The Daily Ittefaq
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৪, ১ ফাল্গুন ১৪২০, ১২ রবিউস সানী ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ মানিকগঞ্জে বাসে ধর্ষণ : চালক-সহকারীর যাবজ্জীবন | লক্ষ্মীপুরে যুবলীগ কর্মীকে গুলি করে হত্যা | বাতিল হওয়া সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ১৪ মার্চ | কোপা দেল রে'র ফাইনালে বার্সেলোনা

ফুল নেবে গো ফুল!

পহেলা ফাল্গুন ও ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে রাজধানীতে ফুল কেনার ধুম, বছরে ৭০ কোটি টাকার ফুল বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে, তবে নেই কোন স্থায়ী বাজার, সংরক্ষণ ও পরিবহন ব্যবস্থা আধুনিকায়নের দাবি ব্যবসায়ীদের

মুন্না রায়হান

'জোটে যদি মোটে একটি পয়সা?/খাদ্য কিনিও ক্ষুধার লাগি/দু'টি যদি জোটে অর্ধেকে তার/ফুল কিনে নিও, হে অনুরাগী!' মানুষের জীবনে ফুলের গুরুত্ব নিয়ে মহানবীর (স.) একটি বিখ্যাত হাদিসের ঠিক এমনি কাব্যরূপ দিয়েছেন বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত। কবিরা সৌন্দর্য ও ভালোবাসার প্রতীক ফুল নিয়ে যে কত শত কবিতা লিখেছেন তার ইয়ত্তা নেই। কবি পুর্ণেন্দু পত্রী তার প্রিয়ার উদ্দেশে লিখেছেন, 'তুমি ফুল ভালোবাস বলে-/তোমাকে ফুলের বৃন্তে মাঙ্গলিক উত্সবের মতো লাগে বলে-/আমাকে ফুলের খোঁজে যেতে হয় পথ খুঁজে খুঁজে-/সিন্ধুনদ, হিন্দুকুশ, হরপ্পার মতো দূর-দূরান্তরে।'

কত সহস্র উপমায় বিশেষায়িত এই ফুল। শুদ্ধতা, পবিত্রতা ও সৌন্দর্যের প্রতীক, শ্রদ্ধা প্রকাশের শ্রেষ্ঠ উপকরণ, ভালোবাসার অর্ঘ্য, প্রার্থনার নৈবেদ্য...আরও কত কী! ফুল ভালোবাসে না—এমন কে আছে? কার অন্তর না মাতে ফুলের পরশে! বাঙ্গালির জীবনাচরণে, সংস্কৃতির পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে ফুলের সৌরভ। আজ পহেলা ফাল্গুনে খোঁপায় তাজা ফুল গুঁজবে না এমন তরুণী খুঁজে পাওয়া যাবে না। আবার পরদিন ভালোবাসা দিবস। এ উপলক্ষে ইতিমধ্যে রাজধানীর ফুল বাজারগুলোতে বেচাকেনার ধুম পড়েছে।

ফুলের মহিমা নিয়ে কবিরা কবিতা লিখলেও ফুল ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা দেশের ফুলের বাজার নিয়ে অপার সম্ভাবনা দেখছেন। তারা বলেছেন, প্রতিদিন শুধু রাজধানীতেই পাইকারী বাজারে ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকার ফুল কেনাবেচা হয়। আর বিশেষ বিশেষ দিবসে যেমন পহেলা ফাল্গুনে ৮ থেকে ১০ কোটি টাকার ফুল বিক্রি হয়। বর্তমানে সামান্য পরিমাণে ফুল বিদেশে রপ্তানি হলেও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও বড় বাজার তৈরি করা যাবে। তবে ব্যবসায়ীরা জানান, ফুল সংরক্ষণ ও পরিবহনে আধুনিক ব্যবস্থার অভাবে উত্পাদিত ফুলের প্রায় ৩০ শতাংশই নষ্ট হয়ে যায়। চাষিদের উন্নতমানের প্রশিক্ষণ, স্বল্প সুদে ঋণ প্রদান, ফুল সংরক্ষণ ও পরিবহনে আধুনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি ফুলের উন্নত জাত ও মান উন্নয়নে গবেষণা জোরদার করার আহবান জানিয়েছেন তারা।

ফুল বাণিজ্য: যেভাবে শুরু

১৯৮৭ সালের ঘটনা। আমরা হাতেগোনা মাত্র কয়েকজন ব্যবসায়ী শাহবাগ এলাকায় ফুলের ব্যবসা শুরু করি, বলছিলেন ঢাকা ফুল ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সভাপতি বাবুল প্রসাদ। তিনি বলেন, তখন চাষিরা ফুল চাষ করতে ভয় পেত। আমরা তাদের অগ্রিম টাকা দিয়ে ফুল চাষ করতে উদ্বুদ্ধ করি। তখন শুধু রজনীগন্ধা চাষ হতো। আর এখনতো সারাদেশে ১৯ জেলায় ফুল চাষ হয়। জেলাগুলোর মধ্যে যশোর, রাজবাড়ী, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর, সাতক্ষীরা, বগুড়া, রাজশাহী, সিলেট, ময়মনসিংহ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কক্সবাজার ও নারায়ণগঞ্জ অন্যতম। প্রতিবছরই ফুলের চাষ বাড়ছে। খামারবাড়ির তথ্য মতে, সারাদেশে প্রায় ১২ হাজার হেক্টর জমিতে ফুল ও বাহারি গাছের চাষ হচ্ছে। তবে ফুল চাষের উপর তেমন কোন তথ্য নেই কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে। কি পরিমাণ টাকার ফুল কেনাবেচা হয় সেই পরিসংখ্যানও তাদের কাছে নেই।

স্থায়ী কোন বাজার নেই

রাজধানীতে ফুলের ব্যবসাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে দুটি পাইকারি বাজার। একটি শাহবাগে, আরেকটি ফার্মগেটস্থ খামারবাড়ির সামনে। প্রতিদিন রাত ৩টা না বাজতেই দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে এই বাজারে ফুল আসতে শুরু করে। সকাল ১০টা পর্যন্ত চলে এই বাজারের কার্যক্রম। সিটি কর্পোরেশনের জায়গায় বাজার বসলেও তা স্থায়ী বরাদ্দ দেয়া হয়নি। এ প্রসঙ্গে ঢাকা ফুল ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সভাপতি বলেন, ১৯৯০ সালের দিকে আমরা শাহবাগের এই জায়গাটা ফুলের বাজারের জন্য স্থায়ীভাবে বরাদ্দ দিতে সিটি কর্পোরেশনের কাছে আবেদন করেছি। কিন্তু এখনো বরাদ্দ পাইনি।

গত মঙ্গলবার রাজধানীর ওই দুই ফুল বাজারে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ফুলে ফুলে বাজার দুটি সয়লাব। পহেলা ফাল্গুন উপলক্ষে রীতিমতো জমজমাট বাজার। ব্যবসায়ীদের দম ফেলারও ফুসরত নেই যেন! গোলাপ, রজনীগন্ধা থেকে গাঁদা, গ্লাডিউলাস, অর্কিড, কামিনী, বকুল, দোঁলনচাপা, পদ্ম, জিপসীসহ আরো নানা ধরনের বাহারি ফুলের সমারোহ সেখানে। রাজধানী ও রাজধানীর আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ফুল ব্যবসায়ীরা এসেছেন ফুল কিনতে।

শাহবাগ মার্কেটের ফুল ব্যবসায়ী মাসুদ বলেন, ফুল ব্যবসায়ীদের প্রতি সরকারের কোন নজর নেই। স্বল্প সুদে ব্যাংক ঋণ পেলে ও ফুল সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকলে এ ব্যবসায় খুব ভালো করা যেত। তিনি বলেন, পহেলা ফাল্গুন, ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে এখন ফুল কেনার ধুম পড়েছে। সারা বছর ফুল চাষ হলেও শীত মৌসুমেই ফুলের বাজার জমে ওঠে বলে তিনি জানান।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সারাদেশে ৫ লাখ লোক ফুল ব্যবসার সাথে জড়িত। আর শুধু ঢাকাতেই ফুলের দোকান আছে তিন'শ। এর মধ্যে গুলশান, বনানী ও বেইলী রোডে রয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ফুলের দোকান।

আমদানি-রপ্তানি দুই-ই হচ্ছে

বর্তমানে প্রতিবছর প্রায় ৭০ কোটি টাকার ফুল পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে বলে জানা গেছে। এরমধ্যে রয়েছে দুবাই, কাতার, ওমান, সৌদি আরব ও কুয়েত। রফতানিকৃত ফুলের মধ্যে রয়েছে রজনীগন্ধা, গ্লাডিউলাস ও গোলাপ। কিন্তু বর্তমানে ফুল রপ্তানির জন্য কোন নীতিমালা না থাকায় পানের সাথে তা পাঠানো হচ্ছে।

অন্যদিকে ৬ থেকে ৭ কোটি টাকার ফুল চীন, থাইল্যান্ড ও ভারত থেকে দেশে আমদানি করা হচ্ছে। অথচ দেশে ফুল চাষের প্রতি জোরালো নজর দিলে দেশের চাহিদা পুরোপুরি মিটিয়ে বিদেশেও বাজার সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে।

দেশে প্রতিবছরই বাড়ছে ফুল চাষ

আমাদের ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি বিমল সাহা জানান, দেশে বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষের পথিকৃত জেলা যশোর। সারাদেশে চাহিদার ৫০ থেকে ৬০ ভাগ ফুল এই জেলা থেকে সরবরাহ করা হয়। তবে যশোরের ফুল চাষ এখন ঝিনাইদহ ও চুয়াডাঙ্গা জেলাতেও ছড়িয়ে পড়েছে। ফুল চাষ অন্য ফসলের চেয়ে লাভজনক। এবার হরতাল অবরোধে ফুল চাষিদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বর্তমানে দাম চড়েছে। এতে চাষিরা খুশি। ফুল চাষের ফলে গ্রামের মহিলাদেরও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

১৯৮০ সালের দিকে যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার পানিসরা গ্রামের শের আলী প্রথম বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষ শুরু করেন। ফুল চাষ লাভজনক হওয়ায় অন্য চাষিরাও ফুল চাষে আগ্রহী হয়ে উঠে। ১৯৯০ সালে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ ও মহেশপুর উপজেলায় বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষ শুরু হয়। এখন ঝিনাইদহ জেলার কোটচাঁদপুর, সদর উপজেলা, চুয়াডাঙ্গা জেলার জীবননগর ও দামুরহুদায় ফুল চাষ হচ্ছে। ঝিনাইদহ জেলায় প্রায় ২শ' হেক্টর এবং চুয়াডাঙ্গা জেলায় একশ হেক্টর জমিতে ফুল চাষ হয়। এ দুই জেলাতে গাঁদা ফুলের চাষ বেশি হয়। পাশাপাশি গ্লাডিউলাস, গোলাপ, রজনীগন্ধা ও গোলাপের চাষ হচ্ছে। এ দুই জেলায় বছরে ফুল বাণিজ্য হয় আনুমানিক ২০ কোটি টাকার বেশি।

কালীগঞ্জ উপজেলার বড় ঘিঘাটি গ্রামের ফুল চাষি আব্দুর রাজ্জাক জানান, এক বিঘা জমিতে গাঁদা ফুল চাষে ১০ - ১২ হাজার টাকা, গ্লাডিউলাস চাষে ৮০ হাজার টাকা থেকে এক লাখ টাকা, রজনীগন্ধা ডবল স্টিক চাষে বিঘা প্রতি ২০-২৫ হাজার টাকা এবং সিঙ্গল স্টিক চাষে ১৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়। তিনি জানান, বর্তমানে ফুলের বাজার চড়ছে। এক বিঘা জমির গাঁদা ফুল বিক্রি করে ৪০-৫০ হাজার টাকা, রজনীগন্ধা ডবল স্টিক বিক্রি করে ৬০-৭০ হাজার টাকা , রজনীগন্ধা সিঙ্গল স্টিক বিক্রি করে ৫০-৫৫ হাজার টাকা এবং গ্লাডিউলাস বিক্রি করে দুই লাখ টাকার উপর আয় হয়।

ব্যস্ত ফুলচাষিরা

যশোর অফিস থেকে আহমেদ সাঈদ বুলবুল জানান, বিশ্ব ভালোবাসা দিবসকে ঘিরে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন যশোরের ঝিকরগাছার গদখালীর ফুলচাষিরা। এ বছর পাঁচ কোটি টাকার ফুল বিক্রির লক্ষ্য নিয়ে রাতদিন সমানতালে ফুল ক্ষেতের বাড়তি পরিচর্যা ও ফুল তোলার কাজ করছেন তারা।

বর্তমানে যশোরের পাঁচ উপজেলার ১৫শ হেক্টর জমিতে চাষ হচ্ছে নানা ধরনের ফুল—যা ছড়িয়ে পড়ছে রাজধানীসহ গোটা দেশে। এর মধ্যে শুধুমাত্র গদখালীতেই এবছর ১২শ' হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের ফুলচাষ হয়েছে। আর তা থেকে বছরে আয় হচ্ছে ৪শ থেকে ৫শ কোটি টাকা। ফুলচাষ ও কেনাবেচার সাথে জড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করছে এই এলাকার প্রায় ৫০ হাজার মানুষ।

রংপুর প্রতিনিধি ওয়াদুদ আলী জানান, চাঙ্গা হয়ে উঠেছে জেলার ফুল বাজার। ব্যস্ততা বেড়েছে ফুল চাষিদের। গত ১৬ ডিসেম্বরে বেচা-বিক্রির একটা সুযোগ থাকলেও রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব পড়েছিল ফুল বাজারে। তবে এখন আগের লোকসানের কিছুটা পুষিয়ে নেয়া যাবে বলে ফুল চাষিরা আশা করছেন। নগরীর ইঞ্জিনিয়ার পাড়ার সৌখিন ফুল বিতানের লিটন বললেন, গত ফাল্গুনে বেচা-বিক্রি ৪ লাখ টাকা হলেও এবার তার চেয়েও বেশি বিক্রির আশা করছেন তিনি।

এই পাতার আরো খবর -
font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছেন, ৫ বছর পর একাদশ সংসদ নির্বাচন হবে এবং তা হবে বর্তমান সংবিধান আলোকেই। আপনি কি তার সাথে একমত?
7 + 1 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
অক্টোবর - ১৯
ফজর৪:৪২
যোহর১১:৪৪
আসর৩:৫২
মাগরিব৫:৩৩
এশা৬:৪৪
সূর্যোদয় - ৫:৫৭সূর্যাস্ত - ০৫:২৮
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :