The Daily Ittefaq
ঢাকা, বুধবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ১ ফাল্গুন ১৪১৯, ২ রবিউস সানি ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ সেমিফাইনালে চিটাগং কিংস | মহিলা বিশ্বকাপ ক্রিকেট: প্রথমবারের মতো ফাইনালে উইন্ডিজ | জামায়াতের বিষয় নিয়ে কাল ইসির বৈঠক | জাবি ভিসির পদত্যাগের সিদ্ধান্ত | আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সংশোধন বিল সংসদীয় কমিটিতে অনুমোদন | ঢাকা মহানগর দায়রা জজ ও জেলা জজকে হাইকোর্টে তলব | মতিঝিল এলাকায় জামায়াত-শিবিরের তাণ্ডব | মোশতাকের নির্দেশে কিছু সেনাকর্মকর্তা জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করেছে: এটর্নি জেনারেল | বিপ্লবী বসন্তে আগুন ঝরছে শাহবাগে | কাদের মোল্লা ও কামারুজ্জামানের প্রেসক্লাবের সদস্যপদ বাতিল

ঝালে ঝোলে অম্বলে

উপদেশ শুধুই উপদেশ

চিররঞ্জন সরকার

কোনো প্রেমিক তার প্রেয়সীর কাছে উপদেশ চায় না, চায় ভালোবাসা, আলিঙ্গন। কোনো ভিক্ষুকও উপদেশ শুনতে পছন্দ করে না, সেও ভিক্ষা চায়। শুধু প্রেমিক বা ভিক্ষুকই নয়, উপদেশ কেউই পছন্দ করে না। কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো, আমাদের সমাজে সবাই শুধু উপদেশ দিতে চায়। উপদেশ দেয়ার ক্ষেত্রে ধর্মগুরু, রাজনৈতিক নেতা, ফতোয়াবাজ, অভিভাবক, বুদ্ধিজীবী, বন্ধু, প্রেয়সী এমনকি বয়সে যারা ছোট— পরিবারের ভেতর ছোটভাই বা ছোটবোনরাও কম যায় না। আমাদের সমাজ জুড়ে কেবলই উপদেশ-দাতা, জীবনের প্রতি পদে কেবল উপদেশ আর উপদেশ। আমাদের অর্থমন্ত্রী সাহেব যদি উপদেশের ওপর কিছু কিছু করে ট্যাক্স আরোপ করতেন, তাহলে তা নিঃসন্দেহে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের চাইতেও কয়েকগুণ বেশি হত। এই টাকা দিয়ে অনায়াসে একাধিক পদ্মাসেতুও নির্মাণ করা যেত।

এটা করো না, ওটা করো, ওভাবে করো না, এভাবে করো— এ জাতীয় ফালতু কথা বা উপদেশ কেউই মানতে চায় না বা মানতে পারে না। তারপরও এটা-ওটা করা বা না করার উপদেশ আমরা একে-অপরকে প্রতিনিয়ত দিয়েই যাচ্ছি। এ এক আশ্চর্য প্রবণতা।

আমাদের দেশে কম-বেশি প্রত্যেক মানুষই নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করে। সে যা জানে-বোঝে, অন্যকেউ তার ধারে কাছেও নেই—এমন একটা ভাব বেশিরভাগ মানুষের মধ্যেই দেখা যায়। আর তাইতো সবকিছু গ্রহণ করতে রাজি হলেও উপদেশ গ্রহণের ক্ষেত্রে সবার মধ্যেই প্রবল আপত্তি। ঘন ঘন হরতাল যেমন রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে হরতালের উপযোগিতাকে প্রায় অকার্যকর বানিয়ে ফেলেছে, ঠিক তেমনি কারণে-অকারণে বেশি-বেশি দেয়ার ফলে উপদেশও এখন গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেছে। এখন যে যাকে, যে উদ্দেশ্যে, যত গুরুত্বপূর্ণ উপদেশই দিক না কেনো, কেউ আর তা শুনতে চায় না, মানতেও চায় না। শুধু তা-ই নয়, উপদেশ শুনলে চটে যায় বা বিরক্ত হয় এমন মানুষেরর সংখ্যা আমাদের সমাজে মৌলবাদীদের হিংস তার মতই ব্যাপকভাবে বাড়ছে। তারপরও অবশ্য উপদেশ আর উপদেশদাতার কোনো ঘাটতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।

উপদেশ কোনো কাজে আসে না, কারো উপদেশ কেউ কখনো মানে না (খারাপটা ছাড়া) তারপরও মানুষ কেন চান্স পেলেই উপদেশ দেয়, এ বিষয়ে গবেষণা হতে পারে (এটাও উপদেশ হয়ে গেল নাতো?)। মানুষের জীবনের অসংখ্য রহস্যের মধ্যে উপদেশ দেয়ার বাতিকটাও নিঃসন্দেহে একটা বড় রহস্য। মানুষ কেন উপদেশ দেয়, উপদেশ দিতে চায়, আবার কেনই বা কেউ কারো উপদেশ মানতে চায় না, এসব রহস্য ভেদ করা সৃষ্টি-তত্ত্ব কিংবা যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে শাস্তি হিসেবে ফাঁসির রায় না আসার মতই জটিল এবং কঠিন।

উপদেশ নিয়ে বাহুল্য কচকচানি ছেড়ে আমরা বরং একটু বাস্তব-উপদেশ অর্থাত্ আমাদের প্রিয় 'দাতাগোষ্ঠীর উপদেশ' নিয়ে খানিকটা আলোচনা করি। বিষয়টি আমাদের জন্য জরুরিও বটে। বর্তমানে আমাদের দেশে বিভিন্ন উন্নয়ন-সহযোগী কিংবা দাতা-সংস্থাগুলোর দান-খয়রাত কমলেও উপদেশ প্রদানের মাত্রা অনেক বেশি বেড়ে গেছে। ইউরোপ-আমেরিকা থেকে তারা উড়ে উড়ে আসছেন, এদেশে এসে অত্যন্ত উপাদেয় সব উপদেশবাণী দিয়ে আমাদের সমৃদ্ধ করে চলে যাচ্ছেন।

এখানে বলে রাখা ভাল, দাতাদের উপদেশ ততটা পুষ্টিকর না হলেও অনিবার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ আমরা আমাদের অর্থনীতি এবং মনমানসিকতাকে এমনভাবে সাজিয়েছি যে, ছিটে-ফোঁটা হলেও বিদেশি সাহায্য বা ঋণ-অনুদান ছাড়া আমরা অচল। তাদের আমরা রক্ষাকর্তা, 'প্রাণেশ্বর' বানিয়ে ফেলেছি। তাদের 'দয়ার দান' নিয়েই আমাদের ফুটানি, টিকে থাকা। আর যারা টাকা পয়সা দেন, দান-খয়রাত করেন, তারা বোনাস হিসেবে কিছু উপদেশও দেবেন—এটা স্বাভাবিক। আমাদের দেশে দান বা ঋণের চাইতে দাতারা উপদেশ দেন বেশি। এরও অবশ্য কারণ আছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাদের দেয়া ঋণ, অনুদানের টাকা আমরা মেরে খাই। যে কারণ দেখিয়ে, যেভাবে, যে কাজের কথা বলে আমরা টাকা বাগাই, পরে আর সেটা সেভাবে করি না। পুকুর কাটার জন্য টাকা এনে আমরা পুরোটাই মেরে দিতে চাই। তারপর দাতারা পুকুর দেখতে চাইলে আমরা তাড়াহুড়ো করে একটা গর্ত খুঁড়ে সেটাকে পুকুর হিসেবে চালাই। দাতারা সব বোঝে। তারা আমাদের চালাকি আর মিথ্যাচার সব উপভোগ করে।

গরিবের সঙ্গে মশকরা করে বড়লোকেরা যে তৃপ্তি পায়, তা নাকি আর কিছুতে পায় না। তবে দাতারা আমাদের চালাকি উপভোগ করলেও তাদের স্বার্থ ও সুবিধা পুরোপুরি অর্জন না হওয়ায় অতঃপর টাকার পরিমাণ কমিয়ে দেয়। আগেরবার সামান্য পুকুর কাটার জন্য যে টাকা তারা দিয়েছিল, পরবর্তী সময় 'সমুদ্র খননের' জন্য বরাদ্দ দেয় তার অর্ধেক। একইসঙ্গে দেয়া হয় এক সমুদ্র শর্ত ও উপদেশ। দাতাদের মনোভাবটা এমন, তোমরা ব্যাটারা তো আর উপদেশ মেরে খেতে পারবে না, কাজেই ও জিনিস বেশিই নাও। আর চুরিতে তোমরা যেহেতু ওস্তাদ, কাজেই টাকার পরিমাণ কমতে থাকুক। অবশ্য এই তথাকথিত দাতারা নিজেদের স্বার্থ ও সুবিধাটা দেখে সবার আগে। তাদের ঋণ বা সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে অনেক গোপন অভিসন্ধি থাকে। থাকে নানা রকম হিসাব-নিকাশ, ধান্দা, রাজনীতি। ফায়দা হাসিলের সম্ভাবনার ঘাটতি দেখা দিলে তারা নানা রকম ধানাই-পানাই শুরু করে দেয়। যেমনটা হয়েছে পদ্মা সেতুর ক্ষেত্রে।

তারা এতটাই চালাক যে, আজগুবি সব অভিযোগ আর শর্ত আমাদের উপর চাপিয়ে দেয়। উন্নয়ন সহযোগিরা ইদানীং অবশ্য উপদেশ নিয়ে একটু বাড়াবাড়িই করছে। তারা একের পর এক উপদেশ দিয়েই চলছে। আমাদের পক্ষে যা সম্ভব নয়, তেমন উপদেশও মাঝে মাঝে দিচ্ছে, বার বার বলছে। যেমন তারা বলছে, রাজনৈতিক ঝগড়া আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই মিটিয়ে ফেল, দুর্নীতি কমাও, ব্যয় কমাও, বন্দর-তেল-গ্যাসের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নাও, আমদানি শুল্ক কমাও, জ্বালানির দাম বাড়াও, কৃষিখাতে ভর্তুকি কমাও—এমনি অসংখ্য সব উপদেশ। এসব উপদেশ মেনে চলা স্বাভাবিকভাবেই আমাদের সরকারের পক্ষে সম্ভব হয় না। কারণ দাতাদের সব শর্ত মানলে জনগণ বিগড়ে যেতে পারে। আর জনগণকে সমীহ করে না চললে আম-ছালা দুটোই হারানোর আশঙ্কা থাকে।

দাতাদের উপদেশ সচেতন মানুষকে অনেক সময় ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত করে। হয় তারা টাকা দেবে, অথবা দেবে না। কিন্তু এত শত উপদেশ দেয়ার তারা কে? তাছাড়া দাতাগোষ্ঠীর বোঝা উচিত আমরা টাকা চাই, ঋণ-অনুদান-সাহায্য চাই; কিন্তু উপদেশ চাই না। উপদেশ দেয়ার জন্য দাতাগোষ্ঠীর কোনো প্রতিনিধি এদেশে না এলেও চলবে। আমাদের দেশে মন্ত্রী থেকে যন্ত্রী, বুদ্ধিজীবী থেকে পকেটমার, মজুর থেকে কেবিনেট সচিব উপদেশ দেয়ার ক্ষেত্রে সবাই সমান দক্ষ। আমাদের আর যা কিছুরই অভাব থাকুক না কেনো, উপদেশের কোনো অভাব নেই। কাজেই আমাদের ও জিনিসের কোনো দরকার নেই। আমাদের টাকার অভাব। তাই টাকা চাই, উপদেশ চাই না।

দাতারা মাঝে মাঝে আমাদের সরকারকে ধমকেও যায়। যা করার কথা তা করা হচ্ছে না বলে উষ্মা প্রকাশ করেন। দাতাদের এ ধরনের আচরণ মোটেও কাম্য নয়। তারা কি শোনেনি যে, ধৈর্যই ধর্ম, যে সহে সে রহে? আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কি তারা কোনো শিক্ষাই গ্রহণ করবে না? আমরা যুগের পর যুগ, গণতন্ত্র, সুশাসন, আর্থিক উন্নতি, মোটা ভাত, মোটা কাপড়, মৌলিক অধিকারের বাস্তবায়ন, বৈষম্যহীন-সুখী-সমৃদ্ধ শান্তিপূর্ণ সমাজের জন্য অপেক্ষা করেছি। আমাদের দেশে যখন যারা ক্ষমতায় গেছেন, তারাই আমাদের সুদিনের স্বপ্ন দেখিয়েছেন। করছি, করব, হচ্ছে, হবে বলে আমাদের ভুলিয়ে রেখে নিজেদের আখের গুছিয়েছেন। কিন্তু আমাদের কাঙ্ক্ষিত সেই দিন আসেনি। পরিস্থিতি একটু একটু করে বরং খারাপ হয়েছে। তারপরও আমরা ধৈর্য হারাইনি। এখনো হারাচ্ছি না। বিদ্যুত্, জ্বালানি নিয়ে তেলেসমাতি কাণ্ড চললেও আমরা বিক্ষুব্ধ হইনি। জিনিসপত্রের দাম বাড়তে বাড়তে আকাশছোঁয়া হলেও আমরা হতাশ হইনি। সরকারের প্রতি আমরা অনাস্থাও জ্ঞাপন করিনি। কারণ আমরা ধৈর্য ধারণের শিক্ষা গ্রহণ করেছি। কিন্তু দাতারা কি আমাদের কাছ থেকে কোনো শিক্ষাই নিতে পারে না? গরিব বলেই কি আমাদের প্রতি এই অবহেলা? আর সরকারের কর্তাব্যক্তিদেরও বুঝতে হবে দাতাদের স্বভাব-চরিত্র। তাদের আচার-ব্যবহার। তাদের কাছে টাকা নিতে চাইলে শর্ত মানতেই হবে। উপদেশ শুনতেই হবে। শর্ত এবং উপদেশই তাদের টাকা ছাড়ের একমাত্র অস্ত্র। নিজেদের মত চলতে চাইলে দাতাদের ঋণ-সাহায্য বর্জন করতে হবে। কোনো রকম শর্ত-উপদেশহীন সহায়তা আমরা কীভাবে আশা করি? কাকের কাছে কি কখনও কোকিলের কু-হু আশা করা যায়? বোবার কাছে কখনও উচ্চাঙ্গসঙ্গীত শোনার বায়না ধরা যায়? কুজোকে চিত্ হয়ে শুতে অনুরোধ করা কি সঙ্গত? পদ্মা সেতু ইস্যুতে অন্যতম দাতা সংস্থা বিশ্বব্যাংকের ভূমিকা আমাদের মোটেও ভাল লাগেনি। পদ্মা সেতুতে অর্থ বিনিয়োগের না করার পেছনের কারণগুলোর দিকে দৃষ্টি না দিয়ে, তাদের কথামত দুর্নীতির অভিযোগকেই যদি সত্যি বলে মানি, তারপরও বলব, আমরা দুর্নীতিই করি আর সুনীতিই করি— তাতে তোমাদের কী?

আমরা ভোট দিয়ে বর্তমান সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়েছি। এ সরকার আমাদের সরকার। তারা যা খুশি তাই করুক তা নিয়ে তোমাদের এত মাথা ব্যথা কেন? এই মহাজোট সরকারের 'পাঁঠা' যদি তারা লেজের দিকে জবাই করে তাতে বিশ্বব্যাংক বা দাতাগোষ্ঠীর বলার কী আছে?

 লেখক : কলামিস্ট

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
বিএনপি বলেছে শাহবাগের কিছু ঘটনা ফ্যাসিবাদের প্রতিধ্বনি। দলটির বক্তব্য আপনি সমর্থন করেন?
5 + 6 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
অক্টোবর - ১৮
ফজর৪:৪১
যোহর১১:৪৪
আসর৩:৫২
মাগরিব৫:৩৪
এশা৬:৪৫
সূর্যোদয় - ৫:৫৭সূর্যাস্ত - ০৫:২৯
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :