The Daily Ittefaq
ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৬ মার্চ ২০১৩, ১২ চৈত্র ১৪১৯, ১৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ টাইগারদের টার্গেট ৩০৩ : প্রথম বাংলাদেশি বোলার হিসেবে আব্দুর রাজ্জাকের ২০০ উইকেট | আপিল করেছেন সাঈদী | আপিল করবেন না সঞ্জয় | মুন্সীগঞ্জে ১৪৫ মণ জাটকা আটক | সাতক্ষীরায় পুলিশের ওপর শিবিরকর্মীদের সশস্ত্র হামলা, গুলিবিদ্ধ ৪

মুক্তিযুদ্ধ :রোমাঞ্চকর কয়েকটি গেরিলা অপারেশন

সাদেক হোসেন খোকা

আমাদের আগেও বেশ কটি গ্রুপকে গেরিলা অপারেশনের জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছিল। তারা কয়েকটি সফল অপারেশন চালালেও তাদের কেউ কেউ পাকিস্তানি আর্মির হাতে ধরা পড়েছিলেন। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে অপারেশন শুরুর আগে আমরা অগ্রবর্তী গ্রুপগুলোর ত্রুটি- বিচ্যুতিগুলো নিয়ে গভীরভাবে পর্যালোচনা করি। প্রথমে আমাদের গ্রুপে ৪০ জন যোদ্ধাকে ২০ জন করে দুটি সাব গ্রুপে ভাগ করা হয়। যার একটি গ্রুপের নেতৃত্ব বর্তায় জনপ্রিয় পপ গায়ক আজম খানের ওপর, অপরটির নেতৃত্বে ছিল মোহাম্মদ শামসুল হুদা। আমাদের অন্য ৩৭ জন সহযোদ্ধার মধ্যে ছিলেন ইকবাল সুফী, আসলাম লস্কর, কাজী মোহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহ (বর্তমানে ব্যাঙ্ক কর্মকর্তা), মোহাম্মদ শফি, খুরশিদ (চট্টগ্রাম), খুরশিদ (টাঙ্গাইল), আব্দুল মতিন, আবু তাহের, মোহাম্মদ বাশার, খন্দকার আবু জায়েদ জিন্নাহ, ফরহাদ জামিল ফুয়াদ, ড. নিজাম, জাহেদ, নান্টু, মাসুদ, রুপিন, হারুন, মাহফুজ, রুহুল আমিন, বিজু ও কচিসহ আরো অনেকে।

ঢাকার সন্তান হিসেবে এই শহরের প্রতিটি অলিগলি ছিল আমাদের নখদর্পণে। অন্যদিকে পাকিস্তানি দখলদারদেরও কেন্দ্রীয় শক্তি ছিল ঢাকায়। তখন পাকিস্তানি শাসকরা ঢাকায় স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে বলে দেশে-বিদেশে ব্যাপকভাবে প্রচার চালাচ্ছিল। আমরা সংকল্প করলাম বড় কয়েকটি বিস্ফোরণ ঘটিয়ে তাদের প্রচারণার অসত্যতা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরবো।

ঢাকায় আসার আগে মেজর হায়দার যে ব্রিফিং দিয়েছিলেন তা যুদ্ধকালীন সময় যথাযথভাবে মেনে চলেছি। একক সিদ্ধান্ত না নিয়ে সঙ্গীদের সঙ্গে আলোচনা-পর্যালোচনা করে অগ্রসর হয়েছি। তাই আমাদের প্রায় সব অভিযানই সফলতা পেয়েছিল। গেরিলা যুদ্ধের রণকৌশল মেনে চলেছি, যেমন হিট এন্ড রান, জনগণের মধ্যে থেকে যুদ্ধ করা, শত্রুপক্ষকে সব সময় অস্থির রাখা, সাফল্য নিয়ে বেশি উত্ফুল্ল না হওয়া, নিজেদের নিরাপত্তার কথা স্মরণে রাখা, যুদ্ধে যতটা সম্ভব কম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, শত্রুর ব্যাপক ক্ষতিসাধন করা, প্রমাণাদি একেবারে সাথে না রাখা, ইত্যাদি। এমন সব জায়গায় আমরা সফল অপারেশন করেছি যে, আজো ভাবলে শরীর শিউরে উঠে। আমরা অপারেশন টার্গেট নির্ধারণ করতাম প্রচারের গুরুত্ব বিবেচনা করে, যাতে মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচার পায় এবং শত্রু আতঙ্কগ্রস্ত হয়।

সিদ্ধান্ত ছিল লস্কর ভেন্টিলেটর দিয়ে বিস্ফোরক যথাস্থানে রেখে আসবে, সুফী ও আমি গাড়িতে বসে কভার দেব। লস্কর বেচারা ছিল আমার মতো খাটো, ভেন্টিলেটরের নাগাল পেতে তার খুব অসুবিধা হচ্ছিল। অবস্থা দেখে সুফী এগিয়ে গিয়ে তাকে সাহায্য করে। আমি ব্যাগের ভেতর স্টেনগান নিয়ে বেবিটেক্সিতে বসে ছিলাম। ড্রাইভার বিষয়টি বুঝতে পেরে বিচলিত হয়ে উঠে। আমি তাকে ধমক দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করি। স্কুটার নিয়ে বর্তমান মেডিক্যালের ইমারজেন্সি গেটে আসতেই বিস্ফোরণে পুরো এলাকা ধোঁয়া ও ধুলায় অন্ধকার হয়ে যায়। দিন-তারিখ ঠিক মনে না থাকলেও আমাদের গুরত্বপূর্ণ অপারেশন ছিল পাক বিমানবাহিনীর একটি রিক্রুটিং অফিসে। এটি ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলের কাছে। আবার এর একেবারে নিকটেই ছিল বাবুপুরা পুলিশ ফাঁড়ি। পূর্ব পরিকল্পনামতো লস্কর ও সুফীসহ একটি বেবিটেক্সিতে ব্যাগভর্তি ২০ পাউন্ড বিস্ফোরক নিয়ে সেখানে যাই।

আমরা ওখানে বেবিটেক্সি ছেড়ে মেডিক্যাল কলেজের ভেতর দিয়ে ঢুকে পশ্চিম দিকের গেট দিয়ে বেরিয়ে রিকশা নিয়ে বুয়েট হলে চলে যাই। সেই হলে থাকত সংগী আমসাল লস্কর। ওর রুমে ঢুকে দ্রুত কাপড় বদলিয়ে ঘটনাস্থলের কাছাকাছি পৌঁছে দেখি হুলস্থুল অবস্থা। জনতার সঙ্গে মিশে দূর থেকে ঘটনা দেখেছি। আশপাশের এলাকা আর্মি, মিলিটারি পুলিশ, বিমানসেনা ও পুলিশ ঘিরে ফেলেছে এবং নানা পরীক্ষা করছে। তারা আশঙ্কা করছিল আশপাশে কোথাও মাইন পোতা আছে। এই অপারেশনটি মে মাসের শেষদিকে অথবা জুনের প্রথমে চালিয়েছিলাম।

প্রতিটি অপারেশনে আমরা আক্রমণ করেই সরে পড়েছি এবং জনগণের মধ্যে থেকে ফলাফল বা প্রতিক্রিয়া উপভোগ করেছি।

পিলখানার অভ্যন্তরে প্রবেশের সুযোগ পেয়ে যাই। দিনমজুরের যে দলটির সঙ্গে আমি ভেতরে যেতাম সে দলের একজন ছাড়া কেউ আমার আসল পরিচয় জানতো না। একদিন কাদামাটি গায়ে জিগাতলার গেট দিয়ে বের হচ্ছি, এমন সময়ই মুসলিম লীগের ছাত্র সংগঠন এনএসএফপি-এর তত্কালীন নেতা মাহবুবুল হক দোলন আমাকে চিনে ফেলেন। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, খোকা না? একি হাল! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে দোলন ভাই জানতেন আমি সচ্ছল পরিবারের সন্তান, তাই দিনমজুরের কাজ করার কথা না। প্রশ্ন শুনেই আমি ভয় পেয়ে যাই- এই বুঝি ধরা পড়ে গেলাম! কারণ অনতি দূরেই ইপিআরের সদস্যরা। ভয়ের সাথে সাথে বিব্রতও হই কিছুটা। তখন ছাত্র রাজনীতিতে প্রতিপক্ষ দলের নেতাদের সঙ্গেও সৌহার্দ্যমূলক সম্পর্ক ছিল বলেই হয়তো তিনি বিষয়টি চেপে গিয়েছিলেন। যাই হোক, সংক্ষেপে শুভেচ্ছা বিনিময় করে দ্রুত মিশে যাই জনতার মধ্যে।

এভাবে বেশ কয়েকদিন পিলখানার অভ্যন্তরে যাওয়া-আসা করি এবং উত্তেজনা নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পিলখানার অভ্যন্তরের সব কিছু দেখে নেই। কোথায় কোথায় অবজারভেশন পোস্ট আছে পরখ করি। আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল পিলখানার অভ্যন্তরে বিস্ফোরণ ঘটানো। সম্ভব হলে তাদের অস্ত্রভাণ্ডারের কাছাকাছি। কিন্তু হঠাত্ সার্বের কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভেতরে বিস্ফোরণ নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। তবে আজিমপুর কবরস্থান সংলগ্ন গেট এলাকায় আমরা প্রচণ্ড গ্রেনেড হামলা চালিয়ে তত্কালীন ইপিআর বাহিনীর বেশ ক্ষয়ক্ষতি ঘটিয়েছিলাম। রাতের বেলা পরিচালিত এই হামলার সময় একটি গুলি দেয়ালে লেগে ডিরেকশন চেঞ্জ হয়ে আমার পায়ে এসে বিদ্ধ হয়। অসহ্য যন্ত্রণা সত্ত্বেও ধরা পড়ার ভয়ে গুলিটি শরীরে বেশ কয়েকদিন বহন করেছি। পরে জাফর ভাইয়ের (কাজী জাফর আহমেদ) পরামর্শে তারই আত্মীয় জাহাঙ্গীর ভাই তখনকার ঢাকার একমাত্র বেসরকারি ক্লিনিক পলি ক্লিনিকে নিয়ে যান। এলিফেন্ট রোডে অবস্থিত ক্লিনিকটির পরিচালক ডা. আজিজ প্রথম দিন অপারেশন না করে দুইদিন পরে আবার যেতে বলেন এবং ২য় দিন তিনি নিজেই অপারেশন করে গুলিটি বের করেন। তত্কালীন ন্যাশনাল ব্যাংক (বর্তমানে সোনালী ব্যাংক) কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর ভাই দুইদিনই ক্লিনিকে আমার সাথে গিয়েছিলেন। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সহায়তা করেছেন এটা জানতে পেরে পাকসেনারা জাহাঙ্গীর ভাইকে একদিন অফিস থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে।

সঠিক দিন-তারিখ মনে না থাকলেও মনে আছে ডিএফপির অপারেশনের মতই রোজার মাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অপারেশন চালিয়েছিলাম তত্কালীন নির্বাচন কমিশন অফিসে। যে সকল জাতীয় সংসদ সদস্য ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নিয়ে মুক্তাঞ্চলে চলে গিয়েছিলেন তাদের আসন শূন্য ঘোষণা করে সেইগুলোতে উপ-নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি চলছিলো কমিশনে। এই নির্বাচন আয়োজনের চেষ্টা ভণ্ডুল করার উদ্দেশ্যে কমিশন অফিসটি উড়িয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেই।

তখন নির্বাচন কমিশনের অফিসটি ছিল রাজারবাগ পুলিশ লাইনের উল্টোদিকে মোমেনবাগের দুইটি ভাড়া করা বাড়িতে। পরে জানতে পারি এর একটি বাড়ির মালিক ছিলেন সাবেক মন্ত্রী ও বিএনপি নেতা ড. আব্দুল মঈন খানের বাবা আব্দুল মোমেন খান (তিনি সচিব এবং পরবর্তীতে জিয়াউর রহমানের সরকারে মন্ত্রী ছিলেন)। এখানে উল্লেখ করা আবশ্যক যে, নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা আবুল কাশেম (বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী) এই অপারেশন পরিকল্পনা চূড়ান্ত করতে আমাদের বিশেষ সহায়তা করেছিলেন। আবুল কাশেম তখন ঢাকা জেলা নির্বাচন অফিসের কর্মকর্তা ছিলেন। তার কর্মস্থল ছিল পুরান ঢাকার ভিক্টোরিয়া পার্কের কাছে। তার সঙ্গে ঘুরে ঘুরে আমি সব কিছু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখি। পরে সহযোদ্ধাদের সঙ্গে পরামর্শ করে অপারেশনের বিস্তারিত পরিকল্পনা করি।

অপারেশনের দিন প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছিলো, রাস্তা-ঘাটে লোক সমাগত ছিল কম। জনাকীর্ণ শহরে অপারেশনের জন্য বেশ আদর্শ পরিবেশ। এরকম এক অনুকূল পরিবেশে আমি, ইকবাল সুফী, আমসাল লস্কর, কাজী মোহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহ, মোহাম্মাদ বাশার ও নান্টু এই ৬ সহযোদ্ধা ২০ কেজি করে বিস্ফোরকভর্তি দুইটি বস্তা নিয়ে সেখানে যাই। পূর্ব পরিকল্পনা মত তিনজন করে দুইটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে দুই ভবনে বিস্ফোরক স্থাপনের জন্য এগিয়ে যাই। এখানেও প্রথমেই অস্ত্র দেখিয়ে দারোয়ানদের আয়ত্তে আনি। তাদেরকে বুঝাই আমরা কোন সন্ত্রাসী নই, মুক্তিযোদ্ধা, পাকিস্তানি জুলুমবাজদের কবল থেকে দেশকে স্বাধীন করার জন্য যুদ্ধ করছি। দেশ স্বাধীন হলে আমাদের সবার ভালো হবে, পাকিস্তানিদের অত্যাচার আর শোষণ থেকে বাঙালিরা রেহাই পাবে। তারা সহজেই আমাদের কথা মেনে নেয় এবং আমাদের নির্দেশনা মত অপারেশন সফল করতে সবরকম সহায়তা করে।

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা ও ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
দেশে যৌথ উদ্যোগে তরুণ এসএমই উদ্যোক্তা তৈরির ভারতীয় প্রস্তাব সরকার গ্রহণ করবে বলে মনে করেন?
3 + 6 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
আগষ্ট - ৪
ফজর৪:০৭
যোহর১২:০৫
আসর৪:৪২
মাগরিব৬:৪৩
এশা৮:০২
সূর্যোদয় - ৫:২৯সূর্যাস্ত - ০৬:৩৮
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :