The Daily Ittefaq
ঢাকা, শুক্রবার, ২২ মার্চ ২০১৩, ৮ চৈত্র ১৪১৯, ৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ মিয়ানমারে আটক ৪ বাংলাদেশির মুক্তি অনিশ্চিত | পরশুরাম থেকে ৬ শিশু ধরে নিয়ে গেছে ভারতীয় বাহিনী | ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় টর্নেডোতে নিহত ৯, আহত ৩০০ | রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় রাষ্ট্রপতির দাফন সম্পন্ন

যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ

জলতরঙ্গে সুরেলা মৃদু আওয়াজ

মঈনুস সুলতান

লাওসে পরবাসের পর আমরা মাত্র আমহার্স্ট শহরে ফিরে এসেছি। সাড়ে পাঁচ বছর আগে আমি ও হলেণ এখানকার ইউনিভারসিটি অব ম্যাস্যাচুসেটসে ছাত্র ছিলাম। মেয়ে কাজরিকে নিয়ে আমরা আজ বেরিয়েছি ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসের দিকে। সড়কের ডান পাশে সবুজ ঘাসের খোলামেলা চত্বর। তার পাশেই ইংরেজি এস অক্ষরের মতো সঞ্চিত স্বচ্ছ জলের বৃহত্ এক কৃত্রিম হূদ। হঠাত্ করে সড়কের চলমান ট্রাফিক স্থির হয়ে আসে। বিপরীতগামী দুটি লেনে গাড়িগুলো থেমে যায় সহসা। আমরা লেকের দিকে যেতে যেতে ঘাড় ঘুরিয়ে বিষয়টি কী তা দেখি। একটি মা হাঁস আটটি ছানা-পোনাসহ অতি ধীরে সড়ক অতিক্রম করে নেমে আসে ঘাসের সবুজে। শেষ ছানাটি রাস্তা পেরুতেই আবার জোর গতিতে ট্রাফিক চলাচল শুরু হয়। আমরা হাঁসছানাদের পেছন পেছন ধীরে ধীরে ঘাসের উপর দিয়ে হাঁটি। চত্বরের সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে বোধ করি ঘাসের বীজ খুঁটে খাচ্ছে কানাডিয়ান গীজ নামক কালচে বৃহদাকৃতির গুচ্ছ-গুচ্ছ মরাল। আমরা তাদের মাঝ দিয়ে এঁকেবেঁকে চলে আসি লেকের পাশে। জলে তীব্র সূর্যালোক আয়নার মতো ঝলকাচ্ছে। ওপারের আকাশচুম্বী লাইব্রেরি ভবনের প্রতিফলনের পাশে ধ্রুপদী ধাঁচে নির্মিত পুরোনো দিনের পাথরের চ্যাপেল বা গীর্জা ঘরটিকে বামুনাকৃতির স্ট্রাকচার বলে বোধ হয়। আমাদের দিকে সাবলীল গতিতে ভেসে আসে ধবধবে শ্বেতশুভ্র অতি বৃহত্ দু'টি সোয়ান জাতীয় হাঁস। সোয়ান দু'টি একত্রে গ্রীবা উঁচুনীচু করে যেন আমাদের অভিবাদন করে। তারপর কিছুক্ষণ স্থির তাকিয়ে থেকে কোয়াক্ কোয়াক্ শব্দ তুললে কাজরি বলে, 'লুক দে আর আসকিং আস সামথিং।' হলেণ প্রকাণ্ড হাঁস দু'টির দিকে চেয়ে বলে, 'সরি সোয়ানস্, টুডে উই ডোন্ট হ্যাভ এনিথিং উইথ আস। উই ক্যান্ট আফার ইউ এনি ফুড্, ভেরি সরি।' পাখি দু'টি হতাশ হয়ে স্বল্প উচ্চারণে শুধু 'কোয়াক্' করে ভেসে যেতে থাকে দূরে। কাজরি তাদের দিকে হাত নেড়ে বলে, 'গুডবাই সোয়ানস্, টুমোরো উই উইল ব্রিংগ ইউ সাম ফুড।' একটি সোয়ান গ্রীবা বাঁকিয়ে কাজরির দিকে তাকিয়ে বলে 'কোয়াক্'। সে জানতে চায়, 'হোয়াট দ্যা বিগ হাঁস ইজ সেয়িং বাপি?' আমি কাজরিকে বলি মনে হয় সোয়ানটি বলছে, 'ঠিক আছে কালকেই না হয় কিছু নিয়ে এসো।'

আমরা পাথরের সেতু ধরে হেঁটে হরদের ভেতরকার ছোট্ট কৃত্রিম দ্বীপে এসে পৌঁছি। দ্বীপটিতে কেবলমাত্র একটি গাছ। বিরলপত্র গাছে বসে আছে অনেকগুলো মত্স্যভুক বক। আমাদের সাড়া পেয়ে বেশ ক'টি সাদা পাখি উড়ে যায় লেকের দিকে। অন্যপাড় সূর্যালোকে উজ্জ্বল হয়ে আছে বটে, তবে গ্রীষ্মের ছুটির কারণে বোধ করি সব কিছু শুনশান ও মন্থর। আমাদের পায়ে চলা পথের পাশে দু'টি মেয়ে প্লাস্টিকের ডেকচেয়ার পেতে সূর্য স্নানে আধশোয়া হয়ে আছে। একটি মেয়ের অর্ধনগ্ন বক্ষ যুগলের উপর রাখা হালকা পেপারব্যাক বই। বইটির সম্পূর্ণ মলাট জুড়ে টকটকে রক্তবর্ণের কাঁকড়ার ছবি স্থির হয়ে আছে। অন্য মেয়েটির বুঝি সূর্যস্নান শেষ হয়ে এল। সে উঠে দাঁড়িয়ে আড়মোড়া ভাঙ্গে। তারপর সাবধানে খাপে ধারাল অস্ত্র পোরার মতো আলতো হাতে সিল্কের মেজেন্টা বর্ণ বন্ধনীতে স্তন যুগল ঢাকে। তার বিকিনি এডজাস্ট করা হয়ে যেতে মেয়েটি ঈষত্ ঝুঁকে জলের দিকে তাকায়। সদ্য ছাটা ঘাসের উপর তার ছায়া ফলবতী পেঁপে গাছের মতো রেখাচিত্র আঁঁকে। আমরা নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে সূর্যস্নানরতাদের পাশ দিয়ে খানিক দ্রুত হেঁটে যাই। জলতরঙ্গে সুরেলা মৃদু আওয়াজ আমাদের কানে সিগ্ধ হয়ে বাজে। একদম জলের পাশে টেবিল পেতে অনেকগুলো জলভরা ওয়াইন গ¬্লাসে কাঠি দিয়ে পাশ্চাত্য কেতায় জলতরঙ্গ বাজিয়ে চলেছে চুলে হলুদ রং মাখা এক শিল্পী যুবক। আমরা বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার বাজনা শুনি। কাজরি এক পর্যায়ে এগিয়ে গিয়ে তার হ্যাটে ফেলে দেয় রাস্তার কুড়িয়ে পাওয়া পোনিটি। এতে আর্টিস্ট মোটেই অপদস্ত বোধ করে না। সে বরং বিষণ্ন চোখ তুলে ম্ল¬ান হেসে কাজরির দিকে ঝুঁকে অভিবাদন জানায়।

লেকের শেষ প্রান্তে ফুটে আছে ল্যাভেন্ডারের গুচ্ছ গুচ্ছ সুরভিত ফুল। আমরা সপরিবারে বেশ কিছু ফুল চয়ন করে হাতের তালুতে ঘষি সুগন্ধি নিংড়ানোর জন্য। ফুল তুলতে গিয়ে নজরে পড়ে ঝোপের আড়ালে শায়িত হেইতির কৃষ্ণকায় এক ঈষত্ নামজাদা কবি। এই পদ্য লিখিয়ের সাথে বছর আষ্টেক আগে আমার খানিক খাতির ছিল। এখন ঠিক বুঝতে পারি না—কবি আমাকে চিনতে পেরেছেন কিনা? মানুষটি কি মটকা মেরে ঘাসে পড়ে আছেন নাকি ঘুমিয়ে পড়েছেন? এ মুহূর্তে আমার সামাজিক কতর্ব্য কী? আমি কি তাকে হেই হেই করে জাগিয়ে 'হাউ ডু ইউ ডু ম্যান বা কেমন আছ' বলে সম্ভাষণ করব। কবির পারিপার্শ্বিক জ্ঞান বা সংবিত কিছু অবশিষ্ট আছে বলে মনে হয় না। তার আশপাশে ছড়ানো গোটা তিনেক জার্নাল ও পত্রিকা। বুকের উপর রাখা হাইপাওয়ারের চশমায় প্রতিসরিত হয় শেষ বিকালের রোদ। কবির শিথানে ব্রাউন ব্যাগে রাখা একাধিক বিয়ারের ক্যান। একটি ক্যানের মুখে মৃদু মৃদু জ্বলছে আধপোড়া সিগার। অতীতের ঈষত্ দোস্তির কথা ভেবে মনে করি পরে যা হয় হবে এ মুহূর্তে প্রয়োজন এ প্রতিভাবানকে জাগানোর। প্রস্তুতি নেই—'ওঠ ওঠ' বলে হাঁক দেওয়ার। ভাবি কানের কাছে গিয়ে বলব—মাল পান করেছ বলে হয়েছি কি? বহুদিন পর লাওস থেকে এসেছি, এবার তোমার সাথে সহবত্ না করে যাই কীভাবে? কিন্তু হলেণ কিছুতেই সুরামগ্ন শায়েরকে ডিসটার্ব করতে দেবে না। খানিকটা ডিসয়েপয়েনটেড্ হয়ে তার সাথে কাজরিকে নিয়ে ভিন্ন দিকে হাঁটি।

তাজ্জবের বিষয়! আমাদের দিকে টাক্ টাক্ খুর ধ্বনি তুলে ছুটে আসছে এক অশ্বারোহী। ঘোড়ার পিঠের সাওয়ারের চোস্ত লেবাস ও কোমর বন্ধের পিস্তল দেখে তাকে মাউন্টেড পুলিশের সদস্য বলে চিনে নিতে অসুবিধা হয় না। পুলিশ দেখেই আমার কলজে শুষ্ক হয়ে ওঠে। মাত্র ঘণ্টা কয়েক হলো আমহার্স্ট শহরে এসেছি, ইতিমধ্যে কী এমন কসুর করে বসলাম যে দিন দুপুরে দারোগা দ্বারা ধাবিত হব! একটু আগে সকলে মিলে ল্যাভেন্ডার ফুল ছিড়ে হাতে কচলিয়েছি, ভাবি—কাজটি কী অবৈধ হয়ে গেল? এখন তো আর উপায় বলে কিছু অবশিষ্ট নেই। দারোগার কাছে যেই জোড়হাতে মাফ চাইব ভাবছি—ততক্ষণাত্ পুলিশ অফিসার ঘোড়া থেকে নেমে গোয়ামুরি হাসি হেসে করমর্দন করার জন্য আমাদের দিকে হাত বাড়ায়। ভাবি হ্যান্ডশেক হয়ে গেলে বুঝি হাতকড়া পরাবে। অফিসার বোধ করি আমরা যে তাকে চিনতে পারছি না তা বুঝতে পেরে হ্যাট খুলে আবার হাসে। হলেণ চিত্কার করে ওঠে, 'জাসটিন! হাউ ওয়ান্ডারফুল! ইউ বিকাম এ্য কাপ্। তুমি পুলিশ হয়েছ জাসটিন!' আমাদের বিস্ময়ের শেষ থাকে না। জাসটিন যখন হলেণের সাথে কথাবার্তা বলছে আমি তখন জ্যামাইকার এ অভিবাসী যুবককে দেখি। দীর্ঘকায় কৃষ্ণবর্ণের মানুষটির শক্তপোক্ত কাঠামোতে এখন এসেছে রীতিমত ম্যাসলম্যানের আদল। মনে পড়ে প্রায় বছর দশেক আগে সে যখন শরণার্থী হয়ে প্রথম এখানে আসে। ত্রাণ কর্মসূচির কল্যাণে হলেণ তাকে জুটিয়ে দেয় রেস্তোরাঁয় ওয়েটারের কাজ। আমি জিজ্ঞেস না করে পারি না, 'জাসটিন, আর ইউ এন আমেরিকান সিটিজেন নাও?' সে আবার গোয়ামুরি হাসি হেসে আমার দিকে তাকিয়ে বলে, 'ও ইয়া।' জাসটিন অশ্বারোহণে লেকের পাড়ে পাড়ে আবার ছুটতে শুরু করলে আমরা নর্থ আমহার্স্টের দিকে রওনা দেই। যেতে যেতে আমরা জাসটিনকে নিয়ে কথা বলি। হলেণ মন্তব্য করে, 'যা হোক একজন শরণার্থী এখানে থিতু হয়ে ঘোড়ায় চড়ে বেড়াচ্ছে তা আর কম কি!'

হাঁটতে হাঁটতে এতক্ষণে ওয়াটরবাস মিনিমার্টের সামনে চলে এসেছি। এক দশক আগে এ দোকান থেকে আমরা নিত্যদিন সওদাপতি করতাম। তাই উত্সাহের সাথে ভেতরে ঢুকে পড়ি। কাউন্টারের উঁচু চেয়ারে মিসেস ওয়াটরবাস আগের মতোই মূর্তি হয়ে বসে আছেন। আমাদের চিনে নিতে তার একটুও কষ্ট হয় না। বছর ছয়েক আগে তিনি শিশু কাজরিকে দেখতে আমাদের বাসা অব্দি এসেছিলেন। এবার দেখা হতেই তার বেড়ে ওঠা নিয়ে মন্তব্য করেন। মনে হয় তার কথায়বার্তায় আগের উত্সাহের ঝাঁজটি আর নেই। এ ক'বছরে মিসেস বৃদ্ধাও হয়েছেন অনেক। তার গোলাপী গাত্রবর্ণ বদলে গিয়ে তাতে পড়েছে ধূসর ছাই রঙের প্রলেপ। গালের মাংশপেশী কুঁচকে চোখ দু'টি হয়েছে কোটরাগত। তিনি বার বার আমাদের দিকে চেয়ে চশমা খুলে তা আস্তিনে মুছে আবার পরছেন। বোধ করি আগের মতো আর দেখতেও পান না। হলেণ মি. ওয়াটরবাসের কথা জিজ্ঞাস করে। মিসেস খানিকক্ষণ নির্বাক থেকে ছাঁদের দিকে তাকান, তারপর চশমা খুলে কাচ মুছতে মুছতে বলেন, 'মাস তিনেক হলো হাসপাতালে আছে, আমি আর বাড়িতে একা সব সামলাতে পারি না। অত্যন্ত নেষ্ঠি এক ধরনের ক্যানসার হয়েছে। কেমো থেরাপিতেও কিছু রেসপন্স করছে না।' হলেণ কোনো কথা খুঁজে না পেয়ে আলটপকা বলে বসে, 'আর কতদিন দোকানদারী করবেন মিসেন ওয়াটরবাস, এবার কাজবাজ ছেড়ে বাড়িতে বসে একটু বিশ্রাম নেন না কেন?' তার মন্তব্য শুনে মিসেস চোখের কোটর দু'টি হঠাত্ জ্বলে ওঠা জোড়া মোমের মতো উজ্জ্বল করে হেসে বলেন, 'বাড়িতে আর কত বসে থাকব, কোমরের জোড়, হাটুর খিল সব আজকাল খুলে খুলে পড়ছে। কিন্তু যতদিন ওপার থেকে ডাক না আসছে, ততদিন কাজ না করে যাওয়া ভিন্ন আর গতি কী?' মিনিমার্ট থেকে খানিক অরেঞ্জ জুস্ আর দু'টি আপেল নিয়ে আমরা বিষণ্ন হয়ে বেরিয়ে আসি। বাইরে আসতেই কাজরি জিজ্ঞেস করে বসে, 'ইজ মিস্টার ওয়াটরবাস গোনা ডাই? হোয়াই হি হ্যাজ এ্য নেষ্ঠি ক্যানসার?' মি. ওয়াটরবাস কী মৃত্যু পথযাত্রী, তার কী কাল ব্যাধি ক্যানসার হয়েছে? এ প্রশ্ন দু'টির উত্তরে আমরা মৌন থাকি।

এবার বাড়ি ফেরার পালা। নর্থ ভিলেজের দিকে রওয়ানা হওয়ার আগে ইচ্ছে হয় একটু কাউলস রোড হয়ে ঘুরে যাই। কাউলস রোডে শত বছরের পুরোনো এক খামারবাড়ির ছোট্ট কুটুরীতে আমি ও হলেণ এক সময় ভাড়া থাকতাম। এদিকে এসে গোলাপী ফুলে ঝেপে আসা বৃহত্ মেগনোলিয়ার গাছ আর তার কোণের মাইকবার নামক পান্থশালা দেখে মনেই হয় না কোনো কিছুর পরিবর্তন হয়েছে। কাউলস রোডে দীর্ঘদিন আমাদের প্রতিবেশী ছিলেন মিস্টার ও মিসেস বেইটস। এখানে এসেই গেছি যখন হলেণ তাদের হ্যালো বলতে চায়। আমরা অবসর প্রাপ্ত পাগলাটে ইঞ্জিনিয়ার মি. বেইটসের দোরগোড়ায় এসে কলিংবেল টিপি। কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যায় না। ভাবি ফিরে যাই কিন্তু হলেণ বলে, 'হয়তো কলিংবেল কাজ করছে না অথবা বেইটসদের শ্রবণ ক্ষমতা কমে গেছে।' সে উল্টোদিকে গিয়ে কিচেনের দরোজায় দাঁড়িয়ে কাচ দিয়ে ভেতরে তাকায়। মি. বেইটস এই তপ্ত সামারের দিনে অনেকগুলো শীতবস্ত্র পরে রান্নাঘরের টেবিলে বসে সংবাদপত্রের দিকে নির্লিপ্ত তাকিয়ে আছেন। হলেণের করাঘাতে বুঝি তিনি জেগে উঠে খানিক কাঁপতে কাঁপতে এসে দোর খুলেন। তার পেছন পেছন খোঁড়াতে খোঁড়াতে এসে দাঁড়ায় বৃদ্ধ ঝুপসি পশমের কুকুরটি। কুকুর অস্থির হয়ে আমাদের সকলকে শুঁকে। মি. বেইটস হতভম্ব হয়ে কিছুক্ষণ আমাদের দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাত্ চিত্কার করে উঠেন, 'হোয়াট অ্যা প্লে¬জার! টুডে ইজ মাই বার্থডে, নাইনটি সেকেন্ড বার্থডে, আই হ্যাভ বীন এলোন ফর অল ডে, রিডিং দ্য সেইম নিউজ পেপার এগেন অ্যান্ড এগেন।' আমরা বৃদ্ধের উল্ল¬াস বুঝতে পারি। বিরান্নব্বইতম জন্মদিনে ঘরে বসে একাকী কেবলই বাসি সংবাদপত্র পড়ে চলেছেন। কোথাও কেউ নেই যে একটু কথা বলবেন। তিনি এবার হলেণের হাত ধরে বলেন, 'তোমরা একটু বাইরে এসে দাঁড়াও। ঘরের আলোয় আমি আজকাল আর তেমন কিছু দেখি না।' বৃদ্ধ বেইটস্ টুকটুক করে কাঁপতে কাঁপতে লাঠি ভর দিয়ে বাইরের আঙ্গিনায় এসে দাঁড়ান। তারপর আলোর দিকে পর পর হলেণ, আমি ও কাজরির থুতনি তুলে ধরে চেয়ে দেখেন। বুড়ো বেইটসের কুকুর পা ঘষটাতে ঘষটাতে আমাদের শুঁকে বেড়ায়। কাজরি জানতে চায়, 'হোয়াট হেপেনড্ টু দিস ডগি?' মি. বেইটস জবাব দেন, 'ওর পায়ে অর্থারাইটিস বা বাত, সে আর আগের মতো ছুটতে পারে না, তবে এখনও তার ঘ্রাণ নেওয়ার ক্ষমতা ভালোই আছে।' মি. বেইটস কেবলই কথা বলে যান। তিনি বোধ করি বহুদিন পর কথা বলার মানুষ পেয়েছেন—তাই সহজে ছাড়তে চান না। হঠাত্ করে বলে বসেন, 'মিসেস থাকলে হয়তো তোমাদের ডিনারে নেমনতন্ন করে বসত। আমি তো আর রাঁধতে-টাধতে পারি না। কিন্তু মেয়েকে নিয়ে আমার জন্মদিনে এসেছ। আমি তাকে চমত্কার একটি ট্রিট দেব।' তার মন্তব্য শুনে কাজরি বলে ওঠে,'ওয়াও, আই এ্যাম গোনা গেট এ ট্রিট্।' মি. বেইটস কাঁপা হাতে জ্যাকেটের পকেট থেকে বের করেন রিমোট কন্ট্রোল। বোতাম টিপতেই ক্যাচম্যাচ করে খুলে যায় গ্যারাজের জং ধরা দরোজা। তার ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে দুই বগির ছোট্ট একটি মিনিয়েচার ট্রেইন। কাজরি এক্সাইটেড হয়ে খেলনা রেলগাড়ির দিকে ছুটে যায়। মি. বেইটস লাঠি ঠুকঠুক করে ট্রেনের কাছে এসে আমাদের সকলকে তাতে চড়তে বলেন। তারপর কাজরির দিকে চেয়ে যেন কিছু ঘোষণা দিচ্ছেন এমন ভঙ্গিতে বলেন, '১৯৫১ সালে আমাদের ছেলেমেয়ে দু'টির জন্য আমি নিজ হাতে ট্রেনটি তৈরি করি। পরে তাদের ঘরে আমাদের নাতি-নাতনি হলে সিস্টেম চেঞ্জ করে তা রিমোট কন্ট্রোল করিয়ে নেই। অনেক দিন তাদের কেউ এখানে আসে না তাই রেলগড়িটির ব্যবহারও হয় না।' মি. বেইটস অবশেষে রিমোটের বোতাম টেপেন। রেলগাড়িটি আমাদের নিয়ে অতি ধীর গতিতে প্রায় পাঁচ বা সাত একরের বৃহত্ আঙ্গিনায় পাতা রেলের উপর দিয়ে ঘটাং ঘটাং করে চলে। বাতে পঙ্গু প্রায় কুকুরটি ঘেউ ঘেউ করে খোঁড়াতে খোঁড়াতে রেলগাড়ির সাথে ছুটে। আঙ্গিনার অদূরে ঢালু উপত্যকা, তারপরে দিগন্তের দিকে চলে যাওয়া এক সারি সবুজ পাহাড়ের সূর্যজ্বলা রেখা। মি. বেইটস দাঁড়িয়ে থেকে আমাদের দিকে ক্রমাগত হাত নাড়েন।

রেলগাড়ি চড়া শেষ হলে পর আমরা মি. বেইটসের কাছ থেকে বিদায় নিতে গিয়ে চমত্কার বিকালের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করি, 'ক্যান উই ডু এনিথিং ফর ইউ মি. বেইটস?' মি. বেইটস একটু ভেবে বলেন, 'আগামী রবিবারে, চার্চের আগে তোমরা যদি একটু আসো তাহলে আমি তোমাদের একজনের হাত ধরে চার্চে যেতে পারি। এখন আর একা যেতে সাহস পাই না। তোমরা তো জানো আমি গত একত্রিশ বছর প্রতি রবিবারে চার্চে ঘণ্টা বাজিয়েছি। আজ প্রায় বছর তিনেক হলো আর ঘণ্টা বাজাতে যেতে পারি না। তোমরা যদি একজন আমাকে চার্চে নিয়ে যাও আমি বেলটা আবার বাজাতে পারি। তোমাদের অন্যজন না হয় ততক্ষণ ছোট্ট মেয়েটিকে ট্রেন চড়াবে।' আমরা সকলে মাথা ঝাঁকিয়ে মি. বেইটসকে অভিবাধন করে তার অনুরোধে তত্ক্ষণাত্ রাজি হই।

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
নির্বাচনে বিচারিক ক্ষমতা দিয়ে সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি জানিয়েছে বিএনপি। আপনি এটা সমর্থন করেন?
5 + 9 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
সেপ্টেম্বর - ১৯
ফজর৪:৩০
যোহর১১:৫৩
আসর৪:১৭
মাগরিব৬:০২
এশা৭:১৫
সূর্যোদয় - ৫:৪৬সূর্যাস্ত - ০৫:৫৭
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :