The Daily Ittefaq
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৪, ১ ফাল্গুন ১৪২০, ১২ রবিউস সানী ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ মানিকগঞ্জে বাসে ধর্ষণ : চালক-সহকারীর যাবজ্জীবন | লক্ষ্মীপুরে যুবলীগ কর্মীকে গুলি করে হত্যা | বাতিল হওয়া সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ১৪ মার্চ | কোপা দেল রে'র ফাইনালে বার্সেলোনা

বাংলা নিয়ে প্রতিশ্রুতির পর শাসকগোষ্ঠীর হরফ ষড়যন্ত্র

মাহবুব রনি

১৯৪৮ সালের ১৫ মার্চ সম্পাদিত চুক্তিতে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা এবং পূর্ববঙ্গের সরকার-আদালত-শিক্ষার ভাষা করার প্রতিশ্রুতি দিলেও পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী বাংলা বিতাড়নের জন্য হরফ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। উর্দু অথবা আরবি হরফে বাংলা লেখা প্রচলনের পদক্ষেপ নেয় সরকার। তাদের এ অপচেষ্টার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান বাংলাভাষী বিজ্ঞজন এবং রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলনকারীরা।

শাসকগোষ্ঠীর এ হরফ ষড়যন্ত্র সম্পর্কে ভাষা সংগ্রামী আহমদ রফিক বলেন, বাংলাভাষা সম্পর্কে জন্মলগ্ন থেকেই পাকিস্তান সরকারের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য ছিল বাংলা বিরোধী দু'ধারী তরবারির মতন। তারা একদিকে রাজনৈতিকভাবে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চালায়। অন্যদিকে আরবি হরফে বাংলা লেখার ব্যবস্থা করে বাংলা ভাষার বিকৃতি ঘটানো এবং এই ভাষাকে পূর্ব ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করতে সচেষ্ট ছিল সরকার। আবার উর্দু শিক্ষার প্রসার ঘটাতে ব্যাপক কর্মসূচি গৃহীত হয়।

১৯৪৮ সালের ১৫ মার্চ পূর্ববঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী নাজিমউদ্দিন সংগ্রাম পরিষদের সাথে আট দফা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। ঐ চুক্তিতে বাংলাকে পূর্ববঙ্গের শিক্ষা, আদালত ও সরকারি ভাষাতো বটেই পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার প্রস্তাবও তিনি মেনে নেন। কিন্তু এর কয়েকদিন পরই পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মুহম্মদ আলী জিন্নাহ পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা উর্দু হবে বলে ঘোষণা করেন। এর পর নানা কারণে ভাষা আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ে। আর পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী বাংলাকে উর্দু কিংবা আরবি হরফে লেখার ষড়যন্ত্র শুরু করে। ব্যবস্থাপনা পরিষদ কর্তৃক বাংলা মাধ্যমে শিক্ষার প্রস্তাব বছরের পর বছর ধরে এডুকেশন সেক্রেটারিয়েটে পড়ে থাকে। মন্ত্রীদের কাছেও সংশ্লিষ্ট ফাইলটি উপস্থাপন করা হয়নি। পত্রিকায় এ নিয়ে সমালোচনা হয়। কিন্তু বায়ান্নের আগে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি।

১৯৪৮ সালের ৮ এপ্রিল বিধানসভায় মন্ত্রী হবিবুল্লাহ বাহার বাংলা ভাষায় আরবি হরফ প্রবর্তনের সুপারিশ করেন। আনুষ্ঠানিকভাবে ষড়যন্ত্র শুরু হয়। ১০ জুন করাচীতে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা বোর্ডের সভায় মাধ্যমিক স্তর থেকে উর্দুকে গোটা পাকিস্তানের শিক্ষায় বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তবে হিন্দু শিক্ষার্থীদের জন্য এটি ঐচ্ছিক করা হয়। পূর্ববঙ্গের শিক্ষা বিভাগের পরিচালক ড. কুদরত-ই-খুদা রোমান বর্ণমালা গ্রহণের প্রস্তাব করেন। (আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৩ জুন ১৯৪৮)। মাঠের আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ার পর এ ষড়যন্ত্রের মধ্যে ১৪ নভেম্বর বাংলা ভাষার দাবিকে এগিয়ে নিতে সাপ্তাহিক 'সৈনিক' পত্রিকা প্রকাশ করে তমদ্দুন মজলিস। ভাষা আন্দোলনের মুখপত্র হিসাবে পত্রিকাটি তখন ৪৮ কাপ্তান বাজার থেকে প্রকাশিত হত। প্রথম সংখ্যায় এর সম্পাদক ছিল যুগ্মভাবে অধ্যাপক শাহেদ আলী ও এনামুল হক। এ পত্রিকাকে কেন্দ্র করে একটি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক বলয় গড়ে উঠায় হরফ ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে এবং রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে বিভিন্নজন কথা বলেন। ২৭ ডিসেম্বর করাচীতে নিখিল পাকিস্তান শিক্ষক সম্মেলনে পাকিস্তানের শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমান বাংলা ভাষা আরবি হরফে লেখার প্রস্তাব ও যৌক্তিকতা উত্থাপন করেন। ১৯৪৯ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি পেশোয়ারে পাকিস্তান শিক্ষা বোর্ডের বৈঠকে বাংলা ভাষায় আরবি হরফ প্রবর্তনের কথা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন। ২ এপ্রিল চট্টগ্রাম সাহিত্য পরিষদের সভায় বাংলা ভাষা আরবি হরফে লেখার সরকারি সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানানো হয়।

একই ধারায় বাংলা ভাষা উর্দু হরফে লেখা এবং উর্দু শিক্ষা প্রসারে ষড়যন্ত্র করে শাসকগোষ্ঠী। ১৯৪৯ সালের ৯ ডিসেম্বর বাংলা ভাষায় উর্দু হরফ গ্রহণের ষড়যন্ত্রকে প্রতিহত করতে তমদ্দুন মজলিসের সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় 'বাংলা ভাষার জন্য উর্দু হরফ গ্রহণ নিতান্ত মারাত্মক' বলে উল্লেখ করা হয়। আরবি হরফে লেখারও প্রতিবাদ জানানো হয়। ১০ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আব্দুল হালিমের সভাপতিত্বে এক সভায় ছাত্র-ছাত্রীরা সরকারি প্রচেষ্টা-সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানান। বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন কলেজের ছাত্রদের নিয়ে কেন্দ্রীয় বর্ণমালা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। (দৈনিক আজাদ, ১৪ ডিসেম্বর; সাপ্তাহিক সৈনিক ১৬ ডিসেম্বর ১৯৪৯)।

এ বছরেরই ১৪ ডিসেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত পাকিস্তান শিক্ষা উপদেষ্টা বোর্ডের বৈঠকে শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমান উর্দুকে পাকিস্তানের লিংগুয়া ফ্রাংকা বা জাতীয় ভাষা হিসাবে ঘোষণা করেন। পঞ্চম শ্রেণি থেকে উর্দুকে বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করেন। ১৯৫০ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ড. আবদুল হককে সভাপতি করে উর্দুর উন্নয়নে ১৬ সদস্যের একটি কমিটি গঠিত হয়। উর্দু হরফে বাংলা লিখে দেয়ার জন্য লেখকদের কাছে টেন্ডারও আহ্বান করে সরকার।

এ সময় ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহও আরবিতে লেখার প্রস্তাব করেন। হরফ ষড়যন্ত্র ঠেকাতেই তিনি এ প্রস্তাব করেছিলেন বলে জানান ভাষা সংগ্রামী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি বলেন, বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলনে শহীদুল্লাহ সক্রিয় ছিলেন। ওই প্রস্তাব একটি কৌশল ছিল মাত্র।

হরফ ষড়যন্ত্রের বিষয়ে সৈনিক পত্রিকায় (২৮ মে ১৯৫০) 'বাংলাভাষা ও হরফ হত্যার নতুন ষড়যন্ত্র' শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়-'বাংলা ভাষা ও হরফ সম্বন্ধে সরকারের মনোভাব কিছুদিন ধরে খুবই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ...বাংলা ভাষা ও হরফকে চিরতরেই কবর দিতে, পূর্ব পাকিস্তানকে তামদ্দুনিক শৃংখল পরাতেই যে সরকার চূড়ান্তভাবে কোমর বেঁধেছেন এইটিই আজকের স্পষ্ট ও তিক্ত সত্য।'

১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী নাজিমউদ্দিন ঢাকায় পল্টনে সমাবেশে বাংলায় বক্তৃতা দেন। অথচ তিনি ভালো বাংলা জানতেন না। তার বক্তব্যটি উর্দুতে অক্ষরান্তর করা হয়েছিল। তিনি বাংলাতেই ঘোষণা করেন, 'পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু'।

মূলত চুক্তি ভঙ্গ করে বাংলার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রই ১৯৫২ সালের আন্দোলনের সূত্রপাত করে। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক আবুল কাসেম 'ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস' বইয়ে বলেন, 'সরকার যদি গড়িমসি না করিয়া তাড়াতাড়ি বাঙলাকে এখানের সরকারী ভাষা ও শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে চালু করিয়া দিতেন, উর্দু অক্ষরে বাঙলা লেখার প্রচেষ্টা হইতে বিরত থাকিতেন আর জোর করিয়া উর্দুকে এখানে বাধ্যতামূলক করার চেষ্টা না করিতেন ... তাহা হইলে এবারে আন্দোলনই হইত না।'

এই পাতার আরো খবর -
font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছেন, ৫ বছর পর একাদশ সংসদ নির্বাচন হবে এবং তা হবে বর্তমান সংবিধান আলোকেই। আপনি কি তার সাথে একমত?
8 + 9 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
জুন - ২০
ফজর৩:৪৩
যোহর১২:০০
আসর৪:৪০
মাগরিব৬:৫১
এশা৮:১৬
সূর্যোদয় - ৫:১১সূর্যাস্ত - ০৬:৪৬
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :