The Daily Ittefaq
ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৬ মার্চ ২০১৩, ১২ চৈত্র ১৪১৯, ১৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ টাইগারদের টার্গেট ৩০৩ : প্রথম বাংলাদেশি বোলার হিসেবে আব্দুর রাজ্জাকের ২০০ উইকেট | আপিল করেছেন সাঈদী | আপিল করবেন না সঞ্জয় | মুন্সীগঞ্জে ১৪৫ মণ জাটকা আটক | সাতক্ষীরায় পুলিশের ওপর শিবিরকর্মীদের সশস্ত্র হামলা, গুলিবিদ্ধ ৪

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসচর্চার ঝুঁকি

ড. দিব্যদ্যুতি সরকার

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস যাঁরা লেখা বা সংকলনের চেষ্টা করেন, তাঁদের নানারকমের ঘরানা হয়ে গেছে। ইতিহাসচর্চার এই ঘরানা উন্নত দেশেও আছে, তবে তা মূলত ইতিহাস রচনার পদ্ধতি ও দৃষ্টিভঙ্গিজনিত। ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রে মাত্র দু-তিন দশক আগেও শ্রেণীসংগ্রামের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর অনেক ইতিহাসবিদ জোর দিতেন। সমপ্রতি সাবঅল্টার্ন ঘরানা বেশ পরিচিত। এ ছাড়া গ্রাসরুট লেবেল হিস্ট্রি, মাইক্রো হিস্ট্রি, ওরাল হিস্ট্রি—ইতিহাস লিখনের এসব নানা ধরন ও পদ্ধতি সারা পৃথিবীতে চর্চিত হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চা বিশেষত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসচর্চার ঘরানা হয়ে পড়েছে রাজনৈতিক। রাজনৈতিক বললে অবশ্য ঠিক বোঝা যায় না, বলা যেতে পারে—দলীয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা খুব দুঃখজনক ও বিপজ্জজনক।

দুঃখজনক এ জন্য যে, এখানে কারও নিরপেক্ষ থাকার উপায় থাকছে না। যে পেশাদার ইতিহাসবিদ পদ্ধতিগত নিরপেক্ষতা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ চর্চা করছেন, তিনিও রেহাই পাচ্ছেন না। কারণ, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধচর্চার ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুতর জখম তৈরি করে ফেলা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে স্পর্শকারতর জখমটি হলো 'স্বাধীনতার ঘোষণা'। এই ঘোষণা দেওয়ার কাজটি কে করেছিলেন, ঘোষণার ভাষাটি কী ছিল, ঘোষণা দেওয়াটা কার এখতিয়ারে ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব স্বভাবতই ইতিহাসবিদদের। কিন্তু ইতিহাসবিদ যখন তা করতে যান, তখনই তিনি অনেক খড়্গের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যান। এ প্রশ্নের উত্তরে যদি তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন, ঘোষণা দেওয়ার এখতিয়ারও একমাত্র তাঁর ছিল, তাহলে তাঁকে বাংলাদেশের বড় একটি রাজনৈতিক দলের মুখোমুখি অবস্থান নিতে হয়। আর এর ফলেই তিনি নিজেকে একপ্রকার বিপদের মধ্যে নিক্ষেপ করেন। ক্রমে এই বিপদ হয়ে পড়ে নানামুখী। এই একটিমাত্র প্রশ্নের উত্তর কী দিয়েছেন, তার ওপর ভিত্তি করে ওই ইতিহাসবিদের পছন্দের রাজনৈতিক দল সম্পর্কে সবাই একপ্রকার নিশ্চিত হয়ে যান। এর ফলে তাঁর জীবন-জীবিকা, চাকরি-বাকরি, সামাজিক সম্মান ও নিরাপত্তা অনেক কিছু নির্ধারিত হতে থাকে। এর ফলে এই অতি সহজ একটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় ইতিহাসবিদ হয় কূটনৈতিক ভাষার আশ্রয় নেন, নয়তো প্রসঙ্গটি একেবারে এড়িয়ে যান। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস গবেষণার ক্ষেত্রে আমি এ রকম অনেক এড়িয়ে যাওয়ার উদাহরণ দিতে পারব।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে অ্যাকাডেমিক গবেষণার ক্ষেত্রেও গবেষকদের এই অস্বস্তি আমি লক্ষ করেছি। একজন গবেষকের সমগ্র থিসিসটি সুলিখিত হলেও এই একটি প্রশ্নের উত্তর পরীক্ষকদের মনমতো না হওয়ার জন্য অনেক ক্ষেত্রে ডিগ্রিপ্রাপ্তি বাধার মুখে পড়ে। আবার ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনার চাকরি পেতে হলে এই প্রশ্নের উত্তর কী দেওয়া হয়েছে, সেটিও নির্বাচকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। গবেষক বা ইতিহাসবিদ এই সমাজেরই একজন মানুষ, তিনি 'নিরালম্ব ও বায়ুভুক' হয়ে থাকতে পারেন না। ফলে তাঁকেও পরিস্থিতি বুঝে, রাজনৈতিক আবহাওয়ার পূর্বাভাস জেনে মুক্তিযুদ্ধচর্চা করতে হয়। এভাবে আকাশ-পাতাল ভেবে যে ইতিহাস রচিত হয়, তাতে মুক্তিযুদ্ধের ওপর লেখা বইয়ের সংখ্যা বৃদ্ধিই হয় মাত্র, কিন্তু কমতে থাকে মুক্তিযুদ্ধের বিজ্ঞানসম্মত ইতিহাসচর্চা।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রে আরেকটি ঝুঁকি হলো মূল্যায়নের ঝুঁকি। তথ্য-উপাত্তের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে কোনো নিরপেক্ষ গবেষক যখন কারও ব্যাপারে মূল্যায়ন উপস্থিত করেন, তখনও সেটিকে আমাদের রাজনৈতিক দলসমূহের প্রচলিত মূল্যায়নের সাথে মিলিয়ে দেখা হয়। এই মেলানোর সময় যত গরমিল চোখে পড়বে, ইতিহাসবিদের ক্যারিয়ার ততটা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

তবে এসব ঝুঁকি অনেকটা দূরবর্তী ধরনের ঝুঁকি। মুক্তিযুদ্ধের একজন গবেষক যদি তৃণমূল পর্যায়ের ইতিহাস সংগ্রহে নামেন, তাহলে তিনি একেবারে হাতেগরম কিছু ঝুঁকির মুখোমুখি হতে পারেন। কয়েক মাস আগে সাতক্ষীরার কয়েকটি এলাকায় একাত্তরের গণহত্যা, নির্যাতন ও লুণ্ঠনের উপাত্ত সংগ্রহ করতে গিয়ে আমার এ রকম কিছু অভিজ্ঞতা হয়। একাত্তরে যাঁরা গণহত্যা ও নির্যাতন করেছিলেন এবং যাঁরা নির্যাতিত হয়েছিলেন, তাঁরা এখনও পাশাপাশি গ্রামে অথবা পাড়ায় বাস করেন। এ পাড়ার এক উঠতি তরুণ রাজাকার হয়তো ধর্ষণ করেছিল ও পাড়ার একজন স্কুলপড়ুয়া কিশোরীকে। সেই তরুণ আজ হয়তো এলাকার চেয়ারম্যান আর ধর্ষিতা কিশোরীটি ছাপোষা একটি সংসারের বৃদ্ধা। ফলে কোনো গবেষক যদি গ্রামে গ্রামে ঘুরে এসব উপাত্ত সংগ্রহ করতে থাকেন, তাহলে তিনি একাত্তরের ধর্ষক ও নির্যাতনকারীর দ্বারা আক্রমণের ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। সাতক্ষীরা জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লিখেছেন এমন একজন লেখক আমাকে জানিয়েছেন, বইটি লেখার কারণে কয়েক বছর আগে তাঁকে গাড়িচাপা দিয়ে মারার চেষ্টা করা হয়েছিল। প্রাণভয়ে তিনি এরপর আর ওই ইতিহাসচর্চায় আগ্রহ ধরে রাখতে পারেননি। তিনি এ-ও লক্ষ করেছিলেন, তাঁর বইটি প্রকাশিত হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যে বাজারে তার একটি কপিও নাই। বাগেরহাট জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লিখেছেন, এমন একজন প্রতিথযশা অধ্যাপককেও কয়েক বছর আগে টেলিফোনে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। বাগেরহাটের কাড়াপাড়া গণহত্যার উপাত্ত সংগ্রহে গিয়ে আমি ওই লেখকের ওপর জনৈক স্বাধীনতাবিরোধীর পুত্রের তীব্র ক্ষোভের কথা জানতে পারি। তিনি উক্ত লেখককে একবার ছুরি মেরে খুন করার অভিলাষ পোষণ করেছিলেন বলেও আমাকে জানান। অথচ নানামুখী অনুসন্ধানে আমি অনুধাবন করি যে, যে লেখককে তিনি খুন করতে চেয়েছিলেন, সেই ইতিহাস লেখকের বর্ণনাই বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ।

সমপ্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্যদানকারীদের নিরাপত্তাহীনতার কিছু খবর আমাদের চোখে পড়েছে। শোনা যাচ্ছে, একাত্তরে যাঁরা অপরাধ করেছিলেন, তাঁরা তাঁদের বিপক্ষের সাক্ষীদের হত্যার হুমকি দিচ্ছেন। এর ফলে বিচারকাজ বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে অনেকে শঙ্কা করছেন। মুক্তিযুদ্ধের তৃণমূল পর্যায়ে সরেজমিন অনুসন্ধান ও জরিপ-ভিত্তিক ইতিহাস যিনি রচনা করতে চান, তিনিও এসব সাক্ষীদের মতো ঝুঁকির মধ্যে অবস্থান করেন। কারণ, একটি ব্যাগ কাঁধে করে একাকী তাঁকে এ গ্রাম থেকে ও গ্রামে ঘুরে বেড়াতে হয়। ওই ব্যাগের মধ্যে যে খাতা বা রেকর্ডার আছে, সেখানে যতই নির্যাতন ও গণহত্যার উপাত্ত জমা হতে থাকে, ততই ব্যাগের মালিক ঝুঁকির মধ্যে পড়তে থাকেন।

মুক্তিযুদ্ধের বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস রচিত হচ্ছে না বলে দেশ-বিদেশের অনেক অ্যাকাডেমিশিয়ান আমাদের ইতিহাসবিদদের সমালোচনা করেন। মুক্তিযুদ্ধের তৃণমূল পর্যায়ের ইতিহাস যা রচিত হচ্ছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা-ও অসম্পূর্ণ। ভাসা ভাসা বর্ণনা, ঘটনার অসামঞ্জস্য, স্থানীয় গণহত্যাকারী ও অত্যাচারীদের আড়াল করা, শহীদদের তালিকা না থাকা—প্রভৃতি এ জাতীয় গ্রন্থগুলোর গুরুতর ত্রুটি হিসেবে দেখা দিয়েছে। এসবের নানা কারণ আছে, তবে একটি বড়ো কারণ হলো গবেষকের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও ক্যারিয়ারের ঝুঁকি। আমাদের প্রশিক্ষিত গবেষক আছেন, গবেষণার আগ্রহ আছে কিন্তু গবেষণা কাজে নেমে এসব অবাঞ্চিত ঝুঁকি দেখে অনেকেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। এর ফলে আমরা এখনও মুক্তিযুদ্ধের প্রামাণ্য ইতিহাস রচনা করতে পারিনি।

অনেকে আশা করেন, আরও কয়েক দশক পরে মুক্তিযুদ্ধের বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস রচিত হবে। ২০৭১ সালে যখন মুক্তিযুদ্ধের শতবর্ষ পূর্তি হবে, আমরা যদি কল্পনা করি, তখন এই বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস লেখা হবে, তাহলে তা শুনতে একরকম ভালোলাগার স্বপ্নাবেশ আসে। এই দূরবর্তী সময়ে গিয়ে অবশ্য কিছু বিতর্কিত প্রশ্নের মীমাংসা হবে বলে ধরে নেওয়া যায়। যেমন, স্বাধীনতার ঘোষণা কে দিয়েছেন, তা নিয়ে হয়তো তখন কেউ বিতর্ক তুলবেন না। কিন্তু তখন অনেক তথ্য-উপাত্ত চলে যাবে ইতিহাসের চিরকালীন কৃষ্ণগহ্বরে। গত বিয়াল্লিশ বছরে আমরা একাত্তরের গণহত্যা, নির্যাতন, লুণ্ঠন, ধর্মান্তর, শরণার্থী প্রভৃতি সম্পর্কে খুব কম তথ্য-উপাত্ত বিধিবদ্ধভাবে গ্রন্থনা করেছি। বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শীদের সংখাগরিষ্ঠ অংশ হয়তো মারা গিয়েছেন, প্রতিদিনই তাঁরা সংখ্যায় কমে যাচ্ছেন। ফলে প্রতিদিনই আমরা হারাচ্ছি অসংখ্য তথ্য-উপাত্ত। শুধু সখের ইতিহাসবিদেরা গাটের পয়সা খরচ করে ঝুঁকি নিয়ে এই তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে রাখবেন আর শতবর্ষ পূর্তির সময় তখনকার ইতিহাসবিদেরা তা ঘেঁটে ঘেঁটে মুক্তিযুদ্ধের বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস লিখবেন, সে আশা করার কোনো মানে আছে বলে মনে হয় না। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের অনেক গর্বের একটি উপলক্ষ, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসচর্চা সেই গর্ববোধের সাথে মোটেই মেলে না। তবে আমরা এখনই এমন একটি পদক্ষেপ নিতে পারি, যাতে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম শতকের পর শতক ধরে গর্ব করতে পারে। সেটি হলো মুক্তিযুদ্ধের সম্ভাব্য সমস্ত দলিল, তথ্য-উপাত্ত, প্রমাণ ও ওরাল হিস্ট্রি অবিকৃতভাবে এখনই সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা। আর বাংলাদেশের কোনো একক ব্যক্তি তা করতে পারবে না, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে হোক বাংলাদেশ রাষ্ট্রকেই এ দায়িত্ব নিতে হবে।

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
দেশে যৌথ উদ্যোগে তরুণ এসএমই উদ্যোক্তা তৈরির ভারতীয় প্রস্তাব সরকার গ্রহণ করবে বলে মনে করেন?
6 + 6 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
সেপ্টেম্বর - ১৭
ফজর৪:৩০
যোহর১১:৫৪
আসর৪:১৮
মাগরিব৬:০৪
এশা৭:১৭
সূর্যোদয় - ৫:৪৫সূর্যাস্ত - ০৫:৫৯
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :