The Daily Ittefaq
ঢাকা, শুক্রবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৪, ৯ ফাল্গুন ১৪২০, ২০ রবিউস সানী ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ নাটোরে বাস-লেগুনা সংঘর্ষে নিহত ৩ | শাহ আমানতে সাড়ে ১০ কেজি সোনা আটক | একুশের প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন

আমার দেখা অমর একুশে

শামসুল হুদা

ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনে অমর একুশের স্মৃতিচারণে অনেক কথা মনে পড়ে। ২১শে ফেব্রুয়ারি সকাল থেকেই ঢাকার স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন চত্বরে (বর্তমান ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের জরুরি বিভাগ) এসে জমায়েত হতে শুরু করে। বাইরে অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত পুলিশ বাহিনী ও ই.পি.আর. বাহিনী অবস্থান নিয়েছিল সকাল ৭টা থেকেই। সকাল ১০ টার দিকেই কলাভবন প্রাঙ্গণে আমতলায় জনাব গাজীউল হকের সভাপতিত্বে সভা শুরু হলো। সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে আওয়ামী মুসলিম লীগ নেতা জনাব শামসুল হক উপস্থিত, সঙ্গে খন্দকার মোশতাক আহমেদ। শামসুল হক সাহেব সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের পূর্ব দিনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জানালেন যে, ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হবে না। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে মতিন ভাই ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে ছাত্র সমাজের যুক্তি দিলেন। শেষ পর্যন্ত ১৪৪ ধারা ভঙ্গেরই সিদ্ধান্ত হলো। প্রবীণ ছাত্র নেতা আবদুস সামাদ আজাদ ক'জন করে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হবে সে সম্পর্কে প্রস্তাব রাখেন। সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, ছাত্র-ছাত্রীরা ১০ জনের এক একটি দল করে বিশ্ববিদ্যালয়ের লোহার গেট দিয়ে বেরুবে। সভা পরিণত হলো ১৪৪ ধারা ভঙ্গকারী শোভাযাত্রায়। বিশ্ববিদ্যালয় গেট পর্যন্ত ছাত্র-জনতার অভাবনীয় ভীড়। কিন্ু্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশ দ্বারের লোহার উঁচু গেট বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছেন ভাইস চ্যান্সেলার ডঃ সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন এবং আরও দু'চারজন প্রভোষ্ট এবং অধ্যাপক। বাইরে সশস্ত্র বাহিনী ছাত্রদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার অপেক্ষায়। এরই মধ্যে গাজীউল হক অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তাকে ধরাধরি করে কলা ভবনের দোতলায় শুশ্রূষার জন্য নেয়া হলো। ছাত্র-ছাত্রীরা দলবদ্ধভাবে বিশ্ববিদ্যালয় গেট অতিক্রম করা মাত্রই লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস ও ফাঁকা গুলি। বিশ্ববিদ্যালয় মেডিক্যাল কলেজ, খেলার মাঠ মুহূর্তেই রণাঙ্গনে পরিণত হয়ে গেল। আমি ৩য় দলে লোহার গেট অতিক্রম করেছিলাম। বের হবার সাথে-সাথেই লাঠিচার্জ। লাঠির আঘাতে স্থানচ্যুত হতেই আমার পূর্বের স্থানে যে এক স্কুল ছাত্র এসে পড়ল তার মাথার খুলি লাঠির আঘাতে ফেটে গেল এবং সে ভূপাতিত হলো। আমাদেরকে পুলিশ ভ্যানে উঠিয়ে নিল। পুলিশ ভ্যান থেকে গোলাগুলির শব্দ শুনতে পেলাম। পুলিশ ভ্যানে মেডিক্যাল কলেজ হোষ্টেল (ব্যাম্বো শেড) -বর্তমানে শহীদ মিনার-পার হতেই প্রচণ্ড গোলাগুলি দেখে গেলাম। কি হলো বুঝলাম না। পরে সেন্ট্রাল জেলে পৌঁছে গুলিতে রফিক উদ্দিন আহমেদের তাত্ক্ষণিক মৃত্যু সংবাদ পেয়ে গভীরভাবে শোকাহত হই। পরবর্তীতে আব্দুল জব্বার, আবুল বরকত ও আব্দুস সালামের গুলিতে আহত/নিহত হওয়ার খবর জেলখানায় পাই। মেডিক্যাল কলেজ হোষ্টেল প্রাঙ্গণে পুলিশের গুলিতে রফিকের মাথার খুলি উড়ে যায় এবং সাথে-সাথে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। জব্বার, বরকত এবং সালামও মেডিক্যাল কলেজ হোষ্টেল প্রাঙ্গণে গুলিবিদ্ধ হয়ে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। এই চার ভাষা শহীদ ছাড়াও ২২ ফেব্রুয়ারি বাংলাভাষা আন্দোলনের মিছিলে আরও চারজন নবাবপুর রোডে গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তারা হলেন সফিউর রহমান, আবদুল আউয়াল, অহিউল্ল্যাহ এবং সিরাজউদ্দিন। সবচেয়ে হূদয় বিদারক ঘটনা গুলিতে মাথার খুলি উড়ে রফিক উদ্দিনের তাত্ক্ষণিক মর্মান্তিক মৃত্যু, যা মনে পড়তেই দুঃসহ পীড়া অনুভব করি। আরও দুঃখজনক হলো রফিকের মরদেহ সেদিন গভীর রাতে আত্মীয়-স্বজনের অজ্ঞাতে পুলিশ কর্তৃক আজিমপুর কবরস্থানের অসংরক্ষিত এলাকায় কবর দেয়া হয়। ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী, নেতৃত্বদানকারী ও কারাবরণকারী সংগ্রামী ভাষাসৈনিক হিসেবে এইসব ভাষা শহীদদের বিশেষ করে গুলিতে মাথার খুলি উড়ে রফিক উদ্দিনের তাত্ক্ষণিক মৃত্যুবরণ অহরহ মনে গভীর পীড়া দেয়। ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বীর ভাষা শহীদদের অকাতরে প্রাণ উত্সর্গ এবং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কঠোর সংগ্রামে নির্যাতিত- আত্মত্যাগী ভাষা সংগ্রামীদের অসাধারণ অবদানে অর্জিত বাংলা ভাষাকে আমরা দীর্ঘ ৬২ বছরেও কাঙ্ক্ষিত মর্যাদা দিতে পারিনি, সর্বস্তরে মাতৃভাষার প্রয়োগ ও প্রচলন করতে সক্ষম হইনি। এটা পরম পরিতাপের বিষয়। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাস আসলেই কেবল আমরা বাংলা ভাষার ব্যাপারে তত্পরতা দেখাই। তার পর ভুলে যাই। আমাদের এই ব্যর্থতার কারণ খুঁজে বের করে তার আশু সমাধান করা সময়ের দাবি।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৩ নং অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে- 'প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা'। মাতৃভাষা বাংলাই রাষ্ট্রভাষা। তাছাড়া, দেশে বাংলা ভাষা প্রচলন আইন-ও বিদ্যমান। কিন্তু সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রয়োগ লক্ষণীয় নয়। সরকার কর্তৃক আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনষ্টিটিউট স্থাপন সত্ত্বেও সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন ও বাস্তবায়ন পরিলক্ষিত হচ্ছে না। ইংরেজীকে প্রধান্য দিয়ে বাংলা ভাষা মারাত্মকভাবে অবহেলিত। সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন ও বাস্তবায়নের লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয়ভাবে এবং সামাজিকভাবে তত্পরতা সীমিত। বাংলা ভাষার ঐতিহ্য রক্ষার জন্য এ অবস্থার পরিবর্তন অপরিহার্য। বাংলা ভাষার সংকটাপন্ন অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন সমাজ ব্যবস্থা ও মনোবৃত্তির পরিবর্তন, প্রয়োজন স্বনির্ভর চিন্তাধারা, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে বাংলাভাষার ব্যবহার, প্রচলন ও বাস্তবায়নের জন্য সম্যক উদ্যোগ গ্রহণ। সর্বোপরি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনষ্টিটিউটকে কার্যকর ও সক্রিয় করে তুলে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার, প্রচলন ও বাস্তবায়নের কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব অর্পণ।

বাঙালি জাতির একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস এখন বিশ্বের ২০০-এর অধিক দেশে স্বীকৃত এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। বাংলা ভাষা সারাবিশ্বে চতুর্থ বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ভাষা হিসেবে স্বীকৃত। কারও কারও মতে, সপ্তম বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ভাষা। এদেশের মানুষের মরণজয়ী ভাষা সংগ্রামের ফলশ্রুতিতে ও গণ আন্দোলনের চেতনায় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ও প্রতিষ্ঠা সার্থক রূপ নেবে আমাদের প্রাণপ্রিয় মাতৃভাষা বাংলার ব্যবহার সর্বস্তরে প্রচলন ও প্রসারের মাধ্যমে। এ জন্য গণসচেতনতা সৃষ্টি করে আমাদের আন্তরিকভাবে নিরলস প্রচেষ্টা চালাতে হবে।

[ লেখক :ভাষাসৈনিক ]

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেছেন, 'উপজেলা নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি প্রমাণ করেছে শেখ হাসিনার অধীনে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
1 + 9 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
জুন - ২৪
ফজর৩:৪৪
যোহর১২:০১
আসর৪:৪১
মাগরিব৬:৫২
এশা৮:১৭
সূর্যোদয় - ৫:১২সূর্যাস্ত - ০৬:৪৭
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :