The Daily Ittefaq
ঢাকা, বুধবার, ২২ জানুয়ারি ২০১৪, ০৯ মাঘ ১৪২০, ২০ রবিউল আওয়াল ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ চাঁপাইনবাবগঞ্জে নারী ইউপি সদস্যের রগ কর্তন | জাহাঙ্গীরনগরের ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য এম এ মতিন | ৭ মন্ত্রী-এমপির সম্পদ তদন্তে দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগ | ট্রাফিক ব্যারাকে লাশ, পুলিশ কন্সটেবল গ্রেফতার

ক্ষুদে মুক্তিযোদ্ধা

রানা জামান

আজ পর্যন্ত কেউ ওকে চড় বা লাথি মারেনি। যদিও ও নড়বড়ে একটা চা-দোকানের পিচ্চি ম্যাসিয়ার। কিছুক্ষণ আগে পাকিস্তানি সৈন্যটা ওকে খুব মারলো কোন কারণ ছাড়াই। কেউ কোন প্রতিবাদ করলো না; উল্টো সবাই ভয় পাচ্ছে ওদের। ওরা কারা? ওগো সবাই ডরাইতাছে ক্যান? কালুর মনে প্রশ্ন। প্রৌঢ় শুক্কুর আলি চা-দোকানে ঢুকে গলা উঁচিয়ে বললেন, ভাতিজা এক কাপ চা দে। দুধ বেশি দিবি।

কালু মুখ ভার করে চা-দোকানদার ছমেদালির সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। ছমেদালি চা বানাতেই সে পিরিচে কাপটা উঠিয়ে শুক্কুর আলির সামনে এসে টেবিলে রাখলো।

শুক্কুর আলি ধুমায়িত চায়ের ঘ্রাণ নিয়ে কালুর মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, কিরে ভাতিজা? তোর মুখটা প্যাঁচার মতো লাগতাছে ক্যান? কেউ মারছে নাকি?

কালু শুকনো কণ্ঠে বললো, পাক-বাহিনীর একটা সৈন্য খালিখালিই আমারে মারলো। কেউ এর প্রতিবাদ করলো না চাচা। আমি কি কারো সেবা কম দেই কন চাচা?

শুক্কুর আলি কণ্ঠ নামিয়ে বললেন, আস্তে কথা ক কালু! ওরা শুনলে একেবারে ঠুস মাইরা দিবো!

ক্যান চাচা? আমি খারাপ কী কইছি?

আবার কথা কয়! একদম চুপ! ওগো নিয়া কোন কথাই কওয়া যাইবো না! ওরা এখন হানাদার বাহিনী!

হানাদার বাহিনী কী চাচা?

তখন ছমেদালি বললো, শুক্কুর ভাই, এইসব কথা এইখানে বইয়েন না। আমার বিপদ হইবো। দোকানটা জ্বালাইয়া দিবো।

শুক্কুর আলী ছমেদালির দিকে তাকিয়ে বললো, তুমি ঠিক কথাই কইছো ছমেদালি। এই কাউল্যা, তুই যা এইখান থাইক্যা।

শুক্কুর আলি চায়ের কাপ তুলে চুমুক দিতে আরম্ভ করলেন। কালু কিছু বুঝতে না পেরে মুখ ভার রেখেই ছমেদালির দিকে এগিয়ে গেলো।

এসময় চৌকিদার ঠান্ডু মিয়া চা-দোকানে ঢুকে বললো, পাক-বাহিনী চা খাইবো। তাড়াতাড়ি কুড়ি কাপ চা পাঠাও ছমেদালি ভাই।

ছমেদালি বললো, চা'র দাম দিবো কেডা?

আমি জানি না।

শুক্কুর আলি চায়ের কাপে একবার চুমুক দিয়ে বললেন, দামের কথা কইয়ো না ছমেদালি। পাক-বাহিনী শুনলে দোকানডা ত জ্বালাইয়া দিবোই, তোমাকেও ঠুস মাইরা দিবো।

আমি গরীব মানুষ শুক্কুর ভাই। আমার ওপর এই বোঝা আইতাছে ক্যান? কুড়ি চাপ চা একবার দিলেই ত শেষ হইয়া যাইবো না। ওরা যদ্দিন এখানে থাকবো, তদ্দিন যখনই চাইবো তখনই দিতে হইবো।

ঠান্ডু মিয়া বললো, তা তো দিতে হইবোই। অহন কথা না বাড়াইয়া চা-টা বানাও। আমি নিয়া যাইবাম। কাউল্যারে সাথে দিও।

মুখ ভার রেখে ছমেদালি চা বানাতে শুরু করলো। শুক্কুর আলি চা'র কাপ হাতে নিয়ে আস্তে আস্তে ছমেদালির কাছাকাছি এলো। ছমেদালির হাতের দিকে তাকিয়ে থেকে বললো, চা-টা ভালো কইরা বানাইও ছমেদালি। নাইলে পাক-বাহিনী তোমার চা খাইয়া মুখ গোমরা কইরা দোকানডা তো জ্বালাইয়া দিবোই, তোমাকেও ঠুস মাইরা দিবো কইয়া রাখলাম।

ছমেদালি একবার মুখ তুলে শুক্কুর আলিকে দেখে চা বানাতে থাকলো। মনে মনে বললো: কুড়ি কাপ চা'র ট্যাকাটা তো মাইর গেলো আমার। আল্লাহ তুমি এর বিচার কইরো।

রাত দশটায় কালু শেষ চা দিয়ে এলো পাকিস্তানি আর্মি ক্যাম্পে। খালি কাপ নিয়ে ফিরে আসতেই ছমেদালি মুখ ব্যাজার করে জিজ্ঞেস করলো, মোট কয় চাপ চা গচ্ছা গেলো রে আইজ কাউল্যা?

কালু ঠোঁট উল্টে বললো, আমি ত হিসাব জানি না চাচা।

গাধা!

কালু ফের বললো, ওরা আমারে খালি খালি মারে ক্যান চাচা?

ওগো জিগা। আমি আছি আমার জ্বালায়! আইজ পাক আর্মিরা ছয় বারে মোট একশ' কুড়ি কাপ চা খাইছে। আল্লাই জানে এরা কয়দিন থাকবো এইখানে। এইভাবে দৈনিক একশ' কুড়ি চাপ চা দিতে হইবো। না দিলে আমারে তো মারবোই, বাড়ি-ঘরও জ্বালাইয়া দিবো। আমি শেষ রে কাউল্যা, আমি শেষ!

পরদিন থেকে হানাদার বাহিনীর নৃশংসতা, বর্বরতা দেখে কালু কথা বলা ভুলে গেলো যেন; তবে ওর ভেতর কিছু প্রশ্নের উদয় হলো। পাকিস্তানি আর্মিগুলো হঠাত্ এলাকায় আইসা খারাপ কাম করতাছে ক্যান? মাদ্রাসার হুজুররা ওগো সাহায্য করতাছে ক্যান? আমরা কী দোষ করছি? আর্মিরা কী চায়? আমারেও কি একদিন মাইরা ফালাইবো পাক-বাহিনী? কিন্তু ক্যান মারবো আমারে? আমি কী দোষ করছি? আমি ত ওগো ফুট-ফরমাস খাটতাছি। পাক-বাহিনী ও ওদের দোসরদের বর্বরতা বাড়তে থাকায় আস্তে আস্তে ওদের প্রতি কালুর ঘৃণা জমতে লাগলো। সে মূর্তির মতো চা নিয়ে ক্যাম্পে যায়; ওদের লাথি-গুতো হজম করে চোখ তুলে একবার ওদের দেখে শুধু। আর রাতে পাশের গ্রামের শুক্কুর আলির বাংলোঘরের বারান্দায় গুটিসুটি মেরে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।

কয়েকদিন পর এক গভীর রাতে শুক্কুর আলি কালুকে ডেকে তুললো। ওকে সরাসরি নিয়ে গেলেন শোবার ঘরে। ঘরটায় একটা হ্যারিক্যান টিমটিম করে জ্বলছে। কালুর চোখ তখনো ঢুলুঢুলু। সে কিছুই বুঝতে পারছে না; ঘরে ঢুকে আলো-আঁধারিতে প্রথমে কিছুই চোখে পড়লো না ওর। চোখে আলো-আঁধার সয়ে এলে ঘরের চৌকির উপর বসে থেকে কয়েকজন লোককে ওর দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ওদের দিকে চোখ বড় বড় করে তাকালো। ও মনে মনে ভাবছে: এরা কারা? হাঁটু অব্দি ময়লা পেন্ট, গায়ে ছেঁড়া ময়লা গেঞ্জি, লম্বা চুল, খোঁচা খোঁচা দাড়ি, কারো মাথায় কারো বা কোমরে গামছা বান্দা। কান্দে ঝুলানো লোহার চোঙার মতো বস্তুটা কী? কারো হাতে মাইট্যা রঙের আন্ডার মতো বস্তুটা কী? কী করে এইগুলো দিয়া?

শুক্কুর আলি কালুর কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বললো, এরা মুক্তিযোদ্ধা।

কালু কিছুই বুঝতে না পেরে মুক্তিযোদ্ধাগণকে একবার দেখে শুক্কুর আলির দিকে তাকালো।

শুক্কুর আলি ফিসফিস করে ফের বললো, এরা পাক-বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আসছে। এরা পাক-বাহিনীর হাত থেকে আমাদের দেশটারে মুক্ত করবো।

কালু মুখে কিছু না বলে ডান হাতের আঙুল তুলে একজন মুক্তিযোদ্ধার কাঁধের এবং আরেকজনের হাতের ডিমটা দেখিয়ে ভ্রু নাচাতেই মুক্তিযোদ্ধা জাকির নিজ কাঁধে ঝুলানো অস্ত্রটি দেখিয়ে বললেন, এটা স্টেনগান। পাশের মুক্তিযোদ্ধার হাতের অস্ত্র দেখিয়ে বললো, ওটা গ্রেনেড।

কালুর চোখের সামনে ভেসে উঠলো হানাদার বাহিনীর আধুনিক যুদ্ধাস্ত্রগুলো। সে দাঁড়িয়ে মুক্তিযোদ্ধাগণের দিকে তাকিয়ে বললো, ওগো অস্তর গুলাইন খুব নয়া আর খুব সুন্দর। দেখলেই ডর লাগে! আপনেগো গুলাইন দেইখা ডর লাগে না! এইসব পুরান অস্তর দিয়া আপনেরা কি হেগো লগে পারবাইন?

জাকির কালুর কাছে এসে হাঁটু গেরে বসে বললেন, তুমি সাহায্য করলে পারবো। আমরা এই অস্ত্র দিয়েই বিভিন্ন জায়গায় হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করছি।

কালু বুঝতে না পেরে বললো, আমি কিভাবে সাহায্য করবাম আপনাগো?

তুমি হানাদার বাহিনীর ক্যাম্পে যাও। তুমি আজ ক্যাম্পে গিয়ে পাক-বাহিনী অস্ত্র-গোলা বারুদ কোথায় রাখে, হানাদার সৈন্যরা ক্যাম্পের কোন কোন জায়গায় পাহারায় থাকে তা ভালো করে দেখে এসে আমাদের বলবে। তুমি বললে আমরা আগামী রাতে ক্যাম্পে আক্রমণ চালাবো। পারবে না ছোট ভাই?

লাথি-গোতার প্রতিশোধ নেবার সুযোগ পেয়ে বালক কালুর চোয়াল দুটো শক্ত হয়ে উঠলো। সে একবার মাথা ঝাকি দিয়ে বললো, খুব পারবাম! এইডা কুনো কামই না! আপনেরা নিশ্চিন্তে ঘুমান, আমারেও ঘুমাইতে দ্যান। আমার খুব ঘুম পাইতাছে।

কালু শব্দ করে লম্বা একটা হাই তুললো।

শুক্কুর আলি বললো, অহন তোর আর বাংলা ঘরের বারান্দায় গিয়া কাম নাই। এই ঘরেই ছাটাই বিছাইয়া শুইয়া পড়।

ট্রে করে চা নিয়ে ক্যাম্পে ঢুকেই কালু দক্ষ গোয়েন্দার মতো এদিক ওদিক তাকাতে লাগলো। অফিস কক্ষে ট্রে রেখে কালু বাইরে বেরিয়ে এলো। সে বারান্দা ধরে এদিক ওদিক তাকিয়ে হাঁটতে লাগলো। একটা তালাবদ্ধ কক্ষের দরজার ফাঁক দিয়ে ভেতরে উঁকি দিয়ে চমকে উঠলো। বিরবির করে বললো: ভিতরে খালি পায় কারা হাঁটতাছে? ঘরটা আন্ধাইর ক্যান?

পাহারায় থাকা এক পাকিস্তানি সৈনিক কালুকে ওভাবে দেখতে পেয়ে ছুটে এসে ওর ঘাড় ধরে টেনে আনলো। ধাক্কা দিয়ে মেঝেতে ফেলে মারতে লাগলো সবুট লাখি। সৈনিকের হৈ চৈ শুনে হাতের চায়ের কাপ ফেলে বেরিয়ে এলো পাকিস্তানি মেজর: পেছনে অন্যরা। সৈনিকটার কাছে ঘটনা শুনে ছড়ি বাগায় মেজরটা। পেটাতে শুরু করে ক্ষুদে মুক্তিযোদ্ধা কালুকে। ইউনিয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান ও চৌকিদার ঠান্ডুর চোখেও পাকিস্তানি সৈনিকের দৃষ্টি। কালু প্রথমে মাগো বাবাগো বলে চিত্কার করলেও পরে আস্তে আস্তে ওর আর্তনাদ স্তিমিত হয়ে এলো। বেদম মারপিটে জর্জরিত কালু নিস্তেজ হয়ে পড়লে মেজর বেত্রাঘাত থামিয়ে মুখমন্ডল গম্ভীর রেখে চলে গেলো অফিস কক্ষের দিকে। অন্যরাও ওর পিছু নিলো।

আঘাতে আঘাতে কালুর রক্তাক্ত দেহটা পড়ে থাকলো সেখানেই সারাদিন।

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, 'সাতক্ষীরায় যৌথ বাহিনীর অভিযান নিয়ে খালেদা জিয়া যা বলেছেন, তা দেশের জন্য অপমানজনক। এ জন্য জনগণের কাছে তার মাফ চাইতে হবে।' আপনি কি তার সাথে একমত?
8 + 1 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
নভেম্বর - ১৩
ফজর৫:১১
যোহর১১:৫৩
আসর৩:৩৮
মাগরিব৫:১৭
এশা৬:৩৪
সূর্যোদয় - ৬:৩২সূর্যাস্ত - ০৫:১২
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :