The Daily Ittefaq
ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৬ মার্চ ২০১৩, ১২ চৈত্র ১৪১৯, ১৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ টাইগারদের টার্গেট ৩০৩ : প্রথম বাংলাদেশি বোলার হিসেবে আব্দুর রাজ্জাকের ২০০ উইকেট | আপিল করেছেন সাঈদী | আপিল করবেন না সঞ্জয় | মুন্সীগঞ্জে ১৪৫ মণ জাটকা আটক | সাতক্ষীরায় পুলিশের ওপর শিবিরকর্মীদের সশস্ত্র হামলা, গুলিবিদ্ধ ৪

বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ

বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ মেধাসম্পদ

নির্মলেন্দু গুণ

পৃথিবী নামক এই ক্ষুদ্র গ্রহপৃষ্ঠে তিরিশ লক্ষ প্রাণের মূল্যে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ নামের এই দেশটি যত দিন তার প্রায় ৫৬ হাজার বর্গমাইলের বর্তমান অবয়ব নিয়ে টিকে থাকবে, তত দিনে এই ভূ-খণ্ডের মানুষ পরম শ্রদ্ধা ও গর্বের সঙ্গে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দেওয়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণটিকে স্মরণ করবে। ক্ষমতায় আসার কিছুদিনের মধ্যেই খালেদা-নিজামীর জোট সরকার স্কুলের পাঠ্যসূচি থেকে আমার নির্দোষ কবিতাটিকে বাদ দিলেও, হয়তোবা দেবী দুর্গার সঙ্গে মহিষাসুরের মতো, ওই ভাষণ নিয়ে রচিত আমার 'স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো'—কবিতাটি টিকে যেতে পারে তা আমার কবিতাটি টিকুক আর না-ই টিকুক, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণটি যে টিকে থাকবে, সে ব্যাপারে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। আমার কাছে ওই ভাষণটিকে একটি রাজনৈতিক কবিতার মতো মনে হয়, যা কমপ্লিট ইন ইটসেল্ফ। ওই ভাষণটিকে আমি বাঙালি জাতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ মেধাসম্পদ (ইনট্যালেকচুয়াল প্রপার্টি) বলে মনে করি। ৭১-এর ৭ মার্চের দিনটির সাথে আমার নানা স্মৃতি জড়িত। ওই সময় আমি সাপ্তাহিক 'গণবাংলা' পত্রিকায় কাজ করতাম। ওই পত্রিকাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৭১ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি। বড় কলেবরের ওই বিশেষ সংখ্যাটিতে আমার ও কবি হুমায়ুন কবিরের নেওয়া শহীদ মুনীর চৌধুরীর শেষ সাক্ষাত্কারটি প্রকাশিত হয়েছিল। ওই সংখ্যায় আমার কবিতা ছিল কি না, মনে পড়ছে না। পঁয়ত্রিশ বছর পর আমি 'গণবাংলা' পত্রিকাটির সন্ধানে প্রথমে গণবাংলার নির্বাহী সম্পাদক জনাব আনোয়ার জাহিদ ও পরে তাঁর কাছ থেকে পাওয়া ফোন নম্বর নিয়ে পত্রিকার মালিক-সম্পাদক-সাহিত্যিক আবিদুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করি। দীর্ঘ বিরতির পর আবিদ ভাইয়ের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হতে পেরে আমার খুব ভালো লাগে। আমি যখন একাত্তরের স্মৃতিসমুদ্রে হাতড়ে বেড়াচ্ছি, তখন আবিদ ভাইয়ের সন্ধান পেয়ে মনে হলো আমার সামনে দিয়ে একটা গাছের ডাল ভেসে যাচ্ছে। আমেরিকা আবিষ্কারের দীর্ঘ সমুদ্রপথে কলম্বাসের ক্ষেত্রে যেমনটি ঘটেছিল। আমার কাছে আবিদ ভাই হচ্ছেন সমুদ্রতীরের বাতিঘরের মতো। আমি সেই ডাল আঁকড়ে ধরলাম। কিন্তু যতটা আশা করেছিলাম, তার পুরোটা পূর্ণ হলো না। জানলাম, তাঁর কাছে 'গণবাংলা' পত্রিকার কোনো কপি নেই। তবে পত্রিকার কোনো কপি না থাকলেও দেখলাম বয়সে আমার চেয়ে বেশ বড় হলেও তাঁর স্মৃতি এখনও খুব প্রখর। তিনি তাঁর অতিক্রান্ত জীবন নিয়ে আগেও লিখেছেন, এখনও লিখে চলেছেন। বাংলার চেয়ে ইংরেজি ভাষাতেই তিনি বেশি লিখেছেন। তাঁর ইংরেজি কবিতা অতি উচ্চমানের। তাঁর সঙ্গে কথা বলে আমি আমার বর্তমান রচনাকর্মে প্রভূত সাহায্য পেয়েছি। 'গণবাংলা'র সন্ধানে বাংলা একাডেমী লাইব্রেরি, পাবলিক লাইব্রেরি ও 'ইত্তেফাক' পত্রিকার সংগ্রহশালায় অনুসন্ধান চালিয়ে আমি ব্যর্থ হয়েছি। কেথাও পত্রিকাটি নেই। বাকি আছে ন্যাশনাল আর্কাইভ; যদি সেখানে 'গণবাংলার' হদিস পাওয়া যায়। 'গণবাংলা' পত্রিকাটি আমি সন্ধান করছিলাম আরও একটি কারণে। ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের পর 'গণবাংলা' সন্ধ্যায় একটি টেলিগ্রাম প্রকাশ করেছিল। ওই বিশেষ টেলিগ্রাম-সংখ্যাটিতে আমার তাত্ক্ষণিকভাবে লেখা একটি কবিতা ছাপা হয়। আমি কী লিখেছিলাম ওই কবিতাটিতে, আমার একটুও মনে পড়ছে না; একটি বর্ণও না। সাংবাদিকদের জন্য সংরক্ষিত আসনে বসে আমি বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ শুনেছিলাম। সেদিনের ওই তিল-ঠাঁই-নাই মাঠে, মঞ্চের কাছাকাছি সাংবাদিকদের জন্য সংরক্ষিত আসনে আমার মতো তরুণ কবি ও নবিশ সাংবাদিকের বসবার কথা নয়। জাহিদ ভাইয়ের কল্যাণে আমি সে সুযোগ পাই। তিনি আমাকে সঙ্গে নিয়ে রেসকোর্সে যান এবং বঙ্গবন্ধুর ভাষণের ওপর রিপোর্ট তৈরি করতে বলেন। পূর্বেই স্থির হয়েছিল যে, আমরা বঙ্গবন্ধুর ভাষণের ওপর একটি টেলিগ্রাম-সংখ্যা প্রকাশ করব। বঙ্গবন্ধু রেসকোর্সের ভাষণ-মঞ্চে আসতে বেশ দেরি করছিলেন। লক্ষ লক্ষ ব্যাকুল বিদ্রোহী শ্রোতা অধীর আগ্রহে তাকিয়েছিল তাঁর সম্ভাব্য আগমনপথের দিকে। ওই বিলম্বের ফাঁকে আনোয়ার জাহিদ ছাত্রনেতা আ স ম আব্দুর রবকে কাছে ডাকেন, 'কী রব সাহেব, আপনার নেতা কি আজ স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন?' জাহিদ ভাইয়ের সূক্ষ্ম উস্কানির ফাঁদে পা দিয়ে বঙ্গবন্ধুর মতো পাজামা-পাঞ্জাবি পরা রব হাসতে হাসতে বললেন, 'তিনি যদি আজ স্বধীনতা ঘাষণা না দেন, তবে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে আমরা আজই স্বাধীনতা ঘোষণা করব।' রবের কথা শুনে বিদ্রূপের হাসি হেসে আনোয়ার জাহিদ বললেন, 'হুম, নেতা আসলে আপনেরা তো ভিজা বিড়াল হইয়া যাবেন। দেখব।' জাহিদ-রব সংলাপ চলার মধ্যে বঙ্গবন্ধু মাঠে প্রবেশ করলেন। রব দৌড়ে চলে গেলেন মঞ্চের দিকে। আমরা কাগজ-কলম নিয়ে আমাদের যার যার আসনে বসলাম। রেসকোর্সে সমবেত লক্ষ জনতার উদ্দেশে নেতার ভাষণ শুরু হলো। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো বসে তাঁর ভাষণ শুনলাম। অপূর্ব! এমন হূদয়কাড়া জাদুকরী ভাষণ আমি আগে কখনো শুনিনি। ইহজনমে আবার কখনো শুনব বলেও মনে হয় না। পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ পিনপতন নীরবতার মধ্যে তাদের প্রিয় নেতার ভাষণ শুনছে। আর গগনবিদারী স্লোগান তুলছে, 'বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো', 'জয়য়য়য়য় বাংলা, জয়য়য়য়য় বঙ্গবন্ধু।' আমাকে প্রচণ্ড ঘোরের ভেতরে নিক্ষেপ করে তিনি তাঁর ভাষণ শেষ করলেন এই বলে, 'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।' অফিসে ফিরে গিয়ে তাঁর ভাষণের সেই অন্তিম চরণ দুটিকে হেড লাইন করে আমি আমার রিপোর্ট তৈরি করলাম। আমার রিপোর্ট পড়ে জাহিদ ভাই হাসলেন। বললেন, 'কবি, আপনি কি লক্ষ করেননি যে শেখ সাহেব চারটি শর্ত দিয়েছেন?' বললাম, 'কোথায়? কখন?' তখন জাহিদ ভাই বললেন, 'যান, আপনি বরং একটি কবিতা লেখেন টেলিগ্রামের জন্য। আমি রিপোর্ট লিখছি।' তখন আমি রিপোর্ট লেখা বাদ দিয়ে বসে গেলাম কবিতা লিখতে। আমি সেই কবিতাটির কথাই বলছি। কী ছিল সেই কবিতায়? আমার কিছুই মনে পড়ছে না। ৭ মার্চ সন্ধ্যায় প্রকাশিত 'গণবাংলা' পত্রিকার ওই টেলিগ্রাম সংখ্যাটি দুর্ভাগ্যবশত আমার সংগ্রহে নেই। বাঙালির জন্য আনন্দের বিষয় হচ্ছে, ৭ মার্চের ভাষণটিকে কেউ কেউ আব্রাহাম লিঙ্কনের গেটিসবার্গ ভাষণের সঙ্গে তুলনা করেছেন। আমি মনে করি, বঙ্গবন্ধুর ওই ভাষণটি গেটিসবার্গ অ্যাড্রেসের চেয়েও এগিয়ে। বিশ্বের বিভিন্ন কালজয়ী নেতা প্রদত্ত ঐতিহাসিক ভাষণসমূহ শ্রবণের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় রেখেই আমি বলি, বঙ্গবন্ধুর ওই ভাষণের চেয়ে সুভাষণ আমি শুনিনি।

অনুলিখন : খালেদ আহমেদ

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
দেশে যৌথ উদ্যোগে তরুণ এসএমই উদ্যোক্তা তৈরির ভারতীয় প্রস্তাব সরকার গ্রহণ করবে বলে মনে করেন?
4 + 4 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
নভেম্বর - ১৫
ফজর৪:৫৪
যোহর১১:৪৩
আসর৩:৩৭
মাগরিব৫:১৬
এশা৬:৩১
সূর্যোদয় - ৬:১২সূর্যাস্ত - ০৫:১১
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :