The Daily Ittefaq
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৪, ১ ফাল্গুন ১৪২০, ১২ রবিউস সানী ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ মানিকগঞ্জে বাসে ধর্ষণ : চালক-সহকারীর যাবজ্জীবন | লক্ষ্মীপুরে যুবলীগ কর্মীকে গুলি করে হত্যা | বাতিল হওয়া সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ১৪ মার্চ | কোপা দেল রে'র ফাইনালে বার্সেলোনা

[ নি র্বা চ ন ]

আসন্ন উপজেলা নির্বাচন রাজনীতির জন্য এসিড টেস্ট

প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আবদুর রশীদ

শুরু হলো মাতৃভাষার মাস। এ মাসটি বাংলাভাষী জনগণের জন্য আবেগ ও মর্যাদার মাস। জাতি-রাষ্ট্র গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে মাতৃভাষা অন্যতম প্রধান উপাদান। আত্মপরিচয়ের প্রশ্নে ভাষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ তথাকথিত দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ধর্মীয় আবরণ দ্বারা আচ্ছাদিত চেতনা-উত্সারিত পাকিস্তানী জাতীয়তাবাদ ছিল খুবই দুর্বল এবং অংশত 'কৃত্রিম'। ফলে পূর্ব-পশ্চিম বৈষম্য, অভ্যন্তরীণ কলোনী ধারার পাঞ্জাবী অপশাসন ও শোষণ শীঘ্রই 'বাস্তব' হয়ে উঠতে শুরু করেছিল। তবে অন্যান্য ক্ষেত্রে বৈষম্য শোষণ ও বঞ্চনা যতটা না অনুভূত হয়ে উঠেছিল তার চেয়ে বহুগুণ অনুভূত হয়েছিল তখন যখন জাতীয় চেতনার মূল উত্স সংস্কৃতির প্রতি আক্রমণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায় আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের বীজ-মন্ত্র ভাষা এবং সংস্কৃতির ওপর বর্বর পাকিস্তানীদের প্রত্যক্ষ আক্রমণ থেকে আরম্ভ হয়েছিল। অথচ গত বছর ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ভাষা-সংস্কৃতি ভিত্তিক জাতীয়তাবোধের স্তম্ভগুলোর ওপর চিহ্নিত মহল চূড়ান্ত সন্ত্রাসী আক্রমণ আরম্ভ করেছিল। স্বভাবতই তাদের এই বর্বর আক্রমণের লক্ষ্য ছিল আমাদের স্বাধীনতার মূল চেতনার জায়গা স্বাধীনতাপন্থি জনসমাজের ওপর আক্রমণ, স্বাধীনতার প্রতীক ধ্বংস করা, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ভিত্তি বিনষ্ট করার মানসে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর '৭১ সালের কায়দায় অকথ্য আক্রমণ।

গত এক বছরে বিএনপির আন্দোলন সরকার উত্খাতের হুমকির বিভিন্ন ঘটনা পরম্পরা ধারাবাহিকভাবে পর্যালোচনা করলে এর সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়। বিএনপি তার জন্মলগ্ন থেকেই 'বাঙালিত্বের' বিপরীতে 'বাংলাদেশীত্ব' প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা মূলত মুক্তিযুদ্ধের আদি চেতনার বিরুদ্ধে '৭১ এর আগেকার পাকিস্তানী 'কৃত্রিম' জাতীয়তাবোধ পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রয়াস চালায়। এ প্রচেষ্টা বিএনপি এখনও অব্যাহত রেখেছে এবং বলা যায়; আরো জোরালোভাবে। তাই দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন চাপের পরও জামায়াতকে ত্যাগ করা বিএনপি 'সংগত' মনে করে না। এ বিছিন্নতা যারা 'সম্ভব' বলে মনে করেন তারা হয়তো বাস্তবতা উপলব্ধির বিষয়ে কিছুটা 'ভ্রান্তির' মধ্যে রয়েছেন। কেননা আমরা যতভাবেই বলি না কেনো যে রাজনীতিতে আদর্শ এখন মৃতপ্রায় (এন্ড অব আইডিওলজি), কিন্তু বাংলাদেশে আদর্শ এখনও রাজনীতিতে 'সক্রিয়' অবস্থায় রয়েছে এবং থাকবে ততদিন যতদিন '৭১ এর মূল চেতনার প্রশ্নে বড় দুটি দলের মধ্যে সমঝোতা বা ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত না হয়। তবে আমার মনে হয় এ ধরনের ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়া সহজ নয়। তারচেয়ে বরং '৭১ এর মতো 'নক আউট' প্রক্রিয়া ব্যতীত এর মূল উত্পাটন হবে না। আমার এ বক্তব্য 'চরম' বলে মনে হলেও এটি সত্য; এটিই বাস্তব। অথচ পরিতাপের বিষয় হলো সুশীল সমাজের অনেকেই এ বাস্তবতাকে মেনে নেন না। তথাকথিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা থাকলে 'দলীয় মনোনয়ন' নিয়ে তাঁদের কেউ কেউ 'তিন দিনের বৈরাগী' হওয়ার সুযোগ অর্জন করতে পারেন। হয়তো এ ধরনের কামনা-বাসনাও তাঁদেরকে পেয়ে বসেছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা যেমন 'কাঁটা স্বরূপ'। তেমনি সুশীল সমাজের 'দলীয়করণের' ক্ষেত্রেও এটি একটি 'কারণ' হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্মোহভাবে সমাজ ও রাজনীতি বিশ্লেষণ করার মতো সুশীল মানবের সংখ্যা সম্ভবত এখন শূন্য।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ইস্যু বাংলাদেশের রাজনীতির সন্ত্রাসকরণ প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে চূড়ান্ত রূপ প্রদান করে। মানবতাবিরোধ বিচার স্তব্ধ করে দেবার মূল লক্ষ্য অর্জনের নিমিত্তে জামায়াত-বিএনপি এই ইস্যুটি চরমভাবে ব্যবহার করে। নির্বাচন ঠেকাবার জন্য তীব্র গণআন্দোলনের ডাক দিয়েও তারা ব্যর্থ হয়ে অবশেষে একটানা হরতাল-অবরোধ এবং নির্বাচন 'প্রতিরোধের' মতো 'অফেনসিভ' কর্মকাণ্ডের ডাক দেয়। ফলে বিগত তিন মাস বাংলাদেশে যে মাত্রার সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটেছে তা জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে কারো অজ্ঞাত নয়। জ্বালাও পোড়াও, খুন, চলন্ত বাসে পেট্রোল বোমা মেরে মানুষ পুড়িয়ে মারা। ট্রেনের ফিস প্লেট তুলে ফেলা, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের মানুষ হত্যা করা, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর মানবতা বিরোধী অপরাধ সংঘটিত করা, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের কায়দায় আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠা—কোনটিই বাদ যায়নি। এমন একটি ভয়াবহ অবস্থার মধ্যে বিগত ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিএনপি ও তাদের জোট এ নির্বাচনকে 'অবৈধ' বলছে যদিও এ ধরনের বক্তব্যের কোন সাংবিধানিক ভিত্তি নেই। সন্ত্রাসী ঘটনার জন্য দেশের অর্থনীতি দারুণ ক্ষতির মুখোমুখি হয়ে পড়েছিল। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংগঠনের হিসাব মতে, এর পরিমাণ প্রায় পঞ্চাশ হাজার কোটি টাকা। 'রোল মডেল' বাংলাদেশ আজ বেশ 'হোঁচট' খেয়েছে। এ বছর গড় আয় বিগত বছরের তুলনায় বেশ কিছুটা নিম্নগামী। জাতির জন্য এর চাইতে দুর্ভাগ্যের কী হতে পারে।

আন্দোলন জমিয়ে তোলার ব্যর্থতা, আন্তর্জাতিক মহলের নানামুখী চাপ, সরকারের কঠোর মনোভাব বিশ্লেষণ করে বিএনপি ও তার জোট দু'পা পিছিয়ে আসে এবং বর্তমানে দেশে তুলনামূলকভাবে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। কিন্তু এ পরিস্থিতির অবনতি 'সময়ের ব্যাপার মাত্র' বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ দেখা দিচ্ছে। প্রথমত: বিএনপি ও তার মিত্রজোট আবার পেছনে ফেরানো পা' সামনে এগিয়ে আনতে শুরু করেছে। অর্থাত্ তারা আবার রাজনীতির বদলে সন্ত্রাসমুখী হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে তারা আগের যৌক্তিক-অযৌক্তিক দাবির প্রতি অনড় অবস্থানের দিকে এগুচ্ছে। সন্ত্রাসী সংগঠন বলে আদালত কর্তৃক অভিযুক্ত এবং আন্তর্জাতিক মুরুব্বি কর্তৃক কথিত এবং দেশের শান্তিপ্রিয় জনগণ কর্তৃক উপলব্ধিকৃত জামায়াত-শিবিরকে পরিত্যাগ করার বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা শুরু করার পরিবর্তে বিএনপি আবার বিপুল বিক্রমে জামায়াত-শিবিরমুখী হয়ে পড়ছে।

তাদের মূল লক্ষ্য মানবতা বিরোধীদের বিচার ঠেকানোও সম্ভব হচ্ছে না। এমতাবস্থায় তারা কীভাবে জামায়াতকে বাদ দেবে? আগের অবস্থানে ফিরে যাওয়াই তাদের জন্য সম্ভবত 'বিকল্পবিহীন' রাস্তা।

তবে সম্প্রতি ঘোষিত উপজেলা নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, সুশাসন প্রদানের ব্যর্থতার জন্য নানা কারণে জনগণ আওয়ামী লীগের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। আওয়ামী লীগের বিগত সরকার রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হাতে নিয়েছিল, অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও তাদের সাফল্য সামান্য নয়। কিন্তু জনমতকে নিজের পক্ষে রাখার জন্য একটি সরকারের এটিই শেষ কথা নয়। এ জন্য 'সুশাসন' গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আওয়ামী লীগ বিগত সরকারের আমলে এটি উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছিল। এ কারণেই কোন প্রকার 'ইতিবাচক অবদান' না রেখেই বিএনপি কেবলমাত্র সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে জনগণকে তাদের পক্ষে আনতে বেশ কিছুটা সফলতার পরিচয় রেখেছিল।

সম্ভবত বর্তমান সরকার বিগত সময়ের ভুলত্রুটি এখন উপলব্ধি করতে পারছে এবং সে জন্য কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়া আরম্ভ করেছে এবং বলাবাহুল্য জনগণ কর্তৃক তা সমর্থিত হচ্ছে। সত্ ও যোগ্য লোকদের সরকার পরিচালনায় সামনের কাতারে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে যতটুকু 'গর্জন' হচ্ছে ততটুকু 'বর্ষণ' না হলে তার ফলাফল আগের চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে। আশা করা যায়, আওয়ামী নেতৃত্ব বিষয়টি উপলব্ধি করবেন।

বিএনপি ও তার মিত্ররা সরকারকে 'অবৈধ' বলার পরও রাজনৈতিক 'কৌশল' হিসেবে উপজেলা নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছে। কর্মীদের মনোবল ফিরিয়ে আনার চেয়েও বড় কথা, তাদের জনপ্রিয়তা কী পরিমাণ আছে— তাও তারা পরীক্ষা করতে চায়। সামনের নির্বাচনে বিএনপি ও তার মিত্ররা উপজেলার অধিকাংশ স্থানে বিজয়ী হলে পরে তারা সরকার পতন এবং পুনরায় নির্বাচনের দাবিতে মুখর হয়ে উঠবে। তারা নৈতিক শক্তিও ফিরে পাবে। সরকার তখন যদি গতানুগতিকভাবে নির্বাচন করতে চায় তার ফল হবে উল্টো। বিশেষ করে মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচার, '৭১ এর স্পিরিট ভূলুণ্ঠিত হয়ে পড়বে। সরকারের পক্ষে কূল রক্ষা করা আর সম্ভব হবে না। সুতরাং সরকার যদি জয়ী হতে চায় তাহলে জনগণ এবং জাতির জন্য 'ইতিবাচক' পদক্ষেপের সঙ্গেই সামনে এগুতে হবে। এ বিষয়ে দ্বিচারিতা, দ্বিধা-দ্বন্দ্ব 'আত্মঘাতী' হবে। তাই বলা যায়, আগামী উপজেলা নির্বাচন শুধুমাত্র জনপ্রিয়তার 'এসিড টেস্ট' নয়, জাতির জন্য একটি চূড়ান্ত 'অগ্নিপরীক্ষা'।

লেখক: সাবেক সভাপতি, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছেন, ৫ বছর পর একাদশ সংসদ নির্বাচন হবে এবং তা হবে বর্তমান সংবিধান আলোকেই। আপনি কি তার সাথে একমত?
8 + 7 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
এপ্রিল - ২৩
ফজর৪:১০
যোহর১১:৫৭
আসর৪:৩১
মাগরিব৬:২৬
এশা৭:৪৩
সূর্যোদয় - ৫:৩০সূর্যাস্ত - ০৬:২১
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :