কবি তালিম হোসেন বাংলা সাহিত্যের খ্যাতনামা কবিদের মধ্যে অন্যতম এক নাম। কবিতায় যিনি বাস্তবতাকে জীবন্ত রূপ দিয়েছেন নান্দনিকভাবে। তার কবিতাগুলো আধুনিক বাণীবন্ধের মন্ডিত সুষমায় উত্কীর্ণ। কবিতায় ফুটে উঠেছে জীবনদর্শন, সমাজসংস্কার, পরকালীন ধ্যান-ধারণাসহ অসংখ্য বিষয়। কবি ও কবিতা এই দু'টি বিষয় তার রচনায় এমনভাবে সহাবস্থান করেছে, যা সত্যিই ব্যতিক্রম। তার রচনাগুলো অত্যন্ত শিল্পসম্মত ও সার্থক। তার কবিতাসমূহ সৃষ্টি করে সেই কাঙ্ক্ষিত ধ্বনি যা ছন্দময়; গতিও অসাধারণ। তিনি জীবনের প্রকৃত সত্যকে কবিতার ভাষা ও ব্যাকরণের অপূর্ব সমন্বয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন দারুণভাবে যা পাঠকদের হূদয়ে স্থায়ী প্রভাব ফেলে এবং ভাসিয়ে নিয়ে যায় বৃষ্টিস্নাত এক অপূর্ব কাব্যময় রজনীতে। কবি তার শিল্পিত হূদয়ের তুলিতে কবিতার যে চিত্রকল্প এঁকেছেন তাও বিস্ময়কর। তিনি তার 'বাড়ি' কবিতায় লিখেছেন- 'প্ল্যানে দরজাটা ছোট মাপের দেখানো ছিল।/ কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি,/ দরজাটা শেষ পর্যন্ত বড় রাখতে/ রাজী হতেই হলো;/ কারণ, অশিক্ষিত প্রৌঢ়/ রাজমিস্ত্রি সর্দার বললো-/ এ্যাত্তো ছোট রাখবেন সাব/ এ দিয়ে তো খাটিয়া বেরোবে না।'- কি অসাধারণভাবে নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় থেকে মানব জীবনের এক অনিবার্য সত্যদর্শনকে উন্মোচন করেছেন, যা জীবনের সকল স্বর্ণময় আয়োজন সত্ত্বেও মৃত্যুর স্বাদ অনুভবের হাত থেকে পরিত্রাণ না পাবার বার্তাকে মানবজাতির সামনে আবারো উদ্ভাসিত করে; যাতে করে মানুষ জীবনের আয়োজনের জালে আবদ্ধ হয়ে মৃত্যুর পর অনন্ত অসীম জীবনের কথা ভুলে না যায় সেই প্রয়াস পেয়েছে। তিনি নিসঃন্দেহে একজন শক্তিমান কবি বলেই তার চিত্রকল্পের তুলিতে জীবনের ভেতর থেকে মৃত্যুকে টেনে বের করে নিয়ে এসেছেন, যা আমাদের বিবেককে জাগ্রত করে তোলে। এমন অসংখ্য কবিতায় তিনি মানুষের জন্য বার্তা পাঠিয়েছেন, যা অত্যন্ত শিক্ষণীয় ও বাস্তবনির্ভর। ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত জ্ঞানী ও বিচক্ষণ এই মানুষটি ছিলেন অত্যন্ত হূদয়বান ও বন্ধুসুলভ। বিখ্যাত লোকবিজ্ঞানী ড. আশরাফ সিদ্দিকী এবং কবি আব্দুল মান্নান সৈয়দের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন তিনি। সংগঠক হিসেবেও তিনি ছিলেন খুবই সফল ও দক্ষ। তার প্রমাণ রেখেছেন তিনি নজরুল একাডেমী প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। নজরুল একাডেমী প্রতিষ্ঠার বিষয়টি তার জীবনের এক অমর-অক্ষয় কীর্তি। বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্টিকর্মের উপর গবেষণা, প্রচার-প্রসার, চর্চা ও সংরক্ষণের দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন নজরুল একাডেমী, যা রাজধানীর মগবাজারের বেলালাবাদে অবস্থিত। তার সেই প্রচেষ্টার একটি বড় সুফল হচ্ছে নজরুলের গানের বাণী ও সুরের বিকৃতি রোধে নজরুল সঙ্গীতের স্বরলিপি রচনা ও প্রবন্ধ আকারে তা প্রকাশ। উনিশ শতকের মধ্যভাগে কবি তালিম হোসেন সম্পাদনা করেছেন তত্কালীন স্বনামধন্য সাহিত্য পত্রিকা 'মাহে নও'।
ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনেও তিনি ছিলেন একজন প্রিয় মানুষ। তার সফল ও সুখী জীবনের সহধর্মিণী ছিলেন দৈনিক বাংলা পত্রিকার মহিলা বিষয়ক পাতার সম্পাদিকা বিশিষ্ট কথা-সাহিত্যিক-সাংবাদিক মাফরুহা চৌধুরী। সহধর্মিণী বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক-সাংবাদিক মাফরুহা চৌধুরী স্বামী কবি তালিম হোসেনের 'কবিতা সমগ্র' সম্পাদনা ও প্রকাশনার গুরুদায়িত্বও পালন করেছিলেন। কবি তালিম হোসেন ও কথাসাহিত্যিক মাফরুহা চৌধুরী দম্পতির সন্তানেরাও বাংলাদেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতির আকাশে উজ্জ্বলতম নক্ষত্র। এই দম্পতির কনিষ্ঠ কন্যা একজন বিশিষ্ট নজরুল সঙ্গীত শিল্পী, যিনি স্বমহিমায় উজ্জ্বল শিল্পী ইয়াসমিন মুসতারী। অন্য দু্ই কন্যাও শিল্পী, তারা হলেন পারভীন মুসতারী ও শবনম মুসতারী। দুই ছেলের মধ্যে একজন কম্পিউটার বিজ্ঞানী শাহরিয়ার চৌধুরী ও অন্যজন বাংলাদেশ বিমানের বৈমানিক ক্যাপ্টেন হাসনাইন চৌধুরী।
আজ কবি তালিম হোসেনের ১২তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৯৯ ইং সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভোররাতে খ্যাতনামা এই কবির বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনাবসন ঘটে। এক যুগ পরেও কবি তালিম হোসেনের সৃষ্টি আমাদের মাঝে তার সরব উপস্থিতি নিশ্চিত করে। তার কবিতার মাঝে তিনি বেঁচে থাকবেন বাংলা সাহিত্যে ও পাঠকের হূদয়ে। আশা করি আমরা তার কবিতার নির্যাস সংগৃহীত রস গভীরভাবে ধারণ করতে পারবো। আজ তার মৃত্যুবার্ষীকিতে তাকে স্মরণ করছি শ্রদ্ধাবনতচিত্তে। তার জন্য মহান আল্লাহর নিকট পরকালীন শান্তিময় জান্নাত প্রার্থনা করছি।
লেখক :কবি ও গবেষক