The Daily Ittefaq
ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৬ মার্চ ২০১৩, ১২ চৈত্র ১৪১৯, ১৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ টাইগারদের টার্গেট ৩০৩ : প্রথম বাংলাদেশি বোলার হিসেবে আব্দুর রাজ্জাকের ২০০ উইকেট | আপিল করেছেন সাঈদী | আপিল করবেন না সঞ্জয় | মুন্সীগঞ্জে ১৪৫ মণ জাটকা আটক | সাতক্ষীরায় পুলিশের ওপর শিবিরকর্মীদের সশস্ত্র হামলা, গুলিবিদ্ধ ৪

[ আ লো ক পা ত ]

রাষ্ট্রপতির নির্বাচন নিয়ে কিছু ভাবনা

ধীরাজ কুমার নাথ

প্রয়াত রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান এমন এক মহান ব্যক্তিত্বের মানুষ ছিলেন যিনি পরকে অতি সহজে আপন করার এক আদর্শ স্থাপন করেছেন। এমন একজন মহান ব্যক্তিত্বের মহাপ্রয়াণে দেশবাসী বাঙালি জাতির আদর্শের প্রতিবিম্ব মহান ব্যক্তিকে হারিয়ে শোকে বিহ্বল। সর্বস্তরের গণমানুষের শোক প্রকাশ তারই বহিঃপ্রকাশ। চাকরি জীবনে নানান কাজে আমার এ মহান মানুষটির অনেক কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের সচিব হিসেবে এই মন্ত্রণালয়ের প্রয়াত মন্ত্রীর কাছে বিভিন্ন সময় একান্তে আলোচনারও সুযোগ পেয়েছি। সরকারি কাজের সাথে দুই একটি রাজনৈতিক আলোচনা আসতে বাধ্য, কারণ অনেক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে প্রায় সকল দলীয় গণতান্ত্রিক সরকার নিজের দলের অবস্থান ও দলীয় কর্মীদের স্বার্থ বা সরকারের ভাবমূর্তি নিয়ে ভাবেন। এ জাতীয় ভাবনা বিশ্বের সকল গণতান্ত্রিক দেশে প্রচলিত আছে। প্রয়াত রাষ্ট্রপতিও ছিলেন তার দলের মহাসচিব। কিন্তু সরকারের সকল কাজে বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে দলের কথা বলার অনেক ঊর্ধ্বে ছিলেন এ মহান ব্যাক্তিত্ব, অন্তত আমি যা দেখেছি কাছে থেকে। তাই দেশের সকল স্তরের জনগণ তার মহাপ্রয়াণে হূদয় থেকে গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছেন শঙ্কাহীন চিত্তে, মহান ব্যক্তিত্বের মহাপ্রয়াণে।

এখন ভাবনা শুরু হয়েছে তার স্থলাভিষিক্ত কে হবেন? তবে যেহেতু এবারের রাষ্ট্রপতি পরবর্তী ৫ বছর দেশের কর্ণধার থাকবেন এবং অনেক চড়াই-উতরাই, সুসময় ও দুঃসময়ের ক্রান্তিকালে তাকে হাল ধরতে হতে পারে। তাই এবারের রাষ্ট্রপতির নির্বাচন অনেক বেশি গুরুত্ব বহন করে।

বাংলাদেশের সংবিধানে নির্বাহী কাজে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা দৃশ্যমান নয়, কিন্তু রাষ্ট্রপতি দেশের প্রধান। সংবিধানের ৪৮(২) অনুচ্ছেদ অনুসারে, 'রাষ্ট্রপ্রধানরূপে রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের অন্য সকল ব্যক্তির ঊর্ধ্বে স্থান লাভ করিবেন এবং এই সংবিধান ও অন্য কোন আইনের দ্বারা তাঁহাকে প্রদত্ত ও তাঁহার উপর অর্পিত সকল ক্ষমতা প্রয়োগ ও কর্তব্য পালন করিবেন।' তবে সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ বলছে, 'এই সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদের (৩) দফা অনুসারে কেবল প্রধানমন্ত্রী ও ৯৫ অনুচ্ছেদের (১) দফা অনুসারে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ব্যতীত রাষ্ট্রপতি তাঁহার অন্য সকল দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কার্য করিবেন ঃ তবে শর্ত থাকে যে, প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে আদৌ কোন পরামর্শদান করিয়াছেন কি না এবং করিয়া থাকিলে কি পরামর্শ দান করিয়াছেন, কোন আদালত সেই সম্পর্কে কোন প্রশ্নের তদন্ত করিতে পারিবেন না।'

দেশবাসীর প্রত্যাশা দেশের একজন বরেণ্য সন্তান, অবিসংবাদিত ও আদর্শ চরিত্রের অধিকারী প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিত্বকে জাতির এ ক্রান্তিলগ্লে নির্বাচন করাই হবে দুরদর্শী সিদ্ধান্তের পরিচায়ক। তাই দলমত নির্বিশেষে ঐকমত্যের ভিত্তিতে একজন বরণ্যে ব্যক্তিকে নির্বাচিত করা হলে দেশবাসী নিজেদের গৌরবান্বিত মনে করতে পারবে। এক্ষেত্রে যেকোন প্রকার সংকীর্ণতার পরিচয় হবে দেশের জন্য ক্ষতিকর, দেশের ভাবমূর্তি বিকাশের পথে প্রধান অন্তরায়।

আরো কিছু ভাবনা প্রসঙ্গক্রমেই চলে আসে। রাষ্ট্রপতির পদ সকল দেশেই আছে, শুধু যেসব দেশে রাজা বা রাণী আছে সেখানে রাষ্ট্রপতি নেই। রাষ্ট্রপতির সাথে উপরাষ্ট্রপতি আছেন। আমেরিকায় যেমন আছে, তেমনি আছে ভারতে। রাষ্ট্রপতির অবর্তমানে স্বাভাবিকভাবে উপরাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালন করবেন। বাংলাদেশেও তাই ছিলো। বাংলাদেশে এমনও নিয়ম ছিলো রাষ্ট্রপতি হবেন জনগণের সরাসরি প্রত্যক্ষ ভোটে। ড. কামাল হোসেন এ পদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। অনেক সময় ক্ষমতাসীনরা তাদের নিজেদের কারণে এসবের পরিবর্তন করে থাকেন। রাষ্ট্রপতি সরাসরি জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হওয়ার বিধান পুনরায় চালু করলে ক্ষতি কি? বাংলাদেশে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী অনুসারে উপ-প্রধানমন্ত্রীর পদটি বিলোপ করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর পদের সাথে কমপক্ষে দুজন উপ-প্রধানমন্ত্রী থাকলে কাজের অনেক বিভাজন হতে পারে এবং একজনের উপর প্রচুর কাজের চাপ পড়বে না। পক্ষান্তরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে নীতি-নির্ধারণী বিষয়ে ভাবনার অনেক সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। এমনকি তিনি দলীয় সংগঠনের কাজেও নিজেকে নিয়োজিত করতে পারেন।

আরো একটি বিষয় সাধারণ জনগণের কাছে যা সমালোচনার বস্তু হচ্ছে বা দেশবাসী ভালোভাবে দেখছে না বলে মনে হয়, তা হচ্ছে নির্বাচিত সরকারের অধীনে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রায় ৬ জন উপদেষ্টার নিয়োগ। এ সকল উপদেষ্টা জাতীয় পতাকা উড়িয়ে দেশময় চষে বেড়াচ্ছেন এবং মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কাজে অযাচিতভাবে হস্তক্ষেপ করে তালগোল পাকিয়ে ফেলছেন বলে অনেকের ধারণা। কেনাকাটা, নিয়োগ-পদোন্নতিতে অনাবশ্যকভাবে মাথা দিয়ে সুশাসনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে সরকারের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করছেন বলে অনেকেই বলেন। অথচ এ সকল উপদেষ্টা এ জাতীয় কাজ করার জন্য জনগণের নিকট থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত হননি। তারা সাংবিধানিকভাবে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা নয়। এ হচ্ছে একরকম বিচিত্রভাবে সুবিধাদানের সুব্যবস্থা। কোন দায়বদ্ধতা নেই, অথচ সবকিছুই করছেন। রাজনৈতিক দলের জন্যও কোন অবদান রাখছেন বলে মনে হয় না। এ সমস্ত সুবিধা বণ্টনের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার বোধ হয় সময় এখন এসেছে। এ জাতীয় পদের বিলোপ করতে হবে।

সুশীল সমাজ, ছাত্র-যুবকরা এমন ভাবনা ভাবছেন বলে অনেকের বিশ্বাস। ছাত্র-যুবকদের জাগরণ মূলত সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে, আদর্শ রাষ্ট্র গড়ার পক্ষে, আইনের শাসন বলবত্ করার সুদৃঢ় প্রত্যয়ে পরিচালিত। এ কোন ভাবাবেগ নয়, নৈতিকতা ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনে এ হচ্ছে এক আন্দোলন। চিকন আলীরা সমাজের আইনের শাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাবে, নিরীহ ও সত্ মানুষরা নির্যাতিত হবে, তাদের বিশ্বাস ও আরাধনার অঙ্গন বিনষ্ট হবে দিনের পর দিন, এ কেমন কথা। এখানেই প্রতিবাদী কণ্ঠের উচ্চৈঃস্বর তীব্র থেকে তীব্রতর হতে বাধ্য।

বাংলাদেশের জনগণ স্বাধীনতা অর্জন করেছে যুদ্ধ করে, অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে, অনেক হারানো বেদনাকে বুকে ধরে। র্যাডক্লিফ কলম দিয়ে বাংলাদেশের সীমানা নির্ধারণ করেনি। প্রতিটি সীমান্তে যুদ্ধ হয়েছে, যেমন হয়েছে ভুরঙ্গামারিতে, তেমনি হয়েছে বিলোনিয়ায়, রৌমারীতে, ভোমরায়, শমসেরনগরে। গ্রামে গ্রামে, পথে পথে, সকল মানুষের হূদয় মাঝারে, যুদ্ধ হয়েছে দিনের পর দিন অন্তরে ্বাইরে। রীতিমতো জীবনযুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এসেছে এ স্বাধীনতা।

স্বাধীনতার পরও স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তির ধারক-বাহকগণ অনেকভাবে নির্যাতিত হয়েছে। অনেক শ্লোগান এসেছে এ স্বাধীন দেশে, কখনো মুসলিম বাংলা, কখনো বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র আবার কখনো ধর্মীয় ভাবাবেগের মাঝে জাতিকে বহুভাবে বিভক্তির উন্মাদনা। আর কতো? এখন চলছে মন্দির ভাঙার মহোত্সব। কোন প্রতিবাদ নেই। নিবারণের কোন রাজনৈতিক উদ্যোগ আছে বলে মনে হয় না। পুলিশ মামলা দিচ্ছে। কিন্তু এসব খুচরা মামলার কি বিচার হয় এদেশে?

ভিন্ন কথা বলে লাভ নেই, শুধু প্রত্যাশা এমন একজন রাষ্ট্রপতি হবেন যিনি সকল দলের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারেন, জনগণের নিকট সন্মানের আসনে অধিষ্ঠিত হতে পারেন। এ ব্যাপারে একটি সুযোগ এসেছে সকল রাজনৈতিক দলের সাথে আলোচনা বৈঠকে বসার এবং আলোচনার একটি ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছে। বিরোধীদল শুধু বিরোধিতা করবে, আর সরকারি দল তাদের কোন মূল্যই দিবে না এমনটি তো সংসদীয় গণতন্ত্রের ভাষা নয়। জাতীয় সংসদে কোন দল কতটি আসন পেয়েছে গত নির্বাচনে, তার সাথে দেখতে হবে পপুলার ভোট কোন দল কত শতাংশ পেয়েছে, তবেই বুঝা যাবে ভবিষ্যত্ কি হতে পারে।

দেশের অর্থনীতি এখন গতিশীল। জনগণের মাঝে সামনের পথে অগ্রসর হওয়ার সুবর্ণ সুযোগ এসেছে । বাণিজ্যিক ভুবনে বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা তাদের অবস্থান দিনের পর দিন দৃঢ় করছে। শিক্ষিত যুবকরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিজেদের দক্ষতা ও প্রজ্ঞা প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে দেশের ভাবমূর্তিকে বিকশিত করার সুযোগ পেয়েছে। বিদেশ থেকে উপার্জন বৃদ্ধি পেয়েছে। জাতিসংঘের শান্তি মিশনে বাংলাদেশ এখন একটি প্রশংসিত নাম। সামনের সুন্দর এ দিনগুলোকে রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝে জনগণ হারিয়ে যেতে দিতে পারে না। তাই দেশবাসী ভাবছে একজন গ্রহণযোগ্য বিশিষ্ট ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপ্রধান করা যেতে পারে সবার সাথে আলোচনার মাধ্যমে, ঐকমত্যের ভিত্তিতে, দেশের অগ্রগতিকে সুরক্ষিত রাখার প্রয়োজনে।

লেখক :প্রাক্তন সচিব

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
দেশে যৌথ উদ্যোগে তরুণ এসএমই উদ্যোক্তা তৈরির ভারতীয় প্রস্তাব সরকার গ্রহণ করবে বলে মনে করেন?
8 + 3 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
অক্টোবর - ১৭
ফজর৪:৪২
যোহর১১:৪৪
আসর৩:৫৩
মাগরিব৫:৩৪
এশা৬:৪৬
সূর্যোদয় - ৫:৫৭সূর্যাস্ত - ০৫:২৯
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :