The Daily Ittefaq
ঢাকা, শনিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৪, ১০ ফাল্গুন ১৪২০, ২১ রবিউস সানী ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ হোয়াইট ওয়াস হলো স্বাগতিকরা | সরকার উপজেলা নির্বাচনে জনগণের বিজয় ঠেকাতে পারেনি : রিজভী | সোনালী ব্যাংকের টাকা লুট, 'মূল পরিকল্পনাকারী' গ্রেফতার | ফেসবুকে ক্ষমা চাইলেন সাকিব

মহান ভাষার মাসে জেলাভিত্তিক বিশেষ আয়োজন

আমাদের শহীদ মিনার : রাজশাহী জেলা

আনিসুজ্জামান, রাজশাহী অফিস

ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত ঢাকায় হলেও রাজশাহীর ছাত্ররা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সদ্য প্রয়াত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ও প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান শেলি, তার সহপাঠী ও অনুজ ছাত্ররা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ রাজশাহীতে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলেন। মিছিল-সমাবেশে কেঁপে ওঠে বিস্তৃর্ণ জনপদ। ওই মিছিলে সরকারের মদতপুষ্ট সন্ত্রাসী হামলায় গোলাম রহমান, গোলাম তোয়াব, প্রতীশ ঘোষ, আবদুল লতিফ প্রমুখ ছাত্রনেতার রক্তে রঞ্জিত হয় রাজশাহীর রাজপথ। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাতে স্থানীয় ছাত্ররা ইট, কাঁদামাটি ও বাঁশ দিয়ে রাজশাহী কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে তৈরি করেন দেশের প্রথম 'শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ'। বিভিন্নগ্রন্থ, গবেষণা, স্মারকপত্র ও ভাষাসৈনিকদের সাক্ষাত্কারে এর স্বপক্ষে তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৪৯ সালে লেখাপড়ার উদ্দেশ্যে ঢাকায় গিয়েও ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান শেলি। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে মিছিলে অংশগ্রহণের দায়ে কারাবন্দিও হন তিনি। তার সহপাঠী ও অনুজ ছাত্ররা রাজশাহীতে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন। '৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্র হত্যার খবর পেয়ে রাজশাহীর ছাত্ররা প্রতিবাদে ফেটে পড়েন। ডা. এসএমএ গাফফার, বিচারপতি মোহাম্মদ আনসার আলী, অ্যাডভোকেট মহসিন প্রামাণিক ও অ্যাডভোকেট গোলাম আরিফ টিপু'র নেতৃত্বে রাজশাহী কলেজের নিউ মুসলিম হোস্টেলে আন্দোলনরত ছাত্রনেতারা জরুরী বৈঠকে বসেন। বৈঠকে রাজশাহী মেডিক্যাল স্কুলের এস.এম.এ গাফ্ফারকে সভাপতি এবং রাজশাহী কলেজের হাবিবুর রহমান ও গোলাম আরিফ টিপুকে যুগ্ম-সম্পাদক করে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। পরিষদের সিদ্ধান্তে ওই রাতেই ছাত্ররা রাজশাহী কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে ইট, কাঁদামাটি ও বাঁশ দিয়ে 'শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ' তৈরি করা হয়। পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি সকালে ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে ওই শহীদ স্মৃতি স্তম্ভের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। অবশ্য কয়েক ঘণ্টা পরই সরকারের পুলিশ সেটি ভেঙ্গে দেয়।

এ প্রসঙ্গে আলাপে রাজশাহীর বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, গবেষক ও 'রাজশাহীতে ভাষা আন্দোলন' স্মারকপত্রের সম্পাদক অধ্যক্ষ ড. তসিকুল ইসলাম রাজা ইত্তেফাককে বলেন, ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং দেশের প্রথম শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ তৈরিতে রাজশাহীর ছাত্রদের অবদান অবিস্মরণীয়। তাদের সাক্ষাত্কার ও স্মৃতিকথায় এ সম্পর্কে বহু তথ্য রয়েছে। রাজশাহীর বিশিষ্ট ভাষাসৈনিক অ্যাডভোকেট গোলাম আরিফ টিপু স্মৃতিচারণে বলেন, '৫২'র ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্রদের মিছিলে পুলিশের গুলিতে হতাহতের খবরে রাজশাহীর ছাত্ররা ক্ষোভে ফেটে পড়ে। ডা. এসএমএ গাফফার, বিচারপতি মোহাম্মদ আনসার আলী, ন্যাপ নেতা অ্যাডভোকেট মহসিন প্রামাণিক ও তার নেতৃত্বে রাজশাহী কলেজের নিউ হোস্টেলের বৈঠকে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ গঠন, ওই রাতেই হোস্টেল প্রাঙ্গণে 'শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ' তৈরি ও পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি রাজশাহীতে সর্বাত্মক হরতাল পালনের সিদ্ধান্ত হয়। এরপর রাতেই কাঁদামাটি, ইট ও বাঁশ দিয়ে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করা হয়। রাজশাহীর এ শহীদ মিনার প্রসঙ্গে স্থানীয় বিশিষ্ট ভাষাসৈনিক সাইদউদ্দীন আহমেদ ও আবুল হোসেনের স্মৃতিচারণে একই মতামত দেন। অপর ভাষাসৈনিক কাজী জিয়ারত হোসেন স্মৃতিচারণে বলেন, দেশের প্রথম শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ তৈরির পর তিনি নিজের ক্যামেরায় ছবি ধারণ করেন। স্টার স্টুডিওতে ওয়াশের পর ভাষাসৈনিক অ্যাডভোকেট মহসিন প্রামাণিক ওই ছবি সংরক্ষণ করেন।

ভাষাসৈনিক অ্যাডভোকেট মহসিন প্রামাণিক স্মৃতিচারণে বলেন, ২১ শে ফেব্রুয়ারি দিনগত সারারাত ধরে তারা ইট, কাঁদা মাটি ও বাঁশ দিয়ে নিউ মুসলিম হোস্টেলের মেইন গেটের সামনে একটা শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করেন এবং সকাল ৭টার দিকে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। বাংলাদেশের প্রথম শহীদ স্মৃতিস্তম্ভটি ২২ শে ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টার দিকে ছাত্ররা হরতালের পিকেটিংয়ের জন্য বেরিয়ে যাবার পর সরকারের নির্দেশে পুলিশ গুড়িয়ে দেয়। ভাষা আন্দোলনে রাজশাহীর নারীরাও সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। বিশিষ্ট আইনজীবী গোলাম আরিফ টিপু বলেন, 'ন্যাপ নেতা আতাউর রহমানের নেতৃত্বে '৫২'র ২২ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে রাজপথে তাদের মিছিলে ছাত্রীরাও অংশ নেয়। রাজশাহীর ছাত্রীদের ওই সাহসিকতায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি এবং আন্দোলনে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়। ওইদিন মিছিলে অংশ নেন জাহানা আরা বেগম (ঢা.বি শিক্ষক), মোহসেনা বেগম, মনোয়ারা বেগম, হাফিজা বেগম টুকু ও হাসিনা বেগম প্রমুখ। ২৩ ফেব্রুয়ারি ভুবনমোহন পার্কের বিশাল ছাত্রসমাবেশে রাজশাহী কলেজের ছাত্রী জাহানারা বেগম, মেডিক্যাল স্কুলের ছাত্রী মোহসেনা বেগম, কুলসুম বেগম, পিএন স্কুলের ছাত্রী মনোয়ারা বেগমসহ হিন্দু ও মুসলিম ছাত্রীরা জ্বালাময়ী বক্তৃতা দেয়। রাজশাহী মেডিক্যাল স্কুলের ছাত্রী ডা. কুলসুম বেগম সেই দুর্যোগের সময়ে সরকারি গোয়েন্দাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে, জীবনবাজি রেখে কারাবন্দী ছাত্র নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আন্দোলন চালিয়ে গেছেন। '৫২ সালে রাজশাহী কারাগারে আটক ভাষাসৈনিকদের জন্য নিজ হাতে তৈরি রুটি-পরাটার মধ্যে বিশেষ কৌশলে পাঠানো চিঠিতে বাইরের আন্দোলন পরিস্থিতি অবহিত করতেন।'

এদিকে রাজশাহী জেলা ও মহানগরীতে শতাধিক শহীদ মিনার থাকলেও দেশের প্রথম শহীদ স্মৃতিস্তম্ভের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও রাজশাহী কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মাণে স্থানীয় গণমানুষের দাবি এখনো উপেক্ষিত। তাদের মানববন্ধন ও পথসভার পরিপ্রেক্ষিতে রাজশাহী কলেজ কর্তৃপক্ষ স্থানটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মেলেনি। রাজশাহীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারও সেখানে নির্মিত হয়নি। তবে ১৯৫৩ সালেই স্থানীয় ভাষাসৈনিকদের উদ্যোগে ভুবনমোহন পার্কে শহীদ মিনার তৈরি করে জাকজমকভাবে একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপন করা হয়। এরপর ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে বিজয়ী যুক্তফ্রন্ট সরকার ২১শে ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস ও সরকারি ছুটি ঘোষণা করে। কিন্তু দু'মাসের কম সময়ে যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রিসভা ভেঙ্গে পাকিস্তান কেন্দ্রীয় শাসন জারির কারণে তা কার্যকর হয়নি। এরপর পাকিস্তান আমলেই স্থানীয় ভাষাসৈনিকদের উদ্যোগে রাজশাহী কলেজ প্রাঙ্গণে শহীদ মিনার নির্মিত হয়। যা ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক বাহিনী গুড়িয়ে দেয়। পরে ১৯৭৮-৭৯ সালে শহীদ মিনারটি পুন:নির্মাণ করা হয়।

অন্যদিকে ১৯৬৪ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) সচেতন ছাত্ররা ক্যাম্পাসের শহীদুল্লাহ কলাভবনের দক্ষিণ পার্শ্বের আম বাগানে শহীদ মিনার তৈরি করেন। পরবর্তীতে ১৯৬৪-৬৫ সালে সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদের প্রচেষ্টায় ক্যাম্পাসে গড়ে ওঠে পূর্ণাঙ্গ শহীদ মিনার। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকহানাদার বাহিনী শহীদ মিনারটি গুড়িয়ে দেয়। স্বাধীনতার পর শের-ই-বাংলা একে ফজলুল হক হলের সামনের চার একর জমিতে মনোরম স্থাপত্যের নিদর্শন ক্যাম্পাসের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ, আজকের শহীদ মিনার নির্মিত হয়। এই শহীদ মিনারের পটভূমিতে শিল্পী মুর্তজা বশীর এবং শিল্পী ফনিন্দ্র নাথ রায়ের বিশাল ম্যুরাল রয়েছে। এছাড়া স্বাধীনতার পর ১৯৭৪-৭৫ সালে সরকারি উদ্যোগে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজের (রামেক) প্রশাসন ভবনের সামনের শহীদ মিনার নির্মিত হয়।

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ বলেছেন, 'বিএনপি নির্বাচনে গেলে তাদের জয় ছিল হান্ড্রেড পার্সেন্ট নিশ্চিত'। আপনিও কি তাই মনে করেন?
1 + 3 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
এপ্রিল - ২০
ফজর৪:১৪
যোহর১১:৫৮
আসর৪:৩১
মাগরিব৬:২৫
এশা৭:৪১
সূর্যোদয় - ৫:৩৩সূর্যাস্ত - ০৬:২০
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :