The Daily Ittefaq
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১০ জানুয়ারি ২০১৩, ২৭ পৌষ ১৪১৯, ২৭ সফর ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ ভারতে ট্রাক দুর্ঘটনায় ২৫ জন নিহত | ডিএসই: সূচক বেড়েছে ১০ পয়েন্ট | শ্যাভেজের বিলম্বিত অভিষেক বৈধ: আদালত | আজ বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস | ১০ ঘন্টা পর মাওয়ায় ফেরি চালু

বছরে ২ লাখ একর কৃষিজমি চলে যাচ্ছে অকৃষি খাতে

ভরাট হচ্ছে বিল-হাওর, ভবিষ্যত্ খাদ্য নিরাপত্তায় হুমকি

মনির হায়দার

বদলে যাচ্ছে ভূমির শ্রেণী। কৃষিজমি রূপান্তরিত হচ্ছে আবাসিক, বাণিজ্যিক বা শিল্পপ্লটে। একটি বেসরকারি সংস্থার হিসেব অনুযায়ী আবাসন, শিল্পায়ন ও বাণিজ্যিক খাতে ব্যবহারের কারণে বছরে গড়ে ২ লাখ একর কৃষিজমি কমে যাচ্ছে। আবার জলাধার তথা বিল-ঝিল ও হাওর-বাঁওড় ভরাট করে থামিয়ে দেয়া হচ্ছে পানি প্রবাহের স্বাভাবিক ধারা। ফলে ভূপ্রকৃতি যেমন দিনদিন বিরূপ হচ্ছে, তেমনি হুমকি দেখা দিচ্ছে ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমির শ্রেণী পরিবর্তনের যথেচ্ছ ধারা তথা কৃষিজমি ধ্বংসের লাগামহীন প্রবণতা অবিলম্বে থামানো না গেলে অনিবার্য বিপর্যয়ের কবলে পড়বে ভবিষ্যত্ প্রজন্ম। তবে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা জানিয়েছেন, ভূমির শ্রেণী পরিবর্তন ও কৃষিজমি ধ্বংসের আগ্রাসন ঠেকানোর লক্ষ্যে প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। সারাদেশের সকল ভূমির জোনিং করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে উপকূলীয় অঞ্চলের ১৯টি জেলার জোনিং সম্পন্ন হয়েছে। ২০১৪ সালের জুন মাসের মধ্যে সারাদেশের জোনিং সম্পন্ন হবে। পাশাপাশি কৃষিজমি রক্ষা ও ভূমির শ্রেণী পরিবর্তন রোধের লক্ষ্যে একটি নতুন আইন প্রণয়নেরও কাজ চলছে।

সরকারি হিসেব অনুযায়ী বাংলাদেশে সবমিলিয়ে জমির পরিমাণ ১ কোটি ৪৪ লাখ হেক্টর। জনসংখ্যা ১৫ কোটি ধরা হলে প্রতিজন নাগরিকের বিপরীতে জমির পরিমাণ গড়ে প্রায় ২০ শতাংশ। তবে এরমধ্যে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ মাথাপিছু ১৫ শতাংশের বেশি নয়। জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে মাথাপিছু জমির পরিমাণ দ্রুতই কমছে। অর্থনৈতিক অগ্রগতির সাথে সাথে বাড়ছে নগরায়নের প্রবণতা। ঘটছে শিল্পোন্নয়ন, নিত্য-নতুন রাস্তাঘাট নির্মাণ এবং সেই সাথে বিস্তার ঘটছে শিক্ষা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানেরও। এসব কারণে কৃষিজমির পরিমাণ ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে।

১৯৮৩-৮৪ সালের সরকারি হিসেব অনুযায়ী দেশে মোট আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ২ কোটি ২০ লাখ একর। কিন্তু ১৯৯৭ সালে পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায় যে, মাত্র এক যুগের ব্যবধানেই কৃষিজমির পরিমাণ কমে গিয়ে ১ কোটি ৭৫ লাখ একরে দাঁড়ায়। এমন বেপরোয়া গতিতে কৃষিজমির ধ্বংস হওয়ার প্রেক্ষাপটে সরকার ২০০০ সালের গোড়ার দিকে 'জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতি' নামে একটি নীতিমালা প্রণয়নের কাজ শুরু করে। পরের বছর ২০০১ সালের ২১ জুন আনুষ্ঠানিক গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে 'জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতি ২০০১' জারি করা হয়। তাতে বলা হয়েছিল যে, গেজেট বিজ্ঞপ্তি জারির দিন থেকেই নীতিমালাটি কার্যকর হবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। আর সেটা না হওয়ায় গত এক দশকে রাজধানীর পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন অঞ্চলসহ সারাদেশেই আবাসন, শিল্পায়ন ও নগরায়নের জন্য ব্যাপকভাবে কৃষিজমি ধ্বংস করা হয়। অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি) নামের একটি বেসরকারি সংস্থার হিসেব অনুযায়ী আবাসন, শিল্পায়ন ও বাণিজ্যিক প্রয়োজনে প্রতিদিন গড়ে ২২০ হেক্টর কৃষিজমি ধ্বংস করা হচ্ছে। সেই হিসেবে বছরে গড়ে ৮০ হাজার ২০০ হেক্টর (একরের হিসেবে যা ২ লাখ একর) কৃষিজমি হারিয়ে যাচ্ছে অপরিকল্পিত উন্নয়নের থাবায়। স্বাধীনতার পর গত ৪১ বছরে কমবেশি ৫০ লাখ একর কৃষিজমি ধ্বংস হয়েছে বলে জানিয়েছেন ভূমি মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজউকের পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের সন্নিহিত এলাকায় কৃষিজমি ধ্বংস করে অনেকগুলো বেসরকারি আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে। এসব প্রকল্পের উদ্যোক্তারা আদৌ রাজউক বা সরকারের অন্যকোনো দফতরের অনুমোদন নিয়েছেন কিনা তা পরিষ্কার নয়। এছাড়া গাজীপুর, টঙ্গি, সাভার, ধামরাই, কেরানীগঞ্জ, সিঙ্গাইর, মুন্সীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জ জেলার বিভিন্ন অংশে বিপুল সংখ্যক আবাসিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে কৃষিজমির ওপর। কেবল আবাসিক প্রকল্পই নয় শিল্পায়ন এবং নগরায়নের জন্যও কৃষিজমি ও বনাঞ্চল ধ্বংস এবং জলাধার ভরাট করা হচ্ছে যথেচ্ছা।

ভূপ্রকৃতি বিনষ্টের এই ধারা রোধকল্পে ২০০৬ সালে তত্কালীন সরকার দেশের উপকূলীয় ১৯টি ও সমতলের নিম্নাঞ্চল অধ্যুষিত ২টি জেলায় ল্যান্ড জোনিং কার্যক্রম হাতে নেয়। কথা ছিল যে ২ বছরের মধ্যে প্রকল্পটির কাজ শেষ করা হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই প্রকল্পের কাজ শেষ হয় ২০১২ সালের জুন মাসে। এ প্রকল্পের আওতায় মোট ১৪৭ উপজেলায় ৪৭ হাজার ২০১ বর্গকিলোমিটার ভূমির ৮টি ক্যাটাগরিতে জোনিং কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। এগুলো হলো ১. চিংড়ি জোন (লোনা পানি), ২. চিংড়ি জোন (মিঠা পানি), ৩. লবণ-চিংড়ি জোন, ৪. বন জোন, ৫. প্যারা (ম্যানগ্রোভ) জোন, ৬. শহর ও বাণিজ্যিক জোন, ৭. পর্যটন জোন এবং ৮. কৃষি জোন।

এই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর এ পর্যায়ে গত জুলাই মাস থেকে দেশের আরও ৪০টি জেলার ল্যান্ড জোনিংয়ের লক্ষ্যে নতুন প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। ৩টি পার্বত্য জেলা বাদে বাকি সবগুলো জেলাই এ প্রকল্পের আওতায় রয়েছে। ১৭ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ের প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য সময় ধরা হয়েছে ২ বছর। প্রকল্প পরিচালক মো. আব্দুল হাই ইত্তেফাককে জানিয়েছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সারাদেশের ৪০টি জেলার ল্যান্ড জোনিং কার্যক্রম সম্পন্ন করার পর প্রতিটি জোনের ভূপ্রকৃতি অক্ষুণ্ন্ন রাখার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে সরকার। এজন্য ইতিমধ্যেই 'কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইন' নামে একটি প্রস্তাবিত আইনের খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে। ল্যান্ড জোনিংয়ের কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর এ আইনের আওতায় সারাদেশে ভূমি ব্যবহার তদারকির জন্য স্থানীয় পর্যায়ে কমিটি গঠন করা হতে পারে। তিনি বলেন, ল্যান্ড জোনিং ও প্রস্তাবিত আইনটি প্রণয়নের মূল লক্ষ্য হলো ভূমির সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করা, ভূমির ক্ষয়রোধ ও ক্ষয়প্রাপ্ত ভূমি সংরক্ষণ করা, জীব-বৈচিত্র্য ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ সুরক্ষা করা এবং ভূমি ব্যবহারকারীদের মধ্যে স্বার্থের দ্বন্দ্ব নিরসন করা। উদ্যোগটি সফল হলে একদিকে ভূসম্পদকে ঘিরে যেমন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রণয়ন ও কৃষিজমি রক্ষা করা সম্ভব হবে, তেমনি রক্ষা পাবে পরিবেশের ভারসাম্যও। তাছাড়া এ কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলে দেশের ভূসম্পদের ওপর একটি তথ্যবহুল ডাটাবেজ তৈরি করা সম্ভব হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

বিষয়টি নিয়ে ইত্তেফাক প্রতিনিধির সঙ্গে আলাপকালে ভূমিমন্ত্রী রেজাউল করিম হীরা বলেন, কৃষিজমি রক্ষা এবং ভূপ্রকৃতির বিপর্যয় রোধে আওয়ামী লীগ সব সময়ই সচেতন। সে কারণে আওয়ামী লীগের আগের আমলে 'জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতি-২০০১' প্রণয়ন করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে চারদলীয় জোট এবং ওয়ান ইলেভেনের সরকার সেই নীতিমালা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়নি। সে কারণেই গত এক দশকে প্রচুর পরিমাণ কৃষিজমি ধ্বংস হয়েছে। তরান্বিত হয়েছে ভূপ্রকৃতি নষ্টের প্রবণতাও। বর্তমান মহাজোট সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বিষয়টি নতুন করে বিবেচনায় নিয়েছে। আর তাই ২০০১ সালে প্রণীত ভূমি ব্যবহার নীতি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া যেমন শুরু হয়েছে, তেমনি সারাদেশের সকল জমির জোনিং কার্যক্রম সম্পন্ন করা হচ্ছে। এছাড়া ভূমির শ্রেণী পরিবর্তন রোধ তথা কৃষিজমির অস্তিত্ব রক্ষার জন্য নতুন আইন প্রণয়নের কাজও শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি।

এই পাতার আরো খবর -
font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, দেশের মানুষ এখন পরিবর্তন চাচ্ছে। আপনিও কি তাই মনে করেন?
6 + 1 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
অক্টোবর - ২৭
ফজর৪:৪৫
যোহর১১:৪৩
আসর৩:৪৬
মাগরিব৫:২৭
এশা৬:৪০
সূর্যোদয় - ৬:০১সূর্যাস্ত - ০৫:২২
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :