The Daily Ittefaq
ঢাকা, শনিবার, ৫ জানুয়ারি ২০১৩, ২২ পৌষ ১৪১৯, ২২ সফর ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ 'যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি সুবিধার বিষয়টি বিবেচনা করবে' | নারী শিবির সন্দেহে আটক ৭ | তাজরীনের মালিককে গ্রেফতারের দাবি | রাজধানীতে ১২টি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ | মালালাকে সম্মাননা জানাতে মার্কিন কংগ্রেসে বিল উত্থাপন | 'চুরি ও দুর্নীতির কারণেই বাড়াতে হয়েছে তেলের দাম' | দিল্লিতে গণধর্ষণ : ঘটনার বর্ণনা দিলেন মেয়েটির বন্ধু

ইলিয়াস গুম :সিলেটে সংসদ নির্বাচনের বড় ইস্যু হতে পারে

হুমায়ূন রশিদ চৌধূরী, সিলেট অফিস

বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি সাবেক এমপি এম. ইলিয়াস আলী 'গুম' রয়েছেন প্রায় সাড়ে ৮ মাস । একইসঙ্গে গুম হয়েছেন তার গাড়ি চালক আনসার আলী। কিন্তু আজো কেউ তাদের সন্ধান দিতে পারছে না। এমনকি সরকারের গোয়েন্দারাও কোন তথ্য দিতে পারেনি। বিষয়টি আগেই জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। তবে বৃহত্তর সিলেটে তার সমর্থক, শুভানুধ্যায়ীরা বিশ্বাস করেন, ইলিয়াস আলী আবার ফিরে আসবেন তাদের মাঝে।

ইলিয়াস আলীকে কারা গুম করেছে, কেন করেছে, কোথায় কে তাকে আটকে রেখেছে—এসব প্রশ্নের কোন উত্তর কারো জানা নেই। সিলেটের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সাথে আলাপকালে তারা জানান, ইলিয়াস 'গুম'-এর ঘটনা আগামী সংসদ নির্বাচনে তার নির্বাচনী এলাকায়তো বটেই, বৃহত্তর সিলেটসহ সারা দেশেই ব্যাপক প্রভাব পড়বে। বিরোধী দল সরকারের বিভিন্ন ব্যর্থতার সাথে ইলিয়াস ইস্যুকে বেশ বড় করে তুলে ধরবে। আর এজন্য সিলেট ও বিশ্বনাথে ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। ইলিয়াস আলীকে ফিরে পেতে আন্দোলন অব্যাহত আছে জানিয়ে বিশ্বনাথ উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক আব্দুল হাই ইত্তেফাককে বলেন, 'আন্দোলন আরো জোরদার করা হবে, ইলিয়াস গণমানুষের নেতা তাকে কেউ গুম করে রেহাই পাবে না।

বিশ্বনাথ এলাকার অনেকের সাথে কথা বলে জানা যায়, ইলিয়াস 'গুম' হওয়ার আগে যত না জনপ্রিয় ছিলেন এখন তার জনপ্রিয়তা আরো বেড়েছে। বিশ্বনাথের মানুষ তাকে ফিরে পাওয়ার ইস্যুতে এক। এমনকি সরকারি দলের মাঝারি পর্যায়ের নেতারাও বিষয়টি নিয়ে বিব্রত। তারাও মনে করেন, এভাবে একটি মানুষ 'গুম' বা 'নিখোঁজ' হতে পারে না। আর এর রহস্য উদ্ঘাটন অথবা উদ্ধার করতে না পারাটা সরকারের ব্যর্থতা। বিশ্বনাথ-বালাগঞ্জের সাবেক এমপি ইলিয়াস নিখোঁজের ঘটনা 'আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও দারুণ প্রভাব ফেলবে'— এমন মন্তব্য করে বিভিন্ন পত্রিকার মিডিয়া কর্মীরা বলেন, বিএনপি ঘরানার নেতা-কর্মীরা ইলিয়াছের বিকল্প কে তা বলতে চান না। তাদের বিশ্বাস ইলিয়াস ফিরে আসবেনই।

গত বছর ১৭ এপ্রিল গভীর রাতে ঢাকার বাসায় ফেরার পথে ইলিয়াস ও তার গাড়ির ড্রাইভার আনসার আলী নিখোঁজ হন। গাড়িটি পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। পরে ঢাকার গুলশান থানায় এ ব্যাপারে একটি মামলা দায়ের হয়। কিন্তু এর কোন অগ্রগতি নেই।

এদিকে তার মা সূর্যবান বিবি আজো তার সন্তানের পথ চেয়ে বসে আছেন। সূর্যবান বিবির চোখের পানিও যেন গত ক'মাসে শুকিয়ে গেছে। শুধু এখন বুকভরে দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন। আর জায়নামাজে বসে আহাজারী করেন আল্লাহর কাছে। কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করলে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন।

কেমন আছেন প্রশ্নের জবাবে কান্নাজড়িত কণ্ঠে উনি বলেন, আমার ইলিয়াসকে ফিরাইয়া দেইন, তারে দেইখা যেন মরতে পারি, এই বলে তিনি দেয়ালে টানিয়ে রাখা ইলিয়াসের একটি বিশাল ফটোর দিকে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নিকট বলেছি, তারে আইন্না দিতে। হাসিনাও স্বজনহারাদের বেদনা বুঝইন। অন্যদিকে ঢাকায় সিলেট হাউজে বসবাসরত তার স্ত্রী তাহসিনা রুসদি লোনা, দুই পুত্র আবরার ইলিয়াস অর্নব, লাবিব শারার ও কন্যা ছাইয়ারা নাওয়াল শুধুই পথ চেয়ে আছেন।

ইলিয়াস নিখোঁজ ইস্যুকে কেন্দ করে বিএনপি সিলেটসহ সারা দেশে টানা হরতাল কর্মসূচি পালন করেছে। এখনো বিশেষ করে বিভিন্ন কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। নিখোঁজ হওয়ার পর ইলিয়াসের নিজ এলাকা বিশ্বনাথে ২৩ এপ্রিল হরতাল চলাকালে পুলিশের সাথে বিএনপি সমর্থকদের সংঘর্ষের সময় পুলিশের গুলিতে নিহত হয় ছাত্রদল ও যুবদলের ৩ জন। একে কেন্দ করে বিশ্বনাথে সরকারি গাড়ি, অফিস, মূল্যবান কাগজ ও আসবাবপত্র পুড়িয়ে দেয়া হয়। একইভাবে রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে ঘটেছে সহিংস ঘটনা। বিরোধী দল ইলিয়াস 'গুমে'র ঘটনায় সরকারকে দায়ি করেছে। সরকার এ অভিযোগ নাকচ করে বলেছে, এতে বিএনপি নিজেই জড়িত থাকতে পারে।

গত বছর মে মাসে বৃটিশ মন্ত্রী এ্যলিস্টার বার্ট বাংলাদেশ সফরকালে ইলিয়াস নিখোঁজের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি এ বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত ও স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রদানের জন্য সরকারকে অনুরোধ জানান। কিন্তু দীর্ঘ সাড়ে ৮ মাস অতিক্রম হতে যাচ্ছে ইলিয়াস আলীর কোন সন্ধান নেই। মহানগর বিএনপির সভাপতি এম.এ. হক ইত্তেফাককে বলেন, সরকার ইলিয়াসকে ফিরিয়ে না দিলে পরিণতি হবে ভয়াবহ।

এদিকে ইলিয়াস আলীর ঘনিষ্ঠ ছাত্রদল নেতা নিখোঁজ ইফতেখার আহমদ দিনারের স্ত্রী প্রিন্সিলার (পিংকির) দায়েরকৃত মামলার পর সিলেট বিএনপির অবস্থা হয় লেজেগোবরে। পিংকি তার স্বামী নিখোঁজের ঘটনার জন্য দায়ি করে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা এডভোকেট সামসুজ্জামান জামানকেসহ ৯ জনকে আসামি করে ঢাকা উত্তরা থানায় মামলা করলে সিলেট বিএনপিতে তোলপাড় শুরু হয়। প্রকাশ্য রূপ নেয় বিএনপির বিভাজন। জামান সিলেট বিএনপির আরেক প্রভাবশালী নেতা। তার অনুসারীরা দিনারের শ্বশুর সিলেট জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট আব্দুল গফফারকে ও সাংগঠনিক সম্পাদক আলী আহমদকে 'সরকারের এজেন্ট' আখ্যায়িত করে সাংবাদিক সম্মেলন করেন। পরে জেলা ও মহানগর ছাত্রদল আরেকটি পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করে এ দুই নেতার অবদান ও ত্যাগের কথা তুলে ধরে প্রতিপক্ষকে কড়া জবাব দেয়। এরকম ঘোলাটে পরিস্থিতিতে খোদ দলের কেন্দ্রীয় নেতারাও বিব্রত হন। পরে কেন্দ থেকেই বিষয়টিকে চাপা দেয়া হয়। উল্লেখ্য, গত বছর ৩ এপ্রিল দিনার ও তার বন্ধু জুনেদ ঢাকা থেকে নিখোঁজ হন।

বিএনপি নেতা সাবেক অর্থমন্ত্রী এম.সাইফুর রহমান জীবিত থাকাবস্থায় ইলিয়াস আলী সিলেটে নেতৃত্বের প্রশ্নে বিপক্ষে অবস্থান নেন। তখন অনেক ঘটনা ঘটে বিএনপি শিবিরে। সাইফুর রহমানের মৃত্যুর পর সিলেটে নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন ইলিয়াস আলীও। ঘরে-বাইরে দলের বিবাদে তিনি ছিলেন অনেকটা বিপর্যস্ত। নিজের ঘরে তুষের আগুন জ্বলছিল। ছাত্রদল কর্মী মাহমুদ হোসেন শওকত হত্যার ঘটনায় ইলিয়াসের নিজ বলয়ে দেখা দেয় অস্থিরতা। সেই অস্থিরতা সামাল দিতে ইলিয়াস আলীকে হিমশিম খেতে হয়।

কিন্তু ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হওয়ায় গোটা চিত্র পাল্টে যায়। যাদের বিরোধিতার মুখে ছিলেন ইলিয়াস আলী তারা এখন ইলিয়াস আলীর সন্ধানের দাবিতে মাঠে তত্পর। তাদের এখন একটাই দাবি, আমরা ইলিয়াস আলীসহ অন্যদের সন্ধান চাই।

সাইফুর রহমান মারা যাওয়ার পরও তার অনুসারীরা বিভক্তভাবেই দলীয় কার্যক্রম চালিয়ে যান। একপর্যায়ে হাল ধরেন বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক, যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি কমর উদ্দিন। সিলেটে এ গ্রুপটির নেতৃত্ব দেন আবুল কাহার শামীম ও ডা. শাহরিয়ার হোসেন চৌধুরী। এরই মধ্যে জেলা ও মহানগর বিএনপির কমিটি ভেঙে নতুন আহ্বায়ক কমিটি করা হয়। ডা. শাহরিয়ার হোসেন চৌধুরী মহানগর বিএনপির আহ্বায়কের দায়িত্ব পান।

২০১০ সালের ৫ নভেম্বর সাবেক জেলা সভাপতি এম এ হককে মহানগর কমিটির সভাপতি করে নতুন কমিটি হয়। সরকার বিরোধী সব আন্দোলন-কর্মসূচি ইলিয়াস গ্রুপ ও সাইফুর অনুসারীরা আলাদাভাবেই চালায়।

গত বছর ২৩ মার্চ নগরের উপশহরে ছাত্রদল কর্মী মাহমুদ হোসেন শওকত দুর্বৃত্তদের হাতে খুন হলে ছাত্রদলের দুই গ্রুপে দ্বন্দ্ব্ব বাধে। সামসুজ্জামান জামানের নেতৃত্বে মিরাবাজার গ্রুপ এ খুনের জন্য ইফতেখার আহমদ দিনারের নেতৃত্বাধীন উপশহর গ্রুপকে দায়ি করে। এই দুই গ্রুপই ইলিয়াস আলীর। এ নিয়ে বাদানুবাদ ও মামলা দায়েরের পর এবং নানা ঘটনায় নিজেদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়।

এরই মধ্যে ওই মামলায় জামিন নিতে ঢাকায় গিয়ে ৩ এপ্রিল নিখোঁজ হন ইফতেখার আহমদ দিনার ও তার এক কর্মী জুনেদ আহমদ। দিনার নিখোঁজের বিষয়ে প্রথমে নিশ্চুপ ছিলেন ইলিয়াস আলী। পরে হঠাত্ করে তিনি সরব হন এবং সংবাদ সম্মেলন করে দিনারের সন্ধান দাবি করে বলেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী একটি বাহিনী দিনারকে ঢাকার উত্তরা থেকে তুলে নিয়েছে। দিনার নিখোঁজ হওয়ার পর ইলিয়াস বলয়ের ভেতরে দ্বন্দ্ব চলছিল। সূত্র জানায়, বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন ইলিয়াস।

এরপর ইলিয়াস আলী নিজেই নিখোঁজ হন। ২০১১ সালের ডিসেম্বর মাসে সিলেটে খালেদা জিয়ার রোডমার্চ ও বিশেষ করে জনসভা চলাকালে যারা তীব্রভাবে অসন্তুষ্ট ছিলেন তারাও এখন ইলিয়াসকে ফিরে পেতে আন্দোলনমুখর।

এই পাতার আরো খবর -
font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
এবার একুশে বইমেলায় কোন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন স্টল দিতে পারবে না। বাংলা একাডেমীর এই সিদ্ধান্ত যৌক্তিক বলে মনে করেন?
9 + 1 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
নভেম্বর - ১৭
ফজর৪:৫৬
যোহর১১:৪৪
আসর৩:৩৭
মাগরিব৫:১৬
এশা৬:৩১
সূর্যোদয় - ৬:১৪সূর্যাস্ত - ০৫:১১
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :