The Daily Ittefaq
ঢাকা, শনিবার, ০৮ মার্চ ২০১৪, ২৪ ফাল্গুন ১৪২০, ০৬ জমা. আউয়াল ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ ২৩৯ যাত্রী-ক্রুসহ মালয়েশীয় নিখোঁজ বিমানটি ভিয়েতনাম সাগরে বিধ্বস্ত | বগুড়ার আদমদিঘীতে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে সোনালী ব্যাংকের ৩০ লাখ টাকা লুট | এশিয়া কাপে শ্রীলঙ্কা অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন | নিজেরাই অধিকার আদায় করুন : নারীদের প্রতি প্রধানমন্ত্রী

'আবাদ করলে ফলতো সোনা'

অদ্বয় দত্ত

তখনও পুব আকাশে আলো ফোটেনি। ৪৫ বছর আগের এমন এক ভোরবেলায় তাঁর জীবনে ভয়াবহ এক 'অভিশাপ' নেমে আসে। সেই দিন ভোর পাঁচটায় তাঁর বাবা মারা যান ট্রেন দুর্ঘটনায়। তখন তিনি চার বছরের অবোধ শিশু মাত্র। জানেন না কী দুর্যোগ নেমে এসেছে তাঁদের বিধবা মা আর আট ভাইবোনের জীবনে। ভারতের ওড়িশা রাজ্যের আদিবাসীদের একজন তিনি। যেন তারা মানুষ নন, উপমানুষ! গরিব বললেও গরিবদের ছোট করা হয়. এতটাই দীনদরিদ্র!

এরকম ঘটনা কত শত-সহস্র অসহায় মানুষের জীবনেই তো ঘটে। যারা পথে ঘাটে বেঘোরে মারা যান, তাদেরও তো সংসার থাকে, বউ-বাচ্চা থাকে। তারা এমনিতেই দরিদ্রের গর্তে পড়েই ছিলেন, সংসারের একমাত্র উপার্জনকারীর মৃত্যু যেন এসব মানুষের পরিবারকে গহিন গহ্বরে ফেলে দেয়। সেই গহ্বর থেকে বের হওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা কে না করেন? কিন্তু তা এমনই চোরাবালি—বেশি চেষ্টা তথা নড়াচড়া করতে গিয়ে আরও অতলে যেন ডুবে যেতে হয়। আর যারা বিরল কৌশলে, বিস্ময়কর নৈপূণ্যে বের হয়ে আসেন সেই ভয়াবহ বৃত্ত থেকে, তাঁরা তো নিজেরাই এক একটা বিস্ময়। সেই বিস্ময়ের সীমা থাকে না যখন এমনই এখন বৃত্তভাঙা মানুষ দারিদ্র্যের বৃত্ত ভাঙার ব্যবস্থা করেন হাজার হাজার শিশুর জন্য। মাত্র কয়েক লাইনে কথাগুলো বলা গেল বটে, কিন্তু তার বিস্ময়কর কর্মযজ্ঞ যত দেখা যায়, যত শোনা যায়, ততই যেন আমাদের মাথা ঘুরিয়ে দেয়।

তিনি, ওড়িশার বিস্ময়কর মানব, অচ্যুত সামন্ত। তাঁকে গত বৃহস্পতিবার খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়ে আরও বেশি চমকে যাই। তাঁর অর্জনের কথা পরে বলি। গল্পকথা বা কল্পকাহিনীতে একজন মানুষের পক্ষে যতটা অনাড়ম্বর, যতটা সাদাসিদে আর সাধারণ হওয়া সম্ভব, সেই কল্পনারই যেন জীবন্তরূপ তিনি। ঢাকার ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি তাঁকে ওইদিন দুপুরে সম্মানসূচক ডি-লিট-এ ভূষিত করেছে। সন্ধ্যায় তাঁর সঙ্গে নিভৃতে স্বল্পসময়ের জন্য কথা হয়। সাক্ষাতের সময় বারবার তাঁর চোখের দিকে তাকাই। তাঁকে ঘিরে চারদিকের উত্সবের জৌলুস তাঁকে যেন কেমন ক্লান্ত করে রাখে। খালবিলে খেলে বেড়ানো মীন যেন ছোট্ট গোলাকার অ্যাকিউরিয়ামে চলে এসেছে! তাঁর চোখের ভেতরে লেগে রয়েছে মাটির গন্ধ। তাঁর শরীরের আড়ষ্টতায় খেলে বেড়াচ্ছে নিখাদ অরণ্যের ভাষা। তিনি রাজা হয়েও এখনও যেন গরিবেরও গরিব। এখনও দুকামরার ভাড়া বাসায় শূন্য সেভিংসে দিন গুজরান করেন। তিনি যেন প্রতিমুহূর্তে উপলব্ধি করেন তাঁর শেকড়কে, তাঁর ভয়াবহ দৈন্যঅতীতকে। তিনি কি জানতেন রামপ্রসাদের সেই গান—'এই মানব জনম রইল পতিত/ আবাদ করলে ফলতো সোনা'? নিশ্চয়ই জানতেন। না-হলে কি করে বুঝলেন, তাঁর মতোই যাঁরা দীনদরিদ্র, তাঁদের মস্তিষ্কের নিউরণে চাষাবাদ করলে তিনিও সোনা ফলাতে পারবেন। তাদের পেশাভিত্তিক শিক্ষায় প্রশিক্ষিত করলেই ভেদ করতে পারবেন দারিদ্র্যের চক্রব্যূহ।

এ এক অসাধ্যসাধকের বিস্ময়কর কাহিনী বললেও কম বলা হয়। তিনি মেধাবী ছাত্র ছিলেন বটে। কিন্তু আট জনের অভাবের সংসারে কী করে পড়ালেখা চালিয়ে গেলেন, সেটা বিস্তারিত জানতে তাঁর আত্মজীবনী লেখা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। যেভাবেই হোক, উচ্চশিক্ষা সমাপ্ত করে চাকরিতে ঢুকেছিলেন একটি কলেজের লেকচারার পদে। এতখানি অর্জনের পর সাধারণত অধিকাংশ মানুষের জীবনই ধরাবাঁধা ছকে চলে যায়। অচ্যুত সামন্ত ব্যতিক্রম এখানেই। কিছু দিন চাকরি করার পর তিনি ঠিক করলেন, ছেলেবেলায় তাঁর পড়াশোনা চালাতে যে রকম অসুবিধা হয়েছিল, সে রকম অসুবিধাতে এ কালের অনেক ছাত্রও তো পড়ে। তাদের জন্যে কিছু একটা করা দরকার। সম্পূর্ণ একার উদ্যোগে স্কুল-কলেজ গড়ায় মন দিলেন। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই তাঁর প্রতিষ্ঠিত কলেজ পেয়ে গেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা। সে মর্যাদা পেতে হলে অনেক শর্ত পূরণ করতে হয়। হলো নিজস্ব ভবন। এবং পর পর তৈরি হতে লাগল মেডিক্যাল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং, বিজনেস ম্যানেজমেন্ট ইত্যাদি পাঠের জন্য পৃথক ব্যবস্থা। মাত্র দু'দশকের মধ্যে এক সুবৃহত্ প্রতিষ্ঠান। ওড়িশার রাজধানী ভুবনেশ্বরের অদূরে এক বিশাল ক্যাম্পাস, সুদৃশ্য বাড়িগুলো তথ্যচিত্রে যেটুকু দেখা গেল তা এককথায় নয়নাভিরাম। এ পর্যন্ত পড়ে মনে হতে পারে, চমকপ্রদ সাকসেস স্টোরি, কিন্তু অবিশ্বাস্য কিছু নয়। এত সব কিছু গড়ে তোলার জন্য অচ্যুত সামন্ত কোনো প্রকার সরকারি সাহায্যের মুখাপেক্ষী হননি। কিছু বন্ধুবান্ধব, শুভার্থী সাহায্য করেছেন, এবং প্রধানত নির্ভর করেছেন ব্যাঙ্কের ঋণের ওপর। যথাসময়ে ঋণ শোধ দিয়ে তিনি ব্যাঙ্কের বিশ্বাস অর্জন করেছেন। এর পর সেই অবিশ্বাস্য ঘটনা। উচ্চমানের শিক্ষা ব্যবস্থায় সার্থকতা অর্জনের পর অচ্যুত সামন্ত শুরু করলেন একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান। কলিঙ্গ ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল সায়েন্সেস। সংক্ষেপে কিস (KISS)। এখানে শুধু আদিবাসী সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ। না, কয়েক শ নয়, বিশ হাজার ছাত্রের জন্য হস্টেল। অচ্যুত সামন্ত আদিবাসী সমপ্রদায়ের দুর্বিষহ জীবনকে স্বাভাবিক করতে মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা, পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণকে। একই সঙ্গে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, কন্যাশিশু হত্যা বন্ধের ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় কিস-এর মাধ্যমে। 'কিস' শুরু হয়েছিল মাত্র ১২৫ জন আদিবাসী ছেলেমেয়েদের দিয়ে। স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিত্সা—পাঁচটি মৌলিক অধিকারই এখানে একযোগে দেওয়া হয়। পড়ালেখা করানো হয় কেজি (কিন্ডারগার্টেন) থেকে পিজি (পোস্ট গ্রাজুয়েশন)। এর সবকিছুই করা হয় বিনামূল্যে। এর ফলাফল হয় বৈপ্লবিক। এই গরিবের চেয়েও গরিব ছেলেমেয়েরা শিক্ষার শক্তিতে জেগে ওঠে। প্রকৃত মানবসম্পদ হয়ে ওঠে। পনের লাখ বর্গফুটের ক্যাম্পাসটির ভেতরে রয়েছে আধুনিক সব ধরনের ব্যবস্থা। তাঁর নতুন স্বপ্ন হলো এই বিশ হাজার সংখ্যাটাকে ২ লাখে উন্নীত করা আগামী ৬ বছরের ভেতরে। সারা বিশ্বে আর কোথাও—এক সঙ্গে বিশ হাজার আদিবাসী সন্তানদের খাওয়া, থাকা, লেখাপড়ার ব্যবস্থা, সব বিনা খরচে—না, আর কোথাও নেই। এর জন্য যে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন তা আসে কোথা থেকে? ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিক্যাল কলেজ চালিয়ে যথেষ্ট উপার্জন হয় তো বটেই, সেই উপার্জন ব্যয়িত হয় আদিবাসী কল্যাণে।

অথচ এই আদিবাসীদের অনেকের বাসস্থান ও জীবন নষ্ট হয়ে পড়ছিল নানা কারণে। শিল্পকারখানা স্থাপন, খনিখনন, অরণ্য ধ্বংসের কারণে তাদের বাসস্থান হয়ে আসছিল সঙ্কুচিত। এ কারণে প্রথাগত জীবন পরিচালনার জন্য যা যা প্রকৃতি থেকে পাওয়া যেতে পারে তা ক্রমশ কমতে শুরু করে। প্রায় শূন্য যোগাযোগ ব্যবস্থা, দারিদ্র্য, অপুষ্টি, অশিক্ষা আর অন্ধবিশ্বাসের প্রকোপে তাদের অবস্থা আরও সঙ্গিন হতে থাকে। ভাগ্যপরিবর্তনের জন্য কেউ কেউ বিপদগামী হয়ে মাওবাদীদের দলে ভিড়েছিল, স্বপ্নে বিভোর ছিল সশস্ত্র বিপ্লবের।

অচ্যুত সামন্তকে এই জায়গায় নিয়ে এসেছে সেই সব আদিবাসী ছেলে মেয়ে, যারা সুযোগ পেয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন, তাদের 'মানব জনম' তথা মেধা'র আবাদ করলে তারাও ফলাতে পারে 'সোনা'। আদিবাসীদের আবাসস্থলে কয়লা থেকে নানা খনিজ পদার্থের খনি রয়েছে, পুঁজিবাদীদের নজর সেদিকে। কিন্তু আদিবাসীদের মস্তিষ্কও যে ঠিক মতো আবাদ করলে যে সোনা ফলতে পারে, তা-র আবিষ্কর্তা অচ্যুত সামন্ত। বনফুলও যে মনভোলানী সুগন্ধী বিতরণ করতে পারে, তার সৌন্দর্য যে ছাপিয়ে যেতে পারে নন্দনকাননের সুপরিচর্যিত যেকোনো ফুলকেও, তারই উন্মোচন ঘটিয়েছেন অচ্যুত সামন্ত। তিনি বুঝেছিলেন, শিক্ষাদীক্ষায় যে 'মানুষ' তৈরি করা হয় তারাই তো তৈরি করেন 'সভ্যতা'। ব্যবস্থাপনার এক বিস্ময়কর মস্তিষ্ক রয়েছে তাঁর। নয়তো কি করে সম্ভব এমন বিশাল সুশৃঙ্খল প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার? তিনি ছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে কনিষ্ঠ আচার্য। ক্ষমতায় আঁকড়ে থাকেননি। জীবিত থাকতেই দেখতে চেয়েছেন তার অবর্তমানে অন্যের নেতৃত্বে কীভাবে পরিচালিত হয়ে তাঁরই মস্তিষ্কপ্রসূত প্রতিষ্ঠান। এসব কিছুই তাঁর 'আর্ট অব গিভিং'—প্রতিদানের শিল্প। এটা এমন একটা ভাবনার প্রক্রিয়ায় সৃষ্টি হয়, যাকে বলা যায় 'আর্ট অব লিভিং'। তিনি সেই শিল্পসত্তায় বসবাস করেন। শিল্পসত্তাতেই বিতরণ করেন তাঁর সবটুকু 'ভালো'।

লেখক : সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক

[email protected]

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, 'উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিএনপি সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
6 + 2 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
সেপ্টেম্বর - ২৩
ফজর৪:৩৩
যোহর১১:৫২
আসর৪:১৩
মাগরিব৫:৫৭
এশা৭:১০
সূর্যোদয় - ৫:৪৭সূর্যাস্ত - ০৫:৫২
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :