The Daily Ittefaq
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৪, ১ ফাল্গুন ১৪২০, ১২ রবিউস সানী ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ মানিকগঞ্জে বাসে ধর্ষণ : চালক-সহকারীর যাবজ্জীবন | লক্ষ্মীপুরে যুবলীগ কর্মীকে গুলি করে হত্যা | বাতিল হওয়া সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ১৪ মার্চ | কোপা দেল রে'র ফাইনালে বার্সেলোনা

কেমন হবে বাংলাদেশের ভবিষ্যত্ রাজনীতি

শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন

বাংলাদেশের ৪২ বছরের ইতিহাসে ২০১৩ সাল ছিল ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ একটি বছর। এতটা উত্তাল সময় একটা জাতির জীবনে বার বার আসে না। গত বছরের রাজনৈতিক দৃশ্যপটগুলো এত দ্রুত পরিবর্তন হয়েছে যে একটি ঘটনার রেশ মিলিয়ে যাওয়ার আগেই আরেকটি ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে। ঘটনার বিশ্লেষণে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা হিমশিম খেয়েছেন। অনেকক্ষেত্রেই রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও বিশ্লেষকদের অনুমানকে ওলট পালট করে দিয়ে ঘটনা নতুন নতুন বাঁক নিয়েছে। দৃশ্যপটের দ্রুত পরিবর্তন, তার ডালপালা বিস্তার ও জাতীয় জীবনের নানাক্ষেত্রে তার অভিঘাত ২০১৩ সালকে করেছে সংঘাতময়, সহিংস, বিয়োগান্ত, বর্ণিল ও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যেমন, রাজনৈতিক অর্থনীতির ইতিহাসেও তেমনি এ বছরটি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হবে। বাঙালির জাতিগত বিভাজন, ধর্ম-ঐতিহ্য ও উত্সবের প্রতি ঝোঁক, হুজুগেপনা ও উপলব্ধিসহ সামাজিক, সাংস্কৃতিক নানা বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার অনেক উপাদান ২০১৩ সালের ঘটনাপ্রবাহ থেকে ভবিষ্যত্ গবেষকরা পাবেন বলে আমার বিশ্বাস।

৭১ সালের হন্তারকদের একের পর এক ফাঁসির রায়, সাঈদীর রায়ের পর সারাদেশে চরম অরাজকতা সৃষ্টি, কোটি জনতার স্বতস্ফূর্ততায় গড়ে ওঠা গণজাগরণ মঞ্চ, তার প্রতিবাদে হেফাজতে ইসলামের অভূতপূর্ব উত্থান ও জমায়েত, রানা প্লাজার বিয়োগান্ত ঘটনা, নির্দলীয় সরকার ছাড়া জাতীয় নির্বাচনের প্রতিবাদে বিরোধী দলের সহিংস অবরোধ, অসংখ্য নিরীহ মানুষের পেট্রোল বোমায় অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যু, বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর করা ইত্যাদি নানা ধরন ও মাত্রার ঘটনা ২০১৩ সালকে বর্ণিল, বৈচিত্র্যময়, মর্মান্তিক ও গুরুত্বপূর্ণ করেছে। নানা সংশয় ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে এবছরের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে। নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের পর নতুন সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করছে।

বিরোধী দলের সহিংস এবং শিক্ষা ও অর্থনীতি বিধ্বংসী অবরোধের অবসান হওয়ায় জনজীবনে স্বস্তি ফিরে এসেছে, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ জনজীবনে গতি ফিরে এসেছে। কিন্তু ২০১৩ সালে বাঙালি জাতির মধ্যে যে বিভাজন লক্ষ্য করা গেছে, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও চেতনার নানা ক্ষেত্রে বিরাজমান ক্ষোভ-বিক্ষোভ ও অসন্তোষের যে সহিংস প্রকাশ ঘটেছে, তার সবকিছুর মীমাংসা হয়ে গেছে এমনটা মনে করা ঠিক হবে না। গত কয়েক বছরের সালতামামি, বিশেষ করে ২০১৩ সালের ঘটনাপ্রবাহ, সামপ্রতিক বিএনপি'র রণে ভঙ্গ দেয়া ও মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী সংগঠনের ভিত্তি কাঠামো ভেঙ্গে পড়ার প্রেক্ষিতে ভবিষ্যত্ বাংলাদেশের রাজনীতি কোন্ দিকে মোড় নেয় তা প্রত্যেকাটি সচেতন নাগরিকের জন্য কৌতূহলের বিষয়। সেই কৌতূহলের কথা মাথায় রেখে বাংলাদেশের ভবিষ্যত্ রাজনীতির জন্য কিছু বিষয়কে আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। আর এ বিষয়গুলো বাংলাদেশের ভবিষ্যত্ রাজনীতির ঝোঁকগুলো নির্ধারণ করবে বলে প্রতীয়মান হয়।

প্রথমত, অনেকের ধারণা ছিল ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের পর দশম সংসদের মেয়াদ হবে ক্ষণস্থায়ী এবং নতুন সরকারের পক্ষে খুব বেশিদিন ক্ষমতায় থাকা সম্ভব হবে না। কিন্তু এ ধারণা সত্যি প্রমাণিত হয়নি। খোদ বিএনপি এখন নতুন সরকারের বৈধতা দিতে চলেছে। কেননা দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হচ্ছে এ অজুহাতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট জাতীয় সংসদের নির্বাচন বর্জন করেছিল, কিন্তু ওই একই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন দলীয় সরকারের অধীনে তারা উপজেলা নির্বাচনে যাচ্ছে। এতে কি বিএনপি কথিত 'অবৈধ সরকার' বৈধতা পেয়ে যাবে না? অনেকেই মনে করেন, নবীন-প্রবীণের সমন্বয়ে গঠিত বর্তমান মন্ত্রিসভা আগের মন্ত্রিসভার চেয়ে অনেক বেশি অভিজ্ঞ ও পরিপক্ব। এছাড়া বর্তমান মন্ত্রিসভায় বিভিন্ন দল ও শ্রেণী-পেশার প্রতিনিধিত্ব থাকায় তা একটি ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। নতুন মন্ত্রিসভা যদি দায়িত্বশীলতা, পরিপক্বতা ও দূরদর্শিতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে যেমন নিশ্চিত করবে, তেমনি তা বিএনপিসহ সরকার বিরোধী দল ও গোষ্ঠীকে গঠনমূলক হতে উত্সাহিত করবে।

দ্বিতীয়ত, গণতন্ত্রে শক্তিশালী বিরোধী দলের কোন বিকল্প নেই। 'অফিসিয়ালী' জাতীয় পার্টি বিরোধী দল হলেও এ ধরনের 'অফিসিয়াল' বাস্তবতা পরিহাসে পরিণত হয়। তাত্ত্বিক আলোচনার নানা তকমা লাগানো হলেও 'জাতীয় পার্টি' মূলত 'গৃহপালিত বিরোধী দল' হিসেবেই পরিচিতি লাভ করবে। গণতন্ত্রকে কার্যকর করার কথাই বলি অথবা রাষ্ট্রের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার কথাই বলি, আমাদেরকে নির্ভর করতে হবে বিএনপি'র ওপর। কেননা, তাদের পেছনে জনগণের একটি বড় অংশের সমর্থন রয়েছে। তবে আশংকার কথা হচ্ছে, বিএনপি তার উদার ডানপন্থী অবস্থান থেকে সরে গিয়ে চরমপন্থী জামায়াতে ইসলামী ও হেফাজতে ইসলামের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। এজন্য তরুণ প্রজন্ম, সুশীল সমাজ, উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোর কাছে বিএনপি'র ইমেজ এখন প্রশ্নবিদ্ধ। ৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের ব্যাপারেও বিএনপি'র অবস্থান পরিষ্কার নয়। জামায়াতে ইসলাম ও হেফাজতে ইসলাম নির্ভরতা বাদ দিয়ে ও সহিংস রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিহার করে বিএনপি যদি গঠনমূলক রাজনীতির ধারায় ফিরে আসে, তাহলে তা তাদের ইমেজ পুনরুদ্ধারে যেমন সহযোগিতা করবে, তেমনি তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার পথকেও মসৃণ করবে বলে মনে হয়। (আর জনগণ বা দেশের কল্যাণের কথা যতই বলুক না কেন, মূলত যে কোন উপায়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাওয়াই হয়ে গেছে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর লক্ষ্য ।)

তৃতীয়ত, অর্থনীতির নানা ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ব্যাপক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সামাজিক উন্নয়নের নানা সূচকেও বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে। এ ধরনের একটি আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় দিনের পর দিন অবরোধ দিয়ে বিরোধী জোট দেশকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল। এ আন্দোলনে জনগণের যেমন কোন সংশ্লিষ্টতা ছিল না, অন্যদিকে এটি ছিল পেট্রোল বোমা ও নাশকতা নির্ভর একটি আন্দোলন। ফলে বিরোধী জোটের প্রতি মানুষ বিরক্ত হয়েছে এবং তাদের সহিংসতা দেখে আতংকিত হয়েছে। ভবিষ্যতে যে কোন রাজনৈতিক দল বা জোট এ ধরনের সহিংস আন্দোলনে যাওয়ার আগে একশবার ভেবে দেখবেন বলে আমার মনে হয়। যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল পরিচালিত এক সাম্প্রতিক জরিপ সে কথাই বলছে। গত বছরে অনুষ্ঠিত ৪টি সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থীরা বিপুল ভোটে জয়ী হলেও জামায়াতের নাশকতা এবং দিনের পর দিন ১৮ দলীয় জোটের সহিংস অবরোধের ফলে বিএনপি'র জনসমর্থন ভয়ানকভাবে কমে যায়। ওই জরিপে অংশগ্রহণকারীরা বলেছেন যে, ৫ জানুয়ারির ভোট যদি সর্বদলীয় হত তাহলে ৪২.৭% ভোটার আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থীদের এবং ৩৫.১% ভোটার বিএনপিকে ভোট দিতেন।

চতুর্থত, বছরখানেকেরও বেশি সময় ধরে জামায়াতে ইসলামী পুলিশসহ সরকারি বাহিনী ও স্থাপনার ওপর যেভাবে হামলা করছে তা রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল। আবার অনেক ক্ষেত্রে বিএনপিও সহিংসতাকে এমনভাবে প্রশ্রয় ও উস্কানি দিয়েছে যা নিয়মতান্ত্রিক বিরোধী দলের কাছে কাম্য নয়। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের মত গণতান্ত্রিক দল সরকারে থেকে যেভাবে বিএনপি'র শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনকে দমন করেছে তাও কাম্য নয়। ভবিষ্যতের সরকারগুলো পুলিশকে দিয়ে কতটা দমন-পীড়ন চালাবে এবং সেই বাস্তবতা মাথায় রেখে রাজনৈতিক আন্দোলনগুলো কতটা জনসম্পৃক্ত সে বিষয়েও অনেকের কৌতূহল জন্ম নিয়েছে। পরিশেষে, একটি কথাই বলতে চাই, আর তা হল- ৬০, ৭০, ৮০-এর দশক, এমনকি ৯০-এর দশকের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা এখন আর নেই। ওই সময়ে মানুষের মধ্যে যে সামাজিক অঙ্গীকার ছিল, সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণের জন্য মানুষ যে তাগিদ অনুভব করত তা কিন্তু আজ আর নেই। 'কর্পোরেট পুজি'র এ যুগে মানুষ যেভাবে অর্থ ও ভোগের জন্য উন্মত্ত হয়ে উঠেছে, তাতে সব কিছুতেই এর অভিঘাত পড়বে বলে মনে হয়।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছেন, ৫ বছর পর একাদশ সংসদ নির্বাচন হবে এবং তা হবে বর্তমান সংবিধান আলোকেই। আপনি কি তার সাথে একমত?
4 + 3 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
জুলাই - ২১
ফজর৩:৫৮
যোহর১২:০৫
আসর৪:৪৪
মাগরিব৬:৪৯
এশা৮:১১
সূর্যোদয় - ৫:২৩সূর্যাস্ত - ০৬:৪৪
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :