The Daily Ittefaq
ঢাকা, রবিবার, ৩১ মার্চ ২০১৩, ১৭ চৈত্র ১৪১৯, ১৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ মঙ্গলবার শিবিরের সারা দেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল | আড়াইহাজারে দুই গ্রামবাসীর সংঘর্ষে আহত ৩৫ | শপথ নিয়েছেন চার বিচারপতি | বিএনপি নেতাদের চার্জশিটের গ্রহণযোগ্যতার শুনানি ১৭ এপ্রিল | ইবিতে ছাত্রলীগ-ছাত্রশিবির সংঘর্ষ, গুলিবিদ্ধসহ আহত ২০ | ফেনির দাঁগনভুইয়া থেকে ৩৫টি ককটেল ও গান পাউডার উদ্ধার | রাজশাহীতে শিবিরের বোমা হামলায় তিন পুলিশ সদস্য আহত

আমাদের রাজনীতি

মো:জাহিদ হোসেন

স্বাধীনতা পরবর্তীকালে আমাদের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মাঝে রাজনীতি একটি আকর্ষণীয় বিষয় হয়ে ওঠে। নানাবিধ কারণে তরুণ সমাজ রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। এতে দোষের কিছু নেই। এদের কাছে বাস্তবে রাজনীতি কোন একটি দলের সাথে যুক্ত হয়ে তাদের নীতি-আদর্শের প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করা, মিটিং, মিছিলে অংশগ্রহণ করা এবং বিনিময়ে ছাত্রজীবনেই কিছু কিছু রাজনৈতিক সুযোগ-সুবিধার আস্বাদ লাভ করা। ভর্তির ক্ষেত্রে, প্রমোশনের ক্ষেত্রে, হলে সিট পাওয়ার ক্ষেত্রে, চাকরি লাভের ক্ষেত্রে, হাত খরচের টাকা উপার্জন ও আধিপত্য বিস্তার করে মানসিক তৃপ্তি লাভের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ততা তাদের জীবনে একটি সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়। এককভাবে যা লাভ করা, আদায় করা বা দখল করা সম্ভব নয়, তা দলগত বা গোষ্ঠীগতভাবে আয়ত্তে আনা সহজতর। তবে অবশ্যই রাজনৈতিক দল এবং সন্ত্রাসী দলের মধ্যে বিরাট পার্থক্য রয়েছে। রাজনৈতিক দল কিংবা রাষ্ট্র অনুমোদিত ট্রেড ইউনিয়নগুলো একটি বিশাল গ্রুপের মঙ্গলের জন্য কাজ করে, সংগ্রাম করে। অন্যপক্ষে সন্ত্রাসী গ্রুপ কতিপয় স্বার্থান্বেষী আতঙ্কবাদির লোভ-লালসা ও অবৈধ স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটায়। কখনো কোন সন্ত্রাসী গ্রুপ দুর্নীতিবাজ সম্পদশালীদের সম্পদ লুট করে দুস্থদের মাঝে বিলিয়ে দিলেও সেটা প্রচালিত নীতি ও আইনের চোখে অবৈধ বিবেচিত হয়। নীতি-আদর্শহীন রাজনীতি যে কোন বিবেকবান ছাত্র বা অভিভাবকের জন্য কখনোই কাম্য হতে পারে না। বরং ছাত্রজীবনে তরুণ বয়সেই সকলের জানা উচিত রাজনীতি একটি পবিত্র দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার। আদর্শ রাজনীতিতে একজন জননেতার জীবন দলমত নির্বিশেষে জনগণের মঙ্গলে নিবেদিত হওয়া বাঞ্ছনীয়।

রাজনীতির সাথে মানুষ, রাষ্ট্র, সরকার, শাসন ব্যবস্থা, বিচার ব্যবস্থা, পার্লামেন্ট, রাজনৈতিক দল, সার্বভৌমত্ব ইত্যাদি শব্দগুলো ওতপ্রোতভাবে জড়িত। গ্রিক শব্দ Politika পনের শতকে ল্যাটিন ভাষার Polettiques এবং পরবর্তীতে ইংরেজি ভাষায় Politics হিসাবে ব্যবহূত হয়ে আসছে। রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থা বিকাশের সাথে সাথে রাজনীতিi ধারণাও বদলে যাচ্ছে সমান তালে। আক্ষরিক অর্থে রাজা ও নীতির সাথে রাজনীতিi কোন সম্পর্ক নেই। বর্তমানে Politics বলতে সংক্ষেপে যা বোঝায় তাহলো ঃ সরকার পরিচালনার বিজ্ঞান বা কলা; সরকারের নীতি-প্রভাব জনগণের মাঝে সঞ্চারিত করা; নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার পরিচালনার নিয়ন্ত্রণভার আয়ত্তে আনা ইত্যাদি। গণতান্ত্রিক রাজনীতির অভিধায় জনগণকেই গণ্য করা হয় ক্ষমতার উত্স হিসাবে। তবে, তাত্ত্বিক আলোচনায় মানুষের শক্তি বা অংশগ্রহণের কথা বলা হলেও কার্যক্ষেত্রে সকল দেশে সকল সময়ে জনগণ ক্ষমতার অধিকারী না হয়ে বরং ভোটে নির্বাচিত শাসক শ্রেণীর ক্রীড়নক হিসাবে বিবেচিত হয়। নির্বাচন পরবর্তীকালে সরকার বহুজন শাসিত গণতান্ত্রিক অবয়ব লাভ না করে গণতন্ত্রের বিকৃত সংস্করণ হিসাবে মুষ্ঠিমেয় সুবিধাবাদীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। বিশ্বের প্রায় সকল রাষ্ট্রেই জনগণের অধিকার কোন না কোন সময়ে লঙ্ঘিত হয়। কেবল কতিপয় কল্যাণকামী রাষ্ট্রেই সরকার জনগণের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা বজায় রাখে। আমরা কল্যাণধর্মী রাষ্ট্র হিসাবে উত্তর ইউরোপ ও উত্তর আটলান্টিকের দেশগুলোকেই বিশেষভাবে বুঝিয়ে থাকি। এক্ষেত্রে ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড, নরওয়ে, সুইডেন ও গ্রীনল্যান্ড উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ব্রুনাই ইত্যাদি কল্যাণধর্মী রাষ্ট্র হলেও তাদের কল্যাণধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি শুধু নিজেদের নাগরিকদের মাঝেই সীমাবদ্ধ। মানুষকে নিয়েই রাষ্ট্রের যাবতীয় কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। মানুষের জন্য রাষ্ট্র নাকি রাষ্ট্রের জন্য মানুষ বিষয়ে বিতর্ক চলতে পারে। তবে, কোন কালেই রাষ্ট্রের নেতৃত্ব কোন দৈত্য, দানব, জ্বীন, পরী, পশু, পাখি, বা অশরীরি শক্তির হাতে ন্যস্ত হয় নি । বরং তা অর্পণ করা হয়েছে চিন্তা-চেতনা ও বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের হাতে। মানুষ মানুষের দ্বারা নির্বাচিত হয়ে মানুষের জন্য রাজনীতি করবে- এটাই প্রথাগতভাবে স্বীকৃত হয়ে আসছে। তাই, যারা নিজের স্বার্থ ত্যাগ করে অন্যের সুখ-শান্তি ও রাষ্ট্রের কল্যাণে ব্রতী হবে কেবল তাদেরই রাজনীতিতে আসা প্রয়োজন। কিন্তু, আমাদের দেশে ছাত্র হলেই রাজনীতির সাথে যুক্ত হতে হবে- এধরনের একটি রেওয়াজ চলে আসছে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এমন পদ্ধতি থাকা প্রয়োজন যাতে রাজনীতি না করে বা কোন একটি দলের খাতায় নাম না লিখিয়েও তরুণরা তাদের প্রাপ্য সুবিধাটুকু লাভ করতে পারে। ছাত্র রাজনীতিকে কোন তরুণের পক্ষেই যাতে জীবন-জীবিকার সিঁড়ি হিসাবে গ্রহণ করতে না হয় সে ব্যবস্থা সরকারগুলোকেই নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষক সমাজের দায়িত্ব অনেক বেশি। শিক্ষকরা যদি দলীয় পরিচয় বর্জন করে রাজনীতির ধূম্রজাল থেকে বেরিয়ে আসতে না পারেন তাহলে কিভাবে তারা ছাত্রদের নিরপেক্ষ দেশপ্রেমিক হিসাবে জ্ঞানার্জনের পথে উদ্বুদ্ধ করবেন? মাদ্রাসা-মক্তবের শিক্ষকরা যদি ধর্মান্ধ দৃষ্টিভঙ্গির খোলস থেকে বেরিয়ে এসে যুক্তি-তর্ক ও বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তা-চেতনার মাধ্যমে তরুণ শিক্ষার্থীদের দেশপ্রেমে অনুপ্রাণিত না করেন তাহলে কিভাবে সমাজে গুণগত পরিবর্তন আসবে?

দায়-দায়িত্বহীন কাজের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেশি থাকে। যেখানে জবাবদিহিতা থাকবে সেখানেই মানুষের আগ্রহ কম হবে। জবাবদিহিতার বালাই নেই বলেই রাজনীতির প্রতি আমাদের এত আগ্রহ। গ্রামের ছোট মুদি দোকান থেকে শুরু করে আইন পরিষদ পর্যন্ত আমরা প্রচুর রাজনৈতিক আলোচনা করতে ভালোবাসি। আমরা পর্যালোচনা, সমালোচনা ও ঝগড়ায় সিদ্ধহস্ত ; কিন্তু সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি না। কারণ, আমরা সমঝোতার স্বার্থে কেউ কাউকে ছাড় দিতে পারি না। আমরা লেখাপড়া, কাজকর্ম বাদ দিয়ে নেতার আদেশ তামিল করতে ভালোবাসি। আমরা কোন দলের ক্যাডার হয়ে শান্তিপ্রিয় নাগরিকের মান-সম্মান অর্থ-বিত্ত হরণ করে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হতে পছন্দ করি। আমরা অন্তরে গভীর হিংসা, বিদ্বেষ ও পরশ্রীকাতরতার বিষ ধারণ করে পরচর্চা ও পরনিন্দার মাধ্যমে নিজেকে জাহির করায় সদাপ্রস্তুত।

স্বল্প মেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা ও প্রথাগত পদাধিকার স্বাভাবিক কারণেই আমাদের তরুণ সমাজ, শিক্ষক, আমলা, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ঠিকাদার, ব্যবসায়ী, আইনজীবী, মৌলানা ইত্যাদি সবাইকে কর্মী হতে, নেতা হতে, ক্যাডার হতে, রাজনীতি করতে এবং ক্ষমতার অশ্বে সওয়ার হতে হাতছানি দিয়ে ডাকে। বর্তমান যুগে রাজনীতির মাধ্যমে জনসেবার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও সম্পদের জগতে প্রবেশাধিকার লাভ করা।

জনসেবায় আমাদের নেতাদের কোন ক্লান্তি নেই। জনকল্যাণে নেই কোন বিরাম। আজীবন, মেয়াদের পর মেয়াদ তারা জনসেবায় নিবেদিত থেকে জনগণকে ভালোবাসতে চান। মিথ্যা আশ্বাস, অলীক স্বপ্ন, ভাওতাবাজি, কপট ভালোবাসা, আর শূন্যগর্ভ জনসেবায় আজ আমাদের রাজনীতি জর্জরিত। আমরা চাই বর্তমান প্রজন্মের নেতাগণ জনসেবার অকৃত্রিম অঙ্গীকার নিয়ে নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করবেন, ক্ষমতাবান হবেন, রাষ্ট্রীয় তথা জনগণের সম্পদ মোবিলাইজ করার স্বত্বাধিকারী হবেন, আইন প্রণয়ন করবেন। তারপর নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষ করে ভাল ইমেজ নিয়ে সততার সাথে তারা চলে যাবেন। যদি বার বার জনগণের সম্পদ দ্বারা দেশসেবার ইচ্ছা কারো মনে জাগে তাহলে নিরপেক্ষ, নির্ভেজালভাবে নির্বাচিত হয়ে আসা উচিত। কারণ, কোন ধনবান সমাজ সেবক যদি মানুষের মঙ্গল করতে চান, তাহলে তিনি রাজনীতিতে অংশগ্রহণ না করেও স্বীয় ইচ্ছা পূরণ করতে পারেন। তবে এখানে আমি রাজনীতি বিরোধী বা বিরাজনীতিকরণের পক্ষে নই। আমাদের রাজনীতিকগণ যদি সত্যিকার অর্থে জনগণের প্রতিনিধি হিসাবে জনগণের সমস্যাকে নিজের সমস্যা মনে করে রাজনীতি করেন তাহলে একদিন রাজনীতি হয়ে উঠবে অর্থবহ এবং সেই আদর্শ রাজনীতির মাধ্যমেই আমরা একটি কল্যাণধর্মী বাংলাদেশ গড়ার পথে এগিয়ে যেতে পারবো।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল

font
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
আইন প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, রাজনৈতিক দলের বৈশিষ্ট্য হারিয়ে সন্ত্রাসী দলে পরিণত হয়েছে বিএনপি। তার এই বক্তব্যের সঙ্গে আপনি একমত?
9 + 4 =  
ফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
জুলাই - ১৪
ফজর৩:৫৩
যোহর১২:০৪
আসর৪:৪৪
মাগরিব৬:৫১
এশা৮:১৪
সূর্যোদয় - ৫:১৯সূর্যাস্ত - ০৬:৪৬
archive
বছর : মাস :
The Daily Ittefaq
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: তাসমিমা হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে তারিন হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, e-mail: [email protected], সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। www.ittefaq.com.bd, e-mail: [email protected]
Copyright The Daily Ittefaq © 2014 Developed By :