The Daily Ittefaq
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ৯ ফাল্গুন ১৪১৯, ১০ রবিউস সানি ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ নূহাশ পল্লীতে ডাকাত সন্দেহে গণপিটুনিতে ৯ জন আহত | ২৬ মার্চের মধ্যে জামায়াত নিষিদ্ধের প্রক্রিয়া শুরুর আলটিমেটাম: শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ | মহাসমাবেশে কর্মসূচির ঘোষণার মধ্য দিয়ে শেষ হলো শাহবাগের লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি | সৈয়দ আশরাফুল রাজনৈতিক শিষ্ঠাচারবিবর্জিত কথা বলেছেন: মির্জা ফখরুল | বরিশাল-ভোলা মহাসড়কে বাস খাদে পড়ে ৫ জন নিহত | আজ মহান অমর একুশে | বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস | কিশোরগঞ্জে শহীদ মিনারে ফুল দেয়াকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের দু'গ্রুপের সংঘর্ষ | ঝিনাইদহের মহেশপুরে জামায়াত-আওয়ামী লীগ সংঘর্ষে ১৫ জন আহত

[ আ লো ক পা ত ]

এক দেশে দুই ভাষা প্রচলনের প্রস্তাব এবং বাংলাভাষার ভবিষ্যত্

কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান

বাংলা ভাষার উত্পত্তি ও বিকাশ আমরা অনেকেই জানি। তবে বাংলার মতো যে কোনো ভাষারই ভবিষ্যত্ সঠিকভাবে আমরা কেউই বলতে পারি না। তবে কোনো ভাষার ভবিষ্যত্ কী কী কারণে সংকটাপন্ন হতে পারে সেই বিষয়ে বিদগ্ধজনেরা হয়তো অনুমান করতে পারবেন। আমি বাংলা সাহিত্যের বা ভাষাবিজ্ঞানের ছাত্র না হয়েও 'বাংলাভাষার ভবিষ্যত্' কথনের মতো একটি জটিল বিষয়ে লিখতে বসেছি একটু ভিন্ন কারণে। সে কারণটি পাঠকদের নিকট একটু পরে তুলে ধরার চেষ্টা করবো। তার আগে ভাষার মতো একটি জটিল বিষয়ে লেখার ঔদ্ধত্য আমার মতো রাজনীতির ছাত্রের তৈরি হয়েছে কেন সে বিষয়ে বলার চেষ্টা করছি। রাজনীতির সকল ছাত্রকেই জাতীয়তাবাদের পাঠ নিতে হয়। বাংলাভাষার সাথে বাঙালি জাতির জাতীয়তাবোধের সম্পর্কের বিষয়ে আমি জ্ঞান লাভ করেছি প্রধানত অধ্যাপক বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের 'আধুনিকতা ও জাতীয়তাবাদ' এবং অধ্যাপক রওনক জাহানের 'পাকিস্তান: ফেইলিউর ইন ন্যাশনাল ইনটিগ্রেশন' গ্রন্থদ্বয় থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এই খ্যাতিমান অধ্যাপকগণ তাঁদের গ্রন্থের মাধ্যমে আমাদেরকে সুস্পষ্টভাবে বোঝাতে পেরেছেন, বাঙালি জাতীয়তাবাদ তথা চূড়ান্ত পর্যায়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে বাংলাভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। এটিই রাজনীতির ছাত্রের ভাষার প্রতি আগ্রহ তৈরির জায়গা। মাতৃভাষাকে রক্ষা করতে না পারলে বাঙালির স্বাধীনতা থাকে না। আর স্বাধীনতার অনুশীলন করা হয় রাষ্ট্র গঠনের মধ্যদিয়ে। ভাষার সাথে জাতীয়তাবোধের সম্পর্কের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা একটু পেছনে তাকালে আমরা লাস্কির 'গ্রামার অব পলিটিক্স' এবং হ্যান্স কোহনের 'দি আইডিয়া অব ন্যাশনালিজম' গ্রন্থেও পাই।

যাহোক, শ্রদ্ধেয় পাঠকদের একটু আগেই বলেছি যে কী কারণে 'বাংলা ভাষার ভবিষ্যত্-এর মতো একটি জটিল বিষয়ে কলম ধরতে চেয়েছি সে বিষয়টি তাদের নিকট স্পষ্ট করবো। এখানে দু'টি বিষয় উল্লেখযোগ্য। প্রথমটি হলো গত ৩০ মার্চ, ২০১২ তারিখ একটি পত্রিকায় 'এক দেশ দুই ভাষা' শিরোনামে লেখা একটি প্রবন্ধ যেখানে কলাম লেখক হাসান ফেরদৌস বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের জন্য প্রথম শ্রেণি থেকেই বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষা প্রচলন করার দাবি করেছেন। প্রধানত দু'টি যুক্তির মাধ্যমে তিনি তাঁর দাবির গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করবার চেষ্টা করেছেন। একটি হলো গবেষণার তথ্য এবং অন্যটি হলো বাস্তব প্রয়োজন। হাসান ফেরদৌস নিউইয়র্ক টাইম্স পত্রিকায় প্রকাশিত যুদ্ধজিত্ চক্রবর্তীর একটি লেখার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন যে, একই সঙ্গে দু'টি ভাষা শিখছে এমন শিশুদের উপর ভাষা শেখার জন্য অতিরিক্ত চাপ পড়লেও চূড়ান্ত পর্যায়ে তাদের কগনিটিভ দক্ষতা বাড়ে। দ্বিতীয় যুক্তি হলো ইংরেজি শিখলে অর্থনৈতিক সুবিধা লাভ করা যাবে। দ্বিতীয় যুক্তিটি খণ্ডন করতে খুব বেশি আলোচনার প্রয়োজন নেই। শুধু জাপান ও চীনের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির উদাহরণই এখানে যথেষ্ট। জাপানের জনগণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এখন পর্যন্ত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির চূড়ান্ত পর্যায়ে অবস্থান করছে ইংরেজি ভাষা না শিখেই। অন্যদিকে, আগামী বিশ্বকে নেতৃত্ব দিবে যে চীন তার জনগণও ইংরেজি ভাষাকে এতো আদর করে লালন করছে না বলেই আমরা জানি। হাসান ফেরদৌস সাহেবের প্রথম যুক্তিটি বৈজ্ঞানিকভাবে আমি ভুল প্রমাণ করতে পারব না, কারণ আমি বিজ্ঞানের ছাত্র নই। তবে এটুকু বলতে পারি, প্রাবন্ধিক নিজেই স্বীকার করেছেন যে একই সময়ে দু'টি ভাষা শিখতে গেলে শিশুদের মস্তিষ্কে অতিরিক্ত চাপ পড়বে। আমার প্রশ্ন হলো এই অতিরিক্ত চাপটা আমি শিশুদের মস্তিষ্কে কেনই বা দেব? তাছাড়া একই সাথে দু'টি ভাষা না শিখেই যেখানে অনেক জাতি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির চূড়ান্ত পর্যায়ে চলে এসেছে সেখানে নতুন পরীক্ষার মধ্যে আমাদেরকে কেন যেতে হবে? প্রাবন্ধিক আমাদের এলিট ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে যে অর্থনৈতিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে তা ঘুচাতে চান প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে মাতৃভাষার মতো করে ইংরেজি ভাষায় পারদর্শী করে। আমার মনে হয় অর্থনৈতিক পুনর্বণ্টনের কথা চিন্তা না করে ভাষা শিখানোর মাধ্যমে অর্থনৈতিক বৈষম্য ঘুচানোর এই প্রস্তাব অনেকটাই উদ্ভট।

আগেই বলেছি এই লেখাটি তৈরি করার পেছনে আমি দু'টি উত্স থেকে প্রেরণা লাভ করেছি। একটি বিষয়ে আমি ইতোমধ্যেই আলোকপাত করেছি। অন্যটি হলো অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের 'বাংলা ভাষার ভবিষ্যত্' শিরোনামে সামপ্রতিক পুস্তিকাটি। বাংলা সমিতি জানুয়ারি ২০১২-তে পুস্তিকাটি প্রকাশ করেছে। লেখক পুস্তিকাটিতে বাংলা ভাষার উজ্জ্বল ভবিষ্যত্ নির্মাণের প্রতি যতটা দরদ দেখিয়েছেন তার চেয়ে বেশি দেখিয়েছেন যুক্তি। অনেক ভাষাবিদ ও সাহিত্যিক বলে থাকেন বাংলাভাষার প্রতি আমাদের আগ্রহটা আবেগের মধ্যে। অথচ ভাষার ভবিষ্যত্ নির্ভর করে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের উপর। রুপার্ট এমারসন থেকে শুরু করে রওনক জাহান পর্যন্ত সকলেই উপনিবেশ পরবর্তী সময়ে সৃষ্ট নতুন রাষ্ট্রগুলোর প্রধান সংকট দেখেছেন তাদের জাতি গঠনের ব্যর্থতার মধ্যে। আর জাতি গঠনে ভাষার মজবুত ভিত্তি দরকার। বাংলাদেশে বাংলা ভাষার ভিত্তি। তবে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত ছাড়া ভাষার মজবুত ভিত্তি তৈরি হয় না। প্রতি বছর ২১ ফ্রেব্রুয়ারি পালন এই সিদ্ধান্তকে জোরদার করার অনুপ্রেরণা দেয় কিন্তু বাস্তবে বাংলাভাষাকে উচ্চশিক্ষা পর্যায় থেকে আদালতসহ রাষ্ট্রের সকল পর্যায়ে কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠিত করার কোনো উদ্যোগ নেয়া হয় না। এখানে হাসান ফেরদৌস সাহেবের ধারণার বিভ্রান্তি। বাংলাদেশে এলিট ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে যে ভাষাগত ফারাক তৈরি হয়েছে তা বাংলাভাষার প্রসারে রাষ্ট্রের অলংকার সর্বস্ব উদ্যোগ বা উদ্যোগহীনতার কারণেই।

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক দেখিয়েছেন যে, কীভাবে উনিশ শতকের বিত্তশালী বাঙালিরা ইংরেজির প্রতি অত্যধিক আকর্ষণের ফলে নিজেদের আত্মপরিচয়ও ভুলে গিয়েছিল। কামিনী রায় লিখেছিলেন:

পরের মুখে শেখা বুলি পাখির মতো কেন বলিস? পরের ভঙ্গি নকল করে নটের মতো কেন চলিস? আপনারে যে ভেঙ্গে-চুরে গড়তে চায় পরের ছাঁচে অলীক ফাঁকি, মেকি সেজন, নামটা তার ক'দিন বাঁচে?

হাসান ফেরদৌস সাহেবের সদয় অবগতির জন্য বলছি যে, বাংলাদেশের প্রত্যন্ত দ্বীপ হাতিয়ায়ও এখন বাংলা মাধ্যমের স্কুলের পাশাপাশি ইংরেজি স্কুল রয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক উভয় পর্যায়ের খ্যাতিমান প্রায় সকল স্কুল-কলেজেই ইংলিশ ভার্সনে পড়াশুনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সর্বোপরি আজকাল নিম্ন মধ্যবিত্তদের সন্তানকেও ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে পড়ানো একটি ফ্যাশন দেখা যাচ্ছে। তাছাড়া, কোমলমতি শিশুরা এখন হিন্দি ভাষায় ডাবিং করা কার্টুন ডোরেমনের ভক্ত। আর যে মায়ের মুখ থেকে সন্তানরা বাংলা শিখবে সেই মা'দের অধিকাংশই বিনোদনের জন্য ভারতীয় স্টার প্লাস ও সনিসহ নানা ধরনের হিন্দি চ্যানেলে আসক্ত। এই পরিস্থিতিতে যেখানে কামিনী রায়ের 'নাম' তথা 'বাঙালি পরিচয়' ধরে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে অথবা এমন অবস্থা যে 'ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়' সেখানে রাষ্ট্রীয়ভাবে বিশেষ নীতিমালা গ্রহণ করে প্রথম শ্রেণি থেকে বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি ভাষার প্রচলন করলে বাংলা ভাষা শুধু ২১ ফেব্রুয়ারিতে সীমাবদ্ধ থাকবে কিনা, সে বিষয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করতে হয়তো জ্যোতিষ না হলেও চলবে। তবে ব্যবসা-বাণিজ্যে ও পেশাদারিত্বের প্রয়োজনে আমাদের অনেককেই ইংরেজি ভাষায় মনোযোগী হতে হবে; কিন্তু তা অবশ্যই রবীন্দ নাথের চিন্তার মতো 'আগে মাতৃভাষার গাঁথুনি ...'।

ভাষার মাস এসেছে সামনে আসছে স্বাধীনতার মাস। এই মাসগুলোর প্রতি শ্রদ্ধা দেখাতে হলে সরকারি উদ্যোগে বাংলাভাষাকে ঠিকভাবে শেখানোর ব্যবস্থা করতে হবে। যে রাষ্ট্র তার জনগণকে এখনও ভাল করে মাতৃভাষাটা শেখাতে পারছে না, যে রাষ্ট্র সবার কাছে শিক্ষাই পৌঁছাতে পারছে না সে রাষ্ট্রকেই নতুন আর একটি ভাষা লালন করার উদ্যোগ নিতে বলা নেহায়েত ভুল। তাছাড়া, ইংরেজি একটি হেজমনিক ভাষা এবং অন্য ভাষা গিলে খাওয়ার ইতিহাসও তার আছে। সেই ভাষাটিকে দরিদ্র বাঙালিদের উপর রাষ্ট্রীয়ভাবে চাপিয়ে দেয়ার সবক দিয়ে বাঙালিদেরকে আর একটি ভাষা সংগ্রামে ঠেলে দেয়া ঠিক হবে না। মনে রাখতে হবে যে, সবকিছু অর্থনৈতিক লাভা-লাভের হিসাব দিয়ে হয় না।

লেখক :শিক্ষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের চেয়ে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করা শ্রেয়—ব্রিটিশ পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর এ বক্তব্যের সঙ্গে আপনি কি একমত?
3 + 5 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
জুলাই - ২২
ফজর৩:৫৮
যোহর১২:০৫
আসর৪:৪৪
মাগরিব৬:৪৯
এশা৮:১১
সূর্যোদয় - ৫:২৩সূর্যাস্ত - ০৬:৪৪
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :