The Daily Ittefaq
ঢাকা, সোমবার, ০৩ মার্চ ২০১৪, ১৯ ফাল্গুন ১৪২০, ০১ জমা. আউয়াল ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ প্রাণনাশের হুমকিতেও লাভ হবে না: রিজভী | এশিয়া কাপ: আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে ১২৯ রানের জয় পেল শ্রীলঙ্কা | পাকিস্তানে আদালতে হামলা, বিচারকসহ নিহত ১১

সেবা ও সাফল্যের গল্প

উচ্ছল শৈশবে বাবা-মা তাকে দিয়েছিলেন পূর্ণ স্বাধীনতা। যখন যেদিকে আগ্রহ দেখিয়েছেন, কলেজ শিক্ষক বাবা তাতে আরও প্রেরণা জুগিয়েছেন। পড়ালেখায় ভালো হলেই যে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে, এমন ধারণা থেকে বের হয়ে ফার্মাসিতে পড়ার স্বপ্ন দেখেছিল ছেলেটি। সেদিনের স্বপ্নবাজ সেই তরুণ আজ দেশের শীর্ষস্থানীয় ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের চিফ অপারেটিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি রাব্বুর রেজা, এ দেশের ঔষধশিল্পের বিকাশে একজন অগ্রপথিক। তিনি অস্ট্রেলিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টের অ্যাসোসিয়েট ফেলো, আমেরিকান সোসাইটি অব হেলথ সিস্টেম ফার্মাসিস্ট এবং ফার্মাসিউটিক্যাল সোসাইটি অব অস্ট্রেলিয়ার সদস্য। সম্প্রতি তিনি বিজনেস ও লিডারশিপের উপর অস্ট্রেলিয়ান অ্যালামনাই এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড ২০১৪-তে ভূষিত হয়েছেন। গুণী এই মানুষটি প্রজন্মকে শুনিয়েছেন তার পথচলার গল্প। তা-ই জানাচ্ছেন

সাজেদুল ইসলাম শুভ্র ও ছবি তুলেছেন দীপঙ্কর দীপু

রাব্বুর রেজার ছেলেবেলা কেটেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জে। তিন ভাইয়ের মাঝে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। বাবা-মায়ের আদর-শাসনের সেই দিনগুলোর কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, 'কোনো কাজে বাবা-মা কখনও বাঁধ সাধেননি।' আরও জানান, এই অফুরন্ত স্বাধীনতার অপব্যবহারও করেননি তিনি কখনোই। গণ্ডির বাইরে ভাবতে শিখিয়েছিলেন বাবা তাকে। সবকিছুতেই তাই আগ্রহের কমতি ছিল না রাব্বুর রেজার। পড়াশোনাতে বরাবরই ভালো ফলাফল করে এসেছেন, তার জন্য যে খুব বই নিয়ে বসে থাকতেন তা না, চেষ্টা করতেন জেনে-বুঝে কোনো বিষয়কে আত্মস্থ করার। একটা সময় পারিপার্শ্বিকতার কারণে অনেকেই চাইতেন মেধাবী এই ছেলে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হোক। রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের পড়াশোনা শেষ করে মেডিকেলে ভর্তির সুযোগও পেয়ে যান তিনি। কয়েক মাস পড়ার পরই ফার্মাসিতে শিক্ষাবৃত্তি পেয়ে চলে যান ভারতের পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটিতে। সেটা আশির দশকের শেষভাগে। ঔষধশিল্পের ভবিষ্যত্ যে ভালোই হবে, সেটা অনুমান করা যাচ্ছিল সে সময়। সব ভেবেচিন্তেই তাই ফার্মাসিতে ভর্তি হয়ে গেলেন তিনি। সময়ের সফল একজন ফার্মাসিস্টের পথচলার শুরুটা ছিল এভাবেই।

রাব্বুর রেজা পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটি থেকে পড়াশোনা শেষে দেশে ফিরে আসেন। বেক্সিমকো ফার্মাতে যোগ দেন প্রোডাক্ট অফিসার হিসেবে। নব্বই দশকে দেশের ফার্মা খাত দ্রুত বিকশিত হতে থাকে এবং এটি একটি সম্ভাবনাময় রপ্তানিমুখী শিল্প হিসেবে পরিচিতি পেতে শুরু করে। এই সময়টাতেই বেক্সিমকোর বিপণন বিভাগের অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ১৯৯৭ সালের দিকে রাব্বুর রেজা এমবিএ করার জন্য পাড়ি জমান অস্ট্রেলিয়ায়। ফার্মাসিউটিক্যালে কাজ করতে করতেই তিনি অনুধাবন করেন যে, প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য ব্যবসায় প্রশাসনে অভিজ্ঞতারও দরকার রয়েছে। সেই আগ্রহেই অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি থেকে তিনি এমবিএ করেন। এমবিএ শেষ করে অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষস্থানীয় ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিগুলোতে কয়েক বছর কাজ করেন তিনি। তার প্রাপ্তির ঝুলিতে যোগ হয় কিছু গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা। একটা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান কীভাবে পরিচালনা করা হয়, সেটাও তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন। এরপর ২০০৫ সালের দিকে আবার দেশে ফিরে আসেন। বেক্সিমকোতেই আবার নির্বাহী পরিচালক হিসেবে যোগ দেন। পদোন্নতি পেয়ে পরিচালক হন মার্কেটিং বিভাগের। এরই মধ্যে আমেরিকার হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল এবং লন্ডন বিজনেস স্কুল থেকে স্ট্র্যাটেজি এবং লিডারশিপে উচ্চতর এক্সিকিউটিভ এডুকেশন গ্রহণ করেন, যেটা তাকে একজন দক্ষ ব্যবস্থাপক হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করেছে। তার অভিজ্ঞতা আর পারদর্শিতার কারণেই বেক্সিমকো কর্তৃপক্ষ তাকে ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠানের চিফ অপারেটিং অফিসার পদে আসীন করেন। নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা আর ভালোবাসা থেকেই সেই গুরুদায়িত্ব সফলভাবে পালন করে চলেছেন রাব্বুর রেজা।

প্রজন্মের এই মেধাবী মানুষটার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, ঔষধশিল্পে নতুন প্রজন্মের ভূমিকা সম্পর্কে। তিনি জানালেন, তরুণেরা সবসময়ই ভালো করছে। নতুন নতুন ভাবনার আশ্রয়ে নতুন প্রজন্মেরই তো জয়যাত্রা এখন। তবে আরও ভালো করতে কাজের প্রতি ভালোবাসা থাকাটা খুবই দরকার। এই বিষয়টায় নতুনদের গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কাজের দায়িত্বকে শুধুই দায়িত্ব না ভেবে যদি একটু ভালোবেসে করা যায়, সেটা অনেক সহায়ক হয় সাফল্যের জন্য। তার নিজের অভিজ্ঞতাটাও তেমনিই। ফার্মাসিতে পড়তে এসে আন্তরিকতার সবটুকু দিয়ে চেয়েছেন এই জগতের সুধাটুকু খুঁজে নিতে এবং এই প্রবণতা তাকে সাফল্যের স্বাদও দিয়েছে। এরই আলোকে বলা যায়, নতুনরা যে কাজই করুক; আগ্রহ আর ভালোবাসা থেকে করলে সফলতা আসবেই।

দেশের ফার্মাসিউটিক্যালসের অগ্রযাত্রা রাব্বুর রেজা খুব কাছ থেকে দেখেছেন। সেই সূত্রে তার কাছ থেকে সংক্ষেপে জানতে চেয়েছিলাম এই শিল্পের বিকাশ সম্পর্কে। তিনি জানালেন, স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত আমাদের দেশের ওষুধ আসত বাইরে থেকেই। বহুজাতিক কিছু প্রতিষ্ঠানই এই বাজার পুরোটা নিয়ন্ত্রণ করে এসেছে। ১৯৮২ সালে ড্রাগ পলিসি প্রণয়নের ফলেই যুগান্তকারী পরিবর্তন আসে এই খাতে। ঔষধশিল্পের ক্রমশ বিকাশ ঘটতে থাকে। আর মাঝের এই ত্রিশ বছরে নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে উন্নত দেশগুলোসহ বিশ্বের অনেক দেশে পৌঁছেছে আমাদের তৈরি ওষুধ। বেক্সিমকোও আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে তাল মিলিয়ে সর্বোচ্চ মানের নিশ্চিত করেই উন্নত দেশগুলোতে ওষুধ রফতানি শুরু করে। আর এখন অর্ধশতেরও বেশি দেশে ওষুধ সরবরাহ করছে তারা। এরই মধ্যে বেক্সিমকো ফার্মা টিজিএ অস্ট্রেলিয়া, ইইউ জিএমপি, এনভিসা ব্রাজিল, জিসিসি জিএমপিসহ সর্বাধিক সংখ্যক জিএমপি অনুমোদন লাভ করেছে। বেক্সিমকো বরাবরই প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারে ওষুধ উত্পাদনে মনোনিবেশ করেছে। সেই যাত্রায় মিটারড ডোজ ইনহেলার, অপথ্যালমিকস, ইনট্রাভেনাস ফ্লুইড, ড্রাই পাউডার ইনহেলার, প্রিফিলড সিরিঞ্জ বেক্সিমকোর ভিন্ন পরিচিতি তৈরি করে দিয়েছে বিশ্বের দরবারে। এই ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারলেই অদূর ভবিষ্যতে রফতানির দুয়ার আরও উন্মোচিত হবে বলে মনে করেন রাব্বুর রেজা। তার নেতৃত্বে বেক্সিমকো কাজ করে যাচ্ছে এমন একটা লক্ষ্যকে সামনে রেখেই। প্রজন্মের এই আইকনের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, সম্ভাবনাময় এই পেশায় আগামীতেও কাজের সুযোগ কেমন থাকবে? আর তারা কেমন প্রার্থীদেরকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন? রাব্বুর রেজা বলেন, 'এই শিল্পে বিজ্ঞান বা ফার্মাসি শাস্ত্র তো বটেই, প্রকৌশল ও ব্যবসায় প্রশাসনের শিক্ষার্থীদেরও কাজের সুযোগ রয়েছে। তারা বরাবরই প্রার্থীর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বিষয়ের পাশাপাশি পারিপার্শ্বিক জ্ঞান ও ইংরেজি দক্ষতাকে বিশেষ প্রাধান্য দেন। একসময় বিদেশি ওষুধের রাজত্ব থাকলেও এখন মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে দেশি ওষুধের কোম্পানিগুলো। বর্তমানে উত্পাদনে রয়েছে এমন দেশি ওষুধ কোম্পানির সংখ্যা ১৬০-এর বেশি। তাই লক্ষ্য ঠিক রাখলে যে কেউ এই পেশায় উন্নত ক্যারিয়ার গড়তে পারেন বলে মন্তব্য করেন তিনি। রাব্বুর রেজা এত বিশাল দাপ্তরিক কাজের পরেও পরিবারের মানুষদের কাছে আত্মার আপনজন। তার বাবা ছিলেন কলেজের শিক্ষক, মা গৃহিণী। মূলত তাদের টানেই বাইরের দেশের সব সুযোগ অগ্রাহ্য করে এসেছেন তিনি সবসময়। তার প্রিয় বাবা-মা ক' বছর হলো চলে গেছেন না ফেরার দেশে। সন্তানের সাফল্যে তারা বরাবরই উচ্ছ্বসিত ছিলেন। সব কাজে উত্সাহ দিতেন, অনুপ্রেরণা দিতেন। ঠিক এখন নিজের মেয়েদেরকেও একই ভাবে উত্সাহ-অনুপ্রেরণা দেন রাব্বুর রেজা। তার তিন মেয়ের দু'জন ফাবলিহা আর তাসফিয়া প্রি-মেডিকেল গ্র্যাজুয়েশন করছেন অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটিতে এবং আরেক মেয়ে সায়িরা পড়ছে গ্রেড ফোরে। স্ত্রী সুরাইয়া আক্তার একজন চিকিত্সক, তিনিও মেয়েদের সাথে অস্ট্রেলিয়ায় বাস করছেন।

রাব্বুর রেজা মনে করেন, কেউই চিরদিন থাকে না। কিন্তু কিছু কাজ মানুষকে চিরঞ্জীব করে রাখে, সেই কাজগুলো অনন্তকাল আদর্শ হয়ে থাকে। এদেশীয় ফার্মাসিউটিক্যাল যাত্রায় বেক্সিমকোকে তিনি নিয়ে যেতে চান এ রকম কোনো মাত্রায়, যেটা শুধু প্রতিষ্ঠানই নয়, বিশ্বের অনেক মানুষের হূদয় ছুঁয়ে যাবে। সে স্বপ্নের পথ ধরে অনেক দূর এগিয়ে যাবেন তিনি, অজস্র শুভকামনা তার জন্য।

রাব্বুর রেজা

জন্ম তারিখ ও স্থান :১৪ নভেম্বর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ

মায়ের নাম :রশিদা খানম

বাবার নাম :একলিমুর রেজা

প্রথম স্কুল :বাবুপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়

প্রিয় মানুষ :বাবা-মা

প্রিয় উক্তি :ইফ ইউ লাভ হোয়াট ইউ আর ডুইং, ইউ উইল বি সাকসেসফুল।

প্রিয় পোশাক :পায়জামা-পাঞ্জাবি

অবসর কাটে যেভাবে :পড়াশোনা করে আর গান শুনে

সাফল্যের সংজ্ঞা :লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য চেষ্টা করে যাওয়া।

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেছেন, 'এখন আমরা অনেক সুসংগঠিত। আমাদের পতন ঘটবে না।' আপনি কি তার সাথে একমত?
5 + 8 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
আগষ্ট - ১১
ফজর৪:১১
যোহর১২:০৪
আসর৪:৪০
মাগরিব৬:৩৮
এশা৭:৫৬
সূর্যোদয় - ৫:৩২সূর্যাস্ত - ০৬:৩৩
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :