The Daily Ittefaq
ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৬ মার্চ ২০১৩, ১২ চৈত্র ১৪১৯, ১৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ টাইগারদের টার্গেট ৩০৩ : প্রথম বাংলাদেশি বোলার হিসেবে আব্দুর রাজ্জাকের ২০০ উইকেট | আপিল করেছেন সাঈদী | আপিল করবেন না সঞ্জয় | মুন্সীগঞ্জে ১৪৫ মণ জাটকা আটক | সাতক্ষীরায় পুলিশের ওপর শিবিরকর্মীদের সশস্ত্র হামলা, গুলিবিদ্ধ ৪

প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ

আশিস সৈকত

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম বাঙালির অস্ত্র গর্জে উঠেছিল ১৯৭১ সালের ১৯ মার্চ। ওই দিন গাজীপুরে জনতা সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। এখানেই প্রথম গর্জে উঠেছিল বাঙালির অস্ত্র। সে সময় জয়দেবপুরের ঐতিহাসিক ভাওয়াল রাজবাড়িতে (বর্তমান জেলা প্রশাসকের কার্যালয়) অবস্থান ছিল দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের। এ রেজিমেন্টের ২৫-৩০ জন জওয়ান অফিসার ছাড়া সকলেই ছিলেন বাঙালি। এঁদের সকলেই ছিলেন মনেপ্রাণে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে। তখন এ রেজিমেন্টের অধিনায়ক (সিও) ছিলেন লে. কর্নেল মাসুদ হাসান খান এবং সহ-অধিনায়ক ছিলেন মেজর কে এম শফিউল্লাহ। বাঙালি সংখ্যাগরিষ্ঠ এ ক্যান্টনমেন্টে অবস্থানরত বাঙালি কর্মকর্তাদের স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেনি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। আর তাই বাঙালি কর্মকর্তাদের দমিয়ে রাখার জন্য তাঁদের নিরস্ত্র করার ষড়যন্ত্র করা হয়। আর এ ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই ঢাকার ব্রিগেড সদর দপ্তর থেকে নির্দেশ আসে ১৫ মার্চের মধ্যে ৩০৩ ক্যলিবার রাইফেল ও গোলাবারুদ সদর দপ্তরে জমা দেবার জন্য। কিন্তু সেনানিবাসের বাঙালি কর্মকর্তারা অস্ত্র জমা দিতে রাজি নন। কারণ ইতিমধ্যেই তাঁরা স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দেবার জন্য সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। এ জন্য স্থানীয় আওয়ামীলীগ এবং সংগ্রাম পরিষদের নেতাদের সঙ্গে তাঁরা সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখে চলছেন। সদর দপ্তরে অস্ত্র জমা না দেবার কৌশল হিসেবে অস্ত্র নিয়ে গাজীপুর থেকে ঢাকা যাওয়া নিরাপদ নয় বলে জনিয়ে দেন রেজিমেন্টের অধিনায়ক। কিন্তু সে অজুহাতে সন্তুষ্ট হলো না পাকিস্তান সামরিক জান্তা। এবার নির্দেশ এলো বিগ্রেড কমান্ডার পাঞ্জাবি ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব নিজেই ১৯ মার্চ এক কোম্পানি সেনাসহ জয়দেবপুর ক্যান্টনমেন্টে আসবেন। অস্ত্র জমা নিতেই বিগ্রেডিয়ার জাহানজেবের এ কৌশল, তা বুঝতে বাকি রইল না কারও। আশংকা দানা বেঁধে উঠল গোটা ক্যান্টনমেন্টজুড়ে। রেজিমেন্টের কয়েকজন কর্মকর্তা বিষয়টি স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের জানিয়ে দেন।

এরপর এল সেই ১৯ মার্চ। ব্রিগেডিয়ার জাহানজেবের নেতৃত্বে ১৮ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের এক কোম্পানি সেনাসহ জয়দেবপুর সেনানিবাসে এসে উপস্থিত হন। সেনানিবাস এলাকায় তাঁর উপস্থিতির পর দাবানলের মতো গোটা জয়দেবপুরে খবর ছড়িয়ে পড়ে যে, বাঙালি সেনাদের নিরস্ত্র করতে ঢাকা থেকে পাঞ্জাবি সেনা এসেছে। সারা শহর থেকে হাজার হাজার উত্তেজিত জনতা এসে ভিড় জমাতে থাকে জয়দেবপুর বাজারে। সমরাস্ত্র কারখনা এবং বাংলাদেশ মেশিনটুলস ফ্যাক্টরির শত শত শ্রমিক কর্মচারীও এসে যোগ দেয় উত্তেজিত জনতার সঙ্গে। সকলের হাতে লাঠি, তীর, বল্লমসহ নানা ধরনের দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে জনতা ক্রমশ জঙ্গিরূপ ধারণ করল। রাস্তার বিভিন্ন স্থানে ইট ,কাঠ, পাথর দিয়ে ব্যারিকেড রচনা করা হলো। রেলস্টেশন থেকে একটি মালগাড়ির ওয়াগন ঠেলে এনে রেলক্রসিংয়ে রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হলো।

এদিকে বিগ্রেডিয়ার জাহানজেব ঢাকায় ফিরে যাবার রাস্তা অবরোধের খবর পেয়ে এবং সেনানিবাসে বাঙালি কর্মকর্তা ও সেনাদের সতর্ক অবস্থা দেখে তাঁদের নিরস্ত্র করার পরিকল্পনা বাদ দেন। কিন্তু ঢাকায় ফেরার মুখে জয়দেবপুর রেলস্টেশনের কাছে তিনি বাঁধার মুখে পড়েন। বিকেল তিনটার দিকে তিনি ব্যারিকেড তুলে ফেলার জন্য দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রধান লে. কর্নেল মাসুদকে নির্দেশ দেন। তাঁর নির্দেশে মেজর মইনুল ব্যারিকেড তুলে ফেলতে স্থানীয় জনগণকে অনুরোধ জানালেও এতে কেউ সায় দেয়নি। ব্যর্থ হয়ে মেজর মইনুল ফিরে আসার ঘটনায় খুবই ক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠেন বিগ্রেডিয়ার জাহানজেব। তিনি এ সময় ব্যারিকেড অপসারণ করতে না পারলে নিজেই অ্যাকশনে যাবেন বলে হুমকি দেন। এরপর বিগ্রেডিয়ার জাহানজেব জনতাকে লক্ষ্য করে গুলি করে রাস্তা ফাঁকা করার নির্দেশ দেন। বাধ্য হয়ে বাঙালি সেনারা আকাশের দিক লক্ষ্য করে ফাঁকা গুলিবর্ষণ করেন। আর এদিকে গুলির শব্দ শুনে উত্তেজিত জনতা সেনাবাহিনীকে লক্ষ্য করে বৃষ্টির মতো ইট-পাথর নিক্ষেপ শুরু করে। এমনকি উত্তেজিত বাঙালিদের মধ্যে কাজী আজিমউদ্দিন আহমেদসহ আরও দুজন তাঁদের লাইসেন্স করা বন্দুক থেকে পাল্টা গুলিবর্ষণ শুরু করেন। ফাঁকা গুলিবর্ষণেও জনতা স্তব্ধ না হওয়ায় জাহানজেব আরও ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠেন।

দু-পক্ষের এই উত্তেজনার এ সময় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি ট্রাক টাঙ্গাইলে রেশন দিয়ে জয়দেবপুরে ফিরছিল। এতে হাবিলদার সিদ্দিকুর রহমানের নেতৃত্বে পাঁচজন বাঙালি সেনা ছিলেন। তাঁদের কাছে ছিল চারটি চাইনিজ রাইফেল ও একটি এসএমজি। ট্রাকটি জয়দেবপুর মসজিদের কাছে পৌঁছালে জনতা ট্রাকটি আটকে ফেলে। বাঙালি সেনাদের থেকে অস্ত্র নিয়ে পাঞ্জাবিদের লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ শুরু করে। ট্রাকের বাঙালি সেনারাও জনতার সঙ্গে যোগ দেন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে এটাই ছিল বাঙালিদের প্রথম গুলিবর্ষণের ঘটনা।

জয়দেবপুরের প্রতিরোধ সামাল দিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কোনোমতে ঢাকার পথে রওনা হয়। ইতিমধ্যে জয়দেবপুরে এ সংঘর্ষের খবর পেয়ে ওখান থেকে তিন কিলোমিটার দূরে চান্দনা চৌরাস্তায় স্থানীয় জনগণ জড়ো হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। আশেপাশের এলাকা কড্ডা, নাওজোর, চান্দনা, ইটাহাঁটা, সালনাসহ আশপাশের গ্রাম থেকে হাজার হাজার মানুষ লাঠিসোঁটাসহ যার হাতে যা ছিল, তা নিয়ে রাস্তায় নামে। এ প্রতিরোধ দেখে ভড়কে যায় পাকিস্তানি সেনারা।

স্থানীয় যুবক হুরমত হাতের লাঠি দিয়ে একজন পাকিস্তানি সেনাকে আঘাত করে তার হাতের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে পাল্টা গুলিবর্ষণের চেষ্টা করে। কিন্তু এ সময় পেছন থেকে আরেক পাকিস্তানি সেনার গুলিতে প্রাণ হারান প্রত্যয়ী যুবক হুরমত। এ সময় আরেক সেনার বন্দুক কেড়ে নিতে গিয়ে গুরুতর আহত হন কড্ডার কানু মিয়া। ঘটনাস্থলে তিনি কোনোমতে বেঁচে গেলেও ওই গুলির ক্ষতের কারণেই কয়েক বছর পর মারা যান তিনি। পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে এ বীরত্বপূর্ণ আবদানের জন্য এলাকার মানুষ তাঁকে বীর কানু নামে ডাকে। এর আগে জয়দেবপুরে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হন নিয়ামত ও মনুখলিফা। আহত হন ইউসুফ, সন্তোষসহ আরও অনেকে। এরপর কারফিউ জারি করে অনেক কষ্টে ব্রিগ্রেডিয়ার জাহানজেবের নেতৃত্বে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সদস্যরা কোনোমতে ঢাকায় ফিরে যান।

জয়দেবপুরের সশস্ত্র এ প্রতিরোধের খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। উদ্দীপ্ত করে তোলে সারা দেশের মুক্তিযোদ্ধাদের। ওই দিন বিবিসিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রচারমাধ্যমে তা গুরুত্ব সহকারে প্রচারিত হয়। ইয়াহিয়ার সঙ্গে আলোচনার সময়ও বিষয়টি তুলে ধরেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে প্রথম প্রতিরোধ করার এ ঘটনা মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রণিত করার ক্ষেত্রে বিরাট অবদান রেখেছিল, যা পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতাযুদ্ধে বিরাট অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। আর সে কারণেই ঢাকাসহ সারা দেশে সেদিন স্লোগান উঠেছিল, 'জয়দেবপুরের পথ ধরো বাংলাদেশ স্বাধীন করো।'

প্রথম সশস্ত্র যুদ্ধের সেই স্মৃতিকে ধরে রাখতে যুদ্ধের পরপরই জয়দেবপুর চৌরাস্তায় জাগ্রত চৌরঙ্গী স্থাপন করা হয়। এ স্মৃতিস্তম্ভ এ এলাকার মানুষের কাছে গৌরব আর সম্মানের প্রতিকৃতি। প্রতিবছর স্থানীয়ভাবে দিবসটি পালিত হলেও স্বাধীনতার ৪২ বছর পরও প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধের দিনটি রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি পায়নি।

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
দেশে যৌথ উদ্যোগে তরুণ এসএমই উদ্যোক্তা তৈরির ভারতীয় প্রস্তাব সরকার গ্রহণ করবে বলে মনে করেন?
9 + 8 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
নভেম্বর - ১৮
ফজর৪:৫৬
যোহর১১:৪৪
আসর৩:৩৭
মাগরিব৫:১৫
এশা৬:৩১
সূর্যোদয় - ৬:১৫সূর্যাস্ত - ০৫:১০
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :