The Daily Ittefaq
ঢাকা, বৃহস্পতিবার ৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২৫ মাঘ ১৪১৯, ২৫ রবিউল আওয়াল ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ জামিন পেলেন হল-মার্ক চেয়ারম্যান জেসমিন | সাগর-রুনি হত্যা: এনামুল সন্দেহে আটক ২০ জন | ৩৪তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ | নির্বাচনের আগেই আন্দোলন করে নেতাদের মুক্ত করা হবে: জামায়াত | বিপিএল: খুলনাকে ৮৯ রানে হারালো চট্টগ্রাম | ময়মনসিংহে সুলতান মীর হত্যা মামলায় চারজনের ফাঁসি | শনিবার চট্টগ্রামে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল | 'দেশে নতুন ভোটার সংখ্যা ৭০ লক্ষাধিক' | 'দেশের অর্থে পদ্মা সেতু হলে চালের কেজি ১৫০ টাকা হবে' | বার্সেলোনা আসবে: সংসদে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী | ফেইসবুকে প্রধানমন্ত্রীর নামে অ্যাকাউন্ট খুলল কে? | ফাঁসির দাবি শাহবাগ থেকে এখন সারাদেশে

জাতীয় অধ্যাপক নূরুল ইসলাম স্যারকে যেমন দেখেছি

ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ

আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় জাতীয় অধ্যাপক ডা. নূরুল ইসলাম স্যার ছিলেন একজন যুগদ্রষ্টা, যুগস্রষ্টা। প্রচুর প্রাণশক্তি আর ব্যাপক কর্মস্পৃহায় পরিপূর্ণ এ মানুষটি সারাজীবন যে কাজে হাত দিয়েছেন সেখানেই সোনা ফলিয়েছেন। তিনি ছিলেন প্রকৃত সব্যসাচী; যেমন ছিলেন প্রথিতযশা চিকিত্সক, নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক ও চৌকস গবেষক, তেমনি ছিলেন সচেতন সমাজকর্মী ও সুদক্ষ প্রশাসক।

আমাদের চিকিত্সা ও স্বাস্থ্য খাতে স্যারের অবদান অপরিসীম। অগণিত রোগাক্রান্তকে সেবা দেয়ার পাশাপাশি তিনি শিক্ষক হিসেবে তৈরি করেছেন অসংখ্য মেধাবী ও সফল চিকিত্সক। তার হাত ধরেই পরবর্তী প্রজন্মের নামিদামি বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকগণ তাদের পথচলা শুরু করেছিলেন। শুধু জ্ঞানের আলো আর অভিজ্ঞতার ঝুলিই নয়, স্যারের কাছ থেকে তারা পেয়েছিলেন সৃষ্টিশীলতা আর বিজ্ঞান-মনস্কতার নির্দেশনা, সে সাথে চিকিত্সক হিসেবে মানবতা আর সমাজ সচেতনতার দীক্ষা। ছাত্রদের পড়ানোর পাশাপাশি তিনি তাদের সুবিধার্থে ইংরেজিতে পাঠ্যবই রচনা করেছেন। আবার সাধারণ মানুষের জন্য বাংলা ভাষায় সহজ করে বই লিখেছেন। তিনি চিকিত্সা বিষয়ক গবেষণা করেছেন প্রচুর। তার অনেক গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক ও খ্যাতিমান অনেক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।

তবে ইসলাম স্যারের মূল অবদান আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার একেবারে ভিত্তিমূলে। এদেশের স্বাস্থ্য সেবাদানের অবকাঠামো গড়ে তোলা, নীতি-নির্ধারণ আর চিকিত্সাবিদ্যা শিক্ষার একেবারে গোড়াতেই ছিল তার ভূমিকা। বলা চলে তার সেসব উদ্যোগ আর কাজের উপরই আজকের বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা দাঁড়িয়ে আছে। তার সবচে গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিঃসন্দেহে পিজি হাসপাতাল। ১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত ইনস্টিটিউট অব পোস্ট গ্রাজুয়েট মেডিসিন এন্ড রিসার্চ, যা জনপ্রিয় হয় পিজি হাসপাতাল নামে, তার প্রতিষ্ঠার পেছনে ইসলাম স্যারের অবদান অনস্বীকার্য। দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে মেধা ও শ্রম দিয়ে তিনি এ প্রতিষ্ঠানটিকে গড়ে তুলেছিলেন। সে সময় এ দেশে চিকিত্সা বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর পড়াশোনার কোন সুযোগ ছিল না। তিনিই প্রথম পিজি হাসপাতালের মাধ্যমে এফসিপিএসসহ অন্যান্য পোস্ট গ্রাজুয়েট কোর্স চালুর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। দেশের চিকিত্সা বিজ্ঞানের সেরা ছাত্র-ছাত্রীরা এখানে উচ্চশিক্ষা লাভ করতেন, করতেন বিশ্বমানের গবেষণা। কালের পরিক্রমায় পিজি হাসপাতাল আজ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় নামে চিকিত্সাসেবা আর গবেষণার অন্যতম শীর্ষস্থান হিসেবে দেশে-বিদেশে সুপরিচিত। বলা চলে এ দেশে এ পর্যায়ে চিকিত্সা, শিক্ষা ও গবেষণার পথিকৃত তিনিই। তিনি সেদিন শুরু করতে পেরেছিলেন বলেই আজ আমাদের চিকিত্সা বিজ্ঞান এ পর্যায়ে আসতে পেরেছে।

শুধু চিকিত্সাসেবা, গবেষণা আর একাডেমিক শিক্ষাদানই নয়, তিনি সমাজ সচেতনতা আর চিকিত্সক হিসেবে সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রতীকও। ধূমপানের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে তিনি শুধু অবহিতই ছিলেন না, একজন সচেতন চিকিত্সক হিসেবে সাধারণ মানুষকে এ বিষয়ে জানানোর প্রয়োজনীয়তাও তিনি উপলব্ধি করেন। ধূমপানের বিরুদ্ধে সমন্বিত সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার প্রেরণা থেকে তিনিই এদেশে প্রথম "আধূনিক" (আমরা ধূমপান নিবারণ করি) নামক জনপ্রিয় ধূমপান বিরোধী সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। এক অর্থে এ দেশে জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডের শুরুতেও তাই তার নামই চলে আসে। স্যারের আরেকটি অবিস্মরণীয় কাজ ১৯৮২ সালে জাতীয় ওষুধ নীতি প্রণয়নের সাথে সরাসরি জড়িত থাকা। সাধারণ মানুষের নিকট চিকিত্সা সেবাকে সহজলভ্য করা আর অপ্রয়োজনীয় ওষুধের ব্যবহার রোধ করাই ছিল ওষুধ নীতির লক্ষ্য; যা পুরোপুরি না হলেও অনেকখানি অর্জিত হয়েছে। আর এরই প্রত্যক্ষ ফলস্বরূপ আমাদের দেশের ওষুধ শিল্প আজ স্বাবলম্বী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত, আমাদের ওষুধ সামগ্রী আজ সুনামের সাথে বহির্বিশ্বে রপ্তানি হচ্ছে।

ওষুধ নীতির অন্যতম প্রবক্তা ইসলাম স্যার চিকিত্সা দেয়ার ক্ষেত্রে নিজেও সব নৈতিকতা মেনে চলতেন। তিনি কখনোই অপ্রয়োজনীয় ওষুধ লিখতেন না, যথাসম্ভব কম ওষুধ লিখতেন, এমনকি কখনো কখনো লিখে দিতেন যে, কোন ওষুধের প্রয়োজন নেই। এছাড়া বিভিন্ন রকমের ল্যাবরেটরি পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন বিচক্ষণ। নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া অযথা রোগীকে কোন পরীক্ষা করাতেন না। তিনি প্রায়ই প্রশ্ন রাখতেন, 'কেন এত অপ্রয়োজনীয় টেস্ট', যা অনেক রোগীর জন্য বোঝা স্বরূপ।

আজন্ম কর্মঠ ইসলাম স্যার অবসরের পরেও নিজেকে কাজেই নিয়োজিত রেখেছিলেন। নতুন নতুন সৃষ্টি আর নতুন নতুন গড়ে তোলাই ছিল তার নেশা। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি চট্টগ্রামে গড়ে তোলেন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি (ইউএসটিসি), যা আমাদের দেশে বেসরকারি পর্যায়ে মেডিক্যালসহ বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসারে একটি বিশিষ্ট প্রতিষ্ঠান হিসেবে ভূমিকা রাখছে। এ প্রতিষ্ঠানটি চট্টগ্রামে গড়ে তোলার পেছনে কয়েকটি কারণ ছিল। চট্টগ্রামের সন্তান হিসেবে তিনি নিজ গ্রামকে এবং চট্টগ্রামকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন, চট্টগ্রামে কিছু প্রতিষ্ঠা করতে চাইতেন। অন্যদিকে সবকিছুকে রাজধানী কেন্দ্রিক না করে সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে ঢাকার বাইরে উন্নত মানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করতেন। কীর্তিমান এ পুরুষ তার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রায় ৩২টি গুরুত্বপূর্ণ দেশি-বিদেশি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রপতি স্বর্ণপদক (১৯৬৩), সিতারা ইমতিয়াজ পদক (১৯৭০), বিজ্ঞান লেখক পুরস্কার (১৯৮২), ফজলুল হক মেমরিয়াল পুরস্কার (১৯৮৭), স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৯৭), বাংলা একাডেমী পুরস্কার (২০০৩) ইত্যাদি। ধূমপান বিরোধী কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতিস্বরূপ পর পর ৩ বছর তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৮৭ সালে তিনি জাতীয় অধ্যাপকের পদ অলংকৃত করেন।

তিনি শুধু চিকিত্সা বিজ্ঞানী আর মুক্তবুদ্ধির চর্চাকারীই ছিলেন না, প্রকৃত অর্থে তিনি ছিলেন একজন ধর্মপরায়ণ আদর্শ মুসলিম। যেমন ছিলেন কঠোর প্রশাসক, কোনরূপ অন্যায় বিচ্যুতি সহ্য করতেন না, তেমনি ছিলেন পিতৃসম অভিভাবক, অধীনস্থ সবাইকে তিনি নিজের ছায়ায় রাখতেন। দেখা যেত কাজে ফাঁকি দেয়ায় বকাঝকা করতেন, আবার পরক্ষণেই তাকে পরম মমতায় কাছে টেনে বুঝিয়ে দিতেন। তাকে প্রায়ই বলতে শুনেছি 'শাসন করা তারই সাজে, সোহাগ করে যে'। ছাত্রদের প্রতি ছিল তার অপরিসীম স্নেহ, মমতা, ভালোবাসা। তিনি শুধু নির্দেশই দিতেন না, নিজে তা করে দেখিয়ে দিতেন, দৃষ্টান্ত রাখতেন। তার মধ্যে আরেকটি অনুকরণীয় গুণ ছিল কঠোর নিয়মানুবর্তিতা আর সময় সচেতনতা। তিনি নিজে সময় মত অফিসে আসতেন এবং সবাইকে তা করার নির্দেশ দিতেন। অনেক সময় বাইরে থেকে তাকে মনে হত খুব কঠিন, কিন্তু আসলে ছিলেন তার বিপরীত, অত্যন্ত নম্র এবং মৃদুভাষী স্বভাবের। আমি নিজে স্যারের একজন ছাত্র ছিলাম, যা আমার পরম সৌভাগ্য ও গর্বের। তার শিক্ষা ও আদর্শ আমাদের সকলের চলার পথের পাথেয় হয়ে থাকবে। চিকিত্সা বিজ্ঞান সম্পর্কিত আমার দুটি বই যা আন্তর্জাতিক প্রকাশক কর্তৃক প্রকাশিত হয়েছে, তা স্যার বেঁচে থাকতেই আমি তার নামে উত্সর্গ করতে পেরে নিজেকেই সম্মানিত ও গর্বিত বোধ করছি।

নূরুল ইসলাম স্যার সত্যিকারের একজন আলোকিত, আদর্শ মানুষ। তিনি সারাটা জীবন সততা, নিষ্ঠা আর একাগ্রতার সাথে কাজের মধ্যে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। আমাদের চিকিত্সা খাত, চিকিত্সা প্রতিষ্ঠান, এমনকি ওষুধ শিল্প বিকাশে তিনি যে অবদান রেখে গেছেন, জাতি তা চিরদিন শ্রদ্ধায় স্মরণ করবে। তিনি ক্ষণজন্মা পুরুষ, বেঁচে থাকবেন তার কর্ম ও প্রতিষ্ঠানের মাঝে। আমাদের ভবিষ্যত্ প্রজন্মের চিকিত্সকগণ তার আদর্শ ও দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে চিকিত্সা পেশার উন্নয়নে এবং রোগীদের সেবায় নিয়োজিত রেখে তার আদর্শকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন, এটাই হোক আমাদের কাম্য।

লেখক:ডিন, মেডিসিন অনুষদ, অধ্যাপক, মেডিসিন বিভাগ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
বিষয়ভিত্তিক টিভি চ্যানেল কেউ স্থাপন করতে চাহিলে সরকার বিবেচনা করবে—তথ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্য আপনি সমর্থন করেন কি?
4 + 5 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
সেপ্টেম্বর - ২২
ফজর৪:৩২
যোহর১১:৫২
আসর৪:১৪
মাগরিব৫:৫৮
এশা৭:১১
সূর্যোদয় - ৫:৪৭সূর্যাস্ত - ০৫:৫৩
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :