The Daily Ittefaq
ঢাকা, রবিবার, ০৫ জানুয়ারি ২০১৪, ২২ পৌষ ১৪২০, ০৩ রবিউল আওয়াল ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ বেসরকারিভাবে প্রাপ্ত ফলাফল: আওয়ামী লীগ (নৌকা) ১০৩টি, জাতীয় পার্টি (লাঙ্গল) ১২টি, অন্যান্য ২২টি

'এই নির্বাচনের ভোটের হিসেব জনগণের ইচ্ছার সূচক হবে'

বীণা সিক্রি

ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশ। শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধশালী, গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ এবং স্থিতিশীল দক্ষিণ এশিয়া নির্মাণে বাংলাদেশ ভারতের একটি মুখ্য-অংশীদারও। আমার দৃষ্টিতে এই সদিচ্ছার প্রতিফলনও ঘটেছে ভারত ও বাংলাদেশের জনগণের মানসে। এর কারণ হলো, ভারত ও বাংলাদেশের বন্ধুত্বের সম্পর্কের স্তর অনেক গভীরে প্রোথিত। এই বন্ধুত্ব, দুই দেশের হাজার বছরের পুরনো সম্পর্ক আরও নিবিড়ভাবে দানা বেঁধেছে একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় এবং তার পরবর্তী পারস্পরিক আকাঙ্খা লেনদেনের ওপর ভিত্তি করে।

সমসাময়িক সময়ে, এই দুই প্রতিবেশীর বন্ধুত্বের আলোকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, রাজনীতি ও সন্ত্রাসবাদ প্রতিহতের ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ অভিব্যক্তি প্রকাশ পেয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যের বিষয়টি ভারতের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহের বাংলাদেশ সফরের সময় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পসহ সব ধরনের প্রধান রপ্তানিমূলক পণ্য ভারতের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশের ঘোষণা দেওয়া হয়। এটা খুবই তাত্পর্যপূর্ণ, কেননা এর ফলে ভারত বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ও আঞ্চলিক অর্থনেতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রটি ব্যাপকভাবে শক্তিশালী হয়। এর ফলে যুগপত্ লাভবান হচ্ছে উভয় দেশের শিল্পোত্পাদক ও ভোক্তারা। এটা উভয় পক্ষের জয়।

উভয় দেশের বিনিয়োগের চিত্র গত দুই বছরে একটি মার্জিত রূপ পেয়েছে। আমরা আশা করি উভয় দেশের উদ্যোক্তারা এই সুযোগ-সুবিধা তাত্পর্যপূর্ণভাবে কাজে লাগাতে পারবে বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক প্রকল্প এবং সমবিনিয়োগের যৌথ প্রকল্পের মাধ্যমে। এমনকি এই যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে উত্পাদিত পণ্য দক্ষিণ এশিয়া কিংবা বাইরের অন্য কোনো দেশেও রপ্তানি করা সম্ভব। ভারত এখন বাংলাদেশে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ রপ্তানি করছে। ভারতের ও বাংলাদেশের মধ্যে সহযোগিতামূলক যৌথ কর্মোদ্যোগের এটি একটি অসাধারণ উদাহরণ।

ভারতের বিরুদ্ধে তত্পর যেসব বিদ্রোহী গ্রুপ বাংলাদেশের মাটিতে আশ্রয় খুঁজতো, সন্ত্রাসবাদ প্রতিহত করতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের উত্খাতে যে কার্যকর ভূমিকা রেখেছেন তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। এটাকে যথাযথভাবে তারিফ করেছে ভারতের জনগণ। এটা সত্যিই খুবই উত্সাহব্যাঞ্জক যে, এই ধরনের বিদ্রোহী গ্রুপের উপস্থিতি ও অবৈধ কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের মানুষ ভালো চোখে দেখেননি, এটা তাদেরও গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছিল। এই কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন এসব বিদ্রোহী গ্রুপের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন, তখন বাংলাদেশের মানুষও শেখ হাসিনার এই পদক্ষেপকে স্বাগত ও সমর্থন জানায়। বিভিন্ন বিদ্রোহী গ্রুপের হিংসাত্মক ও অসাংবিধানিক কর্মকাণ্ড, সন্ত্রাসী, মৌলবাদী ও চরমপন্থী সংগঠনগুলো একটি দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে দুর্বল করে দেয়; সমগ্র অঞ্চল ও দেশটির জনসাধারণের ভেতরে এক ধরনের অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করে। সামপ্রতিক বছরগুলোতে ভারত ও বাংলাদেশ সন্ত্রাসবাদ-বিরোধী কার্যক্রমে যে সহযোগিতার সূত্রপাত ঘটিয়েছে, তার ফলে পারস্পরিকভাবে লাভবান হয়েছে উভয় দেশ।

বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচন নিয়ে ভারতের অবস্থানটা স্পষ্ট। অবাধ, নিরপেক্ষ এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন প্রতিটি গণতান্ত্রিক সমাজে অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই প্রক্রিয়া জনগণের কাছে এই অধিকার ন্যস্ত করে যে, জনসাধারণ তাদের ভোট প্রয়োগের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতার পরিবর্তন সম্ভবপর করে। এটা সত্য যে, বাংলাদেশে ১৯৯৬ সাল থেকে আওয়ামী লীগের উদ্যোগেই 'তত্ত্ববধায়ক সরকার' নামে একটি অপ্রতিম ব্যবস্থা চালু হয়। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনের সময় এই ব্যবস্থা সুন্দরভাবে কাজ করেছিল। কিন্তু ২০০১ থেকে '০৬ সালে বেগম খালেদা জিয়ার প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন সময়ে কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়, যা জনমানসে 'তত্ত্ববধায়ক সরকার' ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির অবসরের বয়সকাল পরিবর্তনের মাধ্যমে এটাকে আরও বিতর্কিত করা হয়। কেননা, ধরে নেওয়া হয় এর ফলে একটি সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিকে সেই সময়েরর আসন্ন তত্ত্ববধায়ক সরকারের প্রধান করার জন্যই এই পরির্বতন। এবং নানা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৬ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি তত্ত্ববধায়ক সরকারের প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট ঘোষণা করেন (সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়) 'তত্ত্ববধায়ক সরকার' ব্যবস্থা বাংলাদেশের সংবিধানের নিয়মবিরুদ্ধ। কেননা, এই 'তত্ত্ববধায়ক সরকার' ব্যবস্থা একটি অনির্বাচিত ব্যক্তিকে সরকারের প্রধান হিসেবে অনুমোদন দেয়। এই ঘোষণার ওপর ভিত্তি করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মাধ্যমে 'তত্ত্ববধায়ক সরকার' ব্যবস্থা বিলোপ করে সংবিধান সংশোধন করা হয়।

বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকার এ ধরনের অপরিহার্য কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। বাংলাদেশের শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের প্রতি ভারত সবসময় সম্পূর্ণভাবে শ্রদ্ধা রাখে। এবং ভারত মনে করে, জনগণের দ্বারা নির্বাচিত একটি সরকারের মাধ্যমে সম্পন্ন এসব সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণই বাংলাদেশের জনগণের বিষয়। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সংলাপ ও সমন্বয়সাধন একটি অত্যাবশ্যক অনুষঙ্গ। একই সঙ্গে সব ধরনের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সকল দলের অংশগ্রহণের প্রয়াস চালিয়ে যাওয়া অতি গুরুত্বপূর্ণ। যদিও এই প্রয়াস অকার্যকর হয়ে যায় রাজপথের অপ্রতিহত ও দূষিত সহিংসতার কারণে। সর্বশেষ কয়েক সপ্তাহে বিদ্যমান সহিংসতা নির্বিচারে অনেক মানুষের জীবনহানি ঘটিয়েছে, যার ভেতরে অনেক নারী ও শিশু রয়েছে। ধ্বংস হয়েছে সরকারি বেসরকারি সম্পদ, অর্থনীতির ওপর আঘাত এসেছে তীব্রভাবে। গণতান্ত্রিক ধারায় সঙ্কট উত্তরণের প্রক্রিয়াও বাংলাদেশে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দারুণভাবে। এটা দুর্ভাগ্যজনক যে, এই সহিংসতা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পায় বিশেষ করে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের ট্রাইব্যুনাল থেকে বিভিন্ন সময় রায় প্রদানের পর পর। এটা সুনির্দিষ্টভাবে দুর্ভোগের যে, বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা এইসব সহিংসতার শিকারে পরিণত হয়, তাদের ওপর জোর প্রয়োগ করা হয় সীমান্ত পার হতে। এ ধরনের সহিংসতা ভারতকে ধাক্কা দেয়।

নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে বিএনপি এবং অন্য বিরোধী দলগুলোর সকল ধরনের সুযোগ ছিল। বিভিন্ন জনমত জরিপ বিএনপির নির্বাচনের পক্ষেই ছিল, নির্বাচনে তাদের জয়ের সম্ভাবনাও ছিল যথেষ্ট। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আরও মজবুত করার প্রক্রিয়ায় না হেঁটে বিএনপির নির্বাচন বর্জন ভারতসহ অন্য সকল দেশের জন্যই অস্বস্তিকর। অথচ বিএনপি নির্বাচনে না এসে জনগণের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত করার নানা প্রকার সহিংস ও ধ্বংসাত্মক পথে এগোলো। প্রতিটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা 'চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স'-এর ওপর ভিত্তি করে এগিয়ে চলে। অবশ্যই বিরোধী দলের কিছু দাবি থাকবে, কিন্তু তার প্রকাশ ঘটবে সংসদে যোগ দিয়ে, রাস্তায় নেমে নয়। আর, নির্বাচনের অংশগ্রহণের প্রশ্নে বিরোধী দলের প্রাক-অপরিহার্য দাবি যদি হয় একজন ব্যক্তিকে সরে যেতেই হবে, তাহলে এমন শর্ত খুব একটা গ্রহণযোগ্য ও গণতান্ত্রিক মনোভাবাপন্ন হয় না কখনও।

এখন নির্বাচনটাকে অনুষ্ঠিত হতে দেয়া হোক। এমন কি যদি নির্দিষ্ট সংখ্যক দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ নাও করে, এটাও একটি গণতান্ত্রিক ধারা যার মধ্য দিয়ে জনগণ তাদের মতামত প্রকাশ করতে পারবে। একবার যদি এসময়ের বাধ্যতামূলক নির্বাচনটি সম্পন্ন হয়ে যায়, তখন এর ফলাফল, এর ভোটপ্রদানের সংখ্যা ও শতকরা হিসেব সুনির্দিষ্টভাবে জনগণের ইচ্ছার সূচক বা নির্দেশক হিসেব কাজ করবে।

[নিবন্ধটি তৈরি হয়েছে বীণা সিক্রির সাম্প্রতিক একটি সাক্ষাত্কারের ভিত্তিতে]

লেখক : ঢাকাস্থ সাবেক ভারতীয় হাই কমিশনার, ভাইস-চেয়ারপারসন- সাউথ এশিয়া ফাউন্ডেশন (এসএএফ-ইন্ডিয়া)

ভাষান্তর : অদ্বয় দত্ত

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
পরিবেশ মন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেছেন, '৫ জানুয়ারি নির্বাচন পরবর্তী দুই সপ্তাহের মধ্যে চলমান সন্ত্রাস নির্মূল করা হবে।' আপনি কি মনে করেন এটা সম্ভব হবে?
7 + 8 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
অক্টোবর - ১৫
ফজর৪:৪০
যোহর১১:৪৫
আসর৩:৫৫
মাগরিব৫:৩৬
এশা৬:৪৮
সূর্যোদয় - ৫:৫৬সূর্যাস্ত - ০৫:৩১
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :