The Daily Ittefaq
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৩ মার্চ ২০১৪, ২৯ ফাল্গুন ১৪২০, ১১ জমা. আউয়াল ১৪৩৫
সর্বশেষ সংবাদ বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে কাল বিএনপির বিক্ষোভ | টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের উদ্বধোন করলেন প্রধানমন্ত্রী | ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৫ | বিদ্যুতের দাম বাড়ল ৬.৬৯ শতাংশ, ১ মার্চ থেকে কার্যকর | রাজধানীতে ছয় তলা ভবনের আগুন নিয়ন্ত্রণে | আদালত অবমাননা : প্রথম আলোর সম্পাদক-প্রকাশক খালাস | খন্দকার মোশাররফ সরকারের চক্রান্তের শিকার : রিজভী

[ রা জ নী তি ]

মোহাবিষ্টদের মোহমুক্তির প্রত্যাশায়

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ

জাতির দুর্ভাগ্য, উজ্জ্বল রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক এদেশের ক্ষমতার রাজনীতির মোহাবিষ্ট নেতা নেত্রীদের অনেকেই দুর্নীতিমুক্ত হতে পারছেন না বা চাচ্ছেন না। এভাবে রাজনীতির সংজ্ঞাটি ক্রমে সাধারণ্যে কলঙ্কিত অর্থবোধক হয়ে পড়ছে। ক্ষমতাধরদের দুর্নীতির মানসিকতায় অনেকটা রাখঢাক থাকা একদিক থেকে ভালো ছিল। অতটা পীড়িত হতে হয়নি বিপন্ন দেশবাসীকে। আমাদের রাজনৈতিক দুরাচারের কারণে সাধারণ বিচারে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসতো সুষ্ঠু ধারায় একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন পরিচালনা করতে। সাধারণত এমন সরকারের মেয়াদ তিন মাসের জন্য থাকে। এরমধ্যে সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের যাবতীয় প্রস্তুতি শেষ করে নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্পন্ন করে। নতুন নির্বাচিত সরকার রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পায়। এই ব্যবস্থাটি একসময় সংবিধানে জায়গা করে নিয়েছিল। এ পথ ধরেই একটি গোলমেলে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে ২০০৭ সালে 'বিশেষ' তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেছিল। সেই সরকার পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্তরা সংবিধানের নির্দেশিত প্রকাশ্য পথে না হেঁটে এবং তিন মাস মেয়াদে আটকে না থেকে দু'বছরের রোডম্যাপ দিয়েছিলেন। এ সময়ে নির্বাচনের প্রস্তুতি ছাড়াও দুর্নীতি দমন এবং নানা প্রশাসনিক নীতি নির্ধারণসহ নির্বাচিত নিয়মতান্ত্রিক সরকার যা যা দায়িত্ব পালন করে থাকে এ সরকার সে সব করার চেষ্টা করেছিল। সে সময় রাজনৈতিক নেতাদের ভাষায় এটি ছিল বিশেষ সরকারের 'রাজনীতি দমন' কার্যক্রম। যদি তা হয়ে থাকে তবে খুব আশঙ্কার কথা বলে সে সময় সচেতন মানুষ মনে করেছিল। রাজনীতি বিচ্ছিন্ন হয়ে দেশ ও রাষ্ট্র এগিয়ে যাবে কেমন করে। আর এই রাজনীতিকেই যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ভেঙ্গে-চুরে একাকার করে দেয় তাহলে দেশের সাধারণ ও রাজনৈতিক ভবিষ্যত্ কোন অন্ধকারে গিয়ে দাঁড়াবে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাধারণ কনসেপ্টে দুর্নীতি দমনের ব্যাপারটি নেই। সে সময়ে বিরোধী দলে থাকা আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব সরকারের দুর্নীতি বিরোধী তত্পরতাকে একরকম স্বাগতই জানিয়েছিল। শত্রু শত্রু খেলার রাজনীতির কারণে তখন আওয়ামী লীগ ভেবেছিল তাদের প্রধান রাজনৈতিক শত্রু বিএনপির দর্পচূর্ণ এবং বিধ্বস্ত করে দিতে এই সরকার এসেছে। আগামীতে ক্ষমতায় পৌঁছার পথ উন্মুক্ত হয়ে গেছে আওয়ামী লীগের জন্য। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের আচরণ-বক্তব্যে একবারও মনে হয়নি তারা তাদের দুর্নীতিবাজ আর সন্ত্রাসী সহযোগীদের জন্য আত্মপীড়ন বোধ করেন। ক্ষমতায় থাকার সময় অনেক অন্যায় দুর্নীতির সাথে প্রত্যক্ষ ও অপ্রত্যক্ষভাবে যুক্ত থেকেছেন, বিরোধী দলে এসে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির পথ ধরে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ভূমিকা রাখেননি, সংসদকে অকার্যকর রেখে কিভাবে ঘুরপথে ক্ষমতায় পৌঁছা যায় সে চেষ্টাই করেছেন। শেষ পর্যন্ত এক অরাজক অবস্থার জন্ম দিতে অন্যতম নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা নিয়েছেন। এসবের জন্য এখনো কেউ আত্মসমালোচনা করেছেন এমন সুন্দর স্বপ্নের দৃশ্য দেখার বা শোনার কপাল দেশবাসীর হয়নি।

অন্যদিকে কিংবদন্তিতুল্য দুর্নীতি আর অপশাসনের কালিমালিপ্ত বিএনপি ১/১১-এর পরে বজ্রাহত হয়ে খামোশ খেয়ে গিয়েছিল। সে সময়ের স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী জেগে থেকেও ঘুমিয়েছিলেন। অবস্থার ফেরে পড়ে বেগম খালেদা জিয়া ট্যাক্স দিয়ে নিজের কালো টাকা সাদা করলেন। ডাকসাইটে দুর্নীতিবাজ নেতা, মন্ত্রী, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এমন অনেকেই দম্ভের কুরসি থেকে ধপাস পতিত হয়ে স্ত্রী-পরিজন নিয়ে পলাতক হলেন। অন্য অনেকেই হলেন কারারুদ্ধ। বাকিদের যারা বালিতে মুখ লুকিয়েছিলেন, বালির বসতিতে কিছুটা ধাতস্থ হওয়ার পর আবার গা ঝাড়া দিয়ে বসতে চাইলেন। প্রথমে চিঁ চিঁ করে তারপর ধীরে ধীরে কণ্ঠ চড়িয়ে কথা বলতে লাগলেন।

মধ্যযুগের কবি লিখেছিলেন—"সে কহে বিস্তর মিছা যে কহে বিস্তর"। বিভিন্ন সময়ে সংবাদ মাধ্যমে দেয়া বক্তব্যে, টকশোর আলাপচারিতায় দেয়া রাজনীতি ঘনিষ্ঠদের কথামালায় বক্তব্যের ধারাবাহিকতার অভাব দেখেশুনে মধ্যযুগের কবিকেই মনে পড়ে যায়। এদের বক্তব্যে বোঝার উপায় নেই বিগত দিনে জোট সরকার কোনো অন্যায় করেছিল, মন্ত্রী-এমপিরা দুর্নীতি করেছিলেন, বিএনপির অপ-রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনে আর দুর্নীতির চালিকাশক্তি হিসেবে হাওয়া ভবনের জন্ম হয়েছিল, প্রশাসনের সর্বত্র দলীয়করণ সর্বকালের রেকর্ড ছাড়িয়েছিল, সাজানো নির্বাচন বাস্তবায়নের জন্য পুতুল নির্বাচন কমিশন গঠন করেছিল। রেকর্ড গড়েছিল ভুয়া ভোটার তালিকা তৈরির। এসব অভিযোগের অনেকটাই সত্য বলে জাতির সামনে স্পষ্ট হয়েছে। তবুও কোনো আত্মধিক্কারের রেশ নেই সংশ্লিষ্ট নেতা ও দল পরিচালকদের বচনে, কোনো লজ্জার ছায়া নেই চেহারায়। দলীয় নেতৃত্বের অন্যায়ের জন্য জনগণের কাছে ক্ষমা চাওয়ার কোন সভ্য আচরণ নেই। ঠিক একইভাবে মহাজোট সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের অনেকের আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার খবর এখন সর্বত্র প্রচারিত। এ নিয়েও আত্মসমালোচনা ও আত্মধিক্কার দেখা ও শোনার সৌভাগ্য আমাদের হচ্ছে না। এই যদি হয় রাজনীতি তাহলে রাজনীতি কোথায় গিয়ে ঠেকবে?

সাধারণ সচেতন মানুষ কিন্তু রাজনীতি বিচ্ছিন্ন হতে চায় না। রাজনৈতিক সংগঠনের অপমৃত্যুও চায় না। বরং চায় মূলধারার রাজনীতি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে অপ-রাজনীতির বিকাশকে রুখে দিক। কিন্তু কোনো পক্ষের রাজনৈতিক নেতৃত্ব কি আত্মশোধনের পথে হেঁটেছেন? বরং বক্তৃতা-বিবৃতিতে ভাঙ্গা রেকর্ডই বাজাচ্ছেন। দলীয় গণতন্ত্রচর্চার অনুকূলে কোনো নীতি নির্ধারণের কথা জনগণকে জানাননি। গতানুগতিকতা পরিহার করে দেশের সমাজ ও অর্থনীতিকে এগিয়ে নেয়ার জন্য কোনো পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেননি। 'দলের ভেতরে সন্ত্রাস আর দুর্নীতিচর্চা ভবিষ্যতে করা হবে না'—অমন অঙ্গীকারের কথাও শোনা যায়নি। বরঞ্চ বিবদমান বড় দুই দলের নেতা-নেত্রীরা প্রতিদিন বক্তৃতার মঞ্চে একে অন্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতি আর সন্ত্রাসের অভিযোগ এনে জনগণের বিশ্বাসকে দৃঢ় করছেন। এদেশের মানুষ বরাবর আশাবাদী। তাই দেশের উপর দিয়ে যে ঝাঁকুনি গেছে তারপরও কঠিন অভিজ্ঞতায় বেড়ে ওঠা মানুষ প্রত্যেকবারই ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর নতুন করে স্বপ্ন বুনতে থাকে। গতানুগতিক বক্তৃতা না শুনে তারা এখন রাজনৈতিক দলগুলোর নিয়ন্ত্রকদের কাছ থেকে গঠনমূলক বক্তব্য শুনতে চায়।

এসব কথা আবার নতুন করে ভাবনায় এলো গত ২৩ ফেব্রুয়ারি জাতীয় দৈনিকের প্রকাশিত একটি রিপোর্ট পড়ে।

আত্মপক্ষ সমর্থনকারীরা বলতেই পারেন বন্ধুত্বের দাবিতে সামাজিকতা রক্ষায় বরেণ্য ব্যক্তিরা অমন দাওয়াতে উপস্থিত থাকতেই পারেন। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আমাদের মত ঘরপোড়া গরুদের নিয়ে। আমরা বিশ্বাস করতে চেয়েছিলাম বিশেষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার যেভাবে সে সময়ের ক্ষমতাসীন ও বিরোধীদলীয় দুর্নীতিবাজদের মুখোশ উন্মোচন করেছিল তাতে পরবর্তী সময়ে অনেক বেশি সতর্ক থাকবেন এসব পদাধিকারী। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। বিগত মন্ত্রিসভায় শেখ হাসিনা অপেক্ষাকৃত নবীনদের প্রাধান্য দিয়ে এবং তাঁর বিবেচনায় শুদ্ধ মানুষদের নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন করেছিলেন। কিন্তু পড়ন্ত বেলায় তাদের অনেকের দুর্নীতির যে ফিরিস্তি বেরুলো তার কারণে এবার অনেককে বর্জন করে আবার নিজ বিবেচনায় সম্ভবত শুদ্ধদের নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন করলেন। নানা সহায়ক সংস্থায় অনেকে নানা পদে নিয়োজিত হলেন। কিন্তু সকলের অঙ্গভঙ্গি দেখে শঙ্কা কাটলো না সাধারণ মানুষের। এমন একটি সময়ে অমন একটি রিপোর্ট প্রকাশ পেলো পত্রিকায়।

এখন যদি সাধারণ মানুষ দুয়ে দুয়ে চার মেলাতে চায় তবে কি দোষ দেয়া যাবে? দুদকের মহাপরিচালকের উপস্থিতিতে যখন ঠিকাদার ১ হাজার ২০০ মণ চালের ভাত, ২৪২টি গরুর মাংস দিয়ে মেজবানীর আয়োজন করেন তখন কি তার মনে কোনো প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছিল? আগত অতিথিদের কেউ কি প্রশ্ন করেছিলেন চারটি স্কুল ছুটি দিয়ে এমন মেজবানীর আয়োজন ন্যায়সঙ্গত হয়েছিল কিনা?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা তাঁর চারপাশটা পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য বারবার পরিবর্তন এনেও যেন ছন্দ খুঁজে পাচ্ছেন না। দুর্নীতির সিঁদুরে মেঘ আমাদের তাড়া করে ফিরছে। দুর্নীতি ও অসততা দুর্বল করে দিচ্ছে সরকারকে, আর আওয়ামী লীগের মত একটি ঐতিহ্যবাহী দলকে। আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছড়িয়ে দিয়ে এগিয়ে যেতে চাই, তারা চারদিকে হতাশার তমসারেখা দেখতে পাই। এরপরও সকলে মুক্তির পথ খোঁজে। এই মুক্তির অর্গল খুলে দেয়ার দায়িত্ব নিতে হবে রাজনীতি অঞ্চলের নিয়ন্ত্রকদেরই। দেশপ্রেমের শক্তিই একমাত্র রাহুমুক্ত করতে পারে। আমরা এখনো আশা হারাতে চাই না। বিশ্বাস করতে চাই মোহাবিষ্টদের নিশ্চয়ই মোহমুক্তি ঘটবে।

লেখক: অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আ স ম হান্নান শাহ বলেছেন, 'ইঁদুর স্বভাবের কিছু নেতার কারণে সংসদ নির্বাচন প্রতিহতের আন্দোলন ঢাকায় সফল হয়নি।' আপনিও কি তাই মনে করেন?
2 + 8 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
জুলাই - ১৮
ফজর৩:৫৬
যোহর১২:০৫
আসর৪:৪৪
মাগরিব৬:৫১
এশা৮:১৩
সূর্যোদয় - ৫:২১সূর্যাস্ত - ০৬:৪৬
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :