The Daily Ittefaq
ঢাকা, শুক্রবার, ১ মার্চ ২০১৩, ১৭ ফাল্গুন ১৪১৯, ১৮ রবিউস সানি ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ কাল ঠাকুরগাঁও ও নোয়াখালীতে জামায়াতের হরতাল | মঙ্গলবার বিএনপি'র সকাল-সন্ধ্যা হরতাল | রাজবাড়ীতে ট্রাক চাপায় ৪ মোটরসাইকেল আরোহী নিহত | নোয়াখালীতে জামায়াত-পুলিশ সংঘর্ষ, আহত ১৫ | গাইবান্ধায় জামায়াতের হামলায় দোকানির মৃত্যু, ১৪৪ ধারা জারি

সারমেয় সমাচার

আনোয়ারুল হক

বাজারে এলে অনেকেরই মাথা গরম হয়ে যায়; মোস্তাকের হয় না। আজকাল বাজারে জিনিসপত্রের দাম যে হারে প্রতিদিন বাড়ছে তাতে মাথা ঠান্ডা রাখা খুবই কষ্টকর। তবু মোস্তাক মাথা গরম করে না। মাথার তালু ঠান্ডা রাখার টেকনিকটা তার সহজ। পারতপক্ষে সে তরিতরকারি জিনিসপত্রের দামাদামিতে যায় না। প্রথম দফা জিজ্ঞেস করে—কত?

দোকানি যা বলে সেটা যদি পছন্দ না হয়, তাহলে সে একটা দাম বলে। বিক্রেতা রাজি না হলে মোস্তাক পছন্দের বিষয়টিকে প্রাধান্য দেয়। তার দিকের পাল্লা ভারী হলে সে ওই দামেই নিয়ে নেয়। এই নিয়মে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাজার করে ভদ্রলোকের বেটা বাড়ি ফিরে আসে।

বাজার থেকে তাড়াতাড়ি ফেরার মোস্তাকের জানা একটা মাসলা আছে। বাজারের ব্যাগ হাতে নিলে তার গ্রামের মসজিদের ইমাম মাওলানা নুরুদ্দিন হুজুরের কথা মনে পড়ে। তিনি বলতেন—বুজজনি মিঞা, বাজার অইল নরক। যত তাড়াতাড়ি পারবা, বাইর অইয়া আসবা। আর মসজিদ অইল বেহেশত, যত বেশি সময় পারবা, থাকবা। দোয়া দরুদ পড়বা,পুণ্য অইব।

এইসব কথার কথা, কেই বা মানে। কিন্তু মোস্তাক বাজারে এলে তার হুজুরের কথা মানে। একদামে জিনিস কেনে। তবে বাড়ি ফেরার পর দ্বিতীয় পর্বে তার স্ত্রী মনোরমা প্রথমেই বলবে—এত তাড়াতাড়ি ফিরে এলে? নিশ্চয়ই পচা-ধচা যা পেয়েছ, নিয়ে এলে! তোমাকে তো ওরা ভালোই চেনে—বলে গজগজ করতে করতে বাজারের ব্যাগ উপুড় করবে সে। মাছ-তরকারি ডান হাতের তর্জনী দিয়ে নাড়তে নাড়তে দাম শুনে চোখ কপালে তুলবে,—এই মাছের এত্ত দাম! তুমি কি দরদামও করতে জানো না?

বাজার থেকে ফিরে এলে মনোরমার নিত্য এই নাটকে মোস্তাক আগে ক্ষেপে যেত। আজকাল আর ক্ষেপে না। কেননা, ক্ষেপার মতো কোনো কারণ ঘটে না। না ঘটার মন্ত্রটা শিখিয়ে দিয়েছেন মোস্তাকের শ্বশুর, মনোরমার বাবা। তিনি সংসার অভিজ্ঞ ঘুঘু। নিজের মেয়েকে ভালোই চেনেন। একদিন মোস্তাকের অনুযোগের জবাবে বললেন—বেটা, অন্তত বাজারের ক্ষেত্রে অত সত্যটা বলার দরকার কী।

মোস্তাক বুদ্ধিমান ছেলে। বুঝে নিয়েছে ইঙ্গিতটা। তবে শ্বশুর আবার সাবধান করে দিয়েছেন। বলেছেন—দাম বাড়ানো-কমানোর প্রয়োগ বুঝেশুনে করো, যেন ধরা পড়ে যেতে না হয়। তো মোস্তাক ঠান্ডা মাথার লোক। ম্যানেজ করার বিষয়টি তার অজানা নয়। রাজগঞ্জ শাখার অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপক মোস্তাক আহমদ ব্যবস্থাপনার বিষয়টি প্রতিদিনই হাতেকলমে প্রয়োগ করে আসছে। দক্ষ সে।

মোস্তাকের আজ তাড়া নেই। শুক্রবার বন্ধের দিন। দাওয়াত দেওয়া হয়েছে একমাত্র শ্যালককে। সে তার বউ নিয়ে আজ দুপুরে খেতে আসবে। মোস্তাকেরও ইচ্ছা, সব সময় তো আর হয় না, এই সুবাদে আজ একটা বড় মাছ কিনবে। ভাবনামতো গজেন্দ্রগমনে এ-ওর ধাক্কা খেতে খেতে দেখতে দেখতে মাছবাজারে রুই মাছের আড়তে ঢুকে চেনা মাছওয়ালার ডালার ওপর চার-পাঁচ কেজি ওজনের রুই মাছটা দেখে থমকে দাঁড়াল মোস্তাক। ডালার সামনে দাঁড়ানো সাহেবের চোখের দিকে চোখ ছিল মাছওয়ালার। জিজ্ঞাসা করল—নিবেন স্যার?

—ইচ্ছে তো আছে। কত?

—আপনে যদি নেন, স্যার তাইলে তিন হাজার টাকা দিয়া নিয়া যান। মাছওয়ালার সরল জবাব শুনে মোস্তাক হকচকিয়ে যায়। এত্ত দাম ! কিস্তু সে দমে যায় না। রুই মাছটার পেটের দিকটা হলুদ রঙের, বোঝা যায়, গাঙের মাছ। সব দিন এমন মাছ মেলে না। আমদানি করা কর্ণফুলী কিংবা বার্মার রুই নয়। বরফ অথবা ফরমালিন দিয়ে তাজা বানিয়ে রাখা রুইও নয়। নদীর মাছের স্বাদই আলাদা। চেহারাই অন্যরকম, দেখাতেও চোখের আরাম।

মোস্তাক দোনামোনা করে। ঘাড় চুলকায়। মাছওয়ালা তাড়া দেয়—নিয়া যান, স্যার। এই মাছ সব দিন বাজারে পাইবেন না। দেন ব্যাগ দেন—বলে মাছবিক্রেতা সাহেবের ব্যাগের জন্য হাত বাড়ায়। মোস্তাক নিজের পকেটের ওজন বুঝে মাছের দাম মোলায়েম করে বিক্রেতার কানের কাছে ছেড়ে দেয়—আট শ টাকা দিলে হয় না মাছটার দাম?

মোস্তাকের দাম শুনে মাছওয়ালা চিলচিত্কার করে ওঠে—কন কী স্যার, আপনে দেইখ্যাই তো এই দাম কইলাম, এমুন মাছ সারা বাজারে পাইবেন না—বিক্রেতার মুখে মাছের গুণাগুণ শুনতে শুনতে সে লক্ষ করে তার আশেপাশে বেশ কজন ক্রেতা দাঁড়িয়ে গেছে। সরে গেলে ফিরে এসে আর জায়গা পাওয়া যাবে না। কেউ না কেউ ছোঁ মারবেই। তাই মোস্তাক রশি ছাড়ে না।

—আচ্ছা ঠিক আছে, আরও দুই শ টাকা দেব। মোস্তাকের এগিয়ে আসার ধরণ দেখে মাছওয়ালা বুঝে গেছে। সে দাম ছাড়ে না। বলল—স্যার, আপনের টাকা দেওন লাগব না। মাছ নিয়া যান। মাছ খাইয়া আমারে টাকা দিয়া যাইয়েন। এই কথা বলে বিক্রেতা ব্যাগের জন্য সাহেবের দিকে হাত বাড়ায়। ঠিক তখনই ঘটল ঘটনাটা।

কান্দিরপাড়ের এই নিউমার্কেটে যারা বাজার করে, তারা সবাই মোটামুটি তাকে চেনে। হঠাত্ পয়সা হওয়ার বাহাদুরিতে লোকটার হাবভাব অন্যদের প্রতি তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের। দুজন কাজের লোক দুই ব্যাগ নিয়ে তার দুই পাশে রেখে সে বাজারে ঢোকে। কোনো দামাদামির বালাই নাই। যা নেবার, আঙুলের ইশারায় ব্যাগে ভরে টাকা দিয়ে চলে যায়। বাজারের লোকজন এবং বাজার করতে আসা লোকজন ওর কাণ্ডকারখানা নিজেদের কেনাকাটা ফেলে হাঁ করে দেখে। পরস্পর বলাবলি করে। কেউ কেউ আড়ালে-আবডালে যা বলে, তা লেখার যোগ্য শব্দ কিংবা বাক্য নয়।

লোকটার শরীর এক হাজার লিটারের গাজীর ট্যাংকির মতো গোলাকার চৌকো। মাথাটা যেন ওপরের দিকে মাঝামাঝি জায়গায় বসিয়ে দেওয়া আধা কেজি ওজনের ভাতের হাঁড়ি। সজারুর কাঁটার মতো খাড়া খাড়া চুল তেলে চকচক করছে। হাতের পাঁচ আঙুলে পাঁচটি নানা জাতের পাথরের আংটি। শার্টের ওপরের দিকের বোতাম খোলা গলায় সোনার চেন। মুখে বেনসন লেগেই আছে। নাক-মুখ দিয়ে হোস পাইপের মতো ধোঁয়া বের হচ্ছে অনর্গল। কাঁধের দুই দিক থেকে ঝুলে থাকা কাকতাড়ুয়ার মতো হাত দুটো বাতাস কেটে যেন বৈঠা বায়। তার মুখটা পেডি ডগের মতো গোল, রঙ কালো।

রুই মাছওয়ালার সামনে এসে মোস্তাকের গায়ের ডান দিকে ধাক্কা লেগে থামল। ওর ধাক্কায় মোস্তাক বাম দিকে হেলে এক পা সরে গেল। ধাক্কা খেয়ে সে যত না বিরক্ত হলো, লোকটার পরের কাণ্ডটা দেখে ও শ্বাস ফেলতেই ভুলে গেল। লোকটা মাছওয়ালাকে বলছে—রুই মাছটা ব্যাগে তুইলা দে। বলার সঙ্গে সঙ্গে সঙ্গী লোকদুটোর একটা ব্যাগ বাড়িয়ে দিয়ে মাছটা গিলে ফেলতে উদ্যত হয়।

মুখের গ্রাস কেড়ে নিলে যা হয়, তা-ই হলো মোস্তাকের। বলা নেই, কওয়া নেই, ভদ্রতার ধারধারি নেই, এতক্ষণ ধরে যে মাছটা সে দরদাম করছে নেবে বলে, সেই মাছটা এই লোকটা হুট করে টাকার জোরে নিয়ে নেবে? খুব অপমানিত বোধ করল মোস্তাক। অসহায়ত্ব তাকে কাণ্ডজ্ঞানশূন্য করে দিল। রাগে সে কাঁপতে লাগল। বাড়িয়ে দেওয়া ব্যাগের মুখ খপ করে চেপে ধরে লোকটার উদ্দেশে বলল—কী ব্যাপার, আপনি দেখছেন না মাছটা আমি দরদাম করছি? গাজীর ট্যাংকি মোস্তাকের কথার কোনো জবাব দিল না। টাকা গুণতে গুণতে মাছওয়ালাকে জিজ্ঞাসা করল—কত রে?

মাছওয়ালা হাত কচলায়। ওদের দুজনের দিকে তাকায়। মাছ বিক্রেতাকে লক্ষ করে মোস্তাকের বিরক্তি ঝরে পড়ে—এই মিয়া, তোমার মাছ আমি দাম করছি, তো ওনার কাছে বিক্রি করছ কেন? মাছওয়ালা কিছু বলে না। মুখ কাচুমাচু করে। কুতকুতে লোকটা এতক্ষণে মোস্তাকের দিকে নজর করে। চোখ ছোট করে ওকে নিরীক্ষণ করে। তারপর ডান হাতের বুড়ো আঙুল মোস্তাকের বুকে ঠেকিয়ে ওকে পেছনে ঠেলা দেয়। সিগারেটটা মুখ থেকে মাটিতে ফেলে পা দিয়ে পিষে আশপাশের কৌতূহলী চোখগুলো একবার দেখে নেয়। মোস্তাক শুনল, লোকটা বলছে—বাজারে নতুন মাল মনে অয়। চেনে না, না রে—শেষাংশের বাক্যটি দুই চেলার দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল।

মোস্তাক লোকটার অসৌজন্যমূলক আচরণে দিগ্বিদিক জ্ঞান হারাল। এক ঝলক রক্ত উঠে গেল মাথায়। লজ্জায়, ঘৃণায় তার শরীরে পশুর শক্তি এসে ভর করল। সে এক ঝটকায় মাছওয়ারার ডালার ওপর রাখা তিন হাত লম্বা ঝকঝকে দা হাতে তুলে নিল। কেউ কিছু বোঝার আগেই বিকট এক চিত্কার দিয়ে রুই মাছের মাথা বরাবর এক কোপ বসিয়ে দিল।

ঘটনার আকস্মিকতায় মুটকু তার চেলাসহ দ্রুত পেছনে সরতে গিয়ে চিত্ হয়ে পড়ল তার পাশে বাঁ হাতে মুরগি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটির ওপর। সারা বাজারে ছোটাছুটি; এ ওর গায়ে পড়ছে। হাঁকডাক—পালা পালা...। কিছু বুঝে ওঠার আগেই এ-ওকে জিজ্ঞেস করে আর দৌড়ায়। ঝপাঝপ দোকানের পাল্লা পড়তেও দেরি নেই। সারা বাজারে রব উঠে গেল—কেল্লা ফালাই দিছে রে... হায় হায় রে, মাথা ফালাই দিছে।

এদিকে মাছওয়ালাকে ঘিরে থাকা লোকজন নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে দেখল, মোস্তাকের সারা শরীরে মাছের ছোপছোপ রক্ত আর জলে-কাদায় মাখামাখি, চোখ লাল। চিত্ হয়ে পড়ে থাকা গাজীর ট্যাংকির সামনে দা হাতে উদ্যত, মুখে বলছে—নে, মাছ খা। এই অবস্থায় কেউ মোস্তাককে নিবৃত্ত করতে এগিয়ে গেল না। ঘটনার কাছাকাছি যারা, তারা তামাশা দেখছে।

চিত্পটাং মুটকু লোকটা ওর দুই চেলার সহায়তায় উঠে দাঁড়াতেই শুরু হলো আরেক দৃশ্য। ওর পাশে বাঁ হাতে মুরগি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বয়স্ক লোকটি ধাক্কা খেয়ে কিঞ্চিত্ সরে যেতে পারলেও তার মুরগিটা পড়ে যায় গাজীর ট্যাংকির পাঁচমণি ওজনের শরীরটার নিচে। তাতে ক্ষতি যা হবার, তা-ই হলো। মুরগিটা বাঁচেনি। মরা মুরগি হাতে নিয়ে এই নিদানের দিনে মানুষটা হাউমাউ করে কেঁদে উঠল—হায় আল্লারে, এইডা কী গজবের কাণ্ড অইল রে। কান্নার মধ্যেই লোকটা ছুটে গিয়ে পাশের দোকানে ঠেস দিয়ে রাখা লাঠিটা এনে মোটার গর্দান বরাবর এক ঘা মেরে দিল। ভেজা মাটিতে কোনো ভারী বস্তু পড়লে যেমন আওয়াজ হয়, তেমনি হলো—ধ্যাস। মরণচিত্কার দিয়ে দুম্বাটা উপুড় হয়ে পড়তে পড়তে ঘুরে দাঁড়িয়ে বাঁ হাতে মুরগিওয়ালা লোকটার নাক-মুখ বরাবর এক থাবড়া মারল। সঙ্গী দুজনও চড়াও হলো লোকটার ওপর।

মারামারির এই পর্যায়ে ভিড়ের মধ্যে এক ছেলের মাথা খারাপ করে দেবার মতো চিত্কার—এই রে, আমার চাচারে মাইরা ফালাইল রে। তোরা আয় জলদি...। নিমেষের মধ্যে বাজারের লোকজন দুভাগে ভাগ হয়ে গেল। ভাঙচুর, জ্বালাও-পোড়াও শেষে পুলিশের আগমন, রায়ট পুলিশের লাঠিপেটা, টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ—কিছুই বাদ গেল না। আহত শতাধিক, ক্ষতি প্রায় দেড় কোটি টাকার। পরের দিনের পত্রিকার সংবাদ—

দুই.

বাজার দুভাগ হয়ে মারামারির সময় মোস্তাকের ব্যাংকের জুনিয়র অফিসার নির্মল দাস তার ম্যানেজার সাহেবকে রক্তমাখা দা হাতে আস্ফাালন করতে দেখে বেকুব হয়ে গেল। দৌড়ে সে ম্যানেজার সাহেবের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই মোস্তাক যেন সম্বিত ফিরে পেল। বুদ্ধিমান নির্মল ওর স্যারের হাত থেকে দা-টা ফেলে দিয়ে দ্রুত মোস্তাককে নিয়ে আড়ালে চলে এল।

জান বাঁচাবার জন্য মাছওয়ালা মাছ ফেলে উধাও। ভেগে গেছে মুটকু আর তার দুই চেলা। মাছের ডালায় অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে দ্বিখণ্ডিত রুই মাছ। এমন সময় দুটো কুকুর, একটি সাদা এবং একটি কালো কোত্থেকে ছুটে এসে মাছের দুই ভাগ মুখে নিয়ে পড়িমরি করে দুই দিকে ছুটে পালাল।

তিন.

কালো কুকুরটা তাগড়া জোয়ান। রুই মাছটার মাথার দিকটা তার মুখে। পাড়মরি করে ছুটতে গিয়ে সে বুঝতে পারল মাছের মাথাটার ওজন কম নয়। তবুও কুকুরটা সমস্ত শক্তি দিয়ে মাথাটা কামড়ে ধরে এক ছুটে নিউমার্কেটের সামনের রাস্তায় নেমে জিলা স্কুল রোডের দিকে ছুটতে লাগল। পুরো বাজার, আশেপাশের রাস্তাঘাট জুড়ে হইচই, চিত্কার, দৌড়াদৌড়ি, মারামারি জুড়ে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির মধ্যেও অনেকে মাছের মাথাটা নিয়ে কুকুরটাকে পালাতে দেখে কেউ কেউ তাড়া করল বটে কিন্তু পুলিশের লাঠি থেকে নিজের জান বাঁচানোটাকেই ফরজ মনে করে আড়াল খুঁজল।

তবে কালো কুকুরটি নিরাপদ রইল না। রুই মাছের ভারী মাথাটা মুখে নিয়ে একনাগাড়ে ছুটতে পারছিল না। কিছুক্ষণ পরপর মাথাটা মাটিতে রেখে জিড়িয়ে নিচ্ছিল। আশেপাশের দিকে তাকিয়ে সে নিরাপদ বোধ করছিল না। কেননা নিউমার্কেট থেকে জিলা স্কুলের সামনে আসতে আসতেই তিনটে কুকুর তার পিছু নিয়েছে। সে থামতে বিশ গজ দূরত্বে ওরাও থামল। দু-পক্ষই একে অপরকে প্রত্যক্ষ করল যার যার চোখে। কালো কুকুরটা খবরদারের ভঙ্গিতে ধমক দিল। তারপর আবার ছুটল। প্রত্যুত্তরে পিছু নেওয়া তিনটে কুকুর গড় গড় শব্দ করে যুদ্ধ ঘোষণার বার্তা দিল।

নিরাপদ জায়গা নিতে নিতে আরও দুটি কুকুর আগের তিনটির সঙ্গে যোগ দিল। দলে ভারী হয়ে কুকুরের দলটি স্টেডিয়াম মার্কেটের সামনে যেতেই কমান্ডো স্টাইলে তিনভাগে ভাগ হয়ে তিন দিক থেকে কালো কুকুরটিকে আক্রমণ করল। চোরের চোখ যেমন থাকে বোঁচকার দিকে, তেমনি সব কুকুরের চোখ মাছের মাথাটার দিকে। এক একটি কুকুর ছুটে এসে কালোটাকে কামড় দেয় তো মাছের মাথাতেও এক কামড় দিতে ছাড়ে না। এ-মুখ ও-মুখ করতে করতে রুইয়ের মাথার অধিকার হাতছাড়া হয়ে যায় যায়। মুখের গ্রাসের এমন পরিণতিতে মালিকপক্ষ জীবনবাজি রেখে ঝাপিয়ে পড়ে অন্যগুলোর ওপর।

এসপির বাংলোর সামনের রাস্তায় কুকুর যুদ্ধের টানাটানি হেঁচড়া-হেঁচড়িতে মাছের মাথাটা এর মুখ থেকে ওর মুখে যেতে যেতে একসময় দশ ফুট চওড়া গভীর নালায় গিয়ে পড়ে—ঝপাং! সবগুলো কুকুরের চোখ দেখল, মাছের মাথাটা টুপ করে তলিয়ে গেল নোংরা কাদাজলের নিচে।

কুকুর হলেও ওরা মানুষের মতো পরাজয়ের গ্লানিতে ক্লান্তির যন্ত্রণাকে হজম করতে জানে। পরস্পর যুদ্ধে অবসন্ন দেহে হাঁপাতে হাঁপাতে একে অপরের দিকে রোষ কষায়িত চোখে তাকায় কিন্তু আর আক্রমণে যায় না। ওরা আর কামড়াকামড়ি না করে নর্দমার পাড়ে কেউ মাটিতে বসে, কেউ শুয়ে পড়ে, কেউ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাঁপায়। নর্দমার পাড় থেকে সরে না। যেনো কোনো মানুষের মতো আবার সুযোগের অপেক্ষা করে।

চার.

বাজারের সাদা কুকুরটার ভাগ্য কালো কুকুরটার মতো হলো না। রাণীর দীঘির পাড় দিয়ে যখন সে রুই মাছটার মাথাবিহীন শরীরটা নিয়ে ছুটছিল, তখন সে স্বগোত্রীয় কারও দ্বারা আক্রান্ত হলো না। তবে মাছের বৃহদাংশ বয়ে নিতে তাকে বেশ বেগ পেতে হচ্ছিল। কষ্ট হলেও সাদা কুকুরটা হাল ছাড়ল না। ছুটতে ছুটতে দিঘির দক্ষিণ-পশ্চিম কোনায় ডাস্টবিনের গোড়ায় এসে বসল। ভেবেছিল—সে নিরাপদ। তা নয়। আগে থেকেই আবর্জনা খুঁটে খাওয়া দুটি কাক তাকে নিরাপদে থাকতে দিল না। বায়সদ্বয় প্রথমে সাদা কুকুরটার মাথার ওপর ঘুরে ঘুরে ওকে স্বরগমের কংস রাগিনীর পাঠ দিল। তারপর কৌশল পাল্টে তারস্বরে চিত্কার করে আশপাশ থেকে আরও গোটা ছয়েক স্বগোত্রীয়কে ডেকে আনল। কাকমণ্ডলীর একজন সাদা কুকুরটার মুখের দিকে গিয়ে নিরাপদ দূরত্বে চঞ্চু বাগিয়ে অবস্থান নিল। দুটি পেছন দিক দিয়ে গিয়ে কুকুরটার লেজে ঠোকর দিল। বাকি সারমেয় বেচারার মাথার ওপর ঘুরে ঘুরে চিত্কার করে তাকে অস্থির করে তুলল। কোনো প্রতি-আক্রমণ করতে না পেরে সাদা কুকুরটা মাছের টুকরে সামনের দুই পায়ে চেপে রেখে লেজের দিকে ফিরে একটা ধমক দিল—ঘাউ। তাতে কাকদুটো পাত্তা দিল না। আবার ঠোকর দিল। এবার ঠোকরের তীব্রতা বেশি ছিল। অগত্যা যন্ত্রণায় কুকুরটা পেছনে ঘাউ করে লাফিয়ে পড়তেই সামনে দিয়ে বাকি কাকগুলো ঝাপিয়ে পড়ে মাছের নরম গায়ে ঠোকর বসাল। ভীষণ বিপদে পড়ে গেল কুকুরটা। একটা কাককে তাড়ালে অন্যটা এগিয়ে আসে। হতাশায়, বিরক্তিতে শেষ পর্যন্ত সে মাছের টুকরাটা মুখে নিয়ে সরে যাবার জন্য উঠে দাঁড়াল।

রাণীর দিঘির পশ্চিম পাড়ের বাঁধানো দেয়ালের ওপর দিয়ে সাদা কুকুরটা শহীদ মিনারের দিকে কাকের তাড়া খেতে খেতে এগোচ্ছিল। কিন্তু বিধি বাম! কোনো কুকুরই মানুষের মতো ইতিহাসের পাতা থেকে শিক্ষা নেয় না। এই কুকুরটিও না। মুখে মাছের টুকরো নিয়ে ডান দিকে দিঘির জলে তাকাতেই সে তার প্রতিবিম্ব দেখতে পেল। ঈশপের গল্পের মতোই সাদা কুকুরটি ভাবল, তার মতোই বুঝি আর একজন। তাই কুকুরের স্বভাব যেমন, কোনো কোনো মানুষের মতো সেও অন্যের ভালোটা সহ্য করতে পারে না। রাগে গরগর করতে করতে সে হুঙ্কার ছাড়ল—ঘাউ।

যা হওয়ার তা-ই হলো। কুকুরটা পানিতে পড়ে যাওয়া মাছের টুকরাটার জন্য পানিতে ঝাপ দিল না। জিহ্বায়, মুখে-ঠোঁটে লেগে থাকা রক্ত, আঁশ চাটতে চাটতে কাকগুলোকে তিরস্কার করল—ঘাউ ঘাউ। তারপর জলের দিকে তাকিয়ে নিজের চেহারা দেখে কুকুরটা তার বোকামিটা ধরতে পারল বলে মনে হলো না। কুকুরেরা তা পারে না। ডাস্টবিনের দেয়ালে সার দিয়ে বসা কাকগুলি দেখল—দিঘির পাড়ে জলের দিকে মুখ করে কুকুরটা বসে পড়েছে। দুটো কাক পরামর্শ করে উড়ে গিয়ে তার পিঠে বসল। সে নড়ল না; বসতে দিল। তারপর গভীর হতাশায় ওরা গায়ে গা লাগিয়ে জলের দিকে তাকিয়ে বসে রইল। কোনো মানুষের মতো, আবার কোনো সুযোগের অপেক্ষায়।

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
তত্ত্বাবধায়ক আমলে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে সেনাবাহিনীর একাংশ। টিআইবির গবেষণা প্রতিবেদনের এই অভিযোগ যৌক্তিক বলে মনে করেন?
1 + 4 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
অক্টোবর - ১৮
ফজর৪:৪১
যোহর১১:৪৪
আসর৩:৫২
মাগরিব৫:৩৪
এশা৬:৪৫
সূর্যোদয় - ৫:৫৭সূর্যাস্ত - ০৫:২৯
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :