The Daily Ittefaq
ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৬ মার্চ ২০১৩, ১২ চৈত্র ১৪১৯, ১৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ টাইগারদের টার্গেট ৩০৩ : প্রথম বাংলাদেশি বোলার হিসেবে আব্দুর রাজ্জাকের ২০০ উইকেট | আপিল করেছেন সাঈদী | আপিল করবেন না সঞ্জয় | মুন্সীগঞ্জে ১৪৫ মণ জাটকা আটক | সাতক্ষীরায় পুলিশের ওপর শিবিরকর্মীদের সশস্ত্র হামলা, গুলিবিদ্ধ ৪

প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ

২৬ মার্চ রাতে ঢাকায় গণহত্যা

মুসা সাদিক

১৯৮৮ সালের ডিসেম্বর মাসে ইসলামাবাদে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন উপলক্ষে আমি জেনারেল টিক্কার এক সাক্ষাত্কার গ্রহণ করি পাঞ্জাবে তাঁর সরকারি 'গভর্নর হাউস'য়ের দোতলায়। আমার সঙ্গে ছিলেন বিটিভির আইন আদালত-খ্যাত অ্যাডভোকেট রেজাউর রহমান।

সাক্ষাত্কারে জেনারেল টিক্কা খানের কাছে আমার একটি প্রশ্ন ছিল, 'When did you exactly start the genocide in Dhaka, Sir?'

জেনারেল টিক্কা নির্বিকারভাবে বলতে থাকেন, 'আমি কোনো গণহত্যা করাইনি। আমাদের টহলদার বাহিনীর ওপর গোলাবারুদ নিয়ে হামলা করার জন্য জগন্নাথ হলে কিছু অবাঞ্ছিত লোক প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এরপর আমি জগন্নাথ হলে কিছু সেনা পাঠাই। এটা সত্য যে তাতে কিছু হিন্দু লোক মারা যায়। এরপর কিছু কিছু সংঘর্ষ হয়। তাতে আমাদেরও কিছু লোক মারা গেছে এবং মুক্তিবাহিনীর লোকও মরেছে। সেখানে দু-পক্ষের মধ্যে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়, তা-তো গণহত্যা নয়।'

গণহত্যাকারী টিক্কার উত্তরে আমি ও রেজাউর রহমান যুগপত্ বিস্ময়ে পরসপরের দিকে তাকাই। পাকিস্তানি আর্মি বাংলাদেশে লক্ষ লক্ষ লোক হত্যা করেছে, যার শুরু জেনারেল টিক্কা করে গেছেন, তা কে না জানে? এ নিয়ে পাকিস্তানে কমিশন গঠিত হয়েছে এবং '৭১-এ বাংলাদেশে জেনোসাইড ও রেপ করার সুনির্দিষ্ট কারণে উক্ত কমিশন পাকিস্তান আর্মির অনেককে কোর্ট মার্শাল করার জন্য সুপারিশ করে। যদিও তা কার্যকর হয়নি।

টিক্কা খানের জ্বলজ্যান্ত মিথ্যা ভাষণে আমার মনে পড়ল শ্রদ্ধেয় হাসান হাফিজুর রহমানের কথা। ১৯৭৭ সালের আগস্টের শেষের দিকে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের তদানীন্তন তথ্য উপদেষ্টা জনাব আকবর কবিরের একান্ত সচিব যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা খান আমির আলীর কক্ষে শ্রদ্ধেয় হাসান হাফিজুর রহমান সাহেবের সাথে আমার দেখা। সচিবালয়ের দ্বিতীয় নয় তলা ভবনের দোতলায় তখন বসতেন খান আমির আলী। খান আমির আলীর সামনে তিনি আমাকে বললেন, 'মুক্তিযুদ্ধের ওপর তুমি অনেক মর্মস্পর্শী লেখা লেখো। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্রের কাজ করতে গিয়ে ঢাকা পৌরসভার ডোমদের কাছ থেকে পাকিস্তানি সেনাদের ভয়াবহ গণহত্যার যে বিবরণ আমি পাচ্ছি, তাতে আমার লোম শিউরে উঠছে। তুমি ঢাকা পৌরসভার ডোমদের সাক্ষাত্কার নিয়ে রাখো। দেশবাসী ও বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিয়ো, পাকিস্তানি সেনারা মানুষরূপী নরপশু ছিল। হিটলারের চেয়েও বড় যুদ্ধাপরাধী ছিল।'

তাঁর কথায় খান আমীর আলী সাহেবও বললেন, 'টিক্কা খান আইখম্যানের চেয়েও বড় গণহত্যাকারী। সে যেসব গণহত্যা করেছে, পৃথিবীর এ যাবত্কালের সকল গণহত্যা ছাড়িয়ে গেছে।' তাদের দুজনের কথায় অনুপ্রাণিত হয়ে পরদিনই আমি ঢাকা পৌরসভার উদ্দেশে যাত্রা করি। সচিবালয় থেকে পুলের জিপ নিয়ে ঢাকা পৌরসভার অফিসে পরপর কয়েক দিন গেলাম। সুইপার ইনস্পেক্টর সাহেব আলী, সুইপার পরদেশি, চুন্নু ডোম, লাল বাহাদুর ডোম, বদলু ডোম, ছোটন ডোম, ভাণু ডোম—এঁদের সাক্ষাত্কার লিপিবদ্ধ করলাম।

ঢাকা পৌরসভার সুইপার ইনস্পেক্টর সাহেব আলীর ওপর ঢাকার রাজপথ ও অলিগলি থেকে মৃতদেহ সরানোর প্রথম হুকুম আসে জল্লাদ টিক্কা বাহিনীর নিকট থেকে। তিনি কয়েকজন ডোম ও ঠেলাগাড়ি নিয়ে ঢাকার রাজপথ থেকে শত শত লাশ ২৬ ও ২৭ মার্চ ও পরবর্তী দিনগুলোতে সরাবার দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বলেন, 'এত লাশ এক সাথে এ জীবনে দেখিনি। পৌরসভার ডোমরা সেদিন রাস্তায় লাশের পাহাড় দেখে ভড়কে গিয়েছিল।'

সুইপার ইনস্পেক্টর সাহেব আলী ঢাকার ২৬-২৭ মার্চের গণহত্যার এক নীরব প্রত্যক্ষ সাক্ষী।

২৬ মার্চ ঢাকায় জল্লাদ টিক্কা খানের গণহত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়ে সাহেব আলী বললেন, '২৬ মার্চ সুইপার কলোনির দোতলা থেকে নেমে বাবুবাজার ফাঁড়িতে গিয়ে দেখলাম ফাঁড়ির প্রবেশপথে, ভেতরে, চেয়ারে বসে, উপুড় হয়ে পড়ে আছে দশজন পুলিশ। ইউনিফর্ম পরা পুলিশদের সারা শরীর গুলির আঘাতে ঝাঁঝরা। রক্তাক্ত হয়ে পড়ে আছে। আমি বাবুবাজার ফাঁড়ির ভেতরে ঢুকে দেখলাম ফাঁড়ির চারদিকের দেয়াল হাজার হাজার গুলির আঘাতে ফোকর হয়ে গেছে। দেয়ালের চারদিকে মেঝেতে চাপ চাপ রক্ত, তাজা রক্ত জমাট হয়ে আছে। সেখানে দেখলাম বাঙালি পুলিশ কেউ জিভ বের করে পড়ে আছে। কেউ হাত-পা টানা দিয়ে আছে। প্রতিটি লাশের শরীরে অসংখ্য গুলির চিহ্ন। এ রকম শত শত বীভত্স দৃশ্য দেখে একটি ঠেলাগাড়িতে করে আমি ও আমার সাথের ডোমরা মিলে সকল লাশ ঢাকা মিটফোর্ড হাসপাতালে লাশঘরে রেখে আসি। সেখান থেকে ঠেলাগাড়ি নিয়ে শাঁখারী বাজারে প্রবেশ করে একেবারে পূর্বদিকে ঢাকা জজকোর্টের কোণে হোটেল-সংলগ্ন রাস্তায় এসে দশ-বারোজন অসহায় ফকির মিসকিন ও রিকশা মেরামতকারী মিস্ত্রির উলঙ্গ ও অর্ধ-উলঙ্গ লাশ দেখে আঁতকে উঠলাম। সেগুলো সব মুসলমানের লাশ ছিল। রাস্তায় পড়ে থাকা গুলিতে ক্ষতবিক্ষত লাশগুলি ঠেলাগাড়িতে তুলে আমরা মিটফোর্ড নিয়ে গেলাম। মুসলমানের লাশ আমরা স্থানীয় লোকজনের সাহায্যে তুলে মিটফোর্ডে জমা করেছি। রাজধানী ঢাকার সর্বত্র কার্ফ্যু থাকা সত্ত্বেও গণহত্যার সেই বীভত্স দৃশ্য দেখার জন্য ছাত্র-জনতা রাস্তায় রাস্তায় বের হয়ে এলে পাকিস্তানি সেনারা ঘোষণা দেয় যে, ঢাকায় কারফিউ বলবত্ রয়েছে। কেউ রাস্তায় বের হলে দেখামাত্র গুলি করা হবে। পাকিস্তানি সেনাদের এ ঘোষণার পর আমরা সরে পড়লাম।'

২৬ মার্চ দিনশেষে তাঁরা ঢাকার যেসব স্থানে যে ডিউটি করেন, তার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, '২৬ মার্চ দিনশেষে বেলা পাঁচটার দিকে তাঁতীবাজার, শাঁখারীবাজার এবং কোর্ট হাউস স্ট্রিট এলাকায় পাকিস্তানি সেনারা আগুন ধরিয়ে দেয়। সাথে সাথে চলতে থাকে বৃষ্টির মতো অবিরাম গুলিবর্ষণ। সারারাত পাকিস্তানি সেনারা তাঁতীবাজার, শাঁখারীবাজার ও গোয়ালনগর এলাকায় অবিরাম গুলিবর্ষণ করতে থাকে। ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ বেলা একটার সময় পাকিস্তানি সেনারা নওয়াবপুর থেকে ইংলিশ রোডের বাণিজ্য এলাকার রাস্তার দু-দিকে সকল দোকানঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। যাদের ঘর থেকে বের হতে দেখেছে, তাদের পাখির মতো গুলি করে মেরেছে। বেলা তিনটা পর্যন্ত ইংলিশ রোডের রাস্তার দু-দিকে আগুন জ্বলতে থাকে। আগুনের সেই লেলিহান শিখায় পার্শ্ববর্তী এলাকার জনতা আশ্রয়ের জন্য পালাতে থাকে। পালাতে গিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের গুলির আঘাতে প্রাণ হারাতে থাকে। বেলা তিনটায় পাকিস্তানি সেনারা তাঁতীবাজারের বাইরের দিকের পথ ও মালিবাগ পুলের পশ্চিম দিকে মন্দিরের ওপর শেলিং করে মন্দিরটি ধ্বংস করে দেয়। ইংলিশ রোডের আগুন সুইপার কলোনির দিকে ধেয়ে আসতে থাকলে সকল সুইপার মিলে কলোনির পানি রিজার্ভ করে রাখে। পাকিস্তানি সেনাদের ডিঙিয়ে সকল সুইপার মিলে সুইপার কলোনিটি রক্ষা করার জন্য এগিয়ে এলে পাকিস্তানি সেনাদের গুলির মুখে পড়ে তারা। ফলে ২৬ মার্চ লাশ তোলা সব বন্ধ হয়ে যায়।'

এ ঘটনার দু-দিন পরে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে লাশ তোলার বিবরণ দিয়ে তিনি বলেন, '২৮ মার্চ সকালে ঢাকা রেডিওতে সকল সরকারি ও বেসরকারি কর্মচারীকে অবিলম্বে কাজে যোগদানের নির্দেশ প্রচার করে। পরদিন আমি সকাল দশটার সময় ঢাকা পৌরসভায় ডিউটিতে গেলে ঢাকা পৌরসভার তত্কালীন কনসারভেন্সি অফিসার মি. ইদ্রিস আমাকে অন্য ডোমদের নিয়ে অবিলম্বে ঢাকার বিভিন্ন রাস্তায় পড়ে থাকা লাশ তুলে ফেলতে বলেন। তিনি অত্যন্ত রূঢ়ভাবে বলতে থাকেন "সাহেব আলী বের হয়ে পড়ো। যদি বাঁচতে চাও, তবে এক্ষুণি ঢাকার রাজপথ ও বিভিন্ন এলাকা থেকে লাশ তোলার জন্য বের হয়ে পড়ো। কেউ বাঁচবে না, কাউকে বাঁচিয়ে রাখা হবে না। সবাইকে পাকিস্তানি সেনারা গুলি করে মারবে। সবাইকে কুকুরের মতো খুন করবে।"'

পৌরসভার তত্কালীন চেয়ারম্যান মেজর সালামত আলী খান শুরের দুর্ব্যবহার প্রসঙ্গে বলেন, 'চেয়ারম্যান শুর হঠাত্ উত্তেজিত হয়ে আমাদেরকে গালিগালাজ করতে থাকেন। সেখানে আমি, সুইপার ইনস্পেক্টর আলাউদ্দিন, সুইপার সুপারভাইজার পাঞ্চাম, সুইপার ইনস্পেক্টর কালীচরণ, সুইপার ইনস্পেক্টর আওলাদ হোসেনসহ আরও কয়েকজন উপস্থিত ছিলাম। আমাকে মন্টু ডোম, পরদেশি সুইপার, লেমু ডোম, দুঘিলা ডোম, গোলাম চান ডোম ও মধু ডোমকে নিয়ে ঢাকা মিটফোর্ড হাসপাতাল থেকে লাশ তুলে স্বামীবাগ আউটফলে ফেলতে বলেন ইদ্রিস সাহেব।'

আমি বললাম, 'ইদ্রিস সাহেব তাহলে ২৬ মার্চের গণহত্যার একজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হতে পারেন কি না?' সুইপার ইনস্পেক্টর সাহেব আলী হ্যাঁ-সূচক উত্তর দিয়ে বললেন, '১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ আমার ডোম দল নিয়ে আমি ঢাকা মিটফোর্ড হাসপাতালের লাশঘর থেকে দু-ট্রাক লাশ তুলেছি। আমি আমার ডোমদের দলের সাথে সকল লাশ তুলেছি এবং আমি স্বচক্ষে এসব লাশ দেখেছি। লাশের অধিকাংশই ছিল সরকারি কর্মচারী, আনসার, পুলিশ ও পাওয়ারম্যানদের খাকি পোশাক পরা বিকৃত লাশ।'

একটু পরে তিনি ৩০ মার্চ কী করলেন, তার বর্ণনা দিয়ে বললেন, '১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল থেকে ভারপ্রাপ্ত পাকিস্তানি সেনাদের এক মেজর পৌরসভায় টেলিফোন করলেন। টেলিফোনে তিনি বললেন, 'রোকেয়া হলের চারিদিকে মানুষের লাশের পচা গন্ধে সেখানে বসা যাচ্ছে না। এক্ষুনি ডোম পাঠিয়ে যেন সব লাশ তুলে ফেলা হয় এবং এ জন্য তিন ঘণ্টা সময় বেঁধে দেওয়া হয়। আমি ছ-জন ডোম নিয়ে রোকেয়া হলে প্রবেশ করে রোকেয়া হলের সমস্ত কক্ষ তন্নতন্ন করে খুঁজে কোনো লাশ পেলাম না। অতঃপর চারতলা ছাদের ওপর গিয়ে আঠারো-উনিশ বছরের এক ছাত্রীর উলঙ্গ লাশ দেখলাম। আমি একটি চাদর দিয়ে লাশটি ঢেকে দিয়ে ডোমদের দিয়ে নামিয়ে নিয়ে আসি। সেখান থেকে গেলাম রোকেয়া হলের সার্ভেন্ট কোয়ার্টারের ভেতরে। সেখানে গিয়ে পাঁচজন মালীর স্ত্রী-পরিজনদের পাঁচটি লাশ এবং আটটি পুরুষের লাশ (মালী) পেলাম। লাশ দেখে মনে হলো মৃত্যুর পূর্বক্ষণে সবাই ঘুমিয়ে ছিল। সে সব লাশ তোলার পর খবর পেয়ে আমি ট্রাক নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিববাড়ির তেতলা থেকে জনৈক অধ্যাপক, তাঁর স্ত্রী ও দুই ছেলের লাশ তুললাম। স্থানীয় লোকজনের মুখে জানতে পারলাম, তাঁর দুই মেয়ে বুলেটবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে আছে। এসব লাশ ট্রাকে করে নিয়ে নির্দেশমতো স্বামীবাগ আউটফলে ফেলে দিলাম। অতঃপর নির্দেশমতো আমরা ট্রাক নিয়ে বুড়িগঙ্গা নদীতে ভাসমান হাত-পা, চোখ বাঁধা অসংখ্য যুবকের লাশ সারা দিন ধরে তুললাম। আমরা ৩০ মার্চ ঢাকা বুড়িগঙ্গা নদী থেকে তিন ট্রাক লাশ তুলে স্বামীবাগ আউটফলে ফেললাম। পাকিস্তানি সেনারা কুলি ও শ্রমিক দিয়ে পূর্বেই সেখানে বিরাট বিরাট গর্ত করে রেখেছিল। পরের দিন অর্থাত্ ৩১ মার্চ আমরা মোহাম্মদপুর এলাকার জয়েন্ট কলোনির নিকট থেকে সাতটি পচা ফোলা লাশ তুললাম। ইকবাল হলে আমরা কোনো লাশ পাইনি। পাকিস্তানি সেনারা পূর্বেই ইকবাল হলের হিন্দু-মুসলমান ছাত্রদের লাশ পেট্রোল দিয়ে জ্বালিয়ে ভস্ম করে দেয়। বস্তি এলাকা থেকে জগন্নাথ হলে আশ্রয়ের জন্য ছুটে আসা দশ-বারো জন নর-নারীর ক্ষত-বিক্ষত লাশ এদিন তুললাম। ফেরার পথে আমরা ঢাকা হলের ভেতর দিয়ে আসি। সেখানে তরতাজা চারজন ছাত্রের লাশ তুলেছি।'

টিক্কার গণহত্যার চতুর্থ দিনের বিবরণ দিয়ে তিনি বললেন, '১৯৭১ সালের ১ এপ্রিল আমরা ড্রাম ফ্যাক্টরি, কচুক্ষেত, ইন্দিরা রোড, তেজগাঁও, শেরেবাংলা এলাকাস্থ ঢাকা বিমানবন্দরের অভ্যন্তর, ঢাকা স্টেডিয়ামের মসজিদের পূর্ব-দক্ষিণ দিক থেকে কয়েকশ ছাত্রের পচা লাশ তুলেছি। এটা ছিল ক্যান্টনমেন্টের কাছাকাছি এলাকা। শুনেছি, তারা মিছিল করে এসে ঝাঁকে ঝাঁকে মারা পড়ে পাকিস্তানি হানাদারদের কামানের গোলায়। এরপর থেকে প্রতিদিন আমরা বুড়িগঙ্গা নদীর পাড় থেকে হাত-পা ও চোখ বাঁধা অসংখ্য যুবকের লাশ তুলেছি। গড়ে প্রতিদিন ১৫০টি লাশ তুলেছি আমরা। রায়েরবাজার ইটখোলায় আমরা কয়েক হাজার বাঙালি যুবক-যুবতী, শিশু-কিশোর এবং বৃদ্ধ-বৃদ্ধার লাশ তুলেছি। অধিকাংশ লাশ ক্ষত-বিক্ষত। পাকিস্তানি সেনারা তাদের ট্রাকে করে ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে লাশ তুলে এনে এখানে জড়ো করে। সেখানে মনে হলো মানুষ না, হাজার হাজার মরা ব্যাঙের লাশ তুলেছি। সেদিন আমার ডোমদের বুক কেঁপে গিয়েছিল। তারা বাংলা মদ গিলে কাজ করে। না হলে পারত না কাজ করতে। মিরপুর এক নম্বর সেকশনের রাস্তার পার্শ্বে ছড়ানো-ছিটানো শত শত বাঙালি যুবকের লাশ তুলেছি। পাকিস্তানি সেনাদের সহায়তায় বিহারীরা এদের এখানে এনে কচু কাটা করেছে দেখা যায়। মোহাম্মদপুর ফিজিক্যাল কলেজের হল থেকে দশজন ছাত্রের ক্ষত-বিক্ষত লাশ তুলেছি। পিলখানা, রায়েরবাজার রাস্তা, গণকটুলি, কলাবাগান, ধানমন্ডি, কাঁঠালবাগান, এয়ারপোর্ট রোডের পার্শ্ববর্তী এলাকা, তেজগাঁও মাদ্রাসা থেকে অসংখ্য নারী-পুরুষের পচা, ফোলা লাশ তুলেছি। অনেক লাশের হাত-পা পেয়েছি, মাথা পাইনি।'

সুইপার ইনস্পেক্টর সাহেব আলীকে আমি বললাম, 'ঢাকায় ২৬ মার্চ থেকে হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ গণহত্যার জন্য এবং আমাদের মা-বোনদের ইজ্জত লোটার জন্য দায়ী জেনারেল টিক্কা খান, জেনারেল রাও ফরমান আলী ও জেনারেল নিয়াজীদের আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার হবে। সেই আদালতে আপনি হবেন প্রত্যক্ষদর্শী গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। আপনি সাক্ষী দেবেন?'

সাহেব আলী বললেন, 'স্যার, সাক্ষী দেব। আমাকে মেরে ফেললেও সাক্ষী দেব। আমি কেয়ামতের দিন আল্লাহতায়ালার কাছেও সাক্ষী দেব। আমার দেশের মা-বোনদের পাকিস্তানি সেনা আর বিহারীরা যে অপমান করেছে, পৃথিবী তার বিচার করুক...।' বলতে বলতে তিনি কেঁদে উঠলেন।

পাকিস্তানি সেনাদের এই পৈশাচিকতা সম্পর্কে তাঁর এবং অন্যদের সাক্ষাত্কার ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত সরকারি ঐতিহাসিক দলিল 'বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ'-এর ৮ম খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে।

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
দেশে যৌথ উদ্যোগে তরুণ এসএমই উদ্যোক্তা তৈরির ভারতীয় প্রস্তাব সরকার গ্রহণ করবে বলে মনে করেন?
1 + 5 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
নভেম্বর - ১৫
ফজর৪:৫৪
যোহর১১:৪৩
আসর৩:৩৭
মাগরিব৫:১৬
এশা৬:৩১
সূর্যোদয় - ৬:১২সূর্যাস্ত - ০৫:১১
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :