঘরের বাইরে বেরুচ্ছে—তারা জানে চারিদিকে ওত পেতে আছে মৃত্যু। মৃত্যুর পয়গাম বুকে নিয়েই একমুঠো ভাতের জন্যে ঘর থেকে বেরুচ্ছে তারা। এদের বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা দিচ্ছে না কেউই। কিন্তু রাজনীতিতো এদের জন্যেই, এসব সাধারণ মানুষের জন্যেই— তাহলে এদেশটি ক্ষুধার রাজ্য আর মৃত্যুপুরিতে কেন পরিণত হচ্ছে? কেন থাকছে না স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা। মানুষকে তো হত্যা করা হচ্ছেই, সেইসাথে নির্বোধ পশুও রক্ষা পাচ্ছে না, রক্ষা পাচ্ছে না বৃক্ষ-লতাপাতাও।

এ কেমন পৈশাচিকতা! রাজনীতির এ কেমন নিষ্ঠুর খেলা! দেশের প্রতি দেশের মানুষের প্রতি ন্যূনতম ভালোবাসাও কি নেই? এই যে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নিয়ে যে-খেলাটা খেলা হলো- এটি কোনো বিবেকবান মানুষ করতে পারে? দেশের কোন বাচ্চা সুস্থ চিন্তা নিয়ে একটি দিনও পরীক্ষা দিতে পারেনি। ভয় আতঙ্ক অনিশ্চয়তা নিয়ে তাদের সময় কেটেছে, এখনো তা থেকে তারা বেরুতে পারেনি। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ পরীক্ষা সম্পন্ন করতে পারেনি। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চিত্রও তো এর বাইরের কিছু নয়, একই।

একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এভাবে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে কার স্বার্থে কোন কল্যাণে এসব অবরোধ হরতাল? গণতান্ত্রিক একটি দেশের বাসিন্দা বলে আমরা গর্ব করি। এখানে কি কোন গণতন্ত্র চর্চা আছে? আমরা কি আদৌ গণতন্ত্র চর্চার মানসিকতা লালন করি। ক'দিন পরেই যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, সে নির্বাচন নিয়েও সাধারণ মানুষের মধ্যে কোনরকমের স্বতস্ফূর্ততা নেই। এ সবের জন্য দায়ী হরতাল, অবরোধ। বিরোধী দল কী চায় তাও স্পষ্ট নয়। আসলে তারা কী চায়? তবে তারা যা চায় তা দুপুরের রোদের মতো পরিষ্কার। আমরা সাধারণ মানুষ বুঝেও অনেক কিছুই বুঝি না। রাজনীতির জিলাপি প্যাঁচের মারপ্যাঁচের জটিল কথা বুঝি না। আমরা কাজ করে দু'বেলা দু'মুঠো ভাত খেতে চাই। সন্তানদের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। এদেশে প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিয়ে বাঁচতে চাই। স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা চাই। আমরা মৃত্যুফাঁদ মুক্ত বাংলাদেশ চাই। আমরা মুগ্ধ চোখে দেখতে চাই, আমাদের অনেক রক্তে কেনা এদেশটি সবধরনের নৈরাজ্য, পৈশাচিকতা ও অনিশ্চয়তা থেকে বের হয়ে একটি সুন্দর সম্ভাবনাময় আগামীর দিকে হাঁটছে।

লেখক:বাংলা বিভাগ, উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, 'বিরোধীদল সরকারের বিরুদ্ধে নয়, জনগণের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
6 + 7 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
জুলাই - ১২
ফজর৩:৫২
যোহর১২:০৪
আসর৪:৪৪
মাগরিব৬:৫২
এশা৮:১৫
সূর্যোদয় - ৫:১৯সূর্যাস্ত - ০৬:৪৭
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :